দ্বীপ অথবা একটি আন্তমহাদেশীয় উপাখ্যান



মহীবুল আজিজ
গ্রাফিক্স: বার্তা২৪.কম

গ্রাফিক্স: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

এটাও সত্য, লোকেরা আশেপাশের এলাকা থেকে নতুন জেগে ওঠা দ্বীপটাতে বসবাস করতে না এলে লুইগিদেরও আসবার অবকাশ তৈরি হতো না। কাজেই এক্ষেত্রে গ্রাম্য অশিক্ষিত-অল্পশিক্ষিতরাই ছিল পথপ্রদর্শক। সুবর্ণদ্বীপে এমনই প্রাণচাঞ্চল্য জেগে ওঠে, লোকে ভুলেই যায় যে এটি মাত্র কিছুকাল আগেও ছিল সমুদ্রের অভ্যন্তরে। লোকেরা তাদের পুরনো অভ্যেস ছাড়তে পারে না। ঘরে-বাইরে তারা নানা ঘটনার সূত্রে জড়িয়ে পড়ে বিবাদে-বিসংবাদে। ফলে আইন-আদালত দ্বীপটিতে প্রতিষ্ঠিত হয় বেশ তোড়জোড়ের সঙ্গে। অথবা এমনও হতে পারে, লোকেরা মোটামুটি বসবাস নিশ্চিত হওয়ার পরপরই যে-কাজটা শুরু করবে সেটা হলো আত্ম ও পারস্পরিক কলহ- কর্তৃপক্ষ তা আগেভাগে জেনেই সুবর্ণদ্বীপে আইনের শাসন নিশ্চিত করে। দ্বীপটিতে একটি কারাগার রয়েছে যেখানকার আসামিরাও তারাই যারা সুবর্ণদ্বীপের প্রথম দিককার বসতি স্থাপনকারী। নৌকা-লঞ্চই যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম এবং শিক্ষিত-অশিক্ষিত ভদ্র-ভদ্রেতর সবাইকে সুবর্ণদ্বীপে অবতরণ করবার সময় নৌকা-স্পিডবোট বা লঞ্চ থেকে লাফ দিয়ে নামতে হয় প্রথমে কাদায় তারপর কাদামাটিতে এবং সবশেষে মাটিতে। ভাগ্য ভাল হলে তারা কলঙ্কমুক্ত বস্ত্রে দ্বীপে পৌঁছাতে পারে তা নাহলে কলঙ্কিত হয়েই উঠে আসতে হয় নদীতীর হতে। এটা কোন লজ্জা অলজ্জা বা মান-অসম্মানের ব্যাপার নয়। লঞ্চ থেকে নামতে গিয়ে এম. এ. পাশ বা গ্র্যাজুয়েট সরকারি কর্মচারি চিৎ হয়ে কাদায় পড়ে গেলেও অধঃস্তন-তৎপরতায় তৎক্ষণাৎ সে ধরণি-উত্থিত হয় এবং তার ব্র্যান্ডের শার্ট-প্যান্ট রং বদলে কৃষ্ণকায় রূপ নিলে সে মনে-মনে ভাবে সুবর্ণদ্বীপের কাদায় কিন্তু গন্ধ মানে সে-অর্থে দুর্গন্ধ নেই। ঢাকা শহরের নর্দমার কাদায় যে-প্রাগৈতিহাসিক গন্ধ থাকে সেটা সুবর্ণদ্বীপের কাদায় চিন্তাই করা যায় না। বরং এই কাদা দেখলেই ইচ্ছে হয়, একটু গায়ে মাখি। মাঝে-মাঝে ছাপা হয় কাগজে, এমন পারমাণবিক যুগেও কাদা গায়ে মেখে সৌন্দর্যচর্চা করে বিশে^র সেরা সুন্দরীরা। অনেকে অবশ্য আজকাল চালাকির আশ্রয় নেয়। গোটা পথ পাড়ি দিয়ে দ্বীপের কাছাকাছি এলেই তারা পোশাক বদলে তার বদলে পরে নেয় নিতান্ত আটপৌরে ঘরোয়া পোশাক। লাগলে কাদা লাগুক ঘরের পোশাকে। বাইরের পোশাক অক্ষত থাকলেই হলো। 

সেটা ছিল নিষ্ঠুর এপ্রিল মাস। এপ্রিল এর আগেও এসেছিল কিন্তু এমন নিষ্ঠুরতার ছাপ রেখে যায় নি। কয়েকদিন ধরেই প্রচারণা চলছিল, ভয়ংকর দুর্যোগের মেঘ জমছে সুবর্ণদ্বীপের আকাশে। লোকেরা যাতে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যায় সেজন্যে দিনভর মাইকে রেডিওতে টেলিভিশনে চলে ঘোষণার পর ঘোষণা। সমস্যা হলো, অধিকাংশ লোক সব ঘোষণা শোনে খুব মনোযোগ দিয়ে এবং তারা সেসব ঘোষণাকে উপেক্ষাও করে সচেতনভাবে। বিপদের কথা ভেবে আগাম স্থানত্যাগের অর্থ তাদের নিকটে নিজেদের অবলম্বন হারানো এবং সম্পদের মালিকানা অন্যের হাতে তুলে দেওয়া। এর জন্যে অবশ্য তাদের দোষও দেওয়া কঠিন। বেশ কয়েকবার এমন দুর্যোগের ঘোষণায় সুবর্ণদ্বীপের অনেক লোক নিজ-নিজ জায়গা ছেড়ে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ এবং উঁচু স্থানে গিয়ে আশ্রয় নেয়। ঝড়ের পরে বাড়ি ফিরে তারা দেখতে পায় তাদের বাড়িঘর চোরেদের তৎপরতার পরিণামে শূন্যতা-আক্রান্ত। ফলত তারা দুই ঝড়-কবলিত হয়ে হায়-হায় করাঘাতে আর্তনাদ করে। সেই এপ্রিলেও অনেকেই আশ্রয় নেয় নিরাপদ বলে প্রতীয়মান প্রশাসন-চিহ্নিত স্থলে যদিও উঁচু জায়গা বলে তেমন কিছুই ছিল না সুবর্ণদ্বীপে যেহেতু সবটাই জেগে উঠেছিল সমুদ্রের গর্ভ থেকে। মধ্যরাতে শুরু হওয়া কয়েক ঘণ্টার ঝড়ো তা-বে সুবর্ণদ্বীপ প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ে একদিনেই। ঢেউ এতটাই উচ্চতা ছোঁয় সাইক্লোন কেটে যাওয়ার পরে গাছে-গাছে মানুষ ও জীব-জন্তুর মৃতদেহ ঝুলে থাকতে দেখা যায়। কোন কোন পরিবারে মৃতদের জন্যে শোক করবার লোকও অবশিষ্ট থাকে না। সভ্য লোকেরা ভাবে, এত মৃত্যু কেন! যে-দ্বীপে মানুষই বসবাসের কথা নয় সেখানে মানুষ বসবাস করতে থাকলে তারা যে মূলত কবলিতই হবে, নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে সেই সরল বাস্তবতাকে মেনে নিতে কষ্ট হয় মানুষের। যখন পত্রপত্রিকা ছিল না, যোগাযোগ এতটা বিস্তৃতজাল ছিল না তখনও এমন মৃত্যু ঘটেছিল এবং সেসব মৃত্যুর কোন হিসেব কেউ রাখে নি।

সুবর্ণদ্বীপের প্রায় সত্তর সতাংশ স্থলভাগ জলকবলিত হলেও সাইক্লোনের পরে যখন ফের সাম্যাবস্থা ফিরে আসে মানে দ্বীপের স্থলভাগ পরিপূর্ণভাবে পূর্বাবস্থায় রূপ নেয় তখন লোকেরা এত মৃত্যুর পরেও এই ভেবে আশায় বুক বাঁধে, না, সুবর্ণদ্বীপ আসলে নিশ্চিহ্ন হবে না, জেগে থাকবে মৃত্যুর মধ্য দিয়েই। আবার লোকেরা আসে, আসে চারদিক থেকে- মূলত প্রতিবেশী অঞ্চল-জেলা থেকে। এসেই তারা মৃতদের শূন্যতা পূরণ করে নিতে থাকে দিকে-দিকে। চাষ-বাস ফসল-বাণিজ্য এইসব করণের প্রক্রিয়ায় আবার জীবন চতুর্দিকে বিস্তৃত হতে থাকে সুপরিসরে। এমন একটা হৃদয়বিদারক ঘটনা সুবর্ণদ্বীপের জন্যে অপকারী এবং উপকারী দুই ফল-ই বয়ে আনে। মৃত্যু ধ্বংস ক্ষয় প্রভূত অপকারের পরে আসে উপকারের দিন। এপ্রিলের নিষ্ঠুরতার কাহিনি দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে পড়লে দ্বীপটি পরিণত হয় আন্তর্জাতিক বিষয়বস্তুতে। বিশে^র বিখ্যাত পত্র-পত্রিকায় সুবর্ণদ্বীপের সাইক্লোনের প্রতিবেদন ছাপা হলে অনেক দেশ এগিয়ে আসে দ্বীপের ভবিষ্যতের মঙ্গল-সাধনে। অনেক ধনি দেশ দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষম স্থাপনা তৈরি করে দেয় দ্বীপটিতে। সেটা তারা করে শতভাগ নিশ্চয়তা সহকারে। তারা দেশটির কিংবা দ্বীপের লোকেদের ওপর আস্থা না রেখে নিজেরাই উপস্থিত থেকে নির্মাণ করে দেয় জরুরি স্থাপনাগুলো। তারা দেখে, যে-দেশের বইয়ে দুধের সঙ্গে পানি মিশিয়ে লোকেদের অপুষ্টিতে নিক্ষেপ করাটাও প্রকাশ্য বিষয়, যে-দেশের বইয়েতে জনসাধারণের প্রধান খাদ্যবস্তু চালের সঙ্গে পাথর মেশানোকে অনৈতিক না ভেবে বরং গণিতের হিসেবে শেখানো হয় সে-দেশের লোকেরা কালক্রমে শিক্ষিত হয়ে আরও-আরও অপকৌশল রপ্ত করে ফেলে। দুধ-পানি এবং চাল-কাঁকরের উন্নততর সংস্করণ হিসেবে তারা বেছে নেয় সিমেন্ট-বালি, এমনকি লোহার রড ও বাঁশের কঞ্চি। তারা আতঙ্কিত হয় ভেবে, যে-দেশের লোক গৃহসামগ্রিতে লোহার রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহারের দুঃসাহস দেখাতে পারে তাদের বানানো আশ্রয়কেন্দ্রগুলির ঝড়-সাইক্লোনের পূর্বাভাসেই ধ্বসে পড়বার সম্ভাবনা। পরিণামে সুবর্ণদ্বীপের লোকেরা পায় মজবুত কিছু ভবন যেগুলো প্রচ- ঝড়েও উৎপাটিত হয়ে যাবে না।

লুইগিকে তাদের অনেকেই প্রথমটায় যাজক ভাবে। এর কারণ তার পরনে ছিল উর্ধাঙ্গে ফতুয়ার মত দেখতে ঢিলেঢালা ধরনের পোশাক এবং নিম্নাঙ্গে সুতির কাপড়ের ঢোলা পায়জামা। হয়তো আবহাওয়ার চরমভাবাপন্নতার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যেই তার এমন পোশাক কিন্তু লোকেরা তাকে যাজকই ভাবে। কিন্তু তার সঙ্গে থাকা গোলাম কবির নামের সহকারীটি লোকেদের সে-ভুল ভাঙিয়ে দিয়ে বলে, সুবর্ণদ্বীপের লোকেরা অত্যন্ত ভাগ্যবান। এই প্রথম দ্বীপে একজন বিদেশি ডাক্তারের পদার্পণ ঘটেছে। লোকেরা এখন থেকে রোগেশোকে নিশ্চিত নির্ভরতা হিসেবে লুইগি পালোমারের কাছে গিয়ে নিজ-নিজ সমস্যার বিবরণ দিতে পারবে। অল্প সময়ের মধ্যেই লুইগির আগমনের সংবাদ রটে যায় সমগ্র দ্বীপে। যেসব লোক এরিমধ্যে অসুস্থতায় আক্রান্ত হয়ে পড়ে তারা বিদেশি ডাক্তারের নাম শুনেই আরাম বোধ করতে শুরু করে এবং অচিরেই লুইগির সাক্ষাৎ লাভের জন্যে মনে-প্রাণে অপেক্ষা করতে থাকে।

আরও পড়ুন: দ্বীপ অথবা একটি আন্তমহাদেশীয় উপাখ্যান

৩য় পর্ব আগামী শুক্রবার

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পেলেন যারা



স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার-২০২১ ঘোষণা করা হয়েছে। ঘোষণা অনুযায়ী ১১ বিভাগে ১৫ জন এবার বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পাচ্ছেন।

রোববার (২৩ জানুয়ারি) বাংলা একাডেমির সদস্য সচিব এ এইচ এ লোকমান স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পুরস্কারপ্রাপ্তদের নাম জানানো হয়।

পুরস্কারপ্রাপ্তরা হলেন:

কবিতায় আসাদ মান্নান ও বিমল গুহ, কথা সাহিত্যে ঝর্না রহমান ও বিশ্বজিৎ চৌধুরী, প্রবন্ধ/গবেষণায় হোসেন উদ্দিন হোসেন, অনুবাদে আমিনুর রহমান, রফিক উম মুনীর চৌধুরী, নাটকে সাধনা আহমেদ, শিশুসাহিত্যে রফিকুর রশীদ, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গবেষণায় পান্না কায়সার, বঙ্গবন্ধু বিষয় গবেষণায় হারুন-অর-রশীদ, বিজ্ঞান/কল্পবিজ্ঞানে পরিবেশ বিজ্ঞানে শুভাগত চৌধুরী, আত্মজীবনী বা স্মৃতিকথা বা ভ্রমণকাহিনীতে সুফিয়া খাতুন, হায়দার আকবর খান রনো এবং ফোকলোর বিভাগে আমিনুর রহমান সুলতানা।

অমর একুশে বইমেলা-২০২২ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরাসরি অথবা ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেবেন বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। 

;

আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার পেলেন আহমদ রফিক ও মাসরুর আরেফিন



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন

ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন

  • Font increase
  • Font Decrease

আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার পেলেন দুই প্রজন্মের দুই কথাসাহিত্যিক।

আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার-২০১৯ পেয়েছেন ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এবং কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন। ‘ভাষা আন্দোলন: টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া’ প্রবন্ধের জন্য আহমদ রফিককে এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ‘আগস্ট আবছায়া’ উপন্যাসের জন্য মাসরুর আরেফিনের নামের পাশে যোগ হয়েছে পুরস্কারটি।

করোনা মহামারির কারণে এবার অনলাইনের মাধ্যমে নির্বাচিত দুই প্রজন্মের দুই কথাসাহিত্যিককে সম্মাননা জানানো হয়। গত ১৫ জানুয়ারি এই আয়োজনে প্রধান অতিথি ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার। এছাড়া ছিলেন আইএফআইসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী শাহ এ সারওয়ার।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে সমসাময়িক লেখকদের স্বীকৃতি দিতে আইএফআইসি ব্যাংক ২০১১ সালে চালু করে ‘আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার’। প্রতিবছর পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করা হয় সেরা দুটি বই। নির্বাচিত প্রত্যেক লেখককে পাঁচ লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র পেয়ে থাকেন।

;

ওমিক্রণে থমকে গেছে বইমেলার আয়োজন



সজিব তুষার, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

এবারও থমকে গেছে লেখক পাঠকের প্রাণের আসর অমর একুশে বইমেলা প্রাঙ্গণ। তুমুল উৎসাহ আর ব্যাপক উদ্দীপনা নিয়ে কাজ শুরু হলেও কোভিড- ১৯ এর ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট আতঙ্ক থামিয়ে দিয়েছে কাজ। একটা বড় অংশের কাঠামো তৈরি হয়ে গেলেও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে আছে গর্ত আর স্তূপ স্তূপ বাঁশ।

বরাবরের মত এ বছরেও ১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়ার কথা অমর একুশে বইমেলা-২০২২। সে অনুযায়ী, কাজ শুরু করে দিয়েছিলো আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি। প্রায় শেষ হয়ে এসেছিলো প্রকাশনী গুলোর রেজিস্ট্রেশন ও লটারি পূর্ববর্তী কার্যক্রম। কাজ চলার মাঝেই বাঁধ সাধে বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯ নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

গত ১৬ জানুয়ারি সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ গণমাধ্যমকে জানান, 'করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে আপাতত দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত করা হয়েছে বইমেলা। মেলার পূর্ণ প্রস্তুতি রয়েছে বাংলা একাডেমির। সংক্রমণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকেই শুরু করা যেতো বইমেলা'। 

সরকারের এই ঘোষণার পর থমকে গেছে পুরো উদ্যমে শুরু হওয়া মেলার স্টল তৈরির কাজ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়ে দেখা যায়, স্টল তৈরির জন্য মাঠে কাঠামোর বেশ খানিকটা তৈরি হয়ে আছে। জায়গায় জায়গায় পুঁতে রাখা রয়েছে বাঁশ। কিন্তু কাজ করতে দেখা যায়নি কোনও শ্রমিককে।

এবারের বই মেলায় প্রথম বই প্রকাশ হবে এমন এক তরুণ লেখক বায়েজিদ হোসেন বলেন, 'ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা আমাদের রক্তে গেঁথে গেছে। বৈশ্বিক মহামারী করোনার তোপে পণ্ড হয় গতবারের মেলাও। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো রাস্তায় বসে যাবে। এমন চলতে থাকলে খুব দ্রুতই অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হবেন তারা। এখন পর্যন্ত যেটুকু টিকে আছে সেটা নষ্ট করে ফেললে; শিল্প সংস্কৃতির আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না'।

যথোপযুক্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে বইমেলা সঠিক সময়ে শুরু করার পক্ষে কথা বলেন তিনি।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গ্রন্থিক'র প্রকাশক রাজ্জাক রুবেল বলেন, 'গতবারের মেলার অভিজ্ঞতার পর এবছর আর রিস্ক নেব বলে মনে হচ্ছে না। সম্ভব হলে জমা দেওয়া টাকাটা ফেরত আনার ব্যবস্থা করবো'।

স্টলের রেজিস্ট্রেশন ও অন্যান্য বাবদ খরচের কথা উল্লেখ করে বলেন, 'দুটা স্টলের জন্য জমা দিতে হয়েছে আগের থেকেও বেশি। ডেকোরেশন খরচ। স্টলের লোকের খরচ। তাদের এমন সিদ্ধান্তে আমি কোনভাবেই লস আটকাতে পারবো না'।

এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমিতে গেলে কেউ কিছু বলতে পারেন নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মচারী জানান, "মহাপরিচালক- প্রকাশক ও সংশ্লিষ্টদের সাথে মিটিং করে সিদ্ধান্ত জানানো পর্যন্ত কেউ কিছু বলতে পারবো না"।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে থেকে তোলা বইমেলার প্রস্তুতিকালীন কাজের একাংশের ছবি। ছবি- বার্তা২৪.কম

 

এর আগে বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ও বাংলা একাডেমির পরিচালক জালাল আহমেদ গণমাধ্যমকে জানান, স্বাস্থ্যবিধি মেনে পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকেই নেওয়া হচ্ছে বইমেলা শুরুর প্রস্তুতি। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত বছরও মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে দেড় মাস পিছিয়ে ১৮ মার্চ থেকে শুরু হয় অমর একুশে বইমেলা। আবার নির্ধারিত সময়ের দুদিন আগে ১২ এপ্রিলই টানে ইতি। সম্প্রতি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সরকার। তবে দু'সপ্তাহ পিছিয়ে দিলে আদতে বই মেলা হবে কি না এ নিয়ে সন্দিহান অনেকেই। বইমেলা মানেই হাজার মানুষের ভিড়। লেখক পাঠকের সমারোহ। তবে একের পর এক মেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকলে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গুলো মেলা করবে কি না তা নিয়েও শঙ্কায় আছেন সচেতন মহল।

স্বাস্থ্যবিধি মেনেই মেলা হোক চান বড় একটা অংশের নেটিজানরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে বেশ আলোচনাও তুলছেন তারা।


উল্লেখ্য, মুক্তধারা প্রকাশনীর মালিক চিত্তরঞ্জন সাহা বাংলা একাডেমির গেইটে ১৯৭২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে চট বিছিয়ে শুরু করেন বই বিক্রি। ১৯৭৭ সালে তার সঙ্গে যোগ দেন আরও অনেকে। ১৯৭৮ সালে এ বইমেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয় বাংলা একাডেমিকে। তখন মহাপরিচালক ছিলেন আশরাফ সিদ্দিকী। পরের বছরই বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি যুক্ত হয় মেলার সঙ্গে।

মনজুরে মওলা বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্বে থাকার সময় ১৯৮৩ সালে 'অমর একুশে গ্রন্থমেলা' নামে এ মেলা আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও তা আর করা যায়নি। পরের বছর বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণে আসর বসে 'অমর একুশে বইমেলা'র। ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি জুড়ে কাগজের বইয়ের মুহুর্মুহু গন্ধ মাখা বইমেলাই যেন দর্শনার্থীদের মনে করিয়ে দেয় ভাষা সংগ্রামের কথা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকার জ্যাম ঠেলেও ফেব্রুয়ারিতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাণের গন্তব্য হয়ে দাঁড়ায় ভাষা ও বইপ্রেমী মানুষের কাছে। সবাই চায় বইমেলা ফিরে পাক তার আগের জৌলুশ। বইয়ের সাথে ভবিষ্যত প্রজন্মের এই মিল বন্ধনের পুণ্যভূমি বেঁচে থাকুক সব অশুভ ছায়া থেকে।

;

অন্বেষণ মানে তো খোঁজ, এই খোঁজ হল আত্ম-অন্বেষণ...



সুবর্ণা মোর্শেদা, চিত্রশিল্পী
সুবর্ণা মোর্শেদা

সুবর্ণা মোর্শেদা

  • Font increase
  • Font Decrease

নিজেকে খোঁজার যে তাগিদ, আমার মধ্যে সেটা সবসময়ই কাজ করে। এই তাগিদ থেকেই আমার কাজের শুরু বলা যেতে পারে। সবসময় মনে হয়, নিজেকে খোঁজার চেয়ে কঠিন কিছু নাই। গত দুই বছরে সেই খোঁজার তাগিদ আরো তীব্র হয়ে উঠেছে। এই সময়ে অন্যদের সঙ্গে যখন কথা বলেছি, তার মাঝেও নিজেকেই খোঁজার চেষ্টা চলতো। লকডাউনের বেশ আগে থেকেই নিজেকে অনেক বেশি আইসোলেশনে নিয়ে যাই আমি—একটা নিরঙ্কুশ একাকীত্বের মধ্যে চলে আত্ম-অনুসন্ধানের কাজ। সো, লকডাউন আমার জন্য খুব নতুন কিছু ছিলো না। শুধু বাবা-মায়ের সঙ্গে নতুন করে থাকাটা ছিলো একেবারে নতুন।


২০১৯-এর একটা সময় আমি খুব অন্ধকারে ডুবে যাই। স্বভাবগত দিক থেকে রঙিন মানুষ হয়েও একটা গভীর ব্যক্তিগত কারণে আমার জীবন হয়ে পড়ে সম্পূর্ণ সাদা-কালো। আর এ সময়টাতেই নিভৃতে অনেকগুলো কাজ করে ফেলি। কখনো লিথোগ্রাফ, কখনো পেন্সিল স্কেচ আর কাগজে সেলাই করে করা এ-কাজগুলোই আমাকে সেই গভীর অন্ধকারেও বেঁচে থাকার প্রেরণা যুগিয়েছে। কাগজে সেলাই করে শিল্পকর্ম নির্মাণের একটা আলাদা আনন্দ আছে। সেটা হলো স্পর্শের আনন্দ।


এই স্পর্শকে কেমন করে দেখাবো! সেলাইয়ের উঁচু-নিচু অংশগুলোকে আমি বলি স্পর্শের প্রতীক। এর মধ্য দিয়ে স্পর্শের অনুভূতিকে অন্যের মনে সঞ্চার করা যায়। বড় হওয়ার পর, জীবনে এই প্রথম আমি মায়ের সাথে বাবার সাথে এতো দীর্ঘ সময় আমি কাটানোর অবকাশ পেয়েছি। আমার মায়ের গাছ লাগানোর শখ অনেক আগে থেকেই। সেই শখ লকডাউনে আরো তীব্র হলো।

তাঁর লাগানো গাছগুলো যতো বড় হচ্ছিলো, আর তাঁর বয়স যেন ততোই কমছিলো। গাছে ফল ধরা, ফুল ধরা দেখে তাঁর কী যে এক আনন্দ! সব মিলে যেন এক অপার্থিব অনুভূতি! তো, আমি তাঁকে একজন সফল চাষী হিসেবে ঘোষণা করলাম। দীর্ঘদিন ধরে আমি গন্ধ, স্পর্শ নিয়ে কাজ করি। এবার মায়ের গন্ধের সঙ্গে যোগ হলো মায়ের বাগানের গন্ধ-স্পর্শ।


গাছগুলোর পাতা যখন ঝরে পড়ে, সে-পাতার রং, শেইপকে আমার কাজের সঙ্গে সংযুক্ত করা আর স্পর্শগুলোকে ধরার জন্যই আমার কাগজে সেলাই করার কাজ। আমার ঘুমের সমস্যা আছে। রাতে ঘুম হয় না বা হতো না সেই অন্ধকার সময়গুলোতে। ঘুম না হওয়ার কারণে যে সকালে খারাপ লাগতো তা-ও না। সকালের গন্ধ আমার খুব প্রিয়।


এরমধ্যেই হলো মায়ের করোনা। দীর্ঘ ১ মাস ধরে মায়ের সিরিয়াস কন্ডিশন । আমি বুঝতে পারতাম, গাছগুলোও মাকে খুব মিস করছে। এদিকে মা তো হসপিটালে অক্সিজেন নিতে ব্যস্ত! ২৪ ঘন্টাই মায়ের সঙ্গে থাকি। তাঁর অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমে যাওয়া-- কখনও ভালো, কখনও মন্দ। অবশেষে মায়ের জয়ী হয়ে ঘরে ফেরা। তাঁর সঙ্গে আবার তাঁর গাছেদের সেই নিবিড় সম্পর্ক--গভীর বন্ধুত্ব!

পুরো সময়টাই যেন কবিতার মত, প্রেমের কবিতা! আমার সাদা-কালো ক্যানভাসে ছড়িয়ে দেওয়া রঙের মত! অন্ধকারে অপরূপ আলোর মত। আমার ছবিগুলো যেন জীবনের মত! আমার জীবন যেন আমার ছবির মতো!

সকলকে আমন্ত্রণ!


চিত্রকর্ম প্রদর্শনী: ‘অন্বেষণ’
শিল্পী: সুবর্ণা মোর্শেদা (তৃতীয় একক প্রদর্শনী)
স্থান: ইএমকে সেন্টার
প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন: অধ্যাপক জামাল আহমেদ, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, তাওহিদা শিরোপা।
মাধ্যম: লিথোগ্রাফ, সায়ানোটাইপ, পেন্সিল স্কেচ, জলরংসহ বিভিন্ন মাধ্যম
সংখ্যা: মোট ৪২টি শিল্পকর্ম
চলবে: ১৫-৩০ জানুয়ারি
শো কিউরেটর: রেজাউর রহমান

;