কওমি মাদরাসার শিক্ষকদের জন্য আপৎকালীন তহবিল গঠন আবশ্যক

মুফতি মুহিউদ্দীন কাসেমী, অতিথি লেখক, ইসলাম
কওমি মাদরাসার ক্লাসরুম, ছবি: সংগৃহীত

কওমি মাদরাসার ক্লাসরুম, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

মাওলানা আবদুল্লাহ (ছদ্মনাম)। গাজীপুর শহরের একটি কওমি মাদরাসার শিক্ষক। বোরবার একটি অনাকাঙ্খিত বার্তা দিলেন। তার বার্তার সারমর্ম হলো- ‘আমাদের মাদরাসা মুহতামিম (প্রিন্সিপাল) সাহেব ফোন দিয়ে জানালেন, মার্চ-এপ্রিল ও মে; এই তিনমাসের বেতন দেওয়া হবে না। কারণ, কিতাব বিভাগ বন্ধ থাকায় ছাত্রদের কাছ থেকে বেতন নেওয়া হবে না।’

বার্তাটি পড়ে তার সঙ্গে ফোনে কথা বললাম। অভাবের সংসার। সে একাই কোনোভাবে সংসার চালাচ্ছেন। একসঙ্গে তিনমাসের বেতন বন্ধ হওয়ায় চলা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। আগের কিছু ঋণ আছে, নতুন করে ঋণ করাও ঝামেলা।

তার বার্তাটি আমি ফেসবুকের একটা গ্রুপে শেয়ার করি৷ গ্রুপটি মূলত কওমি মাদরাসাকেন্দ্রিক। সেখানে কওমি মাদরাসার সুখ-দুঃখ নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা হয়। পোস্টে বেশকিছু কমেন্ট পড়ে দেখলাম, আরও কিছু মাদরাসার অবস্থাও এমন। কিছু মাদরাসার অবস্থা আরও করুণ। করোনার আগেই তাদের অবস্থা করুণ ছিল। কয়েক মাসের বেতন বাকি ছিল। এই পরিস্থিতিতে আসলে কী করা উচিত?

করণীয় নির্ধারণের আগে জানা দরকার, কওমি মাদরাসাগুলো সাধারণত দুই ধরনের হয়ে থাকে। স্থায়ী জায়গায় এবং অস্থায়ী তথা ভাড়া জায়গায় বা বাড়িতে। বর্তমান পরিস্থিতিতে মাদরাসা বন্ধ। ছাত্রদের বেতন নেওয়া যাচ্ছে না। অথচ বাড়ি ভাড়া এবং শিক্ষকদের বেতন তো দেওয়া লাগবে। ভাড়া বাড়িতে মাদরাসার দুই অবস্থা। কোনো মাদরাসা বেশ স্বাবলম্বী। এদের সংখ্যা কম। যাদের কয়েক মাসের টাকা ব্যাংকে আছে। তাদের জন্য আপৎকালীন সংকট দূর করা সমস্যা না। কিন্তু অনেক মাদরাসার অবস্থা বাস্তবেই শোচনীয়। ছাত্রদের মাসিক খাবার ও বেতনের টাকা দিয়েই তারা চলে।

আর যেসব মাদরাসা ভাড়ায় চলে না, স্থায়ী জায়গায়। সেগুলোতেও শিক্ষক ও স্টাফের বেতনের সিংহভাগ ছাত্রদের বেতন হতে সংগৃহীত হয়। কিছু অনুদানও থাকতে পারে। জানা উচিত, কওমি মাদরাসার লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে সাধারণত মানুষজন দান অনুদান এবং জাকাত-ফিতরার টাকা দিয়ে থাকেন। এ টাকা যে ফান্ডে জমা হয়, সেটাকে গোরাবা ফান্ড বলা হয়। গোরাবা ফান্ডের টাকা সরাসরি বেতনে ব্যবহার করা যায় না। সাধারণ ফান্ড হতে বেতন, নির্মাণ ইত্যাদি কাজে ব্যয় করা হয়। এসব মাদরাসাও বন্ধ থাকলে ছাত্রদের বেতন পাবে না, তখন তাদের জন্যও বেতন দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে।

মোটকথা বিদ্যমান সংকটকালে কিছু মাদরাসা ভাড়া দিতে পারছে না। ভাড়া না দিতে পারলে বেতন দেওয়া সম্ভব না। আর কিছু মাদরাসা বেতন দিতে পারছে না। কিছু মাদরাসা এমনও আছে, যাদের আর্থিক অবস্থা ভালো কিন্তু যৌক্তিক কারণ ছাড়াই বেতন আটকে রাখছে। তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসন এবং কওমি মাদরাসার বোর্ডগুলো ব্যবস্থা নেওয়া আবশ্যক।

কওমি মাদরাসাগুলোর ভাড়া ও বেতনের এই সংকট কাটানো যায় কেমনে? বাড়ির মালিককে অনুরোধ করে অথবা সরকারের নির্দেশে ভাড়া বাকি রাখার সাময়িক একটা ব্যবস্থা করা যাবে। কিন্তু শিক্ষক ও স্টাফের বেতন পরিশোধ করা তো আবশ্যক। মাদরাসার অধিকাংশ শিক্ষক আবাসিক। তাদের জন্য মাদরাসার বাইরে ভিন্ন কিছু করার সুযোগ কম। উপরন্তু তাদের বেতনের হারও স্বল্প। পরিবার-পরিজন নিয়ে কোনোরকমে চলেন। সারা মাস চলার পর সঞ্চয় বলতে কিছু থাকে না। এমন মানুষদের জন্য এক মাস বেতন না পেলে চুলায় আগুন জ্বলা মুশকিল। আর সেখানে লাগাতার তিন মাসের বেতন বন্ধ হওয়া তো বিরাট দুর্ঘটনা।

করোনার দুর্যোগে পুরো পৃথিবী আক্রান্ত। এমন সংকট ও আপদ বিভিন্ন সময়েই আসতে পারে। তাই কওমি মাদরাসার কর্তৃপক্ষের উচিত, মাদরাসা ও শিক্ষকদের কল্যাণে আপৎকালীন ফান্ড গঠন করা৷ সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে ফান্ড গঠিত হবে।

কাদের অর্থায়নে ফান্ড হবে?
ক. প্রাথমিকভাবে প্রত্যেক মাদরাসা এবং প্রত্যেক শিক্ষকের কাছ থেকে সদস্যপদ গ্রহণ সাপেক্ষে টাকা নেওয়া যেতে পারে। নির্দিষ্ট পরিমাণ কিংবা এক-দুই দিনের বেতন পরিমাণ।

খ. দেশি-বিদেশি দাতাদের কাছ হতে অর্থ নেওয়া যেতে পারে।

গ. সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বা অন্য ফান্ড হতে অর্থ সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারে।

ফান্ড পরিচালনা করবেন কারা?
ফান্ড সংগ্রহ করার চেয়ে ফান্ড পরিচালনা ও দেখভাল করা বেশি কঠিন। কওমি মাদরাসার বোর্ড বেফাক, হাইয়া অথবা অন্যান্য কওমি বোর্ডের অধীনে বিত্তবান ও শীর্ষ আলেমদের তত্ত্বাবধানে এ ফান্ড পরিচালিত হবে। যাদের অতীতে কোনো আর্থিক কেলেঙ্কারির রেকর্ড নাই, নিজেরা আর্থিকভাবে স্বচ্ছল এবং যারা নিজেরাই শিক্ষকদের কল্যাণে লাখ লাখ টাকা খরচ করার সামর্থ্য রাখেন।

কখন-কোথায় খরচ করা হবে?
আপৎকালীন সময়ে কওমি মাদরাসা এবং মাদরাসার শিক্ষকদের কল্যাণে খরচ করা হবে। এককালীন অনুদান হিসেবেও হতে পারে আবার সুদমুক্ত ঋণও হতে পারে। এখন যেসব মাদরাসা ভাড়া বা বেতন দিতে পারছে না, তাদেরকে ঋণ দেওয়া হল। আগামী রমজানের পর এককালীন অথবা কিস্তিতে শোধ করে দিল।

রোহিঙ্গাদের জন্য কওমি উলামায়ে কেরাম দেশ-বিদেশ হতে কোটি কোটি টাকার ফান্ড সংগ্রহ করে সুষ্ঠুভাবে ব্যয় করেছেন, করছেন। তারা হিম্মত করলে স্বজাতির দরিদ্র শিক্ষকদের কল্যাণে কিছু করতে পারবেন। সকলের প্রয়োজন পূরণ সম্ভব না হলেও কিছু মানুষের প্রয়োজন পূরণ করা তো সম্ভব।
হাদিসে আছে, যেসব দরিদ্র লোকজন আত্মসম্মানের কারণে কারও কাছে কিছু চাইতে পারে না, অথচ তাদের প্রয়োজন রয়েছে; এমন লোকদের দান করা অধিক সওয়াবের কারণ।

বেফাকসহ অন্য বোর্ডগুলো তো এখন মোটামুটি স্বাবলম্বী। পরীক্ষার ফি ও বই-পুস্তক বিক্রি হতে ভালো আয় হয়। তাই বেফাক ইচ্ছে করলে ভর্তির সময় ছাত্রদের কাছ থেকে নির্ধারিত ফি গ্রহণ বন্ধ করে, ওই পরিমাণ টাকা আপৎকালীন ফান্ডের জন্য জমা করতে পারে।

বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ। আজকে আমার-আপনার ঘরে চাল-ডাল, ওষুধপাতি কেনার টাকা না থাকলে কেমন লাগবে? নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সংগ্রহের অবলম্বন না থাকলে মনের অবস্থা কেমন হবে?

কওমি মাদরাসা এবং কওমি শিক্ষকদের বৃহত্তর স্বার্থে আপৎকালীন ফান্ড গঠন করা সময়ের অনিবার্য দাবি।

মুফতি মুহিউদ্দীন কাসেমী: কওমি মাদরাসার শিক্ষক।

আপনার মতামত লিখুন :