Alexa

বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষা বাংলা

বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষা বাংলা

অমর একুশ, ছবি: বার্তা২৪.কম

ড. মাহফুজ পারভেজ, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম
শুধু নিজের ভাষা বলেই নয়, তথ্য-পরিসংখ্যান বলছে বাংলা বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষা। সংখ্যা ও গুণের দিক থেকে এবং অন্যবিধ কারণে বাংলা বিশ্বসভায় সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত।
 
কয়েক বছর আগে প্রকাশিত ‘দ্য ওয়ার্ল্ড ফ্যাক্টবুক’-এর তথ্য অনুসারে সারা বিশ্বে বাংলাভাষী জনসংখ্যা ছিল সাতাশ কোটির কাছাকাছি। চলতি ২০১৯ সালে সংখ্যাটি আরো অনেক বেড়েছে। মনে করা হয়, বর্তমানে পুরো দুনিয়ায় তিরিশ কোটি মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলেন, যার অর্ধেক বাংলাদেশে আর বাকী মানুষ পশ্চিমবঙ্গ, আসাম এবং ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা ও বিশ্বের নানা স্থানে বসবাসকারী বাঙালি।
 
সংখ্যাটি বিশ্ব ও এশিয়া মহাদেশের বিবেচনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ভাষাগত ও জনগোষ্ঠীর এই সংখ্যাগত বিশালত্ব এশিয়া মহাদেশে বাংলাকে দ্বিতীয় বৃহত্তম ভাষিক-জাতিগোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং এশিয়া মহাদেশের ৭০০০ ভাষার মধ্যে মাতৃভাষার অবস্থানে বাংলাকে স্থান করে দিয়েছে দ্বিতীয় আসনে। এই সম্মান বাংলা অর্জন করেছে নিজস্ব যোগ্যতায়।
 
লক্ষ্যণীয় তথ্য হচ্ছে, আমাদের বাংলাভাষা বাংলাদেশের জাতীয় ভাষা। সেই সঙ্গে ভারতের আঠারোটি অফিসিয়াল ভাষার মধ্যে অন্যতম। এখানেই শেষ নয়, বাংলা ভাষায় বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত, ভারতের জাতীয় সঙ্গীত আর জাতীয় স্তোত্র রচিত। ১৯৯৯ সালে ইউনেসকো ১৯৫২-এর দুর্বার ভাষা আন্দোলনের সংগ্রামদীপ্ত আন্দোলনের ঘটনাকে সশ্রদ্ধ মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছে। ২১ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত হয়েছে আন্তর্জাতিক ‘মাতৃভাষা দিবস’ রূপে। বিশ্বের ১৮৮টি দেশের মানব জাতি এই দিনটিকে ‘মাতৃভাষা দিবস’ রূপে উদযাপন করে চলেছেন শ্রদ্ধার ডালি এবং ভালোবাসার অর্ঘ্য নিবেদন করে, যার কৃতিত্ব বাংলা ভাষা ও বাঙালির। 
 
সম্মানজনক তথ্য আরো আছে। ‘এথনোলগ’ নামে একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের জরিপের কথা প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায়। ‘এথনোলগ’ হলো একটি ওয়েব-বেসড ক্যাটালগ। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এখানে জরিপের মাধ্যমে পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিশ্বের ভিন্ন ভিন্ন জনগোষ্ঠীর ভাষাসমূহ সংগ্রহ করে লিপিবদ্ধ করা হয়ে থাকে। তাদের জরিপ অনুযায়ী, বাংলা ভাষিক জনসংখ্যার গরিষ্ঠতা বিচারে বিশ্বের দশটি প্রধানতম ভাষার মধ্যে বাংলা ভাষার স্থান পঞ্চমে।
 
পর্যায়ক্রমে এর আগের চারটি ভাষা হলো, ম্যান্ডারিন চায়নিজ, স্প্যানিশ, ইংলিশ ও হিন্দি। পরের পাঁচটি ভাষা হলো: আরবি, রাশিয়ান, পর্তুগিজ, জার্মান, ফ্রেঞ্চ। অর্থাৎ, বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতির তালিকায় সামনের কাতারে অবস্থান করছে বাংলা ভাষা, যা আমাদেরকে বিশ্ব-সংসারে অগ্রবর্তী হওয়ার জন্য নিত্য প্রাণিত করছে।
 
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, বর্তমানে অস্তিত্বমান ৭০০০ ভাষার মধ্যে বাংলা ভাষার এই আসনটি নির্ণীত হয়েছে বাংলাদেশ এবং বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষী জনসংখ্যার সংখ্যাতত্ত্বগত আধিক্যের ভিত্তিতে। কিন্তু দেশের বাইরে প্রবাসের বিরূপ সামাজিক আবহাওয়ার বাস্তব প্রেক্ষিতে প্রবাসীদের বাংলা ভাষার চর্চা নানাবিধ সংকুলতায় পূর্ণ। তথাপি অনেকেই স্ব-উদ্যোগে সন্তান ও পরিবারের মধ্যে বাংলাকে ধরে রেখেছেন। একটি বৈশ্বিক পরিমণ্ডলের নানা ভাষা ও সংস্কৃতির স্রোতকে ঠেলে ঠেলে সেটা সম্ভব করেছেন বাংলা-প্রিয় বাঙালিরা।
 
অতএব বাংলা ভাষা আমাদের এবং বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা বাঙালির, যার মূল কেন্দ্রস্থল বাংলাদেশ। যদি প্রবাসের বাংলা ভাষিক জনগোষ্ঠীকে বাংলা ভাষার সঙ্গে সম্পর্কিত রাখা সম্ভব না হয়, তাহলে যে বিশাল সংখ্যার জোরে আমরা বাংলা ভাষাকে নিয়ের বুক ফুলিয়ে চলি, সেটা সম্ভব হবে না। 
 
কারণ, বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বাইরে মোট বাংলা ভাষিক জনগোষ্ঠীর এক-তৃতীয়াংশই প্রবাসী। বিশ্বব্যাপী প্রসারিত বাংলা ভাষার দিগন্তকে নির্বিঘ্ন রাখতে হলে প্রবাসীদের মাতৃভাষা চর্চায় মনোযোগ ও গুরুত্ব দিতেই হবে। সে কারণেই বাংলাদেশ এবং বিশ্বব্যাপী অবস্থিত বাঙালির মধ্যে ভাষিক ও সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধ মজবুত হওয়া দরকার। সকলের সাংস্কৃতিক ঐক্যের শক্তিতে বাংলা হবে মজবুত ও আরো মহীয়ান।
   
বাংলা ভাষাকে ঘিরে সাংস্কৃতিক বন্ধন এ কারণেই জরুরি যে, সবাই মিলে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির জন্য নিবেদিত না হলে সভ্যতার আন্তর্জাতিক প্রবাহ থেকে আমরা পিছিয়ে পড়ব। এমন একটি শঙ্কার কথা প্রচ্ছন্নভাবে পাশ্চাত্যের ভাষাবিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন। তারা বলছেন, এশিয়া মহাদেশের ৫৫টি, আফ্রিকার ৩৭টি, ইউরোপের ৭টি, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিশেষত অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের ১৫৭টি এবং দুই আমেরিকার ১৬১টি ভাষা ইতোমধ্যেই বিলুপ্তির পথে। কারণ এই ভাষাগুলোয় যারা এখনো কমিউনিকেট করছেন তারা সকলেই হয় বৃদ্ধ, নয়তো প্রায়-বৃদ্ধ। ৯০০ কোটি মানুষের পৃথিবীতে এই লুপ্তপ্রায় ভাষাভাষী মানুষের সংখ্যা ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ১০০০০ সংখ্যার নিচে। 
 
অতএব প্রবাসী বাঙালিদের অবশ্যই নিজেদের সন্তানদের বাংলায় দক্ষ করতে হবে, যারা এই রক্তরাঙা ভাষাকে এগিয়ে নেবে প্রজন্ম ও পরম্পরায়। হারিয়ে যেতে দেবে না মায়ের ভাষাকে। শত বিরূপতাতেও ধরে রাখবেন ভাষার বৃক্ষ ও সংস্কৃতির শেকড়।
 
আরেকটি তথ্যও বেশ উদ্বেগের। বর্তমানে অস্তিত্বময় ভাষাপ্রবাহের গতিপ্রকৃতির বিভিন্ন তথ্যউপাত্ত সংগ্রহ করে ভাষাবিজ্ঞানের পদ্ধতিগত বিশ্লেষণ শেষে এমন ভবিষ্যৎ সতর্ক বাণী উচ্চারিত হচ্ছে যে, একবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে বর্তমান বিশ্বের ৭০০০ অস্তিত্বমান ভাষার প্রায় নব্বই শতাংশই বিলুপ্ত হয়ে যাবে অথবা অবলুপ্তির সম্মুখীন হয়ে পড়বে। যেভাবে নতুন জন্ম নেয়া জনপ্রিয় ভাষাগুলোর শক্তিশালী অভিঘাতে ক্রমে ক্রমে অব্যবহৃত হয়ে গেছে, ওল্ড চার্চ স্লাভেনিক, ক্লাসিক্যাল আর্মেনিয়ান, অ্যাভিস্টান, বিবলিক্যাল হিব্রু, কপটিক, নিউ টেস্টামেন্ট গ্রিক, গীজ, অর্ধমাগধী (মাগধী প্রাকৃত ও মাগধী অপভ্রংশ, যা বাংলা এবং উপমহাদেশীয় বহু ভাষার জননী), পালি, সংস্কৃত, ল্যাটিন প্রভৃতি।
 
ফলে এতিহ্যবাহী, সমৃদ্ধ, শক্তিশালী ও মহৎ একটি ভাষা থাকলেই হচ্ছে না, তাকে সঞ্জীবিত রাখারও দরকার পড়ছে। বিশেষত বিশ্বায়নের এই যুগে পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্রে মাইগ্রেটেড জেনারেশনের একটা অংশ তাদের পরের প্রজন্মের জন্য মাতৃভাষা চর্চার বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করলেও উত্তর-পুরুষদের বেশিরভাগেরই পূর্ব-পুরুষদের ভাষার সঙ্গে আন্তরিক কোনো সম্পর্ক গড়ে উঠছে না। কারণ শৈশব থেকে যে সুনির্দিষ্ট দেশের অফিসিয়াল ও স্থানীয় ভাষার মাধ্যমে তাদের প্রাত্যহিক শিক্ষা অর্জন ও জীবন-যাপন করতে হয় (স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি প্রভৃতিতে শিক্ষালাভের ফলে), তার সমাজ-সংস্কৃতির পারিপার্শ্বিকতা আর বন্ধু সংসর্গের বাস্তবতাকে তাদের পক্ষে অগ্রাহ্য করা বাস্তবেই সম্ভব নয়। এই বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করেই বিদেশে বসবাসরত বাংলাভাষী মানুষের মুখে ও চর্চায় বাংলা ভাষাকে টিকে থাকতে হচ্ছে এবং অবশ্যই টিকিয়ে রাখতেও হবে।
 
এক্ষেত্রে বাংলাভাষী মানুষের সদিচ্ছা ও সম্মিলিত প্রয়াস অতীব জরুরি। বাংলা ভাষার বিশ্বময় ঐক্য ও মেলবন্ধন আমাদের মায়ের ভাষা বাংলার প্রচার ও প্রসার বাড়াবে, ভিত্তিকে বিশ্বময় দৃঢ় করবে এবং যে কোনো বিপদ ও সঙ্কট কাটাতে সাহায্য করবে। এজন্য বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষা বাংলাকে আরো সমৃদ্ধ ও গতিশীল রাখতে বিশ্বের সকল বাঙালিকেই দায়িত্ব পালন করতে হবে। ভাষাশহিদদের রক্ত ও ভাষা সংগ্রামীদের ত্যাগের পথ বেয়ে অর্জিত বাংলা প্রেম ও বাংলা চর্চার ধারা বিশ্বের সকল বাংলাভাষী অঞ্চলে অব্যাহত রাখার মাধ্যমেই এই ভাষাকে চির সজীব ও সদা জীবন্ত রাখা সম্ভব হবে।

ফিচার এর আরও খবর

মহীবুল আজিজের সৃজন জগৎ

মহীবুল আজিজের সৃজন জগৎ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান, অধ্যাপক ড. মহীবুল আজিজের সৃজন জগৎ বহুমাত্রিক ও বর্ণময়।...