নগরে দেবদূত



রেহানা বীথি
প্রচ্ছেদ/তাসকিন আল আনাস

প্রচ্ছেদ/তাসকিন আল আনাস

  • Font increase
  • Font Decrease

নিস্তব্ধ নির্জন রাত। আমার পতনের শব্দটা প্রতিধ্বনি তুলে মিলিয়ে গেলো রাতের বুকে। বিশাল কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে উঁচু বেদিতে চালকসহ একটা ঘোড়ার গাড়ি। নিশ্চল। বুঝলাম, ওটা আসল নয়, চালকসহ ঘোড়ার গাড়ির কাঠামো। পথবাতির আলো পড়ে চকচক করছে। কে বানিয়েছে এটা? একেবারে নিখুঁত তো! তিনদিক থেকে তিনটে প্রশস্ত পথ এসে মিলেছে এখানটায়। প্রতিটি পথের মাঝেই বিভাজন রেখায় হাঁটুসমান ঘন সবুজ গাছ। নিয়ন বাতির আলোয় যেগুলো কালচে দেখাচ্ছ। কালচে দেখাচ্ছে গাছের বিপুল কৃষ্ণচূড়াগুলোকেও। এখন কি কৃষ্ণচূড়া ফোটার সময়? বিশাল পৃথিবীর মাঝারি এই নগরে এখন কোন ঋতু? কিছু দূরে কাঠগোলাপও ফুটে আছে দেখছি! একটা মিষ্টি মৃদু ঘ্রাণ প্রবেশ করলো আমার নাকে। সেখান থেকে ছড়িয়ে গেলো মস্তিষ্কের কোষে কোষে। আমি আবেশিত হলাম। ইচ্ছে করছে গান গাইতে। না না, তারচাইতেও বেশি ইচ্ছে করছে ঘুমিয়ে যেতে। আমার বাঁ হাতের ওপর ময়ূরকণ্ঠী নীল প্রজাপতিটিও বোধহয় ঘুমিয়ে গেছে। ওটার উড়ু উড়ু করে বসে থাকার ভাবটি নেই এখন। আমিও ক্লান্ত ভীষণ। এই তো..... ঘুমে জড়িয়ে আসছে দু'চোখ।

ভোরের আলো আসি আসি করেও আসছে না। গুঁড়ো গুঁড়ো বৃষ্টি ঝরছে আকাশ থেকে। সেকারণেই যেন কুয়াশাময় চারপাশ।তবুও একটু একটু করে জেগে উঠতে চাইছে শহর। এই সামান্য বৃষ্টিতে থেমে যাবে না কিছুই। সবই চলবে আপন গতিতে। আব্দুল ওয়াহাব, একজন স্কুল শিক্ষক, সে-ও থেমে নেই। ফজরের আজানের আগেই বিছানা ছেড়েছে সে।ছোট্ট মুরগির পাতলা ঝোল আর একেবারে নরম করে একটু খিঁচুড়ি রান্না করেছে। আর করেছে পাঁচটা সেদ্ধ আটার রুটি, একটা ডিমও ভেজেছে। তারপর গোসল করে, পরিপাটি হয়ে বেরিয়ে এসেছে বাড়ি থেকে ছাতা মাথায়। তিনরাস্তার মোড়ের ওই বিশাল কৃষ্ণচূড়া গাছটার কাছে যখন সে পৌঁছালো, তখনও হালকা অন্ধকার, কুয়াশার মতো বৃষ্টি তো আছেই। তাড়াতাড়ি পৌঁছাতে হবে তাকে, না জানি মা ছেলে কী করছে! হয়তো ছেলের খিদে পেয়েছে। বলছে, মা, জলদি আমাকে কিছু খেতে দাও, অনেকদিন পর আমার খুব খুব খিদে পেয়েছে! ছেলেকে একটু নরম খিঁচুড়ি আর মুরগির ঝোল খাইয়ে ওরা মিয়াবিবিতে রুটি আর ডিমভাজি খাবে খুশিমনে। যাই তাড়াতাড়ি, আর একটু পা চালাই। একথা ভেবেই তার চোখ গেলো ঘোড়ার গাড়ির ওই বেদিটার দিকে। দেখলো, গাড়োয়ানের ঠিক পেছনেই, গাড়ির মধ্যভাগে কে যেন একজন হাত পা ছড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে। আশ্চর্য হলো আব্দুল ওয়াহাব। ওখানে তো কাউকে কখনও ঘুমাতে দেখেনি সে! আর দেখবেই বা কেন, ওটা কি ঘুমানোর জায়গা? তারওপর আকাশ থেকে গুঁড়ো গুঁড়ো বৃষ্টি ঝরছে! যাক গে! ভেবেও আবার কি মনে করে এগিয়ে গেলো একটু। নজরে এলো, একটি লোক, গায়ে পাতলা ফিনফিনে নীল রঙের একটা জামা আর নিম্নাংশ আবৃত একখণ্ড সাদা কাপড়ে। লুঙির মতো। তার দু'পা ঝুলে আছে গাড়ির বাইরে। ডানহাতটাও। বাঁহাত বুকের ওপর ভাঁজ করা। এবং......এবং সেই হাতে ওপর অদ্ভুত সুন্দর একটা প্রজাপতি। ময়ূরকণ্ঠী নীল তার রঙ। সেটিকে ঘিরে রেখেছে এক আশ্চর্য নীলাভ আলো। আব্দুল ওয়াহাব নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলো না। সে একেবারে হতবাক হয়ে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো লোকটির দিকে। কে সে? নাকি স্বপ্ন দেখছে আব্দুল ওয়াহাব? স্বপ্নই হবে.... স্বপ্নই হবে! হাতের টিফিনবাটিটা নামিয়ে রেখে দু'হাতে রগড়ে নিলো চোখ। নাহ্, একই অবস্থা। সেই একইভাবে ঘুমিয়ে আছে ঘোড়ার গাড়ির ওপর লোকটা। ডাকবে নাকি? কিন্তু.......! নড়ে উঠলো যেন একটু! মনে হচ্ছে জেগে উঠছে সে। হ্যাঁ, আড়মোড়া ভেঙে হাই তুলতে যাচ্ছে বটে!

এহ্ হে, বেশ ভিজে গেছি দেখছি! ওহ্, বৃষ্টি? আর আমি কি না টেরই পাইনি! বেশ ঘুমিয়ে নিলাম একচোট! কিন্তু আমার পায়ের কাছে ওটা কে দাঁড়িয়ে ছাতা মাথায়? এই কুয়াশাময় হালকা অন্ধকারেও বোঝা যাচ্ছে তার চোখে এক অদ্ভুত বিস্ময়। সাদা রঙের পাঞ্জাবি পরিহিত বছর চল্লিশ- এর এক লোক, কেমন যেন জুবুথুবু। একটু যেন ভয়ে ভয়েও আছে সে। সে থাক, চারপাশের প্রকৃতিকে একটু দেখি তো আগে দু'চোখ ভরে। তারপর না হয় তার সাথে কথা বলা যাবে। বাহ্, ঝকঝকে শহর তো! রাতে বোঝা যায়নি ঠিকমতো। উঁচু উঁচু ভবন, গাছপালাও আছে কিছু। গুঁড়ো গুঁড়ো বৃষ্টি যেন কেমন রহস্যময় করে তুলেছে সবকিছু। এই যাহ্, লোকটা দেখছি চলে যেতে উদ্যত!

-- এই যে শুনছেন? চললেন কোথায়? একটু দাঁড়ান, কথা বলি আপনার সাথে!

-- আমার সাথে? কেন?

-- ইচ্ছে করছে যে! বলবেন না কথা আমার সাথে?

-- আমার একটা জরুরি কাজ আছে, দেরি হয়ে যাবে। পরে বলবো কোনো এক সময়।

আব্দুল ওয়াহাব হাঁটা দিলো জোরে জোরে। অন্যকিছুর ভয় নেই তার তেমন, কিন্তু পাগলকে তার খুব ভয়। এ লোকটা যে পাগল নয়, তার কি কোনো নিশ্চয়তা আছে? 

-- কিন্তু আর যদি আপনার সাথে দেখা না হয়? কী এমন জরুরি কাজ আপনার?

গলা উঁচিয়ে বললো লোকটা।

-- হাসপাতালে যেতে হবে।

কী ভেবে জবাব দিয়েই ফেললো আব্দুল ওয়াহাব।

-- হাসপাতালে, কেন? কেউ অসুস্থ বুঝি?

-- হ্যাঁ, আমার ছেলে।

-- আপনার ছেলে! কী হয়েছে তার? আহা রে!

-- কঠিন অসুখ। একদম শুকিয়ে গেছে। খেতে চায় না কিছুই।

-- বয়স কত তার?

-- দশ বছর।

-- ইশ্, এ বয়সী একটা ছেলে হাসপাতালে? কতদিন ধরে আছে?

-- একমাস।

-- একমাস? বলেন কী! কিছু যদি মনে না করেন, আমি কি যেতে পারি আপনার সাথে?

আচ্ছা মুশকিল তো! মনে মনে ভেবেও রাজি হয়ে গেলো আব্দুল ওয়াহাব।

বৃষ্টি ঝরছে এখনো। আব্দুল ওয়াহাব হাঁটছে, তার পাশে পাশে চলেছে অদ্ভুত লোকটা। ওর হাতের প্রজাপতিটি চঞ্চল। ভেজা ভেজা পথঘাট জেগে উঠছে একটু একটু করে। পথের ধারের দোকানপাট খুলে যাচ্ছে একে একে। ফাঁকা রিক্সাগুলো হুড তুলে চলেছে টুংটাং। হাসপাতালে পৌঁছে গেলো ওরা। এ জায়গা কখনোই পুরোপুরি ঘুমিয়ে যায় না। নিশুতি রাতেও এখানে ব্যস্ততা দিনের মতো। নতুন রোগী আসে, পুরোনোদের হতাশ চলাফেরা, হঠাৎ হৃদয়বিদারক কান্নায় ভাবি হয় বাতাস, কারও মুখ আবার নতুন প্রাণের আগমনে উদ্ভাসিত, সবমিলে কর্মচঞ্চল সবসময়।

আব্দুল ওয়াহাব লোকটাকে নিয়ে প্রবেশ করলো সেই কর্মচঞ্চলতায়। লোকটা কেমন যেন অবাক হয়ে দেখছে সব। লম্বা করিডোরের শেষ মাথায় উপরে ওঠার সিঁড়ি। পাশে কিছু ফুল গাছে নানা রঙের ফুল। ওরা সিঁড়িভেঙে চলে গেলো সোজা তিনতলায়, ছেলের ওয়ার্ডে। ছেলেকে বিছানায় হাসিমুখে বসে থাকতে দেখে মনটা ভরে গেলো আব্দুল ওয়াহাবের। সাথের লোকটিও মিটি মিটি হাসছে দেখছি! ছেলে বউও তাকিয়ে আছে অবাক হয়ে লোকটার দিকে। লোকটির বাঁহাতের ওপর খেলতে থাকা প্রজাপতিটি অবাক হয়ে দেখছে ওরা।

-- তোমার পছন্দ এটা?

-- খুউব! কিন্তু ওটা তোমার হাতের ওপর কেন?

-- হা হা... কারণ ওটা যে আমার প্রজাপতি! সবসময় ওটা আমার সাথে থাকে।

-- সত্যি? কিন্তু তা কী করে হয়? প্রজাপতি আবার কখনও কারও নিজের হয় নাকি? আমার তো নিজের কোনো প্রজাপতি নেই! আমাদের কারোরই নেই, আমার বন্ধুদেরও না।

-- এটা তুমি ঠিক বললে না। তুমি হয়তো জানো না, তোমারও একটা প্রজাপতি আছে। তোমারা যারা ছোট, তাদের সবারই একটা করে প্রজাপতি থাকে।

-- তাহলে দেখতে পাই না কেন? ওগুলোর রঙও কি এটার মতোই? এত সুন্দর!

-- ঠিক এটার মতো নয়, তবে ওগুলোও খুব সুন্দর।

-- তাই! আমি দেখবো!

-- অবশ্যই দেখবে। তার আগে লক্ষী ছেলের মতো খেয়ে নাও তো! তোমার বাবা কত কষ্ট করে তোমার জন্য খিঁচুড়ি আর মুরগির ঝোল রান্না করে এনেছে, দেখো!

-- হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি খাবো! মা, তাড়াতাড়ি আমাকে খেতে দাও, খুব খিদে পেয়েছে.... খুব!

খুশিতে ঝলমল করে উঠলো আব্দুল ওয়াহাব আর তার বউয়ের মুখ। কতদিন পর নিজে থেকে খেতে চাইছে ছেলে! টিফিন বাটি খুলে ছেলেকে খাবার দিচ্ছে বউ। কিন্তু আব্দুল ওয়াহাবের মনটা হঠাৎ খচ খচ করে উঠলো, সে কি কি রান্না করে এনেছে, লোকটা জানলো কেমন করে? কে লোকটা? অন্তর্যামী! বউটাও জানি কেমন, অচেনা এক লোককে সাথে করে এনেছে সে, একবারও কোনো প্রশ্ন করলো না? মা ছেলের ভাব দেখে তো মনে হচ্ছে, কতকালের চেনা! লোকটাও এমন ভাব জমিয়ে ফেলেছে এই অল্প সময়ের মধ্যে! তবুও লোকটার কারণেই এতদিন পর খেতে চেয়েছে ছেলে, সেটা তো অস্বীকার করা যায় না!

একমাত্র সেজন্যেই লোকটার ওপর পুরোপুরি রেগে যেতে পারছে না সে। কেমন যেন খুব সূক্ষ্ম একটা প্রশ্রয়বোধ কাজ করছে। কিন্তু তা বোধহয় আর বেশিক্ষণ থাকবে না। এবার বোধহয় রেগেই যাবে আব্দুল ওয়াহাব। লোকটা তার ছেলেকে নিয়ে বাইরে ঘুরতে যেতে চাইছে, কী আশ্চর্য! ছেলে তো হাসপাতাল থেকে ছাড়াই পায়নি! যত্তসব পাগল ছাগল!

পৃথিবীতে পতনের পর পরই এমন একটা অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হবো ভাবিনি আমি। একটা এত ছোট্ট, এত মিষ্টি ছেলে এতদিন ধরে হাসপাতালে! অথচ মনে হচ্ছে, ছেলেটির কোনো অসুখই নেই। যেটা আছে সেটা হলো অসুবিধা। কিন্তু কি সেই অসুবিধা? জানতে হবে......গভীরভাবে জানতে হবে! যে করেই হোক আজই হাসপাতাল থেকে ছুটি পেতে হবে ছেলেটিকে। তারপর ওকে নিয়ে নগরীর কোনো সুন্দর জায়গায় ঘুরতে ঘুরতে জেনে নিতে হবে ওর সমস্যা। এত সুন্দর একটা ছেলের জীবনে কোনো আনন্দ থাকবে না, তা কী করে হয়? আমার হাতের প্রজাপতিটি দেখে ওর চোখে যে খুশির ঝিলিক ফুটে উঠেছে, তা হারিয়ে যেতে দেয়া যাবে না কোনোমতেই। ওর মনের মধ্যে যে একটা অপূর্ব রঙের প্রজাপতি আছে সেটার সন্ধান ওকে জানাতেই হবে।

-- আজ কেমন আছো বাবু? দেখি জিভটা। হুমম....!

-- জানো ডাক্তার, আমি না ভালো হয়ে গেছি! আমাকে ছেড়ে দাও, বাড়ি যাবো। আর এই যে লোকটাকে দেখছো, যার কাছে একটা প্রজাপতি আছে, ও আমার বন্ধু। ও বলেছে, আমারও একটা প্রজাপতি আছে। ওকে সাথে নিয়ে খুঁজে বের করবো সেটাকে। দেবে না ছুটি আজ?

ডাক্তার বেচারা আশেপাশে তাকিয়ে কোনো প্রজাপতিওয়ালাকে দেখতে পেলো না। প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে আব্দুল ওয়াহাব আর তার বউয়ের দিকে তাকাতেই ওরা বললো, সত্যিই ও ভালো হয়ে গেছে ডাক্তার সাহেব! অ-নে-ক দিন পর ও আজ নিজে থেকে খাবার খেয়েছে। ভালোমতোই খেয়েছে। ছুটি দিয়ে দিন, বাড়ি যেতে চাইছে, হয়তো বাড়ি গেলে আরও তাড়াতাড়ি সুস্থ হবে।

চিন্তার রেখা ডাক্তারের কপালে। হাসপাতালে থেকেও তো বিশেষ লাভ নেই, ভাবলো ডাক্তার। কিন্তু প্রজাপতিওয়ালার কথাটা তো ঠিক বোধগম্য হলো না! ছেলেটির বাবা মা-ও তো কোনো দ্বিমত করছে না ছেলের কথায়! হয়তো ছেলের হঠাৎ কিছুটা সুস্থতায় তাদের এই প্রশ্রয়। যাইহোক, ছুটি দিলে মন্দ হয় না। দেখা যাক! আগামী সপ্তাহে একবার দেখা করে যেতে বললেই হলো।

ঘাসে ছাওয়া নদীর ধার। একটা ছোট্ট ডিঙি বাঁধা আছে ঘাটে। অব্যবহৃত বোধহয় বহুদিন। আব্দুল ওয়াহাব তার বউকে নিয়ে বসে আছে ঘাসের ওপর। ওদের চোখেমুখে উপচে পড়ছে খুশি। ছেলে তাদের ছাড়া পেয়েছে হাসপাতাল থেকে। আমার বাঁহাতের প্রজাপতিটিও অকারণে ফুরফুর করছে। ছেলেটি ছুঁয়ে দেখছে সেটিকে একটু পর পর। বলছে, এত সুন্দর..... এত সুন্দর! আমার চোখ ভিজে যাচ্ছে বার বার। আশ্চর্য, আমার চোখে জল!

-- তোমার স্কুলটা কোথায়? নিয়ে যাবে আমাকে?

-- তুমি যাবে ওখানে? কিন্তু আমার স্কুল তোমার ভালো লাগবে না যে!

-- কেন?

-- ভীষণ উঁচু একটা ভবন। লিফ্ট এ ওঠানামা, আমার ভালো লাগে না।

-- কেন? স্কুলের মাঠে খেলো না বন্ধুদের সাথে? 

-- নাহ্, মাঠই তো নেই! আর যা লেখাপড়ার চাপ! খেলার সময় কোথায়? খেললে পিছিয়ে যাবো না? যে খেলবে সেই পিছিয়ে যাবে। আমরা তো খালি পড়ি। জানো, আমার কয়টা বই?

-- কয়টা?

-- অ-নে-ক! আর প্রতিটা বইয়ের জন্য আলাদা আলাদা খাতা। প্রাইভেট, স্কুল, কোচিং সবকিছুর জন্য আলাদা আলাদা খাতা। সেসবে ব্যাগ এত ভারি হয়, কী বলবো তোমায়! আমার সব বন্ধুদের পিঠে ব্যথা, চোখেও চশমা অনেকের। লেখাপড়া এমন কেন? এত পড়তে হয় কেন? আচ্ছা, তুমিও কি এমন করেই লেখাপড়া করেছো? আমার বাবা করেনি জানো? বাবা যখন ছোট ছিলো, তখন নাকি তাদের স্কুলে বিশাল একটা মাঠ ছিলো। ক্লাসের ফাঁকে তারা বন্ধুরা ওই মাঠে খেলা করতো। গোল্লাছুট, দাড়িয়াবান্ধা আরও কত কী! আমরাও তো ছোট, আমাদের মাঠ নেই কেন? দেখো, পুরো শহরজুড়ে শুধু উঁচু বিল্ডিং। আমার ভালো লাগে না একদম। আমার বন্ধুরা মোবাইলে, কম্পিউটারে গেম খেলে। আমার ভালো লাগে না ওসব।

-- তোমার কী ভালো লাগে বলো?

-- বললে তুমি দিতে পারবে তা?

-- হ্যাঁ পারবো।

-- সত্যিই?

-- একদম সত্যি। বলেই দেখো না!

-- আমি চাই খোলা মাঠ। অনেক গাছ, অনেক প্রজাপতি উড়ে বেড়াবে ফুলে ফুলে। আমি বন্ধুদের সাথে ঘুরবো, খেলবো, মাঝে মাঝে লেখাপড়াও করবো। স্কুলের ব্যাগটা হবে অনেক বেশি হালকা। পারবে করতে এসব? আর আমার প্রজাপতি? ওটা কোথায়? তুমি যে দেবে বলেছিলে আমাকে!

-- দেবো দেবো। সব দেবো তোমাকে। এখন বাড়ি চলো, সন্ধ্যে হয়ে যাচ্ছে। ওই দেখো, তোমার বাবা মা ডাকছেন আমাদের।

-- কিন্তু কখন দেবে? আমার যে আর দেরি সহ্য হচ্ছে না! ওগুলো পেলেই আমি একদম সুস্থ হয়ে যাবো। আর কোনোদিনও হাসপাতালে যেতে হবে না আমাকে।

-- দেবো, অতি শীঘ্রই! চলো, এবার বাড়ি যাই, অন্ধকার হয়ে গেলো।

-- চলো।

-- ও হ্যাঁ, তোমার নামটাই তো বলোনি আমাকে!

-- উচ্ছাস।

-- বাহ্, উচ্ছাস!

-- আর তোমার নাম?

-- পরে বলবো।

একটা ঝাঁ চকচকে সুন্দর শহরের আড়ালে অসুস্থ শিশু? অসুস্থ ভবিষ্যত! হাজার হাজার শিশুর মনে হাজার হাজার প্রজাপতি বন্দী হয়ে আছে এভাবে? ওরা ওড়ার জায়গা পাচ্ছে না। এই সুন্দর শহর এই অসুস্থ সন্তানদের দিয়ে কী ভবিষ্যত গড়বে? ভেবেই পাচ্ছি না আমি। সুন্দর পৃথিবীটা দু'চোখ ভরে দেখবো বলে এসেছিলাম। কিন্তু কোথায় সৌন্দর্য? শুধু প্রশস্ত পথঘাট আর ঝকঝকে উঁচু বিল্ডিংই কী সৌন্দর্য? ছোট, নিষ্পাপ বাচ্চাদের শৈশব হরণ করে এ কেমন সৌন্দর্য? বেদনার পাহাড় যেন বুকে চেপে বসেছে আমার। আমি যেখান থেকে নেমে এসেছি, সেখানে বসে এসব বাচ্চাদের কষ্ট অনুভব করা সম্ভবই নয়। ওদের কষ্ট অনুভব করতে হবে ওদের পাশে থেকে। হঠাৎ পৃথিবীতে আসার সিদ্ধান্তটা ভুল নয় তাহলে! আর এসেই যখন পড়েছি, এইসব কচিমুখগুলোর কষ্ট কিছুটা লাঘব করি। আমার অনন্ত জীবন, আমার অপার্থিব ক্ষমতা যদি কিছুটা কাজে লাগে ওদের, ধন্য হবো আমি।

ওরা ঘুমিয়ে পড়েছে। মাঝখানে ছেলে, দু'পাশে বাবা-মা । ছেলের বুকের ওপর দু'জনের হাত রাখা। আহা, কী নিশ্চিন্তি! কী পরম নির্ভরতা! ওই যে স্বর্গ, যেখানে আমার বাস, আব্দুল ওয়াহাবের ঘরটায় আজ রাতে সেই স্বর্গই নেমে এসেছে যেন। ভোর হওয়ার আগেই সেরে ফেলতে হবে আমার কাজ। মাঝারি এই নগরে প্রতিটা বাড়ির সামনে এক চিলতে উঠোন, উঠোনে ফুল গাছ, ফুলগাছে হাজার হাজার প্রজাপতি ওড়াতে হবে রাতের মধ্যেই! স্কুলের সামনে থাকবে বিশাল খোলা মাঠ। ভোরে সব শিশু কলকল করে উঠবে। অসংখ্য প্রজাপতির ভিড়ে খুঁজে নেবে নিজের প্রজাপতি। ওরা বেড়ে উঠবে সুস্থ সুন্দর মন নিয়ে। গড়ে তুলবে এক স্বপ্নের আগামী। আমি চলে যাবো নিঃশব্দে।

আচ্ছা, উচ্ছাস কে কি বলে যাবো, আমার পরিচয়? 

না থাক, ওরা তো ভুলে যাবে বেদনাময় অতীত। শুধু থাকবে বর্তমান, আর সুন্দর ভবিষ্যত!

সুখে থাকুক ওরা। উচ্ছাস থাকুক আমার মনে, আর আমি নাহয় থাকি উচ্ছাসের মায়াবী ঘোর হয়ে।

   

মনীষী মুঈন উদ-দীন আহমদ খান



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
মনীষী মুঈন উদ-দীন আহমদ খান

মনীষী মুঈন উদ-দীন আহমদ খান

  • Font increase
  • Font Decrease

ইতিহাসবিদ-দার্শনিক মুঈন উদ-দীন আহমদ খান জীবনব্যাপী জ্ঞানচর্চায় নিমগ্ন এক মনীষীর নাম। বাংলাদেশের বিদ্যাবৃত্তে ক্লাসিক্যাল চরিত্রের শেষ দৃষ্টান্ত ছিলেন তিনি। ২৮ মার্চ (বৃহস্পতিবার) ৩য় মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা। 

মনীষী মুঈন উদ-দীন আহমদ খান (১৮ এপ্রিল, ১৯২৫-২৮ মার্চ, ২০২১) নির্জলা তথ্যভিত্তিক ইতিহাসের খোঁজে সুদীর্ঘ জীবনব্যাপী জ্ঞানচর্চার কষ্টসাধ্য দিনগুলো অতিবাহিত করেন নি। তিনি মনে করতেন, ইতিহাসের সত্য সন্ধান শুধু তথ্য আর যুক্তি ভিত্তিক নয়। প্রকৃত ইতিহাস মূলত ইতিহাসের দর্শন, ইতিহাসের পুনর্গঠন, কল্পনা, সমকালীন পর্যালোচনা ও ইনটুইশনের উপর প্রতিষ্ঠিত। তাঁর সান্নিধ্যে এলে সবাই এই সত্য টের পেতেন যে, ইতিহাস প্রধানত দর্শন ও সাহিত্যের সমধর্মীতায় বর্তমানের জ্ঞানতাত্ত্বিক ও বাস্তবতা ভিত্তিক সমস্যাগুলোকে বিশ্লেষণের এবং দিকনির্দেশনা দেওয়ার অপরিহার্য মাধ্যম। তাঁর স্বকীয় চিন্তার দ্যুতিতে তিনি বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা চর্চা ও গবেষণায় একটি বিশিষ্ট ধারার প্রতিভূ রূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এবং একটি পুরো জীবন সম্পূর্ণভাবে বিদ্যাচর্চার ধ্যানজ্ঞানে যাপন করেছেন। আর চট্টগ্রামের নিরিখে তিনি ছিলেন প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যাচর্চা কাঠামোর আদি নির্মাতাদের অন্যতম। যেমনভাবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র ড. আবদুল করিম ছিলেন ইতিহাসচর্চার প্রতিষ্ঠাতা, প্রফেসর মোহাম্মদ আলী ইংরেজির, ড. আর. আই চৌধুরী রাজনীতি বিজ্ঞানের, তেমনিভাবে তিনি ছিলেন ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোবদ্ধ বিদ্যাচর্চা ধারার সূচনাকারী। চট্টগ্রামের আধুনিক উচ্চশিক্ষা বিস্তারের আদি মুঘলদের একজন ছিলেন তিনি।  

তিনি ছিলেন আড়ম্বরহীন জ্ঞানসাধক। নিজস্ব বিদ্যাবলয়ের বাইরে তাঁর কোনও আত্মপ্রচার বা আত্মগরিমা ছিল না। যদিও তাঁর জ্ঞানের পরিধি ও গভীরতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়ার মতো যোগ্য লোকের সংখ্যা তাঁর আশেপাশে খুব বেশি ছিল না, তথাটি যারা তাঁর রচনা খেয়াল করে পড়েছেন এবং তাঁর সঙ্গে শ্রেণিকক্ষে কিংবা অনানুষ্ঠানিক পরিসরে আলাপ, আলোচনা, সংলাপ ও বিতর্কের সুযোগ পেয়েছেন, তাঁরা বিলক্ষণ জানতেন, কত ভাষা, কত বিষয়, কত তত্ত্ব ও তথ্যাদি সম্পর্কে অনায়াস দক্ষতা ও পা-িত্য ছিল প্রাচ্যদেশের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তের এই জ্ঞানতাপসের। দক্ষিণ চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী চুনতী গ্রামের আদিবাস আর পুরনো চট্টগ্রাম শহরের রুমঘাটা থেকে এই মান্যবর জ্ঞানবৃদ্ধের কাছ থেকে বিচ্যুরিত দীপ্তি কিছু কিছু অনুভব স্পর্শ করেছে দেশে-বিদেশে তাঁর কর্ম ও গবেষণা ক্ষেত্র এবং বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান।

তাঁর জ্ঞান, গবেষণা, মনীষা, বুদ্ধির দীপ্তি, বহু ভাষায় পারঙ্গমতা তাঁর সমকালে অন্য কারও মধ্যে বিশেষ পরিলক্ষিত হয় নি। বাংলাদেশে ইতিহাসচর্চায় প্রবাদপ্রতীম ড. আহমদ হাসান দানি যে তিনজন ছাত্রকে গবেষণায় প্রণোদিত ও পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছিলেন, মনীষী মুঈন উদ-দীন আহমদ খান তাঁদের একজন। অন্য দুইজন হলেন আবদুল করিম ও মোহর আলী। এই তিনজনই বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চায় সত্যিকারের মৌলিক অবদান রেখেছেন। বিশেষ করে, মনীষী মুঈন উদ-দীন আহমদ খান প্রাথমিক থেকে পিএইচডি পর্যন্ত শিক্ষাজীবনে প্রথম বিভাগ, স্বর্ণপদক, ফেলোশিপ ও বৃত্তি লাভ করেন একজন মেধাবী ছাত্র রূপে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামিক স্টাডিজে অনার্স ও মাস্টার্স করার পর তিনি মোটেই থেমে থাকেন নি। ফুলব্রাইট স্কলারশিপ নিয়ে কানাডার বিখ্যাত ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দ্বিতীয় মাস্টার্স ডিগ্রি নেন। ফিরে এসে খ্যাতনামা ইতিহাসবিদ ড. আহমদ হাসান দানির তত্ত্বাবধানে ‘ফরায়েজি আন্দোলন’ বিষয়ে পথপ্রদর্শনকারী পিএইচডি গবেষণা সম্পন্ন করেন। তারপর পোস্ট গ্রাজুয়েট ফেলোশিপ লাভ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় বার্কলের ‘ইন্সটিটিউট অব সাউথ এশিয়ান স্টাডিজ’-এ রাজনীতি বিজ্ঞানের ‘সেমিনার ইন ফিল্ড ওয়ার্ক কোর্স’ অধ্যয়ন করেন। তিনি কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের প্রখ্যাত প-িত, ইসলামিক স্টাডিজ ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা উইলফ্রেড ক্যান্টওয়েল স্মিথের সান্নিধ্যে এসে বহুবিদ্যায় পারদর্শী হন। যে কারণে, পরবর্তী জীবনে তিনি ইসলামিক স্টাডিজ ও ইসলামের ইতিহাসকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে ধর্মতত্ত্ব, দর্শন, বিজ্ঞান, বিশেষত এক্সপেরিমেন্টাল সায়েন্সের ক্ষেত্রেও নিজের অবদান রাখেন এবং তাঁর গুণমুগ্ধ শিক্ষার্থীদের ছাড়াও তাঁর মূল-বিষয়ের বাইরের লোকজনকেও প্রবলভাবে আকর্ষণ করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দুইজন নেতৃস্থানীয় শিক্ষক যথাক্রমে মর্শন বিভাগের প্রফেসর ও বিভাগীয় প্রধান বদিউর রহমান এবং কলা ও মানববিদ্যা অনুষদের ডিন শব্বির আহমদ তাঁর অধীনে পিএউচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

গবেষণা তত্ত্বাবধানে তিনি ছিলেন প্রচ- রকমের শুদ্ধতাবাদী। একটি প্রকৃষ্ট গবেষণার জন্য ¯œাতকোত্তর ও এমফিল পর্যায়ের গবেষকদেরও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহে নিয়োজিত করতেন, যাতে তারা ভবিষ্যতে গবেষক হিসাবে স্বাধীনভাবে কাজ করার দক্ষতা অর্জন করতে পারেন। তাঁর সাথে গবেষণার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে ড. আফম খালিদ হোসেন জানিয়েছেন, “তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের উদ্দেশ্যে তাঁর অনুমোদন নিয়ে কলকাতা, লক্ষেœৗ, দিল্লি, তুঘলকাবাদ, করাচি, লাহোর, ইসলামাবাদ, মক্কা ও মদিনা সফর করি।” কোনও মতে একটি ডিগ্রি দিয়ে দেওয়ার অসৎ পন্থার বিপরীতে গবেষণাকে বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যনির্ভর করতে তিনি ছিলেন একজন দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী শুদ্ধতম তত্ত্বাবধায়ক। শেষজীবনে তাঁর সঙ্গে বা পরামর্শে যারা গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন, তাদের মানস গঠনে ও বিষয়বস্তু সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা নির্মাণে তিনি শ্রমবিমুখ ছিলেন না। ঘন্টার পর ঘণ্টা তিনি তাঁদের সঙ্গে আলোচনা কিংবা বই-পুস্তক পর্যালোচনায় লিপ্ত হতেন। এমন চিত্র আমি নিজে তাঁর বাসভবনে উপস্থিত কালে লক্ষ্য করেছি। কখনও নবাগত গবেষকদের তিনি অন্যান্য শিক্ষক ও গবেষকদের কাছে পাঠাতেন। তাঁর রেফারেন্সে একাধিক তরুণ গবেষক আমার কাছে এসে নানা বিষয়ে আলোচনা করেছেন এবং তাঁর রেফারেন্সে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের বিভাগের সেমিনার লাইব্রেরিতে কাজ করেছেন। একটি বস্তুনিষ্ঠ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ গবেষণা সম্পন্ন করতে তিনি তত্ত্বাবধায়ত ও প্রণোদনাদাতা রূপে ছিলেন নিরলস।   

কঠোর তথ্যনিষ্ঠা ও শুদ্ধতার প্রতিফলন ঘটেছে মনীষী মুঈন উদ-দীন আহমদ খানের প্রতিটি রচনায়। বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় রচিত তাঁর গবেষণা গ্রন্থ ও প্রবন্ধগুলো যে কারণে একই সাথে পাঠকপ্রিয় এবং অ্যাকাডেমিক জ্ঞান ভা-ারে মণি-মুক্তা তুল্য। তাঁর সবচেয়ে আলোচিত গ্রন্থ ‘হিস্ট্রি অব ফরায়েজি মুভমেন্ট ইন বেঙ্গল’ একটি পথিকৃৎ গবেষণা, যা ‘বাংলায় ফরায়েজি আন্দোলনের ইতিহাস’ নামে ইংরেজি থেকে অনূদিত হয়েছে। যে ফরায়েজি আন্দোলনকে ওয়াহাবি আন্দোলন বা তরিকা-ই-মুহাম্মদীয়া নামেই সবাই জানতো, তিনি তাঁর বহুমাত্রিক চরিত্র, বৈশিষ্ট্য ও প্রভাব গবেষণার মাধ্যমে উন্মোচিত করেন।  ফারায়েজি আন্দোলন যে কেবলমাত্র একটি ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনেই সীমাবদ্ধ ছিল না, ছিল বাংলার মুসলমানদের রাজনৈতিক সচেতনতা, সামাজিক গতিশীলতা ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যবোধের প্রথম ও আদি প্রচেষ্টা, তিনিই সর্বপ্রথম তা প্রমাণ করেন। বাংলার কৃষিভিত্তিক সমাজ থেকে উত্থিত এই আন্দোলনের গণমুখী চরিত্র, ঔপনিবেশিকবাদ বিরোধী বৈশিষ্ট্য, সামাজিক ও ধর্মীয় কুসংস্কার বিরোধী মনোভাব এবং সাম্প্রদায়িক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াকু মানসিকতার বিষয়াবলী তিনি ঐতিহাসিক তথ্য ও ধর্মতাত্ত্বিক মাত্রায় আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পটভূমিতে উপস্থাপন করেন। বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ ও বৃহৎ ক্যানভাসে গবেষণার কৃতিত্বে তিনি এই বিষয়ে এবং ঔপনিবেশিক বাংলার সামাজিক-রাজনৈতিক ইতিহাস বিনির্মাণের পথিকৃৎ প্রাণিত স্বরূপে সর্বমহলে সম্মানীত হয়েছেন। 

পরবর্তীতে প্রকাশিত মনীষী মুঈন উদ-দীন আহমদ খানের গ্রন্থ ও প্রবন্ধে তিনি তাঁর মৌলিকত্বের ছাপ রেখেছেন। প্রতিটি লেখাতেই তিনি নিজস্ব চিন্তা ও বিশ্লেষণের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁর লেখায় দর্শন, বিজ্ঞান, ধর্মতত্ত্ব, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস ইত্যাদি বহুবিদ্যার প্রকাশ ঘটেছে। শ্রেণিকক্ষের পাঠদান ও গবেষণার বাইরে তাঁর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো জ্ঞানচর্চা ও বিদ্যাধারাকে পরবর্তী প্রজন্মে প্রবাহিত করার প্রয়াস। তিনি ছিলেন ধ্রুপদী দার্শনিকদের মতো সংলাপ-প্রবণ ব্যক্তিত্ব। কেউ আগ্রহী হলে কিংবা কারো প্রতি তিনি আগ্রহী হলে তাঁকে বা তাঁদেরকে সাদরে আমন্ত্রণ জানিয়ে আলোচনায় লিপ্ত হতেন। তিনি তথাকথিত অ্যাকাডেমিশিয়ানদের মতো বইয়ের পাতার শুকনো অক্ষরে বন্দি ছিলেন না, জ্ঞানবৃত্তের মানুষের সঙ্গে প্রাণবন্ত সংলাপ ও সংশ্লেষের মাধ্যমে সদা জীবন্ত ছিলেন। চট্টগ্রামে তো বটেই, বৃহৎ বঙ্গদেশে খুব কম সংখ্যক প-িতই এমন ছিলেন, যারা জ্ঞানচর্চা ও গবেষণায় অন্যকে প্রণোদিত করার ক্ষমতা ধারণ করতেন। ঢাকায় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক এবং চট্টগ্রামে ড. আবদুল করিম, ড. আর. আই. চৌধুরী ছাড়া কম প-িতই ছিলেন, যারা শিক্ষার্থীদের প্রাণিত করার ক্ষেত্রে মনীষী মুঈন উদ-দীন খানের সঙ্গে তুলনাযোগ্য।

জ্ঞানের সঞ্চার ও বিস্তারে তাঁর অসীম কষ্ট সহিষ্ণুতা, আগ্রহ ও বিনয় তাঁকে ক্লাসিক্যাল যুগের প্রাচীন জ্ঞানতাপসের আধুনিক প্রতিচ্ছবিতে পরিণত করেছিল। ব্যক্তিগতভাবে তাঁর সান্নিধ্যে এসে আমি তা স্পষ্টভাবে অনুভব করি। আমি তাঁর সরাসরি ছাত্র ছিলাম না। এবং বয়সের দিক থেকে তিনি ছিলেন আমার চেয়ে কয়েক প্রজন্ম অগ্রগামী। তথাপি অশীতিপর বয়সে এসেও তিনি আমার কোনও লেখার প্রতি আগ্রহী হলে নিজে ফোন করে জানিয়েছেন। ডেকে নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনা করেছেন এবং বিষয়টিকে তত্ত্ব ও তথ্যগতভাবে আরও সমৃদ্ধ করার ইঙ্গিত দিয়েছেন। সেসব আলোচনায় জ্ঞানতত্ত্ব ও তুলনামূলক দর্শন সম্পর্কে তাঁর অতলস্পর্শী পা-িতের দীপ্তিমান প্রভার আঁচ পাওয়ার বিরল সুযোগ আমার হয়েছে। আমি লক্ষ্য করে দেখেছিল, বহু তরুণকে তিনি গবেষণার দিক-নির্দেশনা ও বিষয়বস্তু সম্পর্কে মৌলিক ধারণা দিতে আগ্রহী ছিলেন। তাঁর মধ্যে পথ প্রদর্শনের একটি বিরল গুণ ছিল। আর ছিল জ্ঞানকে অকাতরে ছড়িয়ে দেওয়ার উদার মানসিকতা, যা আজকের অ্যাকাডেমিক প্রতিযোগিতার পঙ্কিল ও সঙ্কীর্ণমনা ধারার প্রেক্ষিতে অকল্পনীয় বিষয়। বড় মন ও মুক্ত মানসিকতার কারণে তিনি ‘বাংলাদেশের লিলিপুট প-িতদের সমাবেশে’ মহীরূহ-সম ব্যক্তিত্বে অধিষ্ঠিত হয়ে রয়েছেন।   

মনীষী মুঈন উদ-দীন আহমদ খানের মতো বিটপী ব্যক্তিত্বকে দৃশ্যপটে রেখে আজকের ক্ষুদ্রতর পরিসরে আলোচনা করা মোটেও সম্ভব নয়। কারণ, বর্তমানের ঊন-মানুষ ও ঊন-মানসিকতার পরিম-লে তাঁর মতো বড় মানুষের দেখা পাওয়াও দুষ্কর। তিনি এবং তাঁর সমগোত্রীয়রা শেষ মুঘলের মতো দৃশ্যপট থেকে চলে গিয়েছেন। কিন্তু রেখে গিয়েছেন ধ্রুপদী ঐতিহ্য, ব্যক্তিত্বের দীপ্তি ও বিভা। তিনি ছিলেন প্রথম প্রজন্মের আধুনিক বাঙালির হিন্দু ও মুসলিম নির্বিশেষে সকল অগ্রণী প-িত, গবেষক ও শিক্ষাব্রতীগণের শ্রেষ্ঠতম ও উজ্জ্বল প্রতিনিধি, যারা  জাগতিক প্রাপ্তির আশায় জ্ঞানের সাধনা করেন নি। জ্ঞানচর্চা ও বিদ্যাচর্চার নিতান্ত আবশ্যক পরিসীমার বাইরেও তাঁরা সচরাচর যান নি। তাঁদের নিতান্ত আবশ্যক বস্তুর তালিকায় সর্বাগ্রে ছিল জ্ঞানচর্চা, বিদ্যার্জন ও গ্রন্থপাঠ। বিষয় ভিত্তিক প্রয়োজনীয় বইয়ের বাইরেও অন্য বিষয় সংক্রান্ত রচনা তাঁরা পড়তেন আনন্দ ও কৌতূহল নিবৃত্তির সুতীব্র আকর্ষণে। কারও কারও পুস্তক সংগ্রহ আর রোজগারের মধ্যে কোনও ভারসাম্য থাকতো না। জাগতিক উন্নতির বিষয়গুলোকে তাঁরা তুচ্ছ বিবেচনা করে অবজ্ঞা করেছেন। ইতিহাসবিদ তপন রায়চৌধুরীর মতে, “যে জীবনে বৈষয়িক উন্নতির সম্ভাবনা বিরল, তার পরিপ্রেক্ষিতে বেশ কিছু বিখ্যাত মানুষ সত্যিই সারস্বত-কর্মে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। বর্তমানের বিশ্লেষণপ্রবণ গবেষণার ধারা তখনও প্রবল হয় নি। কিন্তু অনেক গবেষণাই গভীর পা-িত্যের ভিত্তিতে সুপ্রতিষ্ঠিত হতো।” মনীষী মুঈন উদ-দীন আহমদ খান সম্পর্কে এই বক্তব্য বিশেষভাবে প্রযোজ্য। আত্মমগ্ন ধ্যানীর মতো সারা জীবন তিনি জ্ঞানচর্চায় নিয়োজিত থেকে গভীর পা-িত্যের পরিচয় দিয়েছেন। শুধু নিজেই নন, প্রণোদিত করেছেন পরবর্তী বেশ কিছু প্রজন্মের উৎসাহী তরুণদের, যাদের অনেকেই বিদ্যাচর্চায় লিপ্ত রয়েছেন।

তাঁর সঙ্গে ইতিহাসের আরেক মহান সাধক যদুনাথ সরকারের কিছু কিছু বিষয় তুলনীয়, যার মধ্যে রয়েছে প্রবল পরিশ্রম, জ্ঞান তৃষ্ণা এবং অনুসন্ধান। যদুনাথের বিশ্লেষণের নিরপেক্ষতা ও অসাম্প্রদায়িকতা নিয়ে বিতর্ক থাকার পরেও ইতিহাসচর্চায় তিনি সর্বজনমান্য আচার্য। তিনি নিজের কর্ম ও জীবন আলোচনা করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের কবিতা থেকে উদ্ধৃতি করতেন: “পথের প্রান্তরে করি নাই খেলা/শুধু বাজায়েছি বসি সারাবেলা/ছিন্নতন্ত্রী বীণা।” মনীষী প্রফেসর ড. মুইন উদ-দীন আহমদ খানও সারাজীবন জ্ঞানচর্চার বাঁশরী বাজিয়েছেন। একটি আস্ত জীবনকে উৎসর্গ করেছেন জ্ঞানের সাগরে অবগাহনের মাধ্যমে। বিদ্যার্চচাকে পেশাগত পরিম-লে জিম্মি না করে জীবন ও যাপনের মূলমন্ত্রে পরিণত করেছিলেন তিনি। আর সব কিছুই তিনি করেছেন নিজের সুমৃত্তিকা ও মানুষকে কেন্দ্র করেই। জীবনের পর্বে পর্বে নানা দেশে, নানা প্রতিষ্ঠানে কাজ করেও তিনি অবশেষে ফিরে এসে আলোকিত করেছেন প্রিয় মাটির প্রিয় মানুষদের, প্রিয় জনপদকে। জীবনের দিনগুলোর মতোই মৃত্যুর পরেও তিনি আলোর দিশারী হয়ে দেদীপ্যমান রয়েছেন জ্ঞানচর্চা ও বিদ্যামুখী অভিযাত্রীদের চৈতন্যের মর্মমূলে।  

ড. মাহফুজ পারভেজ, প্রফেসর, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম  সেন্টার ফর রিজিওন্যাল স্টাডিজ, বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)।

;

জাফরানি



শরীফুল আলম । নিউইয়র্ক । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ।
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ভাবছি এই বৈশাখের প্রথম পলাশটা আমি তোমাকেই দেবো
প্রথম চুম্বনটাও তোমাকে।
একটা দীর্ঘ শীত পাড়ি দিয়ে এসেছি,
তোমার খোঁপায় লাল গোলাপ দেবো বলে
চোখে কাজল, কপালে কাল টিপ
এই সব দেয়ার আগে কিছুটা খুনসুঁটি তো হতেই পারে ,
তুমি অনন্যা বলে কথা
তোমাকে উৎকণ্ঠা ও বলা যায়
কিম্বা সুনীলের কবিতা, অসমাপ্ত শ্রাবণ
তুমি আমার ওয়াল্ড ভিউ
তুমি আস্ত একটা গোটা আকাশ
চুরমার করা তুমি এক পৃথিবী ,
কখনো তুমি মুক্ত বিহঙ্গ, সুদূরের মেঘ
তুমি কখনো শান্ত মোহনা, কখনো মাতাল স্রোত
ভরা শ্রাবণ, শরতের স্তব্ধতা তুমি ,
তুমি কখনো আমার সুখের আর্তনাদ ।

আমি সমুদ্র, আমি ক্ষণে ক্ষণে শিউরে উঠি
দিগন্ত রেখায় আমি তোমার অপেক্ষায় থাকি
আমি অপেক্ষায় থাকি তোমার ফোনের গ্যালারিতে
ফেসবুক, হোয়াটস অ্যাপে ,
আমি প্রলেপ বানাতে জানিনা
তাই ফাগুণের রঙকে আমি টকটকে লাল বলি
সিজোফ্রেনিক কে পুরোনো রেকাবি বলি
মূলত তুমি এক হরিয়াল ছানা
আড়ালে চিঁ চিঁ ডাক, উঁকি মার জাফরানি ।

আমার ভাললাগার টুনটুনি
এই শ্রাবণ ধারায় স্নান শেষে
চল ঝিলিমিলি আমরা আলোয় ঢেউ খেলি
ভালোবাসলে কেউ ডাকাত হয় কেউবা আবার ভিখারি ।

;

আকিব শিকদারের দু’টি কবিতা



আকিব শিকদার
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

যোগ্য উত্তর

‘তোমার চোখ এতো ডাগর কেন?’
‘স্বর্ণ দিনের স্বপ্নঠাসা দুচোখ জুড়ে।’

‘তোমার বুকের পাঁজর বিশাল কেন?’
‘সঞ্চয়েছি স্বদেশ প্রীতি থরেথরে।’

‘তোমার আঙুল এমন রুক্ষ কেন?’
‘ছদ্ধবেশীর মুখোশ ছেঁড়ার আক্রোশে।’

‘তোমার পায়ের গতি তীব্র কেন?’
‘অত্যাচারীর পতন দেখে থামবে সে।’

অনন্তকাল দহন

ঝিঝির মতো ফিসফিসিয়ে বলছি কথা আমরা দুজন
নিজেকে এই গোপন রাখা আর কতোকাল?
: অনন্তকাল।

বাঁশের শুকনো পাতার মতো ঘুরছি কেবল চরকী ভীষণ
আমাদের এই ঘুরে ঘুরে উড়ে বেড়ানো আর কতোকাল?
: অনন্তকাল।

তপ্ত-খরায় নামবে কবে প্রথম বাদল, ভিজবে কানন
তোমার জন্য প্রতিক্ষীত থাকবো আমি আর কতোকাল?
: অনন্তকাল।

তোমার হাসির বিজলীরেখা ঝলসে দিলো আমার ভুবন
এই যে আগুন দহন দেবে আর কতোকাল?
: অনন্তকাল।

;

তোমার বীণায় সুর ছিল



প্রদীপ্তকুমার স্যানাল
দৈনিক বসুমতীতে প্রকাশিত প্রদীপ্তকুমার স্যানালের সেই নিবন্ধ। ছবি: আশরাফুল ইসলাম

দৈনিক বসুমতীতে প্রকাশিত প্রদীপ্তকুমার স্যানালের সেই নিবন্ধ। ছবি: আশরাফুল ইসলাম

  • Font increase
  • Font Decrease

‘দিল্লী চলো, চলো দিল্লী’ সুভাষকণ্ঠে আটত্রিশ কোটি আশি লক্ষ হিন্দু-মুসলমানের সম্মিলিত কণ্ঠস্বর যেন এই মুহূর্তে পাচ্ছি আবার শুনতে। দিল্লীর মাটিতে স্বাধীন বাংলার প্রথম রাষ্ট্রপতি পা দিলেন-অবিস্মরণীয় সেই মুহূর্তে শুনি বিস্ময়কর অভিভাষণ, ভারতের আকাশে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত সাড়ে সাত কোটির কণ্ঠস্বর একটি কণ্ঠে। মুজিবর রহমান ..সেই নাম। আমি জানি, নামমাত্র নয় সেই নাম; সমস্ত বাঙালীর সংগ্রামের নামান্তর সে নাম আমাদের আগামীকালের ইতিহাস গড়বে।

লন্ডনের হোটেলে ছিন্নবেশে পা দিয়েছিলেন তিনি যাঁর নির্দেশে বীণা তুলে নিয়েছে ছিন্নকণ্ঠ, মানুষ শুনেছে মৃত্যুর গর্জন সঙ্গীতের মতো। সেই নেতার গলায় স্বাধীন বাংলার প্রথম বরমাল্য তুলে দেওয়ার মহত্তম সৌভাগ্যের অধিকারী আমরা। ভারতবর্ষ তাঁর ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করেছে কণায় কণায়। এই মুহূর্তে সমস্ত কিছুর রং বদলে গেছে। এপারের মানুষও উন্মাদ হয়েছে ওপারের মানুষের উদ্বেল হওয়ার মুহূর্তে।

স্বাধীন বাংলাদেশের মাটি থেকে-যে বিপ্লবী বীর এবং স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে অগ্রসর প্রথম পদাতিক মুজিব (?) তুমি আমাদের ..চিত্তের প্রণতি গ্রহণ করো। তোমার মুখে ‘আমার সোনার বাংলা তোমায় ভালোবাসি’ বাংলার জাতীয় সঙ্গীত হল..। কত আন্দোলনে যে বাংলা ভাষা প্রাণ ফিরে পেয়েছিল তা প্রাণবন্ত হল দিল্লীর জনসভায় তোমার অভিভাষণের জোযারে। দেশবন্ধুর মৃত্যুহীন প্রাণ নেতাজী, আর সেই প্রাণের নিঃসীম স্পন্দন তোমার নেতৃত্বের অঙ্গে অঙ্গে।

শেখ মুজিব তাঁর বক্তৃতায় বলেছেনঃ আমি মানুষ, আমি বাঙালী, আমি মুসলমান। বাঙালীর হৃদয় থেকে উৎসারিত যত কথা যত ভাব সব নেতার একটি ঘোষণায় সুস্পষ্ট চেহারা নিয়েছে। এর চেয়ে সত্য ভাষণ আর কি হতে পারে! সবার উপরে মানুষ সত্য-মনুষ্যত্বের দাবী সবার আগে। মানুষের বাঁচার অধিকার প্রতিষ্ঠায় পৌঁছবার লক্ষ্যে যে সংগ্রাম শুরু হয়েছিল, তার প্রথম পর্যায় সমাপ্তির মুখে। এর চেয়ে সত্যোন্মুক্ত বাণী নেতৃত্বের জবানীতে আর কি হতে পারে? সর্ব প্রথম মানবমুক্তি তার পর অন্য প্রয়োজন। ভাই শেখ সাহেব তাঁর ভাষণের প্রথমেই বলেছেন, প্রতিহিংসার নয় ক্ষমার ক্ষমা সুন্দর মুখকে বাঙালী নিভৃতেও ফুটিয়ে তোলার কথা। এই অন্যায় অবিচারের তুলনা বিরল, দুর্ঘটনায় পরিসমাপ্তির সন্ধিক্ষণে শত্রুকে ক্ষমা করার ঔদার্যে মহিমান্বিত প্রসন্নোক্তি আর কবে কোথায় শোনা গেছে? দেশের মানুষকে কবে কোথায় কোন নেতৃত্বের অভয়বাণী যুদ্ধের অব্যবহিত পরেই শোনাতে পেরেছে শান্তির ললিতবাণী। তাই মনুষ্যত্বের কথা, মানুষের কথা ওঁর মুখে মানায়। অসহযোগ আন্দোলন পূর্ণতম সাফল্যকে সর্বাত্মক মুক্তির আগমন মুহূর্তে সশস্ত্র সংগ্রামে রূপ দেওয়া যাঁর নেতৃত্বে সম্ভব সেই নেতার মুখেই মানায় শান্তির বাণী। দুর্বলের মুখে শান্তির প্রয়াস হাস্যকর নয় শুধু অট্টহাসিকরও বটে।

বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রাম শুরু হওয়ার পরেই-বিভিন্ন মুখে শুনেছি এর নানা বিশ্লেষণ, বৃহত্তর হিসেব নিকেশ। তবু যা একবারও শুনিনি, একটি মানুষের মুখেও যে সত্য উক্তি একবারের জন্যও শোনা যায়নি, তা হল, এ সংগ্রাম সাড়ে সাত কোটি বাঙালীর সংগ্রাম, এ সংগ্রাম বাঙালীর জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম। সেই দুর্ণিবার জাতীয়তাবোধকে ইজমের ধোঁয়ায় অন্ধকারে যদি বিপথে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হত তবে ইয়াহিয়া চক্রের পক্ষেও সম্ভব ছিল এ যুদ্ধ জয় করা। বাঙালীয়ানাই বাঙালীর সবচেয়ে উজ্জ্বল সত্য চরিত্রচিত্র। তাই দিল্লীর জনসভায় মুজিবের কম্বুকণ্ঠে যখন শুনিঃ

‘‘আমি জানতাম না আবার আপনাদের মধ্যে ফিরে আসতে পারব। আমি ওদের বলেছিলাম তোমরা আমাকে মারতে চাও, মেরে ফেল। শুধু আমার লাশটা বাংলাদেশে আমার বাঙালীদের কাছে ফিরিয়ে দিও।’’

তখন তাঁকে শুধু বাংলা বলব, না, সমস্ত মানুষের দুঃখে তার নেতার কণ্ঠে একে বেদনার করুণ বিপ্রলম্ভ বলব। তবু এত ভালবাসা, এত ¯েœহসিক্ত আনন্দের নির্ভরতা বাঙালীর জাতীয়তাবোধ ছাড়া আর কোন পথে আসা সম্ভব। ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ জাতীয় সঙ্গীতের এই প্রথম লাইনেই বঙ্গহৃদয় সোনা হয়ে গেছে। এই গান মুখে নিয়ে বাঙালী প্রাণ দিয়েছে। তবু এই সংগ্রামকে যদি বাঙালী জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম না বলি, তবে মিথ্যা ভাষণের ফল আমাদের পেতেই হবে। বাঙালীর বাঁচারও বটে মরারও বটে একমাত্র প্রশ্ন তার ভাষা। এ সংগ্রাম শুরু হয়েছিল ভাষা আন্দোলনের মুহূর্তে। বাঙালীর সবচেয়ে কোমল সবচেয়ে নিভৃত মর্মকোষ তার ভাষা। সেই কোমল স্থানেই আঘাত করে শাসনচক্র চেয়েছিল বাঙালীকে নিশ্চিহ্ন করতে। বেদনায় বিক্ষত বাঙালী হৃদয় কঠিনতম প্রতিজ্ঞায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিল। সে প্রতিজ্ঞা সফল হয়েছে। সেই সফলতার উৎসে বাঙালীর সবচেয়ে প্রাণের কবি রবীন্দ্রনাথ। বাঙালী কবি। তাই কবিতাই তাকে রক্তাক্ত করেছে, করেছে সুজলা সুফলা।

এমন কঠোরে, কোমলে, আনন্দ বেদনায়, হাসিকান্নার হীরাপান্নায় আর কোন দেশের ইতিহাস হয়ে আছে গাঁথা। ধর্ম নিয়ে অধর্মের রাজনীতি করার পুরণো পথ পরিত্যাগ করেছে বাংলাদেশ। দুর্দিনে অশ্রুজলধারায় বাঙালীর চেতনা থেকে ধর্মান্ধতার ক্লেদ ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেছে। বাঙালী মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ অথবা খৃষ্টান এসব কিছুই নয়। বাঙালীর একমাত্র পরিচয় যে বাঙালী। এই সত্যটুকু বাঙালীকে বুঝে নিতে রক্তের মূল্য দিতে হয়েছে বারংবার। যতদিন বাঙালী হিন্দু, মুসলমান অথবা বৌদ্ধ, খৃষ্টান ছিল, ততদিন জঙ্গীশাহীর শোষণের থাবাও ছিল অপ্রতিহত শক্তিতে উদ্যত। যে মুহুর্তে বাঙালীর মুখ থেকে খসে পড়েছে ধর্মীয় বাধানিষেধের মিথ্যে মুখোশ সেই ক্ষণ থেকেই শোষণে কায়েমী সিংহাসন বাংলার মাটি থেকে উচ্ছেদ হয়ে গেল। কারণ এই ধর্মীয় বাধানিষেধকে সম্বল করেই দীর্ঘদিনের শোষণে পাক জঙ্গীচক্র বাংলার মানুষকে নিঃস্ব করেছে, সব কিছু লুঠে নিয়েছে বাংলার বুক থেকে। রক্তস্নাত বাংলা আজ শোষণহীন, বাঙালীর আজ একটি মাত্র পরিচয় সে-বাঙালী।

বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক এবং সবার বড় কথা সে আজ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। মুসলিম ইতিহাসে এ এক বিরাট নজির। ধর্ম আজ বাংলাদেশে ব্যক্তিগত বিষয় ছাড়া কিছুই নয়। তার নেতার কণ্ঠেও আজ এরই প্রতিধ্বনি। বাংলাদেশের সাথে ভারতবর্ষের পরবর্তীকালে কি সম্পর্ক দাঁড়াবে তা এই প্রথম দিনেও সুস্পষ্ট। বাংলা এবং ভারতের নীতি এক এবং সে নীতি দুর্ণীতির মুলোচ্ছেদ। বাংলাদেশের পাশে বন্ধুত্বের দাবী নিয়ে এগুতে পেরে, পৃথিবীর পৃথিবীর মহত্তম স্বাধীনতা সংগ্রামের পাশে একমাত্র সাহায্যদাতা হিসেবে থাকতে পেরে ভারতবর্ষ বিশ্বের শক্তির ভারসাম্য সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। অন্যের কৃপাকণায় বেঁচে থাকার দুর্দিন আজ ভারতবর্ষের সৌভাগ্যের ঊষা লগ্নে অপসৃত। মুজিবের কণ্ঠে কৃতজ্ঞতার সহৃদয় সম্ভাষণ ভারতবর্ষের মানুষকে ঘিরে, ইন্দিরাকে ঘিরে। বাংলাদেশ তার চরম দুর্ভাগ্যের মধ্যে ভারতবর্ষকে যে বন্ধুত্বের মর্যাদায় বসিয়েছে তা ক্ষুন্ন হওয়া কোন চক্রান্তেই সম্ভব নয় আর।

বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামকে সাফল্যের দ্বারে উপনীত করার প্রতিটি পদক্ষেপে নেতা মুজিব পেয়েছেন নেতাজীর ভাব নির্দেশ। আমরা আজ গর্বিত। বাংলার মানুষের দুঃখের বটে সুখেরও বটে সমান অংশীদার ভারতবর্ষ। মুজিবের নেতৃত্বে নেতাজীর পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছে আসমুদ্র হিমাচল। (নিবন্ধে প্রদীপ্তকুমার স্যানাল ব্যবহৃত বানানরীতি অবিকৃত রাখা হয়েছে)।

প্রথম প্রকাশ: রবিবারের বসুমতী সাময়িকী, ১৬ই জানুয়ারি ১৯৭২; দৈনিক বসুমতী

সংগ্রহ ও সম্পাদনা: আশরাফুল ইসলাম, পরিকল্পনা সম্পাদক, বার্তা২৪.কম

ঋণস্বীকার: ন্যাশনাল লাইব্রেরি, কলকাতা।

;