‘দ্য গ্র্যান্ড ডটার প্রজেক্ট’এর রচয়িতা শাহীন চিশতীর সাক্ষাৎকার



এরশাদুল হক টিংকু
দ্য গ্র্যান্ড ডটার প্রজেক্ট-এর প্রচ্ছদ

দ্য গ্র্যান্ড ডটার প্রজেক্ট-এর প্রচ্ছদ

  • Font increase
  • Font Decrease

শাহীন চিশতি, বিখ্যাত সুফি সাধক খাজা মইনুদ্দিন চিশতীর এই বংশধর লন্ডনে বসবাসরত একজন লেখক। তিনি বরাবরই নারী ক্ষমতায়ন বিষয়ক একজন সাহসী প্রবক্তা। বিশ্ব-সমাদৃত এই ব্যক্তিত্ব কিছুদিন আগে তার প্রথম উপন্যাস ‘দ্য গ্র্যান্ড ডটার প্রজেক্ট’ প্রকাশ করেছেন। যা লিঙ্গ বৈষম্য, জাতিগত নিপীড়ন, যুদ্ধকালীন দুর্দশা ও নারী মুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর লেখা।

লেখকের ভাষ্যমতে, যাদের জীবন মেয়ে, নাতনী অথবা যে কোনো নারীর সাথে সম্পৃক্ত, এ বইটি তাদের জন্য। দ্য গ্র্যান্ড ডটার প্রজেক্ট-এ তিনটি ভিন্ন প্রেক্ষাপটের তিনজন নারীর বাস্তব ঘটনার আলোকে লেখা অভিজ্ঞতার কথা বলা হয়েছে। যেখানে তারা নারীদের সামাজিক মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় সংগ্রাম করেন, কারণ তারা নিজেদের নাতনিদের জন্য একটি সুন্দর ভবিষ্যত গড়তে

শাহীন চিশতীর সাক্ষাৎকারটি হুবহু বার্তা২৪.কম এর পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো-

কোন ভাবনা থেকে দ্য গ্র্যান্ডডটার প্রজেক্ট লেখা শুরু করেছিলেন?

শাহীন চিশতী: একটা স্বপ্ন থেকে। আমি এমন এক সমাজের স্বপ্ন দেখি যেখানে আমার মেয়ে এবং ভবিষ্যত নাতনীরা সম্মানের সাথে বাঁচবে। যেখানে তাদের কোন অন্যায়ের মুখোমুখি হতে হবে না, শুধুমাত্র তাদের নারী পরিচয়ের কারণে ভয় করতে হবে না। সমাজ সংস্কার কিংবা চিন্তা-ভাবনায় যদিও আমরা অনেকদূর এগিয়ে গিয়েছি; কিন্তু তারপরও আমি বলতে চাই, এ পথ এখনও শেষ হয়নি। ভবিষ্যতে আমাদের নাতনিরা যাতে পুরুষের ভয়ে ভীত না থাকে, নিজেদের প্রতিভা দমিয়ে না রাখে, সেজন্য আমাদের আরও অনেকটুকু পথ যেতে হবে।

আমি তরুণীদের অধিকার ও ক্ষমতায়ণের পথ দেখাতে চেয়েছি। আমি চেয়েছি, তারা যাতে নিজেদের হারিয়ে না ফেলে। অসংখ্য নারী বর্তমানে মাথা উঁচু করে চলতে পারছে কারণ তাদের আগের প্রজন্মের সাহসী নারীরা সে পথ তৈরি করে গিয়েছেন বলে। সেই প্রজন্মের দাদী-নানীদের নির্মোহ আত্মত্যাগ আজ তাদের অধিকার ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। তবে দুঃখের কথা হচ্ছে, সেই দাদী-নানীদের অনেকেই পারিবারিক ও সামাজিক চাপে তাদের জীবনের গল্পগুলো না বলেই পৃথিবী থেকে বিদেয় নিয়েছেন। কেউ সাহস করে উঠতে পারেনি, কেউ হয়তো সে সুযোগই পাননি। আমি মনে করি এখন সময় এসেছে তাদের সেই ঘটনাগুলো বলার।

নারী ক্ষমতায়ন নিয়ে লেখার অনুপ্রেরণা?

শাহীন চিশতী: আমার জন্ম রাজস্থানের আজমীরে। প্রচলিত হিন্দু ও মুসলিম সমাজব্যবস্থায় নারীদের জীবন আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। গ্রামের অনেক পরিবারের সাথে আমার সখ্যতা ছিলো। নারীদের অনেক সমস্যা আমার চোখের সামনেই ঘটেছে। এসব ঘটনা আমার ভেতরটাকে ওই বয়সেই নাড়িয়ে দিয়েছিলো। এরপর আমি অল্প-বয়সে ইংল্যান্ড চলে আসি। সেখানে স্বাধীনচেতা নারীদের দেখা পাই, যারা সামাজিক প্রতিবন্ধকতা দূর করার জন্য বদ্ধপরিকর, অধিকার আদায়ে সচেতন। দুই দেশের নারীদের প্রত্যক্ষ করে আমি বুঝতে পারি আসলে দু’দিকের নারীরাই বিভিন্ন সমস্যার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। এই সমাজ আমাদের মা, বোন, কন্যা, স্ত্রীদের সাথে অন্যায় করে আসছে যুগের পর যুগ। এই ভাবনা থেকেই আমি বইটি লেখার সিদ্ধান্ত নিই। যেখানে আমি বিভিন্ন সামাজিক ব্যবস্থায় মেয়েদের প্রতি অন্যায় এবং দমিয়ে রাখার কথাগুলো তুলে ধরবো।

শাহীন চিশতী

দ্য গ্র্যান্ডডটার প্রজেক্ট নিয়ে আপনার সবচেয়ে বড় ভয় কোনটি?

শাহীন চিশতী: আমার বইতে লেখা নারীদের প্রতি সুবিচার না করা। আরও বিস্তারিত বলতে যে সব নারীদের কথা লিখেছি, তাদের হতাশ করা। কারণ তারা অগাধ বিশ্বাস নিয়ে আমাকে তাদের জীবনের নির্যাতন ও কষ্টের কথাগুলো বলেছেন। আমার এ বই সমাজের নারীদের একটা প্রতিফলন। এবং বইতে লেখা অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে অনেক নারীকেই যেতে হয়েছে। আমি তাদের গোপন এবং গভীর কথাগুলো ধরতে চেষ্টা করেছি। কোনও কোনও পাঠকের ক্ষেত্রে এমন বাস্তব অভিজ্ঞতা হয়তো অস্বস্তি সৃষ্টি করতে পারে। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, এই অস্বস্তির ভেতর দিয়ে অসংখ্য নারী সমাজে বাস করছে। সমাজের উন্নতি আনতে পুরানো ভুল থেকেই আসলে শিক্ষা নেয়া উচিত।

বই প্রকাশের জন্য আপনি সমর্থন পেয়েছেন?

শাহীন চিশতী: অবশ্যই। এই বই লঞ্চের পেছনে একটা চমৎকার টিম কাজ করে যাচ্ছে। লেখার সময় আমার যেসব নারীদের সাথে দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে; কাজটা আমি তাদেরই উৎসর্গ করেছি। বইয়ের ঘটনা কাল্পনিক হলেও পৃথিবীব্যাপী অসংখ্য নারীর বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকেই এটা লেখা। তারাই আসল হিরো, আমি নই।

আমার পরিবারের প্রতিও আমি অনেক কৃতজ্ঞ। বিশেষত সেসব নারীদের প্রতি, যারা আমার জীবনে অবদান রেখেছেন। সৌভাগ্যবশত আমি কিছু দৃঢ় মানসিকতার নারীদের মধ্যে বড় হয়েছি। আমি আজ যা, তা তাদেরই অবদান।

এই বই লেখার সময় আপনি কি কি শিখেছেন?

শাহীন চিশতী: মেয়েরা কিভাবে শত নির্যাতন ও লাঞ্ছনা মুখ বুজে সহ্য করে, বিশেষ করে যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ এবং দারিদ্রতার সময়; তা নিয়ে বিস্তর ধারণা হয়েছে। সত্যি বলতে গেলে, এই অভিজ্ঞতাগুলো আমার চোখ খুলে দিয়েছে। এটা এমন একটা ব্যাপার যা আমরা সবাই জানি। কিন্তু ততক্ষণ পর্যন্ত অনুভব বা বিশ্বাস করা যায় না যতক্ষণ না বিষয়টা নিয়ে বিস্তারিত পড়াশোনা করা হয়। কিছুক্ষেত্রে এ জাতীয় হয়রানিকে সৈন্য অথবা শত্রুপক্ষের সাথে গুলিয়ে ফেলি আমরা। মাঝে মাঝে দেখা যায় এই যৌন হয়রানির পেছনে এরা নয় বরঞ্চ দায়ী বাবা, ভাই এবং বন্ধুরা। যুদ্ধের মোড়কে এই ঘটনাগুলোকে আড়াল করা খুব সহজ। কিন্তু কিছু পুরুষ এমন অবস্থার সুযোগ নিয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে চায়।

শাহীন চিশতী

এসব নিয়ে কাজ করার সময় কিছু নিয়ে অবাক হয়েছেন কি?

শাহীন চিশতী: ভবিষ্যত প্রজন্মের উপর ইতিহাসের প্রভাব। আমার বইতে লেখা দাদী-নানীদের কষ্টের অভিজ্ঞতা সরাসরি তাদের নাতনী এবং পরিবারের উপর প্রভাব ফেলে। এই মানসিক যন্ত্রণার অবসান ঘটতে অনেক সময়ের প্রয়োজন হয়, কিন্তু এই আঘাত তাদের আরও দৃঢ় করে গড়ে তোলে, যা তাদের নাতনীদের সাথে বন্ধনকেও মজবুত করে। এমনকি তাদের মৃত্যুর পরও নাতনীরা তাদের দাদী-নানীর সাথে একটা কানেকশন অনুভব করে, গর্ব করে। কারণ তারা ভবিষ্যত প্রজন্ম কে যে অনুপ্রেরণা দিয়ে যান, তা অটুট থাকে চিরকাল।

বইয়ের নামদ্য গ্র্যান্ডডটার প্রজেক্টহবার কারণ?

শাহীন চিশতী: এই নাম আমাকে অনেকখানি পথ হেঁটে আসা দাদী-নানীদের, এবং তাদের নাতনীদের জন্য কিছু একটা করার অদম্য ইচ্ছাকে মনে করিয়ে দেয়। এটা অনেকটা তাদের কাছে একটা আশার বাণী পৌঁছে দেয়ার মতো। তারা একটা পরিবর্তন আনতে চাইতো। তাদের মনে একটা বদ্ধপরিকর ধারণা ছিলো যে, তারা এটা করতে পারবেন।

বইয়ের চরিত্রগুলো কি বাস্তব? যদি বাস্তব হয়ে থাকে তবে আপনি তাদের কথা কেন লিখেছেন, এবং তাদের অভিজ্ঞতাগুলোও কি বাস্তব?

শাহীন চিশতী: হ্যাঁ, অবশ্যই। বইয়ের প্রতিটি দাদী-নানী চরিত্র আসলে অনেকগুলো চরিত্রের সংমিশ্রণ। যারা প্রায় একই রকম অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গেছেন। প্রতিটি ঘটনা এমন হাজারো নির্যাতিতা নারীর প্রতিধ্বনি। চরিত্রগুলো আমার পরিচিত আসল কিছু মানুষের উপর ভিত্তি করে বানানো। তাদের ঘটনা আমাকে মুগ্ধ করে, নাড়িয়ে দিয়ে গেছে। সেসব ঘটনা সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতেই এ বই। এ চরিত্রগুলোকে আমি গত ১৩০ বছরে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা চিত্রায়ণ করতে ব্যবহার করেছি। যেমন ৪৩ এর বাংলার দুর্ভিক্ষ, হলোকাস্ট এবং ১৯৫৮ সালের নটিং জাতির দাঙ্গা। এসবকিছুই নারীর ক্ষমতায়ণের জন্য ব্যবহার করা এবং ওই সময়ের নারীদের দুর্দশাগুলো তুলে ধরা।

লেখার জন্য কেন এই ঘটনাগুলো বেছে নিলেন?

শাহীন চিশতী: ছোটবেলা থেকেই আমি বাংলার ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ নিয়ে পড়ে আসছি, যা নিয়ে খুব বেশি একটা লেখালেখি হয়নি; অন্তত আমার বইয়ে আমি যতটুকু তুলে ধরেছি, ততটুকু না। ইন্ডিয়াতে থাকার সময় হলোকাস্ট নিয়েও খুব অল্প বয়েসেই একটা ধারণা হয়ে গিয়েছিলো। আমার বয়স যখন ৬, তখন এডলফ হিটলারের উপর একটা ডকুমেন্টারি দেখেছিলাম। আর এই বিষয়ে পড়াশোনাও করেছিলাম বেশ কয়েকবার। সৌভাগ্যবশত আমার খুব ভালো কিছু ইহুদি বন্ধু ছিলো; যাদের সাথে আমাদের সামাজিকতার অনেক মিল খুঁজে পেয়েছিলাম। আর লন্ডনে আসার পর স্কুলের যাওয়ার পথে নটিং হিল পড়তো। তাই এই জায়গাটা সবসময়ই আমার হৃদয়ের কাছাকাছি ছিলো। এবং ঠিক এখানেই আমি প্রথমবারের মতো বর্ণবৈষম্য প্রত্যক্ষ করেছিলাম।

আপনার পাঠক মূলত কারা?

শাহীন চিশতী: যাদের মেয়ে আছে, নাতনী আছে কিংবা জীবনে কোন নারী আছে; যারা চায় এই নারীরা তাদের স্বপ্ন নিয়ে নির্দ্বিধায় এগিয়ে যেতে পারে তাদের জন্য। আমার দু’জন মেয়ে আছে। আমি তাদের বোঝাতে চাই যে লিঙ্গ, জাতি, সমাজ, বর্ণ, ধর্ম - এসবের উর্ধ্বে তারা একই রকম গুরুত্ব বহন করে। আমরা সবাই মানুষ। এবং মানুষ মানুষের জন্য।

বই শেষের পর আপনি চরিত্রগুলোর কেমন পরিণতি আশা করেন?

শাহীন চিশতী: মায়া, রেবেকা, তানিয়া - আমি ভাবতে ভালোবাসি যে আমার বইয়ের এই তিন চরিত্র তাদের দাদী নানীদের মতোই সবসময় নিজেদের ভেতর যোগাযোগ রেখেছে, ভালো বন্ধু হয়েছে। তাদের একীভূত শক্তি তাদের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে, যে সিদ্ধান্ত সমাজ তাদের উপর জোর করে চাপিয়ে দিবে না। আমি চাইবো তারা আরও এগিয়ে যাক, ও অন্য নারীদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে উঠুক।

বইয়ের প্রিয় চরিত্র?

শাহীন চিশতী: ইনগ্রিদ আমার প্রিয় চরিত্র। যখন কেউ হেলগার পাশে দাঁড়ায়নি, তখন সে যে সাহস আর শক্তির নিয়ে তার পাশে দাঁড়িয়েছে, তা অনুপ্রেরণাদায়ক। সমাজের চোখ রাঙানি, আইনের বাঁধা উপেক্ষা করে সে যা করেছে তা চিন্তা করাও অকল্পনীয়। এবং সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে হচ্ছে এর বিনিময়ে সে কিছু আশাও করেনি। শুধুমাত্র বিবেকের তাড়নায়, খাঁটি অন্তর থেকেই সে কাজটা করেছে। সবাই নৈতিক সাহসিকতার কথা বলে। কিন্তু এ নৈতিকতা দেখানো সবসময় দেখানো যায় না। অনেক বাঁধা থাকে। সবথেকে সহজ হচ্ছে কিছু না করে থাকা। কিন্তু ইনগ্রিদ তা করেনি। সবাই যদি ওর মতো ভাবতে পারতো, সাহস করতে পারতো তাহলে আমরা আরও সহনশীল একটা সমাজে বাস করতে পারতাম।

ভবিষ্যতে আরও বই লেখার পরিকল্পনা আছে?

শাহীন চিশতী: হ্যাঁ। আমার আরেকটা বই লেখার প্ল্যান আছে। সঠিক সময় এলেই বিস্তারিত জানানো হবে।

বইয়ের কেমন প্রতিক্রিয়া পেয়েছেন?

শাহীন চিশতী: খুবই ইতিবাচক। আমার মেয়েরা এই বই খুবই পছন্দ করেছে। এবং ওরা আমাকে নিয়ে গর্বিত। পরিবার, বন্ধু-বান্ধব - মোটামুটি সবার কাছ থেকে ভালো প্রশংসা পেয়েছি।

এই বই লিখতে কতদিন সময় লেগেছে?

শাহীন চিশতী: দেড় বছর। যেহেতু আমি ফুল টাইম কাজ করি, তাই শুধু ছুটির দিনগুলোতেই লেখার সময় পেতাম। একটা পরিবারের খেয়াল রাখার পাশাপাশি বই লেখার খুব সহজ কাজ না। আমার এই পরিশ্রম তখনই সার্থক হবে যখন এই বই কারও জীবনে একটু হলেও পরিবর্তন নিয়ে আসবে।

যারা বই লিখতে চায় তাদের জন্য কোন পরামর্শ?

শাহীন চিশতী: লেখা শুরু করে দিতে হবে। মাথার শব্দগুলো কাগগজের উপর নিয়ে আসা খুব কঠিন। নিজের লেখা বারবার পড়তে হবে, আইডিয়া নিয়ে বারবার কাজ করতে হবে। তাহলেই কাজে সফলতা আসবে। হৃদয় থেকে লিখতে পারলেই লেখায় ন্যাচারাল আবহ আসে। লেখায় কোন ঐতিহাসিক ঘটনা থাকলে বর্ণনাগুলো যেন সঠিক হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

দ্য গ্র্যান্ডডটার প্রজেক্টকীভাবে কেনা যাবে?

শাহীন চিশতী: প্রায় সব দেশ থেকেই অ্যামাজনে পাওয়া যাবে। এছাড়া অন্যান্য অনলাইন বুকশপেও আছে। চাইলে সরাসারি প্রকাশনীর মেইল-এ ([email protected]) অর্ডার করা যাবে।

সব হারিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ‘আপোষহীন’ আফগান নারীরা!



সুতপা মজুমদার, নিউজরুম এডিটর, বার্তা ২৪.কম
সংগৃহীত

সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

চলাফেরা সীমিত, খুব কম বাইরে বের হন, বন্ধুদের সঙ্গে দেখাও একবারে কম তার, এমনকি একই জায়গায় থাকেন না এক থেকে দুই রাতের বেশি! যদি গাড়ির গতিবিধি চেক করে তাকে খুঁজে বের করা হয়; এ কারণে তার ব্যক্তিগত গাড়িটিও বেশিরভাগ সময় থাকে গ্যারেজে।

বলছি, আফগান নারী রাদা আকবর-এর কথা । একাধারে তিনি চিত্রশিল্পী, ফোটোগ্রাফার, নারী অধিকার কর্মী এবং অপ্রতিরোধ্য ।

সম্প্রতি রাদা আকবর তার বর্তমান যাপিত জীবন নিয়ে কথা বলেছেন বার্তা সংস্থা এফপি’র সঙ্গে। সংগ্রামী এই নারী রাদা আকবরের সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন এফপির করেসপন্ডেন্ট অ্যান চাওন।

জীবননাশের হুমকি পাওয়া রাদার এই সাক্ষাৎকারে ফুটে উঠেছে আফগান নারীদের বর্তমান জীবনের দৃশ্যপট। তালেবান শাসিত আফগানিস্থানে নারীদের বর্তমানে দিনগুলো কিভাবে কাটছে, যারা সমস্ত প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েও নিজেদেরকে তুলে ধরছেন; তারা কিভাবে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছেন- এটা জানানোর উদ্দেশ্য ছিল অ্যান চাওনের। এখানে রাদা যেনো আফগান নারীদের মূর্ত প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছেন। যার চরিত্রে শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব, জোরালো, আপোষহীনতার উজ্জ্বল নিদর্শন পাওয়া যায়।

রাদা আকবর

সম্প্রতি আফগানিস্তানে তালেবান দখলের পর বদলাতে শুরু করেছে নারীদের জীবনের দৃশ্যপট। নারীদের উপর বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার সাথে সাথে সমাজের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গা থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। শিল্প বা মুক্তমনাদের বিতারিত করা হচ্ছে দেশ থেকে, দেয়া হচ্ছে জীবন নাশের হুমকি। রাদাও এমনই একজন। রাদার সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি ফোন কলটি সিগনাল অ্যাপ এ ট্রান্সফার করতে বলেন। সিগনাল এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন দেয়া একটি সুরক্ষিত অ্যাপ যার ফলে ভয়েস রেকর্ডিং বা লোকেশন শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। রাদার আগেও বেশ কয়েকজন গুণী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয়েছিলো। তাঁদের অধিকাংশ ছিলেন দেশের বাইরে, কিন্তু কেউই ক্যামেরার সামনে আসতে চান নি।

প্রায় ৫ ঘণ্টা আলাপ এবং পরিচিতদের সুপারিশে রাদা সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হন। রাদার ভাষ্যমতে, শহরগুলোতে যেখানে বিশেষ করে শিক্ষিত গুণীজন, সমাজ-সেবী, প্রতিবাদী, লেখক ও চিন্তাবিদ তারাই এদের মূল টার্গেট। দেখা যায় যে, সেপ্টেম্বর ২০২০ থেকে ২০২১ এর মধ্যে সাংবাদিক, বিচারক, আইনজীবী, মানবাধিকার কর্মী ও নারী অধিকার কর্মীদের ১৮০ জনকে টার্গেট করে গুলি করে হত্যা বা গাড়িতে বোমা বিস্ফোরণে হত্যা করা হয়েছে। যাদের টার্গেট করা হয় তাদের মধ্যে কেউ কেউ আফগান গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে খবর পান, তারা তখন হয়ত বেঁচে যান আত্মগোপন করে। বেশিরভাগই রাতে ফোন কলে, দরজায় রাখা চিরকুট থেকে বা কখনো কোন অচেনা ব্যক্তির অনুসরণের মাধ্যমে মৃত্যু হুমকি পান বা খুন হন। হুমকি বাস্তব হোক বা কাল্পনিক, প্রত্যেকবার এরকম আলামত পাওয়ার পর সবাই নিজের মতন করে বাঁচার চেষ্টা করেন। কেউ বাড়িতে আত্মগোপন করেন, কেউ জিমে বা বাইরে চলাফেরা বন্ধ করেন, অনেকেই ভয়ে লোকজনের সাথে মেলামেশা বন্ধ করেন।

একজন রেডিও স্টেশনের তরুণ পরিচালকের কথা উল্লেখ করে রাদা বলেন, অফিসের পর বাড়িতে গিয়ে তিনি মৃত্যুভয়ে বাড়ি থেকে পালান, এখন ঘুরছেন রাস্তায় রাস্তায়।

তবে এই হত্যার দায়গুলো কোনভাবেই গ্রহণ করেনি তালেবান কর্তৃপক্ষ। তবে যারা এই মৃত্যু হুমকি পাচ্ছেন তাদেরকে ইসলামপন্থী যোদ্ধারা ক্ষমতা নেওয়ার আগে উচ্ছেদ করছে। আর যারা প্রতিদিন এই হত্যার পরিসংখ্যান বের করছেন তারা কোন জরিপ না করেই প্রকাশ করছে, তাদের তথ্য সঠিক না বলে জানায় তালেবানরা।

আফগান নারীরা

রাদা এবার একটু ইতস্তত হয়েই বলেন, এই মানসিক চাপের জন্য তার নিজস্ব ব্যবসা ছেড়ে প্রতিবেশী দেশে আশ্রয় নিতে হয়েছে। এরপরও ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে তার একটি প্রদর্শনীর কাজ শেষ করতে তাকে ফিরে আসতে হয়। আগের মতোই তিনি তার প্রদর্শনী অনলাইনে রাখেন। কারণ হলো অতিথিদের জন্য বিপদজ্জনক হতে পারে। রাদার সবচেয়ে ভালো বন্ধুদের একজন, ফাতিমা ২০২০ সালের জুনে খুন হন। তিনি স্বাধীন আফগানিস্তানের মানবাধিকার কমিশনে কর্মরত ছিলেন। গাড়ির নিচে বোমা রেখে তাকে তার ড্রাইভারসহ তাকে হত্যা করা হয়। তিনি বন্ধুদের কাছে নাতাশা নামেই পরিচিত ছিলেন এবং খুব ভালো নাচতেন। মাত্র ২৪ বছর বয়সেই তিনি একাধারে ৫টি ভাষায় কথা বলতে পারতেন এবং দুইটি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি ছিল। বিদেশে পড়াশুনা শেষে সবে কাবুলে ফিরেছিলেন।

রাদা খুব কম সময়ের জন্য একবার ক্যামেরার সামনে আসেন। ঘরের মেঝেতে বিছানো তোষকে মুখ গুঁজে তিনি মার্কিনদের সাথে তালেবানের চুক্তিকে অবৈধ বলে তাদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এ সময় তিনি তার পরিবারের কথাও বলেন। প্রতিবেদক অ্যান চাওন রাদা জীবনযাত্রার ধরন শুনে মর্মাহত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, পুরোটা সময় রাদার অসহায়ত্ব চোখে জল আসার মত ছিল। আমি আমার জীবনে প্রথমবারের মত কর্মক্ষেত্রে কেঁদেছিলাম। চারপাশে রাদার হতাশা বিরাজ করছিলো। যা কিনা আফগান নারীদের প্রতিরূপ। তুরস্ক তাকে ভিসা দিতে অস্বীকার জানিয়েছিল। সেই মুহূর্তে ফ্রান্স ছিলো শেষ আশা। কিন্তু দেশ ছাড়ার যাওয়ার আগে রাদা তার কাজগুলো সংরক্ষণ করতে চেয়েছিল।

সাক্ষাৎকারের শেষে রাদা বলেন, 'আজ আশা ধরে রাখা কঠিন। যে-কোন সময় শেষ হতে পারি এবং এটি শুধুমাত্র আমি নই, এ কথাটা আমরা সবাই অনুভব করি। কাল কি হতে চলেছে, আমি কি বেঁচে থাকব?' 

;

সোমঋতা মল্লিক ও শতবর্ষে বিদ্রোহী



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
সোমঋতা মল্লিক ও শতবর্ষে বিদ্রোহী

সোমঋতা মল্লিক ও শতবর্ষে বিদ্রোহী

  • Font increase
  • Font Decrease

কাজী নজরুল ইসলামের ঐতিহাসিক সৃষ্টি 'বিদ্রোহী' কবিতা আজ থেকে ঠিক ১০০ বছর আগে রচিত হয়েছিল। শতবর্ষে এ কবিতা উজ্জীবিত করে বৃহত্তর বাঙালিকে। মাত্র ২২ বছর বয়সে নজরুল প্রায় দেড় শ পঙক্তির ভুবনবিজয়ী কবিতায় বাঙালির শৌর্য, দ্রোহ, সংক্ষোভ ও স্বাধীনতার স্পৃহাকে মূর্ত করেছেন।

নজরুল চর্চায় নিবেদিত 'ছায়ানট কলকাতা' এই ইতিহাসস্পর্শী কবিতার শতবর্ষে আয়োজন করেছে বর্ণাঢ্য আলোচনা ও সঙ্গীতের। 'ছায়ানট কলকাতা'র সভাপতি, বিশিষ্ট শিল্পী ও নজরুল গবেষক সোমঋতা মল্লিক বার্তা২৪.কম'কে বলেন, 'সারা বছরই আমরা নজরুল বিষয়ক নানা আয়োজন করলেও শতবর্ষে বিদ্রোহী আমাদের কাছে গভীর তাৎপর্যবাহী। আমরা কলকাতায় নজরুলের অবস্থানের জায়গাগুলোকে চিহ্নিত করছি এবং তাঁর গান ও অন্যান্য রচনার চর্চা ও বিকাশে ব্যাপৃত রয়েছি।'

সোমঋতা মল্লিক বলেন, '১৯২১ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে মধ্য কলকাতার ৩/৪সি তালতলা লেনের একটি বাড়িতে বসে কাঠ পেন্সিলে কবিতাটি লিখেন তিনি। কবিতা লেখার পরের দিন সকালে প্রথম পড়ে শুনিয়েছিলেন ওই বাড়িতে তার সঙ্গে থাকা বন্ধু কমরেড মুজফফর আহমেদকে। আমরা সেই ঐতিহাসিক বাড়িকে সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছি এই স্মরণীয় দিনকে উপলক্ষ্য করে।'

'মানবমুক্তির মহান সাধক নজরুল নারীশক্তিরও বিকাশ কামনা করেছেন। নারীর সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধিতে নজরুলের কাব্যিক অবদান অগ্রণী' উল্লেখ করে সোমঋতা বলেন, 'নজরুলের নারী শিরোনামের কবিতাটিও যুগান্তকারী সৃষ্টি, যা আজো প্রাসঙ্গিক। নারী কবিতায় নজরুল বলেছেন, সাম্যের গান গাই-/আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই!/বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর/অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর/বিশ্বে যা কিছু এল পাপ তাপ বেদনা অশ্রুবারি,/অর্ধেক তার আনিয়াছে নর অর্ধেক তার নারী/নরক কুন্ড বলিয়া তোমা’ করে নারী হেয় জ্ঞান?/তারে বল, আদি-পাপ নারী নহে, সে যে নর শয়তান।/অথবা পাপ যে-শয়তান যে-নর নহে নারী নহে,/ক্লীব সে, তাই নর ও নারীতে সমান মিশিয়া রহে।/এ বিশ্বে যত ফুটিয়াছে ফুল, ফলিয়াছে যত ফল/নারী দিল তাহে রূপ-রস-সূধা-গন্ধ সুনির্মল।'

সোমঋতা মল্লিক বলেন, মানবসভ্যতার অগ্রগতিতে নারী-পুরুষ উভয়ের অবদান সমান। সভ্যতার অগ্রগতির মূলে রয়েছে নারী ও পুরুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে নারী ও পুরুষের হাত ধরেই পৃথিবী সভ্যতার পথে এগিয়ে চলেছে। সভ্যতার এ অগ্রযাত্রায় মানবজাতির উভয় অংশের অবদানই গুরুত্বপূর্ণ ।

তিনি বলেন, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীরা যুগ যুগ ধরে বঞ্চিত, অবহেলিত ও নির্যাতিত হয়ে আসছে। এ বৈষম্যের অবসান হওয়া প্রয়ােজন। কেননা নারী ও পুরুষ উভয়ই মানুষ, এ দুই সত্তার মাঝে যে কারও অধিকার খর্ব হলে ব্যাহত হবে কাক্ষিত অগ্রগতি। মানুষ তার মেধা আর কায়িক পরিশ্রম দিয়ে তিল তিল করে গড়ে তুলেছে বর্তমান সভ্যতার তিলােত্তমা মূর্তি। এ নির্মাণ অভিযাত্রার নৈপথ্যে রয়েছে নারী ও পুরুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা সভ্যতার বেদীমূলে পুরুষের পরিশ্রমের আর সংগ্রামের চিহ্ন খােদিত হলে তার সাথে স্বমহিমায় উজ্জ্বল হয়ে উঠবে নারীর সেবা আর কর্তব্যনিষ্ঠাও। সভ্যতাকে সাজাতে-গােছাতে পুরুষ দিয়েছে শ্রম। আর তাতে সর্বদা অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে নারী। সব যুগের সব দেশের মানুষের জন্য একথা সত্য। এখানে তাই স্বেচ্ছাচারিতার কোনাে সুযােগ নেই। তা সত্ত্বেও নারীদের অবদানকে অগ্রাহ্য করলে তা সামাজিক ভারসাম্যকে নষ্ট করবে। এমন অবস্থা কখনােই কাম্য হতে পারে না। পৃথিবীর সকল সভ্য সমাজ তাই নারীদের এ বিরাট ভূমিকাকে স্বীকৃতি দিয়েই উন্নয়নের পথে পা বাড়িয়েছে। প্রকৃতপক্ষে নর এবং নারী একে অপরের পরিপূরক। মানবকল্যাণের পথে তাই নারী-পুরুষ উভয়কেই অগ্রসর হতে হবে পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালােবাসার অনুভূতির মধ্য দিয়ে।

শিল্পী সোমঋতা মল্লিক বিশ্বাস করেন, 'পুরুষের শৌর্য-বীর্য আর নারী হৃদয়ের সৌন্দর্য, প্রেম-ভালােবাসার সম্মিলনেই বিশ্বের সকল উন্নতি সাধিত হয়েছে। তাই নারী, পুরুষের পারস্পরিক সহযােগিতার মধ্য দিয়েই কেবল পৃথিবীকে আরও সুন্দর করে গড়ে তােলা সম্ভব। আর এক্ষেত্র চির উন্নত শির নজরুল আমাদের চিরকালীন অবুপ্রেরণার উৎসস্থল।

;

বেগম রোকেয়া: নারী মুক্তির অগ্রপথিক



আমিনুল ইসলাম জুয়েল, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, রংপুর
বেগম রোকেয়া: নারী মুক্তির অগ্রপথিক

বেগম রোকেয়া: নারী মুক্তির অগ্রপথিক

  • Font increase
  • Font Decrease

বৃহস্পতিবার বেগম রোকেয়া দিবস। নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার জন্ম ও মৃত্যুদিন ৯ ডিসেম্বর। ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কুসংস্কারের শৃঙ্খল থেকে নারীকে মুক্ত করার লক্ষ্যে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে যাওয়া এ মহীয়সী নারীকে আজ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে জাতি। এ উপলক্ষে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।

প্রতি বছর বেশ ঘটা করেই এই দিনটিতে বেগম রোকেয়াকে স্মরণ করা হলেও তার জন্মভূমিতে গড়ে ওঠা স্মৃতি কেন্দ্রের কার্যক্রম আজও চালু হয়নি। সেইসঙ্গে বেগম রোকেয়ার পরিবারের বেহাত হয়ে যাওয়া প্রায় সাড়ে ৩শ বিঘা জমি উদ্ধারসহ রোকেয়ার দেহাবশেষ ফিরিয়ে এনে বাস্তুভিটায় সমাহিত করার দাবিও পূরণ হয়নি আজ অবধি।

রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের স্বপ্ন ছিল সমাজে নারী-পুরুষ সমান মর্যাদা আর অধিকার নিয়ে বাঁচবে। সেই স্বপ্নের কথাই তিনি লিখে গেছেন তার গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধগুলোতে। নারীশিক্ষার প্রসারে কাজ করে গেছেন আমৃত্যু। নারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা, তাদের ক্ষমতায়ন, ভোটাধিকারের জন্য লড়াইটা এই বাংলায় রোকেয়াই শুরু করেছিলেন।

১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর রংপুরের পায়রাবন্দে এক জমিদার পরিবারে রোকেয়ার জন্ম হয়। রোকেয়া খাতুন, রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, মিসেস আর এস হোসেন নামেও লিখতেন এবং পরিচিত ছিলেন তিনি। ঊনবিংশ শতকে নারীরা যখন অবরোধবাসিনী, সেই সময়ে নারীর পরাধীনতার বিরুদ্ধে তিনি আওয়াজ তুলেছেন।

বাবা জহির উদ্দিন মুহম্মদ আবুল আলী হায়দার সাবের, মা রাহাতুন্নেছা চৌধুরানী। বেগম রোকেয়ার ছিল দুই ভাই ও দুই বোন।

বড় ভাই ইবরাহিম সাবের ছিলেন একজন প্রগতিশীল মানুষ। অগোচরে মোমের আলোয় বেগম রোকেয়া ও আরেক বোন করিমনুন্নেছাকে বর্ণশিক্ষা দিতেন। আর রোকেয়ার ছিল জানার ও শিক্ষার অদম্য আগ্রহ।

১৮৯৬ সালে ১৬ বছর বয়সে বেগম রোকেয়ার বিয়ে হয় ভাগলপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট খান বাহাদূর সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে। রোকেয়া পেলেন আরেক জন প্রগতিশীল মানুষের সাহচার্য। স্বামী সাখাওয়াত হোসেন বেগম রোকেয়ার লেখাপড়ার প্রতি অকুণ্ঠ আগ্রহ দেখে তাকে সাহায্য করতে লাগলেন বাংলা ও ইংরেজী শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে এবং তার লেখা-লেখিতে সাহায্য করতে লাগলেন।

এই শিক্ষাই তাকে সে সময়ের অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজ, কুসংস্কারাচ্ছন্ন জীবন, শিক্ষাহীন নারী সমাজের মুক্তির কথা। নারীদের অশিক্ষার অন্ধকার থেকে কী করে তাদের টেনে তোলা যায়, সে ভাবনা থাকতো তার মাথায়। আর তাই তো তিনি স্বপ্ন দেখলেন একটি স্কুলের। যেখানে সমাজের পিছিয়ে পড়া নারীরা লেখাপড়া শিখবে। আর তার এ স্বপ্নকে আরও বড় করে তোলেন তার স্বামী সাখাওয়াত হোসেন।

১৯০২ সালে ‘পিপাসা’ নামে একটি বাংলা গল্প লিখে সাহিত্যের জগতে প্রবেশ। আর ১৯০৫ সালে রোকেয়া ইংরেজীতে লিখলেন তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘সুলতানাস ড্রিমস’। সাখাওয়াত হোসেন লেখাটি পড়ে অভিভূত হয়ে পড়েন এবং তাকে উৎসাহ দেন লেখাটি বই আকারে প্রকাশ করার জন্য।

১৯০৮ সালে সুলতানাস ড্রিমস বই আকারে প্রকাশিত হয়। পরবর্তীকালে বইটি বাংলায় ‘সুলতানার স্বপ্ন’ নামে রূপান্তরিত হয়েও প্রকাশিত হয়। এই বইটিকে বিশ্বের নারীবাদি সাহিত্যে একটি মাইল ফলক হিসেবে গণ্য করা হয়। তার অন্যান্য গ্রন্থগুলো হলো ‘অবরোধবাসিনী’, ‘মতিচুর’, ‘পদ্মরাগ’।

বেগম রোকেয়া স্মৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম দুলাল বলেন, বেগম রোকেয়ার জমিগুলো বেদখল হয়ে আছে। কিছু জমিতে তার নামে প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ জমিগুলো উদ্ধারে আদালতে মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

বেগম রোকেয়ার ভাই মসিহুজ্জামান সাবেরের মেয়ে পায়রাবন্দ বেগম রোকেয়া মেমোরিয়াল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষিকা রণজিনা সাবের বলেন, একটি দিনই মাত্র ঘটা করে বেগম রোকেয়াকে স্মরণ করা হয়। বেগম রোকেয়ার প্রকৃত ইতিহাস ও কর্মময় জীবনী নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে স্মৃতি কেন্দ্রের কার্যক্রম চালু করা উচিত।

১৯৩২ সালের এই দিনেই মারা যান তিনি। দিনটি রোকেয়া দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

দিবসটি পালনে রংপুরে নানা কর্মসূচি:

বেগম রোকেয়া দিবসে রংপুরে নানা কর্মসূচির আয়োজন করেছে প্রশাসনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন। তার জন্মস্থান মিঠাপুকুরের পায়রাবন্দে স্বাস্থ্যবিধি মেনে দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়েছে। আজ সকাল ১১টায় বেগম রোকেয়া স্মৃতি স্তম্ভে পুষ্পমাল্য অর্পণ ও দিবসের উদ্বোধন, সাড়ে ১১টায় আলোচনা সভা, সাড়ে ১২টায় নারীর প্রতি সহিংসতা ও বাল্যবিবাহ রোধ সম্পর্কিত সেমিনারে পুরষ্কার ও পদক বিতরণ, দুপুর ১টায় পায়রাবন্দ জামে মসজিদে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল, শেষে বিকেল সাড়ে ৩টায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। তবে এবার রোকেয়া মেলা হচ্ছে না। এ ছাড়া  বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি বেগম রোকেয়া কলেজ, বেগম রোকেয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও রংপুর রোকেয়া ফোরামসহ রংপুরের বিভিন্ন সংগঠন নানা কর্মসূচির আয়োজন করেছে।

;

বর্ণময় জীবনের কর্মময় নয়টি দশক



কনক জ্যোতি, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
রমিলা থাপার

রমিলা থাপার

  • Font increase
  • Font Decrease

একজন আধুনিক, ঋদ্ধ ও মননশীল মানুষের যাবতীয় মহৎ বৃত্তিতে কয়েকদিন আগে তিনি স্পর্শ করেছেন বর্ণময় জীবনের কর্মময় নয়টি দশক। দক্ষিণ এশিয়া উপমহাদেশ তো বটেই, তাবৎ বিশ্বের ইতিহাসচর্চায় এই নারী এক অনন্য উদাহরণ। রমিলা থাপার নামটি উচ্চারণ করলেই অনুভব করা যায় তাঁর অ্যাকাডেমিক উচ্চতা। একদা যিনি দম্ভ ও কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, 'ইতিহাস মূলত কোনো কমিটি গঠনের মাধ্যমে রচিত হয় না। বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ নিজেই তা রচনা করেন।'

১৯৩১ সালের ৩০ নভেম্বর উত্তর ভারতের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শহর লখনৌতে জন্মগ্রহণকারী রমিলা থাপার ৯০ বছরেও সচল আর কর্মপ্রবর্তনার দৃষ্টান্ত। বিশিষ্ট ভারতীয় ইতিহাসবেত্তা এবং দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় এমিরিটাস অধ্যাপক তিনি। তাঁর প্রধান চর্চার বিষয় প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস—প্রকাশিত বেশ কয়েকটি বইয়ের মধ্যে ‘অ্যা হিস্টোরি অফ ইন্ডিয়া’ বহুল আলোচিত—দু’বার ভারত সরকার কর্তৃক পদ্মভূষণে ভূষিত হয়েছেন, কিন্তু দু’বারই তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছেন। এমন সাহসিতার নমুনা বিরল।

রমিলা সেনা বিভাগের চিকিৎসক দয়া রাম থাপারের কন্যা। মায়ের নাম কৌশল্যা। তিনিও ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর চিকিৎসা সেবা বিভাগের মহাপরিচালক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। প্রয়াত সাংবাদিক রমেশ থাপার ছিলেন তাঁর সহোদর ভাই এবং বিশিষ্ট নিউজ প্রেজেন্টার করণ থাপার তাঁর সম্পর্কিত ভাই।

রমিলার ছোটবেলায় তাঁর বাবাকে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের সামরিক কর্মক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করতে হয়েছিল, তাই তিনি ভারতের বিভিন্ন শহরের বিদ্যালয়গুলোতে বিভিন্ন শ্রেণিতে পড়াশোনা করেছেন। পরে তিনি পুনের ওয়াদিয়া কলেজের ইন্টারমিডিয়েট অব আর্টসে পড়েন। পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক হবার পরে, থাপার দ্বিতীয়বার সাম্মানিক স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন ভারতীয় ইতিহাসে। এরপর তিনি ১৯৫৮ সালে স্কুল অফ ওরিয়েন্টাল এবং আফ্রিকান স্টাডিজ, লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এ. এল. বাশামের অধীনে ভারতীয় ইতিহাসে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। বাশাম হলেন সেই ধ্রুপদী ঐতিহাসিক, যিনি 'দ্য ওয়ান্ডার দ্যাট ওয়াজ ইন্ডিয়া' নামের কালজয়ী গ্রন্থ রচনা করেছেন।

রমিলা ১৯৬১ সাল থেকে ১৯৬২ সালের মধ্যে কুরুক্ষেত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসে রীডার ছিলেন এবং ১৯৬৩ থেকে ১৯৭০ সাল অবধি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে এই একই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। পরে, তিনি নতুন দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসের অধ্যাপক হিসাবে কাজ করেছিলেন, যেখানে তিনি অবসরপ্রাপ্ত হওয়ার পর এখন  এমিরিটাস অধ্যাপক।

থাপারের প্রকাশিত প্রধান কাজগুলো হল অশোক এবং মৌর্যসাম্রাজ্যের পতন, প্রাচীন ভারতীয় সামাজিক ইতিহাস: কিছু ব্যাখ্যা, আদি ভারতীয় ইতিহাসের সাম্প্রতিক দৃষ্টিভঙ্গি (সম্পাদক), ভারতের ইতিহাস প্রথম খণ্ড এবং আদি ভারত: আদি থেকে ১৩০০ খ্রিস্টাব্দ। তাঁর প্রথম লেখা, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অশোক এবং মৌর্যসাম্রাজ্যের পতন ১৯৬১ সালে প্রকাশিত হয়। থাপার অশোকের ধম্ম নীতিটি, বিভিন্ন জাতি ও ভিন্ন সংস্কৃতির একটি সাম্রাজ্য একত্র রাখার উদ্দেশ্যে, একটি অসাম্প্রদায়িক নাগরিক নীতি হিসাবে সংস্থাপিত বলে মনে করেছেন। তিনি মনে করেছেন মৌর্য্য সাম্রাজ্যের পতনের জন্য এর কেন্দ্রীয় প্রশাসন দায়ী। এর জন্য ব্যতিক্রমী দক্ষতার শাসকদের ভালভাবে কাজ করার দরকার ছিল।

থাপারের ভারতের ইতিহাস-এর প্রথম খণ্ডটি পাঠকদের জনপ্রিয়তার কথা ভেবে রচিত এবং এটি পূর্ববর্তী ইতিহাস থেকে শুরু করে ষোড়শ শতাব্দীতে ইউরোপীয়দের আগমন পর্যন্ত দেখিয়েছে। তাঁর প্রাচীন ভারতীয় সামাজিক ইতিহাস গ্রন্থটি প্রথম দিকের ইতিহাস থেকে শুরু করে প্রথম সহস্রাব্দের শেষের সময়কাল নিয়ে একটি কাজ, এটিতে হিন্দু ও বৌদ্ধ আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার তুলনামূলক অধ্যয়ন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, এবং বর্ণবাদ পদ্ধতিতে সামাজিক প্রতিবাদ এবং সামাজিক গতিশীলতায় বৌদ্ধধর্মের ভূমিকা পরীক্ষা করেছে। বংশ থেকে রাজ্য বইতে খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দে মধ্য গাঙ্গেয় উপত্যকায় রাজ্য গঠনের বিশ্লেষণ করা হয়েছে, লোহার ব্যবহার এবং কৃষিতে লাঙ্গলের ব্যবহার আসার ফলে যে পরিবর্তন, যাজকবাদী এবং গতিময় বংশ ভিত্তিক সমাজ থেকে শুরু করে বসতি করে কৃষকের জমি নেওয়া, পুঁজিভবন এবং বর্ধিত নগরায়ন এই প্রক্রিয়াগুলির সন্ধান করা হয়েছে।

অতি সম্প্রতি তিনি 'ভারতের পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল' প্রসঙ্গে গ্রন্থ রচনা করেছেন এবং গণতন্ত্র, বহুত্ববাদ, ধর্মনিরপেক্ষতার বিরুদ্ধে উগ্রতার বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। ইতিহাসকে শক্তি ও ক্ষমতার প্রভাব বলয়ের বাইরে বস্তুনিষ্ঠ-নৈর্ব্যক্তিকভাবে বিশ্লেষণের সাহসী পদক্ষেপের অংশ হিসেবে তিনি রাষ্ট্রীয় সম্মাননা, পদক ও পৃষ্ঠপোকতা প্রত্যাখান করে মানুষ, সমাজ ও শিক্ষাঙ্গনে প্রভূত সম্মান লাভ করেছেন। 

;