কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১৬)



জিনি লকারবি ।। অনুবাদ: আলম খোরশেদ
অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

  • Font increase
  • Font Decrease

অই তো যায়, টু আ পেনি

[পূর্ব প্রকাশের পর] আমাদের পূর্ব পাকিস্তান ত্যাগের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই, আমরা উদ্বিগ্ন পরিবার ও বন্ধুদের কাছ থেকে চিঠি পেতে শুরু করি। তার সব ক’টার সুরই এক। “তোমরা নিশ্চয়ই দেশ ছাড়তে পেরে খুব খুশি! তা তোমাদেরকে কবে নাগাদ আমরা আমেরিকায় আশা করতে পারি?”

কিন্তু আমাদের কারুরই আমেরিকার দিকে যাত্রা করার বাসনা ছিল না। আমরা এমনিতেই পূর্ব পাকিস্তান ছাড়তে চাইনি, আর আমাদের মধ্যে যাদের পুনঃপ্রবেশের ভিসা ছিল না, তারা আর কোনোদিন ফিরতে না পারার আতঙ্কে ছিল। আমরা জানি প্রভুই আমাদেরকে বাইরে নিয়ে এসেছেন, যদিও আমরা বুঝিনি এর পেছনে তাঁর কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে। আমরা শুধু এটুকু জানি, আমরা সবাই ফিরতে চাই, এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।

যুদ্ধবিদীর্ণ দেশটিতে আমরা আমাদের বাড়িঘর, জিনিসপত্র, বন্ধুবান্ধব এবং আমাদের হৃদয়খানি ফেলে এসেছিলাম।

আমরা মেয়েরা যখন কেনাকাটায় আর বাচ্চাদের ফুর্তিতে রাখার প্রচেষ্টায় আনন্দেই ছিলাম, পুরুষেরা তখন আমাদেরকে ব্যাংককের বাইরে নিয়ে যাওয়ার সমস্যা সমাধানে ব্যস্ত ছিল। পরিস্থিতির জটিলতা ছিল বহুমাত্রিক। তিনটি পরিবারের কিশোরবয়সী বাচ্চারা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের মারিতে। আমরা ব্যাংককে আসার কয়েকদিনের মধ্যেই, আমাদের দলের যারা পশ্চিম পাকিস্তানে ছিল তাদের কাছ থেকে এরকম চিঠি পেতে শুরু করি যে, কিছু বাচ্চা খুবই আতঙ্কিত হয়ে আছে এবং তারা তাদের বাবামাকে পাশে চাইছিল। যাদের কোনো বাচ্চা ছিল না সেখানে, তাঁরা একগাদা পয়সা খরচ করে সেখানে গিয়ে বেকার বসে থেকে, পূর্ব পাকিস্তানে ফেরার অনুমতি পাবার প্রত্যাশায় দিন গোনার সম্ভাবনায় খুব একটা প্রীত ছিলেন না।

যদিও আমাদের পাকিস্তানে ফিরে যাবার একমাত্র সম্ভাবনা, যুক্তরাষ্ট্রে সরকারের পরামর্শ অনুযায়ী দেশত্যাগীদের একসঙ্গে দলবেঁধে থাকার মধ্যেই নিহিত ছিল। আমাদের যুক্তি ছিল, যেহেতু তারা আমাদের দেশ ছাড়ার জন্য উৎসাহিত করেছিল, সেহেতু নিশ্চয়ই তারাই আমাদেরকে আবার ফিরিয়ে নিতে সাহায্য করবে। তবে এটা তত সহজ ছিল না। আমেরিকার সরকার যতটা করার করছিল, কিন্তু পাকিস্তান সরকার আমাদেরকে সাহায্য করার ব্যাপারে আগ্রহী ছিল না। আমরা তাদের সেই মিথ্যে বুদ্বুদখানি ফাটিয়ে দিয়েছিলাম, “পূর্ব পাকিস্তানে সব স্বাভাবিক রয়েছে।”  যদি সব স্বাভাবিকই থাকত, তাহলে মার্কিন সরকার কেন সবাইকে বিশেষভাবে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছিল?

এই সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হয় এই তথ্যটুকুও যে, আমাদের অর্ধেকেরও বেশির ভিসার মেয়াদ ফুরিয়ে গিয়েছিল। এমনকি স্বাভাবিক অবস্থাতেও আমাদের ফিরতে অসুবিধা হবার কথা।

শহরে আমাদের ঘোরাঘুরির সময় আমরা প্রায়ই পাকিস্তান দূতাবাসের পাশ দিয়ে যেতাম। প্রতিবারই তার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় মেল বিল্‌স প্রাণভরে একবার বলে উঠতেন, “জয় বাংলা”। তাঁর স্ত্রী মার্গি, এটা শত্রুর কানে গিয়ে পৌঁছানর ভয়ে এবং তা আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারে ভেবে তার স্বামীকে তা বলা থেকে বিরত রাখতে চাইছিল।

“ঠিক আছে,” তিনি রাজি হন। “আমি চুপ থাকব, ভেতরে কিন্তু ঠিকই এটা উচ্চারণ করব।”

জে ওয়াল্‌শ ও মেল বিল্‌স মার্কিন দূতাবাস আর পাকিস্তান দূতাবাসের মধ্যে ছোটাছুটি করছিলেন কেবল। পরেরটাতে প্রভু আমাদের পক্ষে ছিলেন। যার দায়িত্ব ছিল এই অনুমতিপত্র প্রস্তুতের, তিনি ঢাকার মানুষ ছিলেন বলে। জে একটু হালকা বোধ করায় তাঁর সঙ্গে বাংলায় কথাবার্তা শুরু করেন। বাঙালি অফিসারের চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে এবং তিনি গলা নিচু করে গোপনে তাঁর কাছে দেশের অবস্থা জানতে চান। এরপর থেকে তিনি তাঁর সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন আমাদের সাহায্য করতে, যদিও তাঁর শ্রেষ্ঠটাও আমাদের জন্য যথেষ্ট ছিল না। চূড়ান্ত অনুমোদন আসবে ইসলামাবাদের কেন্দ্রীয় সরকারের দপ্তর থেকে।

আমেরিকান পর্যটকেরা থাইল্যান্ডে মাত্র পনেরোদিন থাকতে পারত। তারপর তাদেরকে দেশ ছেড়ে আবার নতুনভাবে অনুমতি নিয়ে ঢুকতে হতো। আমাদের পনেরোদিন অতিবাহিত হবার পর আমরা সিদ্ধান্ত নিই আমরা পেনাং দ্বীপে একটা ছোটখাটো ছুটি কাটাব। আমরা যখন বিমানবন্দরে যাওয়ার জন্য বাসে উঠছিলাম তখন সেখানকার এক কর্মচারী জে-কে বার্তা পাঠান। এই বার্তা আমাদের আনন্দময় ভ্রমণের অনুকূল ছিল না। মার্কিন সরকার এইমাত্র তাদের ইসলামাবাদের পাল্টাপক্ষের কাছ থেকে একটা টেলেক্স পেয়েছেন এই নির্দেশসহ যে, আমরা যেন পশ্চিম পাকিস্তানে প্রবেশের চেষ্টাও না করি। সেই অংশ থেকেও মিশনারিদের বার করে দেওয়া হচ্ছিল।

তখন প্রভু ছাড়া আর কোনো গতি ছিল না আমাদের। আমাদেরকে অ্যাসেম্বলি অভ গড মিশনারিদের কথা মনে করিয়ে দেওয়া হলো, যারা বলতেন, “যখন তোমাদের মনে হয় যে, প্রভু ছাড়া আর কোথাও যাওয়ার নেই, তার অর্থ হচ্ছে খাবার ছাড়া আর কিছু খাওয়ার নেই তোমাদের।”

আমরা ঈশ্বরের কাছেই গিয়েছিলাম। আমাদের ব্যক্তিগত এবং দলীয় প্রর্থনাগুলোতে আগের মতো আর বলছিলাম না, “প্রভু আমাদেরকে ফিরিয়ে আনুন,” বরং অনুরোধ করছিলাম, “প্রভু আমাদেরকে বলে দিন আপনি কী চান, আমরা তা-ই করব।”

জে যাদের সঙ্গে ছিলেন তারা আমাদের যাওয়ার কয়েকদিন আগে ব্যাংকক ফিরে গেল। তিনি সবে ফিরেছেন, অমনি পাকিস্তানি দূতাবাস তাঁকে ডেকে পাঠিয়ে বার্তাটা দেখালেন, “এই মানুষগুলোকে পাকিস্তানে ঢোকার ব্যাপারে যা করার করুন।”

জে গোটা ব্যাপারটা দ্রুতই আন্দাজ করে ফেললেন। তিনি নিশ্চিত ছিলেন, পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের মনে আসলে একটা সাধারণ ভ্রমণ অনুমতির বিষয়টাই ছিল, যার মাধ্যমে বাবা-মায়েরা তাঁদের বাচ্চাদেরকে তুলে নিয়ে আবার বেরিয়ে যেতে পারবেন। কিন্তু তিনি কর্মকর্তাকে দিয়ে এর এমন এক ব্যাখ্যা করালেন, যার অর্থ দাঁড়ায়, “এদের সবাইকে চার বছরের জন্য বহুপ্রবেশ ভিসা দেওয়া হোক।”

আবারও ঈশ্বর আমাদের এই বিশ্বাসের প্রতিদান দিলেন তাঁর উপহারের ঝুলি খুলে। আমাদের প্রত্যেককে, যাদের স্রেফ একটি ভিসাই দরকার ছিল, এমনকি যাদের ভিসার মেয়াদ ফুরোয়ওনি, তাদেরকে সুদ্ধ সব ভিসার সেরা ভিসাটি দেওয়া হলো। সেই চার বছরের বহুপ্রবেশ ভিসাটির অর্থ হলো, আমরা ভিসা নবায়ন না করেই আগামী চার বছর যতবার ইচ্ছা আসাযাওয়া করতে পারব। আমাদের কোনো কোনো নবাগত মিশনারি জীবনেও এটা পাননি, কেননা পাকিস্তানে আসার আগে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তাঁরা এটা নিয়ে আসতে পারেননি।

জে আমাদেরকে পেনাংয়ে ফোন করে সুখবরটা দেন এবং আমরা এই পুরস্কার গ্রহণের উদ্দেশ্যে ফিরতি বিমান ধরি সঙ্গে সঙ্গেই। মে মাসের ১৭ তারিখ জে আমাকে, লিনকে আর বেকিকে নিয়ে যান আমাদের পাসপোর্টে ভিসার সিল মারাতে। ফেরার পথে আমেরিকান দূতাবাসে দাঁড়ালে তখনকার কর্তব্য কর্মকর্তা জে-র দিকে তাকিয়ে বলেন, “এই লোক একেবারে চাঁদের দিকে তির ছোড়েন, তাই না?” তারপর একটু গম্ভীর হয়ে বলেন, “আপনার মনে হয় ওপরে কেউ আছেন আপনার হয়ে কাজ করার জন্য।”

আমাদের ভিসা ও টিকিটের জন্য অপেক্ষা করার সপ্তাহগুলোতে আমরা পত্রিকার খবর গিলছিলাম এবং যে-কেউ পাকিস্তানের ওপর কোনো খবর পড়তে থাকলে অভদ্রের মতো তার কাঁধের ওপর হুমড়ি খেযে পড়ছিলাম। নিউজ উইকের ২৬শে এপ্রিল সংখ্যার এই ধরনের খবরের বিশেষ গুরুত্ব ছিল আমাদের কাছে।

… নিষ্ঠুরতার জন্য কুখ্যাত একটি গৃহযুদ্ধে, ঝটিকা আক্রমণগুলো পরিচিত ছিল তাদের বর্বরতার জন্য। বন্দর নগরী চট্টগ্রামে, পাকিস্তানি সেনারা বাঙালি বন্দিদের জোরপূর্বক ট্রাকে তুলে ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি দিতে বাধ্য করে—যেটা ছিল তাদের প্রিয় শ্লোগান। এই শ্লোগান শুনে লুকিয়ে থাকা বাঙালিরা বেরিয়ে এলে, তাদেরকে নির্বিচারে মেশিনগানের গুলি করে মারে। সিলেট ও কুমিল্লা শহরে পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যেরা শত শত বাঙালি কৃষকদের লাশ ফেলে রাখে যত্রতত্র শকুন ও কুকুরের খাদ্য হবার জন্য।

আমরা খবর পাই প্রতি দিন প্রায় এক লাখের মতো বাঙালি শরণার্থী ভারতে প্রবেশ করছে। সেইসব হাজার হাজার শরণার্থীর বহন করে নিয়ে যাওয়া হাজারো ট্রাজেডির গল্প শুনি আমরা: বাচ্চাদের সামনে বাবা-মাকে হত্যা করা; বাচ্চাদের ওপরে ছুড়ে ফেলে দিয়ে সৈন্যদের বেয়নেটের ডগায় গেঁথে নেওয়া; কমবয়েসি মেয়েদের জোর করে যৌনদাসী করে রাখা; পুরুষদের চোখ উপড়ে ফেলে পিটিয়ে মারা ইত্যাদি।

এইসব নির্মমতার কথা জেনে বরং আমাদের ফেরার ইচ্ছা আরও প্রবল হয়, যাতে করে আমরা তাদের সাহায্য করতে পারি। তবে সেদিনের সেই অসহ্য গরমে ব্যাংককের রাত্রিতে প্রার্থনারত অনেকেই অনুৎসাহিত ছিল এতে। কিন্তু আমাদের তো পর্বত-চূড়ার অভিজ্ঞতা হয়েছে। ঈশ্বর আমাদের প্রার্থনা শুনেছেন, আমাদের হাতে ভিসা এসে গেছে।

আমাদের দলের অর্ধেক সিদ্ধান্ত নেন মাঝখানে পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় ছোট্ট বিরতি নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে যাবার। মালুমঘাট ছাড়ার পর চৌত্রিশজনের আমাদের এই দলটি গত পাঁচ সপ্তাহ ধরে এতটা সময় একসঙ্গে ছিলাম যে, এমনকি ছোট্ট বারো বছর বয়সী ফিলিপ ওয়াল্‌শও, প্রথম দলের সদস্য তার পরিবারের হাত ধরে অনিচ্ছুকভাবে বলে, “আমি সত্যি মনে করি না আমাদের দল ভাঙা উচিত।”

আমরা যারা ব্যাংককে ছিলাম তারা এই সংবাদ শুনে উল্লাস করি যে, ঢাকার যাত্রাবিরতিতে ডাঃ ওল্‌সেন তাঁর নিজের পরিবার, ওয়াল্‌শ ও কেচামের পরিবারকে অভ্যর্থনা জানান এবং পূর্ব পাকিস্তানে তাঁরা কোথায় থাকবেন তার একটা ছকও আঁটেন। তাঁরা সবাই ফিরে গেছেন, আর আমরা এখানে এই গরম, গুমোট ব্যাংককে আটকে আছি।

পাকিস্তানি দূতাবাস প্রতিজ্ঞা করে যে, ঢাকা প্রত্যাবর্তনের অনুমতি আসার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের খবর দেবে। কিন্তু অনেক কটা দিন কেটে যায়, কোনো খবর আসে না। ২৯শে মে শুক্রবার মেল বিল্‌স দূতাবাসে আশ্রয় নেন, কিন্তু দুপুরের পরেই সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। মুসলিম দেশগুলোতে শুক্রবার দুপুরেই অফিস বন্ধ হয়ে যায়, আর কোনো সরকারই শনিবার ও রবিবার খোলা থাকে না। সেখানে কোনো সম্ভাবনাই ছিল না যে, আমরা রবিবার বিকালের বিমান ধরতে পারব।

আমরা আসলে ৩১শে মে রবিবার রাতে ইভাঞ্জেলিকাল চার্চ অভ ব্যাংককে শুরু হতে যাওয়া বিলি গ্রাহামের ছবি টু আ পেনি দেখার ওপর একটু বেশিই গুরুত্ব দিয়ে ফেলেছিলাম, কেননা ততদিনে আমাদের কাছে কেনাকাটা করা, চিড়িয়াখানায় যাওয়া এমনকি সুইমিং পুলে সাঁতার কাটাও আকর্ষণ হারিয়ে ফেলেছিল।

প্রার্থনার সময় অনেকেই স্বীকার করেছিলেন যে, আমাদের বিশ্বাস একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছিল। অন্যেরা ইতোমধ্যেই ফিরে গেছেন, তাহলে আমরা নই কেন? ঈশ্বর কি তাহলে চাইছিলেন না যে, আমরা ফিরে যাই? এতগুলো সপ্তাহ এখানে বেকার বসে থাকার পর আমাদেরকে কি তাহলে যুক্তরাষ্ট্রেই ফিরে যেতে হবে? আমরা কি তবে মিশনের পরিচালনা পর্ষদের এই পরামর্শকেই মেনে নেব যে, আমাদের মধ্যে যারা স্বাস্থ্যকর্মী তাদের ফিলিপিন্সে গিয়ে স্বাস্থ্য-কর্মসূচিতে কাজ করা উচিত? লিন সে-রাতে বিশেষ কিছু বলেনি। সে তার অবস্থান পরিষ্কার করেছিল আগেই: ঈশ্বর আমাদেরকে ফিরিয়ে নেবেন, এই রবিবারেই!

ব্যাংককের ইভাঞ্জেলিকাল চার্চ প্রথমে তাদের প্রার্থনাসভার আয়োজন করে, তারপর সংক্ষিপ্ত বিরতি দিয়ে, রবিবারের স্কুলের ক্লাসগুলো চালায়। সকালের অধিবেশনের উপসংহারে পাদ্রি একটা বার্তা পড়ে শোনান, “এখানে যদি ডাঃ কুক বলে কেউ থাকেন, তাহলে তাঁকে ফোনে ডাকা হচ্ছে।” আমাদের ড. ডিকুক ভাবেন নামটা যথেষ্ট কাছাকাছি, তাই তিনি দৌড়ে গিয়ে সবচেয়ে কাছের যে-ফোন সেটা ধরেন। আমরা তখন রবিবারের স্কুলের উদ্বোধনী প্রার্থনাসংগীত গাইতে শুরু করে দিয়েছি, যখন তিনি আকর্ণবিস্তৃত হাসি নিয়ে ফিরে আসেন। বাকি জমায়েতকে একটা সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা প্রদান করে আমরা দ্রুত হেঁটে, বলা চলে প্রায় উড়ে, চলে যাই লবিতে।

বেচারা জো ডিকুক গল্পটা একটু রসিয়ে বলারও সময় পেলেন না। পাকিস্তান এয়ারলাইন্স এতগুলো যাত্রী হারাতে চায় না বলে সরকারি কর্তৃপক্ষের ওপর বিশেষ চাপ প্রয়োগ করে। দেশে প্রবেশের অনুমতি এসে পৌঁছেছে পিআইএ অফিসে। আমরা কি বিকাল ৫টার মধ্যে তৈরী হতে পারব? পারব আমরা? অর্ধেক মহিলা ততক্ষণে লিফটে ঢুকে গেছেন প্রায়, হোটেল ত্যাগ করার জন্য, ইভাঞ্জেলিকাল চার্চ তাদের সভাটি হোটেলেই করেছিল। আমি আরো এক তলা সিঁড়ি ভেঙে বাচ্চাদেরকে ক্লাস থেকে বার করে আনি এবং জুনিয়র ক্লাসের ছাত্রদেরকে অন্যদের বিরক্ত না করে নিঃশব্দে বেরিয়ে আসার ইঙ্গিত করি। তারা আমার সঙ্গে হলঘরে এসে দেখা করে।

“ব্যাপার কী?” দশ বছর বয়সী ড্যানি জিজ্ঞাসা করে।“

আমরা আজ বিকালে বাড়ি যাচ্ছি, ড্যানি।” আমি উত্তর করি।

“বাড়ি? মানে আমরা পাকিস্তান ফিরে যাচ্ছি? কী মজা! আমাকে ক্লাসে ফিরে গিয়ে সবাইকে তা বলতে হবে। তারা সবাই প্রার্থনা করছিল যেন আমরা ফিরে যেতে পারি।”

আমাদের প্রার্থনার এমন ইতিবাচক উত্তরের অভিঘাত আমাদের মধ্যে দৃশ্যমান হয়, আমরা যখন অতগুলি সিঁড়ি ভেঙে দ্রুত নেমে আসি।

“অই যায়, টু আ পেনি!” আমরা ট্যাক্সিতে ওঠার সময় ড্যানি বলে ওঠে। [চলবে]


কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১৫)
কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১৪)

কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১৩)
কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১২)
কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১১)
কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১০)

 

 

হাসান হাফিজের এক গুচ্ছ কবিতা



হাসান হাফিজ
হাসান হাফিজের এক গুচ্ছ কবিতা

হাসান হাফিজের এক গুচ্ছ কবিতা

  • Font increase
  • Font Decrease

ছায়ামায়া বিচ্ছিন্নতা

আবার কখনো হয়তো দেখা হবে
ম্যানিলায়, স্যান মিগুয়েল ড্রাইভে
অদেখার চাপা কষ্ট হয়তো মুছে যাবে
যেহেতু এখন বিশ্ব গ্লোবাল ভিলেজ
ভালো থেকো ম্যানিলাসুন্দরী
তোমার চিকুরে গ-ে মূর্ত হবে
অস্তগামী রোদ্দুরের আভা
কনে দেখা আবছায়া আলোয় মল্লারে
অঙ্কুরিত হতে হতে মরে যাওয়া,
ভালোবাসা ফুল্ল হবে সঘন বন্দিশে
সেই ঐশী মুহূর্তের অপেক্ষায়
পোড়খাওয়া দিন রাত্রি যায়
যুগল মনকে মেখে আবেগে জড়ায়
আধখানা পায় যদি আধেক হারায়
টেলিপ্যাথি দু’জনাকে কাছে এনে
আবারও বিচ্ছিন্ন করে ছায়ায় মায়ায়!

আমাদের জানা নেই

জন্ম থেকে মৃত্যু অব্দি
কতো ক্লান্তি টানাহেঁচড়া এবং ধকল
সমুদয় ফুলের কুঁড়িরা
এই ব্যথা লগ্নি করে নিঝুম নিস্তেজ।
তারাও তো নীলকণ্ঠ
চুপেচাপে হজম করেছে কতো
অপ্রাপ্তি ও লাঞ্ছনার বিষ
মানবজন্মও মূলে লানতের সিঁড়ি
পতনেরই সম্মোহন আছে
আরোহণ অধরা বস্তুত।

জন্ম-মৃত্যু কোন্ প্রশ্নে একাকার লীন
সম্পূরক একজনা অপর জনার
অবিমিশ্র খাঁটি সত্য আমরা জানি না
অন্ধের আন্দাজশক্তি হাতড়িয়ে নিঃসঙ্গতা
বৃদ্ধি করে আরো, আলো ছুঁতে ব্যর্থ অপারগ।

পাই বা না পাই চাই

হাত ধরেছো অন্ধকারে
এইটুকুনি, এর বেশি তো নয়
কেন কেঁপে উঠতে গেলাম
কী ছিল সেই ভয়?
হাতের শিরায় উপশিরায়
মেদুর সে কম্পন
হৃৎযন্ত্রেই পৌঁছে গেল
সীমার যে লংঘন
করলে তুমি জেনেশুনে
অবাস্তবের স্বপ্ন বুনে
কে কার আপনজন
নির্ধারিত হওয়ার আগেই
লুন্ঠন কাজ শেষ
নিষিদ্ধ প্রেম বজ্রঝিলিক
হয়নি নিরুদ্দেশ,
জাঁকিয়ে বসে আরো
মারবে আমায়? মারো-
মারতে মারতে জীবনশক্তি
ফুরিয়ে নিঃশেষ
চাই তোমাকে, পাই বা না পাই
নিমজ্জমান হতেই তো চাই
হোক যতো শ্রম ক্লেশ।

মৃত্যুগাঙে ঢেউয়ের সংসারে

গাঙের মাঝি গাঙেরে কি চিনে?
এই প্রশ্ন হয় না মনে উদয়
গাঙের ঢেউয়ে আছাড় পিছাড়
দ্বন্দ্ব দ্বিধা টানাপড়েন আশঙ্কা সংশয়
গাঙ যে মাঝির পরানসখা, বন্ধুতা তার বিনে
অন্য কোনো রয় কি পরিচয়?
গাঙে উঠলে মৃত্যুমাতাল ঢেউ
পায় না রেহাই কেউ
মাঝগাঙ্গে সে ডুইব্যা মরে, কীভাবে উদ্ধার
চারদিকেতে ঢেউয়েরই সংসার
মাঝি ও গাঙ, অন্য কেহই নাই
চিরকালীন দুইয়ের সখ্য, কোন্ ইশারা পাই
গাঙের মাঝি গাঙের গূঢ় গোপন কথার
শরিক হইতে চায়
কত্তটুকুন পারে ক্ষুদ্র এই জীবনে
আয়ু ক্ষইয়ে যায়
অল্প কিছুই সুলুক সন্ধান
সন্তোষ নাই তায়

বেঁচে থাকা বলে কাকে

জীবন তো ব্ল্যাকবোর্ড ছাড়া কিছু নয়।
ঘটনা বা অঘটন যাই থাকে
নিপুণ শিল্পীর মতো মুছে দেয়,
বাকি বা অক্ষত রাখে সামান্যই।
অদৃশ্যে কে ক্রিয়াশীল আমরা জানি না,
কিবা তার পরিচয়, সাকিন মোকাম কোথা
কিছুরই হদিস নাই। উদ্ধারেরও সম্ভাবনা নাই।
ব্ল্যাকবোর্ড এবং ডাস্টার। জন্ম ও মৃত্যুর খতিয়ান
তুচ্ছতা ঔজ্জ্বল্যে ঋদ্ধ থরোথরো লাবণ্য স্মৃতির
মস্তিষ্কের নিউরন নিখুঁত সেন্সর করে
কারুকে বাঁচিয়ে রাখে, অন্যদের
সরাসরি মৃত্যু কার্যকর
ভোঁতা এক অনুভূতি সহায় সম্বল করে
আমরা ক্লীব টিকে থাকি
একে তোমরা ‘বেঁচে থাকা’ বলো?

আমাদেরও নিয়ে নাও নদী

হৃদয়বাহিত হয়ে তোমার কষ্টের কান্না
সংক্রমিত হয়ে পড়ে হৃৎপিন্ডে আমার
নিদান আছে কী কিছু ?
নাই কোনো স্টেরয়েড এ্যান্টিবায়োটিক
সেহেতু শরণ লই ভেষজ উদ্ভিদে
গুল্মলতা তোমার নির্যাসরসে প্রাকৃতিক হই
বুনোবৃষ্টি মাথাচাড়া দিতে চায় দিক
অঝোর বর্ষণে আমরা সিক্ত হই যথাসাধ্য
নিঃস্ব রিক্ত পুলকিত হই যুগপৎ
নদী খুঁজে পেয়ে যায় আকাক্সিক্ষত সাগরমোহানা
লীন হয়,বাঞ্ছিতকে আলিঙ্গনে ভারাতুরও হয়
এই প্রাপ্তি তপস্যারই পরিণতি,আছে কী সংশয়
কখন হারিয়ে ফেলে এইমতো রয়েছেও ভয়

হৃদয়বাহিত হয়ে নদীস্রোতে যায় বয়ে পরিস্রুত হয়ে
আমাকে তোমাকে সঙ্গে নিয়ে যাক করুণা প্রশ্রয়ে

;

শিশুসাহিত্যিক আলী ইমাম মারা গেছেন



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বিশিষ্ট লেখক, শিশুসাহিত্যিক, সংগঠক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব আলী ইমাম মারা গেছেন। তার বয়স হয়েছিল ৭২ বছর।

সোমবার (২১ নভেম্বর) বিকেলে রাজধানীর ধানমন্ডির ইবনে সিনা বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। আলী ইমাম শ্বসনতন্ত্রের সমস্যা, নিউমোনিয়াসহ নানা জটিল রোগে ভুগছিলেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আলী ইমামের পেজে তার ছেলের দেওয়া এক পোস্টে বিষয়টি জানানো হয়।

আলী ইমাম ১৯৫০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছয়শতাধিক বই লিখেছেন। কর্মজীবনের শেষপ্রান্তে একাধিক স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনের আগে তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশন (২০০৪-২০০৬) ও অধুনালুপ্ত চ্যানেল ওয়ানের (২০০৭-২০০৮) মহাব্যবস্থাপক ছিলেন।

দেশের শিশুসাহিত্যে অবদানের জন্য আলী ইমাম ২০০১ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার এবং ২০১২ সালে শিশু একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার পান। এছাড়াও অনেক পুরস্কার পান তিনি। শিশুসাহিত্যিক হিসেবে জাপান ফাউন্ডেশনের আমন্ত্রণে ২০০৪ সালে তিনি জাপান ভ্রমণ করেন।

আলী ইমামের শিশুসাহিত্য চর্চার শুরু শৈশব থেকে। ১৯৬৮ সালে তিনি তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তান শিক্ষা সপ্তাহে বিতর্ক এবং উপস্থিত বক্তৃতায় চ্যাম্পিয়ন হন। ১৯৮৬ সালে ইউনেস্কো আয়োজিত শিশুসাহিত্য বিষয়ক প্রকাশনা কর্মশালায় অংশ নেন। এছাড়া বাংলাদেশ স্কাউটসের প্রকাশনা বিভাগের ন্যাশনাল কমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

;

কবি সুফিয়া কামালের মৃত্যুবার্ষিকী আজ



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

নারীমুক্তি আন্দোলনের পুরাধা ব্যক্তিত্ব গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল আন্দোলনের অগ্রদূত জননী সাহসিকা কবি বেগম সুফিয়া কামালের ২৩তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ রোববার।

এ উপলক্ষে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হবে।

মুক্তিযুদ্ধসহ বাঙালির সমস্ত প্রগতিশীল আন্দেলনে ভূমিকা পালনকারী সুফিয়া কামাল ১৯৯৯ সালের ২০ নভেম্বর শনিবার সকালে বার্ধক্যজনিত কারণে ইন্তেকাল করেন। সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার ইচ্ছানুযায়ী তাকে আজিমপুর কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

তার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন।

রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে উল্লেখ করেন, কবি সুফিয়া কামাল ছিলেন নারী আন্দোলনের পথিকৃৎ এবং সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে এক অকুতোভয় যোদ্ধা। তার জন্ম ১৯১১ সালের ২০ জুন বরিশালে। তখন বাঙালি মুসলমান নারীদের লেখাপড়ার সুযোগ একেবারে সীমিত থাকলেও তিনি নিজ চেষ্টায় লেখাপড়া শেখেন এবং ছোটবেলা থেকেই কবিতাচর্চা শুরু করেন। সুললিত ভাষায় ও ব্যঞ্জনাময় ছন্দে তার কবিতায় ফুটে উঠত সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ ও সমাজের সার্বিক চিত্র। তিনি নারীসমাজকে অজ্ঞানতা ও কুসংস্কারের বেড়াজাল থেকে মুক্ত করতে আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। মহান ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার, মুক্তিযুদ্ধসহ গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতিটি আন্দোলনে তিনি আমৃত্যু সক্রিয় ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, ছিলেন তার অন্যতম উদ্যোক্তা।

তিনি বলেন, কবি সুফিয়া কামাল পিছিয়ে পড়া নারী সমাজের শিক্ষা ও অধিকার আদায়ের আন্দোলন শুরু করেছিলেন এবং গড়ে তোলেন ‘বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ’। বিভিন্ন গণতান্ত্রিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে অবদানের জন্য তাকে ‘জননী সাহসিকা’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কবি বেগম সুফিয়া কামালের সাহিত্যে সৃজনশীলতা ছিল অবিস্মরণীয়। শিশুতোষ রচনা ছাড়াও দেশ, প্রকৃতি, গণতন্ত্র, সমাজ সংস্কার এবং নারীমুক্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে তার লেখনী আজও পাঠককে আলোড়িত ও অনুপ্রাণিত করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মহিলা হোস্টেলকে ‘রোকেয়া হল’ নামকরণের দাবি জানান তিনি । ১৯৬১ সালে পাকিস্তান সরকার রবীন্দ্র সংগীত নিষিদ্ধ করলে এর প্রতিবাদে গঠিত আন্দোলনে কবি যোগ দেন। বেগম সুফিয়া কামাল শিশু সংগঠন ‘কচি-কাঁচার মেলা’ প্রতিষ্ঠা করেন। আওয়ামী লীগ সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার নামে ছাত্রী হল নির্মাণ করেছে।

কবি বেগম সুফিয়া কামাল যে আদর্শ ও দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন তা যুগে যুগে বাঙালি নারীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পঁচাত্তরের পনেরই আগস্টে নির্মমভাবে হত্যা করে যখন এদেশের ইতিহাস বিকৃতির পালা শুরু হয়, তখনও তার সোচ্চার ভূমিকা বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের গণতান্ত্রিক শক্তিকে নতুন প্রেরণা যুগিয়েছিল।

সুফিয়া কামাল ১৯১১ সালের ২০ জুন বেলা ৩টায় বরিশালের শায়েস্তাবাদস্থ রাহাত মঞ্জিলে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর সুফিয়া কামাল পরিবারসহ কলকাতা থেকে ঢাকায় চলে আসেন। ভাষা আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং এই আন্দোলনে নারীদের উদ্বুদ্ধ করেন। তিনি ১৯৫৬ সালে শিশু সংগঠন কচিকাঁচার মেলা প্রতিষ্ঠা করেন।

পাকিস্তান সরকার ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র সঙ্গীত নিষিদ্ধের প্রতিবাদে সংগঠিত আন্দোলনে তিনি জড়িত ছিলেন এবং তিনি ছায়ানটের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ সালে মহিলা সংগ্রাম কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন এবং গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেন।

১৯৭০ সালে তিনি মহিলা পরিষদ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭১ সালের মার্চে অসহযোগ আন্দোলনে নারীদের মিছিলে নেতৃত্ব দেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার ধানমন্ডির বাসভবন থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা দেন। স্বাধীন বাংলাদেশে নারী জাগরণ ও নারীদের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামেও তিনি উজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেন। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণসহ কার্ফু উপেক্ষা করে নীরব শোভাযাত্রা বের করেন।

সাঁঝের মায়া, মন ও জীবন, শান্তি ও প্রার্থনা, উদাত্ত পৃথিবী ইত্যাদি তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ। এ ছাড়া সোভিয়েতের দিনগুলি এবং একাত্তরের ডায়েরী তার অন্যতম ভ্রমণ ও স্মৃতিগ্রন্থ।

সুফিয়া কামাল দেশ-বিদেশের ৫০টিরও বেশি পুরস্কার লাভ করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার, সোভিয়েত লেনিন পদক, একুশে পদক, বেগম রোকেয়া পদক, জাতীয় কবিতা পরিষদ পুরস্কার ও স্বাধীনতা দিবস পদক।

সুফিয়া কামালের পাঁচ সন্তান। তারা হলেন, আমেনা আক্তার, সুলতানা কামাল, সাঈদা কামাল, শাহেদ কামাল ও সাজেদ কামাল।

;

বিশেষ ব্যক্তিদের সম্মাননা দিলো 'চয়ন সাহিত্য প্রকাশনী'



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

"চয়ন সাহিত্য ক্লাব" এর ২০ তম বার্ষিকী এবং সাহিত্য পত্রিকা "চয়ন ও দশদিগন্ত" এর ৩০ তম  প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী  ১৮ নভেম্বর, ২০২২, বিকাল ৩ টায় জাতীয় জাদুঘরের কাজী সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় ।

অনুষ্ঠানে ‘চয়ন সাহিত্য ক্লাব স্বর্ণপদক-২০২২’ তুলে দেওয়া হয়। লিলি হক রচিত "কবিতার প্রজাপতির নীড়ে " বইটি " চয়ন প্রকাশন" থেকে প্রকাশিত হয়, একই সময়ে কবিতা পাঠের পাশাপাশি অন্যান্য আকর্ষণীয় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন জাতীয় জাদুঘর প্রযত্ন পর্ষদ এর সভাপতি আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন একুশে পদকপ্রাপ্ত কথা সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক হাসনাত আব্দুল হাই, বিশেষ অতিথি, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্ব ম. হামিদ, মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরী অথরিটির এক্সিকিউটিভ ভাইস চেয়ারম্যান মোঃ ফসিউল্লাহ্। উপস্থিত ছিলেন উৎসব কমিটির চেয়ারম্যান, সুসাহিত্যক সেলিনা হোসেন। 

পদকপ্রাপ্ত গুণীজন আর্ন্তজাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফ্যাশন আইকন বিবি রাসেল, প্রখ্যাত বাচিকশিল্পী গোলাম সারোয়ার ,কথাসাহিত্যিক আবু সাঈদ, সুসাহিত্যক এবং বাংলা একাডেমীরই আজীবন সদস্য  গুলশান-ই-ইয়াসমীন।

সঙ্গীত পরিবেশন করেন বিশিষ্ট সঙ্গীত শিল্পী স্বাধীন বাংলা বেতারের শিল্পী বুলবুল মহলানবীশ, মনোয়ার হোসেন খান, ও আনজুমান আরা বকুল। অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন ছড়াশিল্পী ওয়াসীম হক। সার্বিক পরিচালনায় ছিলেন অনুবাদক মোঃ নুরুল হক। হৈমন্তী সন্ধ্যায় অনুষ্ঠানটি এক মিলনমেলায় পরিণত হয়।

;