কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১৭)



জিনি লকারবি ।। অনুবাদ: আলম খোরশেদ
অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

  • Font increase
  • Font Decrease

অই তো যায়, টু আ পেনি

(পূর্ব প্রকাশের পর) আমি যেসব বাড়তি জিনিস কেনাকাটা করেছিলাম সেগুলো বাঁধাছাঁদা করার জন্য বাক্স, দড়ি ইত্যাদি খুঁজে পেতে কী ঝক্কিটাই না পোহাতে হয়েছিল সেই বিকালে আমাদের। আমরা জানতাম না খাবারদাবারের কী অবস্থা হবে, তাই আমরা টিনের মার্জারিন, মাংস ও অন্যান্য জিনিসপত্র কিনে বোঝাই করে ফেলেছিলাম। পিআইএ এবং অতিথিনিবাসের আন্তরিক কর্মচারীদের সহযোগিতায় আমাদেরকে এবং আমাদের অতিরিক্ত ওজনের বাক্সপ্যাটরাদের তারা বিমানবন্দরের পথে রওনা করিয়ে দেয় সময়মতোই, হয়তো একটু আগেভাগেই। বাচ্চারা যথেষ্ট সময় পেয়েছিল ব্যাংকক বিমানবন্দরের বিশাল অপেক্ষাগৃহে হারিয়ে যাওয়ার। একটা বেড়ার ওপর থেকে তিন বছরের এক বাচ্চাকে উদ্ধার করে আনতে গিয়ে আমি শুনতে পাই একজন আমেরিকান ভদ্রলোক তাকে জিজ্ঞেস করছেন সে কোথায় যাচ্ছে। এতগুলো সপ্তাহের ভ্রমণে ছোট্ট এমি একটু বিভ্রান্ত হয়ে গিয়েছিল।
সে হাসিমুখে উত্তর দিল: “আমি ব্যাংকক যাচ্ছি।”

“না, তুমি ব্যাংককেই আছো। তুমি এখান থেকে কোথায় যাচ্ছো?”

তারপর তিনি পরবর্তী ক্ষুদে স্বর্ণকেশীর দিকে ফিরে একই প্রশ্ন করলেন, যার এর উত্তর জানা ছিল।

“আমরা ঢাকা যাচ্ছি, তারপর সেখান থেকে চিটাগাং।” সে তাকে বলে।

“আপনি কি এদের সঙ্গে সম্পর্কিত?” আমি কাছে গেলে তিনি আমাকে শুধান।

“আমরা সবাই এক সঙ্গেই ভ্রমণ করছি।” আমি ব্যাখ্যা করে বলি।

“ওহ।” তিনি বলেন। “আপনার সঙ্গে পরিচয় হয়ে ভালো লাগল, আমি পাকিস্তানে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত।”

যে-ক্ষমতাই আমাকে এই কথাটি, “হ্যাঁ এবং আমি মিসেস সান্তা ক্লস” (অথবা এরকম মজাদার কিছু একটা) বলা থেকে বিরত রাখে, তাকে আমি ধন্যবাদ দিই, কেননা এই সাদামাটা, মধ্যবিত্ত চেহারার মানুষটি আমার কল্পনার রাষ্ট্রদূতের ধারে কাছেও ছিলেন না। তারপর তিনি দ্রুত কাজে নেমে গেলেন একজন ভালো রাজনীতিবিদের মতো—সবার সঙ্গে হাত মেলান, বাচ্চাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন, দ্বিগুণ সংখ্যক নারীদের সঙ্গে ভ্রমণের সৌভাগ্যের জন্য পুরুষদের সঙ্গে ঠাট্টা করেন। তিনি অবশ্য একটা উদ্বেগজনক মন্তব্য করেই আমাদের কাছ থেকে বিদায় নেন।

“আমি অবাক হচ্ছি যে আপনারা ফেরত যাচ্ছেন। সবাই তো দেখি বেরিয়ে আসার জন্যই অস্থির।”

এবং আমরা সেই দেশে যাওয়ার বিমানেই উঠি যেখান থেকে সবাই বেরিয়ে আসতে চাইছে। আমাদের সব মালপত্রই বৈধ এবং আমাদের ঢাকায় নামার অনুমতি আছে, এটা শুল্ক কর্মকর্তাদের বোঝাতে বোঝাতে মধ্যরাত হয়ে যায়। বিমানবন্দরের কর্মীদের ধারণা ছিল, কারুরই বুঝি তখন ঢাকা বিমানবন্দরে নামার অনুমতি নেই।

আমরা চমৎকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে উঠি। কিন্তু এতটাই ক্লান্ত যে, তার গরমজলের সৌরভটুকু উপভোগ করতে পারি না। পরেরদিন একটু জরিপ করতে গিয়ে বুঝতে পারি, হোটেলটাকে একটা কবরস্থানের মতো দেখাচ্ছে, যা কিনা সম্প্রতি নানাবিধ কর্মকাণ্ডের একটি জমজমাট কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। দিনের শেষে ঢাকার অপর মিশনারিরা আমাদেরকে নিয়ে যেতে এলে আমরা চাপমুক্ত বোধ করি, এবং চারটা ভিন্ন ভিন্ন বাড়িতে বসে চাটগাঁ যাবার টিকিট ও অনুমতির অপেক্ষা করতে থাকি।

ডা: ওল্‌সেন একটা চিঠি লিখেছিলেন এবং আমাদের সম্ভাব্য ঢাকা আগমনের আগেই সেটা সেখানে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। সেই ‘প্রিয় বাহিনী’ সম্বোধন করা চিঠিটি অনেক শূন্যস্থান পূরণ ও আমাদের মনে খেলা করে যাওয়া অনেক প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিল।

১০ই মে ১৯৭১

প্রিয় বাহিনী,

রিড, ডন ও ভিকের তরফ থেকে শুভেচ্ছা। আমরা ভালো আছি, তোমাদের সবার অভাব বোধ করি খুব, তোমাদের কথা ভাবি ও প্রার্থনা করি সবসময়। তোমাদেরকে ছাড়া এখানে ঠিক মন বসছে না আমাদের। আমি চিঠি লিখছি চিটাগাং থেকে। এই প্রথমবার আমি এখানে এতদিন ধরে আছি। রিড তার অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে দিয়েছে এবং গুর্‌গানসের বাড়িতে চলে গেছে, যেটা সে অর্ধেক টাকায় ভাড়া নিতে পেরেছে। এটা গুর্‌গানসের নিজের ও তাঁর পরিচিত বিভিন্ন ব্যক্তির রেখে যাওয়া জিনিসপত্রে ঠাসা। আমি রিডের সঙ্গে এই কয়েক ঘণ্টার বন্ধুতা কী উপভোগই না করেছি। সে শহরের চতুর্দিকে ঘুরে ঘুরে সবাইকে উৎসাহ ও উপদেশ দিয়ে এবং একসাথে প্রার্থনা করে কী দারুণ কাজই না করছে। সে বাস্তব উপায়েও নানাভাবে নানান লোককে সাহায্য করে উঠতে পেরেছে।

২১শে এপ্রিল তোমাদের আচমকা বিদায়ের পরপরই আমি আমাদের দেশি সদস্যদের ডাকি। সভার শুরুতে ম্যাথুর ২৮ নম্বর শ্লোকের শেষদিকের সেই অসাধারণ অংশগুলোর উচ্চারণ আমাদের জন্য অনেক অর্থবহ ছিল। আমরা অবস্থার পর্যালোচনা করি এবং কয়েকটি সাময়িক সিদ্ধান্ত নিয়ে রাখি। সভার সবচেয়ে উৎকণ্ঠাময় মুহূর্তে একটি আকস্মিক কানফাটানো বিস্ফোরণের শব্দ সবাইকে জানালা, দরজা কিংবা খাটের তলার দিকে ধাবিত করে, যদিও সেটা স্রেফ একটা বজ্রপাতের শব্দ ছিল। আমি রোগী দেখে, কর্মচারীদের বুদ্ধি-পরামর্শ এবং রাতের পাহারার সময় বাড়িয়ে দিয়ে দিনটা কাটাই। দিনের অপরভাগে আরো কিছু ঘটনার কারণে রাত সাড়ে নয়টার দিকে একটা সভা ডাকা বুদ্ধিমানের কাজ হয়েছিল বটে। একটা ভয় ছিল যে, হাসপাতালের ধারে কাছেই বেশ বড়সড় যুদ্ধ হতে পারে। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, হাসপাতালের কর্মচারীদের হেব্রন ও অন্যান্য গ্রামে সরিয়ে নেওয়া হবে।

এপ্রিলের ২২ তারিখ আমরা আগের রাতের সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নে ভীষণ ব্যস্ত ছিলাম। আমার দুর্ঘটনাটি ঘটে সকাল বেলায়। আমি বেশ জোরেই আমার মোটরসাইকেলটা চালাচ্ছিলাম, গাড়ির মূল কাঠামোটায় হঠাৎ একটা ফাটল দেখা দেয় এবং তা মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে দু’টুকরো হয়ে যায়। এর পতনের সঙ্গে সঙ্গে আমিও রাস্তায় ছিটকে পড়ি এবং আমার ডান হাতের কনুই ভেঙে যায়। আমি কোনোমতে হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছাই, এক্সরে করাই এবং সেটা নিরীক্ষণ করে দেখি যে, হাড়টা বেশ জটিলভাবেই ভেঙেছে, যেটা সারাতে অপারেশন ও কিছু যন্ত্রপাতি লাগানোর প্রয়োজন হবে। ডনের ও আমার দিনের বেলায় অনেক কাজ ছিল, তাই আমরা অপারেশনের সময় নির্ধারণ করি রাত ৮টা। ডন অপারেশনে দারুণ কাজ করেছিল। (আমি আনন্দিত যে, তোমরা তার থাকার পক্ষে ভোট দিয়েছিলে।) পরের দিনও ছিল খুব ব্যস্ততায় ভরা। আমি ডেমেরলের প্রভাবে ঘুমিয়ে থাকি, তবে মধ্যসকালে আমার মাথা পরিষ্কার হয়ে ওঠে এবং আমি একটু নাড়াচাড়া করতে পারি, পরে তাদের কাজে খানিকটা সাহায্যও করতে পারি। কর্মচারী ও শরণার্থীদের হাসপাতাল প্রাঙ্গণ থেকে সরানোর কাজে ডন প্রায় একজন সেনা অধিনায়কের ভূমিকা পালন করে।

পরের সপ্তাহগুলোতে আমরা কম রোগী দেখেছিলাম, কম অ্যাডভেঞ্চার করেছিলাম এবং তোমাদের মিস করেছিলাম খুব। সব রোগী ছেড়ে দেওয়ার জন্য হাসপাতালটাকে তখন সমাধির মতো মনে হচ্ছিল। আমেরিকান ও পাকিস্তানি কর্মীদের বিদায়ের পর আমরা সশস্ত্র ডাকাতির ভয় পাচ্ছিলাম। আমরা রাতপ্রহরীদের সংখ্যা বাড়িয়ে দিই এবং তাদেরকে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করে তুলি। ঈশ্বরের কৃপায় যে-রাত থেকে অই আক্রমণের আশঙ্কা করছিলাম আমরা, ঠিক সে-রাতেই সারারাত বিদ্যুৎ ছিল এবং সেটা পরেও অব্যাহত থাকে।

সম্প্রতি আমরা একটা চোরও ধরি। কর্মচারীরা বিদায় নিয়ে চলে গেলে আমাদের পশ্চিম পাকিস্তানী কর্মীদের নিরাপত্তার জন্য তাদেরকে অন্যত্র সরিয়ে দেওয়া দরকার হয়ে পড়ে। সে-রাতে আমরা তাদেরকে আমাদের সঙ্গে কেচামের বাড়িতে নিয়ে আসি এবং মিলিটারিদের হাতে তাদেরকে নিরাপদে হস্তান্তর করা পর্যন্ত তারা আমাদের সঙ্গে সেখানেই ছিল। তাদের সেই কৃতজ্ঞতাবোধটুকু দেখার মতো ছিল। আমি যদিও অবিবাহিত জীবনের পক্ষে সাফাই গাইছি না, তবে আমি এই সময়টা ডনের সঙ্গ খুব উপভোগ করেছিলাম। সে একজন নিবন্ধক, ডাক্তার, সেবক, কোষাধ্যক্ষ, হিসাবরক্ষক, অষুধবিদ হিসাবে দারুণ কাজ করেছিল। সে আধ্যাত্মিক সাহায্য, উপদেশ ও শুশ্রূষা প্রদানের কোনো সুযোগ কখনো হাতছাড়া করেনি।

ডন একদিন দুটো ছাড়া-কুকুরকে গুলি করে এক রকম কেলেঙ্কারির জন্ম দেয়। গুলির শব্দে পার্শ্ববর্তী গ্রামের লোকজন সব পালিয়ে যায়। তারা ভেবেছিল যুদ্ধ তাদের গ্রামে এসে হাজির হয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধাদের পাঁচজনের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ ছিল। মে মাসের ৫ তারিখ পাকিস্তানি মিলিটারি হাসপাতালে এসে উপস্থিত হয়। পথে তারা কোনো বাধার সম্মুখেই পড়েনি। তারা এসে গাড়ি থামায় এবং একজন মেজর ও কর্নেল আমাদের সঙ্গে ত্রিশ মিনিটের মতো কথা বলে। সেই সভার সিদ্ধান্তসমূহ ছিল নিম্নরূপ:

• তারা হাসপাতাল দেখে খুশি এবং তারা চায় এটা খোলা এবং চালু থাকুক।

• তারা নিশ্চয়তা দেয় যে, ধর্ম নির্বিশেষে সকল কর্মচারীরই নিরাপত্তার বিধান করবে তারা।

• তারা আমাদের পরামর্শ দেয়, দেশি কর্মীদের ডেকে এনে কাজে লাগিয়ে দিতে।

মে মাসের ৫ তারিখের সেই সভার পরপরই হেব্রন থেকে এক দূত এসে চিঠি দেয় আমাদের, যাতে লেখা ছিল, সেই রাতেই সেখানে সশস্ত্র ডাকাতির শঙ্কা করা হচ্ছে। প্রভুর সাহায্যে সেখানে পুলিশি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়েছিল সে-রাতে এবং পরেরদিন সতেরোটি নৌকা দিয়ে তাদেরকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। একইভাবে আমরা জানতে পারি, আমাদের অপর কর্মচারীরা যারা জঙ্গলের অন্যত্র লুকিয়ে ছিল তারাও ডাকাতির ভয়ে ছিল। আমরা সঙ্গে সঙ্গে তাদেরকেও চলে আসার জন্য বার্তা পাঠিয়ে দিই। প্রভুর সময়বোধ কী চমৎকার! আমাদের লোকদের জন্য অসহনীয় ঝুঁকি ও বিপদের সম্ভাবনা দেখা দেওয়ামাত্রই মিলিটারির এসে হাজির হওয়া, দারুণ সব আশ্বাস এবং তাদেরকে ফিরিয়ে আনার অনুমতি দেওয়া আমাদের! হেব্রন থেকে আনা সতেরোটি নৌকায় লোক ছিল মোট ১২০ জন, সঙ্গে বেশ কিছু ছাগল, অগুনতি মুরগি আর পর্বতপ্রমাণ বোঁচকাপত্র। মে মাসের ৬ তারিখে ফিরে আসা এই শরণার্থীদের দলটি ছিল একটি অবসন্ন, কিন্তু উল্লসিত বাহিনী।

আমরা তোমাদের ফিরে আসার একটা পরিকল্পনা করেছি। এটা করা খুব সহজ ছিল না, যেহেতু আমরা তোমাদের ভিসার অবস্থা জানি না, এমনকি তোমরা কে কোথায় আছো সেটাও না। মে মাসের ৮ তারিখ আমি কনসাল জেনারেলের সঙ্গে ফোনে কথা বলি। আমি তোমাদের ফিরে আসার যে-সময়সীমা তাঁর কাছে উত্থাপন করি তিনি তা অনুমোদন করেন। তাঁর মন্তব্য অনুযায়ী, তাঁর প্রতিনিধিরা তোমাদের ব্যবহারে খুব মুগ্ধ ছিল। আমি তোমাদের প্রত্যেকের হয়ে একটু করে লজ্জা পাই, তাঁকে তাঁর সদয় বার্তার জন্য ধন্যবাদ দিই এবং বলি, আসলে গাড়িভরা এক চমৎকার মার্কিন প্রতিনিধিদলকে তিনি পাঠিয়েছিলেন আমাদের এখানে। এই পারস্পরিক তোষামোদ পর্বটি যখন বেশ ছেলেমানুষির পর্যায়ে চলে যাচ্ছিল, তখন আমরা কাজে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবি। তিনি তোমাদেরকে একটা বার্তা পাঠানোর কথা বলেন এবং আমি নিশ্চিত, তোমরা ইতোমধ্যে তোমাদের প্রত্যাবর্তনের একটা সময়সূচি পেয়ে গেছো।

আরও শ’খানেক প্রসঙ্গের বর্নণা দিতে পারতাম আমি, কিন্তু এই চিঠিকে তো এক জায়গায় থামতে হবে। আমরা তিনজন ঈশ্বরের কৃপা ও করুণার সাক্ষ্য দিই। প্রভু কিভাবে আমাদেরকে কঠিন পরিস্থিতিতে শক্তি যুগিয়েছিলেন এবং কঠিন সিদ্ধান্ত নেবার প্রজ্ঞাও। আজকে একটি সুদূরপ্রসারী অভিঘাতসম্পন্ন জটিল সমস্যা তাৎক্ষণিক সমাধান দাবি করেছিল। আমাদের হাসপাতালের জনসংযোগ কর্মকর্তা ও আমি একটি গাড়িতে উঠি, ইঞ্জিন যখন চালু হবার জন্য সময় নিচ্ছিল তখন আমরা একসঙ্গে প্রার্থনা করি, তারপর আমরা রওনা হই। এবং ঈশ্বর আমাদের কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশার বাইরেও আমাদের হয়ে কাজ করেছিলেন। আমাদের সেই অফিসার বলেন, “ঈশ্বর আমাদের জন্য কী চমৎকার কাজই না করেছেন। আমরা তাঁর দারুণ সহায়তার জন্য, আবার যেন প্রার্থনা করতে এবং তাঁকে ধন্যবাদ জানাতে ভুলে না যাই।” আমরা তোমাদের সেই ভোটের জন্য কৃতজ্ঞ, যা আমাদেরকে ঈশ্বরের আহ্বানে সাড়া দিয়ে এমন এক অভূতপূর্ব সময়ে এখানে থাকার সুযোগ করে দিয়েছিল।

ঈশ্বর তোমাদের প্রত্যেকের মঙ্গল করুন।

যিশুর ভালোবাসায়,

ভিক

জুনের ৩ তারিখের সকালের মধ্যে সবকিছু গোছানো হয়ে যায় এবং আমরা দিনের শেষ বিমানে উঠি, চট্টগ্রামগামী সেই চল্লিশ মিনিটের উড়ানে। আমরা ফোন করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু লাইন কাটা ছিল। আমরা একটা বার্তা পাঠিয়েছিলাম, কিন্তু সেই টেলিগ্রাম কখনো পৌঁছায়নি। পরিণতিতে, বিমানবন্দরে কেউ আসেনি আমাদের নিতে। ভাগ্যক্রমে পিআইএ তাদের বাস ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিল আমাদের, এবং তার ড্রাইভার আমাদেরকে মিশন গেস্টহাউস পর্যন্ত নিয়ে যায়। বাইরের দরজায় শেকল ও তালা লাগানো ছিল, ফলে সে আমাদেরকে একেবারে অফিস পর্যন্ত নিয়ে যায়। দারোয়ান জানায় যে, যার কাছে সবকিছুর চাবি থাকে সেই রিড মিনিখ সকালে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেছেন—বাজে এক রাস্তার পঁয়ষট্টি মাইল দূরত্বে অবস্থিত যা। বাস ড্রাইভার ত্রাণকারীর ভূমিকা পালন করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল, তাই ঘোষণা দিল, সে আমাদেরকে শহরে পিআইএর অফিসে নিয়ে যাবে এবং সেখানেই আমাদেরকে নেমে যেতে হবে। সেটা ঠিক ছিল। সেই অফিস আমাদের বাসা থেকে দুয়েক মিনিটের পথ মাত্র। একটা তিনচাকার বেবিট্যাক্সিতে চেপে আমরা আমাদের বাসায় যাই। বাঙালিদের মাঝখানে ফিরতে পেরে আমি এতটা উত্তেজিত ছিলাম যে, বারান্দায় এক বৃদ্ধাকে দেখে আমি তাকে আলিঙ্গন করি। পরে আমি ভাবতে থাকি, সে কে ছিল এবং কী করছিল সেখানে।

ততক্ষণে দুপুর হয়ে গেছে এবং আমরা সবাই ক্ষুধার্ত। রিডের কাছে আমাদের বাড়ির চাবিখানাও ছিল, কিন্তু আমার পার্সের ভেতরে একটা বাড়তি চাবি লুকানো ছিল রান্নাঘরের, যেখানে আমরা টিনভর্তি খাবারদাবারগুলো রাখি। কোনার দোকানে রুটি পাওয়া যেত। টিনের মাংসের স্যান্ডউইচ, স্যুপের প্যাকেট, গরম কোক, তা-ও সেই কোনার দোকান থেকেই আনা, দিয়ে সবার মোটামুটি খাওয়া হয়ে যায়। পুরুষেরা একটা বাস ধরে আনে, যেটাতে করে হাসপাতালের কর্মচারীরা মালুমঘাটে চলে যেতে পারবে। দুপুর দুটা নাগাদ ‘বাহিনীটা’ ভেঙে যায় চিরস্থায়ীভাবে।

লিন আর আমি বসার ঘরের মেঝেতে বসে, আমরা-যে ফিরে এসেছি সে-বিষয়ে ধাতস্থ হবার চেষ্টা করি। নিজেদের ঘরে যাবার চাবি ছিল না আমাদের কাছে, তবে আমরা বাড়িতে একা ছিলাম না। জব্বারের বউ ও দুই ছেলে আমাদের কয়েকদিন আগে ফিরেছিল। তারা আমাদের সঙ্গে হাসপাতালে গিয়েছিল আমরা যখন শহর ছাড়ি, এবং সেখান থেকে নৌকা করে হেব্রনের সেই জঙ্গল-কেন্দ্রে পালিয়েছিল, এবং আবারও হাসপাতালে ফিরে এসেছিল যখন ডাকাতির বিপদ দেখা দেয়। এখন তারা আমাদের বাড়িতে ফিরেছে ফের। বৃদ্ধাটি তাদেরই কোনো পরিচিত, যে-এখানে থাকছিল, গ্রাম থেকে বাবা-মায়ের খবর নিয়ে জব্বারের ফিরে না আসা পর্যন্ত।

বাঙালিরা। আমাদের লোক। আমরা বাড়ি ফিরে এসেছি।

কিন্তু তখনও এটি ‘জয় বাংলা’র দেশ হয়ে ওঠেনি। [চলবে]


কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১৬)
কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১৫)
কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১৪)
কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১৩)
কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১২)

   

কোরবানি



শাহেদ শফিক
কোরবানি

কোরবানি

  • Font increase
  • Font Decrease

আমি তো হাজির হে আমার রব
তোমার প্রিয় ঘরে
উজাড় করে দিতে পারি সব
প্রভু তোমার তরে।

নত মনে আজ তোমার চরণে
সঁপেছি এই শীর
তুমি তো মহান, চির অম্লান,
মালিক ধরিত্রীর।

আজ দূর হয়ে যাক মনের পশু
ধুয়ে যাক সব জিদ
জাগ্রত হোক কণ্ঠে সবার
বাজুক তোমার গিদ।

তুমি তো আমায় দিয়েছিলে রব
জগতের সব কিছু।
আমি তো ছুটেছি জীবন জুড়ে
পাপের পিছু পিছু।

কী দিয়ে তোমার, সুধিবো ঋণ
নেই যে কিছু আর
তাই তো প্রভু তোমার সকাসে
ছুটি বারং বার।

আজ দূর হয়ে যাক সব বেধাবেধ
পড়রে কালিমা
হিংসা বিভেদ, ফাসাদ ভুলিয়া
ছড়াক মহিমা।

১৭ জুন ২০২৪।
লন্ডন, যুক্তরাজ্য।

;

কদম



আকিব শিকদার
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ঋতুটি শরৎ এখন পঞ্জিকার পাতায়।
বর্ষার আমেজ কাটেনি বুঝি, সারাটি আকাশ
কালো করে নামে বৃষ্টি।
একটানা ভিজে শালবন, মহুয়ার কিশলয়। সতেজ হয়-
লতানো পুঁইয়ের ডগা।

এ বর্ষণ দেখার সৌভাগ্য আমার নেই। দূর পরবাসে
বসে আমি ভাবি- আহ, কি সহজেই ভুলে গেলাম, ভুলে গেলাম
প্রিয় ফুল কদমের কথা...!
পড়ার টেবিলে দুটো কদম, আষাঢ় শ্রাবণে তরতাজা দুটো কদম
জিইয়ে রেখেছি কতো-
কাচের বোতলে। ভেজা বাতাসে কদমের হালকা সুবাস।
তিনটে বছর, মাত্র তিনটে বছর
ভুলিয়ে দিলো চব্বিশ বছরের বর্ষার স্মৃতি, যেন চব্বিশ বছর
পরাজিত তিন বছরের পাল্লায়।

পরিজন ফোন করে খবর নিতে- ‘কি পাঠাবো বল...?
কাঠালের বিচি ভাজা, চিনে বাদাম, ঝুনা নারকেল
নাকি আমের আচার...?’-ওদের তালিকায়
আমার পছন্দ অনুপস্থিত।

সাহেবদের বিলেতী ফুলের ভীড়ে
ঠাঁই নেই কদমের-
যেমন আছে কাঁদা মাটির সুঁদাগন্ধ ভরা বাংলায়।
ক্যালেণ্ডারের পাতায় দেখি
ফুটফুটে কদমের শ্বেত রেণু বিনিময়, আর অন্তরে অনুভবে
রূপ-রস-গন্ধ।

;

একগুচ্ছ কবিতা



মাহফুজ পারভেজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

পরাবাস্তবতা-জাদুবাস্তবতা
আপাতদৃষ্টিতে অবাস্তব অথচ বাস্তবের অধিক
অসম্ভব তবু প্রতিনিয়ত সম্ভাবনার শঙ্কা জাগায়
তারই নাম পরাবাস্তবতা
অন্যভাবে বলতে জাদুবাস্তবতা:
যেমন, এই যে আশ্চর্য সকাল
এর কতtটুকু তুমি দেখো
কতটুকু আমি
আর কতটুকু দিগন্তের ওপাশে অদেখার!
জলের উপর একলা মুখ ঝুঁকিয়ে থাকা
শেষবিকেলের মর্মবেদনা জানে
শিরীষ কিংবা কৃষ্ণচূড়ার ভাসমান পাতা
তুমি আর আমি কতটুকু জানি!
অর্থবোধ্য সীমানা পেরিয়ে
আমাদের যাতায়াত নেই
এমন কোনো ঠিকানায়
যার দিক নেই, চিহ্ন নেই, প্রতীক নেই!

সম্পর্ক

প্রিজমের টুকরোয় ছিটকে পড়া আলোয়
অধ্যয়ন করছি সম্পর্ক
সম্পর্কের উত্থান-পতন
বাঁক ও শিহরণ
লগ-ইন বা লগ-আউটে
নিত্য জন্মাচ্ছে নতুন সম্পর্ক
সম্পর্কের বিভিন্ন রং
লিখে লিখে মুছে দিচ্ছে ফেসবুক
সন্তরণশীল সম্পর্ক খেলা করছে
মানুষের জীবনের বহুদূরের ভার্চুয়ালে
সম্পর্ক হয়ে গেছে স্বপ্নময় জগতে
মনকে জাগ্রত রাখার কৌশল

জোনাকি

দূরমনস্ক দার্শনিকতায়
রাতের পথে যারা আসে
তারা যাবে দিগন্তের দিকে
আত্মমগ্ন পথিক-পায়ে।
এইসব পদাতিকের অনেকেই আর ফিরবে না
ফিরে আসবে অন্য কেউ
তার চিন্তা ও গমনের ট্র্যাপিজ ছুঁয়ে
অন্য চেহারায়, অন্য নামে ও অবয়বে।
তারপর
গাঢ় অন্ধকারের মধ্যে সরল রেখায়
আলোর মশালে জ্বলে উঠবে
অনুভবের অসংখ্য জোনাকি।

নিঃসঙ্গতা

নিঃসঙ্গতা শীতের কুয়াশার মতো প্রগাঢ়
তমসাচারী মৃত পাখির নিঃশব্দ কুহুতান-স্মৃতি
নিহত নদীর শ্যাওলাজড়ানো জলকণা
দাবানল-দগ্ধ বনমর্মর:
মায়ায় মুখ আড়াল করে অনন্য বিমূর্ত বিবরে
নিঃসঙ্গতা কল্পলোকে রঙ মাখে
নীলাভ স্বপ্নের দ্যুতিতে
অস্তিত্বে, অনুভবে, মগ্নচৈতন্যে:
জীবনের স্টেজ অ্যান্ড স্ক্রিনে!

আর্কিওপটেরিক্স

পনেরো কোটি বছরের পাথরশয্যা ছেড়ে তিনি
প্রত্নজীববিদের টেবিলে চলে এলেন:
পক্ষী জীবাশ্ম দেখে প্রশ্ন শুরু হলো পৃথিবীময়
‘ডানার হলেই তাকে পাখি বলতে হবে?‘
তাহলে ‘ফ্লাইং ডাইনোসরস‘ কি?
তাদের শরীরে রয়েছে ডানা, কারো কারো দুই জোড়া!
পাখি, একলা পাখি, ভাবের পাখি খুঁজতে খুঁজতে হয়রান
বিজ্ঞানী থেকে বিপ্লবী কবিগণ
আর্কিওপটেরিক্স কি পাখির আদি-জননী?

;

কবি অসীম সাহা আর নেই



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি অসীম সাহা মারা গেছেন। ৭৫ বছর বয়সে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান বাংলা সাহিত্যের এই খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব।

মঙ্গলবার (১৮ জুন) বিকেলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

বিষযটি নিশ্চিত করেছেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ও কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

তিনি জানান, মাঝখানে দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর অসীম সাহা মোটামুটি সুস্থই ছিলেন। অল্প ক’দিন আগেই আমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। আজ শুনি তিনি আর নেই। বর্তমানে অসীম সাহাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে রাখা হয়েছে। তাকে দেখতে সেখানেই যাচ্ছি।

অসীম সাহার শেষকৃত্য সম্পর্কে তাঁর ছোট ছেলে অর্ঘ্য সাহা বলেন, তাঁর বাবা মরদেহ দান করে দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে গেছেন।

চলতি বছরের শুরুর দিকেই গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন কবি অসীম সাহা। চিকিৎসকরা তখন জানিয়েছিলেন, বিষণ্নতায় ভুগছেন কবি। এছাড়া পারকিনসন (হাত কাঁপা রোগ), কোষ্ঠকাঠিন্য ও ডায়াবেটিস রোগেও আক্রান্ত হন।

১৯৪৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি নানারবাড়ি নেত্রকোণা জেলায় জন্ম গ্রহণ করেন কবি অসীম সাহা। পড়াশোনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা সাহিত্য বিভাগে। সামগ্রিকভাবে সাহিত্যে অবদানের জন্য ২০১২ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। পরে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য ২০১৯ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত করে।

;