ক্রীড়ায় হিজাবি নারীরা ভাঙছেন শত বছরের বাধা

নুসরাত জাবীন বিভা, নিউজরুম এডিটর, বার্তা২৪.কম
অলিম্পিকে মিসরীয় পদকজয়ী নারী খেলোয়াড় হেদায়া মালাক, ছবি: সংগৃহীত

অলিম্পিকে মিসরীয় পদকজয়ী নারী খেলোয়াড় হেদায়া মালাক, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

২০১৬ সালের রিও অলিম্পিক গেমস, বীচ ভলিবলে জার্মানীর বিরুদ্ধে উদ্বোধনী ম্যাচের পরের দিন। একদিনেই সবার নজর কেড়েছেন মিসরের দোয়া এলঘোবাশি।

উদ্বোধনী ম্যাচে খেলার সময় নেটে মুখোমুখি দু’জনের ছবি। নেটের একপাশে হিজাব, ফুলহাতা শার্ট এবং লেগিংস পরা এলঘোবাশি, আরেক পাশে বিকিনি পরা জার্মানী প্রতিদ্বন্দ্বী কিরা ওয়াল্কেনহর্স্ট। সেবারের অলিম্পিক আসরে ভাইরাল হওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছবিগুলোর মধ্যে একটি।

অলিম্পিক গেমস থেকে প্রত্যাশিত সাংস্কৃতিক মিলনের একটি প্রতিচ্ছবি এটি। কিন্তু এই ছবিতে মানুষ যে ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল তাতে মনে হয়েছিল আন্তর্জাতিক আসরে এমন বৈচিত্রের বিষয়টি এখনও বেশ নতুন।

এলঘোবাশি দ্য ন্যাশনালকে বলেন, ‘শুধু আমার ছবি দেখে অনেকে আমার সাথে কথা বলতে আসে। হঠাৎ করেই আমি যেন বিখ্যাত হয়ে যাই। আমার ধারণাও ছিলো না কেন। তারপর বুঝলাম বীচ ভলিবলে হিজাব পরে খেলা এই খ্যাতির কারণ।’

দ্বিতীয় ম্যাচের দিন কোপাকাবানা বীচে দর্শক উপচে পড়ে। ১০ হাজার দর্শকের সামনে এলঘোবাশি ও নাদা মেয়াওয়াদরা ইতালির বিরুদ্ধে খেলে। সেদিনের স্মৃতি মনে করে এলঘোবাশি বলেন, ‘মানুষ শুধু দোয়া এলঘোবাশিকে দেখতে আসে যে হিজাব পরে খেলাকে এই মেয়ে যার ছবি পুরো ইন্টারনেটজুড়ে। আমরা ওই ম্যাচ হেরে যাই কিন্তু ম্যাচ শেষে দর্শকরা আমাদের দাঁড়িয়ে অভিনন্দন জানিয়েছে। আমরা যতটুকু অর্জন করতে পেরেছি তাতেই সবাই ভীষণ খুশি ছিল।’

সেবার এলঘোবাশি এবং মেয়াওয়াদ প্রথম মিসরীয় জুটি হিসেবে অলিম্পিকে অংশ নিয়ে ইতিহাস গড়েছে ঠিকই কিন্তু এলঘোবাশির পোশাক তাকে স্পটলাইটে নিয়ে এসেছে। দশ বছর যাবত সে হিজাব পরেই খেলছে। তবে রিওতে অলিম্পিক গেমসে অংশগ্রহণের জন্য তাকে তার পোশাকের জন্য বিশেষ অনুমতি নিতে হয়েছিল।

২৩ বছর বয়সী এলঘোবাশি বলেন, ‘পুরো বিষয়টি আমার কাছে নতুন ছিলো, প্রথম হিজাবি খেলোয়াড় হিসেবে বীচ ভলিবল খেলা এবং প্রথম মিসরীয় ও আরব নারী হিসেবে অলিম্পিক গেমসে অংশ নেওয়া। এরপর থেকে কোনো সমস্যা ছাড়াই আমি হিজাব পরে যেকোনো আন্তর্জাতিক আসরে খেলতে পারছি।’

মিসরের দোয়া এলঘোবাশি, ছবি: সংগৃহীত

বর্তমানে আন্তর্জাতিক ভলিবল ফেডারেশন (এফআইভিবি) শরীরের কতখানি ঢাকা হবে তার ভিত্তিতে তিন ধরনের পোশাকের অনুমতি দিয়েছে।

সে বছর অলিম্পিকে মিসরীয় দু’জন পদকজয়ী নারী খেলোয়াড় হেদায়া মালাক এবং সারা আহমেদ হিজাব পরেই তায়কোন্দো এবং ভার উত্তোলনে অংশ নেন।

ব্রোঞ্জজয়ী মালাক দ্য ইন্টারন্যাশনালকে বলেন, ‘অলিম্পিক শেষে অনেকে আমাকে মেসেজ পাঠিয়ে বলেছে, আমি তাদের আদর্শ। কারণ আমি হিজাব পরছি এবং নিজের খেলাও চালিয়ে যাচ্ছি। তায়কোন্দোর কারণে আমি হিজাব ছাড়িনি। অনেকে আমাকে দেখে উৎসাহিত হয়েছে।’

হিজাবি খেলোয়াড়দের আন্তর্জাতিকভাবে এমন অভূতপূর্বভাবে দেখার মূল কারণ হলো অনেক খেলাই তাদের বহু বছর ধরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করেছে।

২০১৪ সালে ফিফা নারী খেলোয়াড়দের হিজাবের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে। ২০১৭ সালে বাস্কেটবলের আন্তর্জাতিক পরিচালনা কমিটি ফিবাও তাদের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে। তবে এর জন্য আমেরিকান মুসলিম বাস্কেটবল খেলোয়াড় বিলকিস আব্দুল কাদিরের ধন্যবাদ পাওনা আছে। তাকে খেলা অথবা ধর্মীয় বিশ্বাস এর মধ্যে একটি বেছে নিতে বাধ্য করা হয়। বিলকিস হিজাবের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার জন্য কয়েক বছর ধরে চেষ্টা চালিয়েছেন।

এলঘোবাশি তার বাস্কেটবল খেলোয়াড় বন্ধুদের কথা মনে করেন। তাদের মধ্যে কতজন শুধু হিজাব পরার কারণে জাতীয় দলে জায়গা পায়নি।

এলঘোবাশি বলেন, ‘যদি আপনি সত্যিই প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক খেলা চান তাহলে আপনার সবাইকে সুযোগ দিতে হবে। শুধু হিজাব পরার জন্য কেন কারও স্বপ্নকে মেরে ফেলবেন? আমরা একেকজন একেক রকমের সংস্কৃতি থেকে এসেছি। আমাদের সবার গৃহীত হওয়ার অধিকার রয়েছে।’

আন্তর্জাতিক আসরে প্রথম হিজাবি স্কেটার আমিরাতের জাহারা লারি। ২০১২ সালে রক্ষণশীল পোশাকের জন্য পয়েন্ট কাটা যাওয়ায় তিনি আন্তর্জাতিক স্কেটিং ইউনিয়নের (আইসিইউ) সাথে যোগাযোগ করেন। আইসিইউ স্পষ্টভাবে হিজাব সমর্থন না করায় এখনও তাকে বিশেষ বিবেচনায় হিজাব পরে খেলতে হয়।

আমিরাতের জাহারা লারি, ছবি: সংগৃহীত

মিসরীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকান গলফ খেলোয়াড় নুর আহমেদ হিজাবি খেলোয়াড় হিসেবে তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন, ‘আমি যখনই গলফ মাঠে পা দেই আমার মনে হয় একজন মুসলিম নারী যে খেলতে পারে এবং হিজাব পরে এবং যথেষ্ট ভালোভাবে সেটি আমাকে আবার প্রমাণ করতে হবে।’

‘যতবার আপনি হিজাব পরে খেলতে নামবেন ততবার প্রথাগত ধারণা ভাঙতে পারবেন।’

টেনিসে হিজাবের ব্যাপারে স্পষ্ট করে কিছু বলা না থাকলেও আগের নিয়ম অনুযায়ী লেগিংসের ব্যাপারে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল। কেউ লেগিংস পরতে চাইলে তাকে সেটা স্কার্ট বা জামার নিচে পরতে হবে এবং এর ঝুল হাঁটুর সামান্য নীচ পর্যন্ত হতে পারবে। কিন্তু ধর্মীয় নিয়ম অনুযায়ী একজন হিজাবি নারীর পুরো পা ঢাকতে হবে।

গতবছর এই নিয়মে পরিবর্তন আনা হয়। এখন কেউ চাইলে উপরে স্কার্ট বা অন্যকোনো পোশাক ছাড়াই পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত ঢাকে এমন লেগিংস পরতে পারবে। এর আগে টেনিস কর্তৃপক্ষদের এই বিষয়টি কখনোই ভাবায়নি যে তাদের এমন নিয়মের কারণে নারীদের পুরো একটি অংশ বাদ পড়ে যাচ্ছে যারা সারা শরীর ঢেকে টেনিসে নিজেদের ক্যারিয়ার গড়তে চায়।

অনুমোদন থাকা সত্ত্বেও ম্যাচ শুরুর আগে লেগিংস খুলে ফেলতে বলায় ওমানের টেনিস খেলোয়াড় ফাতেমা আল নাভানি ইন্টারন্যাশনাল টেনিস ফেডারেশনের কাছে একাধিকবার অভিযোগ জানান। তিউনিশিয়ায় একবার একজন ফ্রেঞ্চ আম্পায়ার তাকে জিজ্ঞেস করেন, তিনি কি ঠান্ডার কারণে লেগিংস পরেছেন নাকি ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে। যদি ধর্মীয় কারণে হয় তাহলে তাকে এটি খুলে ফেলতে হবে।

আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে নিজেদের জায়গা করে নিতে মুসলিম নারীদের দীর্ঘ পথ পারি দিতে হয়েছে। এলঘোবাশি, আব্দুল কাদির, জাহারা লারি ছাড়াও আরো অনেক খেলোয়াড় আছেন যারা বাধা পেরোতে, দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে এবং অন্যদের পথ মসৃণ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

আন্তর্জাতিক পরিচালনা পর্ষদের অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যে তারা সবার জন্য অংশগ্রহণমূলক এবং স্বাগত পরিবেশ তৈরিতে তাদের ভূমিকাটা পালন করছে। তাদের এই অপেক্ষায় বসে থাকা উচিত নয় যে, কবে একজন মুসলিম খেলোয়াড় ওপরে উঠবে এবং নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস বজায় রেখে স্বপ্নপূরণের জন্য চলমান নিয়মের ব্যতিক্রম দাবি করবে।

কে জানে, হয়তো এমন দিন আসবে যখন একজন হিজাবি খেলোয়াড় তার ধর্মীয় বিশ্বাস বা সে তার মাথা খোলা রেখেছে না ঢাকা সেটি দেখার আগে তার অর্জনের জন্য স্বীকৃত হবে।