করোনাকালে দেখা নেই নেতাদের

মাহমুদ আল হাসান, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, নীলফামারী
(ফাইল ফটো) বার্তা২৪.কম

(ফাইল ফটো) বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

‘আইজ সারাদিন আইসক্রিম বিক্রি করনু (করলাম) ১৫০ টাকার। করোনাভাইরাসের জন্যে সাত দিন থাকি বউ-বাচ্চা নিয়া খেয়া না খেয়া আছুং (আছি), কাহো খোঁজ নেয় না। ভোটের আগে আগে কতো নেতা-নেত্রী বাড়ি আসিয়া হাত ধরি দোয়া চেয়া গেলো, হামার (আমাদের) সেবা করিবে, এলা কারো দেখা নাই’— আক্ষেপ নিয়েই এমন করেই বলছিলেন আইসক্রিম বিক্রেতা মোহাম্মদ আলমগীর।

পাশেই বসে রাস্তার ধারের নালায় বড়শি দিয়ে মাছ ধরছেন নীলফামারী সদর উপজেলার মেম্বার পাড়া'র সোলায়মান। পেশায় রিকশা চালক। ঢাকার রামপুরা এলাকায় রিকশা চালাতেন তিনি। কিন্তু করোনার ভয়ে গ্রামে এসে কোনো কূল-কিনারা খুঁজে পাচ্ছেন না।

রিকশা চালক সেলায়মান বলেন, ঢাকা থাকি আসি যে ঠেলায় (বিপদ) পরচি তা কওয়ার (বলার) মোতোন নয়। এলাকায় কাজ-কাম নাই, কাহো এক কেজি চাউলও না দেয়। কাকো কবারও পাইছি না। ভোটের সময় বাড়িত ছিনো, কতোজন আইসে এলা (এখন) আর কাহো আইসে না।

মোহাম্মদ আলমগীর ও সেলায়মানের মতো দিন এনে দিন খাওয়া নিম্ন আয়ের মানুষেরা জানে না এর শেষ কোথায়?

এদিকে জেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও পুলিশের পক্ষ থেকে বার বার সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার তাগিদ দিলেও তা মানছেন না গ্রামাঞ্চলের মানুষজন। অনেকে সরকারি সহযোগিতার জন্য রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের দ্বারে দ্বারে সাহায্যের জন্য ঘুরছেন।

ডোমার উপজেলার সোনারায় ইউনিয়নের শাহ কলন্দর মাজার এলাকার মোমেনা খাতুন বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে বাড়িতে থাকতে বলতেছে সবাই। কিন্তু কাজ না করলে ভাত পাবো কোথায়? কাজ ছাড়া ভাত জোটে না।

গত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থীর হিড়িক দেখেছে নীলফামারীবাসী। দলে বলে সব মিলে অর্ধশতাধিক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে এসব নির্বাচনে। ভোট শেষ হবার পর থেকে কয়েকজন মাঠে থাকলেও দেখা মেলেনি বাকিদের। মহামারি করোনা দুর্যোগে লাপাত্তা জনপ্রতিনিধি হওয়ার স্বপ্নে বিভোর হওয়া ওইসব প্রার্থী। ফলে জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।

সচেতন মহল বলছে, দেশের সংকটকালে দল-মত নির্বিশেষে সরকারের পাশাপাশি সামর্থ্যবান সকলের এগিয়ে আাসা উচিত। বিশেষ করে নির্বাচনের সময়ে যারা জনসেবার প্রতিশ্রুতি দেন তাদের কাছে সাধারণ মানুষের এখন প্রত্যাশা বেশি। সরকারিভাবে জেলায় বরাদ্দ থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

সৈয়দপুর উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শেখ আবদুল্লাহ সোহাগ বলেন, ভোট আসলে সৈয়দপুরে অনেক নেতা আমদানি হয়। এলাকার অনেক মানুষ এখন কর্মহীন। এখন নেতারা তাদের পাশে নাই। ভোট আসলে আবার তাদের দেখা যাবে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নীলফামারী-৪ (সৈয়দপুর-কিশোরগঞ্জ) আসনে আ'লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন আ'লীগে কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার ও প্রকাশনা উপ-কমিটির সদস্য আমেনা কহিনুর আলম। ভোটের আগে দুই উপজেলায় ঘরে ঘরে গিয়ে গণসংযোগ করেন তিনি।

করোনা সংকটে এলাকার মানুষদের জন্য তার উদ্যোগ জানতে চাইলে তিনি মোবাইল ফোনে জানান, আসলে আমি ঢাকায় আছি, ব্যক্তি উদ্যোগে সামান্য কিছু সাহায্য সহোযোগিতা করেছি। প্রধানমন্ত্রীর দেয়া ত্রাণ যাতে এলাকার গরীব-দুঃখী মানুষ পায় সেজন্য স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে আ'লীগ নেতাদের সমন্বয় করে দিয়েছি।

করোনা প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও অসহায় মানুষদের সহায়তার উদ্যোগ জানতে চাইলে নীলফামারী-১ (ডোমার-ডিমলা) আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী অ্যাডভোকেট মনেয়ার হোসেন মোবাইলফোনে জানান, সরকার নির্দেশ দিয়েছে বাসায় থাকতে। এলাকার লোকজনের সঙ্গে কথা হচ্ছে। তাছাড়াও সরকার যথেষ্ট খাদ্য সহায়তা দিচ্ছে। এতে কোনো সমস্যা হবে না।

এদিকে করোনা দুর্যোগে সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে নীলফামারীতে খাবারসহ বিভিন্ন উপকরণ বিতরণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ছাত্রলীগ জেলা, উপজেলা, পৌর ও ইউনিয়ন পর্যায়ে জীবানুনাশক ঔষধ স্প্রে, মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, সাবান বিতরণ করেছে। এরই মধ্যে নীলফামারী-৩ (জলঢাকা) আসনের জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য রানা মোহম্মদ সোহেল খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করলেও নিরাপদ সামাজিক দূরত্ব না মেনে বিতরণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এছাড়াও নীলসাগর গ্রুপ, কেয়া বেকারি এন্ড কনশট্রাকশন, ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ফাউন্ডেশন, সুভা সৈয়দপুর, করোনা ব্রিগেড নীলফামারী, শাখামাছা হাট ফেসবুক গ্রুপসহ অনেকে ব্যক্তি উদ্যোগে ও সংগঠনের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষের সেবায় কাজ করছেন।

আপনার মতামত লিখুন :