কোন গায়ত্রী ছিলেন বিনয়ের প্রেমিকা?

মাসুদুজ্জামান
অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

  • Font increase
  • Font Decrease

নারীকে কেন্দ্র করে গল্প, কবিতা জন্ম হলেই আমরা একজনের পাশে একজনকে দাঁড় করিয়ে দিই তথ্য প্রমাণ ছাড়াই। কবি বিনয় মজুমদার আর গায়ত্রীর স্পিভাকের বিষয়টিও কি তেমনই এক ইস্যু—আমাদের গড়ে তোলা পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোয় আবদ্ধ নারীর স্বরূপ? গায়ত্রী স্পিভাকের কাজ ও তাঁর অবস্থানকে ভুলে আমরা তাঁর চরিত্রায়ন করি, পরিচিতি তুলে ধরি ভিন্ন আঙ্গিকে—বিনয়ের প্রেমিকা হিসেবে। গায়ত্রীর সঠিক পরিচয় তাই এখানে তুলে ধরবার চেষ্টা। - বিভাগীয় সম্পাদক


মাত্র ১৪টি কবিতা নিয়ে ১৯৬১ সালে প্রকাশিত হয় বিনয় মজুমদারের ‘গায়ত্রী’ নামের শীর্ণ একটি কবিতার বই। বাংলা কবিতায় এর আগে দুই-তিনজন নারী বেশ বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের রঞ্জনা, জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেন বা সুরঞ্জনার কথা মনে পড়বে আমাদের। রঞ্জনা আর সুরঞ্জনার মধ্যে নামের অনেকটা মিল আছে না? এই মিল-অমিল কতটা কবিতার মর্মবস্তুতে, কতটা নামে, সে ব্যাপারে গবেষণা হতে পারে। কিন্তু সে যা-ই হোক, গায়ত্রী নামটি বিনয়ের কারণে রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে উঠল। কলকাতার কবিমহলে তখন একটাই জিজ্ঞাসা, কে এই গায়ত্রী?

বিনয়ের সঙ্গে গায়ত্রীর কী ধরনের সম্পর্ক ছিল? কতটা গভীর? নাকি এ শুধু কবিকল্পনা? বিস্তর খোঁজ-খবরের পর দেখা গেল, গায়ত্রী হচ্ছে প্রেসিডেন্সি কলেজের ইংরেজি বিভাগের ডাকসাইটে সুন্দরী আর মেধাবী ছাত্রী। পরে যিনি কলকাতা ছেড়ে মার্কিন মুল্লুকে থিতু হন। তুলনামূলক সাহিত্যের অধ্যাপক আর বিশ্ববিখ্যাত একজন ভাবুক হিসেবে প্রতিষ্ঠা অর্জন করেন। এহেন একজন নারীকে বিনয়প্রেমীরা অনেক দিন বিনয়ের একজন প্রেমিকা হিসেবে ভেবে এসেছেন। এই নারীকে ঘিরে রোমান্টিক গালগল্প এখনো চালু আছে। অনেকেরই ধারণা, বিশ্বখ্যাত সেই ভাবুক গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক কবি বিনয় মজুমদারের মানসী ছিলেন।

‘আনন্দবাজার’ পত্রিকায় একজন একথা উল্লেখ করে একটা চিঠিও লিখেছিলেন। চিঠিতে পত্রদাতা উল্লেখ করেছিলেন যে, গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের বাবার নাম জনার্দন চক্রবর্তী। তিনি কলকাতার একটা হোটেলের ডিরেক্টর ছিলেন। কিন্তু আসল তথ্য হচ্ছে, গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের বাবার নাম পরেশচন্দ্র চক্রবর্তী। তিনি ছিলেন একজন ডাক্তার। কবি নির্মলেন্দু গুণের পিতৃভূমি যে বারহাট্টা, সেই বারহাট্টা গ্রামের নায়েবের বাড়িতে পরেশবাবুর জন্ম। গত শতকের চল্লিশের দশকে পেশাগত কারণে তিনি ঢাকায় সিভিল সার্জন হিসেবে চাকরি করতেন। কিন্তু একটা ধর্ষণের মামলায় সরকারের ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে তাঁকে মিথ্যে সাক্ষ্য দিতে বলা হলে তিনি চাকরি ছেড়ে কলকাতায় পালিয়ে গিয়েছিলেন।

ঢাকায় পরেশবাবুর একটা সালোঁ ছিল। বুদ্ধদেব বসু, সৈয়দ মুজতবা আলী, হুমায়ুন কবীর, উৎপলা সেন সেখানে আসতেন। এর অনেক পরে কলকাতায় গায়ত্রী যখন একবার লেডি ম্যাকবেথ নাটকের জন্য রিহার্সাল দিচ্ছেন। তখন সেখানে এসেছিলেন সৈয়দ মুজতবা আলী। গায়ত্রী বলছেন, “রিহার্সাল হচ্ছে, সৈয়দ মুজতবা আলী একদম মদে চুরচুর হয়ে বসে আছেন ওখানে...উনি আমাকে কাছে ডেকে নিয়ে বললেন, মা, পরিচয় দাও মা। বললাম, আমার বাবার নাম পরেশ চক্রবর্তী। উনি একদম তরিৎস্পৃষ্টবৎ চমকে উঠে বললেন, তুমি এখানে কী করছো? উনি তো সাধু ছিলেন। আমি বললাম, সাধু হলে কি নাটক করা যায় না?” গায়ত্রী এরপর পাড়ি জমান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে উচ্চশিক্ষা শেষ করে তুলনামূলক সাহিত্য পড়াতে শুরু করেন। সমকালের একজন গুরুত্বপূর্ণ ভাবুক-তাত্ত্বিক হিসেবে অর্জন করেন প্রচণ্ড খ্যাতি।

সম্প্রতি আমার হাতে এলো গায়ত্রীর ‘সমর সেন স্মারক বক্তৃতা ২০১৭’ নিয়ে প্রকাশিত একটা গ্রন্থ ‘গণতন্ত্রের রহস্য’। আরো আগে পেয়েছিলাম এই সময়ের আরেক তুখোড় ভাবুক-তাত্ত্বিক জুডিথ বাটলারের সঙ্গে আলাপচারিতা নিয়ে প্রকাশিত আরেকটি বই—Who Signs the Nation-State? এই দুটো বইয়ের বিষয়বস্তু একই। দেশ, দেশহীনতা, গণতন্ত্র, অভিবাসন, ডায়াসপোরা, বিশ্বায়ন, সাহিত্য- সর্বোপরি ‘ক্ষমতা’। ২০১০ সালে গায়ত্রীর একটা ইন্টারভিউ পড়েছিলাম ‘বইয়ের দেশ’-এ। অসাধারণ ওই সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছিলেন এই সময়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন লেখক চিন্ময় গুহ। সেই সাক্ষাৎকারটি পড়ে গায়ত্রীকে বেশ ভালোই চিনেছিলাম। তারও আগে গায়ত্রীর প্রায় সব বই আমি অবশ্য পড়ে ফেলি। মহাশ্বেতা দেবীকে নিয়ে তাঁর সেই বিখ্যাত Can the Subaltern Speak লেখাটির কথা তো সবারই জানা। কিন্তু আমার কাছে A Critique of Postcolonial Reason এবং Other Asias বই দুটি আরো গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে।

একটা কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, গায়ত্রীকে বারবার পড়া যায়। বিশ্বপ্রেক্ষাপটে আমাদের এশীয় চেহারাটা তিনি ভালোই তুলে ধরতে পেরেছেন। ওঁর কয়েকটি বক্তৃতা ইউটিউবে আছে। সেই বক্তৃতাগুলিও বেশ ভাবনা জাগানিয়া বলা যায়। আর সেই যে ২০০০ সালে তুলনামূলক সাহিত্যের মৃত্যু ঘোষণা করেছিলেন একটা বক্তৃতায়, তাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয় আমার কাছে। গায়ত্রী আসলে ছিলেন বিনয়ের কবিতার মানসী, বাস্তবের প্রেমিকা নন। তবে যে গায়ত্রী এখন বিশ্বখ্যাত, তিনি নন, বিনয়ের গায়ত্রী ছিলেন অন্য গায়ত্রী। বিনয় মজুমদারকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল তিনি যে গায়ত্রীকে নিয়ে কবিতা লিখলেন, তাঁকে কি তিনি ভালোবাসতেন? উত্তরে তিনি কী বলেছিলেন দেখেন—

“আরে ধ্যুত, আমার সঙ্গে তিনচার দিনের আলাপ। প্রেসিডেন্সি কলেজের কলেজের নামকরা সুন্দরী ছাত্রী ছিলেন ইংরেজি সাহিত্যের—তারপর কোথায় যে চলে গেলেন—আমেরিকা না কোথায় ঠিক জানি না।”

তাহলে ওকে নিয়ে কবিতা কেন?

“কাউকে নিয়ে তো লিখতে হয়—আমগাছ কাঁঠালগাছ রজনীগন্ধা নিয়ে কি চিরকাল লেখা যায়?”

আপনার মতামত লিখুন :