বঙ্গবন্ধুর বেড়ে ওঠা (পর্ব ৬)

সৈয়দ নূরুল আলম
গ্রাফিক: বার্তা২৪.কম

গ্রাফিক: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

বঙ্গবন্ধুর বেড়ে ওঠা (পর্ব ১)
বঙ্গবন্ধুর বেড়ে ওঠা (পর্ব ২)
বঙ্গবন্ধুর বেড়ে ওঠা (পর্ব ৩)
বঙ্গবন্ধুর বেড়ে ওঠা (পর্ব ৪)
বঙ্গবন্ধুর বেড়ে ওঠা (পর্ব ৫)


৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ বঙ্গবন্ধুর সাথে হাসপাতালের কেবিনে দেখা করেন শামসুল হক চৌধুরী, আবদুস সামাদ আজাদ ও ডা. গোলাম মাওলা। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ২১ ফেব্রুয়ারি হরতাল ডেকে অ্যাসেম্বলি ঘেরাও করার জন্য তাদের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদকে পরামর্শ প্রদান করেন। তিনি আরো জানান রাষ্ট্রভাষার দাবিতে এবং বিনাবিচারে আটকাবস্থা থেকে মুক্তির দাবিতে তিনি এবং মহিউদ্দিন আহমদ ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে জেলখানায় অনশন করবেন। ৪ ফেব্রুয়ারি পূর্বনির্ধারিত ছাত্রধর্মঘট পালিত হয়। ইতোমধ্যে গোয়েন্দা সংস্থা তাদের লিখিত রিপোর্টে সরকারকে জানায়, বঙ্গবন্ধুকে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আনা হলেও তিনি হাসপাতালে চিকিৎসার নামে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত আছেন। এরপরই বঙ্গবন্ধুকে ঢাকা জেলখানায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

আবার ১৫ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু এবং মহিউদ্দিন আহমদকে ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ফরিদপুর জেলে পাঠানো হয়। নারায়ণগঞ্জে তাঁদের সাথে দেখা হয়েছিল শামসুজ্জোহা, বজলুর রহমান, আলমাস আলীসহ কয়েকজন ছাত্রনেতার। বঙ্গবন্ধু তাদেরকে অনুরোধ করে গেলেন যেন একুশে ফেব্রুয়ারিতে হরতাল মিছিল শেষে আইনসভা ঘেরাও করে বাংলাভাষার সমর্থনে সদস্যদের স্বাক্ষর আদায় করা হয়। পরদিন থেকে তাঁরা দু-জন অনশন ধর্মঘট করবেন—সে কথাও নারায়ণগঞ্জের নেতা-কর্মীদের জানিয়ে রাখলেন। পরের দিন তাঁরা ফরিদপুর কারাগারে গিয়ে পৌঁছলেন। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা’ ও ‘বন্দী মুক্তি’র দাবিতে ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে বঙ্গবন্ধু এবং মহিউদ্দিন আহমদ ফরিদপুর কারাগারের অভ্যন্তরে আমরণ অনশন শুরু করেন। চারিদিকে বিষয়টি জানাজানি হতে থাকে এবং বাইরে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। বঙ্গবন্ধুর অনশনের বিষয়টি ২০ ফেব্রুয়ারি তদানীন্তন বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য আনোয়ারা খাতুন মূলতবী প্রস্তাব হিসেবে উত্থাপন করেন।

একুশে ফেব্রুয়ারি সকাল থেকেই পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয় কলাভবন প্রবেশদ্বারের উল্টোদিকে সশস্ত্র অবস্থান নেয়। বেলা দশটা থেকে ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে জমায়েত হতে শুরু করে। সহস্র কণ্ঠে গর্জে ওঠে “১৪৪ ধারা মানব না।” সর্বদলীয় কর্মপরিষদের শামসুল হক ছাত্রদের বোঝানোর চেষ্টা করলেন। তিনি তাদের বললেন, ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা ঠিক হবে না। ছাত্রনেতা আবদুস সামাদ পরামর্শ দেন, দশজন দশজন করে বের হলে আইন অমান্য হবে না। এ প্রস্তাব সকলে মেনে নেয়। দশজন দশজন করে ছাত্র নিয়ে একেকটি দল তৈরি হলো। তারা সমস্বরে চিৎকার করে উঠল, “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই”, “১৪৪ ধারা মানি না”, “নাজিম-নুরুল নিপাত যাক”, “চলো চলো অ্যাসেম্বলি চলো”।

ছাত্রদের প্রথম ‘দশজনী মিছিল’ স্লোগান দিয়ে বের হতেই পুলিশ এসে তাদের গ্রেফতার করে ট্রাকে উঠিয়ে নেয়। গ্রেফতারের পরও ছাত্রদের দমন করতে না পেরে তাদের ছত্রভঙ্গ করার জন্য পুলিশ কাঁদুনে গ্যাস নিক্ষেপ করে। কাঁদুনে গ্যাসে আহত হয়ে অনেক ছাত্র রাস্তার পাশে এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে পড়ে থাকে। ছাত্ররা তখন উত্তেজনা আর যন্ত্রণায় অধিকতর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ছাত্ররা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল, মেডিকেল কলেজ গেট এবং ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ গেটে সমবেত হতে থাকে। সেখান থেকে দলবদ্ধভাবে স্লোগান দিয়ে বের হতেই পুলিশ এসে তাড়া করে। বেলা তিনটার দিকে এক-এক করে মন্ত্রী ও এমএলএ মেডিকেল কলেজের সামনে দিয়ে পরিষদ ভবনে যেতে থাকেন। পুলিশ এসময় বেপরোয়াভাবে ছাত্রদের ওপর আক্রমণ চালায়। ছাত্ররাও ইট-পাটকেল ছুড়তে থাকে। এক পর্যায়ে পুলিশ ছাত্রদের লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করে। ঘটনাস্থলেই রফিকউদ্দিন ও আবদুল জব্বার শহীদ হন এবং আরো ১৭ জন ছাত্র গুরুতরভাবে জখম হন। আহতদের মধ্যে আবুল বরকত অপারেশন টেবিলে মারা যান।

গুলি চালানোর সাথে সাথেই পরিস্থিতি অচিন্ত্যনীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়। ১৪৪ ধারার নাম-নিশানাও তখন আর পরিলক্ষিত হয় না। গুলিবর্ষণের সংবাদ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে শহরের প্রান্তে প্রান্তে। তখনই অফিস আদালত, সেক্রেটারিয়েট ও বেতারকেন্দ্রের কর্মচারীরা অফিস বর্জন করে বেরিয়ে আসে। শহরের সমস্ত লোক তখন বিক্ষুব্ধ হয়ে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতাল প্রাঙ্গণে এসে হাজির হতে থাকে। বাইরের এমন পরিস্থিতির প্রভাব আইন পরিষদ কক্ষেও এসে লাগে। পরিষদের বিরোধীদলীয় সদস্যরা মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমীনের কাছে গুলিবর্ষণের ব্যাপারে কৈফিয়ত দাবি করেন এবং পরিষদ মুলতবী রাখার দাবি জানান। গুলিবর্ষণ করে ছাত্রহত্যার প্রতিবাদে মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশসহ কিছু সদস্য পরিষদসভা বর্জন করেন।

২৪ ফেব্রুয়ারি সকালের মধ্যে ভাষাশহীদদের স্মরণে শহীদ মিনার নির্মাণ করে ফেলে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতা।

১০ ফুট উঁচু আর ৬ ফুট চওড়া ছোটখাট এ শহীদ মিনার একুশের ভাষাআন্দোলনে নতুন শক্তির সঞ্চার ঘটায়। দলে দলে লোকজন ছুটে আসেন সদ্যনির্মিত শহীদ মিনার দেখতে। তাদের ফুলের ভারে, চোখের জলে, শোকের ছায়ায় এবং শ্রদ্ধার অর্ঘ্যে শহীদ মিনার হঠাৎ করে এক অভাবনীয় মর্যাদা পেয়ে যায়। রাজপথে মিছিল আর শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে জনতার ঢল সরকারের জন্য এক বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। আইন পরিষদ সদস্যপদে সদ্য ইস্তফাদানকারী আবুল কালাম শামসুদ্দিনকে দিয়ে ২৬ ফেব্রুয়ারি সকালে শহীদ মিনার উদ্বোধন করা হয়। কিন্তু ওই ২৬ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় পুলিশ বলপূর্বক শহীদ মিনার ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়।

মাত্র আড়াই দিন স্থায়ী প্রথম শহীদ মিনারের স্মৃতি দেশবাসীর মন থেকে তৎকালীন সরকার মুছে ফেলতে পারেনি। বায়ান্ন সালে প্রথম শহীদ মিনার ভেঙে ফেলার প্রতিক্রিয়ায় দেশব্যাপী স্কুল-কলেজ ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছোট বড় শহীদ মিনার গড়ে ওঠে। শহীদ মিনারকে কেন্দ্র করে শুধু ভাষাচেতনা বা গণতান্ত্রিক সংগ্রামের প্রকাশই ঘটেনি, শহীদ মিনার কালক্রমে হয়ে ওঠে অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তা এবং জাতিসত্তার প্রতীক।

১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ফরিদপুর জেলে বঙ্গবন্ধু অনশনরত ছিলেন। ২১ ফেব্রুয়ারি সারাদিন অভুক্ত অবস্থায় উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার মধ্যে তাঁর সময় কাটে। রাতের শিফটের সিপাহীরা ডিউটিতে এসে তাঁকে জানায় যে ঢাকায় খুব গোলমাল হয়েছে এবং কয়েকজন গুলিতে মারা গেছে। এ খবর শুনে বঙ্গবন্ধু ভীষণভাবে চিন্তিত হয়ে পড়েন। রাতে তিনি আর কোনো খবর পাননি। পরদিন সকালে ফরিদপুর জেলখানার পাশের রাস্তায় বিরাট শোভাযাত্রার স্লোগান শুনে তিনি ২১ ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় ঘটে যাওয়া ঘটনা সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা পেয়ে যান। ২২ ফেব্রুয়ারিও ফরিদপুর সারাদিন মিছিলে সরগরম ছিল। সেদিন বঙ্গবন্ধু খবরের কাগজ পড়েও ঢাকার ঘটনা কিছুটা জানতে পারেন।

২৫ ফেব্রুয়ারি অনশনরত বঙ্গবন্ধুকে পরীক্ষা করে ফরিদপুরের সিভিল সার্জনের মুখ গম্ভীর হয়ে যায়। তিনি বঙ্গবন্ধুকে খাবার খেতে অনুরোধ করেন এবং বলেন, “এভাবে মৃত্যুবরণ করে কি কোনো লাভ হবে? বাংলাদেশ যে আপনার কাছে অনেক কিছু আশা করে।” বঙ্গবন্ধুর সে সময় কথা বলতে কষ্ট হচ্ছিল, আস্তে আস্তে বঙ্গবন্ধু বলেন, “অনেক লোক আছে, কাজ পড়ে থাকবে না। দেশকে এবং দেশের মানুষকে ভালোবাসি, তাদের জন্য জীবন দিতে পারলাম, এই শান্তি।” সিভিল সার্জন প্রতিদিন পাঁচ-ছবার করে আসতে লাগলেন। ২৭ তারিখে দিনের বেলা বঙ্গবন্ধুর অবস্থা বেশ খারাপ হয়ে যায়।

২৭ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যার পর বঙ্গবন্ধুর মুক্তির আদেশ আসে। ডেপুটি জেলার বঙ্গবন্ধুকে তাঁর মুক্তির আদেশ পড়ে শোনালে তিনি মহিউদ্দিনের হাতে দু-চামচ ডাবের পানি পান করে অনশন ভঙ্গ করেন। সে সময় বঙ্গবন্ধু খুব দুর্বল ছিলেন। জেলের বাইরে যাবার মতো শারীরিক ক্ষমতা তাঁর ছিল না, সিভিল সার্জনও তাঁর অবস্থা বিবেচনা করে রাতে তাঁকে ছাড়লেন না। পরদিন জেলগেটে বঙ্গবন্ধুর বাবাসহ অনেক লোক এসে উপস্থিত হয়। বঙ্গবন্ধুকে স্ট্রেচারে করে জেলগেটের বাইরে রেখে দেয় জেল কর্তৃপক্ষ। সেখান থেকে বঙ্গবন্ধুকে কয়েকজনে বয়ে নিয়ে যায় আলাউদ্দিন খানের বাড়িতে, সেখান থেকে বিকালে বঙ্গবন্ধুর বোনের বাড়িতে। পরদিন ট্যাক্সিযোগে ভাঙ্গা এবং সেখান থেকে নৌকায় মাদারিপুরের দত্তপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর বড় বোনের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে। দত্তপাড়ায় একরাত থেকে বঙ্গবন্ধুকে গোপালগঞ্জ নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সমস্ত নদীপার ভর্তি বিরাট জনতা তাঁকে স্বাগত জানায়। বঙ্গবন্ধুকে কোলে নিয়ে জনতা মিছিল করে এবং আবার নৌকায় পৌঁছে দেয়। এভাবে জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পাঁচদিন পর অসুস্থ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তাঁর বাবা টুঙ্গিপাড়ায় বাড়ি পৌঁছেন। [চলবে]