বঙ্গবন্ধুর বেড়ে ওঠা (পর্ব ৫)

সৈয়দ নূরুল আলম
গ্রাফিক: বার্তা২৪.কম

গ্রাফিক: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বঙ্গবন্ধুর বেড়ে ওঠা (পর্ব ১)
বঙ্গবন্ধুর বেড়ে ওঠা (পর্ব ২)
বঙ্গবন্ধুর বেড়ে ওঠা (পর্ব ৩)
বঙ্গবন্ধুর বেড়ে ওঠা (পর্ব ৪)


দিল্লি থেকে ট্রেনে কোলকাতা গিয়ে পার্ক সার্কাসে বঙ্গবন্ধু তাঁর বন্ধু খন্দকার নুরুল আলমের বাসায় একরাত অবস্থান করেন। পরদিন এগারোটার ট্রেনে তিনি খুলনা রওয়ানা হন। সন্ধ্যার সময় বেনাপোল পৌঁছে ট্রেন পুরোপুরি থামার আগেই বঙ্গবন্ধু নেমে পড়েন। পাশের সিটের এক যাত্রীকে তিনি তাঁর মালামালগুলো কাস্টমসকে দেখাতে অনুরোধ করেন। গোয়েন্দা বিভাগের লোকেরা এবং পুলিশ ট্রেন তন্নতন্ন করে তল্লাশি করে। বঙ্গবন্ধু প্ল্যাটফরমের পাশে গাছের আড়ালে থেকে সবকিছু লক্ষ করেন। তল্লাশি শেষে ট্রেন ছেড়ে দিলে মুজিব দৌড়ে চলন্ত ট্রেনে উঠে পড়েন। আপাতত গ্রেফতার এড়ানোর উদ্দেশ্যে তিনি এভাবে পুলিশকে ফাঁকি দেন। রাত সাড়ে দশটার দিকে ট্রেন খুলনা পৌঁছলে বঙ্গবন্ধু সকল যাত্রী নেমে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেন এবং তারপর পাঞ্জাবি খুলে ফেলে বিছানা ঘাড়ে, স্যুটকেস হাতে কুলির বেশে ট্রেন থেকে নেমে পড়েন এবং গোপনে তাঁর এক আত্মীয়ের বাসায় ওঠেন।

পরদিন কোট-প্যান্ট-হ্যাট পরে কিছুটা ছদ্মবেশ ধারণ করে বঙ্গবন্ধু গোপালগঞ্জগামী জাহাজে ওঠেন এবং সন্ধ্যার সময় পাটগাতি ঘাটে নেমে ১৯৪৯-এর ডিসেম্বরের ৩য় সপ্তাহে বাড়িতে উপস্থিত হন। বাড়িতে কয়েকদিন খুব সতর্কতার সাথে থাকার পর বঙ্গবন্ধু মাদারীপুরের শিবচরে বড়বোনের বাড়িতে যান। সেখানে সাতদিন স্ত্রী-সন্তানসহ অবস্থান করেন। স্ত্রী-সন্তান আর বড়বোনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে প্রথমে নৌকা এবং তারপর জাহাজ ধরে মুন্সিগঞ্জ পৌঁছেন বঙ্গবন্ধু। সন্ধ্যার আগে নৌকায় নারায়ণগঞ্জ পৌঁছে রিকশা করে খান সাহেব ওসমান আলীর বাড়িতে পৌঁছান। সেখানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার পর ওসমান আলী খান সাহেবের বড় ছেলে শামসুজ্জোহা বঙ্গবন্ধুকে ঢাকায় যাবার ট্যাক্সিতে তুলে দেন। পথে ট্যাক্সি ছেড়ে দিয়ে রিকশা নিয়ে তিনি ১৫০ মোগলটুলির আওয়ামী মুসলিম লীগের অফিসে এসে উপস্থিত হলেন।

১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারি দুপুর বেলায় পুলিশ বঙ্গবন্ধুকে খাজে দেওয়ানে অবস্থিত আলী আমজাদ খান সাহেবের পুরানা বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে। রাতে লালবাগ থানায় বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরদিন তাঁকে সাধারণ কয়েদি হিসেবে জেলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। একরাত সাধারণ কয়েদি হিসেবে থাকার পর বঙ্গবন্ধুকে ডিভিশন দেওয়া হয় এবং মাওলানা ভাসানী ও শামসুল হকের সাথে একই কক্ষে রাখা হয়। মাওলানা সাহেবের কাছ থেকে বঙ্গবন্ধু জানতে পারেন, তাঁদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট মামলা দায়ের করা হয়েছে। এতদিন বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার না হওয়ায় বিচার শুরু হয়নি। ১৯৪৯ সালের ১১ অক্টোবরে পুলিশের সাথে নাজিরাবাজারে যে গোলমাল হয়, তারই ভিত্তিতে মামলা হয়েছে। পনের দিন পর পর মামলার তারিখ পড়লে ভাসানী-বঙ্গবন্ধু-শামসুল হককে কোর্টে নেওয়া হতো। কোর্টে তাঁদেরকে চেয়ার দেওয়া হতো। তাঁদের পক্ষে মামলা পরিচালনা করতেন আতাউর রহমান খান। জেলখানার কক্ষে মাওলানা ভাসানীর সাথে বঙ্গবন্ধু ও শামসুল হক নিয়মিত নামাজ পড়তেন। ভাসানী সাহেব মাগরিবের নামাজের পর কোরআন মজিদের অর্থ করে শামসুল হক এবং বঙ্গবন্ধকে বোঝাতেন। জেলখানায় অবস্থানকালে এটা নিয়মে পরিণত হয়েছিল।

জেলখানায় বঙ্গবন্ধু ফুলের বাগান করেছিলেন। জমাদার সিপাহীদের দিয়ে তিনি ফুল গাছের চারা আনাতেন। তাঁর বাগানটি বেশ সুন্দর হয়েছিল।

জেলসুপার আমীর হোসেন সপ্তাহে একদিন ভাসানী ও বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করতেন। বঙ্গবন্ধু অন্য রাজনৈতিক বন্দীদের কষ্ট ও অসুবিধা লাঘব করার জন্য জেলসুপারকে অনুরোধ করতেন। জেলখানায় শামসুল হক সাহেবের স্বাস্থ্য বেশ খারাপ হয়ে যায়, তার ওজন এক পর্যায়ে ২২ পাউন্ড কমে গিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর পরামর্শে তিনি স্বাস্থ্যগত কারণে মুক্তি চেয়ে আবেদন করেন। সিভিল সার্জন সুপারিশ করায় শামসুল হক সাহেবকে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়। তখন মাওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু জেলে রয়ে যান। বঙ্গবন্ধুর মেজোবোন তাঁকে মাঝে মাঝে জেলখানায় দেখতে আসতেন, একবার বাবা শেখ লুৎফর রহমানও দেখা করেন বঙ্গবন্ধুর সাথে।

১৯৫০ সালের শেষদিকে বঙ্গবন্ধুর মামলার রায় হলো। মাওলানা ভাসানী ও শামসুল হককে মুক্তি দেওয়া হলেও বঙ্গবন্ধুকে তিন মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হলো। মাওলানা সাহেব অবশ্য মুক্তি পেলেন না, কারণ তিনি নিরাপত্তাবন্দী ছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে ঢাকা জেলে কয়েদি হিসেবে সুতা কাটতে হতো। এটা তিনি আনন্দের সাথেই করতেন। গোপালগঞ্জে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা থাকায় কিছুদিন পর বঙ্গবন্ধুকে গোপালগঞ্জ পাঠানো হয়। তাঁকে যেদিন গোপালগঞ্জ পাঠানো হয়, সেই দিনই তাঁর স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাবা-মা ঢাকায় রওয়ানা দেন তাঁর সাথে দেখা করার জন্য। এক জাহাজে বঙ্গবন্ধু গোপালগঞ্জ গিয়েছেন, আরেক জাহাজে তাঁরা ঢাকা গিয়েছেন। নদীবক্ষে দুই জাহাজ পরস্পরকে অতিক্রম করেছে, কিন্তু পরিবার-পরিজনের সাথে আপাতত দেখা হলো না। পরদিন গোপালগঞ্জ পৌঁছলে বঙ্গবন্ধুকে থানায় রাখা হয়। অনেক আত্মীয়-স্বজনেরা থানায় গিয়ে তাঁর সাথে দেখা করেন। বঙ্গবন্ধুকে কোর্টে হাজির করা হলে একমাস পর মামলার তারিখ পড়ে এবং তাঁকে ফরিদপুর জেলা কারাগারে রাখবার হুকুম হয়।

গোপালগঞ্জ থেকে ফরিদপুরের যোগাযোগ ব্যবস্থা তখন খুবই খারাপ ছিল। বর্তমান সময়ে গোপালগঞ্জ থেকে ফরিদপুর যেতে সময় লাগে দেড়ঘণ্টা, তখন লাগত দেড়দিন। গোপালগঞ্জ থেকে জাহাজে মাদারীপুরের সিন্ধিয়া ঘাট, সেখান থেকে নৌকায় ভাঙ্গা এবং ভাঙ্গা থেকে ট্যাক্সি করে ফরিদপুর যেতে হতো। ফরিদপুর জেলা কারাগারে ডিভিশনপ্রাপ্ত বন্দীদের থাকার মতো কোনো উপযুক্ত কক্ষ না থাকায় বঙ্গবন্ধুকে জেল হাসপাতালের একটি কক্ষে রাখা হয়। এখানেও তিনি ফুল বাগানের পরিচর্যার ভার নেন।

একমাস পর বঙ্গবন্ধুকে আবারও মামলায় হাজিরার জন্য গোপালগঞ্জ নিয়ে যাওয়া হয়। থানার ঘাটে নৌকা থেকে নামতেই দীর্ঘ একবছর পর বাড়ির সবার সাথে বঙ্গবন্ধুর দেখা হয়। এ সাক্ষাৎকার সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বলেছেন—“এক বছর পরে আজ ওদের সাথে আমার দেখা। হাসিনা আমার গলা ধরল আর ছাড়তে চায় না। কামাল আমার দিকে চেয়ে আছে, আমাকে চেনেও না আর বুঝতে পারে না, আমি কে ? মা কাঁদতে লাগল। আব্বা মাকে ধমক দিলেন এবং কাঁদতে নিষেধ করলেন। আমি থানায় আসলাম আর বাড়ির সকলে আমাদের গোপালগঞ্জের বাসায় উঠল। প্রস্তুত হয়ে কোর্টে রওনা করলাম, এবার রাস্তায় অনেক ভিড়। বহু গ্রাম থেকেও অনেক সহকর্মী ও সমর্থক আমাকে দেখতে এসেছে। কোর্টে হাজির হলাম, হাকিম সাহেব বেশি দেরি না করে সাক্ষ্য নিতে শুরু করলেন। পরের দিন আবার তারিখ রাখলেন। আমি আমাদের কর্মী ও অন্যান্য বন্ধুদের থানায় যেতে নিষেধ করলাম, কারণ এদের বিপদে ফেলে আমার লাভ কী? কোর্টেই তো দেখা হয়েছে সকলের সাথে। থানায় ফিরে এলাম। আব্বা, মা, রেণু খবর পেয়ে সেখানেই আসলেন। আব্বা, মা ও ছেলেমেয়েরা কয়েকঘণ্টা রইল। কামাল কিছুতেই আমার কাছে আসলো না। দূর থেকে চেয়ে থাকে, ও বোধ হয় ভাবে, লোকটা কে ?”

ফরিদপুর থেকে গোপালগঞ্জ যাতায়াত কষ্টকর বিবেচনা করে বঙ্গবন্ধুকে খুলনা কারাগারে বদলি করা হয়। কিন্তু খুলনা জেলে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তাঁর থাকা-খাওয়ার ভীষণ অসুবিধা হতে থাকে। এ সময় তাঁর শারীরিক অবস্থা বেশ খারাপ হয়ে যায়। খুলনা জেলে তিনমাস কাটানোর পর ডিটেনশন অর্ডারের মেয়াদ অতিক্রান্ত হওয়ায় বঙ্গবন্ধু কারা-কর্তৃপক্ষের কাছে মুক্তি দাবি করেন। তবে ইতোমধ্যে তাঁকে গোপালগঞ্জ কোর্টে একটি মামলায় হাজির করানোর জন্য প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট এসে গিয়েছিল। তাই খুলনা জেল কর্তৃপক্ষ বঙ্গবন্ধুকে গোপালগঞ্জ কোর্টে পাঠিয়ে দিল। [চলবে]