বেগম রোকেয়া: নারী মুক্তির অগ্রপথিক



আমিনুল ইসলাম জুয়েল, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, রংপুর
বেগম রোকেয়া: নারী মুক্তির অগ্রপথিক

বেগম রোকেয়া: নারী মুক্তির অগ্রপথিক

  • Font increase
  • Font Decrease

বৃহস্পতিবার বেগম রোকেয়া দিবস। নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার জন্ম ও মৃত্যুদিন ৯ ডিসেম্বর। ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কুসংস্কারের শৃঙ্খল থেকে নারীকে মুক্ত করার লক্ষ্যে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে যাওয়া এ মহীয়সী নারীকে আজ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে জাতি। এ উপলক্ষে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।

প্রতি বছর বেশ ঘটা করেই এই দিনটিতে বেগম রোকেয়াকে স্মরণ করা হলেও তার জন্মভূমিতে গড়ে ওঠা স্মৃতি কেন্দ্রের কার্যক্রম আজও চালু হয়নি। সেইসঙ্গে বেগম রোকেয়ার পরিবারের বেহাত হয়ে যাওয়া প্রায় সাড়ে ৩শ বিঘা জমি উদ্ধারসহ রোকেয়ার দেহাবশেষ ফিরিয়ে এনে বাস্তুভিটায় সমাহিত করার দাবিও পূরণ হয়নি আজ অবধি।

রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের স্বপ্ন ছিল সমাজে নারী-পুরুষ সমান মর্যাদা আর অধিকার নিয়ে বাঁচবে। সেই স্বপ্নের কথাই তিনি লিখে গেছেন তার গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধগুলোতে। নারীশিক্ষার প্রসারে কাজ করে গেছেন আমৃত্যু। নারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা, তাদের ক্ষমতায়ন, ভোটাধিকারের জন্য লড়াইটা এই বাংলায় রোকেয়াই শুরু করেছিলেন।

১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর রংপুরের পায়রাবন্দে এক জমিদার পরিবারে রোকেয়ার জন্ম হয়। রোকেয়া খাতুন, রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, মিসেস আর এস হোসেন নামেও লিখতেন এবং পরিচিত ছিলেন তিনি। ঊনবিংশ শতকে নারীরা যখন অবরোধবাসিনী, সেই সময়ে নারীর পরাধীনতার বিরুদ্ধে তিনি আওয়াজ তুলেছেন।

বাবা জহির উদ্দিন মুহম্মদ আবুল আলী হায়দার সাবের, মা রাহাতুন্নেছা চৌধুরানী। বেগম রোকেয়ার ছিল দুই ভাই ও দুই বোন।

বড় ভাই ইবরাহিম সাবের ছিলেন একজন প্রগতিশীল মানুষ। অগোচরে মোমের আলোয় বেগম রোকেয়া ও আরেক বোন করিমনুন্নেছাকে বর্ণশিক্ষা দিতেন। আর রোকেয়ার ছিল জানার ও শিক্ষার অদম্য আগ্রহ।

১৮৯৬ সালে ১৬ বছর বয়সে বেগম রোকেয়ার বিয়ে হয় ভাগলপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট খান বাহাদূর সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে। রোকেয়া পেলেন আরেক জন প্রগতিশীল মানুষের সাহচার্য। স্বামী সাখাওয়াত হোসেন বেগম রোকেয়ার লেখাপড়ার প্রতি অকুণ্ঠ আগ্রহ দেখে তাকে সাহায্য করতে লাগলেন বাংলা ও ইংরেজী শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে এবং তার লেখা-লেখিতে সাহায্য করতে লাগলেন।

এই শিক্ষাই তাকে সে সময়ের অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজ, কুসংস্কারাচ্ছন্ন জীবন, শিক্ষাহীন নারী সমাজের মুক্তির কথা। নারীদের অশিক্ষার অন্ধকার থেকে কী করে তাদের টেনে তোলা যায়, সে ভাবনা থাকতো তার মাথায়। আর তাই তো তিনি স্বপ্ন দেখলেন একটি স্কুলের। যেখানে সমাজের পিছিয়ে পড়া নারীরা লেখাপড়া শিখবে। আর তার এ স্বপ্নকে আরও বড় করে তোলেন তার স্বামী সাখাওয়াত হোসেন।

১৯০২ সালে ‘পিপাসা’ নামে একটি বাংলা গল্প লিখে সাহিত্যের জগতে প্রবেশ। আর ১৯০৫ সালে রোকেয়া ইংরেজীতে লিখলেন তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘সুলতানাস ড্রিমস’। সাখাওয়াত হোসেন লেখাটি পড়ে অভিভূত হয়ে পড়েন এবং তাকে উৎসাহ দেন লেখাটি বই আকারে প্রকাশ করার জন্য।

১৯০৮ সালে সুলতানাস ড্রিমস বই আকারে প্রকাশিত হয়। পরবর্তীকালে বইটি বাংলায় ‘সুলতানার স্বপ্ন’ নামে রূপান্তরিত হয়েও প্রকাশিত হয়। এই বইটিকে বিশ্বের নারীবাদি সাহিত্যে একটি মাইল ফলক হিসেবে গণ্য করা হয়। তার অন্যান্য গ্রন্থগুলো হলো ‘অবরোধবাসিনী’, ‘মতিচুর’, ‘পদ্মরাগ’।

বেগম রোকেয়া স্মৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম দুলাল বলেন, বেগম রোকেয়ার জমিগুলো বেদখল হয়ে আছে। কিছু জমিতে তার নামে প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ জমিগুলো উদ্ধারে আদালতে মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

বেগম রোকেয়ার ভাই মসিহুজ্জামান সাবেরের মেয়ে পায়রাবন্দ বেগম রোকেয়া মেমোরিয়াল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষিকা রণজিনা সাবের বলেন, একটি দিনই মাত্র ঘটা করে বেগম রোকেয়াকে স্মরণ করা হয়। বেগম রোকেয়ার প্রকৃত ইতিহাস ও কর্মময় জীবনী নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে স্মৃতি কেন্দ্রের কার্যক্রম চালু করা উচিত।

১৯৩২ সালের এই দিনেই মারা যান তিনি। দিনটি রোকেয়া দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

দিবসটি পালনে রংপুরে নানা কর্মসূচি:

বেগম রোকেয়া দিবসে রংপুরে নানা কর্মসূচির আয়োজন করেছে প্রশাসনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন। তার জন্মস্থান মিঠাপুকুরের পায়রাবন্দে স্বাস্থ্যবিধি মেনে দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়েছে। আজ সকাল ১১টায় বেগম রোকেয়া স্মৃতি স্তম্ভে পুষ্পমাল্য অর্পণ ও দিবসের উদ্বোধন, সাড়ে ১১টায় আলোচনা সভা, সাড়ে ১২টায় নারীর প্রতি সহিংসতা ও বাল্যবিবাহ রোধ সম্পর্কিত সেমিনারে পুরষ্কার ও পদক বিতরণ, দুপুর ১টায় পায়রাবন্দ জামে মসজিদে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল, শেষে বিকেল সাড়ে ৩টায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। তবে এবার রোকেয়া মেলা হচ্ছে না। এ ছাড়া  বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি বেগম রোকেয়া কলেজ, বেগম রোকেয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও রংপুর রোকেয়া ফোরামসহ রংপুরের বিভিন্ন সংগঠন নানা কর্মসূচির আয়োজন করেছে।

কর্মক্ষেত্রে থেমে নেই নারীর বিড়ম্বনা



মীর ফরহাদ হোসেন সুমন, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, লক্ষ্মীপুর
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

নারীরা চার দেয়ালের ঘেরাটোপ ভেঙে পুরুষের সঙ্গে সমানতালে অফিস-আদালতে কাজ করছেন। ব্যক্তি উদ্যোগে অনেকে ব্যবসা বাণিজ্যসহ নানান আয়বর্ধক কাজে অদম্য উৎসাহে এগিয়ে চলার চেষ্টা করছেন। নারীরা এখন পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রর গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে আত্মনিয়োজিত। তথাপি পুরুষতান্ত্রিক সমাজে এখনো বদলায়নি নারীদের প্রতি পুরুষের মানসিকতা। এ কারণেই কর্মক্ষেত্রে নারীরা এখনো নিপীড়নের শিকার হন, মুখোমুখি হন ব্যক্তিগত নানা বিড়ম্বনার। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর দীর্ঘ এই সময়েও সামাজিক ও পারিবারিক প্রতিবন্ধকতা-বিড়ম্বনা কর্মজীবী নারীদের পিছু ছাড়ছে না।

নারীরা প্রতিবন্ধকতা ও বিড়ম্বনার শিকার হওয়ার এই চিত্র প্রায় সর্বক্ষেত্রে। মফস্বল এলাকায় এই চিত্র যেন আরও বেশি। কয়েকজন কর্মজীবী নারীর সঙ্গে কথা বলে উঠে আসে এমন না জানা অনেক তথ্য।

বেসরকারি একটি টিভি চ্যানেলের লক্ষ্মীপুর জেলা প্রতিনিধি জান্নাতুল ফেরদৌস নয়ন বলেন, বিদ্যমান সামাজিক কুসংস্কার-অপসংস্কৃতি দূর করার আন্দোলনে অংশীদার হতে কলম যোদ্ধা হিসেবে পথচলা শুরু করি। ইতিমধ্যে এ পথচলার দীর্ঘ সময় পেরিয়ে এসেছি। অথচ সামাজিক বিড়ম্বনা থেকে এখনও নিজেকে মুক্ত করতে পারিনি। এই পথচলায় ব্যক্তিগত জীবনে আমার অসংখ্য তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। পেশাগত জীবনের পথচলার শুরু থেকে আজকের জায়গায় আসতে অনেক কষ্ট, নিভৃত কান্নার নোনা জল রয়েছে। বৈরিতার সাথে লড়তে লড়তে আজকের এই পর্যায়ে এসেছি। তবে অনেক শুভাকাঙ্ক্ষীর সহযোগিতাও পেয়েছি। যা কোনদিনই অস্বীকার করার নয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক নারী জানান, কুদৃষ্টি, গায়ে ধাক্কা, অশ্লীল ইশারা, কুপ্রস্তাব, অশ্লীল কথাবার্তা—এ ধরনের অনেক বিব্রতকর পরিস্থিতির শিকার হতে হয় নারীকে। এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে অফিসের বড় কর্মকর্তারা নানা অজুহাতে তাদের কক্ষে ডেকে পাঠান। আকার-ইঙ্গিতে নানা কিছু বোঝানোর চেষ্টা করেন। বুঝলে বিপদ, না বুঝলেও বিপদ।

পুরুষ সহকর্মীদের দ্বারা নানা ধরনের গসিপ, কানাকানি, কথা লাগানো তো নিত্য ঘটনা। বস ও সহকর্মী দ্বারা হয়রানির শিকার হতে হয় অনেক কর্মজীবী নারীকে। ঘটে যৌন নিপীড়নের মতো ঘটনা।

এ বিষয়ে স্থানীয় একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার প্রধান নির্বাহী পারভিন হালিম বলেন, নারী-পুরুষের বৈষম্যের বিষয়টি এখন বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। বৈষম্য বৃদ্ধির ফলে নারীরা কাজ কম পাচ্ছেন। যেসব নারী কাজ পাচ্ছেন, তারাও খুব মানসম্পন্ন কাজ পাচ্ছেন না। একই মানের কাজ করেও কর্মক্ষেত্রে নারীরা পুরুষদের তুলনায় কম পারিশ্রমিক পাচ্ছেন।

তিনি বলেন, মেধা, যোগ্যতা আর দক্ষতার বিচারে পুরুষদের সমকক্ষ নন নারীরা—এমনটাই মনে করা হয় পুরুষতান্ত্রিক সমাজে। একজন নারীকে তারা ততক্ষণ সহ্য করেন, যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি তার ওপরে না ওঠেন। যখনই ওপরে উঠতে যান, তখনই শুরু হয় দ্বন্দ্ব ও নানা সমস্যা।

লক্ষ্মীপুরের একটি কলেজের প্রভাষক সুলতানা মাসুমা রিতু বলেন, শিক্ষকতার পাশাপাশি সৃষ্টিশীল কাজের প্রতি আগ্রহ আমার। আমি কবিতা লিখি ও আবৃত্তি করি। চাকরির পাশাপাশি মননশীল এ কাজে বাড়তি সময় ব্যয় করতে পারি না সহজে। পরিবারের নানান বাধা আর কৈফিয়ত আমাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে।

এডভোকেট আফরোজা ববি নামের একজন বলেন, এ সমাজের পুরুষরা আমাদের চাওয়া-পাওয়ার কোন মূল্যায়নই করতে রাজি নয়। পুরুষরা আমাদের নারীদের প্রতিনিয়ত বিভিন্নভাবে হয়রানি করে চলছে। টেলিফোন, এসএমএস, ই-মেইলের মাধ্যমেও হয়রানি করেন অনেক পুরুষ সহকর্মী।

লক্ষ্মীপুর সরকারি মহাবিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও সংস্কৃতিবিদ অধ্যাপক মাইন উদ্দিন পাঠান বলেন, সবার আগে পুরুষদের দৃষ্টিভঙ্গি বা মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে, তা না হলে এটি চলতে থাকবে। নারীদেরও সচেতন হতে হবে। কোনো সমস্যা হলে সেটি নিয়ে চুপ করে বসে থাকলে চলবে না। এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে হবে। নারী যেখানে কাজ করছেন, সেই প্রতিষ্ঠান না চাইলে এসব সমস্যার সমাধান হবে না। প্রতিষ্ঠানকে বিভিন্ন পলিসির মাধ্যমে নারীদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার বিষয় যেমন—প্রশিক্ষণ, বেতন-ভাতা ও পদোন্নতি নিশ্চিত করতে হবে। কর্মক্ষেত্রে নারী নির্যাতন বা নিপীড়ন বন্ধে আইন আছে, এর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। নিপীড়নের বিষয়ে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে পলিসি থাকতে হবে, নারীরা যাতে অভিযোগ করতে পারেন ও তাকে যেন এ আশঙ্কা না করতে হয়, অভিযোগ করলে চাকরি চলে যাবে। মিডিয়ারও একটি জোরালো ভূমিকা আছে। মিডিয়া নারীদের বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরতে পারে।

;

একজন নারীর এগিয়ে যাওয়া



আসমাউল হুসনা
আসমাউল হুসনা, সহযোগী অধ্যাপক, পবিপ্রবি। ছবি: সংগৃহীত

আসমাউল হুসনা, সহযোগী অধ্যাপক, পবিপ্রবি। ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

আমাদের দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। মানুষের জীবন যাত্রার মান, শিক্ষার হার, অর্থনৈতিক সূচক বা অবকাঠামোগত উন্নয়নের সাথে সাথে মানুষেন মন মানসিকতারও উন্নয়ন হয়েছে। মেয়েদেকে এগিয়ে যেতে এখন আর অতো বেশি বাধাগ্রস্ত হতে হয় না বা অন্য কারো কথা শুনতে হয় না।

অথচ আশির দশকেও আমরা অনেক কুসংস্কারে বিশ্বাস করতাম, অনেক ধরনের আজেবাজে কথা মেয়েদেরকে শুনতে হতো। যেমন- মেয়েরা এটা করতে পারবে না, ওটা করতে পারবে না, এখানে যেতে পারবে না, ওখানে যেতে পারবে না ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্ত এখন অন্তত মেয়েদের এসব কথা শুনতে হয় না।

মেয়েদের প্রতি তার নিজের পরিবারের সদস্যদের ভাবনা এখন অনেক বদলেছে কারন একজন মেয়ের এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রথমেই প্রয়োজন তার নিজ পরিবারের সাপোর্ট। তাছাড়া চলার পথে বা কর্মক্ষেত্রে পুরুষের দৃষ্টিভংঙ্গিও এখন কিছুটা বদলেছে।

তবে একজন নারীর এগিয়ে যাওয়ার বিষয়টা একটি পুরুষের মতো অতোটা সাবলিল নয়। মাতৃত্ব, সন্তান, সংসার এবং পরিবার-এই বিষয়গুলোর সাথে একজন নারী অতোপ্রতোভাবে জড়িত। এসবের জন্য একজন নারীকে অনেক কিছু সেক্রিফাইস করতে হয়।

তাই একজন নারী চাইলেই এসব ভুলে বা ছেড়ে থাকতে পারে না। থাকলেও তার অন্তর আত্মা ঢুকরে ঢুকরে কেঁদে ওঠে, যা কখনোই কেউ শুনতে পায় না। প্রকৃতি একজন নারীকে এভাবেই তৈরি করেছে। একজন নারীর একটি বিশেষ দিক হল সে চাইলে সকল দিক একা হাতে গুছিয়ে সবকিছু সামলিয়ে যে কোন অসাধ্যও সাধন করতে পারে।

অনেক সময় নিরুপায় হয়ে নারীরা অনেক শক্ত চ্যালেঞ্জও গ্রহণ করে। একজন নারীর সফলকাম হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো সে যে কাজটিই করে সেটি অনেক ডেডিকেশন দিয়েই করতে পারে, যদি সে মন থেকে চায়।

আজকে আমাদের দেশে যেসব নারীরা স্ব স্ব ক্ষেত্রে এগিয়েছে বা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তাদেরকে অনেক কঠিন কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সামনে এগুতে হয়েছে। তাদের কারোরই চলার পথ অতো সহজ ছিল না। তবে যেসব নারীরা তথাকথিত সব বাধাবিপত্তি মোকাবিলা করে সামনে এগিয়ে যায় দিনশেষে তারাই সাফল্য পায়। ইতিহাস তো তাই বলে।

আমাদের দেশে নারী জাগরণের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় নারীদের এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তৎকালীন সমাজ তাঁকে কখনোই বরণ ডালায় নন্দিত করেনি। বরঞ্চ সমাজের তীব্র লাঞ্ছনা-গঞ্জনা ও তিক্ততার মাঝে তাঁর সংগ্রামী যাত্রাপথ নিদারুণভাবে বাধাগ্রস্থ হয়েছে।

নারী পথিকৃত বেগম রোকেয়া এবং তার উত্তরসূরী ফয়জুননেছা, জোবেদা খাতুন, সুফিয়া কামাল ওনাদের জীবন কাহিনী জানলে নারী জাগরণের সঠিক চিত্র পাওয়া যায়। তারাঁ নারী শিক্ষা, নারী অধিকারের জন্য আমৃত্যু সংগ্রাম করে গেছেন। নারীদের এগিয়ে যাওয়ার ভিত রচনা করেছেন। তাইতো ইতিহাসে তাদেঁর নাম স্বর্নাক্ষরে আজীবন লেখা থাকবে।

নারীদের এগিয়ে যেতে হবে প্রথমত তার নিজের জন্য। নিজেকে একজন সফল মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। তার মাতৃত্ব, সন্তান, সংসারকে নিজের তাগিদে বাচিঁয়ে রাখার জন্য। এসবের একান্ত দাবীদার মুলত একজন নারী কারন এগুলোর মুল কারিগরই হচ্ছে নারী। এটা নারীর আবেগের জায়গা। নিজস্ব সম্পত্তি। এগুলো একজন নারীকে পরিপূর্ণ করে।

পুরুষরা এসবের অংশীদার হলেও এগুলো লালন কওে একজন নারী। তাই নারীদেরকে এমন অবস্থানে যেতে হবে যেন পুরুষরা চাইলেই তাকে অবজ্ঞা করতে না পারে। কোন ধরনের হুমকি, ভয় দেখাতে না পারে। আমাদের দেশে অনেক নারীরা এখনো মুখ বুজে অনেক কিছু মেনে নেয়।

অত্যাচার সহ্য করে। তাদের অন্তর আত্মার আর্জি মুখ ফুটে বলতেও পারে না। এখান থেকে নারীদেরকে বেরিয়ে আসতেই হবে। তবে নারী স্বাধীনতার নামে বা নারী অধিকারের নামে এমন কিছু করা যাবে না যেগুলো নারীদের আত্নসম্মানকে পদদলিত করে।

আমাদের দেশে নারীরা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় খুবই ভালো করছে। রাজনীতিতে নারীরা বেশ এগিয়েছে। তবে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে নারীর সংখ্যা বাড়লেও নারী নেতৃত্ব এখনো অপ্রতুল। কর্মক্ষেত্রে সফল নারীর সংখ্যা আশাব্যাঞ্জক নয়। তবে নারী উদ্যোক্তা ব্যপক হারে বেড়েছে।

বিশেষ করে ডিজিটাল বাংলাদেশের সুফলতা নিয়ে অনেক নারী অনলাইন বিজনেস প্লাটফর্মে খুবই ভালো করছে। নারীরা এখন বুঝে গেছে নিজের পায়ের মাটি শক্ত করা কতটা জরুরী। গ্রামেগঞ্জে নারীরা সাবলম্বী হওয়া শুরু করেছে। নারীরা এখন চারদেয়ালে বন্দি কোন শোপিস নয় বা কবি লেখকের রসালো কবিতা বা উপন্যাসের মুল উপজীব্য নয়।

নারীদেরকে প্রকাশ্যে কেউ হেয়প্রতিপন্ন করতে এখন অন্তত চিন্তা করতে হয়। তবে সুযোগ পেলে নারীদের উপর তথাকথিত পুরুষরা বল প্রয়োগ করতে চায় তাই নারীদের উচিত কখনোই পুরুষকে সেই সুযোগ না দেয়া। নিজেকে অসহায় না ভাবা। সবর্দা আত্মবিশ্বাস নিয়ে চলা।

লেখক: পিএইচডি ফেলো, স্কুল অব বায়োলজিকাল সায়েন্স, ইউনিভার্সিটি সায়েন্স মালেয়শিয়া ও সহযোগী অধ্যাপক, বায়োটেকনোলজি বিভাগ, পবিপ্রবি, বাংলাদেশ।

;

নারীর প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে হবে: মনোয়ারা হাবীব



আনিসুর বুলবুল, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম
মনোয়ারা হাবীব, সিজিডিএফ।

মনোয়ারা হাবীব, সিজিডিএফ।

  • Font increase
  • Font Decrease

মনোয়ারা হাবীব। বাংলাদেশের প্রথম নারী কন্ট্রোলার জেনারেল ডিফেন্স ফাইন্যান্স (সিজিডিএফ)। ডিফেন্স ফাইন্যান্স ডিপার্টমেন্টের (ডিএফডি) বিভাগীয় প্রধান কর্মকর্তা হিসেবে তিনি গত বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি দায়িত্বগ্রহণ করেন। এর আগেও তিনি প্রথম নারী হিসেবে অডিট এন্ড অ্যাকাউন্টস ডিপার্টমেন্টের বিভাগীয় প্রধান কর্মকর্তা (ডেপুটি সিএজি সিনিয়র) পদে কর্মরত ছিলেন।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে সম্প্রতি রাজধানীর সেগুন বাগিচায় সিজিডিএফ কার্যালয়ে তাঁর সাথে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। বাংলাদেশের নারী উন্নয়ন ও অংশগ্রহণের নানা বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেন তিনি।

মনোয়ারা হাবীব বলেন, বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। এরপরও নারীর আরও উন্নয়ন ও অংশগ্রহণের জন্য সবার আগে প্রয়োজন নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের মানসিকতার পরিবর্তন। একটি শিশু জন্মগ্রহণের পর তাকে ছেলে কিংবা মেয়ে হিসেবে না দেখে সন্তান হিসেবে দেখতে হবে। মানসিকতার পরিবর্তন শুরু করতে হবে পরিবার থেকেই।

তিনি বলেন, আজ নারীরা ঘরে এবং বাইরে নানাবিধ পেশায় সাফল্যের সাথে কাজ করছে তারপরেও সমাজের একটি বদ্ধমূল ধারণা রয়েছে যে নারীরা অনেক কাজ করতে পারেন না। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে নারীরা যা পারে তার কোনো গুরুত্ব বা মূল্যায়ন করা হয় না।

সিজিডিএফ মনোয়ারা হাবীব বলেন, নারীর প্রতি পরিপূর্ণভাবে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে হবে। নারী বাসায় সন্তান লালন-পালনসহ গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন, কিন্তু তার কোনো মূল্যায়ন নেই। গ্রামে নারী গৃহস্থালি, কৃষি ও পশু পালনের মতো উৎপাদন–কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত থাকলেও তার স্বীকৃতি নেই। নারীদের এসব কাজের স্বীকৃতি থাকা প্রয়োজন।

১৯৬৪ সালের ২৩ মার্চ জামালপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন মনোয়ারা হাবীব। তিনি বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস ক্যাডার) ৮ম ব্যাচের সদস্য। তিনি ১৯৮৯ সালের ২০ ডিসেম্বর সিভিল সার্ভিসে যোগদান করেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী, স্পিকার নারী। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে অনেক নারী কর্মকর্তা রয়েছেন। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের ৮০ শতাংশেরও বেশি নারী। বাংলাদেশ নারীর উন্নয়ন ও অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে অনেক দূর এগিয়েছে, কিন্তু পথটা অনেক লম্বা। আমাদের আরও অনেক দূর যেতে হবে।

নারী হয়ে এই অবস্থানে আসতে পরিবার বা কর্মস্থলে কখনো বাঁধার সম্মুখীন হতে হয়েছে? এমন প্রশ্নের জবাবে মনোয়ারা হাবীব বলেন, আমার কাছে মনে হয় না, আমি কোনো বাঁধার মুখে পড়েছি। পরিবার থেকে আমাকে সেই পরিবেশ ও সুযোগ তৈরি করে দেয়া হয়েছে। কর্মস্থলেও সকলের পারস্পরিক সহযোগিতা পেয়েছি। তারপরেও একজন মা হিসেবে সন্তানের প্রতি দায়িত্ব পালন এবং দাপ্তরিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন দুটো একসাথে চালিয়ে যেতে একজন পুরুষের চেয়ে বেশি মানসিক পরিশ্রম করতে হয়।

তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে বিএ (অনার্স) এবং এমএ (মাস্টার্স) ডিগ্রি অর্জন করেন। শৈশব থেকেই তিনি লেখাপড়ায় অনেক ভালো ছিলেন। তিনি যথাক্রমে ১৯৭৯ এসএসসি ও ১৯৮১ সালে এইচএসসি পাস করেন।

দেশের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আমাকে দিয়ে কিছু হবে না এমনটা কখনো ভাবা যাবে না। মানুষ চাইলে সবই পারে, একজন নারীও তাই। এজন্য ইচ্ছা, শক্তি ও মনোবল থাকতে হবে। তাকে চেষ্টা করতে হবে। তবেই সফলতা আসবে। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে কিন্তু অনেক নারী কর্মকর্তা রয়েছে। তাঁদের ইচ্ছা ছিল বলেই আজ গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোয় পুরুষের মতো তাঁরাও সাফল্যের সাথে এগিয়ে যাচ্ছে।

নারীদের এগিয়ে যেতে সমাজ ও পরিবারের ভূমিকা প্রসঙ্গে মনোয়ারা হাবীব বলেন, সমাজের কিছু কিছু মানুষ এখনো নারীকে ছোট করে দেখে। কর্মজীবী নারী যখন অফিসের কাজ শেষ করে বাসায় ফিরে তখন তার বিশ্রামের প্রয়োজন হয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে পরিবার মনে করে বাসার গৃহস্থালী কাজ শুধুই নারীদের, পুরুষের জন্য নয়। এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি। পরিবার বা সমাজ থেকে নারীকে তার কাজের সুযোগ করে দিতে হবে এবং তাঁর প্রতি একটা শ্রদ্ধাবোধ থাকতে হবে। তার কাজে প্রয়োজনে সহায়তা করতে হবে। এই বিষয়টি সমাজ বুঝে উঠতে পারলে নারী-পুরুষ সমানভাবে এগিয়ে যাবে।

এর আগে মনোয়ারা হাবীব ফিন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট একাডেমির (ফিমা) মহাপরিচালক, সিনিয়র ফাইন্যান্স কন্ট্রোলারসহ (আর্মি) অডিট অ্যান্ড একাউন্টস ডিপার্টমেন্টের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি প্রশিক্ষণ, সেমিনার ও বিভিন্ন সরকারি দায়িত্ব পালন উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, চীন, ভারত, মালয়েশিয়া, হংকং, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ফ্রান্স, গ্রিস, জর্ডান, বাহরাইন, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি, মিশরসহ বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন।

;

নারী-পুরুষ বৈষম্য করে না পর্বত



জাকারিয়া মন্ডল, শ্রীলঙ্কা থেকে ফিরে
পুরুষ-নারী বৈষম্য করে না পর্বত। ছবি: বার্তা২৪.কম

পুরুষ-নারী বৈষম্য করে না পর্বত। ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

নারী-পুরুষ বৈষম্য করে না পর্বত। হয় তাকে জয় করো, নয় তো পরাজিত থাকো। —এ আপ্তবাক্যকে মূলসূত্র ধরেই শ্রীলঙ্কার প্রথম এভারেস্টজয়ী হিসেবে ইতিহাসে নিজের নাম পোক্ত করে নিয়েছেন জয়ন্তি কুরু-উতুমপালা। নারী হিসেবে তো বটেই, প্রথম শ্রীলঙ্কান হিসেবেও এই অনন্য গৌরব অর্জন করে নিয়েছেন তিনি। যে গৌরবে পুরুষরাও তার থেকে পিছিয়ে।

যদিও জয়ন্তি বলেন, ‘প্রথম হওয়া আমার স্বপ্ন ছিলো না। স্বপ্ন ছিলো এভারেস্ট চূড়ায় পা রাখবো।’

সম্প্রতি শ্রীলঙ্কান ট্যুরিজম প্রমোশন বোর্ডের আমন্ত্রণে শ্রীলঙ্কা সফরে যাওয়া বাংলাদেশ ট্রাভেল রাইটার্স এসোসিয়েশন প্রতিনিধিদলের মুখোমুখি হন এই এভারেস্টজয়ী। কলম্বোর ঐতিহ্যবাহী শিল্প, সাহিত্য ও ফ্যাশন কেন্দ্র বেয়ারফুট এর বাগানে বসে মেলে ধরেন মনের ঝাঁপি।

তিনি বলেন, ‘প্রকৃতি কখনও নারী-পুরুষ বৈষম্য করে না।’

বিশ্ব নারী দিবসের প্রাক্কালে জয়ন্তি জানান, কৌতূহলী কৈশোরেই এভারেস্ট জয়ের ইচ্ছা ডানা মেলেছিলো মনের ভেতর। পত্রিকা আর ম্যাগাজিনের পাতায় পর্বতারোণের খবর পড়তেন মনোযোগ দিয়ে। নারিকেল গাছে চড়া উপভোগ করতেন। পাহাড় বাইতে ছুটতেন। সবাই বলতো- চড়ো না। ওতো দস্যিপনা ভালো নয়।

ব্যতিক্রম কেবল বাবা। তিনি উৎসাহ দিতেন। ভাইয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নারিকেল গাছে নিরাপদে চড়ে নিরাপদে নেমে আসার কৌশল বাবাই শিখিয়েছিলেন সেই শৈশবে।

তারপর অনেকদিন কেটে গেছে। ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক হয়েছেন। ভারতে এডমুন্ড হিলারির সঙ্গে এভারেস্ট শীর্ষে পা রাখা তেনজিং নোরগে প্রতিষ্ঠিত হিমালয় মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে কোর্স করেছেন। রক ক্লাইম্বিং, আইস ক্লাইম্বিং শিখেছেন। উঁচু পর্বতে ওঠার টেকনিক্যাল জ্ঞান অর্জন করেছেন। উঁচুতে টিকে থাকার কৌশল রপ্ত করেছেন।

জয়ন্তি বলেন, সবসময় ‘এভারেস্ট জয় করতে চাইতাম। কিন্তু কখনও ভাবিনি, সেটা সম্ভব হবে।’ 

এভারেস্ট জয় করতে চাইতাম। কিন্তু কখনও ভাবিনি, সেটা সম্ভব হবে।

তার স্বপ্নের অন্তরায় ছিলো সঙ্গী ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাব। এরই ফাঁকে যু্ক্তরাজ্য থেকে জেনডার ডেভেলপমেন্ট বিষয়ে স্নাতকোত্তর শিক্ষা শেষ করেন তিনি। চাকরি নেন একটি নারী অধীকার সংস্থায়। শুরু হয় নিয়মিত অফিসের হ্যাপা। উইক এন্ড এলেই ছুটতেন রক ক্লাইম্বিংয়ে।

২০১২ খ্রিষ্টাব্দে একজন বন্ধু জোটে জয়ন্তির। তাকে নিয়ে জয় করেন শ্রীলংকার আইল্যান্ড পিক, আদম পিক। আরও বছর দুই পর শুরু হয় দেশের বাইরে অ্যাডভেঞ্চার। জয় করেন মাউন্ট কিলিমানজারো। তারপর পিরেনিজ পর্বতমালা।

কিন্তু এভারেস্ট অভিযানের সুযোগ মিলছিলো না। থাকা-খাওয়া, গাইড, অক্সিজেন ট্যাংক, পারমিট ফি-সব মিলিয়ে প্রায় ৬০ হাজার মার্কিন ডলারের ধাক্কা। অবশ্য, অনেক চেষ্টার পর তার ব্যবস্থাও হয়ে গেলো। তারপর মূল চ্যালেঞ্জ। এভারেস্ট অভিযান।

জয়ন্তি মনে করেন, ‘এজন্য রক ক্লাইম্বিংটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দড়ির ব্যবহারটা খুব ভালোভাবে শেখা যায়।’

এভারেস্ট অভিযানের কথা স্মরণ করে জয়ন্তি বলেন, ‘আমার টিমে আমি ছিলাম সবচেয়ে ধীরগতির। আমরা খুব সাবধানে এগুচ্ছিলাম। মাইনাস ৩০ ডিগ্রি ঠাণ্ডা, তুষার ঝড়- সব প্রতিবন্ধকতা আমাদের কাছে হার মানছিলো। কিন্তু চূড়ার কিছু আগে আমার অগ্রবর্তীর অক্সিজেন শেষ হয়ে গেলো। আমার কাছে যেটুকু ছিলো সেটুকুও তখন বুঝেশুনে খরচ করতে হবে। কারণ, নামার সময়ও অক্সিজেন প্রয়োজন হবে। ডেথজোনে পৌঁছে আরও সতর্ক হলাম। একটা ভুল হলেই জীবনলীলা সাঙ্গ। কিন্তু শেষ অবধি আমি পারলাম। ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দের ২১ জুন ভোর ৫টা ৩ মিনিটে পা রাখলাম এভারেস্টেরা চূড়ায়।’

সুযোগ পেলেই বেড়াতে বাংলাদেশে যাবো।

সেদিনের কথা স্মরণ করে জয়ন্তি বলেন, ‘পর্বতই তোমাকে বেছে নেবে। তুমি পর্বতকে বেছে নিতে পারো না। তাই পর্বতকে পবিত্র জ্ঞান করো। শ্রদ্ধা করো।’

বাংলাদেশের দুই নারী এভারেস্ট আরোহী নিশাত মজুমদার ও ওয়াজফিয়া নাজরিন সম্পর্কে বেশ ভালো ধারণা জয়ন্তির। পার্বত্য চট্টগ্রামের সৌন্দর্যের কথাও বেশ জানা আছে তার। বললেন, ‘সুযোগ পেলেই বেড়াতে বাংলাদেশে যাবো।’

লেখক: প্রধান বার্তা সম্পাদক, দৈনিক আমাদের বার্তা ও নির্বাহী সদস্য, বাংলাদেশ ট্রাভেল রাইটার্স এসোসিয়েশন।

;