শিল্প, পেশা ও নারীচিত্র

লায়লা ফেরদৌস হিমেল
অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

  • Font increase
  • Font Decrease

ব্যক্তির সুনির্দিষ্ট বিষয়ে প্রশিক্ষন গ্রহণ পরবর্তী জীবন-জীবিকা নির্বাহের জন্য প্রাপ্ত চাকরি বা বৃত্তি-বিশেষ যদি পেশা হয় তবে তার প্রধাণতম শর্ত হলো শারীরিক ও মানসিক শ্রমের বিনিময়ে অর্থ উপার্জন। শারীরিক ও মানসিক শ্রম-শর্তে শিল্পীর প্রত্যেকটি সফল শৈল্পিক প্রয়াস ‘পণ্য’। তাই শিল্প সৃষ্টির পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা শিল্পীমনের নানাবিধ প্রত্যাশা হৃদয়ানন্দে বেজে ওঠা করতালিতে পূর্ণ হলেও তা শিল্পী ও শিল্পের পেশাগত শর্তপূরণে কোনো ভূমিকা রাখে না। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সংগীত, নাট্যকলা, নৃত্যকলা, চারুকলা বা অন্যান্য প্রায়োগিক কলা বিষয়ে অধ্যয়ন শেষ করা একজন ছাত্রকে তাই হিমশিম খেতে হয় তার বিষয় ও অভিজ্ঞতা অনুযায়ী চাকরি খুঁজে পেতে। এই যুদ্ধটা শুরু হয় আসলে আরো আগে থেকে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে একজন ছাত্র একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একাধিক বিষয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। কারণ তারা সবাই ‘ভালো সাবজেক্টে’ পড়তে চায়। এই তথাকথিত ভালো সাবজেক্টের তালিকায় যে ‘প্রায়োগিক কলা’ বিষয়টি সচারচর থাকে না তার প্রমাণ মেলে ছাত্রদের সাবজেক্ট চয়েস ফর্মের দিকে তাকালে। তবে কেবলই প্রায়োগিক কলা—সংগীত, নৃত্যকলা, নাট্যকলা বা চারুকলায় পড়বে সিদ্ধান্ত নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়; এমন দৃষ্টান্তও বিরল নয়, এমন ছাত্ররা খানিকটা মানসিক সংকটের মধ্য দিয়েই শুরু করে তাদের শিক্ষাজীবন। যদিও উল্লিখিত উভয় দলের কেউই শেষ পর্যন্ত পেশা হিসেবে প্রায়োগিক কলাকে গ্রহণ করে না। এর কারণ খুঁজতে গেলে প্রথমেই ছাত্র শব্দটিকে ভেঙে দিতে হবে। কেননা সমস্যাগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে ছেলে ছাত্র ও মেয়ে ছাত্রের ক্ষেত্রে ভিন্ন। তবে ছেলে-মেয়ে উভয় ছাত্রের ক্ষেত্রে কমন যে সমস্যাটি থাকে তা হলো ‘ক্ষেত্র সমস্যা’।

প্রায়োগিক কলাকে পেশা হিসেবে নেওয়ার মতো যথোপযুক্ত ক্ষেত্রের সংকট রয়েছে—এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তাই পাঁচ বছরের অর্জিত প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানকে সখের থলেতে ফেলে চাকরি খুঁজতে হয় ভিন্নতর ক্ষেত্রে গিয়ে। এদের মধ্যে কেউ কেউ ব্যাংক, এনজিও বা বেসরকারি টিভি চ্যানেলে যোগদান করে। এভাবে পারফর্মিং আর্টসের পারফরমার ছাত্ররা প্রোগ্রাম এ্যাসিস্ট্যান্ট, ব্যাংকার বা এনজিও কর্মকর্তা বনে যায়। এদের মধ্যে অল্প দুয়েকজন অতি মেধাবী ভাগ্য জোরে শিক্ষকতা পেশায় নিযুক্ত হন বা যার প্রচুর টাকা আছে সে খুলে বসে নিজস্ব প্রতিষ্ঠান। ওদিকে মনের গোপন থলেতে লুকিয়ে রাখা শিল্পসত্তা সুযোগ পেলেই সময়ে-অসময়ে উঁকি দিতে শুরু করে। ভিন্নতর ক্ষেত্রে দাপ্তরিক কাজ সারতে গিয়ে টিএসটির বারান্দায় বসে গিটারের তারে সুরের ঝংকার তোলা ছেলেটির নিজের জীবনের তারে টান পড়ে যায়। থিয়েটার ল্যাবে যে মেয়েটি একাধারে রবীন্দ্রনাথ, গ্যেটে, ফাল্লাচি বা সেলিম আল দীনের বিভিন্ন চরিত্রের অভিনয় করে তাক লাগিয়ে দিত সেও প্রতিদিন একই সময়ে একই ধরনের পোশাকে একই অফিসে একই কাজে নিজেকে অভ্যস্ত করার চেষ্টায় লিপ্ত হয়। এ যেন নিজের ভেতরে নিজ অস্তিত্বকে আড়াল করে নিজেকেই এগিয়ে নেওয়ার সামিল।

এই সংকটকালীন সময়ে এসে একজন পুরুষ তার দাপ্তরিক কাজের ফাঁকে শুরু করে শখের শিল্প সাধনা। গড়ে তোলে নতুন কোনো সংগঠন বা পুরনো সংগঠনে যোগ দিয়ে চেষ্টা করে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কারের। যদিও শিল্পচর্চার এই প্রয়াস হওয়ার কথা ছিল তার দাপ্তরিক কাজেরই একটা অংশ। অন্যদিকে একজন নারী এ সময় অন্য চিন্তায় ডুব দেন। পূর্বোক্ত সেই মেয়ে ছাত্রীটির কথা বলছি। ঠিক এ সময়ে সে পূর্ণাঙ্গ একজন নারী। দাপ্তরিক কাজের ফাঁকে এ সময় সেই নারীকে শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে হয় অন্তত আরো একটি প্রাণের স্পন্দন এ পৃথিবীতে নিয়ে আসার জন্য অথবা দুটি। কারণ সচেতন সে নারী জানে পঁয়ত্রিশ মানেই ঝুঁকি। নতুন একটি সংসার গড়ে তোলার যুদ্ধও চলছিল একই সাথে। পাশাপাশি চলমান সামাজিক ও পারিবারিক অন্যান্য প্রতিকুলতার কথা নাই বা বললাম। কারণ আমরা কথা বলছি একবিংশ শতাব্দির নারী প্রসঙ্গে। সে নারী নাজুক নয় নিশ্চিত। এ সময়ে সংগীত ও চারুকলার পাঠ চুকিয়ে আসা নারী অভ্যস্ত অভিজ্ঞ হস্ত বা কণ্ঠের সাথে মস্তিস্কের অনুরণন ঘটিয়ে শিল্পচর্চা খানিকটা চালিয়ে যেতে পারলেও নৃত্যকলা বা নাট্যকলার পাঠ চুকিয়ে আসা নারীটি নিরুপায়। এ সময় তাকে বিরতিতে যেতেই হয়। নির্ধারিত ছ মাস বা তারও আগে দাপ্তরিক কাজ শুরু করলেও সখের থলের তালা খুলতে সময় লাগে অন্তত দু বছর বা তারও বেশি। এরপর যখন সে চোখ খোলে তখন তার সামনে দৃশ্যমান হয় নতুন এক পৃথিবীর। যে পৃথিবীর অলি-গলি সবকিছুই তার অজানা অচেনা। পেশা ও শিল্পের দাম্ভিকতার নদীতে জীবন তরী ভাসিয়ে ছুটে চলা এক নারীর—এই চিত্র।


লায়লা ফেরদৌস হিমেল
প্রভাষক, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ

আপনার মতামত লিখুন :