স্বপ্ন ছুঁয়েছে’ পদ্মার এপার-ওপার

দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম ও একমাত্র মহিলা নওয়াব



মায়াবতী মৃন্ময়ী, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী।

নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী।

  • Font increase
  • Font Decrease

মুঘল আমলের নওয়াবি প্রথা শেষ হয়ে গেলেও বাছাই করা কিছু জমিদারদের নবাব/নওয়াব উপাধি দিত ব্রিটিশ সরকার। হিন্দু জমিদারদের ক্ষেত্রে ছিল মহারাজ, আর মুসলমান জমিদারদের ক্ষেত্রে নওয়াব। এটাই জমিদারির সর্বোচ্চ সম্মান হিসাবে বিবেচিত হত ঔপনিবেশিক শাসনামলে। বাংলাদেশের কুমিল্লার  নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী ছিলেন দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম ও একমাত্র মহিলা নওয়াব ও নারীশিক্ষার পথিকৃৎ। তাঁর আগে বা পরে আর কেউ এমন সম্মানজনক উপাধি লাভ করেন নি। জমিদারি পরিচালনার সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজের অদম্য ইচ্ছায় শিক্ষিত হয়ে শিক্ষা, সমাজকল্যাণ ও সেবাব্রতে যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন তা-ও ইতিহাসে বিরল।

ফয়জুন্নেসা চৌধুরানীকে নওয়াব উপাধি দেওয়া সহজ ছিল না। তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার ও ঔপনিবেশিক ভারতের ক্ষমতা কাঠামো প্রত্যন্ত বাংলার একজন মুসলমান ও একজন নারীকে সম্মানিতা করতে আগ্রহী ছিল না। প্রশ্ন উঠেছিল, একজন মহিলাকে কী করে নওয়াব উপাধি দেওয়া যেতে পারে? শেষে ব্রিটিশ মহারানি ভিক্টোরিয়া ঠিক করলেন, তাঁকে 'বেগম' উপাধি দেওয়া হবে। কিন্তু আত্মসম্মানবোধের কারণে সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেন তিনি। স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, প্রজারা তাঁকে 'বেগম' বলেই ডাকেন। কিন্তু তিনি এমন সম্মান চান, যা একজন পুরুষের সমকক্ষ। মহিলা বলেই পিছিয়ে থাকতে রাজি নন তিনি।

অবশেষে হার মানতে বাধ্য হয় সরকার ও সমাজের কর্তারা। ১৮৮৪ সালে রানি ভিক্টোরিয়া তাঁকে নওয়াব উপাধি দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মানিতা করেন। ইতিহাসে নাম লিপিবদ্ধ করেন তিনি দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম ও একমাত্র মহিলা নওয়াব রূপে।

নওয়াব ফয়জুন্নেসার জন্ম কুমিল্লা জেলার হোমনাবাদ পরগনার (বর্তমানে লাকসামের) অন্তর্গত পশ্চিমগাঁয়ে । তিনি ১৮৩৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন । তাঁর বাবা জমিদার আহমেদ আলী চৌধুরী আর মা আরাফান্নেসা চৌধুরাণী।

ফয়জুন্নেসা বাবার প্রথম কন্যাসন্তান। জমিদার বংশের সন্তান হিসেবে বেশ আরাম-আয়েশের মধ্য দিয়ে তিনি বেড়ে ওঠেন। মুঘল রাজত্বের উত্তরসূরী এই মহীয়সী নারীর ছিল দুই ভাই (এয়াকুব আলী চৌধুরী এবং ইউসুফ আলী চৌধুরী) আর দু’বোন (লতিফুন্নেসা চৌধুরাণী এবং আমিরুন্নেসা চৌধুরাণী)।

ছোটবেলা থেকে লেখাপড়ায় তাঁর প্রচুর আগ্রহ দেখে ফয়জুন্নেসার বাবা মেয়ের জন্য গৃহশিক্ষক নিযুক্ত করেন। তিনি কঠোর নিয়মানুবর্তিতা পালন করে তাঁর জ্ঞানস্পৃহাকে আরও উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর করে তোলেন। গৃহশিক্ষকের সাহায্যে ফয়জুন্নেসা খুব দ্রুতই কয়েকটি ভাষার উপর গভীর জ্ঞান অর্জন করতে সক্ষম হন। বাংলা, আরবি, ফার্সি ও সংস্কৃত এ চারটি ভাষায় ব্যুৎপত্তি লাভ সহ ফয়জুন্নেসার এ প্রতিভা স্ফুরণে তাঁর শিক্ষক তাজউদ্দিনের অবদান অতুলনীয়।

সে সময়ের আরেক জমিদার সৈয়দ মোহাম্মদ গাজীর সাথে ১৮৬০ সালে তাঁর বিয়ে হয়। তিনি ছিলেন মোহাম্মদ গাজীর দ্বিতীয় স্ত্রী। তাঁর দাম্পত্য জীবন খুব একটা সুখের হয়নি। এক পর্যায়ে তাঁদের বিচ্ছেদ ঘটে। স্বামী বিচ্ছেদের পর তিনি সমাজ সংস্কার ও গঠনমূলক কাজে আত্মনিয়োগ করেন। কথিত আছে, নওয়াব ফয়জুন্নেসা ১৮৭১ সালে বিয়ের সতের বছর পর জানতে পারেন তাঁর স্বামীর আরেকটি স্ত্রী আছে। তাই সতীন থেকে পৃথক থাকার জন্য তিনি তাঁর বিয়ের কাবিনের এক লক্ষ এক টাকা দিয়ে পশ্চিমগাও-এ সাড়ে তিন একর জমিতে একটা বাড়ি করেন। এটি নির্মাণ করতে তিন বছর সময় লেগেছিল।

শিক্ষার পাশাপাশি তিনি জমিদারি পরিচালনার প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। বুদ্ধির দীপ্ততা, বিচক্ষণতা আর কর্মদক্ষতায় অনেক বেশি এগিয়ে ছিলেন তিনি। ফলে ১৮৭৩ সালে পিতার মৃত্যুর পর তিনি পশ্চিমগাঁও-এর জমিদারি লাভ করেন এবং ১৮৮৫ সালে মায়ের মৃত্যুর পর তিনি মাতুল সম্পত্তিরও উত্তরাধিকারী হয়ে সুদক্ষতার সঙ্গে সেসব পরিচালনা করেন।

কুমিল্লার হোমনাবাদ পরগনার জমিদার নবাব ফয়জুন্নেসা চিন্তা কাজ কর্মে ছিলেন সে সময়ের চেয়ে অনেক বেশি আধুনিক। সেকালের সমাজ ব্যবস্থার সবরকম বাঁধা পেরিয়ে তিনি সম্পূর্ণ কুসংস্কার মুক্ত সমাজ গঠনে মনোযোগ দিয়েছিলেন। একজন নারী হয়েও সে সময়ে জমিদারির কঠোর দায়িত্ব তিনি সফলভাবে পালন করতে পেরেছেন। তিনি নির্ভীকভাবে শাসনকাজ পরিচালনা করেন। তিনি জীবনের শেষ প্রান্তে ওয়ারিশদের প্রাপ্য অংশ বুঝিয়ে দেন আর নিজ জমিদারিটি পরিণত করেন 'ওয়াকফ' সম্পত্তি হিসেবে।

দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম মহিলা নওয়াব ফয়জুন্নেসা সমাজ সংস্কারের অংশ হিসেবে মেয়েদের শিক্ষার প্রতি জোর প্রচেষ্টা করেন। ১৮৭৩ সালে ('বেগম রোকেয়া'র জন্মের সাত বছর পূর্বেই) নারী শিক্ষা প্রসারের লক্ষ্যে তিনি মেয়েদের জন্য কুমিল্লায় একটি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। উপমহাদেশের বেসরকারিভাবে প্রতিষ্ঠিত মেয়েদের প্রাচীন স্কুলগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। দেশে বিদেশে শিক্ষার প্রচারে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। নওয়াব ফয়জুন্নেসা (পশ্চিমগাঁয়ে) একটি অবৈতনিক মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। মাদ্রাসার ছাত্রদের অন্য একটি ছাত্রাবাসও ছিল। মাদ্রাসার ভালো ফলাফলে উৎসাহিত হয়ে পরবর্তিকালে ফয়জুন্নেসার বংশধরগণ ১৯৪৩ সালে এটিকে উচ্চ মাধ্যমিক ইসলামিক কলেজে রূপান্তরিত করেন। ১৯৬৫ সালে কলেজটি একটি ডিগ্রি কলেজে রূপান্তরিত হয়ে নওয়াব ফয়জুন্নেসা ডিগ্রি কলেজ নামে আখ্যায়িত হয়। ১৯৮২ সালে কলেজটির সরকারিকরণ হয় এবং নাম হয় নওয়াব ফয়জুন্নেছা সরকারি কলেজ। তাছাড়া তাঁর কন্যা বদরুন্নেসা পশ্চিমগাঁওয়ে নওয়াব ফয়জুন্নেছা সরকারি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন।

মেয়েদেরকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার জন্য তিনি সব সময় উৎসাহিত করতেন। তিনি মেয়েদের জন্য হোস্টেলের ব্যবস্থা করেছিলেন। তাঁর জমিদারির আয় থেকে মেয়েদের জন্য নির্মিত এ হোস্টেলের সব খরচ বহন করা হতো। মেয়েদের জন্য মাসিক বৃত্তির ব্যবস্থাও তিনি করেছিলেন। তিনি পবিত্র মক্কা শরিফে 'মাদ্রাসা-ই-সওলাতিয়া ও ফোরকানিয়া' সহ বিভিন্ন শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠানে প্রচুর পরিমানে সহায়তা করেন। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে তিনি সমস্ত নারীর জন্যই চিন্তা ও কাজ করে গেছেন। জেলার উন্নয়নে কুমিল্লার তদানীন্তন প্রশাসক ডগলাস জমিদারদের কাছে ঋণ চাইলে তিনি তোড়াভরতি টাকা দান হিসাবে প্রেরণ করেন।

শিক্ষা বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে তিনি মেয়েদের স্বাস্থ্য রক্ষা ও সুচিকিৎসারও ব্যবস্থা করেন। ১৮৯৩ সালে কুমিল্লা শহরে প্রতিষ্ঠা করেন 'ফয়জুন্নেসা জানানা হাসপাতাল'। ১৮৯৩ সালে নওয়াব বাড়ির কাছেই তিনি মেয়েদের জন্য একটি স্বতন্ত্র হাসপাতাল নির্মাণ করেছিলেন। তিনি ১৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, অনেকগুলো দাতব্য প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, এতিমখানা এবং সড়ক নিমার্ণ করে তাঁর মানবতাবাদী ও সমাজ সংস্কারের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তিনি নওয়াব বাড়ীর সদর দরজায় একটি দশ গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৯৪ সালে পবিত্র হজ্ব পালন করার সময় তিনি মক্কায় হাজীদের জন্য একটি 'মুসাফিরখানা'ও প্রতিষ্ঠা করেন। নওয়াব ফয়জুন্নেসা সরকারি-বেসরকারি জনহিতকর কাজেও প্রচুর অর্থ দান করতেন।

রবীন্দ্রযুগে যে কয়জন বাংলা সাহিত্য সাধনা করে যশ ও খ্যাতি অর্জন করেন, নবাব ফয়জুন্নেসা তাঁদের মধ্যে অন্যতম। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সাহিত্যিক হিসেবে নবাব ফয়জুন্নেসার নাম চিরস্মরণীয়। কলকাতার ঠাকুরবাড়ির 'সখী সমিতি'র সদস্যা ছিলেন তিনি। তিনি প্রথম মুসলিম গদ্য-পদ্যে লেখিকা ছিলেন। ১৮৭৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ঢাকা গিরিশচন্দ্র মুদ্রণ যন্ত্র থেকে শ্রীমতি নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরাণী রচিত সাহিত্য গ্রন্থ ‘রূপজালাল' প্রকাশিত হয়।

ব্রিটিশ অপশাসনের ফলে মুসলিম সমাজে কুসংস্কারের বেড়াজালে অবরোধবাসিনী হয়েও ফয়জুন্নেসা সাহিত্য সাধনার মাধ্যমে একটি গৌরবময় স্থান অধিকার করে আছেন। রূপজালাল ব্যতীত ফয়জুন্নেসা কর্তৃক দু'খানি গ্রন্থের নাম পাওয়া যায়-'সঙ্গীত লহরী' ও 'সঙ্গীত সার', এখন দুষ্প্রাপ্য। শুধু তাই নয়, মৃত্যুর আগে তিনি তার সমস্ত ভূসম্পত্তি জাতির সেবায় দিয়ে যান।

২০০৪ সালে ফয়জুন্নেসা চৌধুরানীকে মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করা হয়। তাঁর নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছাত্রী নিবাসের নামকরণ করা হয়। তাঁর প্রতিষ্ঠিত অসংখ্য প্রতিষ্ঠান ও জনহিতকর প্রচেষ্টা এখনও দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম ও একমাত্র মহিলা নওয়াবের স্মৃতি বহন করছে। ১৯০৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর এ মহীয়সীর জীবনাবসান ঘটে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত দশগম্বুজ মসজিদের পাশে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

আমাদের সবার আগে ভালো মানুষ হয়ে উঠতে হবে: সাই পল্লবী



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
দক্ষিণী নায়িকা সাই পল্লবী

দক্ষিণী নায়িকা সাই পল্লবী

  • Font increase
  • Font Decrease

তাবৎ ভারতীয় চলচ্চিত্রে বিস্ময় বলা হয় দক্ষিণী নায়িকা সাই পল্লবীকে। যৌন উত্তেজনা, উগ্র পোষাক, শরীরের প্রদর্শনী, এমনকি, মেকআপ পরিহার করে শুধুমাত্র অভিনয়শৈলীতে একনম্বরে চলে আসার সাফল্য পল্লবী ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার খুব কম নায়িকারই আছে। শনিবার (১৮ জুন) প্রথমবারের মতো ফেসবুক লাইভে এসে তিনি পুনরুল্লেখ করেন, 'আমাদের সবার আগে এক ভালো মানুষ হয়ে উঠতে হবে। আমরা যদি ভালো হই, তাহলে অন্যকে আঘাত করব না।’

কিছুদিন আগে এক সাক্ষাতকারে মানবতা ও অসাম্প্রদায়িকতার পক্ষে এবং ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও সহিংসার বিরুদ্ধে কথা বলা সাই পল্লবী ইংরেজিতে দেওয়া পাঁচ মিনিটের ফেসবুক লাইভে নিজের নিরপেক্ষ ও মানবিক অবস্থান আবারও স্পষ্ট করেন। ভারতে সাম্প্রদায়িক অসহিষ্ণুতা ও ধর্মীয় উগ্রতার পটভূমিতে অনেকেই যখন মুখ খুলতে সাহসী হননি, তখন মানুষ ও মানবতার পক্ষে সাই পল্লবীর দ্বিধাহীন বক্তব্য দৃষ্টান্তমূলক। মানবতাবাদী-বিবেকবান মানুষের শ্রদ্ধা অর্জন করলেও তার কথা ধর্মীয় উগ্রশক্তিকে নাখোশ করে। ফলে তিনি ফেসবুকে এসে নিজের মানবিক মতের পক্ষে আরও জোরালোভাবে অবস্থান নেন এবং মানবতাবিরোধী অপশক্তির সমালোচনার জবাব দেন।

সাই পল্লবী বিবেক অগ্নিহোত্রীর ‘কাশ্মীর ফাইলস’ ছবিকে ঘিরে তার প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, ‘কাশ্মীর ফাইলস ছবিতে দেখানো হয়েছে, কাশ্মীরি পণ্ডিতদের কীভাবে মারা হয়েছে। আপনি যদি এ ঘটনাকে ধার্মিক সংঘর্ষ হিসেবে নেন, তাহলে কিছুদিন আগেই এক মুসলিম চালককে গরু নিয়ে যাওয়ার অপরাধে মারধর করা হয়। আর তাকে দিয়ে জোর করে “জয় শ্রীরাম” বলানো হয়। এ দুই ঘটনার মধ্যে পার্থক্য কোথায়?' তিনি বলেন, 'পেশাগত জীবনে একজন চিকিৎসক হিসাবে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, প্রতিটি মানুষের জীবনই মূল্যবান। মত ও পথের ভিন্নতার কারণে কাউকেই নিধন করা যায় না।'

সাই পল্লবী তার রাজনৈতিক মতাদর্শ স্পষ্ট করতে গিয়ে বলেন, ‘আমি এক নিরপেক্ষ পরিবারের মধ্যে বড় হয়েছি। আমাকে এখানে সব সময় এক ভালো মানুষ হওয়ার কথা বলা হয়েছে। আমাকে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে যে আমি সেসব মানুষকে যেন রক্ষা করি, যারা অসহায় আর কোনও বিপদের মধ্যে আছে। উৎপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা আমায় দেওয়া হয়েছে। আর এ ক্ষেত্রে সে কত বড় বা ছোট মাপের মানুষ, বা কোন মতের মানুষ, তা যেন না দেখি।'

'বামপন্থী আর ডানপন্থীর বিষয়ে শুনেছি আমি। আমি নিশ্চিত যে আমি কোনও পন্থী নই। আমি নিরপেক্ষ এবং মানুষের পক্ষে', স্পষ্টভাষায় ঘোষণা করেন সাই পল্লবী।

সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে ধর্মীয় উগ্রতাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে সংখ্যালঘুদের হত্যা, নির্যাতন ও নিপীড়নের পটভূমিতে সাই পল্লবীর বক্তব্য ভারতের চিরায়ত গণতান্ত্রিক-ধর্মনিরপেক্ষ-অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্যের প্রতি সমর্থনের ধ্বনিই উচ্চারণ করেছে, যে শাশ্বত মতাদর্শ উগ্রশক্তির কবলে প্রায়ই বিপন্ন হয়ে চলেছে।

একজন চিকিৎসক, উচ্চশিক্ষিত, ধ্রুপদী সঙ্গীতশিল্পী ও নৃত্যে পারদর্শী সাই পল্লবী, একনম্বর তেলেগু অভিনেত্রী হয়েও পুরো দক্ষিণ ভারত এবং সমগ্র ভারতীয় চলচ্চিত্রের সম্মানজনক ও জনপ্রিয় অগ্রণী নায়িকা। যিনি প্রেমাম, কালি, ফিদা, আথিরান এবং এমসিএ-মিডল ক্লাস আববায়ির মতো ব্লকবাস্টারে অভিনয় করেছেন।

ইউটিউব চ্যানেল 'গ্রেট অন্ধ্র'র সাথে অতি সাম্প্রতিক একটি সাক্ষাৎকারের সময়, অভিনেত্রী তার মন্তব্যে বেশ সৎ ছিলেন এবং তিনি ধর্মীয় বিদ্বেষ নিয়ে হিন্দু-মুসলিম বিভাজনের বিরোধিতা করেছিলেন। ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে তার মন্তব্য ছিল স্পষ্ট। তিনি হিন্দুদের কাশ্মীর গণহত্যা মতোই ধর্মের নামে একজন মুসলিম ব্যক্তিকে হত্যার বিরুদ্ধে কথা বলেন। তিনি উভয় ধর্মীয় অসহিষ্ণু মনোভাবের নিন্দা করছিলেন এবং বলেছিলেন, 'যেখানে লোকেরা কোনও আপাত কারণ ছাড়াই ঘৃণার অনুভূতি রাখে এবং ধর্মীয় লাইনে একে অপরকে আঘাত করে, যা তার দৃষ্টিকোণ থেকে অগ্রহণযোগ্য।'

তেলুগুতে তার আসন্ন ছবি "বিরাতা পার্ভম" এর প্রচারের সময় এই মন্তব্যগুলো করেন পল্লবী। তিনি স্পষ্টই বলেন যে, একটি নিরপেক্ষ পরিবারে বড় হয়ে ও উদার শিক্ষাব্যবস্থা অনুসরণ করে তিনি একজন ভাল মানুষ হওয়ার শিক্ষাই লাভ করেছেন। শৈশবে, তাকে ধর্মীয় পটভূমি নির্বিশেষে সামাজিকভাবে নিপীড়িত লোকদের রক্ষা করতে শেখানো হয়েছিল। তিনি এই বার্তাটি ভারতের জনগণ এবং তার ভক্তদের কাছে পৌঁছে দিয়ে চান।

সাই পল্লবীর মন্তব্যর পর নেট দুনিয়ায় উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তি ও ধর্মীয় অসহিষ্ণুরা বিরূপ হয়ে রীতিমতো ঝড় তুলে। তবে, তার পক্ষেও প্রশংসনীয় মন্তব্য করছেন নেটিজেনরা। এমন পটভূমিতে প্রথমবারের মতো লাইভে এসে সাই পল্লবী দৃঢ়তার সঙ্গে নিজের গণতান্ত্রিক-ধর্মনিরপেক্ষ-অসাম্প্রদায়িক-মানবিক মতাদর্শিক অবস্থান সাহসিকতার সঙ্গে পুনরুল্লেখ করেন।

নিজের স্বচ্ছ অবস্থানের মতোই সাই পল্লবী স্বচ্ছতার ভিত্তিতে বেছে বেছে খুবই কম ছবিতে অভিনয় করেন। কাহিনীর গভীরতা ও বিষয়বস্তুকে প্রাধান্য দিয়ে অভিনয়ের শতভাগ সততা প্রদর্শনের কারণে তিনি অনেক পরিচালক-প্রযোজকের কোটি কোটি টাকার ছবি অবলীলায় ফিরিয়ে দেন। বলিউড তথা ভারতীয় ছবির অবক্ষয় ও বিকৃতির বিরুদ্ধে হিম্মতের সাথে দাঁড়ানো অন্যতম শিল্পী সাই পল্লবী তিরিশ বছর ছোঁয়ার আগেই স্পর্শ করেছেন নিজের সম্মানীত অবস্থান। তার অভিনয় কৃতিত্ব, দৃষ্টিভঙ্গির শুদ্ধতা ও নান্দনিক পরিচ্ছন্নতার কারণে তাকে স্থান দেওয়া হয় অনন্য অভিনেত্রী শাবানা আজমি, স্মিতা পাতিল, কিরণ খেরের পাশে।

সাই পল্লবী এখন ব্যস্ত তার আগামী রোমান্টিক অ্যাকশন-পলিটিক্যাল-ড্রামাভিত্তিক দক্ষিণ ভারতীয় ছবি ‘বিরাট পর্ভম’-এর মুক্তিকে ঘিরে। এ ছবিতে নায়ক রানা দাজ্ঞুবতির সঙ্গে তাকে চ্যালেঞ্জিং অভিনয় করতে দেখা যাবে। রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় এক তরুণীর প্রেমকথা নিয়ে এ ছবির গল্প বোনা হয়েছে। তরুণীটি যে কারণে বিপজ্জনক নকশাল নেতা রাবণকে ভালোবেসে ফেলে। পল্লবী তার অতীতের ছবিগুলোর মতো এতেও অভিনয়ের সংবেদনশীল স্পর্শকাতরতায় সাফল্যের শিখরস্পর্শী অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হবেন বলে ছবি মুক্তির আগেই প্রিভিউ দেখে বোদ্ধা-সমালোচকরা বলতে শুরু করেছেন। তার এই ছবির ট্রেলার মুক্তি পেতেই কয়েক মিলিয়ন ভিউ পেয়ে গেছে। ভারতের সিভিল সমাজ ও মূলধারার মিডিয়া মনে করছে, পল্লবীর নিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ ও মানবিক অবস্থান নিয়ে ধর্মীয়ভাবে অসহিষ্ণু-উগ্রপন্থীদের বিতর্ক তৈরির অপচেষ্টাকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ প্রদর্শন করেছে সাধারণ মানুষ।

;

বাজেটে নারী উন্নয়নে বরাদ্দ বেড়েছে ৩০ হাজার ৮৯৭ কোটি টাকা

  বাজেট অর্থবছর ২০২২-২৩



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
বাজেটে নারী উন্নয়নে বরাদ্দ বেড়েছে ৩০ হাজার ৮৯৭ কোটি টাকা

বাজেটে নারী উন্নয়নে বরাদ্দ বেড়েছে ৩০ হাজার ৮৯৭ কোটি টাকা

  • Font increase
  • Font Decrease

২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে নারী উন্নয়নে ২ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকার জেন্ডার বাজেট পেশ করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল আজ সংসদে বাজেট বক্তৃতায় এ প্রস্তাব করেন। এই বরাদ্দ গত অর্থবছরের তুলনায় ৩০ হাজার ৮৯৭ কোটি টাকা বেশি।

বৃহস্পতিবার (৯ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট অধিবেশনে ২৭টি মন্ত্রণালয় ও ১৭ টি বিভাগের জন্য পৃথক জেন্ডার বাজেট উপস্থাপন করেন। বাজেট বক্তৃতায় মন্ত্রী বলেন, নারী উন্নয়নে ক্রমাগত বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি নারী সমঅধিকার ও কল্যাণ সুনিশ্চিতকরণে বর্তমান সরকারের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন এবং সদিচ্ছা প্রতিফলিত হয়েছে।

“কোভিডের অভিঘাত পেরিয়ে উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় প্রত্যাবর্তন” শীর্ষক এ বাজেটে দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে গুরুত্ব দিয়ে ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য মোট ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৮ কোটি টাকার বাজেট পেশ করা হয়। এটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের ৫১তম বাজেট এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের ২৩তম বাজেট।

আহম মুস্তফা কামাল বাজেট বক্তৃতায় বলেন, ২০২২-২৩ অর্থবছরের মোট  বাজেটে জেন্ডার সম্পৃক্ত বাজেটের শতকরা হার ৩৩.৮৪। যা জিডিপি’র ৫.১৬ শতাংশ।  

জেন্ডার বাজেটকে তিনটি থিমেটিক এরিয়ায় ভাগ করে বাজেট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এতে দেখানো হয়েছে যে, ‘সরকারি সেবা প্রাপ্তিতে নারীর সুযোগ বৃদ্ধি’ খাতে সর্বোচ্চ ৫২ শতাংশ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এর পরেই গুরুত্ব দেয়া হয়েছে ‘নারীর ক্ষমতায়ন ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি’ খাত। এ খাতে নারী উন্নয়ন খাতের ৪১ শতাংশ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ‘উৎপাদন, শ্রমবাজার ও আয়বর্ধক কাজে নারীর অধিকতর অংশগ্রহণ’ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৭ শতাংশ।   

নারীর ক্ষমতায়ন ও  সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ছয়টি মন্ত্রণালয় ও ছয়টি বিভাগের জন্য বাজেট প্রস্তাব করা হয়। এগুলো হলো, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ, খাদ্য মন্ত্রণালয়, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ ও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ।

দ্বিতীয় অংশে উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শ্রমবাজার ও আয়বর্ধক কাজে নারীর অধিকতর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নয়টি মন্ত্রণালয় ও দুইটি বিভাগের জন্য বাজেট প্রস্তাব করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়,আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়,  শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় , যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় , বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ,  পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় , দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা  ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়। 

জেন্ডার বাজেটের তৃতীয় অংশে সরকারি সেবা প্রাপ্তিতে নারীর সুযোগ বৃদ্ধির ওপর জোর দেয়া হয়। এতে ১২ টি মন্ত্রণালয় ও ৯ টি বিভাগের জন্য জেন্ডার বাজেটের প্রস্তাব করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে প্রধামন্ত্রীর কার্যালয়, নির্বাচন কমিশন, আইন ও বিচার বিভাগ,  জননিরাপত্তা বিভাগ, সুরক্ষা সেবা বিভাগ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, গৃহায়ন ও গণপুর্ত মন্ত্রণালয় , তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় , সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় , সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়,  জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, ভূমি মন্ত্রণালয়, রেলপথ মন্ত্রণালয়, নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ, বিদ্যুৎ বিভাগ এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়।

সদ্য প্রয়াত সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ২০০৯-১০ অর্থবছরে প্রথমবারের মত ৪টি মন্ত্রণালয়ের জন্য জেন্ডার বাজেট প্রস্তাব করেন। ঐ বছর নারী উন্নয়নে বরাদ্দ ছিলো ২৭ হাজার ২৪৮ কোটি  টাকা। পরবর্তীতে ২০১০-১১ অর্থবছরে জেন্ডার বাজেটে ১০ টি মন্ত্রণালয়ের জন্য ৩৪ হাজার ২২১ কোটি টাকা, ২০১১-১২ অর্থবছরে ২০ টি মন্ত্রণালয়ে  ৪২হাজার ১’শ ৫৪ কোটি টাকা, এবং ২০১২-১৩ অর্থবছরে ২৫ টি মন্ত্রণালয়ে ৫৪ হাজার ৩’শ ২  কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৪০টি মন্ত্রণালয়কে অন্তুর্ভুক্ত করে জেন্ডার বাজেট প্রণয়ন করা হয়। এরপর ২০১৭-১৮ এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছরে জেন্ডার বাজেটে মোট ৪৩ টি মন্ত্রণালয়/বিভাগের জন্য জেন্ডার বাজেট প্রণয়ন করেন। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল তারই ধারাবাহিকতা রক্ষা করে ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য একাদশ বারের মতো জেন্ডার বাজেট উপস্থাপন করেন। অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল আজ ২০২২-২৩ অর্থবছরে মোট ৪৪টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের জন্য চতুর্দশতম জেন্ডার বাজেট পেশ করেন।

;

'আমি এক বয়সী কন্যাশিশু': গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক



কনক জ্যোতি, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক। সংগৃহীত

গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক। সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

৮০তম জন্মদিন ছুঁয়ে সাহিত্য সমালোচক, তাত্ত্বিক এবং যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক (জন্ম: ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৪২) বলেছিলেন, 'আমি এক বয়সী কন্যাশিশু' ('I’m a happy old girl’)। কর্মে, সৃজনে, বক্তব্যে, চিন্তায় আসলেই তিনি তাই। চঞ্চল শিশুর মতো সদাসক্রিয়।

বাংলা থেকে যারা বৈশ্বিক বিদ্যামণ্ডলে স্থান করে নিয়েছেন, তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক। পূর্ববঙ্গের বৃহত্তর ময়মনসিংহ পিতৃভূমি হলেও তার জন্ম ও প্রাথমিক বিকাশ পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায়।

১৯৪২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশশাসিত ভারতের অখণ্ড বঙ্গদেশের রাজধানী কলকাতায় চিকিৎসক ডা. পরেশ চন্দ্র এবং শিবানী চক্রবর্তীর কন্যা হিসাবে জন্মগ্রহণ করেন গায়ত্রী চক্রবর্তী। ১৯৫৯ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজিতে প্রথম শ্রেণিতে সম্মানসহ স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ইংরেজি ও বাংলা সাহিত্যে স্বর্ণপদক অর্জন করেন।

তারপরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল ইউনিভার্সিটিতে লেখাপড়া করেন এবং সেখানে তিনি ইংরেজিতে এমএ এবং তুলনামূলক সাহিত্যে পিএইচডি করেন। ১৯৬০ সালে জনৈক ট্যালবট স্পিভাকের সঙ্গে তিনি সীমিত সময়ের জন্য বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন।

তার উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে উত্তর উপনিবেশবাদের সূচনাকারী লেখা “Can the Subaltern Speak?” এবং জাক দেরিদার “De la grammatologie” বইটিকে মূল ফরাসি থেকে ইংরেজি অনুবাদ করা, যেটির ইংরেজি নাম “On Grammatology”; তিনি তার একটি নিবন্ধে এর বাংলা নামকরণ করেছেন “লিপিতত্ত্বপ্রসঙ্গ”।

গায়ত্রী স্পিভাক নিজেকে বাস্তববাদী মার্ক্সীয়–নারীবাদী অবিনির্মাণিক হিসেবে পরিচিত করেন। উত্তরাধুনিক ও উত্তর উপনিবেশবাদের তাত্ত্বিক ধারণা নির্মাণে তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাসকে সাবঅল্টার্ন বা নিম্নবর্গের প্রেক্ষিত থেকে আলোচনার ক্ষেত্রেও তিনি তৎপর রয়েছেন।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, অশীতিপর বয়সেও তিনি শারীরিক ও মানসিক পরিসরে এতোটাই কার্যকর যে, তা বিস্ময়কর। এখনও তিনি গবেষণায়, শ্রেণিকক্ষে তৎপর। আলোচনা ও বক্তৃতায় সাবলীল ও উৎসাহী। দেশে-বিদেশে বিদ্যাচর্চায় বিরামহীন ও অদম্য। জুন মাসের শেষে তিনি কলকাতার দক্ষিণে ডায়মন্ড হারবার কলেজে আসছেন 'বেগম রোকেয়া স্মারক বক্তৃতা' দিতে।

;

নজরুলের ফজিলাতুন্নেসা



কনক জ্যোতি, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
নজরুল ও ফজিলতুন্নেসা। সংগৃহীত

নজরুল ও ফজিলতুন্নেসা। সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

ফজিলাতুন্নেসাকে ‘সঞ্চিতা’ উৎসর্গ করতে চেয়ে নজরুল লিখেছিলেন – ‘'আপনি বাংলার মুসলিম নারীদের রাণী, আপনার অসামান্য প্রতিভার উদ্দেশ্যে সামান্য কবির অপার শ্রদ্ধার নিদর্শন স্বরূপ ‘সঞ্চিতা’ আপনার নামে উৎসর্গ করিয়া ধন্য হইতে চাই। আশা করি এজন্য আপনার আর সম্মতি পত্র লইতে হইবে না। আমি ক্ষুদ্র কবি, আমার জীবনের সঞ্চিত শ্রেষ্ঠ ফুলগুলি দিয়া পুষ্পাঞ্জলী অর্পণ করা ব্যতীত আপনার প্রতিভার অন্য কী সম্মান করিব?’'

সেই নারী, ফজিলাতুন্নেসা নজরুলের এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। আহত নজরুল পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথকে উৎসর্গ করেন ‘সঞ্চিতা’।

অবশ্য সেই সংকলনে রয়েছে একটি গান, যেটি ফজিলাতুন্নেসার বিলেত যাওয়ার আগে, বিদায়-সংবর্ধনার উপলক্ষে লেখা।

ফজিলাতুন্নেসা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্কের ছাত্রী। তিনিই মুসলিম বাঙালি নারীদের মধ্যে প্রথম এমএ ডিগ্রিধারী। ফলে, পড়াশোনায় তাঁর অর্জন নিয়ে সন্দেহ থাকতে পারে না। মাস্টার্সের শেষে উচ্চশিক্ষার জন্য ইংল্যান্ডে যাত্রা করেন তিনি। সেখানেই তাঁর সঙ্গে প্রেম হয় খুলনার এক যুবকের সঙ্গে। দেশে ফিরে, বিয়ে করেন তাঁরা।

ফজিলাতুন্নেসার প্রতি নজরুলের এই যে অনুরাগ, বলা ভালো, প্রেম – তা কি একপাক্ষিক ছিল? নজরুল-গবেষকরা একবাক্যে জানিয়েছেন হ্যাঁ। ফজিলাতুন্নেসার পক্ষ থেকে কোনো প্রশ্রয় বা আকর্ষণই ছিল না নজরুলের প্রতি। কারণ ফজিলাতুন্নেসা তখন মেধাবী এক ছাত্রী, উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ তাঁর সামনে। আর নজরুল বিবাহিত, স্ত্রী-পুত্র নিয়ে রয়েছে ভরাট সংসার। নজরুলের প্রেমকে প্রশ্রয় নিয়ে নিজের ভবিষ্যতকে অনিশ্চিত করতে চাননি ফজিলাতুন্নেসা।

ফজিলাতুন্নেসার প্রতি নজরুলের মনোভাবের কথা একমাত্র জানতেন কাজী মোতাহার হোসেন, যিনি ছিলেন নজরুলের বন্ধু এবং ফজিলতুন্নেসার অধ্যাপক। এই মোতাহারের সৌজন্যেই ঢাকায় প্রথম আলাপ নজরুল-ফজিলাতুন্নেসার। এরপর, একের পর এক চিঠিতে মোতাহারের কাছে নিজের অনুভব জানিয়েছেন নজরুল। প্রত্যাখ্যাত প্রেমিকের ব্যথা জড়িয়ে আছে সেই চিঠিগুলোর ছত্রে ছত্রে।

পরবর্তীকালে কাজী মোতাহার হোসেন লিখেছেন – '‘ফজিলাতের প্রতি নজরুলের অনুভূতির তীব্রতা দু’তিন বছরের সময়সীমায় নিঃশেষিত হয়ে যায়।’'

কিন্তু সেই সময় ফজিলাতুন্নেসাকে লেখা নজরুলের চিঠি পড়লে, বোঝা যায়, তীব্রতা ছিল কতখানি গভীর। কবি লিখছেন –"আপনার অন্ততঃ কুশল সংবাদটুকু মাঝে মাঝে জানিতে বড্ডো ইচ্ছা করি। যদি দয়া করিয়া দুটি কথায় – শুধু কেমন আছেন লিখিয়া জানান – তাহা হইলে আমি আপনার নিকট চির ঋণী থাকিব। আমার ইহা বিনা অধিকারের দাবী।’'

প্রেম, সফল বা ব্যর্থ হলেও প্রেমই। আর কবির প্রেম দুর্দমনীয়,  লেলিহান। নজরুল তার জ্বলন্ত প্রমাণ।

;