কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১৭)



জিনি লকারবি ।। অনুবাদ: আলম খোরশেদ
অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

  • Font increase
  • Font Decrease

অই তো যায়, টু আ পেনি

(পূর্ব প্রকাশের পর) আমি যেসব বাড়তি জিনিস কেনাকাটা করেছিলাম সেগুলো বাঁধাছাঁদা করার জন্য বাক্স, দড়ি ইত্যাদি খুঁজে পেতে কী ঝক্কিটাই না পোহাতে হয়েছিল সেই বিকালে আমাদের। আমরা জানতাম না খাবারদাবারের কী অবস্থা হবে, তাই আমরা টিনের মার্জারিন, মাংস ও অন্যান্য জিনিসপত্র কিনে বোঝাই করে ফেলেছিলাম। পিআইএ এবং অতিথিনিবাসের আন্তরিক কর্মচারীদের সহযোগিতায় আমাদেরকে এবং আমাদের অতিরিক্ত ওজনের বাক্সপ্যাটরাদের তারা বিমানবন্দরের পথে রওনা করিয়ে দেয় সময়মতোই, হয়তো একটু আগেভাগেই। বাচ্চারা যথেষ্ট সময় পেয়েছিল ব্যাংকক বিমানবন্দরের বিশাল অপেক্ষাগৃহে হারিয়ে যাওয়ার। একটা বেড়ার ওপর থেকে তিন বছরের এক বাচ্চাকে উদ্ধার করে আনতে গিয়ে আমি শুনতে পাই একজন আমেরিকান ভদ্রলোক তাকে জিজ্ঞেস করছেন সে কোথায় যাচ্ছে। এতগুলো সপ্তাহের ভ্রমণে ছোট্ট এমি একটু বিভ্রান্ত হয়ে গিয়েছিল।
সে হাসিমুখে উত্তর দিল: “আমি ব্যাংকক যাচ্ছি।”

“না, তুমি ব্যাংককেই আছো। তুমি এখান থেকে কোথায় যাচ্ছো?”

তারপর তিনি পরবর্তী ক্ষুদে স্বর্ণকেশীর দিকে ফিরে একই প্রশ্ন করলেন, যার এর উত্তর জানা ছিল।

“আমরা ঢাকা যাচ্ছি, তারপর সেখান থেকে চিটাগাং।” সে তাকে বলে।

“আপনি কি এদের সঙ্গে সম্পর্কিত?” আমি কাছে গেলে তিনি আমাকে শুধান।

“আমরা সবাই এক সঙ্গেই ভ্রমণ করছি।” আমি ব্যাখ্যা করে বলি।

“ওহ।” তিনি বলেন। “আপনার সঙ্গে পরিচয় হয়ে ভালো লাগল, আমি পাকিস্তানে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত।”

যে-ক্ষমতাই আমাকে এই কথাটি, “হ্যাঁ এবং আমি মিসেস সান্তা ক্লস” (অথবা এরকম মজাদার কিছু একটা) বলা থেকে বিরত রাখে, তাকে আমি ধন্যবাদ দিই, কেননা এই সাদামাটা, মধ্যবিত্ত চেহারার মানুষটি আমার কল্পনার রাষ্ট্রদূতের ধারে কাছেও ছিলেন না। তারপর তিনি দ্রুত কাজে নেমে গেলেন একজন ভালো রাজনীতিবিদের মতো—সবার সঙ্গে হাত মেলান, বাচ্চাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন, দ্বিগুণ সংখ্যক নারীদের সঙ্গে ভ্রমণের সৌভাগ্যের জন্য পুরুষদের সঙ্গে ঠাট্টা করেন। তিনি অবশ্য একটা উদ্বেগজনক মন্তব্য করেই আমাদের কাছ থেকে বিদায় নেন।

“আমি অবাক হচ্ছি যে আপনারা ফেরত যাচ্ছেন। সবাই তো দেখি বেরিয়ে আসার জন্যই অস্থির।”

এবং আমরা সেই দেশে যাওয়ার বিমানেই উঠি যেখান থেকে সবাই বেরিয়ে আসতে চাইছে। আমাদের সব মালপত্রই বৈধ এবং আমাদের ঢাকায় নামার অনুমতি আছে, এটা শুল্ক কর্মকর্তাদের বোঝাতে বোঝাতে মধ্যরাত হয়ে যায়। বিমানবন্দরের কর্মীদের ধারণা ছিল, কারুরই বুঝি তখন ঢাকা বিমানবন্দরে নামার অনুমতি নেই।

আমরা চমৎকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে উঠি। কিন্তু এতটাই ক্লান্ত যে, তার গরমজলের সৌরভটুকু উপভোগ করতে পারি না। পরেরদিন একটু জরিপ করতে গিয়ে বুঝতে পারি, হোটেলটাকে একটা কবরস্থানের মতো দেখাচ্ছে, যা কিনা সম্প্রতি নানাবিধ কর্মকাণ্ডের একটি জমজমাট কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। দিনের শেষে ঢাকার অপর মিশনারিরা আমাদেরকে নিয়ে যেতে এলে আমরা চাপমুক্ত বোধ করি, এবং চারটা ভিন্ন ভিন্ন বাড়িতে বসে চাটগাঁ যাবার টিকিট ও অনুমতির অপেক্ষা করতে থাকি।

ডা: ওল্‌সেন একটা চিঠি লিখেছিলেন এবং আমাদের সম্ভাব্য ঢাকা আগমনের আগেই সেটা সেখানে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। সেই ‘প্রিয় বাহিনী’ সম্বোধন করা চিঠিটি অনেক শূন্যস্থান পূরণ ও আমাদের মনে খেলা করে যাওয়া অনেক প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিল।

১০ই মে ১৯৭১

প্রিয় বাহিনী,

রিড, ডন ও ভিকের তরফ থেকে শুভেচ্ছা। আমরা ভালো আছি, তোমাদের সবার অভাব বোধ করি খুব, তোমাদের কথা ভাবি ও প্রার্থনা করি সবসময়। তোমাদেরকে ছাড়া এখানে ঠিক মন বসছে না আমাদের। আমি চিঠি লিখছি চিটাগাং থেকে। এই প্রথমবার আমি এখানে এতদিন ধরে আছি। রিড তার অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে দিয়েছে এবং গুর্‌গানসের বাড়িতে চলে গেছে, যেটা সে অর্ধেক টাকায় ভাড়া নিতে পেরেছে। এটা গুর্‌গানসের নিজের ও তাঁর পরিচিত বিভিন্ন ব্যক্তির রেখে যাওয়া জিনিসপত্রে ঠাসা। আমি রিডের সঙ্গে এই কয়েক ঘণ্টার বন্ধুতা কী উপভোগই না করেছি। সে শহরের চতুর্দিকে ঘুরে ঘুরে সবাইকে উৎসাহ ও উপদেশ দিয়ে এবং একসাথে প্রার্থনা করে কী দারুণ কাজই না করছে। সে বাস্তব উপায়েও নানাভাবে নানান লোককে সাহায্য করে উঠতে পেরেছে।

২১শে এপ্রিল তোমাদের আচমকা বিদায়ের পরপরই আমি আমাদের দেশি সদস্যদের ডাকি। সভার শুরুতে ম্যাথুর ২৮ নম্বর শ্লোকের শেষদিকের সেই অসাধারণ অংশগুলোর উচ্চারণ আমাদের জন্য অনেক অর্থবহ ছিল। আমরা অবস্থার পর্যালোচনা করি এবং কয়েকটি সাময়িক সিদ্ধান্ত নিয়ে রাখি। সভার সবচেয়ে উৎকণ্ঠাময় মুহূর্তে একটি আকস্মিক কানফাটানো বিস্ফোরণের শব্দ সবাইকে জানালা, দরজা কিংবা খাটের তলার দিকে ধাবিত করে, যদিও সেটা স্রেফ একটা বজ্রপাতের শব্দ ছিল। আমি রোগী দেখে, কর্মচারীদের বুদ্ধি-পরামর্শ এবং রাতের পাহারার সময় বাড়িয়ে দিয়ে দিনটা কাটাই। দিনের অপরভাগে আরো কিছু ঘটনার কারণে রাত সাড়ে নয়টার দিকে একটা সভা ডাকা বুদ্ধিমানের কাজ হয়েছিল বটে। একটা ভয় ছিল যে, হাসপাতালের ধারে কাছেই বেশ বড়সড় যুদ্ধ হতে পারে। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, হাসপাতালের কর্মচারীদের হেব্রন ও অন্যান্য গ্রামে সরিয়ে নেওয়া হবে।

এপ্রিলের ২২ তারিখ আমরা আগের রাতের সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নে ভীষণ ব্যস্ত ছিলাম। আমার দুর্ঘটনাটি ঘটে সকাল বেলায়। আমি বেশ জোরেই আমার মোটরসাইকেলটা চালাচ্ছিলাম, গাড়ির মূল কাঠামোটায় হঠাৎ একটা ফাটল দেখা দেয় এবং তা মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে দু’টুকরো হয়ে যায়। এর পতনের সঙ্গে সঙ্গে আমিও রাস্তায় ছিটকে পড়ি এবং আমার ডান হাতের কনুই ভেঙে যায়। আমি কোনোমতে হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছাই, এক্সরে করাই এবং সেটা নিরীক্ষণ করে দেখি যে, হাড়টা বেশ জটিলভাবেই ভেঙেছে, যেটা সারাতে অপারেশন ও কিছু যন্ত্রপাতি লাগানোর প্রয়োজন হবে। ডনের ও আমার দিনের বেলায় অনেক কাজ ছিল, তাই আমরা অপারেশনের সময় নির্ধারণ করি রাত ৮টা। ডন অপারেশনে দারুণ কাজ করেছিল। (আমি আনন্দিত যে, তোমরা তার থাকার পক্ষে ভোট দিয়েছিলে।) পরের দিনও ছিল খুব ব্যস্ততায় ভরা। আমি ডেমেরলের প্রভাবে ঘুমিয়ে থাকি, তবে মধ্যসকালে আমার মাথা পরিষ্কার হয়ে ওঠে এবং আমি একটু নাড়াচাড়া করতে পারি, পরে তাদের কাজে খানিকটা সাহায্যও করতে পারি। কর্মচারী ও শরণার্থীদের হাসপাতাল প্রাঙ্গণ থেকে সরানোর কাজে ডন প্রায় একজন সেনা অধিনায়কের ভূমিকা পালন করে।

পরের সপ্তাহগুলোতে আমরা কম রোগী দেখেছিলাম, কম অ্যাডভেঞ্চার করেছিলাম এবং তোমাদের মিস করেছিলাম খুব। সব রোগী ছেড়ে দেওয়ার জন্য হাসপাতালটাকে তখন সমাধির মতো মনে হচ্ছিল। আমেরিকান ও পাকিস্তানি কর্মীদের বিদায়ের পর আমরা সশস্ত্র ডাকাতির ভয় পাচ্ছিলাম। আমরা রাতপ্রহরীদের সংখ্যা বাড়িয়ে দিই এবং তাদেরকে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করে তুলি। ঈশ্বরের কৃপায় যে-রাত থেকে অই আক্রমণের আশঙ্কা করছিলাম আমরা, ঠিক সে-রাতেই সারারাত বিদ্যুৎ ছিল এবং সেটা পরেও অব্যাহত থাকে।

সম্প্রতি আমরা একটা চোরও ধরি। কর্মচারীরা বিদায় নিয়ে চলে গেলে আমাদের পশ্চিম পাকিস্তানী কর্মীদের নিরাপত্তার জন্য তাদেরকে অন্যত্র সরিয়ে দেওয়া দরকার হয়ে পড়ে। সে-রাতে আমরা তাদেরকে আমাদের সঙ্গে কেচামের বাড়িতে নিয়ে আসি এবং মিলিটারিদের হাতে তাদেরকে নিরাপদে হস্তান্তর করা পর্যন্ত তারা আমাদের সঙ্গে সেখানেই ছিল। তাদের সেই কৃতজ্ঞতাবোধটুকু দেখার মতো ছিল। আমি যদিও অবিবাহিত জীবনের পক্ষে সাফাই গাইছি না, তবে আমি এই সময়টা ডনের সঙ্গ খুব উপভোগ করেছিলাম। সে একজন নিবন্ধক, ডাক্তার, সেবক, কোষাধ্যক্ষ, হিসাবরক্ষক, অষুধবিদ হিসাবে দারুণ কাজ করেছিল। সে আধ্যাত্মিক সাহায্য, উপদেশ ও শুশ্রূষা প্রদানের কোনো সুযোগ কখনো হাতছাড়া করেনি।

ডন একদিন দুটো ছাড়া-কুকুরকে গুলি করে এক রকম কেলেঙ্কারির জন্ম দেয়। গুলির শব্দে পার্শ্ববর্তী গ্রামের লোকজন সব পালিয়ে যায়। তারা ভেবেছিল যুদ্ধ তাদের গ্রামে এসে হাজির হয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধাদের পাঁচজনের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ ছিল। মে মাসের ৫ তারিখ পাকিস্তানি মিলিটারি হাসপাতালে এসে উপস্থিত হয়। পথে তারা কোনো বাধার সম্মুখেই পড়েনি। তারা এসে গাড়ি থামায় এবং একজন মেজর ও কর্নেল আমাদের সঙ্গে ত্রিশ মিনিটের মতো কথা বলে। সেই সভার সিদ্ধান্তসমূহ ছিল নিম্নরূপ:

• তারা হাসপাতাল দেখে খুশি এবং তারা চায় এটা খোলা এবং চালু থাকুক।

• তারা নিশ্চয়তা দেয় যে, ধর্ম নির্বিশেষে সকল কর্মচারীরই নিরাপত্তার বিধান করবে তারা।

• তারা আমাদের পরামর্শ দেয়, দেশি কর্মীদের ডেকে এনে কাজে লাগিয়ে দিতে।

মে মাসের ৫ তারিখের সেই সভার পরপরই হেব্রন থেকে এক দূত এসে চিঠি দেয় আমাদের, যাতে লেখা ছিল, সেই রাতেই সেখানে সশস্ত্র ডাকাতির শঙ্কা করা হচ্ছে। প্রভুর সাহায্যে সেখানে পুলিশি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়েছিল সে-রাতে এবং পরেরদিন সতেরোটি নৌকা দিয়ে তাদেরকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। একইভাবে আমরা জানতে পারি, আমাদের অপর কর্মচারীরা যারা জঙ্গলের অন্যত্র লুকিয়ে ছিল তারাও ডাকাতির ভয়ে ছিল। আমরা সঙ্গে সঙ্গে তাদেরকেও চলে আসার জন্য বার্তা পাঠিয়ে দিই। প্রভুর সময়বোধ কী চমৎকার! আমাদের লোকদের জন্য অসহনীয় ঝুঁকি ও বিপদের সম্ভাবনা দেখা দেওয়ামাত্রই মিলিটারির এসে হাজির হওয়া, দারুণ সব আশ্বাস এবং তাদেরকে ফিরিয়ে আনার অনুমতি দেওয়া আমাদের! হেব্রন থেকে আনা সতেরোটি নৌকায় লোক ছিল মোট ১২০ জন, সঙ্গে বেশ কিছু ছাগল, অগুনতি মুরগি আর পর্বতপ্রমাণ বোঁচকাপত্র। মে মাসের ৬ তারিখে ফিরে আসা এই শরণার্থীদের দলটি ছিল একটি অবসন্ন, কিন্তু উল্লসিত বাহিনী।

আমরা তোমাদের ফিরে আসার একটা পরিকল্পনা করেছি। এটা করা খুব সহজ ছিল না, যেহেতু আমরা তোমাদের ভিসার অবস্থা জানি না, এমনকি তোমরা কে কোথায় আছো সেটাও না। মে মাসের ৮ তারিখ আমি কনসাল জেনারেলের সঙ্গে ফোনে কথা বলি। আমি তোমাদের ফিরে আসার যে-সময়সীমা তাঁর কাছে উত্থাপন করি তিনি তা অনুমোদন করেন। তাঁর মন্তব্য অনুযায়ী, তাঁর প্রতিনিধিরা তোমাদের ব্যবহারে খুব মুগ্ধ ছিল। আমি তোমাদের প্রত্যেকের হয়ে একটু করে লজ্জা পাই, তাঁকে তাঁর সদয় বার্তার জন্য ধন্যবাদ দিই এবং বলি, আসলে গাড়িভরা এক চমৎকার মার্কিন প্রতিনিধিদলকে তিনি পাঠিয়েছিলেন আমাদের এখানে। এই পারস্পরিক তোষামোদ পর্বটি যখন বেশ ছেলেমানুষির পর্যায়ে চলে যাচ্ছিল, তখন আমরা কাজে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবি। তিনি তোমাদেরকে একটা বার্তা পাঠানোর কথা বলেন এবং আমি নিশ্চিত, তোমরা ইতোমধ্যে তোমাদের প্রত্যাবর্তনের একটা সময়সূচি পেয়ে গেছো।

আরও শ’খানেক প্রসঙ্গের বর্নণা দিতে পারতাম আমি, কিন্তু এই চিঠিকে তো এক জায়গায় থামতে হবে। আমরা তিনজন ঈশ্বরের কৃপা ও করুণার সাক্ষ্য দিই। প্রভু কিভাবে আমাদেরকে কঠিন পরিস্থিতিতে শক্তি যুগিয়েছিলেন এবং কঠিন সিদ্ধান্ত নেবার প্রজ্ঞাও। আজকে একটি সুদূরপ্রসারী অভিঘাতসম্পন্ন জটিল সমস্যা তাৎক্ষণিক সমাধান দাবি করেছিল। আমাদের হাসপাতালের জনসংযোগ কর্মকর্তা ও আমি একটি গাড়িতে উঠি, ইঞ্জিন যখন চালু হবার জন্য সময় নিচ্ছিল তখন আমরা একসঙ্গে প্রার্থনা করি, তারপর আমরা রওনা হই। এবং ঈশ্বর আমাদের কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশার বাইরেও আমাদের হয়ে কাজ করেছিলেন। আমাদের সেই অফিসার বলেন, “ঈশ্বর আমাদের জন্য কী চমৎকার কাজই না করেছেন। আমরা তাঁর দারুণ সহায়তার জন্য, আবার যেন প্রার্থনা করতে এবং তাঁকে ধন্যবাদ জানাতে ভুলে না যাই।” আমরা তোমাদের সেই ভোটের জন্য কৃতজ্ঞ, যা আমাদেরকে ঈশ্বরের আহ্বানে সাড়া দিয়ে এমন এক অভূতপূর্ব সময়ে এখানে থাকার সুযোগ করে দিয়েছিল।

ঈশ্বর তোমাদের প্রত্যেকের মঙ্গল করুন।

যিশুর ভালোবাসায়,

ভিক

জুনের ৩ তারিখের সকালের মধ্যে সবকিছু গোছানো হয়ে যায় এবং আমরা দিনের শেষ বিমানে উঠি, চট্টগ্রামগামী সেই চল্লিশ মিনিটের উড়ানে। আমরা ফোন করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু লাইন কাটা ছিল। আমরা একটা বার্তা পাঠিয়েছিলাম, কিন্তু সেই টেলিগ্রাম কখনো পৌঁছায়নি। পরিণতিতে, বিমানবন্দরে কেউ আসেনি আমাদের নিতে। ভাগ্যক্রমে পিআইএ তাদের বাস ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিল আমাদের, এবং তার ড্রাইভার আমাদেরকে মিশন গেস্টহাউস পর্যন্ত নিয়ে যায়। বাইরের দরজায় শেকল ও তালা লাগানো ছিল, ফলে সে আমাদেরকে একেবারে অফিস পর্যন্ত নিয়ে যায়। দারোয়ান জানায় যে, যার কাছে সবকিছুর চাবি থাকে সেই রিড মিনিখ সকালে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেছেন—বাজে এক রাস্তার পঁয়ষট্টি মাইল দূরত্বে অবস্থিত যা। বাস ড্রাইভার ত্রাণকারীর ভূমিকা পালন করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল, তাই ঘোষণা দিল, সে আমাদেরকে শহরে পিআইএর অফিসে নিয়ে যাবে এবং সেখানেই আমাদেরকে নেমে যেতে হবে। সেটা ঠিক ছিল। সেই অফিস আমাদের বাসা থেকে দুয়েক মিনিটের পথ মাত্র। একটা তিনচাকার বেবিট্যাক্সিতে চেপে আমরা আমাদের বাসায় যাই। বাঙালিদের মাঝখানে ফিরতে পেরে আমি এতটা উত্তেজিত ছিলাম যে, বারান্দায় এক বৃদ্ধাকে দেখে আমি তাকে আলিঙ্গন করি। পরে আমি ভাবতে থাকি, সে কে ছিল এবং কী করছিল সেখানে।

ততক্ষণে দুপুর হয়ে গেছে এবং আমরা সবাই ক্ষুধার্ত। রিডের কাছে আমাদের বাড়ির চাবিখানাও ছিল, কিন্তু আমার পার্সের ভেতরে একটা বাড়তি চাবি লুকানো ছিল রান্নাঘরের, যেখানে আমরা টিনভর্তি খাবারদাবারগুলো রাখি। কোনার দোকানে রুটি পাওয়া যেত। টিনের মাংসের স্যান্ডউইচ, স্যুপের প্যাকেট, গরম কোক, তা-ও সেই কোনার দোকান থেকেই আনা, দিয়ে সবার মোটামুটি খাওয়া হয়ে যায়। পুরুষেরা একটা বাস ধরে আনে, যেটাতে করে হাসপাতালের কর্মচারীরা মালুমঘাটে চলে যেতে পারবে। দুপুর দুটা নাগাদ ‘বাহিনীটা’ ভেঙে যায় চিরস্থায়ীভাবে।

লিন আর আমি বসার ঘরের মেঝেতে বসে, আমরা-যে ফিরে এসেছি সে-বিষয়ে ধাতস্থ হবার চেষ্টা করি। নিজেদের ঘরে যাবার চাবি ছিল না আমাদের কাছে, তবে আমরা বাড়িতে একা ছিলাম না। জব্বারের বউ ও দুই ছেলে আমাদের কয়েকদিন আগে ফিরেছিল। তারা আমাদের সঙ্গে হাসপাতালে গিয়েছিল আমরা যখন শহর ছাড়ি, এবং সেখান থেকে নৌকা করে হেব্রনের সেই জঙ্গল-কেন্দ্রে পালিয়েছিল, এবং আবারও হাসপাতালে ফিরে এসেছিল যখন ডাকাতির বিপদ দেখা দেয়। এখন তারা আমাদের বাড়িতে ফিরেছে ফের। বৃদ্ধাটি তাদেরই কোনো পরিচিত, যে-এখানে থাকছিল, গ্রাম থেকে বাবা-মায়ের খবর নিয়ে জব্বারের ফিরে না আসা পর্যন্ত।

বাঙালিরা। আমাদের লোক। আমরা বাড়ি ফিরে এসেছি।

কিন্তু তখনও এটি ‘জয় বাংলা’র দেশ হয়ে ওঠেনি। [চলবে]


কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১৬)
কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১৫)
কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১৪)
কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১৩)
কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১২)

হাসান হাফিজের এক গুচ্ছ কবিতা



হাসান হাফিজ
হাসান হাফিজের এক গুচ্ছ কবিতা

হাসান হাফিজের এক গুচ্ছ কবিতা

  • Font increase
  • Font Decrease

ছায়ামায়া বিচ্ছিন্নতা

আবার কখনো হয়তো দেখা হবে
ম্যানিলায়, স্যান মিগুয়েল ড্রাইভে
অদেখার চাপা কষ্ট হয়তো মুছে যাবে
যেহেতু এখন বিশ্ব গ্লোবাল ভিলেজ
ভালো থেকো ম্যানিলাসুন্দরী
তোমার চিকুরে গ-ে মূর্ত হবে
অস্তগামী রোদ্দুরের আভা
কনে দেখা আবছায়া আলোয় মল্লারে
অঙ্কুরিত হতে হতে মরে যাওয়া,
ভালোবাসা ফুল্ল হবে সঘন বন্দিশে
সেই ঐশী মুহূর্তের অপেক্ষায়
পোড়খাওয়া দিন রাত্রি যায়
যুগল মনকে মেখে আবেগে জড়ায়
আধখানা পায় যদি আধেক হারায়
টেলিপ্যাথি দু’জনাকে কাছে এনে
আবারও বিচ্ছিন্ন করে ছায়ায় মায়ায়!

আমাদের জানা নেই

জন্ম থেকে মৃত্যু অব্দি
কতো ক্লান্তি টানাহেঁচড়া এবং ধকল
সমুদয় ফুলের কুঁড়িরা
এই ব্যথা লগ্নি করে নিঝুম নিস্তেজ।
তারাও তো নীলকণ্ঠ
চুপেচাপে হজম করেছে কতো
অপ্রাপ্তি ও লাঞ্ছনার বিষ
মানবজন্মও মূলে লানতের সিঁড়ি
পতনেরই সম্মোহন আছে
আরোহণ অধরা বস্তুত।

জন্ম-মৃত্যু কোন্ প্রশ্নে একাকার লীন
সম্পূরক একজনা অপর জনার
অবিমিশ্র খাঁটি সত্য আমরা জানি না
অন্ধের আন্দাজশক্তি হাতড়িয়ে নিঃসঙ্গতা
বৃদ্ধি করে আরো, আলো ছুঁতে ব্যর্থ অপারগ।

পাই বা না পাই চাই

হাত ধরেছো অন্ধকারে
এইটুকুনি, এর বেশি তো নয়
কেন কেঁপে উঠতে গেলাম
কী ছিল সেই ভয়?
হাতের শিরায় উপশিরায়
মেদুর সে কম্পন
হৃৎযন্ত্রেই পৌঁছে গেল
সীমার যে লংঘন
করলে তুমি জেনেশুনে
অবাস্তবের স্বপ্ন বুনে
কে কার আপনজন
নির্ধারিত হওয়ার আগেই
লুন্ঠন কাজ শেষ
নিষিদ্ধ প্রেম বজ্রঝিলিক
হয়নি নিরুদ্দেশ,
জাঁকিয়ে বসে আরো
মারবে আমায়? মারো-
মারতে মারতে জীবনশক্তি
ফুরিয়ে নিঃশেষ
চাই তোমাকে, পাই বা না পাই
নিমজ্জমান হতেই তো চাই
হোক যতো শ্রম ক্লেশ।

মৃত্যুগাঙে ঢেউয়ের সংসারে

গাঙের মাঝি গাঙেরে কি চিনে?
এই প্রশ্ন হয় না মনে উদয়
গাঙের ঢেউয়ে আছাড় পিছাড়
দ্বন্দ্ব দ্বিধা টানাপড়েন আশঙ্কা সংশয়
গাঙ যে মাঝির পরানসখা, বন্ধুতা তার বিনে
অন্য কোনো রয় কি পরিচয়?
গাঙে উঠলে মৃত্যুমাতাল ঢেউ
পায় না রেহাই কেউ
মাঝগাঙ্গে সে ডুইব্যা মরে, কীভাবে উদ্ধার
চারদিকেতে ঢেউয়েরই সংসার
মাঝি ও গাঙ, অন্য কেহই নাই
চিরকালীন দুইয়ের সখ্য, কোন্ ইশারা পাই
গাঙের মাঝি গাঙের গূঢ় গোপন কথার
শরিক হইতে চায়
কত্তটুকুন পারে ক্ষুদ্র এই জীবনে
আয়ু ক্ষইয়ে যায়
অল্প কিছুই সুলুক সন্ধান
সন্তোষ নাই তায়

বেঁচে থাকা বলে কাকে

জীবন তো ব্ল্যাকবোর্ড ছাড়া কিছু নয়।
ঘটনা বা অঘটন যাই থাকে
নিপুণ শিল্পীর মতো মুছে দেয়,
বাকি বা অক্ষত রাখে সামান্যই।
অদৃশ্যে কে ক্রিয়াশীল আমরা জানি না,
কিবা তার পরিচয়, সাকিন মোকাম কোথা
কিছুরই হদিস নাই। উদ্ধারেরও সম্ভাবনা নাই।
ব্ল্যাকবোর্ড এবং ডাস্টার। জন্ম ও মৃত্যুর খতিয়ান
তুচ্ছতা ঔজ্জ্বল্যে ঋদ্ধ থরোথরো লাবণ্য স্মৃতির
মস্তিষ্কের নিউরন নিখুঁত সেন্সর করে
কারুকে বাঁচিয়ে রাখে, অন্যদের
সরাসরি মৃত্যু কার্যকর
ভোঁতা এক অনুভূতি সহায় সম্বল করে
আমরা ক্লীব টিকে থাকি
একে তোমরা ‘বেঁচে থাকা’ বলো?

আমাদেরও নিয়ে নাও নদী

হৃদয়বাহিত হয়ে তোমার কষ্টের কান্না
সংক্রমিত হয়ে পড়ে হৃৎপিন্ডে আমার
নিদান আছে কী কিছু ?
নাই কোনো স্টেরয়েড এ্যান্টিবায়োটিক
সেহেতু শরণ লই ভেষজ উদ্ভিদে
গুল্মলতা তোমার নির্যাসরসে প্রাকৃতিক হই
বুনোবৃষ্টি মাথাচাড়া দিতে চায় দিক
অঝোর বর্ষণে আমরা সিক্ত হই যথাসাধ্য
নিঃস্ব রিক্ত পুলকিত হই যুগপৎ
নদী খুঁজে পেয়ে যায় আকাক্সিক্ষত সাগরমোহানা
লীন হয়,বাঞ্ছিতকে আলিঙ্গনে ভারাতুরও হয়
এই প্রাপ্তি তপস্যারই পরিণতি,আছে কী সংশয়
কখন হারিয়ে ফেলে এইমতো রয়েছেও ভয়

হৃদয়বাহিত হয়ে নদীস্রোতে যায় বয়ে পরিস্রুত হয়ে
আমাকে তোমাকে সঙ্গে নিয়ে যাক করুণা প্রশ্রয়ে

;

শিশুসাহিত্যিক আলী ইমাম মারা গেছেন



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বিশিষ্ট লেখক, শিশুসাহিত্যিক, সংগঠক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব আলী ইমাম মারা গেছেন। তার বয়স হয়েছিল ৭২ বছর।

সোমবার (২১ নভেম্বর) বিকেলে রাজধানীর ধানমন্ডির ইবনে সিনা বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। আলী ইমাম শ্বসনতন্ত্রের সমস্যা, নিউমোনিয়াসহ নানা জটিল রোগে ভুগছিলেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আলী ইমামের পেজে তার ছেলের দেওয়া এক পোস্টে বিষয়টি জানানো হয়।

আলী ইমাম ১৯৫০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছয়শতাধিক বই লিখেছেন। কর্মজীবনের শেষপ্রান্তে একাধিক স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনের আগে তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশন (২০০৪-২০০৬) ও অধুনালুপ্ত চ্যানেল ওয়ানের (২০০৭-২০০৮) মহাব্যবস্থাপক ছিলেন।

দেশের শিশুসাহিত্যে অবদানের জন্য আলী ইমাম ২০০১ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার এবং ২০১২ সালে শিশু একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার পান। এছাড়াও অনেক পুরস্কার পান তিনি। শিশুসাহিত্যিক হিসেবে জাপান ফাউন্ডেশনের আমন্ত্রণে ২০০৪ সালে তিনি জাপান ভ্রমণ করেন।

আলী ইমামের শিশুসাহিত্য চর্চার শুরু শৈশব থেকে। ১৯৬৮ সালে তিনি তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তান শিক্ষা সপ্তাহে বিতর্ক এবং উপস্থিত বক্তৃতায় চ্যাম্পিয়ন হন। ১৯৮৬ সালে ইউনেস্কো আয়োজিত শিশুসাহিত্য বিষয়ক প্রকাশনা কর্মশালায় অংশ নেন। এছাড়া বাংলাদেশ স্কাউটসের প্রকাশনা বিভাগের ন্যাশনাল কমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

;

কবি সুফিয়া কামালের মৃত্যুবার্ষিকী আজ



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

নারীমুক্তি আন্দোলনের পুরাধা ব্যক্তিত্ব গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল আন্দোলনের অগ্রদূত জননী সাহসিকা কবি বেগম সুফিয়া কামালের ২৩তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ রোববার।

এ উপলক্ষে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হবে।

মুক্তিযুদ্ধসহ বাঙালির সমস্ত প্রগতিশীল আন্দেলনে ভূমিকা পালনকারী সুফিয়া কামাল ১৯৯৯ সালের ২০ নভেম্বর শনিবার সকালে বার্ধক্যজনিত কারণে ইন্তেকাল করেন। সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার ইচ্ছানুযায়ী তাকে আজিমপুর কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

তার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন।

রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে উল্লেখ করেন, কবি সুফিয়া কামাল ছিলেন নারী আন্দোলনের পথিকৃৎ এবং সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে এক অকুতোভয় যোদ্ধা। তার জন্ম ১৯১১ সালের ২০ জুন বরিশালে। তখন বাঙালি মুসলমান নারীদের লেখাপড়ার সুযোগ একেবারে সীমিত থাকলেও তিনি নিজ চেষ্টায় লেখাপড়া শেখেন এবং ছোটবেলা থেকেই কবিতাচর্চা শুরু করেন। সুললিত ভাষায় ও ব্যঞ্জনাময় ছন্দে তার কবিতায় ফুটে উঠত সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ ও সমাজের সার্বিক চিত্র। তিনি নারীসমাজকে অজ্ঞানতা ও কুসংস্কারের বেড়াজাল থেকে মুক্ত করতে আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। মহান ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার, মুক্তিযুদ্ধসহ গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতিটি আন্দোলনে তিনি আমৃত্যু সক্রিয় ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, ছিলেন তার অন্যতম উদ্যোক্তা।

তিনি বলেন, কবি সুফিয়া কামাল পিছিয়ে পড়া নারী সমাজের শিক্ষা ও অধিকার আদায়ের আন্দোলন শুরু করেছিলেন এবং গড়ে তোলেন ‘বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ’। বিভিন্ন গণতান্ত্রিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে অবদানের জন্য তাকে ‘জননী সাহসিকা’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কবি বেগম সুফিয়া কামালের সাহিত্যে সৃজনশীলতা ছিল অবিস্মরণীয়। শিশুতোষ রচনা ছাড়াও দেশ, প্রকৃতি, গণতন্ত্র, সমাজ সংস্কার এবং নারীমুক্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে তার লেখনী আজও পাঠককে আলোড়িত ও অনুপ্রাণিত করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মহিলা হোস্টেলকে ‘রোকেয়া হল’ নামকরণের দাবি জানান তিনি । ১৯৬১ সালে পাকিস্তান সরকার রবীন্দ্র সংগীত নিষিদ্ধ করলে এর প্রতিবাদে গঠিত আন্দোলনে কবি যোগ দেন। বেগম সুফিয়া কামাল শিশু সংগঠন ‘কচি-কাঁচার মেলা’ প্রতিষ্ঠা করেন। আওয়ামী লীগ সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার নামে ছাত্রী হল নির্মাণ করেছে।

কবি বেগম সুফিয়া কামাল যে আদর্শ ও দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন তা যুগে যুগে বাঙালি নারীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পঁচাত্তরের পনেরই আগস্টে নির্মমভাবে হত্যা করে যখন এদেশের ইতিহাস বিকৃতির পালা শুরু হয়, তখনও তার সোচ্চার ভূমিকা বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের গণতান্ত্রিক শক্তিকে নতুন প্রেরণা যুগিয়েছিল।

সুফিয়া কামাল ১৯১১ সালের ২০ জুন বেলা ৩টায় বরিশালের শায়েস্তাবাদস্থ রাহাত মঞ্জিলে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর সুফিয়া কামাল পরিবারসহ কলকাতা থেকে ঢাকায় চলে আসেন। ভাষা আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং এই আন্দোলনে নারীদের উদ্বুদ্ধ করেন। তিনি ১৯৫৬ সালে শিশু সংগঠন কচিকাঁচার মেলা প্রতিষ্ঠা করেন।

পাকিস্তান সরকার ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র সঙ্গীত নিষিদ্ধের প্রতিবাদে সংগঠিত আন্দোলনে তিনি জড়িত ছিলেন এবং তিনি ছায়ানটের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ সালে মহিলা সংগ্রাম কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন এবং গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেন।

১৯৭০ সালে তিনি মহিলা পরিষদ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭১ সালের মার্চে অসহযোগ আন্দোলনে নারীদের মিছিলে নেতৃত্ব দেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার ধানমন্ডির বাসভবন থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা দেন। স্বাধীন বাংলাদেশে নারী জাগরণ ও নারীদের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামেও তিনি উজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেন। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণসহ কার্ফু উপেক্ষা করে নীরব শোভাযাত্রা বের করেন।

সাঁঝের মায়া, মন ও জীবন, শান্তি ও প্রার্থনা, উদাত্ত পৃথিবী ইত্যাদি তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ। এ ছাড়া সোভিয়েতের দিনগুলি এবং একাত্তরের ডায়েরী তার অন্যতম ভ্রমণ ও স্মৃতিগ্রন্থ।

সুফিয়া কামাল দেশ-বিদেশের ৫০টিরও বেশি পুরস্কার লাভ করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার, সোভিয়েত লেনিন পদক, একুশে পদক, বেগম রোকেয়া পদক, জাতীয় কবিতা পরিষদ পুরস্কার ও স্বাধীনতা দিবস পদক।

সুফিয়া কামালের পাঁচ সন্তান। তারা হলেন, আমেনা আক্তার, সুলতানা কামাল, সাঈদা কামাল, শাহেদ কামাল ও সাজেদ কামাল।

;

বিশেষ ব্যক্তিদের সম্মাননা দিলো 'চয়ন সাহিত্য প্রকাশনী'



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

"চয়ন সাহিত্য ক্লাব" এর ২০ তম বার্ষিকী এবং সাহিত্য পত্রিকা "চয়ন ও দশদিগন্ত" এর ৩০ তম  প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী  ১৮ নভেম্বর, ২০২২, বিকাল ৩ টায় জাতীয় জাদুঘরের কাজী সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় ।

অনুষ্ঠানে ‘চয়ন সাহিত্য ক্লাব স্বর্ণপদক-২০২২’ তুলে দেওয়া হয়। লিলি হক রচিত "কবিতার প্রজাপতির নীড়ে " বইটি " চয়ন প্রকাশন" থেকে প্রকাশিত হয়, একই সময়ে কবিতা পাঠের পাশাপাশি অন্যান্য আকর্ষণীয় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন জাতীয় জাদুঘর প্রযত্ন পর্ষদ এর সভাপতি আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন একুশে পদকপ্রাপ্ত কথা সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক হাসনাত আব্দুল হাই, বিশেষ অতিথি, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্ব ম. হামিদ, মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরী অথরিটির এক্সিকিউটিভ ভাইস চেয়ারম্যান মোঃ ফসিউল্লাহ্। উপস্থিত ছিলেন উৎসব কমিটির চেয়ারম্যান, সুসাহিত্যক সেলিনা হোসেন। 

পদকপ্রাপ্ত গুণীজন আর্ন্তজাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফ্যাশন আইকন বিবি রাসেল, প্রখ্যাত বাচিকশিল্পী গোলাম সারোয়ার ,কথাসাহিত্যিক আবু সাঈদ, সুসাহিত্যক এবং বাংলা একাডেমীরই আজীবন সদস্য  গুলশান-ই-ইয়াসমীন।

সঙ্গীত পরিবেশন করেন বিশিষ্ট সঙ্গীত শিল্পী স্বাধীন বাংলা বেতারের শিল্পী বুলবুল মহলানবীশ, মনোয়ার হোসেন খান, ও আনজুমান আরা বকুল। অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন ছড়াশিল্পী ওয়াসীম হক। সার্বিক পরিচালনায় ছিলেন অনুবাদক মোঃ নুরুল হক। হৈমন্তী সন্ধ্যায় অনুষ্ঠানটি এক মিলনমেলায় পরিণত হয়।

;