করোনা আতঙ্ক বাজারে, ক্রেতা না থাকায় বিপাকে চাষিরা

মোহাম্মদ ইউসুফ, মিরসরাই (চট্টগ্রাম) থেকে:
করোনা আতঙ্ক বাজারে, ক্রেতা না থাকায় বিপাকে চাষিরা

করোনা আতঙ্ক বাজারে, ক্রেতা না থাকায় বিপাকে চাষিরা

  • Font increase
  • Font Decrease

করোনাভাইরাস আতঙ্কে সারা দেশের ন্যায় মিরসরাইতেও পালিত হচ্ছে লকডাউন। এতে করে ঘরের বাইরে বের হচ্ছে না কেউ। স্থানীয় বাজারে ক্রেতা সংকট আর মহাসড়কে গাড়ি না থাকাতে বাইরে থেকেও আসছে না কোন ক্রেতা। ফলে উৎপাদিত সবজি নিয়ে বিপাকে আছেন কৃষকরা। মিরসরাইয়ে শীতাকলীন শাকসবজিতে এখনো ভরে আছে কৃষকের ক্ষেত। করোনার প্রভাবে বাজারে উচিৎ মূল্য না মিললেও সরকারি হিসেবে আবাদের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছে। তবে এখনো বৃষ্টি শুরু না হওয়ায় পাহাড়ের শত শত হেক্টর জমিতে আবাদ শুরু হয়নি।

দূর্গাপুর ইউনিয়নের পূর্বদূর্গাপুর গ্রামের কৃষক মোঃ কালাম উদ্দিন ১০ শতক জমিতে হাইব্রিড মরিচ রোপণ করেছেন। গেলো সপ্তাহেও প্রতি কেজি মরিচ পাইকারি ৪০ টাকা বিক্রি করেছেন। রোববার (২৯ মার্চ) মিঠাছরা বাজারে প্রতি কেজি বিক্রি করেছেন ২০ টাকা করে। বাজারে কোন পাইকার না আসাতে দাম অর্ধেক হয়ে গেছে।

কৃষক মো. হানিফ মৌসুমে বেশি সময় পাওয়ার দরুন ৪৪ শতাংশ জমিতে এবার দুই দফা শীতকালীন শাকসবজির আবাদ করেছেন। দ্বিতীয় দফা আবাদে বেশ ভালো লাভ হওয়ার কথা থাকলেও হঠাৎ বাজারে করোনাভাইরাসের প্রভাবে ক্রেতা কমে যাওয়ায় শাকসবজির ঠিক দাম পাচ্ছেন না। তবে ক্ষেতে খরচের তুলনায় তার লাভ কম হলেও এ প্রতিবেদককে জানান তার লোকসান হবে না।

কৃষক আলা উদ্দিন বলেন, করোনা ভাইরাসের কারণে কেউ ঘর থেকে বের হচ্ছে না। টমেটো বিক্রি করার জন্য স্থানীয় মিঠাছরা বাজারে নিয়ে গেলে প্রতি কেজি ৮-১০টাকায় বিক্রি করতেও কষ্ট হচ্ছে। অথচ ১ সপ্তাহ আগেও প্রতি কেজি টমেটো ২০ টাকা করে বিক্রি করেছি। এভাবে চললে চাষের খরচও উঠবেনা। 

মিরসরাইয়ের একটি গ্রামে পাট শাকের ক্ষেত

অপরদিকে মিরসরাই সদর ইউনিয়নের গড়িয়াইশ গ্রামের কৃষক নিজাম উদ্দিন জানালেন অন্য কথা। প্রতিবছর মার্চ মাসের দিকে ভরা বৃষ্টি শুরু হলে তিনি পাহাড়ের ঢালু জমিতে জিঙ্গা, শশা ও বরবটির আবাদ করতেন। এবার বৃষ্টির দেখা নেই, আবাদও শুরু করতে পারেন নি। এতে তার দুঃশ্চিন্তার শেষ নেই। তিনি বলেন, ‘পাহাড়ে চাষাবাদ ছাড়া আমাদের আর কোন রুটি-রোজগারের পথ নেই। এবার কি করবো ভেবে পাচ্ছি না।’

মিরসরাই উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসের হিসেব মতে, এবার শীত মৌসুমে মিরসরাইতে সরকারি লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছে। উপজেলায় দেড়শ হেক্টর জমিতে সিসিঙ্গা, ঝিঙ্গা, ঢেড়শ চাষাবাদ করা হয়েছে। মোট শীতকালীন সবজী চাষ করা হয়েছিলো ১৮৫০ হেক্টর জমিতে। শীতকালীন সবজী এখনো বাজারে আছে। এদিকে শীতকালীন সবজী বিক্রি শেষ হওয়ার আগে লাগানো হচ্ছে গ্রীষ্মকালীন সবজী। উপজেলায় ৮’শ হেক্টর জমিতে গ্রীষ্মকালীন সবজি চাষ করা হবে। মার্চ মাসের ১৬ তারিখ থেকে সবজী বীজ রোপন করা হচ্ছে। আগামী দেড় থেকে ২ মাসের মধ্যে সবজি বিক্রির উপযোগী হবে। যেখানে কেয়ার, শসা, করলা, চিচিঙা, ঝিঙা, বরবটি, পুই শাক উল্লেখযোগ্য।

এছাড়া উপজেলাতে রবিশষ্যের মধ্যে মুগডাল ২ হাজার ৬শ হেক্টর, হেলন ডাল ২ হাজার ৪শ হেক্টর, খেসারি ডাল ৮শ হেক্টর, সরিষা ৪০ হেক্টর, ভুট্টা ৩৫ হেক্টর জমিতে চাষ করা হয়েছে। শীতকালীন সবজি ও রবিশষ্যের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হলেও শুধুমাত্র বোরো আবাদে পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। বোরো ধানের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৪৬০ হেক্টর। চাষাবাদ হয়েছে ১১৬০ হেক্টর জমিতে। এদিকে চলতি বছর মিরসরাইতে সরিষার বাম্পার ফলন হয়েছে। গত বছর উপজেলাতে ৩৫ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ করা হলেও এ বছর করা হয়েছে ৪০ হেক্টর জমিতে। যেখানে ৪৫ টন সরিষা উৎপাদন হয়েছে। সরিষা চাষে উদ্বুদ্ধ করার জন্য উপজেলায় ১৫০ জন কৃষককে দেড় কেজি করে সরিষার বীজ দেওয়া হয় কৃষি অফিস থেকে। কৃষকরা স্থানীয় বাজারে  প্রতি কেজি সরিষা ৮০ টাকা বিক্রি করছেন বলে জানা গেছে।    

মিরসরাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রঘুনাথ নাহা জানান, ‘এবার মৌসুমে সরকারি লক্ষ্যমাত্রা ঠিকঠাকভাবে অর্জিত হয়েছে। কৃষকেরা ভালো লাভবান হয়েছেন। তবে পানি সংকটের কারণে বোরো আবাদ সামান্য কম হয়েছে।’

অনাবৃষ্টির কারণে পাহাড়ে আবাদ শুরু না হওয়া প্রসঙ্গে স্থানীয় এ কৃষি কর্মকর্তা জানান, আশা করছি এপ্রিল মাসের দিকে পুরোদমে বৃষ্টি শুরু হবে। কৃষকেরা ওই সময়ে আবাদ শুরু করতে পারলে ফলনও ভালো হবে।

আপনার মতামত লিখুন :