দ্য রিভার গার্ল



মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
দ্য রিভার গার্ল ভিভিয়েন হাইগ উড (১৮৮৮-১৯৪৭)। ছবি: সংগ্রহীত

দ্য রিভার গার্ল ভিভিয়েন হাইগ উড (১৮৮৮-১৯৪৭)। ছবি: সংগ্রহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

১.

নারীকে নদীর সঙ্গে কিংবা নদীকে নারীর সঙ্গে তুলনা করার রেওয়াজ খুবই প্রাচীন। কিন্তু উপমা বা কল্পনার বাইরে একজন ছিলেন বাস্তবে। এই শতাব্দী শুরুর দিকে জানা যায় নদীর মতো এক নারীর কথা, ‘যে জলের মতো ঘুরে ঘুরে একা কথা কয়।’ নাম তার ভিভিয়েন। স্টিফেন স্পেন্ডার লিখেছেন, স্বামী টি.এস. এলিয়টের (১৮৮৮-১৯৬৫) বন্ধুরা তাকে বলত দ্য রিভার গার্ল (The River Girl). 

আমাদের দেশে, পৃথিবীর অবিমিষ্যকামী মানুষের কাছে, বরাবরই অযত্ন, অবহেলা পায় নদী, আলোচ্য নদীকন্যাও অবহেলার বদলে সমাদর, সম্মান পান নি। কেউ তাকে ভালোবাসেনি। তাকে নিয়ে নাসিকা কুঞ্জন করেছেন ভার্জিনিয়া উলফ (১৮৮২-১৯৪১)। সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি চিরকালের মতো চিহ্নিত হয়ে গেছেন ‘চিলেকোঠার উন্মাদিনী’ হিসেবে, যদিও তার মূল নাম ছিল ভিভিয়েন হাইগ উড (১৮৮৮-১৯৪৭)।

প্রায় রাতারাতি আধুনিক ইংরেজি কবিতার খোলনলচে পালটে দেওয়া তরুণ আমেরিকান-ব্রিটিশ কবি টি. এস. এলিয়ট-এর বিস্ফোরক আবির্ভাবের প্রধান স্বাক্ষী তিনি। শুধু তারই জন্য ইংল্যান্ডে পড়তে আসা হার্ভাডের মুখচোরা ছাত্রটি আর দেশে ফিরে যাননি। ১৯১৫ থেকে ১৯৩২ সাল পর্যন্ত এলিয়টের সবচেয়ে সৃজনশীল সময়ে তিনি তার জীবনসঙ্গিনী, তথাপি যাকে ছেড়ে কবি চলে গিয়েছিলেন বিয়ের ১৭ বছর পর।

শেষ পর্যন্ত, স্বামী-পরিত্যক্তা দ্য রিভার গার্ল (The River Girl) নয় বছর এক মনোরোগ সেবাশ্রমে কাটিয়ে ১৯৪৭ সালে ৫৮ বছর বয়সে আত্মহত্যা করেন, বছরটি ছিল তার স্বামীর নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির ঠিক আগের বছর। বিলাতের হ্যারোর পিনার সমাধিক্ষেত্রে, যেখানে তিনি সমাহিত হতে চাননি, পরম অবহেলায় তিনি শায়িত। সমাধি-ফলকে খোদিত তার মৃত্যুর ভুল তারিখটি শুধরে দেয়নি কেউ। সেখানে তার বিখ্যাত স্বামীর কোনো উল্লেখ নেই, যদিও ঞযব জরাবৎ এরৎষ ভিভিয়েনকে সমাধিস্থ করার সময় প্রাক্তন-স্বামী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন টি.এস এলিয়ট। 

শুধু নারী নয়, সমগ্র মানব প্রজন্মের সঙ্গেই নদীর সম্পর্ক আসলে গভীর, অচ্ছেদ্য। প্রস্তরযুগের ভলগা থেকে গঙ্গা পর্যন্ত একেকটি নদীর তীরে যখন গড়ে উঠেছিল মানবসমাজ ও সভ্যতার বুনিয়াদ, তখন থেকেই এই বন্ধনের সৃষ্টি। শুধু রক্তের সম্পর্ক বা সামাজিক সম্পর্কের বন্ধন নয়, বরং একেকজন মানুষের ভাগ্য সূক্ষèভাবে জড়িয়ে রয়েছে প্রকৃতি, পরিবেশ, বিশেষত নদীর সঙ্গে। অদৃশ্য বিধানে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে মানুষ ও প্রকৃতির জীবনচক্র। মানুষের জীবনের ঘটনাপ্রবাহগুলোকে কখনো মিলিয়ে দিচ্ছে নদী¯(The River Girl) সমান্তরালে। প্রকৃতি ও নদীকে ঘিরে মানুষ একত্রিত হয়েছে, আবার ছড়িয়েও গেছে। এই আসা-যাওয়া, মেলামেশার দোলাচলেই বয়ে চলে জীবন আর নদী স্রোতে। মানুষ, জীবন, প্রকৃতি, নদী, সব কিছুর মধ্যেই রয়েছে এক জটিল অরৈখিক সম্পর্ক। সেই অরৈখিক সম্পর্কের নকশিকাথাঁয় বিন্যস্ত রয়েছে জৈব-জীবন ও প্রাকৃতিক-জীবনের যাবতীয় আয়োজন।

দক্ষিণ এশিয়া উপমহাদেশের সবচেয়ে নদীমাতৃক জনপদ বাংলায় সভ্যতার প্রথম সোপান রচিত হয়েছে নদীতটে। সমাজ, সংস্কৃতির বিনির্মাণ থেকে বাণিজ্যযাত্রার পথও খুলে দিয়েছে নদীসমূহ। ইতিহাস ও সভ্যতার মতোই প্রাচীন বাংলাদেশের প্রবহমান নদীগুলো। নদীভিত্তিক সাহিত্য, গল্প, কবিতা, উপন্যাস বাংলা ভাষার মতো অন্য কোনো ভাষায় পাওয়া যাবে না। প্রাচীন মঙ্গলকাব্যের বিস্তৃত পটভূমিকায় নদীর একটি আলাদা তাৎপর্য লক্ষ্যণীয়ভাবে এসেছে নদ-নদীর কথা। বরং রহস্যময় ‘সান্ধ্যভাষা’ নামে পরিচিতি চর্যার পদগুলোতে গাছ বা নদীর প্রতীকে নর বা নারীকে বিবৃত করা হয়েছে। মনসা মঙ্গলের বেদনাগ্রস্ত নায়িকা বেহুলা নদী পথেই ভেলায় পৌঁছে গিয়েছিলেন মৃত লখিন্দরের শবদেহ নিয়ে অমরাবতীর দরজায়। তিনিও তো একজন দ্য রিভার গার্ল (The River Girl) ‘নদী-কন্যা’ই তো বটে।