এই দুর্যোগে নারী-পুরুষ একে অন্যের সহায় হন

কাজী নুসরাত শরমীন
অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

  • Font increase
  • Font Decrease

সময়টা ভালো নয়। সময়টা আত্মনিয়ন্ত্রণের, কৃচ্ছ্রতা সাধনের। ঘরে থাকা জরুরি, তাহলে করোনাভাইরাসজনিত রোগটা ছড়ানোর আশঙ্কা কিছুটা কম। কৃচ্ছ্রতা সাধন কথাটা বারবার বলতে চাই। খাদ্যাভ্যাস থেকে শুরু করে আচরণে যতটা সৌম্য শান্ত থাকা যায়।পৃথিবীর সকল দুর্যোগে নারী সবচেয়ে ভোগান্তির পথ পাড়ি দেন। এদেশে বিয়ে মানেই একজন নারীর কাঁধে একটি পরিবারের সমস্ত দায় এসে চাপে। পরিবারের সদস্যসংখ্যা কম বা বেশি যাই হোক না কেনো, তাদের খাওয়া, পড়া, ঘুম, ভালো লাগা, না লাগা সব দায় ওই নারীর। এমনকি বরের কাজের জায়গায় যত মানসিক চাপ, পরিশ্রম তার দায়ও ওই নারীটির। যেন কেবলমাত্র বউয়ের জন্যই তিনি খেটে মরছেন। নারীর রোগ, জরা-মরা থাকতে নেই। এ এক অলিখিত দাস প্রথা।

আজ যে প্রসঙ্গে এ কথা লিখছি, যে করোনাভাইরাসের ভয়ে আপনি ঘরে ঢুকেছেন, হাতে গ্লাভস পরে, মুখে মাস্ক এটে কষ্ট করে টেলিভিশনের রিমোট চাপছেন, আর কিছুক্ষণ পরপরই টাইমলি বারবার চা-নাস্তা পাচ্ছেন না বলে চিৎকার করে পাড়া মাথায় নিচ্ছেন। টেবিলে দশ পদের খাওয়া না হলে চলে না বলে ঘরে থাকা গৃহকর্মী আর ওই যে কাবিনের রেজিস্ট্রেশনে পাওয়া অলিখিত দাসের পিণ্ডি চটকাচ্ছেন, এর নাম কৃচ্ছ্রতা নয়। এই দুর্যোগে অন্তত স্বভাবটা বদলান। সব দায় নারীর ঘাড়ে চাপানোর যে পুরুষতান্ত্রিকতা আপনি মনে মনে মগজে লালন করছেন, অন্তত এই সময়ে আচরণে সংযমী হন।

গুরুগম্ভীর তত্ত্ব ও পরিসংখ্যান শোনার মানসিকতায় নেই আমরা। সাম্য ও সমতার তর্কও কানে লাগবে এখন। আর নারীবাদ? সে তো অচ্ছুৎ শব্দ বলে ঠাঁই-ই পায়নি সমাজের মনে মগজে। ভীষণ পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজে কেবল পুরুষ নন, একজন নারীও হতে পারেন ভীষণ পুরুষতান্ত্রিক।

আর ১০০ জনে যে ১০জন এ আলোচনার বাইরে, তাদেরকে স্যালুট। জীবনের সকল দুর্যেোগ দুর্বিপাকে নারী ভীষণ একলা। আপনার ১০ বারের চা আর টেবিলভর্তি পদ তৈরি করতে গিয়ে সে হয়তো খাওয়ার সময়ই পায় না। অথবা আপনারও এত সময় হয় না যে খোঁজ নেবেন, আপনার মা, স্ত্রী, সন্তান ঠিক মতো খেয়েছে কিনা। অতিরিক্ত কাজের চাপে তাদের ক্লান্ত লাগছে কিনা। এই বৈরী সময়ে গৃহবন্দি থেকে তাদের খিটিমিটি লাগছে কিনা। জীবনে এ পর্যন্ত যথেষ্ট সার্ভিস নিয়েছেন। এবার তাদের দিকেও একটু তাকান।

করোনাভাইরাসের কারণে ঘরে ঘরে অনেক মজুদদারের চরিত্র প্রকাশ পেয়েছে। সেদিন সাপার শপে এমনই এক মজুদদার চরিত্রের ক্রেতার সামনে টিভি রিপোর্টার, তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, কেনো আপনি এত পণ্য কিনছেন? উত্তরে তিনি জানিয়েছেন, তার স্ত্রী তাকে এত পণ্য কিনতে পাঠিয়েছেন! যেন তার নিজস্ব বিচারবুদ্ধি লোপ পেয়েছে, অথবা ওই যে পুরুষতান্ত্রিকতা? নারী বেশি বেশি কেনেন, বেশি বেশি খরচ করেন... বহুকাল ধরে চলা নারীর বিরুদ্ধে পুরুষতান্ত্রিক ধ্যান ধারণা চাপিয়ে দেওয়া আরকি। এটা লোকে বেশি বিশ্বাস করে, তাই ওই টিভি রিপোর্টারের সামনে দাঁড়ানো ভদ্রলোকের মাথায় ওই মুহূর্তে এটাই মোক্ষম উত্তর মনে হয়েছে। এটাই এখানে সিদ্ধ।

আজ এ লেখার যথেষ্ট যুক্তিযুক্ত কারণ আছে। কাউকে আঘাত করা এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। সকালে ঘুম ভাঙতেই কাছের বন্ধু মিতার (ছদ্মনাম) ফোন পেলাম। ও হাউমাউ করে কাঁদছিল। জানতে চাইলাম কী হয়েছে। ও যা বলল তা অনেকটা এমন, ওর বর রোজ ঘুম থেকে উঠে বা বাইরে থেকে ফিরে খেয়াল করে মিতা কী করছে। যদি দেখে মিতার হাতে কাজ নেই, তখন সে ধরেই নেয় মিতা সারাদিন বসেই থাকে, কোনো কাজ করে না। মিতার বরের সব আচরণ এর ওপর নির্ভর করে। মিতাকে সারাক্ষণ দাসী-বাঁদির মতো কাজ করতে দেখলেই সে শান্ত থাকে।

নিজে এক গ্লাস পানিও ঢেলে খায় না। সব তার মুখের সামনে ধরে রাখতে হয়। তারপর পান থেকে চুন খসলেই চিৎকার চেঁচামেচি আর অশ্রাব্য গালিগালাজ।
ওকে থামানোর চেষ্টা করলাম। অনেকক্ষণ ফোনে কথা বললাম, কিছুটা শান্ত হলো। এই দুর্যোগের সময়টা পাড়ি দেওয়া ওর জন্য কত কঠিন তা ভাবতে পারছি না। ও নিজের সুরক্ষার কথা ভাববে কখন?

এই মিতারাই অবদমিত নারীর প্রতিনিধিত্ব করে, আপনি আমি নই। তাই বলি, দুর্যোগটা নারী পুরুষ নির্বিশেষে সবার জন্য। তাই বাড়ির নারী সদস্যটির প্রতি মানবিক হোন। আপনাকে বাড়তি কিছু করতে বলো হচ্ছে না, কেবল মানুষের আচরণ করুন।


কাজী নুসরাত শরমীন
লেখক ও সাংবাদিক

আপনার মতামত লিখুন :