‘একসঙ্গে এত মানুষের জানাজা পড়তে হবে, কল্পনাও করেনি কেউ’

উবায়দুল হক, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ময়মনসিংহ
নেত্রকোনায় নৌকাডুবিতে নিহতদের নামাজে জানাজা

নেত্রকোনায় নৌকাডুবিতে নিহতদের নামাজে জানাজা

  • Font increase
  • Font Decrease

নেত্রকোনার মদন উপজেলার উচিতপুর হাওরে ভ্রমণে গিয়ে নৌকাডুবিতে নিহত মাদরাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ ১৭ জনের নামাজে জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) সকালে ময়মনসিংহ সদরের সিরতা ইউনিয়নের কোনাপাড়ায় ১২ জনকে, চরগোবিন্দপুরে একজন, চরখরিচায় দুইজন এবং গৌরীপুর উপজেলার ধোপাজাঙ্গালিয়া গ্রামে আরও দুইজনকে সমাহিত করা হয়।

এসময় নিহতদের স্বজনসহ উপস্থিত হাজারো মানুষের বুকফাটা আর্তনাদ আর চোখের পানিতে ভারী হয়ে উঠে জানাজাস্থল। শোকার্ত মানুষের ভিড়ে সেখানে সৃষ্টি হয় জনারণ্যের। একসঙ্গে এতো মৃত্যুর ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তারা। বাসিন্দারা বলছেন, একসঙ্গে এত মানুষের জানাজা পড়তে হবে, কেউ কল্পনাও করেনি।

উপস্থিত হাজারো মানুষের বুকফাটা আর্তনাদ

কোনাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মোকছেদ মিয়া বলেন, কী আর বলব। সবাই একসঙ্গে হাওরে গিয়েছিল আনন্দ করতে। কোথা থেকে কী হয়ে গেল বুঝতে পারছি না। এখন সবাই শুধু কাঁদছে। প্রিয় মানুষগুলো এভাবে আমাদের ছেড়ে চলে যাবে কখনো ভাবিনি। একসঙ্গে এতো মরদেহ এর আগে দেখেনি এ গ্রামবাসী।

আব্দুল বাছির নামের আরেকজন বলেন, ‘মাদরাসায়ে মারকাজুস সুন্নাহ’র মুহতামিম মাওলানা মাহফুজুর রহমানের মৃত্যুতে আলেম সমাজের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল। তার হাত ধরেই এলাকায় অনেক হাফেজ ও আলেম হয়ে দ্বীনের আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন।

এদিকে আকস্মিক এ ঘটনায় শোকে মুহ্যমান নিহতদের স্বজনরা। খবর শোনার পর বুধবার বিকেল থেকেই খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে সবাই শুধু কান্না করছে। তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার মতো ভাষা কারও নেই।

নৌকাডুবিতে নিহত মাদরাসার শিক্ষক মাওলানা আজহারুল ইসলামের স্ত্রী মমেনা খাতুন কাঁদতে কাঁদতে বলেন, স্বামীর শিক্ষকতার আয়ে তাদের সংসার কোনো মতে চলছিল। তাকে ছাড়া আমি সংসার চালাবো কিভাবে? ৪ মাসের কোলের মেয়েকে আমি কিভাবে মানুষ করব।’

প্রসঙ্গত, বুধবার (৫ আগস্ট) ময়মনসিংহ সদরের সিরতা ইউনিয়নের ‘মাদরাসায়ে মারকাজুস সুন্নাহ’র মুহতামিম মাওলানা মাহফুজুর রহমানের নেতৃত্বে নেত্রকোনার মদন উপজেলার ‘মিনি কক্সবাজার’ খ্যাত উচিতপুর হাওরে ঘুরতে যায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকসহ ৪৮ জনের একটি দল। দুপুরে উচিতপুর পৌঁছে হাওরে ভ্রমণের জন্য নৌঘাট ছেড়ে যাওয়ার কিছু পরেই হাওরে ডুবে যায় তাদের ইঞ্জিনচালিত নৌকাটি। খবর পেয়ে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে ফায়ার সার্ভিস। একে একে উদ্ধার হয় ১৭টি মরদেহ। তাদের মধ্যে হাফেজ মাওলানা মাহফুজুর রহমান, তার দুই ছেলে, দুই ভাতিজা-ভাতিজি ও ভাগ্নেসহ একই পরিবারের আটজনের প্রাণ গেছে।

স্বজনদের কান্না থামছে না

নিহতরা হলেন- ‘মাদরাসায়ে মারকাজুস সুন্নাহ’র মুহতামিম হাফেজ মাওলানা মাহফুজুর রহমান (৪৫), তার দুই ছেলে হাফেজ মাহবুবুর রহমান আসিফ (১৫) ও মাহমুদুর রহমান (১২), ভাগ্নে রেজাউল করিম (১৫), ভাতিজা জোবায়ের (২০) ও জোনায়েদ (১৭), ভাতিজি লুবনা (১৩) ও জুলফা (৭), চরখরিচা গ্রামের কৃষক ইসা মিয়া (৪০) ও তার ছেলে শামীম (১০), কোনাপাড়া গ্রামের মাদরাসা শিক্ষক আজাহারুল ইসলাম (৩৮), হামিদুল (৩৫), সাইফুল ইসলাম রতন (৩০) ও জহিরুল ইসলাম (৩৫), চরগোবিন্দপুরের তালেব মেম্বারের ছেলে শহিদুল (৪০) এবং গৌরীপুর উপজেলার ধোপাজাঙ্গালিয়া গ্রামের আবুল কালামের ছেলে শফিকুর রহমান (৪০) ও তার ছেলে সামাআন (১০)।

এদিকে, নৌকাডুবির ঘটনায় নিখোঁজ থাকা রাকিবুল ইসলামের (২২) মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে ওই হাওরের রাজালীকান্দা এলাকায় রাকিবুলের মরদেহ ভাসতে দেখে স্থানীয়রা। পরে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে মদন থানা পুলিশ। রাকিবুল ময়মনসিংহ সদরের সিরতা ইউনিয়নের কোনাপাড়া গ্রামের শফিকুল ইসলামের ছেলে এবং নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলার তেলীগাতী মঈনুল ইসলাম মাদরাসার শিক্ষক। এ নিয়ে এ ঘটনায় মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮ জন।

আপনার মতামত লিখুন :