আমাদের বিষাদি আত্মাগণ সুখে থাকুক



এনামুল রেজা
অলঙ্করণ শতাব্দী জাহিদ

অলঙ্করণ শতাব্দী জাহিদ

  • Font increase
  • Font Decrease

এমন হলে ভালো লাগে না। রিকশায় দশ নম্বর থেকে বাসায় ফিরবার সময় একটা প্রাইভেট কারের সামনে প্রায় উল্টে পড়েছিলাম। ট্যাক্সিটা রাস্তা ক্রস করতে চাইছিল, কিছু বুঝবার আগেই প্রায় ফাঁকা রাস্তায় চলন্ত রিকশার সামনে এসে ব্রেক করল। তাল সামলাতে না পেরে উড়ে গেলাম।

দামি গাড়ি, ফ্রন্ট ডোরের কিছুটা তুবড়ে যাওয়ায় ড্রাইভার যখন রিকশাঅলাকে মারতে উদ্যত হবে, বিস্ময় কাটিয়ে চিৎকার করে উঠেছিলাম, “আমার জীবনের দামের চেয়ে গাড়ির দাম বেশি নাকি মিয়া? দিয়েছিলেন তো পিষে আরেকটু হলে!” জানি না ওই চিৎকারে বিশেষ কিছু ছিল কিনা, ট্যাক্সির পেছনে বসা সফেসটিকেটেড ভদ্রলোক ভেতর থেকে বেরিয়ে নিজের ড্রাইভারকে শান্ত করলেন। খুব দ্রুতই একটা “হতে পারত” ধরনের ঝামেলা মিটে গেল। চারপাশ মুহূর্তে ঘিরে ফেলা লোকজন এদিক ওদিক চলে গেল হতাশ হয়ে, তারা গণ্ডগোলভুক, পৃথিবীর এ-প্রান্তে পথচারীদের সম্ভবত হাতে কোনো কাজ থাকে না, রাস্তায় কিছু ঘটলেই উৎসাহ নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। রিকশাঅলা ঝড়ের গতিতে আমাকে নিয়ে বারো নম্বরের পথ ধরল।

মামা, যা থেরেটটা দিছিলেন না! নাইলে আজকে আমার খবর আছিল।
আপনি আরেকটু সাবধানে চালাবেন। হাইওয়েতে রিকশাকে কেউ গোনায় ধরে না।
আইজ আপনেই কন মামা, আমার দুষ ছিল কুনো?

রিকশাঅলার নাম জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছিল। একেকদিন করিও। টুকটাক সামাজিক-রাজনৈতিক আলাপ ওদের সঙ্গে করতে ভালো লাগে। এই যে মেট্রোরেল হচ্ছে, মায়ানগরের পথঘাট পরিণত হচ্ছে খানাখন্দে, এসব নিয়ে দেখা যায় ওরা বেশ তথ্য রাখে। বেশিরভাগই সরেজমিন মন্তব্য। হয়তো নির্মাণ শ্রমিকদের কাছ থেকে ওরা তথ্যগুলো পায়। প্রতি পিলারে কয় গাড়ি সিমেন্ট লাগে, কোথায় কত বড় চুরি হচ্ছে, কবে নাগাদ এই যজ্ঞ শেষ হতে পারে। কেউ কেউ আবার দারুণ সরকার-ভক্ত। নিয়মিত আমাদের লাইনের মাথা থেকে রিকশায় দশ নম্বরে যাই, এদিকটায় ওদের প্রায় সকলেই চেনে আমাকে। কিন্তু আজ আর কথা বিশেষ এগিয়ে নিয়ে যেতে ইচ্ছে করছিল না।  

আসলে বুকের রক্ত ছলকে ওঠা ব্যাপারটা টের পেয়েছিলাম তো। এক মুহূর্তের এদিক ওদিকে কত কিনা হতে পারে।  কিভাবে ভারসাম্য ঠিক রাখলাম জানি না। রাস্তায় উল্টে না পড়ে একটা পল্টি খেয়েও সোজা হয়ে দাঁড়াতে পেরেছিলাম। এই ক্ষণিকের উড্ডয়ন ও পল্টিতে একটা সার্কাস ছিল সম্ভবত, সঙ্গে কিছু সাফল্যও। তাই কি অমন জোর পেয়েছিলাম কন্ঠে? জানি না।

বাসায় ফিরেছি বহুক্ষণ পেরিয়ে গেছে। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে এ-সমস্ত ভাবছি। ফাঁকা ড্রয়িংরুমে এই রাতের প্রথম প্রহরেও গহন রজনীর নিস্তব্ধতা। বাইরে থেকে শব্দ আসছে খুব অল্প। মশার যন্ত্রণায় জানালাগুলো বন্ধ। এখন তো সারা বছর মশার যন্ত্রণা। কী চমৎকার বিবর্তন হয়েছে ব্যাটাদের। কয়েলে কাজ হয় না, গ্রীষ্ম-বর্ষা-শীত, সকল ঋতুতেই ওদের প্রজনন বহাল থাকে। টিভি অন করা যেতে পারে। যদিও টিভিতে এখন আর দেখার মতো প্রোগ্রাম কই হয়?

আমি সম্ভবত বৃদ্ধ হয়ে যাচ্ছি এ সাতাশেই। বেঁচে থাকার দিনগুলোতে নানাভাই সারাদিন ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক আর এনিমল প্লানেটে বাঁদর-কুমির এইসব দেখত। ছোটবেলায় আমার ধারণা ছিল বুড়ো হলে এসব চ্যানেল দেখতে হয়। এখনো ধারণাটা বদলায়নি। এনিমল প্লানেট আর আসে না, আমাদের ডিশের লাইন খুব যা-তা ধরনের, থাকতে হয় তাই আছে। বিলও বেশি না, সম্ভবত দেড়শো টাকা দিতে হয় মাসে। আমি ন্যাটজিও আর ডিসকভারি চ্যানেল ছাড়া টিভিতে কিছু দেখবার মতো খুঁজে পাইনা। বিশেষত, বাঁদর বিষয়ক যে কোনো অনুষ্ঠান দারুণ লাগে, বাস্তবে বাঁদর দেখার মতো উত্তেজক না হলেও মন্দ না ততটা। শেষ কবে সাক্ষাৎ বাঁদর দেখেছি? মিরপুর ক্যান্টনমেন্টের ভেতর দিয়ে রিকশায় যাচ্ছিলাম। জাহাঙ্গীর গেট থেকে বাংলা-মটরের বাসে উঠব। জাহাঙ্গীর গেটের কিছু আগে দেয়াল ঘেরা একটা আর্মি কোয়ার্টারের বাগানে দেখলাম চার সদস্যের এক বাঁদর পরিবার জুলজুল করে চেয়ে আছে আমার দিকে। তাদের বসবাস এক ফলবতী কাঁঠাল গাছে, ওগুলোর গায়ের রঙও ছিল হলদেটে, কাঁঠালের মতন।

লীনা বাসায় নেই। এই না থাকাটার কারণ হয়তো কোনো নিমন্ত্রণ। কারো বিয়ে বা কারো সন্তানের জন্মদিন, মুসলমানি ইত্যাদি। বাচ্চা মেয়েটাকে নিয়ে প্রায় একা একাই সবখানে যায় লীনা। এই সংসারে আমার থাকা-থাকিটা যান্ত্রিক। ছুটির দিন ছাড়া ওদের সঙ্গে তেমন কথা হয় না। সকালে অফিসের জন্য বের হয়ে যাই। সারাদিন কাটে কাজের মাঝে। ফিরতে ফিরতে রাত আটটা কি নয়টা। ট্র্যাফিক জ্যাম, কোনো গাড়ি না পেয়ে দুই তিন কিলোমিটার হণ্টনের ক্লান্তি আমাকে অবশ করে দেয়। বেশিরভাগ দিনেই পারিজা ঘুমিয়ে পড়ে। লীনা আর আমার সংসার খুব বিমর্ষ ধরনের। মেয়েটা এসব দেখতে দেখতে বেড়ে উঠছে। বড় হলে নিজেও হয়তো অবসন্ন আর বিষণ্ন এক মানুষ হবে। আজকাল এ-নিয়ে দুশ্চিন্তা করি না আমরা কেউ। লীনা করে কিনা তা অবশ্য জানা নেই। আমাদের সঙ্গমে মরচে ধরে গিয়েছে।

বাইশ বছর বয়সে বিয়ে করে ফেলাটা নিশ্চয়ই একটা বিপ্লবী ধরনের ঘটনা। লীনা আর আমার বিয়েটা ছিল ঘর-পলাতক। অবশ্য, আমার পালাবার দরকার হয়নি। ও-ই একদিন গাঁটছড়া বেঁধে সবকিছু নিয়ে আমার ঘাটে এসে ভিড়েছিল। খুব ক্রিটিকাল এক সময় তখন। নানাভাই ভীষণ অসুস্থ। যে কোনো দিন ঝরে যাবেন। আম্মা ঘুমাতে পারছেন না রাতের পর রাত, হাইস্কুল পড়ুয়া ছোটবোন ত্রপা আর কী বা সাহায্য করবে? আব্বার পোস্টিং তখনও মায়ানগরের বাইরে। একা একা কতদূর সামলানো যায়? এসবের মধ্যেই আমাদের প্রেম চলছিল। রেস্টুরেন্টে, রিকশায়, সোহরোয়ার্দী উদ্যান কিংবা পাবলিক বাসে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও ছাড়পত্র মেলেনি কারো অথচ মনে হতো দারুণ বড় হয়ে উঠেছি। একদিন সুলতানের চিত্রকলার মতো প্রাণশক্তিতে ভরপুর এক ভালোবাসা-বাসির সময় আমিই ওর চুলে আঙুল চালাতে চালাতে বলেছিলাম, “আমাদের উচিত বিয়ে করে ফেলা।” লীনা হেসেছিল। ওর ঘেমে ওঠা নাকের ডগা, কাজল লেপ্টে যাওয়া চোখ আর অপ্রশস্ত কপালের রেখায় খেলা করতে শুরু করেছিল বিস্ময়।

এখনো আমরা পাশ করে বের হলাম না। বিয়ে যে করবে আমাকে, খাওয়াবে কী?
তোমার কি ধারণা আমি এখন কোনো চাকরি পাব না?
কী যে পাবে! আমার বাসায় রাজি হবে কেন তোমার সঙ্গে বিয়ে দিতে?
রাজি হওয়া লাগবে না লীনা। চলো আমরা নিজেরাই বিয়ে করে ফেলি।

অনুমেয়-ভাবেই কেউ রাজি হলো না ওদের বাসায়। আম্মা বললেন, বিয়ে করবি বেশ। তোর নানাভাইয়ের এমন অবস্থা, আমি একা মানুষ, তোর আব্বা শহরের বাইরে।  সময়টা আনন্দের না শিপন। ত্রপার এসএসসি আর ক’দিন বাদেই।  

মানুষ হিসেবে নিজেকে পলাতক মনে হয় আমার, চিরকাল। সব সঙ্কট থেকে গা বাঁচিয়ে কিভাবে ভালো থাকা যায়, এই চেষ্টা ছোট থেকেই করতাম।  নানাভাইকে যে আমি ভালোবাসতাম না, এমন নয়। সেই ভালোবাসা ছাপিয়ে আমার মনে হতো, নব্বই ছুঁই ছুঁই একজন বৃদ্ধ সহজ স্বাভাবিক মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন, সে দুঃখে নিজের জীবনের স্রোত আটকে দিলেই কি মানুষটা অমরত্ব পাবেন কিংবা অন্তত দশ বছরের বাড়তি আয়ু? বাসা থেকে লীনাকে জোর করে বিয়ে দেবার তোড়জোড় শুরু হয়ে গেল। পাত্র হিসেবে আমার তেমন যোগ্যতা ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ে যে বাংলা-সাহিত্য পড়ি, ভবিষ্যতে চাকুরির বাজারে তার কদর খুব সামান্য।  আর, আমাদের বয়সটা, আজ মনে হয়, ওই সময় বাইশ যেমনই থাকুক, আজকের চিন্তায় নিতান্তই কৈশোরকাল। গোঁফ-দাড়ি পেয়েছিলাম বংশগত কারণেই, আমাকে বেশ বড় দেখাত এটা অনুমান করি। আসলে আর কত বড় ছিলাম? তবু, ঘটনাটা আমার পক্ষে মোড় নিলে লীনা এক ঘোলাটে শীতের ভরদুপুরে একটা লাগেজ নিয়ে উঠে এসেছিল আমাদের বাসায়।  

যাক, ওসব মনে করে আর কী লাভ-ক্ষতি? ফলাফলের চিন্তা ঝেড়েই আমার মগজে অতীতের সুতীব্র সঙ্গীত দিনমান বাজতে থাকে। জীবন এমন নিস্তরঙ্গ হবে কখনো ভাবিনি। কোনো শঙ্কা নেই, ঢেউ বা প্রবল স্রোত নেই। এই পাঁচ বছর আগেও এত এত এক্সাইটমেন্ট যে পুষতাম বুকে, সেসব কি বেলুনে পোরা বাতাস ছিল? বেলুনটা ফুটো করে দিল কে? চায়ের কাপ হাতে নিয়ে ঘড়ির দিকে তাকালাম। সাড়ে ন’টা বাজে। এক জায়গায় বসে কেমন ঘণ্টাখানেক কাটিয়ে দিয়েছি।  ফোন বেজে চলেছে বেডরুম থেকে। উঠে গিয়ে ধরব, ইচ্ছে করছে না। শরীরে হু-হু করে মেদ বাড়ছে। নিয়মিত বাইরে খাওয়ার ফল। হিসেব করলে দেখা যাবে, প্রতি মাসে কয় বেলা ঘরের রান্না খাওয়া হয় তা হাতের কড়ে গুনে বের করতে পারব।

শ্লেষ্মাজড়ানো একটা কন্ঠে আমার নাম ধরে ডাকল কেউ। কোন একটা ঘরের ভিতর থেকেই। বাইরে থেকে ডাকলে বোঝা যেত।

“শিপন, তোর মোবাইলে রিং হয়। ফোন উঠাস না কেন?..”

যেন প্রশ্ন না। শ্লেষ্মা জড়ানো কণ্ঠটা নির্দেশ দিচ্ছে ফোন ওঠাবার। আজ যখন ফিরেছি, লক ছিল বাইরে থেকেই। চাবি ঘুরিয়ে খুলেছি খুব স্মরণ আছে। অন্ধকার আমার ভালো লাগে না তবু লীনা রুমগুলোর বাতি নিভিয়ে বের হয় সব সময়। আমি আবার সবকটা লাইট জ্বালিয়ে, ফ্লাস্ক থেকে কাপে চা ভরে এরপর ড্রয়িং রুমে বসেছিলাম। কেউ ভেতরে থাকলে টের পেতাম না?

“শিপন, কী হলো? তুই জানিস না ফোনের রিংটোন শুনলে আমার মাথা ব্যাথা করে?”
কে বলতো এই কথা? নানাভাই?     
ডিভান থেকে শরীরটা ওঠাতে খুব বেগ পেতে হলো। একসময় কলেজ টিমে দুর্দান্ত ফুটবল খেলা আমার এত বড় ভুঁড়ি হয়েছে ভাবা যায় না। মোটা লোকদের এত অপছন্দ করতাম। বলে বেড়াতাম মানুষ চাইলেই ফিট থাকতে পারে। এমনকি ফেসবুকে একবার বন্ধুদের থেকে অপিনিয়ন চেয়েছিলাম, “জাতি হিসেবে বাঙালি কি অলস?” আশিভাগ লোক ভোট দিয়েছিল অলসতার পক্ষে। মেনে নিয়েছিলাম, এই ভুখণ্ডের মানুষ অলস। বাস না পেলে মাইল মাইল হাঁটবে। বাস এভেলবল দেখলে আধা কিলোর জন্যও ভিড় ঠেলে উঠে পড়বে।

বেশ তো। দৃশ্যটা খুব অস্বাভাবিক লাগল না। একটা ধুতি আর স্যান্ডোগেঞ্জি গায়ে নানাভাই বসে আছেন বেডরুমের এক কোনায়। শৈশবে আমি ঈশ্বরের অবয়ব কল্পনা করতে চেষ্টা করতাম। দেখতাম যে একটা উঁচু আসনে বসে আছেন তিনি, প্রাচীন এক বৃক্ষের ছায়াতে, পরণে ধুতি আর পাতলা স্যান্ডোগেঞ্জি। নানাভাই পরতেন লুঙ্গি। এখন ধুতি কেন পরে আছেন কে জানে। চেহারায় ঝলমল করছে হাসি। আমাকে দেখে বললেন, “ফোন ধরিস না কেন রে গাধা?”

ফোন করেছে ত্রপা। নানাভাইয়ের হাসি হাসি মুখের সামনেই কলটা রিসিভ করলাম।
হ্যাঁ, ত্রপা, বল।
ফোনের ওপার থেকে অসহিষ্ণু কন্ঠে ছোটবোন বলল, “ভাইয়া ফোন ধরছিলি না কেন? কতক্ষণ ধরে ট্রাই করছি জানিস?”
অফিস থেকে ফিরে ক্লান্ত লাগছিল। ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কী হয়েছে?
পারিজাকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। ভাবি আর আমি সুপারশপে গিয়েছিলাম সন্ধ্যায়। বাবু তো খুব পছন্দ করে ঘুরতে। কিডস কর্নারে ওকে রেখে আমরা কেনাকাটা করেছি। এসে দেখি নেই।
নেই মানে কী?
জানি না ভাইয়া। কী করব বুঝতে পারছি না। ভাবি খুব কান্নাকাটি করছে। আমরা কী করব এখন?

ত্রপা ফোনের ওপাশে কথা বলতে বলতে কাঁদতে শুরু করল। কী বলছে হড়বড় করে শুনতে পেলাম না। আমাদের মেয়ে হারিয়ে গেছে এর মানেটা কী? এই যুগে কারো বাচ্চা হারায়?
তোরা কোথায় এখন?
পল্লবী থানায়।
পুলিশ কী বলেছে?
আর কোনো জবাব পেলাম না। ও হয়তো ফোন কেটে দিয়েছে। পারিজার বয়স চার বছর। দৌড়ে বেড়ায়। চুপচাপ থাকা স্বভাব হলেও ভেঙে ভেঙে প্রায় ভালোই কথা বলতে পারে, বোঝে। অফিসের ড্রেস পরেই আমি বাইরে বেরুলাম। পল্লবী থানা যেতে দশ মিনিট লাগবে। রিকশায় বিশ টাকা নেয়। একটা রিকশা থামিয়ে উঠে পড়লাম। কী করব মাথায় আসছে না। বাচ্চারা হারিয়ে গেলে তাদের কিভাবে খুঁজে বের করে? মসজিদে নিখোঁজ সংবাদ দেব কি?

থানার সামনে রিকশা থেকে নেমেছি, দেখলাম গেটের সামনে ত্রপা আর লীনা দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখেই ওরা ছুটে এলো। দুজনকেই বড় অসহায়, আশাহীন দেখাচ্ছে। টানা কেঁদেছে দুজনে, বোঝা চলে।

শিপন এখন কী করব আমরা? আমার পারিজাকে খুঁজে এনে দাও।
পুলিশ কী বলেছে?
জিডি নিয়েছে। বলেছে চব্বিশ ঘণ্টার আগে কিছু করতে পারবে না।  আজকের মধ্যে পাওয়া না গেলে কাল বিকেল থেকে ওরা তল্লাশি শুরু করবে। অতক্ষণে আমার পারিজা কোথায় থাকবে? ও আল্লাহ গো!

চোখের সামনে লীনা জ্ঞান হারাল। মাটিতে পড়ার আগে ওকে ধরে ফেললাম আমি। ত্রপা আবার উচ্চশব্দে কাঁদতে শুরু করেছে। ধমক দিতে ইচ্ছে হলেও সামলে নিলাম। একটা বাচ্চাকে নিয়ে বের হয়ে এতটা কেয়ারলেস কিভাবে হয় মানুষ? কয়েক মিনিটেই জ্ঞান ফিরল লীনার। আবার চারদিকে লোক জমে গিয়েছে। মানুষ পারেও। কারো কি কোনো কাজ নেই? একটা সিএনজিতে ওদের তুলে দিয়ে বললাম, “তোমরা বাসায় যাও। আমি দেখছি কী করা যায়।”
***
সুপার শপের দারোয়ান বলল, “বাচ্চাটারে আমি বাইর হইতে দেখছি। আর দুইজন মহিলার পিছে পিছে কেমন হেইলা দুইলা আগায়া গেল। আমি তো ভাবছি অরাই গার্জেন সার।”
আশ্চর্য। এত দিন ধরে এই দোকানে শপিং করি আমরা। একটু খেয়াল করবেন না?
এত এত লোক সার, কত খেয়াল রাখুম কন?

ওখান থেকে বেরিয়ে আশেপাশের প্রায় সব দোকানে অস্থির হয়ে খোঁজ করলাম। চার বছরের বাচ্চা। সবুজ হাতাকাটা ফ্রক পরা, ফর্সা রঙ, লালচে চুলে ছোট্ট দুই বেণি, কপালের বাম পাশে আধা ইঞ্চির মতো কাটা দাগ, পায়ে গোলাপি স্নিকার। অনিক প্লাজার সামনে অজস্র ফুডকোর্ট, খেলনার দোকানদাররা কেউ কিছু বলতে পারল না।

কত বাজে এখন?
ধীরে ধীরে বাসের সংখ্যা কমে যাচ্ছে রাস্তায়। দোকানপাট বন্ধ হতে শুরু করেছে। পথে যতগুলো মসজিদ পেয়েছি কিংবা ওয়ার্ড কমিশনারের বাসায়, কোথাও জানাতে বাকি রাখলাম না। কোনো বাচ্চা পেলে যেন সঙ্গে সঙ্গে এনাউন্স করা হয়। মিরপুর বড় ঘিঞ্জি এলাকা হয়ে গিয়েছে আজকাল। অতো ছোট মা’টা আমার এই ভিড়ের মাঝে কোথায় চলে গেল?

বাসায় ফিরতে ইচ্ছে করছেনা আর।
কোন মুখ নিয়ে ফিরব? তবু এক সময় ক্লান্তি এসে ভর করল। চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরালাম। আষাঢ়ের রাত্রি, বাতাস ভেজা ভেজা। হয়তো বৃষ্টি নামবে কিছুক্ষণ পর। লীনার বড়ভাই অনেকক্ষণ ধরেই ফোন করছে। আজব মানুষ। এতবার ফোন করার কী আছে? পর পর অনেকগুলো সিগারেট আর কয়েক কাপ চা ফুরিয়ে গেল, বেঞ্চে বসে আছি কতক্ষণ ধরে? চা’অলা বলল, “মামায় কি সিক?”  

নিজেদের বাসায় পা রাখলাম বহুদিন পর। কেন যে ছেড়েছিলাম এ বাসা, আজ আর হৃদয়ে তার কোনো অভিঘাত নেই। আমায় দেখে আম্মা-আব্বা ছুটে এলেন। ত্রপাও।

কোনো খোঁজ পেলি শিপন?
নাহ। কেউ দেখেনি। ওই এলাকার কোথাও বাদ রাখিনি খুঁজতে। মসজিদে কেউ দিয়ে গেলে মাইকিং করে জানাবে বলেছে। লীনা কোথায়?
আব্বা বললেন, পাগলামো করছিল খুব। ডাক্তার এসে সিডেটিভ দিয়ে গেছে। তুই যা ভিতরে। মেয়েটার তোকে দরকার এখন খুব। ঘুম ভাঙলে আবার কান্নাকাটি শুরু করবে। গোয়েন্দা বিভাগের সলিমুল্লাকে জানিয়েছি আমি। ওর টেরিটোরি তো এদিকেই। কালকের মধ্যে একটা না একটা সংবাদ পেয়ে যাব। টেনশন করিস না।

আমার রুমটার দরজায় আবার দেখলাম নানাভাইকে। সেই একই রকম হাসি হাসি মুখ করে দাঁড়িয়ে আছেন।

এই দুঃসময়েও আপনি হাসছেন নানাভাই?
হাসব না তো কাঁদব নাকিরে গর্ধব?
আপনি একটা অমানুষ।
হয়েছে। আর তুই খুব মানুষ।

নানাভাইকে পাশ কাটিয়েই ভিতরে ঢুকলাম। লীনা চিৎ হয়ে শুয়ে আছে আমার সেই পুরনো বিছানায়, বিয়ের প্রথম রাতটা যেখানে আমরা কাটিয়েছিলাম। শ্বাস-প্রশ্বাস চলছে ধীরে ধীরে, ঘুমাচ্ছে। দু’গালে, চোখের কোনে শুকিয়ে যাওয়া জলের রেখা। নীলাভ ডিম লাইটের আলোতেও বোঝা চলে। পুরনো আমলের ইলেকট্রিক পাখাটা ঘোঁচ কোঁচ ঘোঁচ কোঁচ ধরনের শব্দ করছে। ছোটবেলায় কত খেলতাম এই শব্দের সঙ্গে। যান্ত্রিক ঘর্ষণের এ আওয়াজকে যেমন খুশি তেমন অর্থ করেই শোনা যেত। ট্রেনে চড়ার সময় যেটা করা যায়। ওর পাশে বসে রইলাম কিছুক্ষণ চুপচাপ। এমন মমতায় শেষ কবে ওর কপালে হাত রেখেছি মনে পড়ল না।

ঘুমালে বউ?
নাহ। ঘুম আসে না।
তুমি ঘুমাও পাখি। আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি।
ভাঙা প্রাণহীন কন্ঠে লীনা বলল, “এভাবে না শিপন। আমাকে আদর করো।”

দূর থেকে দুয়েকটা নিশাচর গাড়ির শব্দ আসছে, খুব নিচু লয়ে বাতাসে ভাসছে খোল করতাল হারমোনিয়ামের ধ্বনি। উত্তরে এক ফুরোতে থাকা গ্রাম আছে তা জানি, মিলিটারি আবাসিকের পেছনে। সেখানে কি যাত্রাপালা চলছে রাতজাগা সব দুঃখী আত্মাদের নিয়ে? আশ্রয়ের সন্ধানে আমি লীনার বুকে আমার মুখটা ডুবিয়ে দিলাম। যে সঙ্গমে মরচে ধরেছিল আমাদের, আজ তা ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যাক।   

আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার পেলেন আহমদ রফিক ও মাসরুর আরেফিন



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন

ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন

  • Font increase
  • Font Decrease

আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার পেলেন দুই প্রজন্মের দুই কথাসাহিত্যিক।

আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার-২০১৯ পেয়েছেন ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন। ‘ভাষা আন্দোলন: টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া’ প্রবন্ধের জন্য আহমদ রফিককে এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ‘আগস্ট আবছায়া’ উপন্যাসের জন্য মাসরুর আরেফিনের নামের পাশে যোগ হয়েছে পুরস্কারটি।

করোনা মহামারির কারণে এবার অনলাইনের মাধ্যমে নির্বাচিত দুই প্রজন্মের দুই কথাসাহিত্যিককে সম্মাননা জানানো হয়। গত ১৫ জানুয়ারি এই আয়োজনে প্রধান অতিথি ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার। এছাড়া ছিলেন আইএফআইসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী শাহ এ সারওয়ার।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে সমসাময়িক লেখকদের স্বীকৃতি দিতে আইএফআইসি ব্যাংক ২০১১ সালে চালু করে ‘আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার’। প্রতিবছর পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করা হয় সেরা দুটি বই। নির্বাচিত প্রত্যেক লেখককে পাঁচ লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র পেয়ে থাকেন।

;

ওমিক্রণে থমকে গেছে বইমেলার আয়োজন



সজিব তুষার, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

এবারও থমকে গেছে লেখক পাঠকের প্রাণের আসর অমর একুশে বইমেলা প্রাঙ্গণ। তুমুল উৎসাহ আর ব্যাপক উদ্দীপনা নিয়ে কাজ শুরু হলেও কোভিড- ১৯ এর ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট আতঙ্ক থামিয়ে দিয়েছে কাজ। একটা বড় অংশের কাঠামো তৈরি হয়ে গেলেও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে আছে গর্ত আর স্তূপ স্তূপ বাঁশ।

বরাবরের মত এ বছরেও ১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়ার কথা অমর একুশে বইমেলা-২০২২। সে অনুযায়ী, কাজ শুরু করে দিয়েছিলো আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি। প্রায় শেষ হয়ে এসেছিলো প্রকাশনী গুলোর রেজিস্ট্রেশন ও লটারি পূর্ববর্তী কার্যক্রম। কাজ চলার মাঝেই বাঁধ সাধে বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯ নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

গত ১৬ জানুয়ারি সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ গণমাধ্যমকে জানান, 'করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে আপাতত দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত করা হয়েছে বইমেলা। মেলার পূর্ণ প্রস্তুতি রয়েছে বাংলা একাডেমির। সংক্রমণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকেই শুরু করা যেতো বইমেলা'। 

সরকারের এই ঘোষণার পর থমকে গেছে পুরো উদ্যমে শুরু হওয়া মেলার স্টল তৈরির কাজ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়ে দেখা যায়, স্টল তৈরির জন্য মাঠে কাঠামোর বেশ খানিকটা তৈরি হয়ে আছে। জায়গায় জায়গায় পুঁতে রাখা রয়েছে বাঁশ। কিন্তু কাজ করতে দেখা যায়নি কোনও শ্রমিককে।

এবারের বই মেলায় প্রথম বই প্রকাশ হবে এমন এক তরুণ লেখক বায়েজিদ হোসেন বলেন, 'ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা আমাদের রক্তে গেঁথে গেছে। বৈশ্বিক মহামারী করোনার তোপে পণ্ড হয় গতবারের মেলাও। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো রাস্তায় বসে যাবে। এমন চলতে থাকলে খুব দ্রুতই অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হবেন তারা। এখন পর্যন্ত যেটুকু টিকে আছে সেটা নষ্ট করে ফেললে; শিল্প সংস্কৃতির আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না'।

যথোপযুক্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে বইমেলা সঠিক সময়ে শুরু করার পক্ষে কথা বলেন তিনি।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গ্রন্থিক'র প্রকাশক রাজ্জাক রুবেল বলেন, 'গতবারের মেলার অভিজ্ঞতার পর এবছর আর রিস্ক নেব বলে মনে হচ্ছে না। সম্ভব হলে জমা দেওয়া টাকাটা ফেরত আনার ব্যবস্থা করবো'।

স্টলের রেজিস্ট্রেশন ও অন্যান্য বাবদ খরচের কথা উল্লেখ করে বলেন, 'দুটা স্টলের জন্য জমা দিতে হয়েছে আগের থেকেও বেশি। ডেকোরেশন খরচ। স্টলের লোকের খরচ। তাদের এমন সিদ্ধান্তে আমি কোনভাবেই লস আটকাতে পারবো না'।

এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমিতে গেলে কেউ কিছু বলতে পারেন নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মচারী জানান, "মহাপরিচালক- প্রকাশক ও সংশ্লিষ্টদের সাথে মিটিং করে সিদ্ধান্ত জানানো পর্যন্ত কেউ কিছু বলতে পারবো না"।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে থেকে তোলা বইমেলার প্রস্তুতিকালীন কাজের একাংশের ছবি। ছবি- বার্তা২৪.কম

 

এর আগে বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ও বাংলা একাডেমির পরিচালক জালাল আহমেদ গণমাধ্যমকে জানান, স্বাস্থ্যবিধি মেনে পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকেই নেওয়া হচ্ছে বইমেলা শুরুর প্রস্তুতি। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত বছরও মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে দেড় মাস পিছিয়ে ১৮ মার্চ থেকে শুরু হয় অমর একুশে বইমেলা। আবার নির্ধারিত সময়ের দুদিন আগে ১২ এপ্রিলই টানে ইতি। সম্প্রতি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সরকার। তবে দু'সপ্তাহ পিছিয়ে দিলে আদতে বই মেলা হবে কি না এ নিয়ে সন্দিহান অনেকেই। বইমেলা মানেই হাজার মানুষের ভিড়। লেখক পাঠকের সমারোহ। তবে একের পর এক মেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকলে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গুলো মেলা করবে কি না তা নিয়েও শঙ্কায় আছেন সচেতন মহল।

স্বাস্থ্যবিধি মেনেই মেলা হোক চান বড় একটা অংশের নেটিজানরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে বেশ আলোচনাও তুলছেন তারা।


উল্লেখ্য, মুক্তধারা প্রকাশনীর মালিক চিত্তরঞ্জন সাহা বাংলা একাডেমির গেইটে ১৯৭২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে চট বিছিয়ে শুরু করেন বই বিক্রি। ১৯৭৭ সালে তার সঙ্গে যোগ দেন আরও অনেকে। ১৯৭৮ সালে এ বইমেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয় বাংলা একাডেমিকে। তখন মহাপরিচালক ছিলেন আশরাফ সিদ্দিকী। পরের বছরই বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি যুক্ত হয় মেলার সঙ্গে।

মনজুরে মওলা বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্বে থাকার সময় ১৯৮৩ সালে 'অমর একুশে গ্রন্থমেলা' নামে এ মেলা আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও তা আর করা যায়নি। পরের বছর বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণে আসর বসে 'অমর একুশে বইমেলা'র। ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি জুড়ে কাগজের বইয়ের মুহুর্মুহু গন্ধ মাখা বইমেলাই যেন দর্শনার্থীদের মনে করিয়ে দেয় ভাষা সংগ্রামের কথা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকার জ্যাম ঠেলেও ফেব্রুয়ারিতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাণের গন্তব্য হয়ে দাঁড়ায় ভাষা ও বইপ্রেমী মানুষের কাছে। সবাই চায় বইমেলা ফিরে পাক তার আগের জৌলুশ। বইয়ের সাথে ভবিষ্যত প্রজন্মের এই মিল বন্ধনের পুণ্যভূমি বেঁচে থাকুক সব অশুভ ছায়া থেকে।

;

অন্বেষণ মানে তো খোঁজ, এই খোঁজ হল আত্ম-অন্বেষণ...



সুবর্ণা মোর্শেদা, চিত্রশিল্পী
সুবর্ণা মোর্শেদা

সুবর্ণা মোর্শেদা

  • Font increase
  • Font Decrease

নিজেকে খোঁজার যে তাগিদ, আমার মধ্যে সেটা সবসময়ই কাজ করে। এই তাগিদ থেকেই আমার কাজের শুরু বলা যেতে পারে। সবসময় মনে হয়, নিজেকে খোঁজার চেয়ে কঠিন কিছু নাই। গত দুই বছরে সেই খোঁজার তাগিদ আরো তীব্র হয়ে উঠেছে। এই সময়ে অন্যদের সঙ্গে যখন কথা বলেছি, তার মাঝেও নিজেকেই খোঁজার চেষ্টা চলতো। লকডাউনের বেশ আগে থেকেই নিজেকে অনেক বেশি আইসোলেশনে নিয়ে যাই আমি—একটা নিরঙ্কুশ একাকীত্বের মধ্যে চলে আত্ম-অনুসন্ধানের কাজ। সো, লকডাউন আমার জন্য খুব নতুন কিছু ছিলো না। শুধু বাবা-মায়ের সঙ্গে নতুন করে থাকাটা ছিলো একেবারে নতুন।


২০১৯-এর একটা সময় আমি খুব অন্ধকারে ডুবে যাই। স্বভাবগত দিক থেকে রঙিন মানুষ হয়েও একটা গভীর ব্যক্তিগত কারণে আমার জীবন হয়ে পড়ে সম্পূর্ণ সাদা-কালো। আর এ সময়টাতেই নিভৃতে অনেকগুলো কাজ করে ফেলি। কখনো লিথোগ্রাফ, কখনো পেন্সিল স্কেচ আর কাগজে সেলাই করে করা এ-কাজগুলোই আমাকে সেই গভীর অন্ধকারেও বেঁচে থাকার প্রেরণা যুগিয়েছে। কাগজে সেলাই করে শিল্পকর্ম নির্মাণের একটা আলাদা আনন্দ আছে। সেটা হলো স্পর্শের আনন্দ।


এই স্পর্শকে কেমন করে দেখাবো! সেলাইয়ের উঁচু-নিচু অংশগুলোকে আমি বলি স্পর্শের প্রতীক। এর মধ্য দিয়ে স্পর্শের অনুভূতিকে অন্যের মনে সঞ্চার করা যায়। বড় হওয়ার পর, জীবনে এই প্রথম আমি মায়ের সাথে বাবার সাথে এতো দীর্ঘ সময় আমি কাটানোর অবকাশ পেয়েছি। আমার মায়ের গাছ লাগানোর শখ অনেক আগে থেকেই। সেই শখ লকডাউনে আরো তীব্র হলো।

তাঁর লাগানো গাছগুলো যতো বড় হচ্ছিলো, আর তাঁর বয়স যেন ততোই কমছিলো। গাছে ফল ধরা, ফুল ধরা দেখে তাঁর কী যে এক আনন্দ! সব মিলে যেন এক অপার্থিব অনুভূতি! তো, আমি তাঁকে একজন সফল চাষী হিসেবে ঘোষণা করলাম। দীর্ঘদিন ধরে আমি গন্ধ, স্পর্শ নিয়ে কাজ করি। এবার মায়ের গন্ধের সঙ্গে যোগ হলো মায়ের বাগানের গন্ধ-স্পর্শ।


গাছগুলোর পাতা যখন ঝরে পড়ে, সে-পাতার রং, শেইপকে আমার কাজের সঙ্গে সংযুক্ত করা আর স্পর্শগুলোকে ধরার জন্যই আমার কাগজে সেলাই করার কাজ। আমার ঘুমের সমস্যা আছে। রাতে ঘুম হয় না বা হতো না সেই অন্ধকার সময়গুলোতে। ঘুম না হওয়ার কারণে যে সকালে খারাপ লাগতো তা-ও না। সকালের গন্ধ আমার খুব প্রিয়।


এরমধ্যেই হলো মায়ের করোনা। দীর্ঘ ১ মাস ধরে মায়ের সিরিয়াস কন্ডিশন । আমি বুঝতে পারতাম, গাছগুলোও মাকে খুব মিস করছে। এদিকে মা তো হসপিটালে অক্সিজেন নিতে ব্যস্ত! ২৪ ঘন্টাই মায়ের সঙ্গে থাকি। তাঁর অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমে যাওয়া-- কখনও ভালো, কখনও মন্দ। অবশেষে মায়ের জয়ী হয়ে ঘরে ফেরা। তাঁর সঙ্গে আবার তাঁর গাছেদের সেই নিবিড় সম্পর্ক--গভীর বন্ধুত্ব!

পুরো সময়টাই যেন কবিতার মত, প্রেমের কবিতা! আমার সাদা-কালো ক্যানভাসে ছড়িয়ে দেওয়া রঙের মত! অন্ধকারে অপরূপ আলোর মত। আমার ছবিগুলো যেন জীবনের মত! আমার জীবন যেন আমার ছবির মতো!

সকলকে আমন্ত্রণ!


চিত্রকর্ম প্রদর্শনী: ‘অন্বেষণ’
শিল্পী: সুবর্ণা মোর্শেদা (তৃতীয় একক প্রদর্শনী)
স্থান: ইএমকে সেন্টার
প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন: অধ্যাপক জামাল আহমেদ, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, তাওহিদা শিরোপা।
মাধ্যম: লিথোগ্রাফ, সায়ানোটাইপ, পেন্সিল স্কেচ, জলরংসহ বিভিন্ন মাধ্যম
সংখ্যা: মোট ৪২টি শিল্পকর্ম
চলবে: ১৫-৩০ জানুয়ারি
শো কিউরেটর: রেজাউর রহমান

;

কল্পনা ও ইতিহাসের ট্রাজিক নায়িকা আনারকলি



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

আনারকলির নাম উচ্চারিত হলে উত্তর-পশ্চিম ভারতের আবহে এক করুণ-মায়াবী প্রেমকাহিনী সবার মনে নাড়া দেয়। ইতিহাস ও কল্পকথায় আবর্তিত এই রহস্যময়ী নতর্কীর পাশাপাশি শাহজাদা সেলিম তথা সম্রাট জাহাঙ্গীর, সম্রাট আকবর, সম্রাজ্ঞী যোধা বাঈ চোখের সামনে উপস্থিত হন। ভেসে আসে পরামক্রশালী মুঘল আমলের অভিজাত রাজদরবার ও হেরেম। ব্রিটিশ ঔপনিবেশ-পূর্ব উপমহাদেশের ঐতিহ্য, সমৃদ্ধি, সাংস্কৃতিক দ্যুতি, বহুত্ববাদী পরিচিতির রাজকীয় অতীত এসে শিহরিত করে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলোর নাগরিকদের। 

১৫২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ১৮৫৭ সালে অস্তমিত ৩৩১ বছরের বিশ্ববিশ্রুত মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে বহু সম্রাট, শাহজাদা, শাহজাদীর নাম বীরত্বে ও বেদনায় লিপিবদ্ধ রয়েছে। কিন্তু আনারকলির নাম বিশ্বস্ত ঐতিহাসিক বিবরণের কোথাও লেখা নেই, যদিও মুঘল হেরেমের এই রহস্যময়ী নারীর নাম আজ পর্যন্ত শিল্প-সাহিত্য-চলচ্চিত্র ও লোকশ্রুতিতে প্রবাহিত হচ্ছে। সম্রাজ্ঞী, শাহজাদী কিংবা কোনও পদাধিকারী না হয়েও মুঘল সংস্কৃতির পরতে পরতে মিশে থাকা কে এই নারী, আনারকলি, যিনি শত শত বছর ধরে মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হচ্ছেন, এমন জিজ্ঞাসা অনেকেরই। ইতিহাসে না থাকলেও শিল্প, সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে চিত্রিত হচ্ছেন তিনি অকল্পনীয় জনপ্রিয়তায়। ইতিহাস ও মিথের মিশেলে তাকে নিয়ে আখ্যান ও কল্পকথার কমতি নেই। তার নামে প্রতিষ্ঠিতি হয়েছে মাজার, সমাধি স্মৃতিসৌধ, প্রাচীন বাজার, মহিলাদের পোষাকের নান্দনিক ডিজাইন। ইতিহাসের রহস্যঘেরা এই নারীকে নিয়ে নির্মিত হয়েছে ইতিহাস সৃষ্টিকারী চলচ্চিত্র ‘মুঘল-ই-আজম’। রচিত হয়েছে অসংখ্য গ্রন্থ ও গবেষণা।

যদিও বাংলা ভাষায় আনারকলিকে নিয়ে আদৌ কোনও গ্রন্থ রচিত হয়নি, তথাপি উর্দু সাহিত্যে তাকে নিয়ে রয়েছে একাধিক নাটক ও উপন্যাস। ইংরেজিতে রয়েছে বহু গ্রন্থ। বিশেষত উর্দু ভাষার বলয় বলতে উত্তর ও পশ্চিম ভারতের যে বিশাল এলাকা পূর্বের বিহার থেকে পশ্চিমে পাঞ্জাব পর্যন্ত প্রসারিত, সেখানে আনারকলি একটি অতি পরিচিত ও চর্চিত নাম। সাহিত্যে ও লোকশ্রুতিতে তিনি এখনও জীবন্ত। অবিভক্ত পাঞ্জাবের রাজধানী লাহোরে রয়েছে আনারকলি মাকবারা। মাকবারা হলো কবরগাহ, সমাধিসৌধ। মুঘল স্মৃতিধন্য শহর দিল্লি, লাহোরে আছে আনারকলি বাজার। সাহিত্য ও লোককথার মতোই আনারকলিকে নিয়ে নির্মিত নানা লিখিত ও অলিখিত উপাখ্যান। 

অথচ মুঘল রাজদরবার স্বীকৃত ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থগুলোর কোথাও উল্লেখিত হন নি আনারকলি। প্রায়-প্রত্যেক মুঘল রাজপুরুষ লিখিত আকারে অনেক স্মৃতি ও ঐতিহাসিক বিবরণ লিপিবদ্ধ রাখলেও তার নাম আসে নি কোনও মুঘলের আত্মস্মৃতি বা ইতিহাস গ্রন্থে। তাহলে কেবলমাত্র একটি কাল্পনিক চরিত্র হিসেবে তার নাম অর্ধ-সহস্র বছর ধরে লোকমুখে প্রচারিত হলো কেন এবং কেমন করে? সত্যিই আনারকলি বলে কেউ না থাকতেন কেমন করে সম্ভব হলো পাঁচ শতাধিক বছর ধরে নামটি টিকে থাকা? এসব খুবই বিস্ময়কর বিষয় এবং আশ্চর্যজনক ঐতিহাসিক প্রশ্ন।

ভারতবর্ষে মুঘল ইতিহাসের এক রহস্যময় নারী চরিত্র রূপে আনারকলিকে নিয়ে আগে বহু চর্চা হলেও সবচেয়ে সফল ও ব্যাপকভাবে তিনি চিত্রিত হয়েছেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের কেন্দ্রস্থল বলিউডের ইতিহাস সৃষ্টিকারী সেরা জনপ্রিয় ও ব্যবসা সফল ছবি ‘মুঘল-ই-আজম’-এ। ছবির কাহিনী মুঘল-ই-আজম তথা শাহানশাহ জালালউদ্দিন মোহাম্মদ আকবরের দরবারে আবর্তিত। আকবরপুত্র শাহজাদা সেলিম, যিনি পরবর্তীতে হবেন সম্রাট জাহাঙ্গীর, মুঘল দরবারের এক নবাগত নর্তকী আনারকলির প্রেমে বিভোর। দীর্ঘ ছবিটি সেলিম-আনারকলির প্রণয়ের রোমান্টিকতায় ভরপুর। কিন্তু সম্রাট আকবর সেই ভালোবাসা মেনে নিতে নারাজ। প্রচণ্ড ক্রোধে আকবর আনারকলিকে শাহজাদার জীবন থেকে সরিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হন নি, সম্রাটপুত্রকে ভালোবাসার অপরাধে তুচ্ছ নর্তকী আনারকলিকে জীবন্ত কবরস্থ করেন। 

প্রশ্ন হলো, সত্যিই যদি আনারকলি নামে কোনও চরিত্র না-ই থাকবে, তাহলে এতো কাহিনীর উৎপত্তি হলো কেমন করে? সাহিত্যে ও চলচ্চিত্রে আনারকলিকে কেন্দ্র করে যা বলা হয়েছে বা দেখানো হয়েছে, তার সত্যতা কতটুকু? সত্যিই কি আনারকলিকে জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছিল? নাকি আনারকলি বলে ইতিহাসে কোনও চরিত্রই ছিল না? নাকি সব কিছুই লোকমুখে ছড়িয়ে পড়া কোনও মিথ, উপকথা বা গল্প? এসব প্রশ্নের উত্তর শত শত বছরেও মেলে নি।

আনারকলি যদি ‘কাল্পনিক’ হবেন, তাহলে, মুঘল আমলে ভারতে আগত ইংরেজ পরিব্রাজকের বর্ণনায়, লখনৌর লেখকের উপন্যাসে, লাহোরের নাট্যকারের নাটকে, বলিউডের একাধিক সিনেমায় আনারকলি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হবেন কেন? কেন শত শত বছর কোটি কোটি মানুষ আনারকলির নাম ও করুণ ঘটনায় অশ্রুসিক্ত হচ্ছেন? কেন আনারকলির নামে ভারতের প্রাচীন শহরগুলোতে থাকবে ঐতিহাসিক বাজার? লাহোরে পাওয়া যাবে তার কবরগাহ, যেখানে শেষ বয়সে শাহজাদা সেলিম তথা সম্রাট জাহাঙ্গীর হাজির হয়ে নির্মাণ করবেন সমাধিসৌধ আর রচনা করবেন করুণ প্রেমের কবিতা?

এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের জন্যে ‘কিছুটা ঐতিহাসিক, কিছুটা কাল্পনিক চরিত্র আনারকলি’ ও তাকে ঘিরে প্রবহমান প্রাসঙ্গিক ঘটনাবলীর ঐতিহাসিক পর্যালোচনা ভিত্তিক এই রচনা। আমার রচিত ‘দারাশিকোহ: মুঘল ইতিহাসের ট্র্যাজিক হিরো’ (প্রকাশক: স্টুডেন্ট ওয়েজ) গ্রন্থটি পাঠকপ্রিয়তা লাভ করায় মুঘল মূল-ইতিহাসের বাইরের এই রহস্যময়ী চরিত্র ও আখ্যানকে বাংলাভাষী পাঠকের সামনে উপস্থাপনে উৎসাহী হয়েছি। উর্দু ও ইংরেজিতে আনারকলির ঘটনাবলী ও প্রাসঙ্গিক ইতিহাস নিয়ে বহু লেখালেখি হয়েছে। যেগুলো থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছি। আনারকলির প্রসঙ্গে তাকে নিয়ে নির্মিত অবিস্মরণীয় চলচ্চিত্র ‘মুঘল-ই-আজম’ সম্পর্কেও আলোকপাত করেছি। চেষ্টা করেছি ইতিহাস ও মিথের মধ্যে লুকিয়ে থাকা মুঘল হেরেমের রহস্যময়ী নতর্কী ও বিয়োগান্ত প্রেমের নায়িকা আনারকলিকে অনুসন্ধানের।

;