নারীবাদ কেন প্রয়োজনীয়, নারীবাদী কারা

ক্যামেলিয়া আলম
অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

  • Font increase
  • Font Decrease

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা ক্যামেলিয়া আলম বর্তমানে তেজগাঁও সরকারি কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে অধ্যপনার সাথে যুক্ত। থিয়েটার সেন্টারে কাজ করেছেন দীর্ঘ ৬ বছর। ‘কাহার’, ‘ইদারা’ ও শামুকবাস’ তার অভিনীত মঞ্চনাটক। বেশকিছু টিভি নাটক ও মীনা কার্টুন রিপ্যাকেজিং টিমে স্ক্রিপ্ট রাইটার হিসেবে কাজ করেছেন। মাদ্রাসার বয়ঃসন্ধিকালীন ছেলেমেয়েদের নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র ‘অমৃত সন্ধানী’ নির্মাণ করেছেন। 


কয়েক দশক থেকে গড়ে ওঠা আন্দোলনের পর্যায়ক্রমিক ভ্রমণের পরে নারীবাদ কী বা এর মূল উদ্দেশ্য বুঝতে কারো সমস্যা হবার কথা না। কিন্তু তবু তা নিয়ে কতগুলো ভ্রান্তি সৃষ্টি হচ্ছে। নারীবাদী নারী আসলে কী? তার স্বরূপ কেমন? কোন মাপকাঠিতে নারীকে বিশ্লেষণ করলে নারীর কাজ নারীবাদী হবে আর কোন ক্ষেত্রে অনারীবাদী হবে? নারীবাদী নারীর প্রতি এক শ্রেণীর পুরুষই নয়, নারীদের এক অংশেরও প্রচ্ছন্ন এক শ্লেষ কেন কাজ করে? বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ভাবছি। আর সেই উপলব্ধিকে সামান্য ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি।

নারীবাদ নারীর ওপর সকল প্রকার বৈষম্য দূর করবার এক মতাদর্শ। এই বৈষম্য দূর হবে কী করে? ‘মানব জাতির অসমতার কারণ’ বলে জ্যঁ জাক রুশোর এক নিবন্ধ আছে। সেখানে বহু বিষয়ের মাঝে দুইটি বিষয় টেনে আনছি এ আলোচনায়। একটা হলো, প্রকৃতির জন্ম সত্তাকে যখনই আবিষ্কার করতে পারল মানুষ তখনই তা তাকে এক স্থায়ী জীবনে অভ্যস্ত করালো। আর এই স্থায়ী জীবনই কালক্রমে যূথবদ্ধ জীবন তথা পরিবারের জন্ম দিল। আর এই পরিবারকে ঘিরে যেমন মায়া, মমতা, ভালোবাসার সূত্রপাত হলো, তেমনই ঠিক সেই বিষয় থেকেই জন্ম নিল হিংসা, বিদ্বেষ আর দ্বন্দ্ব। পরবর্তীতে যূথবদ্ধ জীবন তাদের দিল প্রকৃতির সাথে একা লড়াই করে চলবার সংকট থেকে মুক্তি, দিল অখণ্ড অবসর। অবসর জন্ম দিল শিল্প, সংস্কৃতি। মানুষের মাঝে জন্ম নিল মান যাচাইয়ের ক্ষমতা। সবচেয়ে সুন্দর বা কৌশলী বা সবল—কিংবা ভালো বক্তা যখনই চিহ্নিত হওয়া শুরু হলো বা অন্তত নিজেকে অন্যের চাইতে ব্যতিক্রম ভাবা শুরু করল তখন থেকেই জন্ম নিল অসমতার প্রথম ধাপ।

রুশোর সামাজিক চুক্তি বইয়ের এই নিবন্ধের এই কথাগুলো কতটা সত্য তার কোনো বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা নাই। তবে বিষয়বস্তুর সাথে একমত না হয়ে পারা যায় না। মানুষের মাঝে বৈষম্য কেন সৃষ্টি হবে? যদি নিজেকে শ্রেষ্ঠ ভাববার মানসিকতা তাদের মাঝে না থাকবে। আর এই শ্রেষ্ঠ ভাবনাটাই তাকে নিঃসন্দেহে উদারতাবোধের জায়গা থেকে দূরে নিয়ে আসে। আধিপত্যের বিস্তার তখনই শুরু হয় যখন থেকে কর্তা হিসেবে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখবার মননশীলতা গড়ে ওঠে।

আজ নারীকে নিয়ে বৈষম্যের মাত্রা চূড়ান্ত না হলে তা থেকে পরিত্রাণের চেষ্টা চলত না বা তেমন ভাবাদর্শের জন্মও হতো না। এখন আরেকটা প্রশ্নও প্রচুর শোনা যাচ্ছে যে, মানবতাবাদ প্রতিষ্ঠিত হলেই নারীর ওপর বৈষম্য আপনা-আপনি দূর হবে আর সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠা হবে। তাদের জন্য একটা উত্তর যে, মতামত ঠিক আছে, কিন্তু বাস্তবতায় মানবতাবাদের পর্যায়ে নারীর অবস্থানই এখন আর নাই। কারণ মানবতাবাদের মূল কথা মানুষ সব সমান অধিকার পাবে। এই সমঅধিকারের জায়গাতে নারীদের এখনো পৌঁছানো হয়নি। এর কারণ নারীর মেধা, বুদ্ধির অভাব নয়, দীর্ঘদিনের গড়ে ওঠা সামাজিক সাংস্কৃতিক মানসিক গঠন। সামাজিক কাঠামোর নানা বেড়াজাল। আর নারী যেহেতু তাকে সনাক্ত করতে পেরেছে, তা সমাধানের চেষ্টা তো তারই করতে হবে। ফলে কেবল মানবতাবাদের প্রতিষ্ঠার লড়াই দিয়ে নারীর দীর্ঘদিনের শোষণ বঞ্চনা থেকে মুক্তি মিলবে না। আর নারীর কিছু ব্যতিক্রম ইস্যু আছে যা সমঅধিকার দিয়ে প্রতিষ্ঠা সম্ভব না। প্রজননকালীন দুর্বলতা বা ঋতূকালীন সময়ে নারীর জন্য যা প্রয়োজন সেই প্রয়োজনীয়তা একজন পুরুষের নেই। সন্তান লালন পালনে পুরুষের ভূমিকা থাকলেও সন্তান ধারণে পুরুষের থাকে না ভূমিকা।

আরেকটি বিষয় নারীর শারীরিক গঠন। বায়োলজিক্যালি তাকে শোষণ বা নিপীড়ন করবার যৌনাঙ্গ পুরুষের চেয়ে ব্যতিক্রম। ফলে পুরুষের চাইতে নারীর ওপর যৌণ নিপীড়ন এমন এক ইস্যু যে তা প্রতিরোধে স্বতন্ত্র পরিস্থিতিরই জন্ম দিতে হয়। হ্যাঁ, অনেক ছেলে শিশুও এবিউজের শিকার হয়, কিন্তু তার থাকে একটা নির্দিষ্ট বয়স সীমা। নারীদের মতন দুই মাস থেকে পঞ্চাশোর্ধ অবধি না। ফলে এই অবস্থা থেকে নারীর অধিকারকে আলাদা করতে হয়। এছাড়াও নানা বিবিধ বিষয় তো আছেই। নারীবাদ তাই ততদিন পর্যন্ত প্রয়োজনীয় বিষয় যতদিন পর্যন্ত নারী পুরুষের অবস্থানের পরিবর্তন না আসবে।
নারীবাদ নয়, কেবল মানবতাবাদের পক্ষে যারা সাফাই গাইছে। তারা নিজেরাও কী মানবিক? তারা কেউ জ্ঞান, কেউ শৌর্য বা কেউ বীর্যের প্রতীকী ক্ষমতায়ন দেখাবার চেষ্টা কি করেন না নানা ছলে? সমঅধিকারের সংজ্ঞা তাদের কাছে আমরা খালি গায়ে থাকি, তোমরাও থাকো? নাকি মানুষের বিচিত্রতাকে গ্রহণ করে প্রত্যেককে স্বতন্ত্র সমাধান বিস্তারের লড়াইয়ে নামা। আমরা বহু মানুষকে এক জায়গায় করলে সেখানে প্রায় একই মানের মানুষ পাই, ব্যতিক্রম খুব একটা থাকে না। কিন্তু এরপরেও নিজেকে শ্রেষ্ঠ ভাববার মানসিক গঠনই আমাদের মাঝে অসমতার বীজ বপন করে। আমরা অংশগ্রহণমূলক জীবন ভুলে হয়ে পড়ি প্রতিপক্ষ। আর তা-ই আমাদের অসুস্থ সমাজের মূল কারণ।

এবার প্রশ্ন হলো, নারীবাদী কারা? কোন মাপকাঠিতে ফেলে একজন নারীকে বলা হয় তিনি নারীবাদী আর তিনি নারীবাদী নয়? নারীবাদের মূল উদ্দেশ্য নারীর ওপর সকল প্রকার বৈষম্যের মুক্তি। আবার নারীবাদ মানবতার কথাও বলে। সেক্ষেত্রে নারীর প্রথম লড়াই বৈষম্যের দেয়াল ভাঙা। সেই দেয়াল আছে প্রথা, ধর্ম, আইনের নানা নীতি মত পথ দিয়ে। সেই পথ ভাঙবার জন্য নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ছাড়া আর কোনো পথ আছে কিনা আমার জানা নাই।

তবে আরেক শ্রেণিও সমাজে টিকে আছে, যারা পরিবারের নানা নিপীড়ন সয়েও নিজ সন্তানকে একনিষ্ঠভাবে মানুষ গড়ার কাজ নিভৃতে করে যাচ্ছে, স্বামীর সাথে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হবার পরেও সন্তানের দায়ভার নিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে না, স্বামীর মৃত্যুর পরে সন্তানদের প্রাণপণে মানুষ করছে, অসুস্থ জনের সেবা করতে গিয়ে নিজের সুখ বিসর্জন দিচ্ছে, স্বামী বা বাবার সম্পত্তি আদায়ে লড়াইয়ে নামছে, সারাদিনের ক্লান্তিকর কাজের যোগান সংসারে অবলীলায় ছেড়ে দিচ্ছে, স্বামী বা সন্তানের প্রতিষ্ঠায় একনিষ্ঠভাবে ভূমিকা পালন করছে। এই তারা কি নারীবাদীর সংজ্ঞায় পড়বে কিনা! আমার ধারণা পড়বে। কারণ আমি ততক্ষণই তাকে নারীবাদী বলতে চাই যতক্ষণ সে কোনো আধিপত্যবাদী মানসিকতার মধ্যে অবস্থান নেবে।

তাহলে অনারীবাদী কারা? যে শব্দটা আমি নিজেও ব্যবহার করি। অনারীবাদী আমার দেখা তারাই যারা যে কোনো কর্তৃত্ববাদীর পাশে নিজের অবস্থান রাখার মধ্য দিয়ে সেই সব নারীদের অপমান করে যারা নারীর ওপর অত্যাচার প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে। আধিপত্যবাদীর প্রতিটি কাজে প্রচ্ছন্ন সহায়তা করে (বউ হিসেবে বা ছেলের মা হিসেবে বা কর্তৃত্ববাদী ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের আজ্ঞাবাহক হয়ে), রক্ষণশীলতা দিয়ে পুরুষের গড়া সিস্টেমের ছায়াতলে নির্বিঘ্নে কাটিয়ে দেয়। পুরুষদেরও একটা কথা মাথায় রাখা উচিত যে জেন্ডার ডিসক্রিমিনেশন দিয়ে তারা যে সমস্ত নারীদের লালন পালন করে তা তার জন্য ভারবাহী এক বস্তু। বরং অংশগ্রহণমূলক সমাজে তার একক দায়ভারের সামাজিক মনঃস্তত্ত্ব আর থাকবে না।

ইদানীং আরেক কথা শুনছি, আপনার মেয়েকে তার বরের খাওয়া পরা যোগাড় করতে পারার মানসিক শিক্ষা দিন, তাই বা কেন হবে? একটা সমাজ, রাষ্ট্র, পরিবার গড়ায় সকলের ভূমিকাই থাকবে। সমাজ হবে সমন্বয়ের, অংশীদারত্বের। একে অপরের ভার হিসেবে নিজেকে প্রস্তুত করবার চাইতে যার যা ক্ষমতা আছে তা দিয়ে অংশগ্রহণ করানো অনেক বেশি উপযোগী। একজন নারী পিতা বা স্বামীর সম্পত্তির ভাগ পাওয়ার চাইতে একটা নির্দিষ্ট সিস্টেমে উত্তরাধিকারী হোক, দেনমোহর বা কনে পণের মতো বিষয় থেকে নারীরা নিজেকে গুটিয়ে নিক। নিজের দুই পা, দুই হাত আর মাথার ওপর নির্ভরশীলতা বাড়াক, নারী হিসেব তার শারীরিক যতটা সহযোগিতা পাওয়া উচিত রাষ্ট্র তাকে দিক, শারীরিক কাজ ছাড়াও বৌদ্ধিক বহু কাজের ক্ষেত্র আছে যেখানে নারীর অবস্থান পর্যালোচনা করে দেখা গেছে তারা সফলতার সাথে করতে সক্ষম হয়েছে। এই ক্ষেত্র আরো বাড়াক রাষ্ট্র। কল্যাণমূলক রাষ্ট্রই যদি আমরা চাই, তাহলে এর কোনো বিকল্প কি আছে? আর নারীবাদ তো সেই রকম এক রাষ্ট্রগঠনের কথাই বলছে। নারীকে ‘অপর’ ভাবা হয়েছে বলেই এই আদর্শের জন্ম হয়েছে। যখন ‘সেল্ফ’ ভাবা হবে তখন আপনা থেকেই ইজমের আগে অন্য কোনো শব্দ বসে যাবে।

আপনার মতামত লিখুন :