সাময়িকভাবে মসজিদ বন্ধ রাখা বিষয়ে ইসলামের নির্দেশনা



আব্দুল কারীম আল মাদানী, অতিথি লেখক, ইসলাম
কাবা শরিফ, মক্কা, ছবি: সংগৃহীত

কাবা শরিফ, মক্কা, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বিশ্বব্যাপী প্রাণঘাতী মহামারি করোনাভাইরাসের তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড বিশ্ব। বেশ কয়েকটি রাষ্ট্র পুরো দেশে লকডাউন ঘোষণা করেছেন, ফলে কেউ বের হতে পারছেন না বাসা থেকে। অনেক স্থানে স্কুল-কলেজ ও জনসমাগম বন্ধ করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যসহ বেশ কয়েকটি দেশ সংক্রমণ এড়াতে মসজিদে জামাতে নামাজ আদায়ে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। মানুষকে ঘরে নামাজ আদায়ে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। মানুষের জমায়েত এড়িয়ে চলার জন্য সম্মিলিত ইবাদতসমূহ আপাতত একাকি আদায় করতে বলা হয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে ইসলামি স্কলারদের মাঝে নানা মত পরিলক্ষিত হচ্ছে। অনেকে এটা নিয়ে সমালোচনা করছেন, কেউ আবার সমর্থন জানিয়েছেন। চলমান পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র উৎকণ্ঠা থেকেই বিষয়গুলো আলোচিত হচ্ছে।

বর্তমান বিষয়ে আমরা উপরোক্ত আলোচনাকে প্রথমত দু’টি ধারায় বুঝার চেষ্টা করতে পারি-

এক. কোনো কারণ ছাড়াই মসজিদ বন্ধ করে দেওয়া,
দুই. সঙ্গত কোনো কারণে মসজিদ বন্ধ করে দেওয়া।

প্রথম অবস্থা: তথা স্বাভাবিক কোনো অবস্থা বিরাজ করলে কিংবা কোনো ধরনের শরয়ি কারণ ছাড়া মসজিদ বন্ধ করে দেওয়া বা ইবাদত-বন্দেগিতে বাধা প্রদান করা মুসলিম উম্মাহের ঐক্যমতে- হারাম।

এ বিষয়ে কোরআনে কারিমের সূরা বাকারার ১১৪ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে- ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর মসজিদসমূহে তার নাম উচ্চারণ করতে বাধা দেয় এবং সেগুলোকে উজাড় করতে চেষ্টা করে, তার চাইতে বড় জালেম আর কে? এদের পক্ষে মসজিদসমূহে প্রবেশ করা বিধেয় নয়, অবশ্য ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায়। ওদের জন্য ইহকালে লাঞ্ছনা এবং পরকালে কঠিন শাস্তি রয়েছে।’

দ্বিতীয় অবস্থা: কোনো স্থানে বা দেশে ব্যাপক মহামারি কিংবা দুর্যোগ দেখা দিলে কিংবা যেকোনো ধরনের শরয়ি কোনো উজর (সমস্যা) কিংবা কারণ পাওয়া গেলে এবং এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের পরামর্শ থাকলে, সাময়িকভাবে মসজিদ বন্ধ রাখা বা সম্মিলিত ইবাদত থেকে বিরত থাকা- জায়েজ।

এ বিষয়ে কোরআনে কারিমে ইরশাদ হচ্ছে, ‘আর ব্যয় করো আল্লাহর পথে, তবে নিজের জীবনকে ধ্বংসের সম্মুখীন করো না। আর (মানুষের প্রতি) অনুগ্রহ করো। আল্লাহ অনুগ্রহকারীদের ভালোবাসেন।’ –সূরা বাকারা: ১৯৫

কোরআনে কারিমে আরও ইরশাদ হচ্ছে, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। কেবল তোমাদের পরস্পরের সম্মতিক্রমে যে ব্যবসা করা হয় তা বৈধ। আর তোমরা নিজেদের হত্যা করো না। নিঃসন্দেহে আল্লাহতায়ালা তোমাদের প্রতি দয়ালু।’ –সূরা নিসা: ২৯

উল্লেখিত দুই আয়াত থেকে স্পষ্টভাবে বুঝা যায়, আল্লাহতায়ালা নিজ হাতে নিজেদের ধ্বংসের দিকে ধাবিত করতে নিষেধ করেছেন। আলোচিত মহামারি রোগ যেহেতু ভাইরাস জাতীয় বা সংক্রামক, সম্মিলিত কোনো স্থান থেকে রোগ অন্যের কাছে ছড়াতে পারে। এতে নিজে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে৷ আর যেখানে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, সেখান থেকে বেঁচে থাকতে শরিয়ত নির্দেশ দিচ্ছে।

একাধিক হাদিসে মহামারি কিংবা ভাইরাস জাতীয় কোনো রোগ থেকে দূরে সরে থাকতে বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, আক্রান্ত ব্যক্তি কোনো সুস্থ-সবল লোককে আক্রান্ত করতে যেনো না পারে। তাই আক্রান্ত এলাকায় প্রবেশ না করতে কিংবা বের না হতে।

যেহেতু কোরআনে কারিমে আল্লাহতায়ালা স্পষ্টভাবে নিজেকে ধ্বংস না করতে বলেছেন। অপরদিকে একজন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর লক্ষণ প্রকাশ হওয়ার আগে- সে যদি মসজিদে যায় এবং তার থেকে আপনার মাঝে ছড়ায় বা বিশাল লোকবলে ছড়ায়, তাহলে কি নিজেকে ধ্বংস করা হলো না?

আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনের অনেক জায়াগায় যেকোনো বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের থেকে জেনে নিতে বলেছেন। আর মহামারি ইত্যাদির গতিবিধি কিংবা সতর্কবিধি আমাদের জানা নেই। তাই এ বিষয়ে অভিজ্ঞ ডাক্তাররা পরামর্শ দিচ্ছেন, এই রোগ জনসমাগম থেকে ছড়ানোর সম্ভাবনা বেশি। সুতরাং, আমাদেরকে জনসমাগম জাতীয় সবকিছু এড়িয়ে চলতে হবে।

অভিজ্ঞ ডাক্তাররা সাধারণ মানুষকে সম্মিলিতভাবে কোনো কিছু করা থেকে বিরত থাকতে বলছেন, সেখানে তাদের পরামর্শ মেনে নিয়ে নিজের হেফাজত করা একান্ত শরিয়তসম্মত ও জরুরি বিষয়।

ইসলামি শরিয়তের একটা মূলনীতি হলো- কোনো প্রকারের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া যাবে না (স্বেচ্ছায়) আবার কারও ক্ষতি করা যাবে না।

যেহেতু আপনি-আমি কিংবা আমার পাশের লোকটি করোনায় আক্রান্ত কি-না (কেননা, ১৪ দিনের মধ্যে লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে) তা জানি না। এমতাবস্থায় যদি আক্রান্ত হই তবে অন্যকে ক্ষতি করার সম্ভাবনা প্রবল। অন্য কেউ আক্রান্ত কি-না, তাও অজানা। কেউ আক্রান্ত হলে, নিজে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। উভয় দিকেই ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে। আর এ অবস্থা থেকে বেঁচে থাকতে ইসলামি শরিয়ত নির্দেশ দিচ্ছে।

সমসাময়িক যেকোনো বিষয়ে স্থানীয় আলেম-উলামার ফতোয়া বা পরামর্শ মেনে নিতে শরিয়ত নির্দেশ দিচ্ছে। এতে কল্যাণ রয়েছে। যেসব এলাকায় বা দেশে, বিজ্ঞ আলেম-উলামা মসজিদে এসে জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায় না করতে পরামর্শ দিচ্ছেন, তাদের পরামর্শ দান ও গ্রহণ উভয়ই শরিয়তসম্মত।

উপরোক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হয়, কোনো জায়গায় করোনাভাইরাসের আক্রমণ ভয়াবহ হলে, ওই এলাকায় বা দেশে সাময়িকের জন্য মসজিদ বন্ধ করা বা জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায় থেকে বিরত থাকা সম্পূর্ণ শরিয়তসম্মত।

দেখুন, আপনি কি জন্য মসজিদ বন্ধে ব্যথিত হচ্ছেন? জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায়ে বিরত রাখায় ব্যাথাতুর হচ্ছেন? নিশ্চয়ই বলবেন, সওয়াব বা ইবাদত থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

এটা নিয়ে দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। আপনার জন্য বোখারি শরিফের একটা হাদিস থেকে সু-সংবাদ জানাচ্ছি। ওই হাদিসে হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তি যদি অসুস্থ হয় কিংবা মুসাফির হয়, তবে সে ইবাদতের সওয়াব এতটুকু পাবে, যেটুকু সে একজন সুস্থ মুকিম অবস্থায় ইবাদতের জন্য পাবে।’ এটা একটি মূলনীতিভুক্ত হাদিস।

একইভাবে শরয়ি কোনো সমস্যার কারণে জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায় থেকে বিরত থাকলে, আশা করি জামাতের সওয়াব পাবেন- ইনশাআল্লাহ!

শেষ কথা হলো- মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়, মিসরের আজহার বিশ্ববিদ্যালয় ও সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের সকল ফতোয়া বোর্ড অবস্থা ও পরিবেশ বিবেচনায় একই ফতোয়া দিয়েছেন।

লেখক: শিক্ষার্থী, ইসলামিক আইন ও বিচার বিভাগ, মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়, সৌদি আরব।