আর্থ-মানবতার সেবায় কিশোরগঞ্জের চিনু আপা



কনক জ্যোতি, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
আর্থ-মানবতার সেবায় কিশোরগঞ্জের চিনু আপা। বার্তা২৪.কম

আর্থ-মানবতার সেবায় কিশোরগঞ্জের চিনু আপা। বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

তিনি রাজনীতি করেন না। পদ-পদবীর বিন্দুমাত্র মোহ নেই। ক্ষমতার জন্যে মোটেও লালায়িত নন। কীর্তিমান পিতার আদর্শে, রত্নগর্ভা মায়ের অনুপ্রেরণায় এবং আদর্শ স্বামীর সহযোগিতায় তিনি মানুষ ও মানবতার সেবায় নিজেকে নিবেদিত করেছেন।

কিশোরগঞ্জের সর্বত্র চিনু আপা নামে সুপরিচিত লুৎফুন নেছা পেশায় একজন শিক্ষক হিসেবে শহরের ঐতিহ্যবাহী আরজত আতরজান বিদ্যালয়ের সঙ্গে জড়িত। অনলাইন সামাজিক মিডিয়া গ্রুপের এডমিন ও মর্ডারেট, গার্লস গাইডের সংগঠক, গ্রন্থ ও পাঠাগারপ্রেমী এবং আরও বহুবিধ সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিচিতিতে উজ্জ্বল চিনু আপা আর্থ-মানবতার ডাকে সাড়া দিতে সদা-উন্মুখ।

সারা বছরের মতো তিনি রমজান মাসেও নানামুখী কাজে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছেন। এতিমদের উপহারের ব্যবস্থা করেছেন। তাদের ইফতার ও খাবারের পাশাপাশি 'মাজহারুন-নূর ফাউন্ডেশন'র উদ্যোগে কিশোরগঞ্জের বিশিষ্টজন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র প্রফেসর ড. মাহফুজ পারভেজের একাধিক বই বিতরণ করেছেন। তিনি নিজেও স্ব-অর্থায়নে বিভিন্ন গণগ্রন্থাগারে বই উপহার দেন এবং আলাদা কর্নার করে সেখানে সমকালীন তাৎপর্যবাহী বই সরবরাহ করেন।

তদুপরি, জেলার বিভিন্ন স্থানে ও বিভিন্ন সংগঠন আর ফোরামের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক আলোকায়ন ও আর্থ-মানবতার সেবায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন লুৎফুন নেছা চিনু আপা। প্রশাসন ও কর্তাব্যক্তিদের তোষামোদ করে বিভিন্ন পদ, পদক ও পুরস্কার প্রাপ্তদেরও ম্লান দেখায় তার ঔজ্জ্বল্যের সামনে। সুকর্মের নিরিখে তিনি মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার যে পুরস্কার পেয়েছেন, তা পায়নি কিশোরগঞ্জের অনেক তথাকথিত পুরস্কৃতরা।

কিশোরগঞ্জের নারীশক্তির প্রকৃত উপমা হয়ে বিরাজমান চিনু আপা বার্তা২৪.কমকে বলেন, আমার সকল মানবতাবাদী, সামাজিক প্রচেষ্টার পেছনে রয়েছে পিতার আদর্শ, রত্নগর্ভা মায়ের অনুপ্রেরণা এবং আদর্শ স্বামীর সহযোগিতা।

তিনি বলেন, আমার বাবা আমার কাছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাবা। বাবা মরহুম আব্দুর রশিদ ছিলেন কিশোরগঞ্জের গর্ব। ১৯৪২ সালে কিশোরগঞ্জ শহরের আজিমউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় কলিকাতা বোর্ডের অধীনে বৃহত্তর ময়মনসিংহে তিনজন ছাত্র ১ম বিভাগ পেয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে একমাত্র মুসলিম ছাত্র ছিলেন আমার বাবা। তখন তাঁকে দেখার জন্য দূর দূরান্ত থেকে লোকজন এসেছিল। পরে ময়মনসিংহ আনন্দ মোহন কলেজ থেকে আই.এ এবং বি.এ পাস করার পর তিনি আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে এম.এ ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৪৭ সালের দাঙ্গার সময় প্রাণে বেঁচে ফিরে এসেছিলেন মাতৃভূমিতে। তারপর ১৯৫৪ সালে সি.এস.পি পরীক্ষায় উর্ত্তীণ হয়ে তিনি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে পোস্টিং পেয়েছিলেন কুষ্টিয়ায়। কিন্তু স্বাস্থ্যগত কারণে তিনি এলাকায় প্রথমে আজিমউদ্দিন স্কুলে ও পরে রামানন্দ স্কুলে, যা এখন সরকারী বালক বিদ্যালয়, সুনামের সাথে শিক্ষকতা করেছেন। ১৯৫৮ সালে কিশোরগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৬০ সালে আবার পড়াশোনা শুরু করেন  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। অর্জন করেন ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে এম.এ ডিগ্রি। সেই সাথে ঢাকা সেন্ট্রাল ল কলেজ থেকে এল.এল.বি এবং ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বি.এড ও এম.এড ডিগ্রি। ১৯৬৩ সাল থেকে শুরু করেন আইন পেশা। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৩ সালে পৌরসভা নির্বাচনে জয়ী হয়ে কিশোরগঞ্জ মহকুমার প্রথম পৌর চেয়ারম্যান হন তিনি। কিশোরগঞ্জ বার এসোসিয়েশনের প্রথম সভাপতিও ছিলেন তিনি।

লুৎফুন নেছা চিনু আপা বলেন, আমার মা প্রথমে ভারতেশ্বরী হোমস ও পরে পড়াশোনা করেন ঢাকায় ১৯২৮ সালে প্রতিষ্ঠিত 'নারী শিক্ষা মন্দির'-এ। তার কাছ থেকে আমি পেয়েছি অনুপ্রেরণা।

চিনু আপার স্বামী ফিরোজ কামাল মাসুম একজন ব্যাঙ্কার হলেও আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক কাজে অন্তঃপ্রাণ। এই দম্পতি কিশোরগঞ্জের সামাজিক কাঠামোয় ও সাংস্কৃতিক বৃত্তে তৈরি করেছেন নিজস্ব অবস্থান এবং তাদেরকে ঘিরে রচিত হয়েছে একটি আলোকিত বলয়। কিশোরগঞ্জের চিনু আপা পরিণত হয়েছেন সুকর্ম, সৃজনশীলতা ও সামাজিক কল্যাণে অনুপম দৃষ্টান্ত ও অনুসরণযোগ্য আর্দশ।