সাগরে নেই বর্জ্য, স্বচ্ছ জলে ডলফিন শো



মুহিববুল্লাহ মুহিব, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা ২৪.কম, কক্সবাজার
ছবি সংগৃহীত

ছবি সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

পর্যটন নগরী কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত এখন প্রকৃতির দখলে। ঘোলাটে পানি নীল আবরণে ঢাকা পড়েছে। আর সেই স্বচ্ছ জলে ডলফিন খেলছে আপন মনে। কাঁকড়াও শৈল্পিক ঘর বেঁধেছে তার নিপুণ স্পর্শে। এখন যতদূর চোখ যায় নীল আর নীল। এমন স্বচ্ছ জল পেয়ে সৈকতে দল বেঁধে শো করছে ডলফিন।

জনমানবহীন সাগর পাড়ে ডলফিনের এমন উচ্ছলতা দেখেছেন গুটি কয়েক মানুষ। যা স্থানীয়দের মাঝে বড় ধরনের আশা জাগিয়েছে।

তবে এর মধ্যে একটি প্রশ্ন বার বার এসেছে, তা হলো কেন এতদিন কক্সবাজার উপকূলে ডলফিন আসেনি? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে নানান তথ্য। সেটি হলো, আইন অনুযায়ী বাধ্যতামূলক হলেও পর্যটন নগরী কক্সবাজারে গড়ে ওঠা চার শতাধিক হোটেল মোটেল ও রিসোর্টের বেশির ভাগেরই নেই স্যুয়ারেজট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বা এসটিপি। এতে প্রতিদিন হাজার হাজার টন বর্জ্য পড়েছে সাগরে। সৈকতের গা-ঘেষে গড়ে উঠা একাধিক হোটেল-মোটেলই ঝুঁকি বাড়িয়েছে সৈকতের পরিবেশের।

স্বচ্ছ জলে ডলফিন খেলছে আপন মনে

এছাড়াও প্রতিদিন হাজার টন পৌর এলাকার বর্জ্য বাঁকখালী নদীতে ফেলা হয়। আর এ কাজটি করে পৌরসভা। ওই বর্জ্য বাঁকখালীর মোহনা হয়ে মিশে যায় সাগরে। আর এসবকেই কক্সবাজার উপকূলে ডলফিনের বিচরণ না করার বড় কারণ হিসেবে দেখছেন পরিবেশবিদরা।

পরিবেশবাদীদের দাবি, কক্সবাজারে বছরে পর্যটকের সমাগম হয় প্রায় দশ লাখ। যার অন্তত ৬ লাখই ভিড় জমান পর্যটন মৌসুমে। সেসময় এখানকার চার শতাধিক হোটেল-মোটেল ও রিসোর্টে তৈরি হয় শত শত টন তরল বর্জ্য। কোনো পরিশোধন ছাড়াই খাল নালা হয়ে এসব বর্জ্য পড়ে সাগরে। গত ১৮ মার্চ থেকে কক্সবাজারে পর্যটকদের ভ্রমণ নিষিদ্ধ রয়েছে। তাতেই হোটেল-মোটেলের বর্জ্যও যাওয়ায় বন্ধ হয়েছে। সাগর ফিরে পেয়েছে তার স্বাভাবিকতা, ঘোলাটে জল রূপ নিয়েছে স্বচ্ছ নীলে। তাই ডলফিন ফিরেছে এ উপকূলে।

হোটেল-মোটেলের বর্জ্য, ছবি: বার্তা২৪.কম

কক্সবাজার বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি দীপক শর্মা দীপু বার্তা২৪.কমকে বলেন, বর্জ্যগুলো বঙ্গোপসাগরের পানিতে যাচ্ছে এবং পাশে বাঁকখালী নদীতে ফেলা হচ্ছে। যার কারণে বঙ্গোপসাগর এবং বাঁকখালী নদীর পানি দূষিত হচ্ছে। এ কারণে কোনো সামুদ্রিক প্রাণী এখানে বিচরণ করে না। তাছাড়া অতিরিক্ত পর্যটকের কারণে কাঁকড়া বা কচ্ছপ জাতীয় প্রাণীও তেমন দেখা মিলছে না।

তিনি আরও বলেন, নিজস্ব নিয়ন্ত্রণে একটি বর্জ্যব্যবস্থাপনা প্ল্যান্ট তৈরি করা প্রয়োজন। যে সব ছোট ছোট হোটেল রয়েছে সেগুলোতে কেন্দ্রীয়ভাবে সুয়ারেজ প্ল্যান্ট প্রয়োজন। এখন যে ডলফিন আসছে, কারণ হোটেল-মোটেল বন্ধ তাই। কিছুদিন পরে যদি আবার এগুলো চালু হয় তাহলে আর কোনো প্রাণীর দেখা মিলবে না।

কক্সবাজার পিপলস ফোরামের মুখপাত্র এইচ এম নজরুল ইসলাম বার্তা২৪.কমকে বলেন, দীর্ঘদির ধরে আমরা আন্দোলন করেছি।যাতে এসটিপি প্ল্যান্ট করা হয় হোটেলগুলোতে। কিন্তু প্রশাসনের খেয়ালিপনায় তা আর হয়ে উঠেনি।কিন্তু দিন যত যাচ্ছে সমুদ্রের পানি দূষিত হচ্ছে। যার ফলে আবাসস্থল হারিয়েছে অন্তত ২৫ প্রজাতির প্রাণী।

মানুষের চাপ কমে যাওয়ায় সাগরে ডলফিন ফিরেছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা বিশ্বে অনেক দেশে দেখেছি ডলফিন মানুষের সঙ্গে ইশারায় কথা বলছে। তাহলে মানুষের চাপে কেন ডলফিন আসবে না। সাগরের পানি দূষণমুক্ত বা স্বচ্ছ পেয়েছে তাই এসেছে।

ডলফিনের আবাস্থল গড়ে তুলতে পারলে নতুন করে কক্সবাজার পরিচিতি লাভ করবে দাবি বিশেষজ্ঞদের

তিনি আরও বলেন, আমরা জানি সোয়াচ অব নো গ্রান্ড ছাড়া দেশের কোনো সমূদ্র উপকূলে ডলফিন দেখা যায় না। কিন্তু পর্যটক আসা বন্ধ থাকায় কক্সবাজার উপকূলেও সোয়াচের মতো পরিবেশ ফিরে এসেছে। তাই ডলফিনের আবাস্থল হিসেবে গড়ে তুলতে কক্সবাজারে বছরে অন্তত ২০-২৫ দিন পর্যটক আসা বন্ধ রাখার পাশাপাশি সকল হোটেল-মোটেলে এসটিপি তৈরি করার দাবি করেন তিনি।

ডলফিন দল বেঁধে খেলার ভিডিও ধারণ করেন সায়মন বিচ রিসোর্টের কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান রুবেল। তিনি বার্তা২৪.কমকে বলেন, প্রথমে হোটেলের সামনে দাঁড়ানো এক যুবক ডলফিন দেখতে পান। পরে আমি আইকি বোট নিয়ে নেমে পড়ি সমুদ্রে। তখন ডলফিনের দল আমাকে চারদিকে ঘিরে ধরে। তারা খেলা করতে থাকে। এটি সত্যি আমাদের জন্য একটি ভালো দিক। তবে ডলফিনের আবাস্থল গড়ে তুলতে পারলে নতুন করে কক্সবাজার পরিচিতি লাভ করবে।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো.কামাল হোসেন বার্তা২৪.কমকে বলেন, পৌরসভা ও জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে কেন্দ্রীয়ভাবে এসটিপি করার কাজ শুরু হয়েছে। তবে, যারা এই প্ল্যান্ট করেননি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। যারা এ ধরনের কোনো প্ল্যান্ট না রেখে নিজস্ব ডিজাইনের মধ্যে ব্যবসা করছে তাদের আইনের আওতায় আনা উচিত।

উল্লেখ্য, গত ১৮ মার্চ থেকে দেশে চলমান করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে কক্সবাজারে পর্যটক আগমণের উপর নিষেধাজ্ঞা দেয় জেলা প্রশাসন। এরপর থেকে সাড়ে চার শতাধিক হোটেল মোটেল ও সৈকত এলাকা মানুষ শূন্য হয়ে পড়ে।