রানি বিলকিস: কোরআনে বর্ণিত এক সম্রাজ্ঞীর ঘটনা

মুফতি মাহফূযুল হক, অতিথি লেখক, ইসলাম
কোরআনে বর্ণিত রানি বিলকিসের রাজপ্রাসাদ, ছবি: সংগৃহীত

কোরআনে বর্ণিত রানি বিলকিসের রাজপ্রাসাদ, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

রমজানের ১৬তম তারাবিতে তেলাওয়াত করা হবে ১৯তম পারা অর্থাৎ সূরা ফুরকানের ২১ নম্বর আয়াত থেকে সূরা নমলের ৫৯ নম্বর আয়াত পর্যন্ত। আজকের তারাবির বিশেষ উল্লেখযোগ্য অংশ হলো- নবী হজরত সোলায়মান আলাইহিস সালাম এবং রানি বিলকিসের ঘটনা। সূরা নমলের ১৬ থেকে ৪৪ নম্বর আয়াতে এ ঘটনা স্থান পেয়েছে।

ঘটনার ধারাবাহিকতা কোরআন কারিমে হৃদয়গ্রাহী ভাষায় স্থান পেয়েছে। আমরা এখানে ঘটনা বা কোরআনে কারিমের উক্ত আয়াতগুলোর ধারাবাহিক অনুবাদের দিকে না যেয়ে ঘটনার বিভিন্ন শিক্ষা ও দিক নিয়ে আলোচনা করবো।

হজরত সোলায়মান (আ.) ছিলেন একজন নবী। আর ‘নবী’ এটা কোনো দুনিয়ার পদ বা বিশেষ কোনো ভূষণ নয়। এটা আল্লাহওয়ালাদের, আল্লাহর অলিদের, দুনিয়াবিমুখদের, পরহেজগারদের, আল্লাহর আশেক বা পাগলদের, জান্নাতের নেশায় আচ্ছন্নদের সর্বোচ্চ আসন। অন্যকোনো আসন, পদ বা ভূষণের ব্যক্তি নবীদের চেয়ে আল্লাহর অধিক নিকটতম নয়। অথচ নবী সোলায়ামান (আ.) একজন রাজাও ছিলেন। আবার অঢেল ধন-সম্পদও তার হস্তগত ছিলো। সেই সময়কার মানব সমাজে ব্যবহৃত সকল ধরণের বস্তু সামগ্রী তার ছিলো। বিশাল সেনাবাহিনী ছিলো। রাজ্য নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনার কাজে তিনি জিন, পাখিসহ অন্যান্য প্রাণীদেরও কাজে লাগাতেন। তিনি মানুষের ভাষাসহ অন্যান্য প্রাণীর ভাষা বুঝতেন। এ থেকে প্রমাণিত হয় সম্পদ, রাজ ক্ষমতা, জ্ঞান-বিজ্ঞানের পারদর্শিতা, তথ্য-প্রযুক্তির নেতৃত্ব এগুলো দ্বীনদারি বা পরহেজগারীর পরিপন্থী নয়। অতএব, সম্পদ উপার্জনের জন্য চেষ্টা করলে, রাজ ক্ষমতা লাভের জন্য সচেষ্ট হলে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পারদর্শিতা অর্জনের জন্য পরিশ্রম করলে, তথ্য-প্রযুক্তিতে দক্ষ হতে পরিশ্রম করলে দ্বীনদারী কমবে না, পরহেজগারি হ্রাস পাবে না। এগুলো আল্লাহর অলি হওয়ার, আল্লাহর আশেক হওয়ার বাঁধা নয়।

তবে কারো সম্পদ যদি তাকে কারুনের মতো আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত করে, কারোর রাজ ক্ষমতা যদি তাকে ফেরাউনের মতো আল্লাহদ্রোহী বানায়, কারো জ্ঞান যদি তাকে ইবলিসের মতো অহঙ্কারী বানায় এগুলো যদি তাকে দ্বীন থেকে সরিয়ে দেওয়ার উপলক্ষ্য হয় তবে অবশ্যই এগুলো ইসলামে নিন্দনীয়। আল্লাহর আনুগত্য ও দাসত্বকে শতভাগ ঠিক রেখে দুনিয়া ও দুনিয়ার বস্তু সামগ্রীর সর্বোচ্চ ব্যবহার ইসলামে কাম্য।

আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও মদিনাতে এসে শাসন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে বসেছেন। তার সাহাবাগণ শিল্প, ব্যবসা, কৃষি কাজ করেছেন। যুদ্ধে সময়ের সেরা প্রযুক্তি ও কৌশল ব্যবহার করেছেন।

দুনিয়ার নেতৃত্ব লাভের জন্য শুধু সততা ও পরহেজগারি যথেষ্ট নয়। সততা ও পরহেজগারির পাশাপাশি দুনিয়ার নেতৃত্ব প্রদানের মতো বহুমুখি যোগ্যতা ও প্রতিভার অধিকারী হতে হবে, জ্ঞান-বিজ্ঞানের নেতৃত্বের আসনও দখলে নিতে হবে, নেতৃত্ব প্রদানের মতো নিজস্ব পর্যাপ্ত জনবল ও জনশক্তি থাকতে হবে।

নারীর ক্ষমতায়ন এটা আধুনিকতার কোনো সনদ নয়। জাতি উন্নত হওয়ার কোনো সূচক নয়। দেশ এগিয়ে যাওয়ার কোনো মাপকাঠি নয়। আজ থেকে ৩ সহস্রাধিক বছর পূর্বে বিলকিস ছিল ইয়েমেন সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ ক্ষমতায় আসীন। প্রাচীন ইতিহাসে যা ‘সাবা’ নামে বিবৃত হয়েছে।

আজ থেকে চৌদ্দ শ’ বছর পূর্বে তদানীন্তন পৃথিবীর পরাশক্তি পারস্য সাম্রাজ্যের সিংহাসনে নারী ছিলো। তাই নারী দেশ পরিচালনার গদিতে বসা এটা পৃথিবীর অনেক পুরোনো ইতিহাস। এটা নতুন কোনো নয়, তবে এটা ইসলামে জায়েজ আছে কিনা, তা ভিন্ন একটি প্রসঙ্গ।

নামাজের জামাতের নেতৃত্ব, দেশের নেতৃত্ব, আর প্রধান বিচারপতির আসন এ ৩টি স্পর্শকতার চরম ঝামেলাপূর্ণ দায়িত্ব থেকে ইসলাম নারীকে নিরাপদ দূরে রেখেছে।

অমুসলিম শাসকের উপহার গ্রহণ করা যাবে কিনা, তা-ও এ ঘটনার একটি আলোচনা। এটা ফলনির্ভর একটি বিষয়। যদি তাদের উপহার গ্রহণ করার দ্বারা ইসলামের প্রতি তাদের আকৃষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল থাকে তাহলে উপহার গ্রহণ করা যাবে, বরং গ্রহণ করাই শ্রেয়।

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক খ্রিস্টানের রেশমি বস্ত্র উপহার গ্রহণ করেছিলেন। হজরত আবু সুফিয়ান কাফের থাকা অবস্থায় একটি চাদর উপহার দিয়েছিলেন, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা গ্রহণ করেছিলেন। আর যদি তাদের উপহার গ্রহণের দ্বারা উম্মাহর ওপর, দ্বীনের ওপর তাদের প্রভাব বিস্তারের সম্ভাবনা দেখা দেয়, জনমত তাদের প্রতি দূর্বল হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয় তবে তাদের উপহার গ্রহণ না করা।

আগেই বলা হয়েছে, আল্লাহতায়ালা হজরত সোলায়মান (আ.)-কে বিরল ক্ষমতার অধিকারী করেছিলেন। পশুপাখি, জিন থেকে শুরু করে প্রবাহিত বাতাস পর্যন্ত তার অনুগত ছিল। তার বাহিনীতে অসংখ্য জিন ও পশুপাখি সংযুক্ত ছিল। একদিন হজরত সোলায়মান (আ.) তার অনুগত ‘গোয়েন্দা পাখি’ হুদহুদকে অনুপস্থিত দেখলেন। এতে রাগান্বিত হলেন এবং বললেন, যথাযথ কারণ দর্শাতে না পারলে হুদহুদ কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হবে। কিছুক্ষণ পর হুদহুদ ফিরে এলো এবং রানি বিলকিসের রাজ্য, রাজত্ব, ক্ষমতা, প্রাসাদ ও সিংহাসন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিল।

তিনি রানিকে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের আহ্বান জানিয়ে চিঠি পাঠান। উত্তরে রানি বিপুল পরিমাণ উপঢৌকন প্রেরণ করেন হজরত সোলায়মান (আ.)-এর দরবারে। কিন্তু জাগতিক ধন-সম্পদের প্রতি কোনো মোহ ছিল না হজরত সোলায়মান (আ.)-এর। তিনি তা প্রত্যাখ্যান করলেন এবং জানালেন, মানুষকে কুফর ও শিরকমুক্ত করে একত্ববাদের পথে নিয়ে আসাই তার মূল চাওয়া।

হজরত সোলায়মান (আ.) রানি বিলকিসের উপহার গ্রহণ করেননি। আমাদের নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও অনেক অমুসলিমের উপহার প্রত্যাখ্যান করেছেন।

সাধারণ অবস্থায় কাফেরদের সঙ্গে ভদ্রতা, শিষ্টাচার রক্ষা করা নবীদের সুন্নতভ হজরত সোলায়মান (আ.) তার দূত হুদহুদ পাখিকে রানি বিলকিসের দরবারে পত্র দিয়ে প্রেরণের সময় উপদেশ দিয়েছিলেন, রানির হাতে পত্র সমর্পণ করে তার মাথায় চড়ে বসবে না বরং তার থেকে সম্মানজনক দূরে বসবে।

কোনো অমুসলিমের ওপর ইসলামের প্রভাব বিস্তারের জন্য তাকে প্রভাবিত করার মতো কিছু করা যায়। হজরত সোলায়মান (আ.) চাইলেন রানি বিলকিস উপস্থিত হওয়ার আগেই তার সিংহাসন উপস্থিত করে ফেলতে। যেন তা দেখে সে অবাক হয়ে যায়, প্রভাবিত হয়ে যায়। তবে নিজের প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে কিছু করা, নিজেকে জাহির করার ইচ্ছায় কিছু করা এটা নিন্দনীয়।

কোরআনে কারিমে হজরত সোলায়মান (আ.) রানি বিলকিসের ঘটনার বর্ণনা এ বাক্য দিয়ে শেষ করেছে, বিলকিস বলল- ‘হে আমার পালনকর্তা! আমি তো নিজের প্রতি জুলুম করেছি। আমি সোলায়মানের সঙ্গে বিশ্ব জাহানের পালনকর্তা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করলাম।’ রানি বিলকিসের ইসলাম গ্রহণ পরবর্তী জীবন সম্পর্কে আর কোনো বর্ণনা কোরআনে নেই। অর্থাৎ বিলকিসের পরবর্তী জীবন খোঁজ করা, হজরত সোলায়মান (আ.)-এর সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছিলো কিনা তা গবেষণা করা আমাদের জন্য অনর্থক কাজ।

রানি বিলকিস ছিলেন অপূর্ব সুন্দরী। কিন্তু কোনো পুরুষ তাকে মোহিত করতে পারেনি। প্রসিদ্ধ মতে হজরত সোলায়মান (আ.)-এর সঙ্গে তার বিয়ে হয়, তিনি সোলায়মান (আ.)-এর সন্তানের মাও হন।

আমাদের দায়িত্ব, হজরত সোলায়মান (আ.) ও রানি বিলকিসের ঘটনা কোরআন থেকে বারংবার মনোযোগ দিয়ে পড়ে ঘটনার বাঁকে বাঁকে আমাদের জন্য যে সব হেদায়েত, নসিহত লুকিয়ে আছে তা অনুসন্ধান করা।