রবীন্দ্রনাথের আরেক নায়িকা



সুমন ভট্টাচার্য
মেহরিন জব্বার/ছবি: সংগৃহীত

মেহরিন জব্বার/ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

সাহিত্যে উদ্ভাসিত রবীন্দ্রনাথের নান্দনিক নায়িকাদের কথা সবাই জানি। চলচ্চিত্রে তাদের উপস্থিতিও দেখেছি। তবে, তারা মূলত বাংলাদেশ ও ভারতের বাংলাভাষী পশ্চিমবঙ্গ অঞ্চলে আবর্তিত হয়েছেন। এবার, সম্ভবত প্রথমবারের মতো উর্দুভাষী পাকিস্তানে দেখা পাওয়া গেল রবীন্দ্রনাথের আরেক নায়িকার।

রিভার্স স্যুইং যে পাকিস্তানের পেস বোলাররাই ভাল দেয়, সেটা এতদিন আমরা সবাই জানতাম| তাই বলে এইরকম রিভার্স স্যুইং, মেহরিন জব্বার? আপনার দেওয়া এই যে রিভার্স স্যুইং, পাক সিরিয়ালে রবীন্দ্র সঙ্গীতের ব্যবহার যে এইভাবে ২০২১ এ ফিরে এসে সবার হৃদয়কে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে, তা কে জানতো? আপনার 'সিরিয়াল দিল কেয়া করে'র দৃশ্য আপনি টুইট করে জানিয়ে দেবেন যে, নায়িকা উমনা জাইদির কণ্ঠে 'আমার পরাণ যাহা চায়' গানটি রয়েছে, আর সীমান্তের এপারে ও বিশ্বময় বাঙালি হৃদয় একেবারে আপ্লুত হয়ে যাবে? আপনাকে দেখতে পাবে রবীন্দ্রনাথের আরেক অনিন্দ্য নায়িকা রূপে।

ইতিহাসের কি আশ্চর্য সমাপতন দেখুন, মেহরিন জব্বার, আপনি এই টুইটটা করলেন ২০২১ সালে, অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের ১৬০ তম জন্মবার্ষিকীতে| আমরা সবাই জানতে পারলাম আপনার বহু আলোচিত, তুমুল জনপ্রিয় সিরিয়াল 'দিল কেয়া করে'তে কি চমৎকার ভাবে রবীন্দ্রসঙ্গীত ব্যবহৃত হয়েছে| এবং গেয়েছেন ভারতীয় শিল্পী শর্বরী দেশপান্ডে| অথচ ঠিক ৬০ বছর আগে, ১৯৬১ সালে যখন এই নোবেল জয়ী সাহিত্যিকের জন্মশতবর্ষ পালিত হচ্ছে, তখন সেদিনের পাকিস্তানের সামরিক শাসক আয়ুব খান পূর্ব পাকিস্তান তথা আজকের বাংলাদেশে রবীন্দ্র সঙ্গীতকে নিষিদ্ধ করে দিতে চেয়েছিলেন| আয়ুব খানের সেই রবীন্দ্রনাথের গানকে নিষিদ্ধ করে দেওয়ার প্রতিবাদে বাংলাদেশের বাঙালি সমাজের যে ক্ষোভ, বিক্ষোভ, তাই তো সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের পথ ধরে পরবর্তীকালে রাজনৈতিক ও সশস্ত্র সংগ্রাম পেরিয়ে বাংলাদেশ হয়ে ওঠায় ইতিবৃত্ত রচনা করেছে এবং বাংলা ভাষা, বাঙালি সংস্কৃতি এবং রবীন্দ্রনাথ-নজরুলকে  আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে|

মেহরিনের আলোচিত সিরিয়ালের দৃশ্য
 

মেহরিন বব্বর, তথ্য বলছে ১৯৭১ এ বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ঠিক ১৩ দিন বাদে, ২৯ ডিসেম্বর আপনার জন্ম| কিন্তু আপনি, যাঁকে পাকিস্তানের অন্যতম অগ্রগণ্য মহিলা পরিচালক বলা হয়, যিনি পাকিস্তান আর নিউইয়র্কের মধ্যে জীবনটাকে ভাগ করে নিয়েছেন, তিনি একটি পাকিস্তানি সিরিয়ালে রবীন্দ্রসঙ্গীত ব্যবহারের তাৎপর্যকে বুঝবেন না, তার রাজনৈতিক বা সামাজিক অভিঘাতকে বুঝবেন না, এমনটা হতেই পারে না| কারণ আপনার বাবার নাম জাভেদ জব্বার,  যিনি শুধু পাকিস্তানের অগ্রগণ্য বুদ্ধিজীবী নন, তিন তিনবার সেদেশের মন্ত্রী হয়েছেন, এমনকি পারভেজ মুশারফের আমলে ইসলামাবাদে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রীর দায়িত্ব সামলেছেন| সেই জাভেদ জব্বারের কন্যা, পাকিস্তানের অগ্রগণ্য পাবলিক ইন্টালেকচুয়ালের মেয়ে যখন তাঁর সিরিয়ালে দেখান, নিউইয়র্ক থেকে ফেরা পাকিস্তানি কন্যা মুগ্ধ পুরুষের চোখের সামনে বসে গাওয়ার আগে বলেন, 'শোনো এটা কিন্তু একটা বাংলা গান' এবং তারপরে পরিষ্কার বাংলায় গেয়ে ওঠেন, 'আমার পরাণও যাহা চায়', তখন তো আসলেই অনেক কিছু বলা হয়ে যায়!

১৯৬১ তে কবির জন্মশতবর্ষে আয়ুব খানের নিষেধাজ্ঞার রিভার্স স্যুইং ই তো পাকিস্তানি তরুণীর গলায়, 'আমার পরাণও যাহা চায়' মর্মে গুঞ্জরিত। এমন গান আপনি বাছলেন আপনার নায়িকা উমনা জাইদির জন্য, যে বাঙালির হৃদয়ে উথালপাথাল হবেই।

অবশ্য এই বেড়া ভাঙার খেলাটা, উপমহাদেশের বৃহত্তর পরিসরকে খুঁজে বার করার চেষ্টাটা আপনার মজ্জাগত, বাবার থেকে পেয়েছেন| হ্যাঁ, আপনার বাবা, জাভেদ জব্বর, যাঁর জন্ম ভারতের হায়দরাবাদে, কিন্তু তারপরে দেশভাগের পরে করাচিতে চলে গেলেও এই উপমহাদেশের শেয়ারড এক্সপিরিয়েন্স বা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে কখনও ভোলেননি| তাই তো জাভেদ জব্বার যেমন ভারত পাকিস্তানের মধ্যে ট্র্যাক টু ডিপ্লোম্যাসির অন্যতম অঙ্গ 'নিমরানা সংলাপ'র অগ্রণী উদ্যোক্তা, তেমনই আপনার, মেহরিন জব্বার, আপনার প্রথম ছবি 'রামচান্দ পাকিস্তানি' প্রযোজনা করেন|

'রামচান্দ পাকিস্তানি'কে সালমন খানের সুপার হিট সিনেমা বজরঙ্গী ভাইজানের প্রিল্যুড বলা যায়, কারণ ২০০৮ সালের এই চলচ্চিত্রে দেখানো হয়েছিল পাকিস্তানের এক দলিত হিন্দু বালক ঘটনাক্রমে ভারতে ঢুকে পড়ার পর কি কি ঘটতে থাকে! নন্দিতা দাস অভিনীত আপনার এই সিনেমা দেখেই তো মীরা নায়ারের মতো পরিচালক মুগ্ধ হয়ে যান আর আপনাকে আফ্রিকা নিয়ে যান একসঙ্গে কাজ করার জন্য|

কলকাতায় মেহরিনের পিতার সঙ্গে সস্ত্রীক লেখক

যাঁরা আপনার এই 'দিল কেয়া করে' সিরিয়াল দেখেছে, দেখা সম্ভবও, কারণ এম এক্স প্লেয়ারের মতো ভারতীয় ওয়েব প্ল্যাটফর্মে এই সিরিয়ালটি রয়েছে, তাঁরা জানেন, উমনা জাইদির আমিনা চরিত্রটিকে কত সাহসের সঙ্গে আপনি এঁকেছেন| পাকিস্তানি মিডিয়া, সেদেশের সমালোচকরা বারবার লিখেছেন, মেইনস্ট্রিম মিডিয়ায় একজন বিধবাকে, যাঁর সন্তান রয়েছে, কেউ প্রেম করছে, বিয়ে করছে, দেখানো কত কঠিন| কিন্তু মেহরিন জব্বার সেই কঠিন কাজটা আপনি বারবার করেছেন বলেই আপনাকে নিয়ে এত আলোচনা, এত পুরস্কার আপনার ঝুলিতে|

মেহরিন জব্বার, আপনাকে চেনা, আপনার কাজকে জানা যেহেতু অনেকটা পারিবারিক সূত্র ধরে, সেহেতু জানি, এই উপমহাদেশে বেড়া ভাঙার কাজটা করতে আপনি কতটা স্বচ্ছন্দ| ২০১৫ সালের যে সময়ে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী চলে যাচ্ছেন পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের নাতনির বিয়েতে, সেই সময় আসলে জাভেদ জব্বারও ভারতে এসেছেন, বিভিন্ন শহরে গেছেন দুদেশের শান্তি আলোচনাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে| সেই সময় বিভিন্ন আড্ডার পরে কত সহজে পাকিস্তানের প্রাক্তন মন্ত্রী মধ্য কলকাতায় আমার অফিসে চলে এসেছেন আমার ও আমার অধ্যাপিকা স্ত্রীর সঙ্গে আলাপচারিতাকে আরেকটু এগিয়ে নিয়ে যেতে| কাবাব আর অফ দি রেকর্ড কথাবার্তার মাঝে জাভেদ জব্বার নিজের নতুন বইও দিয়ে গিয়েছেন| সেই দিন থেকেই জানি আপনারা, মানে জব্বাররা হৃদয়ে আগল তুলে দিতে বিশ্বাসী নন|

পাকিস্তানের রাজনীতিতে একটা চালু শব্দ আছে, মোহাজির| অর্থাৎ যাঁরা উদ্বাস্ত| যাঁরা উদ্বাস্তু হিসেবে পাকিস্তানে গিয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নিয়েছেন| মেহরিন জব্বার, করাচি, যে শহরে আপনার জন্ম, বেড়ে ওঠা, সেটা আসলে মোহাজিরদের শহর| মনে আছে অনেক আড্ডা এবং তর্কবিতর্কের পর রাত্রিবেলা বিদায় নেওয়ার আগে আপনার পিতা, জাভেদ জব্বার হঠাৎ মনে করিয়ে দিয়েছিলেন তিনিও আসলে দেশভাগের অনেক ক্ষত বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছেন|

আপনি মেহরিন জব্বার, সেই বাবার মেয়ে হিসেবে এই উপমহাদেশের সবচেয়ে বিখ্যাত লেখককে শুধু সিরিয়ালের গানে ব্যবহার করেই স্মরণ করলেন না, টুইট করে বলতে চাইলেন, 'আমার পরাণ যাহা চায়'। অনেকের না-বলা মনের কথা আপনি বলতে চেয়েছেন। সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের ঈর্ষণীয় নায়িকাদের মতো সংঘাত-বিক্ষুব্ধ বাস্তবে আপনি পরিণত হলেন শান্তি, সম্প্রীতি ও প্রেমের বার্তাবাহী রবীন্দ্রনাথের আরেক নায়িকায়।

লেখক: সুমন ভট্টাচার্য, কলকাতার বিশিষ্ট সাংবাদিক, কবি কথাশিল্পী।