“নেতৃস্থানীয় হয়ে উঠবার মনোভাব বাংলাদেশে নারীবাদের অন্যতম সমস্যা”

ক্যামেলিয়া আলম, বিভাগীয় সম্পাদক, নারীশক্তি
অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

  • Font increase
  • Font Decrease

মানস চৌধুরী গল্প লিখতে শুরু করেছেন প্রবন্ধের থেকে এর প্রকাশনা সহজ হতে পারে এই ভেবে, ২০০২ সালে। প্রথমে সেটা মনে হলেও পরে আর প্রকাশনা সহজ মনে হয়নি তাঁর। লিখে শেষ করার ৪ বছর বাদে তাঁর পয়লা গল্পগ্রন্থ ‘কাকগৃহ’ প্রকাশিত হয়, ২০০৮ সালে, পাঠসূত্র থেকে। পরের ৬ বছরে বাঙলায়ন আর শুদ্ধস্বর থেকে তাঁর আরো খান-তিনেক গল্পের বই বের হয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষকতা তাঁর পেশা। পাশাপাশি সংবাদ-আলোকচিত্র ও মিডিয়া অধ্যয়নে লম্বা সময় পড়িয়েছেন। বিদ্যাজগতে তিনি অনিয়মিত, তবে মোটামুটি প্রকাশিত লেখক। নারী অধিকার, ক্ষমতায়ন ও নারী-পুরুষ বৈষম্যসহ নানাবিধ বিষয়ে সম্প্রতি মানস চৌধুরী কথা বলেছেন নারীশক্তির বিভাগীয় সম্পাদক ক্যামেলিয়া আলমের সাথে।


নারী পুরুষের বৈষম্য আছে তা জানি, চেনাজানা ধরনের বাইরে আর কোনো বিষয় কি চিহ্নিত করতে পারেন?
মানস চৌধুরী: এটা আমার জন্য অত আরামদায়ক প্রশ্ন নয়। এখানে উচ্চারিত/লিখিত “জানি”টা এত লঘুভাবে উচ্চারিত যে আমার সংশয় আছে। তাছাড়া রাজনৈতিক প্রশ্ন চিরকালই জানার চেয়ে অধিকতর মানার, মানার চেয়ে অধিকতর বাস্তবায়নের, বাস্তবায়নের থেকে অধিকতর রূপান্তরের। এটা একটা জটিল সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক যুগপৎ রাস্তা হিসেবে আমি দেখি। চেনাজানা ধরন বলতে আপনি যা যা মনে করেন, আমিও তা তা মনে করি কিনা অত নিশ্চিত নই। বরং যে কোনো গোষ্ঠী বা প্রজাতিকে ‘অক্ষম’, ‘অনগ্রসর’, ‘ছোট’, ‘নির্ভরশীল’, ‘অনুদান বা দয়াসাপেক্ষ’ ইত্যাদি ভাবনাচিন্তার সামাজিক পাটাতন অত্যন্ত শক্তিশালী। সামাজিক এই পাটাতন একদিকে শিক্ষাব্যবস্থা থেকে গড়ে ওঠে, কিন্তু আরো সূক্ষ্মভাবে গড়ে ওঠে সামাজিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেও। ফলে আমি অনুমতি চাইব যাতে লক্ষণ গুনে গুনে নারীপুরুষের বৈষম্য বিষয়ক এই প্রশ্নটিতে আমার সংমিশ্রিত হতে না হয়।

সম্পদ বণ্টন আর উত্তরাধিকার নারীকে অবস্থানচ্যূত করেছিল, এ নিয়ে আপনার এনালাইসিস জানাবেন?
মানস চৌধুরী: সম্পদ বণ্টন আর উত্তরাধিকার বিষয়দুটোকে এক কাতারে রেখে আলাপ করতে আমি খুব চাইব না। এগুলো দেড়শ বছর আগেই আলাপিত প্রসঙ্গ যে বণ্টনের প্রসঙ্গটি সামাজিক ন্যায্যতার আর উত্তরাধিকারের প্রসঙ্গটাই সামাজিক ন্যায্যতা লঙ্ঘন করে “ব্যক্তিগত” সম্পদ হাসিল করার ‘অন্যায্যতার’। কেউ মার্ক্সবাদী (কিংবা নারীবাদী) না হতে চাইলে তাঁর সঙ্গে মারামারি করা হয়তো যায় না, কিন্তু সম্পদ নিয়ে এসব বিশ্লেষণে তাঁদের তীক্ষ্ণতাকে স্বীকার করতেই হবে। বিদ্যমান বাস্তবতার কথা যদি বলেন, বলাইবাহুল্য এই লিঙ্গভিত্তিক উত্তরাধিকারের নিশ্চয়ই আমি সমর্থক নই।

নারী মুক্তি বাধার ক্ষেত্রে দুইটি বিষয় প্রণিধানযোগ্য, ১. পুরুষতান্ত্রিক প্রবণতা ২. সমাজে নারীর অধিকার! ...এর মাঝে কোন বিষয়টি গুরুত্ব নিয়ে দেখা উচিত? আর এ সংকট কাটাতে করণীয় কী?
মানস চৌধুরী: দেখুন এই দুয়ের মধ্যে একটা হচ্ছে সমাজমনোস্তাত্ত্বিক এমনকি শিক্ষাদর্শনগত আরেকটা হচ্ছে আইনগত। ফলে এ দুয়ের মধ্যে একটা তুলনা করতে বসা আমার জন্য হাতি আর শালিকের কার্যক্ষমতার তুলনামূলক আলোচনার মতো। সেটা চিত্তাকর্ষক হতে পারে, কিন্তু অপ্রয়োজনীয় আলাপ হবে। নারীর অধিকার আইনীভাবে নিশ্চিত করা একদম সাধারণ, অত্যন্ত প্রাথমিক একটা পদক্ষেপ। আধুনিক রাষ্ট্রে সেটার বিধান নিশ্চিত করা নিয়ে কোনো আলাপেরই আসলে দরকার নেই। কেন হচ্ছে না, তা নিয়ে বরং প্রচুর আলাপের দরকার আছে। পক্ষান্তরে, একটা আধুনিক রাষ্ট্রে তথা জনসমাজে ‘পুরুষপ্রাবল্যবাচক’ প্রজা কেন তৈরি হচ্ছে তার আলাপটা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র একটা শিক্ষা-দর্শন-সমাজপ্রকরণগত আলাপ-আলোচনা হবে। এ দুয়ের মাঝে আপনার অনুমতি চেয়ে আমি তুলনা না করতে ইচ্ছুক।

নতুন শব্দ বা ভাষারীতি নারী পুরুষের মননশীলতায় পরিবর্তন আনতে পারে। সাহিত্যের প্রচলিত ভাষার পাশে নারীবাদী পাঠ্যভাষা কী হতে পারে? আর তা গ্রহণযোগ্যতা পাবে বলে আপনার মনে হয়?
মানস চৌধুরী: শর্তসাপেক্ষে এটা আমি মনে করি। শব্দ ও ভাষারীতি আমাদের চিন্তাপ্রণালীকে প্রভাবিত করবার সামর্থ্য রাখে বলে আমি মনে করি। তবে এই প্রভাবন রাষ্ট্র ও সমাজের অন্যান্য গুরুতর রদবদল বা কারিগরির বিকল্প নয়। সেগুলো অত্যাবশ্যক। কিন্তু খোদ সাহিত্যের দুনিয়ার লিঙ্গবাদী আচরণ নিজে একটা গুরুতর সংকট বা চ্যালেঞ্জ। নারী লিখিয়েদের অনেকে, এবং পুরুষ লিখিয়েদের দুচারজন এই সংকটটাতে দৃকপাত করেছেন। তাঁরা ভিন্ন ধরনের ভঙ্গিমা/এটিচ্যুড রচনায় আনারও চেষ্টা করেছেন। বেগম রোকেয়া বা তসলিমা নাসরিন হয়তো পরিচিত উদাহরণ, কিন্তু উদাহরণ এখানেই সীমিত নয়। তবে মুশকিল হচ্ছে সাহিত্য-প্রণয়নকারী ব্যক্তিবর্গ আর সাহিত্য-সঞ্চালক প্রণালীগুলো খুব আলাদা। কয়েকজন নারী (বা পুরুষ সাহিত্যিক/রচনাকার) চেষ্টা করছেন বলেই সাহিত্য উৎপাদন প্রণালীর গুরুতর চরিত্র বদল হচ্ছে না। সেটা আমার বলবার জায়গা।

নারীকে কেন্দ্র করে যে সাহিত্য রচনা হয়েছে সেখানে নারীর শক্তিকে যতটা রোমান্টিসজম বা পুরুষতান্ত্রিক চোখের শক্তিমত্তা, যেমন—মা, দেবী আকারে দেখানো হয়েছে তার বাইরে নারীর স্বরূপ সাহিত্যে নাই কেন?
মানস চৌধুরী: নাই বলব না, অল্প আছে এবং অদৃশ্যমান আছে। দেখুন, ভারতের অল্প হলেও বিভিন্ন অঞ্চলে সীতাকেই প্রটাগনিস্ট বানিয়ে রামায়ণ পাঠ আছে। কিন্তু সেটা তো আমরা জানি না, কিংবা জানলেও গৌণ ভাবি, ‘নরমাল’ভাবে নিই না। পুরুষের আকাঙ্ক্ষার নারী (যৌনার্থে হোক আর মমতার্থে হোক) প্রচলিত সাহিত্যে আসছে প্রবলভাবে, নিরবচ্ছিন্নভাবে। সেসব নারীরূপের বদল ঘটানোর জন্য সাহিত্যচর্চাকার পুরুষদের যেমন লিঙ্গরাজনৈতিক চেতনা জাগতে হবে; তেমনি নারী সাহিত্যচর্চাকার বিপুলভাবে বিকশিত হতে হবে। আর এগুলো সামাজিক-রাজনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমেই কেবল হওয়া সম্ভব।

অনেকের কাছে অতিরঞ্জন লাগতে পারে, কিন্তু আমি মনে করি ফেসবুকে অন্তত শক্তিশালী নারীস্বর থাকার কারণে খুব সূক্ষ্ম কিছু বদল আমি দেখতে পাই। সেগুলো স্বতন্ত্র কোনো আলাপে চুলচেরা দেখানো সম্ভব। আবার না-দেখানোও কাজের হতে পারে। কিন্তু এই পরিমণ্ডলে শক্তিশালী নারীস্বর এই পরিমণ্ডল ব্যবহারকারী নানান পুরুষকে হয় দায়িত্বশীল, নয়তো সতর্ক করেছে। বিষয়গুলো আন্দোলন/তৎপরতাসাপেক্ষ।

সাহিত্য আমাদের মনোজগতের এক অদৃশ্য অক্সিজেন, ফলে নারী এর থেকে বেরুতে তো পারছে না। এ বিষয় এ আপনার মতামত কী?
মানস চৌধুরী: আমাকে ক্ষমা করবেন, কিন্তু প্রশ্নটি আমার কাছে অস্পষ্ট। প্রথমত, ‘মনোজগতের অক্সিজেন’ বা ইত্যাকার অভীধা আমার একেবারেই রেটরিক লাগে আর আমি সংমিশ্রিত হতে চাই না। দ্বিতীয়ত, যদি মূল অর্থ ধরে আগাইও, তাহলেই বা কেন নারীর এর থেকে বের হতে হবে? সাহিত্য-চলচ্চিত্র-সঙ্গীত ইত্যাদি ‘উপভোগ্য’ জিনিস থেকে নারী ‘বেরুলে’ই বা তাঁর কী উপকার হচ্ছে?

শিল্পের আচরণ আর শিল্পী হবার তফাতের বাস্তবতায় নারী আদৌ আসতে পারবে?
মানস চৌধুরী: এটা আরেকটা প্রশ্ন যা আমার কাছে অস্পষ্ট। তবে যদি ধরে নিই প্রশ্নটিতে বলা হচ্ছে এই যে নারী যখন শিল্পচর্চা করেন তখন ইতোমধ্যেই বেঁধে-দেওয়া শিল্পের মানদণ্ড অনুযায়ী চর্চা করছেন আর সেটা ভীষণ রকমের পুরুষাধিপত্যমূলক দর্শন দ্বারা পরিচালিত; নারী এই চর্চার বাইরে আসতে পারবেন কিনা। আলবৎ পারবেন। সকল বদল সকল রূপান্তর রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা থেকেই সাধিত হয়। সেই আকাঙ্ক্ষাটা সমাজে, অন্তত মধ্যবিত্ত সমাজে, অন্তত মধ্যবিত্ত নারী সমাজে জাগরূক হলে শিল্পচর্চাতেও তার প্রভাব পড়বে, ফল পাওয়া যাবে।

নারীবাদকে সমর্থন করেন?
মানস চৌধুরী: হা হা হা। অনেক বছর আগে একবার আমাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল একজন অধ্যাপককে (আনু মুহাম্মদ) পুলিশ যে রাস্তায় পিটাচ্ছে সে বিষয়ে আমার অবস্থান কী। আমি হতভম্ব হয়েছিলাম প্রশ্নটাতে। আপনার প্রশ্নটা তার থেকে ভালো। জ্বি আমি সমর্থন করি। তবে আপনার মতো আমিও সতর্ক যে নারীবাদ নানাবিধ, নানান বাস্তবতা-উদ্ভূত, আর লিঙ্গস্বার্থের বাইরেও নানান স্বার্থ-তৎপরতায় সামিল। একটা বর্গের অধীনে রেখে সকল ধরনের নারীবাদের সকল ধরনের উদ্যোগের প্রশ্নাতীত সমর্থক আমি নই। আর প্রশ্নাতীত সমর্থক আমি কোনো বর্গেরই নই।

পাশ্চাত্য নারীবাদ কি আমাদের সংস্কৃতিতে প্রযোজ্য?
মানস চৌধুরী: আমার জন্য এটাও হাতি ও শালিকের মতো প্রশ্ন। একটা রাজনৈতিক-বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতার প্রসঙ্গ, অন্যটি সংস্কৃতি, বড়জোর জীবনশৈলী/লাইফস্টাইলের প্রসঙ্গ। দুটোকে আমি না গুলিয়ে থাকবই থাকব। তত্ত্ব ও মতবাদ রাষ্ট্রীয় সীমানা মেনে চলার কথা নয় সেটা তো খুবই সাধারণ জ্ঞানের প্রসঙ্গ। আর যদি লাইফস্টাইলের কথাই বলি, সেখানে পৃথিবীতে “আমাদের সংস্কৃতি” আর কতটা “আমাদের” রয়েছে, কতটা থাকা “জরুরি”, আদৌ রেখে দেওয়া “সম্ভব” কিনা তা নিয়ে বিশ্বায়নের তার্কিক ও আলোচকগণ ব্যাপক আলোকপাত করেছেন।

যদি আপনার প্রশ্নটা এই কারণে করে থাকেন যে কিছু নারীবাদীর জীবনযাপন আপনি পছন্দ করেন না, তো আমি মনে করিয়ে দেব যে কিছু অনারীবাদীর জীবনযাপনও আপনি পছন্দ করেন না, সম্ভবত। যদি এমন হয় চারপাশে নারীবাদীদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গারের জন্য তাঁদের পোশাক-আশাক ইত্যাদি বিষয়ে গালমন্দ করছেন লোকজন এবং সেই বাস্তবতাতে আপনি প্রশ্নটা করেছেন তাহলে আমি বিনয়ের সঙ্গে বলব যে এসব গালমন্দ নিয়ে আমার আগ্রহ কম। কিন্তু মতবাদ একটা রাষ্ট্রের মধ্যে আটকে রাখতে হবে এরকম অদ্ভুত প্রস্তাব নিয়ে আমি আলাপ না করতে চাইব।

নারী পুরুষের সমন্বয়ের পথ খুব সহজে কী হতে পারে?
মানস চৌধুরী: আমার বিবেচনায় সমন্বয় শব্দটি এখানে ব্যাখ্যার দাবিদার। এটা কী কী অর্থে কেউ বলে থাকতে পারেন তার একটা তালিকা এরকম হবে: সহযোগিতা, বন্ধুত্ব, ভাগিদারী, যৌথতা, সুস্পষ্ট যোগাযোগপ্রণালী, স্বচ্ছতা ইত্যাদি। কিছু ভাগিদারী তো বিদ্যমান ইচ্ছানিরপেক্ষভাবেই। যেমন ধরুন, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের আইনে একটা ন্যায্য ও বৈধ বিয়ে করার জন্য একজন নারী ও পুরুষকে অংশগ্রহণ করতে হয়। জানা মতে, বাচ্চা উৎপাদনের কাজটাও সেভাবেই ঘটে। তারপর ধরুন, শ্রম-ঠিকাদাররা প্রায়শই নারী শ্রমিকদের খুঁজতে থাকেন তাঁদের কম বেতন দেবার ব্যবস্থা চালু আছে বলে। সেটাও সমন্বয়েরই একটা উদাহরণ। গ্রামে কথিত আছে যে, ক্ষুদ্র ঋণের সুলভ টার্গেট নারী বলে অনেক পরিবারে নারী পুরুষ গল্প করতে করতে একত্রে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে ঋণ গ্রহণের জন্য বাড়ির নারী যাবেন। এটাও সমন্বয়েরই উদাহরণ।

তবে প্রশ্নটাতে যদি লিঙ্গবৈষম্যের অবসানের বিষয়ে ইঙ্গিত করা হয়ে থাকে তাহলে আমি অনেকের মতোই মনে করি যে খুব সহজ কোনো রাস্তা নেই। রাস্তাটা ইনসাফ প্রতিষ্ঠার দীর্ঘকালীন ও বন্ধুর পথপরিক্রমার আন্দোলনেরই হবে।

বাংলাদেশে নারীবাদীদের সমস্যা কী?
মানস চৌধুরী: এটা আমার জন্য কঠিন প্রশ্ন, তাছাড়া এটার উত্তর দেওয়াতে কর্তৃত্বের সঙ্কটও রয়েছে। কয়েক দশকের (নাগরিক) নারীবাদী আন্দোলন বাংলাদেশে বিদ্যমান এবং সেখানে অত্যন্ত যোগ্য প্রবক্তা রয়েছেন যাঁরা এই প্রশ্নটির উত্তর দেবার ক্ষেত্রে সঠিক কর্তা। তবে একজন সামাজিক মানুষ হিসেবে, কৌতূহলী হিসেবে, আমার কিছু ভাবনা আছে। সম্প্রতি একটা রচনাতে আমি লিখেছিলাম মুখ্য একটা সমস্যার কথা। সেটা হচ্ছে বিশ্বাস ও ভরসার সমস্যা। আমি মনে করেছিলাম সম্ভাব্য মিত্র খুঁজে পেতে, এবং মিত্রদের মধ্যে একটা অটুট বা টিঁকসই ভরসার সম্পর্ক বিরাজমান রাখবার অনুশীলনের চেয়ে নীতিনৈতিক শাসন করা কিংবা নেতৃস্থানীয় হয়ে উঠবার মনোভাব বাংলাদেশে নারীবাদের অন্যতম সমস্যা সৃষ্টি করছে। আমার ওই বিবেচনাটি প্রকাশিত হয়েছিল আহমেদ রশীদ টুটুল সঞ্চালিত ওয়েবজিন “শুদ্ধস্বর”-এ। আমার ভাবনাকে সমালোচনা করে কিংবা ত্রুটি দেখিয়ে দিয়ে কেউ কখনো আগামীতে কিছু রচনা করলে এবং তা আমার দৃষ্টিগোচর হলে আমি আমার ভাবনা পুনর্তদন্ত করব।

এদেশে নারীদের সম্ভাবনার দিক কী হতে পারে, যা বাস্তবিকই তার অবস্থান পাল্টাবে?
মানস চৌধুরী: এই প্রশ্নটিও আমার সামর্থ্যের তুলনায় গুরুভার প্রশ্ন এবং আমার কর্তৃত্বের বাইরের প্রশ্ন। তবে আগের অনুচ্ছেদটির দিকে দৃকপাত করলে, আমি প্রাথমিকভাবেই কয়েকটা বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিতে চাইব। প্রথমত, নারীবাদী বিভিন্ন বর্গ ও গোষ্ঠীর মধ্যকার একটা কাজ-চালানোর-মতো দীর্ঘ ও আপৎকালীন সুদৃঢ় ঐক্য। এটা কঠিন, বিশেষত সাইবার-পরিমণ্ডলের প্রকাশনার ধরনকে বিবেচনা করলে। কারণ যে কেউ যে কোনো সময়ে যা কিছু প্রকাশ করে বসতে পারেন যা একটা “অটুট-ঐক্য”কে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। বাম দলগুলোর পুরানো ঐতিহ্যতে এই ধরনের তৎপরতাকে ‘হঠকারিতা’ বলা হতো। তারপরও এই ঐক্যপ্রচেষ্টাটা অতিশয় জরুরি যাতে নারীবাদ-বিরুদ্ধ মানুষজন এঁদের একাট্টা সম্পর্কিত বার্তাটা বুঝতে পারেন।

দ্বিতীয়ত, আমি একটা মেনিফেস্টোর বিষয়কেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। এখন পর্যন্ত নারীবাদের চর্চার আনুষ্ঠানিক জায়গাগুলোতে যা যা রয়েছে তা হলো মোটামুটি পারিবারিক উত্তরাধিকার, গার্হস্থ্য নির্যাতন, কখনো কখনো গার্হস্থ্য শ্রম, যৌন নিপীড়ন ও হেনস্তা, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য, শ্রমমজুরি ইত্যাদি। এগুলো নিজগুণে গুরুত্বপূর্ণ। তবে নারীবাদীদের জীবনযাপন যেহেতু নিজপক্ষ ও প্রতিপক্ষ উভয়ের কাছেই মারাত্মকভাবে নজরদারিতে থাকে, তাই আমি জীবনযাপন/লাইফস্টাইল বিষয়ক মেনিফেস্টোর পক্ষে। যদি এই মেনিফেস্টো আপাতত পাবলিক না করে কেবল নারীবাদীরা নিজেদের মধ্যে ব্যাপকহারে রাখতে চান আমি অন্তত সেটারও পক্ষে।

তৃতীয়ত, আমি নারীবাদীদের রাষ্ট্রোর্ধ্ব নানাবিধ মৈত্রীর জরুরিত্ব দেখি। সেরকম কিছু তৎপরতা ইতোমধ্যেই দৃষ্ট। এর পাশাপাশি মাইক্রো লেভেলে নীতিপ্রণেতাদের সঙ্গে অজস্র প্রকাশ্য ও গোপন দরকষাকষির বৈঠকে বসা লাগবে। সেটাও নানানভাবে নারীবাদীরা করে চলেছেন বলে আমি উপলব্ধি করি।

সারাংশ হলো, আমার কাছে কোনো সহজ বা ম্যাজিকরাস্তা নেই। কিন্তু আমি যা দেখতে পাই তার মর্মকথা হলো লাগাতার তৎপরতা।