কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১৭)



জিনি লকারবি ।। অনুবাদ: আলম খোরশেদ
অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

  • Font increase
  • Font Decrease

অই তো যায়, টু আ পেনি

(পূর্ব প্রকাশের পর) আমি যেসব বাড়তি জিনিস কেনাকাটা করেছিলাম সেগুলো বাঁধাছাঁদা করার জন্য বাক্স, দড়ি ইত্যাদি খুঁজে পেতে কী ঝক্কিটাই না পোহাতে হয়েছিল সেই বিকালে আমাদের। আমরা জানতাম না খাবারদাবারের কী অবস্থা হবে, তাই আমরা টিনের মার্জারিন, মাংস ও অন্যান্য জিনিসপত্র কিনে বোঝাই করে ফেলেছিলাম। পিআইএ এবং অতিথিনিবাসের আন্তরিক কর্মচারীদের সহযোগিতায় আমাদেরকে এবং আমাদের অতিরিক্ত ওজনের বাক্সপ্যাটরাদের তারা বিমানবন্দরের পথে রওনা করিয়ে দেয় সময়মতোই, হয়তো একটু আগেভাগেই। বাচ্চারা যথেষ্ট সময় পেয়েছিল ব্যাংকক বিমানবন্দরের বিশাল অপেক্ষাগৃহে হারিয়ে যাওয়ার। একটা বেড়ার ওপর থেকে তিন বছরের এক বাচ্চাকে উদ্ধার করে আনতে গিয়ে আমি শুনতে পাই একজন আমেরিকান ভদ্রলোক তাকে জিজ্ঞেস করছেন সে কোথায় যাচ্ছে। এতগুলো সপ্তাহের ভ্রমণে ছোট্ট এমি একটু বিভ্রান্ত হয়ে গিয়েছিল।
সে হাসিমুখে উত্তর দিল: “আমি ব্যাংকক যাচ্ছি।”

“না, তুমি ব্যাংককেই আছো। তুমি এখান থেকে কোথায় যাচ্ছো?”

তারপর তিনি পরবর্তী ক্ষুদে স্বর্ণকেশীর দিকে ফিরে একই প্রশ্ন করলেন, যার এর উত্তর জানা ছিল।

“আমরা ঢাকা যাচ্ছি, তারপর সেখান থেকে চিটাগাং।” সে তাকে বলে।

“আপনি কি এদের সঙ্গে সম্পর্কিত?” আমি কাছে গেলে তিনি আমাকে শুধান।

“আমরা সবাই এক সঙ্গেই ভ্রমণ করছি।” আমি ব্যাখ্যা করে বলি।

“ওহ।” তিনি বলেন। “আপনার সঙ্গে পরিচয় হয়ে ভালো লাগল, আমি পাকিস্তানে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত।”

যে-ক্ষমতাই আমাকে এই কথাটি, “হ্যাঁ এবং আমি মিসেস সান্তা ক্লস” (অথবা এরকম মজাদার কিছু একটা) বলা থেকে বিরত রাখে, তাকে আমি ধন্যবাদ দিই, কেননা এই সাদামাটা, মধ্যবিত্ত চেহারার মানুষটি আমার কল্পনার রাষ্ট্রদূতের ধারে কাছেও ছিলেন না। তারপর তিনি দ্রুত কাজে নেমে গেলেন একজন ভালো রাজনীতিবিদের মতো—সবার সঙ্গে হাত মেলান, বাচ্চাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন, দ্বিগুণ সংখ্যক নারীদের সঙ্গে ভ্রমণের সৌভাগ্যের জন্য পুরুষদের সঙ্গে ঠাট্টা করেন। তিনি অবশ্য একটা উদ্বেগজনক মন্তব্য করেই আমাদের কাছ থেকে বিদায় নেন।

“আমি অবাক হচ্ছি যে আপনারা ফেরত যাচ্ছেন। সবাই তো দেখি বেরিয়ে আসার জন্যই অস্থির।”

এবং আমরা সেই দেশে যাওয়ার বিমানেই উঠি যেখান থেকে সবাই বেরিয়ে আসতে চাইছে। আমাদের সব মালপত্রই বৈধ এবং আমাদের ঢাকায় নামার অনুমতি আছে, এটা শুল্ক কর্মকর্তাদের বোঝাতে বোঝাতে মধ্যরাত হয়ে যায়। বিমানবন্দরের কর্মীদের ধারণা ছিল, কারুরই বুঝি তখন ঢাকা বিমানবন্দরে নামার অনুমতি নেই।

আমরা চমৎকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে উঠি। কিন্তু এতটাই ক্লান্ত যে, তার গরমজলের সৌরভটুকু উপভোগ করতে পারি না। পরেরদিন একটু জরিপ করতে গিয়ে বুঝতে পারি, হোটেলটাকে একটা কবরস্থানের মতো দেখাচ্ছে, যা কিনা সম্প্রতি নানাবিধ কর্মকাণ্ডের একটি জমজমাট কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। দিনের শেষে ঢাকার অপর মিশনারিরা আমাদেরকে নিয়ে যেতে এলে আমরা চাপমুক্ত বোধ করি, এবং চারটা ভিন্ন ভিন্ন বাড়িতে বসে চাটগাঁ যাবার টিকিট ও অনুমতির অপেক্ষা করতে থাকি।

ডা: ওল্‌সেন একটা চিঠি লিখেছিলেন এবং আমাদের সম্ভাব্য ঢাকা আগমনের আগেই সেটা সেখানে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। সেই ‘প্রিয় বাহিনী’ সম্বোধন করা চিঠিটি অনেক শূন্যস্থান পূরণ ও আমাদের মনে খেলা করে যাওয়া অনেক প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিল।

১০ই মে ১৯৭১

প্রিয় বাহিনী,

রিড, ডন ও ভিকের তরফ থেকে শুভেচ্ছা। আমরা ভালো আছি, তোমাদের সবার অভাব বোধ করি খুব, তোমাদের কথা ভাবি ও প্রার্থনা করি সবসময়। তোমাদেরকে ছাড়া এখানে ঠিক মন বসছে না আমাদের। আমি চিঠি লিখছি চিটাগাং থেকে। এই প্রথমবার আমি এখানে এতদিন ধরে আছি। রিড তার অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে দিয়েছে এবং গুর্‌গানসের বাড়িতে চলে গেছে, যেটা সে অর্ধেক টাকায় ভাড়া নিতে পেরেছে। এটা গুর্‌গানসের নিজের ও তাঁর পরিচিত বিভিন্ন ব্যক্তির রেখে যাওয়া জিনিসপত্রে ঠাসা। আমি রিডের সঙ্গে এই কয়েক ঘণ্টার বন্ধুতা কী উপভোগই না করেছি। সে শহরের চতুর্দিকে ঘুরে ঘুরে সবাইকে উৎসাহ ও উপদেশ দিয়ে এবং একসাথে প্রার্থনা করে কী দারুণ কাজই না করছে। সে বাস্তব উপায়েও নানাভাবে নানান লোককে সাহায্য করে উঠতে পেরেছে।

২১শে এপ্রিল তোমাদের আচমকা বিদায়ের পরপরই আমি আমাদের দেশি সদস্যদের ডাকি। সভার শুরুতে ম্যাথুর ২৮ নম্বর শ্লোকের শেষদিকের সেই অসাধারণ অংশগুলোর উচ্চারণ আমাদের জন্য অনেক অর্থবহ ছিল। আমরা অবস্থার পর্যালোচনা করি এবং কয়েকটি সাময়িক সিদ্ধান্ত নিয়ে রাখি। সভার সবচেয়ে উৎকণ্ঠাময় মুহূর্তে একটি আকস্মিক কানফাটানো বিস্ফোরণের শব্দ সবাইকে জানালা, দরজা কিংবা খাটের তলার দিকে ধাবিত করে, যদিও সেটা স্রেফ একটা বজ্রপাতের শব্দ ছিল। আমি রোগী দেখে, কর্মচারীদের বুদ্ধি-পরামর্শ এবং রাতের পাহারার সময় বাড়িয়ে দিয়ে দিনটা কাটাই। দিনের অপরভাগে আরো কিছু ঘটনার কারণে রাত সাড়ে নয়টার দিকে একটা সভা ডাকা বুদ্ধিমানের কাজ হয়েছিল বটে। একটা ভয় ছিল যে, হাসপাতালের ধারে কাছেই বেশ বড়সড় যুদ্ধ হতে পারে। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, হাসপাতালের কর্মচারীদের হেব্রন ও অন্যান্য গ্রামে সরিয়ে নেওয়া হবে।

এপ্রিলের ২২ তারিখ আমরা আগের রাতের সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নে ভীষণ ব্যস্ত ছিলাম। আমার দুর্ঘটনাটি ঘটে সকাল বেলায়। আমি বেশ জোরেই আমার মোটরসাইকেলটা চালাচ্ছিলাম, গাড়ির মূল কাঠামোটায় হঠাৎ একটা ফাটল দেখা দেয় এবং তা মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে দু’টুকরো হয়ে যায়। এর পতনের সঙ্গে সঙ্গে আমিও রাস্তায় ছিটকে পড়ি এবং আমার ডান হাতের কনুই ভেঙে যায়। আমি কোনোমতে হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছাই, এক্সরে করাই এবং সেটা নিরীক্ষণ করে দেখি যে, হাড়টা বেশ জটিলভাবেই ভেঙেছে, যেটা সারাতে অপারেশন ও কিছু যন্ত্রপাতি লাগানোর প্রয়োজন হবে। ডনের ও আমার দিনের বেলায় অনেক কাজ ছিল, তাই আমরা অপারেশনের সময় নির্ধারণ করি রাত ৮টা। ডন অপারেশনে দারুণ কাজ করেছিল। (আমি আনন্দিত যে, তোমরা তার থাকার পক্ষে ভোট দিয়েছিলে।) পরের দিনও ছিল খুব ব্যস্ততায় ভরা। আমি ডেমেরলের প্রভাবে ঘুমিয়ে থাকি, তবে মধ্যসকালে আমার মাথা পরিষ্কার হয়ে ওঠে এবং আমি একটু নাড়াচাড়া করতে পারি, পরে তাদের কাজে খানিকটা সাহায্যও করতে পারি। কর্মচারী ও শরণার্থীদের হাসপাতাল প্রাঙ্গণ থেকে সরানোর কাজে ডন প্রায় একজন সেনা অধিনায়কের ভূমিকা পালন করে।

পরের সপ্তাহগুলোতে আমরা কম রোগী দেখেছিলাম, কম অ্যাডভেঞ্চার করেছিলাম এবং তোমাদের মিস করেছিলাম খুব। সব রোগী ছেড়ে দেওয়ার জন্য হাসপাতালটাকে তখন সমাধির মতো মনে হচ্ছিল। আমেরিকান ও পাকিস্তানি কর্মীদের বিদায়ের পর আমরা সশস্ত্র ডাকাতির ভয় পাচ্ছিলাম। আমরা রাতপ্রহরীদের সংখ্যা বাড়িয়ে দিই এবং তাদেরকে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করে তুলি। ঈশ্বরের কৃপায় যে-রাত থেকে অই আক্রমণের আশঙ্কা করছিলাম আমরা, ঠিক সে-রাতেই সারারাত বিদ্যুৎ ছিল এবং সেটা পরেও অব্যাহত থাকে।

সম্প্রতি আমরা একটা চোরও ধরি। কর্মচারীরা বিদায় নিয়ে চলে গেলে আমাদের পশ্চিম পাকিস্তানী কর্মীদের নিরাপত্তার জন্য তাদেরকে অন্যত্র সরিয়ে দেওয়া দরকার হয়ে পড়ে। সে-রাতে আমরা তাদেরকে আমাদের সঙ্গে কেচামের বাড়িতে নিয়ে আসি এবং মিলিটারিদের হাতে তাদেরকে নিরাপদে হস্তান্তর করা পর্যন্ত তারা আমাদের সঙ্গে সেখানেই ছিল। তাদের সেই কৃতজ্ঞতাবোধটুকু দেখার মতো ছিল। আমি যদিও অবিবাহিত জীবনের পক্ষে সাফাই গাইছি না, তবে আমি এই সময়টা ডনের সঙ্গ খুব উপভোগ করেছিলাম। সে একজন নিবন্ধক, ডাক্তার, সেবক, কোষাধ্যক্ষ, হিসাবরক্ষক, অষুধবিদ হিসাবে দারুণ কাজ করেছিল। সে আধ্যাত্মিক সাহায্য, উপদেশ ও শুশ্রূষা প্রদানের কোনো সুযোগ কখনো হাতছাড়া করেনি।

ডন একদিন দুটো ছাড়া-কুকুরকে গুলি করে এক রকম কেলেঙ্কারির জন্ম দেয়। গুলির শব্দে পার্শ্ববর্তী গ্রামের লোকজন সব পালিয়ে যায়। তারা ভেবেছিল যুদ্ধ তাদের গ্রামে এসে হাজির হয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধাদের পাঁচজনের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ ছিল। মে মাসের ৫ তারিখ পাকিস্তানি মিলিটারি হাসপাতালে এসে উপস্থিত হয়। পথে তারা কোনো বাধার সম্মুখেই পড়েনি। তারা এসে গাড়ি থামায় এবং একজন মেজর ও কর্নেল আমাদের সঙ্গে ত্রিশ মিনিটের মতো কথা বলে। সেই সভার সিদ্ধান্তসমূহ ছিল নিম্নরূপ:

• তারা হাসপাতাল দেখে খুশি এবং তারা চায় এটা খোলা এবং চালু থাকুক।

• তারা নিশ্চয়তা দেয় যে, ধর্ম নির্বিশেষে সকল কর্মচারীরই নিরাপত্তার বিধান করবে তারা।

• তারা আমাদের পরামর্শ দেয়, দেশি কর্মীদের ডেকে এনে কাজে লাগিয়ে দিতে।

মে মাসের ৫ তারিখের সেই সভার পরপরই হেব্রন থেকে এক দূত এসে চিঠি দেয় আমাদের, যাতে লেখা ছিল, সেই রাতেই সেখানে সশস্ত্র ডাকাতির শঙ্কা করা হচ্ছে। প্রভুর সাহায্যে সেখানে পুলিশি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়েছিল সে-রাতে এবং পরেরদিন সতেরোটি নৌকা দিয়ে তাদেরকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। একইভাবে আমরা জানতে পারি, আমাদের অপর কর্মচারীরা যারা জঙ্গলের অন্যত্র লুকিয়ে ছিল তারাও ডাকাতির ভয়ে ছিল। আমরা সঙ্গে সঙ্গে তাদেরকেও চলে আসার জন্য বার্তা পাঠিয়ে দিই। প্রভুর সময়বোধ কী চমৎকার! আমাদের লোকদের জন্য অসহনীয় ঝুঁকি ও বিপদের সম্ভাবনা দেখা দেওয়ামাত্রই মিলিটারির এসে হাজির হওয়া, দারুণ সব আশ্বাস এবং তাদেরকে ফিরিয়ে আনার অনুমতি দেওয়া আমাদের! হেব্রন থেকে আনা সতেরোটি নৌকায় লোক ছিল মোট ১২০ জন, সঙ্গে বেশ কিছু ছাগল, অগুনতি মুরগি আর পর্বতপ্রমাণ বোঁচকাপত্র। মে মাসের ৬ তারিখে ফিরে আসা এই শরণার্থীদের দলটি ছিল একটি অবসন্ন, কিন্তু উল্লসিত বাহিনী।

আমরা তোমাদের ফিরে আসার একটা পরিকল্পনা করেছি। এটা করা খুব সহজ ছিল না, যেহেতু আমরা তোমাদের ভিসার অবস্থা জানি না, এমনকি তোমরা কে কোথায় আছো সেটাও না। মে মাসের ৮ তারিখ আমি কনসাল জেনারেলের সঙ্গে ফোনে কথা বলি। আমি তোমাদের ফিরে আসার যে-সময়সীমা তাঁর কাছে উত্থাপন করি তিনি তা অনুমোদন করেন। তাঁর মন্তব্য অনুযায়ী, তাঁর প্রতিনিধিরা তোমাদের ব্যবহারে খুব মুগ্ধ ছিল। আমি তোমাদের প্রত্যেকের হয়ে একটু করে লজ্জা পাই, তাঁকে তাঁর সদয় বার্তার জন্য ধন্যবাদ দিই এবং বলি, আসলে গাড়িভরা এক চমৎকার মার্কিন প্রতিনিধিদলকে তিনি পাঠিয়েছিলেন আমাদের এখানে। এই পারস্পরিক তোষামোদ পর্বটি যখন বেশ ছেলেমানুষির পর্যায়ে চলে যাচ্ছিল, তখন আমরা কাজে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবি। তিনি তোমাদেরকে একটা বার্তা পাঠানোর কথা বলেন এবং আমি নিশ্চিত, তোমরা ইতোমধ্যে তোমাদের প্রত্যাবর্তনের একটা সময়সূচি পেয়ে গেছো।

আরও শ’খানেক প্রসঙ্গের বর্নণা দিতে পারতাম আমি, কিন্তু এই চিঠিকে তো এক জায়গায় থামতে হবে। আমরা তিনজন ঈশ্বরের কৃপা ও করুণার সাক্ষ্য দিই। প্রভু কিভাবে আমাদেরকে কঠিন পরিস্থিতিতে শক্তি যুগিয়েছিলেন এবং কঠিন সিদ্ধান্ত নেবার প্রজ্ঞাও। আজকে একটি সুদূরপ্রসারী অভিঘাতসম্পন্ন জটিল সমস্যা তাৎক্ষণিক সমাধান দাবি করেছিল। আমাদের হাসপাতালের জনসংযোগ কর্মকর্তা ও আমি একটি গাড়িতে উঠি, ইঞ্জিন যখন চালু হবার জন্য সময় নিচ্ছিল তখন আমরা একসঙ্গে প্রার্থনা করি, তারপর আমরা রওনা হই। এবং ঈশ্বর আমাদের কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশার বাইরেও আমাদের হয়ে কাজ করেছিলেন। আমাদের সেই অফিসার বলেন, “ঈশ্বর আমাদের জন্য কী চমৎকার কাজই না করেছেন। আমরা তাঁর দারুণ সহায়তার জন্য, আবার যেন প্রার্থনা করতে এবং তাঁকে ধন্যবাদ জানাতে ভুলে না যাই।” আমরা তোমাদের সেই ভোটের জন্য কৃতজ্ঞ, যা আমাদেরকে ঈশ্বরের আহ্বানে সাড়া দিয়ে এমন এক অভূতপূর্ব সময়ে এখানে থাকার সুযোগ করে দিয়েছিল।

ঈশ্বর তোমাদের প্রত্যেকের মঙ্গল করুন।

যিশুর ভালোবাসায়,

ভিক

জুনের ৩ তারিখের সকালের মধ্যে সবকিছু গোছানো হয়ে যায় এবং আমরা দিনের শেষ বিমানে উঠি, চট্টগ্রামগামী সেই চল্লিশ মিনিটের উড়ানে। আমরা ফোন করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু লাইন কাটা ছিল। আমরা একটা বার্তা পাঠিয়েছিলাম, কিন্তু সেই টেলিগ্রাম কখনো পৌঁছায়নি। পরিণতিতে, বিমানবন্দরে কেউ আসেনি আমাদের নিতে। ভাগ্যক্রমে পিআইএ তাদের বাস ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিল আমাদের, এবং তার ড্রাইভার আমাদেরকে মিশন গেস্টহাউস পর্যন্ত নিয়ে যায়। বাইরের দরজায় শেকল ও তালা লাগানো ছিল, ফলে সে আমাদেরকে একেবারে অফিস পর্যন্ত নিয়ে যায়। দারোয়ান জানায় যে, যার কাছে সবকিছুর চাবি থাকে সেই রিড মিনিখ সকালে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেছেন—বাজে এক রাস্তার পঁয়ষট্টি মাইল দূরত্বে অবস্থিত যা। বাস ড্রাইভার ত্রাণকারীর ভূমিকা পালন করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল, তাই ঘোষণা দিল, সে আমাদেরকে শহরে পিআইএর অফিসে নিয়ে যাবে এবং সেখানেই আমাদেরকে নেমে যেতে হবে। সেটা ঠিক ছিল। সেই অফিস আমাদের বাসা থেকে দুয়েক মিনিটের পথ মাত্র। একটা তিনচাকার বেবিট্যাক্সিতে চেপে আমরা আমাদের বাসায় যাই। বাঙালিদের মাঝখানে ফিরতে পেরে আমি এতটা উত্তেজিত ছিলাম যে, বারান্দায় এক বৃদ্ধাকে দেখে আমি তাকে আলিঙ্গন করি। পরে আমি ভাবতে থাকি, সে কে ছিল এবং কী করছিল সেখানে।

ততক্ষণে দুপুর হয়ে গেছে এবং আমরা সবাই ক্ষুধার্ত। রিডের কাছে আমাদের বাড়ির চাবিখানাও ছিল, কিন্তু আমার পার্সের ভেতরে একটা বাড়তি চাবি লুকানো ছিল রান্নাঘরের, যেখানে আমরা টিনভর্তি খাবারদাবারগুলো রাখি। কোনার দোকানে রুটি পাওয়া যেত। টিনের মাংসের স্যান্ডউইচ, স্যুপের প্যাকেট, গরম কোক, তা-ও সেই কোনার দোকান থেকেই আনা, দিয়ে সবার মোটামুটি খাওয়া হয়ে যায়। পুরুষেরা একটা বাস ধরে আনে, যেটাতে করে হাসপাতালের কর্মচারীরা মালুমঘাটে চলে যেতে পারবে। দুপুর দুটা নাগাদ ‘বাহিনীটা’ ভেঙে যায় চিরস্থায়ীভাবে।

লিন আর আমি বসার ঘরের মেঝেতে বসে, আমরা-যে ফিরে এসেছি সে-বিষয়ে ধাতস্থ হবার চেষ্টা করি। নিজেদের ঘরে যাবার চাবি ছিল না আমাদের কাছে, তবে আমরা বাড়িতে একা ছিলাম না। জব্বারের বউ ও দুই ছেলে আমাদের কয়েকদিন আগে ফিরেছিল। তারা আমাদের সঙ্গে হাসপাতালে গিয়েছিল আমরা যখন শহর ছাড়ি, এবং সেখান থেকে নৌকা করে হেব্রনের সেই জঙ্গল-কেন্দ্রে পালিয়েছিল, এবং আবারও হাসপাতালে ফিরে এসেছিল যখন ডাকাতির বিপদ দেখা দেয়। এখন তারা আমাদের বাড়িতে ফিরেছে ফের। বৃদ্ধাটি তাদেরই কোনো পরিচিত, যে-এখানে থাকছিল, গ্রাম থেকে বাবা-মায়ের খবর নিয়ে জব্বারের ফিরে না আসা পর্যন্ত।

বাঙালিরা। আমাদের লোক। আমরা বাড়ি ফিরে এসেছি।

কিন্তু তখনও এটি ‘জয় বাংলা’র দেশ হয়ে ওঠেনি। [চলবে]


কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১৬)
কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১৫)
কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১৪)
কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১৩)
কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১২)

এবার বইমেলায় ফারজানা করিমের নতুন বই



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
এবার বইমেলায় ফারজানা করিমের নতুন বই

এবার বইমেলায় ফারজানা করিমের নতুন বই

  • Font increase
  • Font Decrease

ফারজানা করিম। পেশাগত জীবনে তিনি বহুদিন ধরেই সংবাদ উপস্থাপনা করছে। পেশাগত জীবনের পাশাপাশি সংস্কৃতির বহুমাত্রিকতার সঙ্গে জড়িত ফারজানা করিম। লিখেছেন শতাধিক কবিতা। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘পাখি পৃথিবী'।

প্রকাশের পর ব্যাপক সাড়া পান তিনি। জলকণা , না বলা কথা, মী , শূন্যতা , ভালোবাসার আড়ালে, জলে ভাসা পদ্য , শেষ বিকেলের আলো, দূরে কোথাওসহ বেশকিছু গ্রন্থ প্রকাশ হয় তার। এবারের বইমেলাতেও শোভা পাবে তাঁর নতুন এক গ্রন্থ। নাম- বিচ্ছিন্ন কবিতারা। আসছে তাম্রলিপি প্রকাশনী থেকে,২১ নম্বর প্যাভিলিয়ন। পাওয়া যাবে ১০ তারিখ থেকে।

গতকাল ফেসবুকের এক পোস্টে ফারজানা করিম লিখেন, এবারে কাজের ভিড়ে আমার কবিতাগুলো বেশ কষ্ট পেয়েছে। ওদের শরীরে হাত দিয়েছি , ওদের ঠিকঠাক গড়ে নিয়েছি বেশ কষ্ট করে। আচ্ছা ওরা তো আমার সন্তান। ওদের কে কি আমি মানুষের ভালোবাসার পাত্র করে গড়ে তুলতে পারলাম শেষ পর্যন্ত? ছেড়ে দিলাম আমার প্রিয় পাঠকদের জন্য। তাঁরাই আলোচনা সমালোচনা করে নাহয় ঠিক করে নেবেন। বিচ্ছিন্ন কবিতারা আপনাদের ছোঁয়ার অপেক্ষায় প্রিয় পাঠক। দেখা হবে বইমেলায় যদি বেঁচে থাকি।

উল্লেখ্য, ফারজানা করিমের জন্ম ১৩ জুলাই চট্টগ্রামে। বেড়ে ওঠা এবং পড়ালেখা সবই চট্টগ্রামে। পড়ালেখা শেষ করেছেন ইংরেজি সাহিত্য এবং ফিল্ম এন্ড মিডিয়া থেকে। ২০০৩ সাল থেকে এখন অবধি সংবাদ পাঠক হিসেবে কাজ করছেন।

;

হাসান হাফিজের কবিতাগুচ্ছ



হাসান হাফিজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

অমর একুশে তুমি আত্মপরিচয়

তুমি এক অগ্নিক্ষরা ইতিহাস আবেগের দিন
নক্ষত্রস্পর্ধায় তুমি জ্বলজ্বলে উদার আকাশ
তুমি শুধু বাঙালিরই নও, এই ঋদ্ধি রক্তঋণ
মাতৃভাষা ভালোবাসা স্বতঃস্ফূর্ত প্রাণের প্রকাশ
আজ তুমি বিশ্বমানবের, গোটা বিশ্বসভ্যতার
তারুণ্যের দুঃসাহসে অহঙ্কৃত প্রাণ বলিদান
একুশে তোমার পুণ্য শাশ্বত সুরেলা গান
নয় মাত্র বাঙালির সম্পত্তি ও ঐতিহ্য একার-
ব্রহ্মা-ের কোন্ দূরে প্রান্তদেশ সিয়েরা লিওনে
রাষ্ট্রভাষা হয়েছো তুমিও ছন্দে নূপুরে নিক্কণে
বাংলাভাষা তোমার ধ্রুপদী লয় সুছন্দিত তান
নতুন সংস্কৃতিগর্ব বহুমূল্য জাগৃতি ও জয়গান
অক্ষয় অপরাজেয় উপেক্ষিত ভাষার সম্মান
আন্দোলনে অভ্যুদয়ে মুক্তিযুদ্ধে স্বয়ম্ভু সোপান
দোতারা শাপলা ফুল দোয়েলের চঞ্চলতা শিস
বাঘের হুঙ্কারে দর্পী স্বৈরাচার ভয়ে নিরুদ্দিশ।

একুশ প্রকৃত অর্থে মুক্তছন্দা বহতা নদীর নাম
এই সত্য বিশ্ববুকে আমরাই এঁকে রাখলাম।
ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাষা যতো পায় যেন সপ্রীতি লালন
বিকাশেরও সমান সুযোগ শ্রদ্ধা স্থিতি সংরক্ষণ
একুশে অমূল্য এক পাথেয় প্রেরণা উৎসভূমি
আত্মপরিচয় পেতে দুর্বিনীত বিদ্রোহও তুমি॥

পোড়ানো ও নিমজ্জন

ভুল করে ভালোবাসলে
দণ্ড ও লাঞ্ছনা
প্রাপ্য হবে, হোক।
তোমাকে পুড়িয়ে দিক
আমার দু’চোখ।
নদী যদি হতে পারো
ডুবে মরবো আনন্দেই-
সুতরাং নদী হতে
কোনো বাধা বিপত্তি তো নেই!

মেরুদণ্ড

হাতড়ে দেখি, নেই।
আমারও নেই, তোমারও নেই,
রাজ্যব্যাপী কারোরই নেই।
কোথায় গেল? কোথায় গেল
রিমান্ড চেয়ে তলব করো,
ফায়দা যে কী, তাও বুঝি না।

তত্ত্ব তালাশ করতে গিয়ে
হদ্দ বেকুব বনছি রে ভাই
এই শরমের শুমার যে নাই
কোন্ বনে যাই দুঃখ শুকাই
লজ্জা পেয়ে কোন্ঠে লুকাই
ক্ষতস্থানের নাই প্রশমন
বুঝলি সোনা ও পোড়া মন
ধুঁকছি জাড়ে শীতকামড়ে
কিন্তু আগুন? কোথায় মেলে?
ছুটছি আশার স্বপ্ন ফেলে
নাহ কিছু নাই বুঝলি রে ভাই
ফায়দা তোলার মওকাও নাই
হাতড়ে দেখি সাঁতরে দেখি
আজব কাণ্ড হচ্ছে এ কি
ভীরুতার স্বগত সংলাপ

ভয় পাই নিজেকেই।
কীভাবে যে মুখোমুখি হবো!
কতো পাপ প্রস্তরের ঋণ
জমা হয়ে আছে।
এই কষ্ট বলি কার কাছে?
নিজের ভুবনই ক্রমে
অনাত্মীয় অচেনা হয়েছে
এই দ্বন্দ্ব সংশয়ের কাঁটা
মনে ও মগজে বেঁধে
নীরবে ঝরায় রক্ত
শক্ত কোনো প্রতিরোধ
গড়বার সামর্থ্য যে নেই
নিঃস্বতার সঙ্গে বসবাস
করে করে বাকি আয়ু
শেষ হবে হোক!

আকুল আর্তি

রঙধনু রঙ
যায় মিলিয়ে
তোমার স্মৃতি
জাগনা থাকে
মিলায় না সে
খুঁড়তে থাকে
ছুঁড়তে থাকে
পাথর নুড়ি
ভুলবো তোমায়?
কেমন করে
নাই যে তেমন
হ্যাডম কিংবা সিনাজুরি!

রঙধনু রঙ
হবেই ফিকে
তোমার ছোঁড়া
তীর নিশানা
আসবে ফিরে
আমার দিকে,
এফোঁড় ওফোঁড়
হলেম যদি
কার কি কিছু
যায় বা আসে?
দিন রজনী
কাঁপছে ত্রাসে
চাইছে যেতে
বনের বাসে
কিন্তু সাহস
হচ্ছে না তার
তোমার বিজয়
অঙ্কিত রয়
সাঁঝ সকালের
দূর্বাঘাসে

রঙধনু গো
তোমার সঙ্গী
করবে আমায়
এ পোড়ামুখ
কোথায় রাখি?
আঁধার নেমে
এই চরাচর
সন্ধ্যাতারায়
বিষণœ স্বর
কোথায় পাখি
কোথায় পালক
যাচ্ছে বেড়ে
দহন ও ধক্
ও রঙধনু
তোমার মতোন
হতেম যদি
স্মৃতির ছোবল
এড়িয়ে যাবার
সুযোগ হতো
দিন প্রতিদিন
মরার কষ্ট
আর হতো না!

চরাচরে প্রশ্নই প্রবল

বসন্ত আসবে বলে
অপেক্ষায় ছিলে তুমি
শীতকাল বড়ো বেশি প্রলম্বিত
সব গাছ রুক্ষ শীর্ণ
ঝরাপাতা ধুলোর সংসারে
অপেক্ষার বন্দিশে বেজেছে
বিচ্ছেদী বেহাগ...
কোনোদিন উঠবে না রোদ?
গাছ কবে ফিরে পাবে পাতা
প্রতীক্ষার পালা হবে শেষ
আয়ু সলতে নিভে নিভে যায়
গাঙপাড়ে স্তব্ধতার এলানো চাদর
নৌকা আছে মাঝি নাই
ওম খুঁজছে তালি তাপ্পি সংবলিত
গরিবি কাঁথায়
পারাপার কবে শুরু ফের?
এ প্রশ্নের বিশদ উত্তর
ধরাধামে কারো জানা নেই
---

;

একুশের বইমেলায় সিইসি'র বই স্টুডেন্ট ওয়েজে



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
একুশের বইমেলায় সিইসি'র বই স্টুডেন্ট ওয়েজ প্যাভিলয়নে।

একুশের বইমেলায় সিইসি'র বই স্টুডেন্ট ওয়েজ প্যাভিলয়নে।

  • Font increase
  • Font Decrease

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের শুরু থেকেই প্রশাসন বা আমলাতন্ত্রের সদস্যগণ জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে মৌলিক ও সৃজনশীল লেখালেখিতে লিপ্ত রয়েছেন। অনেকের লেখা কালজয়ী সাহিত্যের অংশেও পরিণত হয়েছে। বিশেষত, তাদের স্মৃতি, বিশ্লেষণ, তথ্য ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ের স্বচ্ছ ও সচল ধারাভাষ্য রূপে গৃহীত হয়েছে। বাংলা সাহিত্যে এমন বইয়ের সংখ্যা কম নয়, যা পাঠকপ্রিয়তা ও বৈশিষ্ট্যময়তায় মৌলিক সম্পদ রূপে বিবেচিত।

কাজী হাবিবুল আউয়াল (জন্ম: ২১ জানুয়ারি ১৯৫৬) বাংলাদেশের ত্রয়োদশ প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এবং সাবেক প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব। পেশাগত জীবনের গুরু দায়িত্ব সামাল দিয়েও তিনি রচনা করেছেন বেশ কয়েকটি গ্রন্থ।

কাজী হাবিবুল আউয়ালের প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে 'জীবন পাতার জলছাপ' (আত্ম-চরিত), 'ট্রাজেকটরি অব এ জুডিশিয়াল অফিসার' এবং 'মেমোরিজ অফ আরলি লাইফ'। এবারের একুশের বইমেলায় অভিজাত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান 'স্টুডেন্ট ওয়েজ' কর্তৃক প্রকাশিত হয়েছে জীবনস্মৃতি ভিত্তিক গ্রন্থ 'জীবন খাতার কয়েক পাতা'।

কাজী হাবিবুল আউয়াল ১৯৫৬ সালের ২১ জানুয়ারি পিতার কর্মস্থল কুমিল্লায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈত্রিক নিবাস চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপের সারিকাইত ইউনিয়নের সারিকাইত গ্রামে। তার পিতা কাজী আবদুল আউয়াল কারা উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি প্রিজন্স) ও জেলখানায় জাতীয় চার নেতা হত্যা মামলার বাদী ছিলেন। তার মাতা বেগম নাফিসা খাতুন।

১৯৭২ সালে খুলনার সেন্ট জোসেফ’স হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৭৪ সালে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৬ সালে এল এল.বি (অনার্স) ও ১৯৭৮ সালে এলএলএম ডিগ্রি অর্জন করেন। বাংলাদেশ বার কাউন্সিল থেকে সনদ পান ১৯৮০ সালে এবং সে বছর ঢাকা জেলা বার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য হন।
কাজী হাবিবুল আউয়াল বিসিএস ১৯৮১ ব্যাচের বিচার ক্যাডারে যোগদান করেন। কর্মজীবন শুরু করেন উপজেলা মুন্সেফ হিসেবে। তিনি প্রেষণে সহকারী সচিব ও উপ সচিব হিসেবে আইন মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন।

১৯৯৭ সালে তিনি জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে পদোন্নতি পান। ২০০০ সালে তিনি আইন মন্ত্রণালয়ে যুগ্ম সচিব হিসেবে দায়িত্ব নেন। তিনি ২০০৪ সালে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন। ২০০৭ সালের ২৮ জুন তিনি আইন মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে পদোন্নতি পান। সেখান থেকে তাকে রাষ্ট্রপতির ১০ শতাংশ কোটায় ২০০৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত আইন মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনের পর ২০১০ সালের ২৪ এপ্রিল তাকে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব করা হয়। পরে ২০১৪ সালের ১৮ জুন তার চাকরির মেয়াদ এক বছর বাড়ায় সরকার।

২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারি অবসরোত্তর ছুটিতে (পিআরএল) যাওয়ার কথা ছিল হাবিবুল আউয়ালের। কিন্তু ২০১৫ সালের ২১ জানুয়ারি পিআরএল বাতিল করে তাকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হিসেবে এক বছরের চুক্তিতে নিয়োগ দেয় সরকার। পরে সেই চুক্তির মেয়াদ আরো এক বছর বাড়ানো হয়। তিনি ২০১৭ সালে জ্যেষ্ঠ সচিব হিসেবে অবসরগ্রহণ করেন। সরকারি চাকরি থেকে পরিপূর্ণ অবসরে যাওয়ার পর তিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন।

বর্তমানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার শহরের পরিবেশে জন্ম ও বেড়ে উঠলেও পৈত্রিক জনপদ বিচ্ছিন্ন দ্বীপ সন্দ্বীপের গ্রামীণ জীবন ও পরিবেশকে বিস্মৃত হন নি। গ্রন্থে তিনি বিগত শতাব্দীর ত্রিশের দশকে নগরজীবন আর গ্রামীণ বাস্তবতাকে উপস্থাপন করেছেন।

প্রকাশক মাশফিকউল্লাহ তন্ময় বার্তা২৪.কমকে জানান, পিতার সরকারি চাকরির বদলিজনিত কারণে লেখক দেশের বিভিন্ন জেলা শহরে শৈশব ও কৈশোর কাটিয়েছেন। বইতে তিনি পরিবার ও নিকটজনদের পরিচয় দিয়েছেন। পাশাপাশি শৈশব ও কৈশোরে দেখা সমাজ, পারির্পাশ্বিকতা, অভাব, দারিদ্র এবং প্রার্চুযহীন অবিলাসী, নিরাভরণ, সাধারণ ও সরল জীবনাচরণের চিত্র তুলে ধরেছেন। শিকড়ের টানে তিনি পিতৃপুরুষদের জন্মস্থান সন্দ্বীপের গ্রামের বাড়িতে একাধিকবার বেড়াতে গেছেন এবং গ্রামের বাড়ি, গ্রাম ও সন্দ্বীপের বিবিধ বিবরণ তুলে ধরেছেন গভীর মমতায়। তিনি নিজের দেখা ইতিহাসের উপজীব্য রাজনীতির বির্বতন এবং বাংলাদেশের স্বাধীকার আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করেছেন বস্তুনিষ্ঠ ও উপভোগ্য ভাষায়।

লেখক স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠিদের কথা বলতে গিয়ে সমকালীন নগরজীবন, পারির্পাশ্বিকতা ও অনেক ঘটনার রসালো বিবরণ দিয়েছেন, যা পাঠকের বিনোদনের খোরাক হতে পারে।

প্রকাশক আরও জানান, এটি লেখকের আত্মজীবনী নয়, শৈশব ও কৈশোরের খানিকটা স্মৃতিচারণ। নিজ জীবনের বিগত একটি সময়ের দৃশ্যপট তিনি সময়ান্তরে অনাগত আরেকটি সময়ে তুলনায় উপস্থাপন করেছেন। ফলে বইটি গ্রামীণ ও শহরের বিন্যাস, সাংস্কৃতিক পালাবদল ও ঘটমান রাজনৈতিক রূপান্তরকে কাঠামোবদ্ধ করেছে এবং সাম্প্রতিক অতীতের প্রাণবন্ত দলিলে পরিণত হয়েছে। এবারের একুশের বইমেলার প্রথম দিন থেকেই বইটি পাওয়া যাবে স্টুডেন্ট ওয়েজ-এর ২৬ নম্বর প্যাভিলিয়নে।

;

যারা পেলেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার ২০২২



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার-২০২২ ঘোষণা করা হয়েছে। সাহিত্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখায় এ বছর ১১টি ক্যাটাগরিতে ১৫ জন এই পুরস্কার পাচ্ছেন।

মঙ্গলবার বাংলা একাডেমির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পুরস্কারপ্রাপ্তদের নাম ঘোষণা করা হয়।


বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২২ প্রাপ্তরা হলেন— কবিতায় ফারুক মাহমুদ ও তারিক সুজাত, কথাসাহিত্যে তাপস মজুমদার ও পারভেজ হোসেন, প্রবন্ধ বা গবেষণায় মাসুদুজ্জামান, অনুবাদে আলম খোরশেদ, নাটকে মিলন কান্তি দে ও ফরিদ আহমদ দুলাল, শিশুসাহিত্যে ধ্রুব এষ, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গবেষণায় মুহাম্মদ শামসুল হক, বঙ্গবন্ধুবিষয়ক গবেষণায় সুভাষ সিংহ রায়, বিজ্ঞান, কল্পবিজ্ঞান বা পরিবেশ বিজ্ঞানে মোকারম হোসেন, আত্মজীবনী, স্মৃতিকথা বা ভ্রমণকাহিনীতে ইকতিয়ার চৌধুরী, ফোকলোরে আবদুল খালেক ও মুহম্মদ আবদুল জলিল।

;