শিক্ষাব্যবস্থার গলদই ধর্ষক তৈরি করে

রাশিদা সুলতানা
অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

  • Font increase
  • Font Decrease

রাশিদা সুলতানা জাতিসংঘের শান্তি মিশনে কাজ করছেন। পেশাসূত্রে থাকেন সুদানে। ইতঃপূর্বে তিনি জাতিসংঘ শান্তি মিশন দারফুরের কেন্দ্রীয় সেক্টরের প্রশাসনিক প্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং জাতিসংঘ শান্তি মিশন পূর্ব তিমুরে আঞ্চলিক প্রশাসক (Regional Administrator) হিসেবে কাজ করেছেন। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার হিসেবে কাজ করেছেন ২০১১ সালে। প্রথম দশকের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কথাসাহিত্যিক রাশিদা সুলতানা। স্বাধীনতা, স্বনির্ভরতা, ব্যক্তিত্ব ও সৃজনশীলতা—এই বিষয়গুলো তাঁর সৃষ্টি, কর্ম ও ব্যক্তিজীবনে মুখ্য হয়ে আছে। ব্যক্তি জীবনে তিনি দুই সন্তানের জননী।


বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন হচ্ছে, দেশ-বিদেশে নারীরা উচ্চতর পড়ালেখা ও চাকরি করতে যাচ্ছে, বহু নারীর অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা এসেছে—নারীদের জীবনে এইসব ইতিবাচক ব্যাপার ঘটছে। কিন্তু অন্য বাস্তবতা হচ্ছে এই দেশে এত বেশি নারী ধর্ষিত হবার কথা আমরা এর আগে কখনো শুনি নাই। কেন এত নারী ধর্ষিত হচ্ছে? এর কারণ নারীর প্রতি শ্রদ্ধাহীন, মূল্যবোধহীন, মানবিকতাহীন বিকারগ্রস্ত, অধঃপতিত একটা সমাজ আমরা দিনে দিনে তৈরি করেছি।

জাপানে মাস্টার্স করার জন্য আমি আড়াই বছর থেকেছি। ওখানে দেখেছি বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি থেকে পড়ালেখা শেষ করে বা কাজ থেকে রাতে দেরি করে মেয়েরা বাসায় ফেরে। কী স্বাধীনভাবে মেয়েরা চলাফেরা করে, এরা কেউ দেরি করে বাসায় ফেরার জন্য ধর্ষিত হয় না। আমি মনে করি এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে জাপানের শিক্ষাব্যবস্থা। তাঁদের সমাজ ও পরিবার তাঁদের নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে গড়ে তোলে। তাছাড়া কার্যকরি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তো আছেই।

নারী উন্নয়ন নিয়ে আমাদের যত আত্মতুষ্টিই আসুক, আজও অধিকাংশ মধ্যবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত নারী যৌতুকের জন্য নিগৃহীত হয় গ্রামে শহরে সবখানে। সীমাহীন নির্যাতন সহ্য করে বহু নারী সংসার টিকিয়ে রাখার জন্য মুখ বুজে নির্যাতন সহ্য করে যায়। সহ্যসীমা পেরিয়ে গেলে হয়তো আত্মহত্যা করে। অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা থাকলে কেউ কেউ স্বামীকে তালাক দিয়ে বেরিয়ে যায়। অমানবিক সমাজ হওয়ার কারণে যৌতুকের নির্যাতনের শিকার, ধর্ষিত নারীর কান্না কাউকে আর স্পর্শ করে না।

আজকের বাংলাদেশ চূড়ান্ত অমানবিক, নারীর প্রতি শ্রদ্ধাহীন, নিষ্ঠুর, একটি অধঃপতিত দেশ। জাপান বা উন্নত বিশ্বের সাথে তুলনা করে ভাবি নিশ্চয়ই তাঁদের শিক্ষা, সংস্কৃতি, সভ্যতা, এবং মূল্যবোধের চর্চা তাঁদেরকে নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল আর মানবিক করে তোলে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায়, পারিবারিক মূল্যবোধে নিশ্চয়ই এমন কোনো বড় গলদ আছে যা আমাদের সমাজে পাড়ায় পাড়ায় ধর্ষক তৈরি করে, ঘরে ঘরে নিষ্ঠুর পুরুষতান্ত্রিক দানব (নারী-পুরুষ উভয়ই) তৈরি করে, যারা যৌতুকের জন্য নারীকে শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতন করে।

একদিকে বাড়িতে যেমন নারীরা যন্ত্রণা, বঞ্চনার শিকার হয়। কর্মপরিবেশেও বহু নারী নানা বৈষম্য ও নিপীড়নের শিকার।

এদেশে সামান্য কিছু নারীকে গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হতে দেখে আমি উচ্ছ্বসিত হই না। অফিসে নারীদের নিয়ে আলোচনাগুলো শুনলেই এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, বহু সরকারি অফিসে, ব্যাংকে, বিদ্যালয়ে, কর্পোরেট হাউজে নারীদের ভোগ্যবস্তু বা যৌনবস্তুর অধিক বিবেচনা করা হয় না।

তবে সংখ্যায় একেবারে কম হলেও কিছু সংখ্যক নারী-পুরুষ এদেশে এখনো আছেন যাঁরা নারী উন্নয়ন আন্তরিকভাবে চান এবং চেষ্টা করে যান। নারীর প্রতি সম্মানবোধের কমতিও তাঁদের নাই। এইসব সহৃদয় মানুষের সংখ্যা কম।

একটা মানবিক এবং নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল দেশ এবং সমাজ, একটা ভিন্নতর, উন্নত নারী-পুরুষের প্রজন্ম তৈরি করতে হলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যবই, একাডেমিক কারিকুলামে মানবিকতা, মূল্যবোধ, নারী-পুরুষ সমতা, যৌতুক-বিরোধিতা, ধর্ষণ, বলপ্রয়োগ, দুর্নীতি, মিথ্যাচারের প্রতি ঘৃণা—এইসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তা নইলে এদেশে নারী নির্যাতন, নারীকে অসম্মান করা কোনোদিন বন্ধ হবে না।