মৃত্যুনীল নদের আখ্যান, পর্ব- ২



তাশরিক-ই-হাবিব (অনূদিত)
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

সাতিপি ইয়ামোসের সঙ্গে আলাপ করছিল।  তার গলা এমনই উচ্চকণ্ঠের যে তা খুব কমই বৈচিত্র্যপূর্ণ মনে হয়।

“তুমি অবশ্যই নিজেকে জাহির করবে, যা আমি স্পষ্ট বলছি। তুমি নিজেকে গুটিয়ে রাখলে কখনোই কেউ তোমাকে গুরুত্ব দেবে না। তোমার বাবা বলেন যে এটা করতে হবে, ওটা করতে হবে এবং কেন তুমি সেসব করোনি? এবং তুমি তাতেই জো হুজুর জো হুজুর করো! তুমি কিছুই না ভেবে তার কথায় সায় দাও আর ওপরওয়ালাই জানেন, সেসব করা আদতে অসম্ভব! তোমার বাবা তোমাকে বাচ্চা, দায়িত্বজ্ঞানহীন বালকের মতোই ভেবে তেমন আচরণ করেন। যেন তুমি আইপির বয়সী!”

ইয়ামোস শান্তভাবে বলে:

“আমার বাবা আমাকে অন্তত আইপির মতো একইভাবে দেখেন না!”

“না, আসলেই তেমন।” সাতিপি নতুন বিষ প্রয়োগে এবার উদ্যমী হলো, “তিনি ঐ বখাটে ছোকরার ব্যাপারে তালকানা। দিনের পর দিন আইপির  বাড় বেড়েই চলেছে। সে যেখানে যেমন খুশি চড়ে বেড়ায় এবং কাজে সাহায্য করে না এবং এমন ভান করে যে তাকে যে কাজ করতে বলা হয়, তা তার জন্য খুবই পরিশ্রমের! ব্যাপারটা অপমানজনক!  এসবই ঘটছে কারণ সে জানে যে তোমার বাবা তাকে লাই দেবে এবং তার পক্ষে থাকবে। তোমার ও সোবেকের এ ব্যাপারে শক্ত হওয়া উচিত।”

ইয়ামোসে ঘাড় বেঁকায়।

“কোনটা ভালো?”

“তোমার জ্বালায় আমি পাগল হয়ে যাবো, ইয়ামোস - তা-ই তো তুমি চাও! তুমি একটা ভীতুর ডিম! তোমার সাহস বলে কিছু নেই। তুমি মেয়েদের মতো মেনিমুখো। তোমার বাবা যা বলেন তাতেই তুমি সঙ্গে সঙ্গে নাচো!”

“আমি সবসময়ই বাবার অনুগত।”

“ঠিক তাই, সেকারণেই তিনি সেই সুযোগ নেন। তুমি মেনিমুখো হয়ে সব দায় হজম কর আর যেসবের দায় তোমার নয়, সেসব বোঝাও বয়ে বেড়াও। তোমারও কথা বলা উচিত এবং সোবেক তাকে যেভাবে জবাব দেয়, সেভাবেই জবাবও দেয়া উচিত। সোবেক কাউকে ভয় পায় না।”

“তা ঠিক। তবে মনে রেখ সাতিপি, বাবা আমাকে বিশ্বাস করেন, সোবেককে নয়। বাবা তার ওপর ভরসা করতে পারেন না। সবকিছুর ব্যাপারে  চূড়ান্ত মত আমি দেই, সোবেক নয়।”

“এবং সেকারণেই এ জমিদারিতে তুমি অংশীদার হিসেবে থাকতেই পারো! যখন তোমার বাবা জমিদারির বাইরে থাকেন, তখন তুমি তার প্রতিনিধিত্ব কর। এমনকি তখন পৌরোহিত্যের দায়ও তোমার ওপর বর্তায়। সবকিছুর ভার তোমার ঘাড়ে চাপে অথচ তোমার কোনো স্বীকৃত কর্তৃত্বই নেই। পুরো ব্যাপারটার বন্দোবস্ত ঠিকঠাক হওয়া দরকার। তুমি এখন মধ্যবয়সী সংসারী মানুষ। এটা মেনে নেয়া যায় না যে তোমার সঙ্গে বাচ্চাসুলভ আচরণ করা হবে।

ইয়ামোসে সন্দিহানভাবে বলে:

“আমার বাবা নিজেই বৈষয়িক তদারকি পছন্দ করেন।”

“ঠিক তাই। এ ব্যাপারটা তাকে আনন্দ দেয় যে এ বাড়ির সবকিছুই তার ওপর নির্ভরশীল থাকুক - এবং এভাবেই প্রতিটি মুহূর্ত কাটুক! এর ফলে ব্যাপারটা খারাপের দিকে যাচ্ছে। তিনি এবার বাড়ি এলে তুমি তাকে অবশ্যই শক্তভাবে চেপে ধরবে আর তাকে অবশ্যই স্পষ্টভাবে জানাবে যে তুমি জমিদারির অংশিদারিত্ব চাও, যার বন্দোবস্ত লিখিতভাবে সম্পন্ন হবে।”

“তিনি শুনবেন না।”

“তুমি তাকে শুনতে বাধ্য করবে। ওফ, আমি যদি মরদ হতাম! তোমার জায়গায় আমি থাকলে দেখিয়ে দিতাম কত ধানে কত চাল! কখনোবা আমার মনে হয়, আমি একটি মহিলাকে বিয়ে করেছি।”

ইয়ামোসে জ্বলে ওঠে।

“আমি দেখব কী করা যায় - আমি সম্ভবত এ ব্যাপারে বাবার সঙ্গে কথা বলব - তাকে জিজ্ঞেস করব -”

“তুমি জিজ্ঞেস করবে না - তুমি অবশ্যই দাবি জানাবে! সবকিছুর পর, তার চাবুক তোমার হাতেই রয়েছে। এখানে তুমি ছাড়া অন্য কেউ নেই, যার কাছে সে এ জমিদারির তদারকির দায়িত্ব চাপাতে পারে। সোবেক এখনো যথেষ্ট অবাধ্য, তোমার বাবা তাকে বিশ্বাস করেন না, আর আইপি বয়সে খুব কাঁচা।”

“সেজন্যই হোরিকে রাখা হয়েছে।”

“হোরি এ পরিবারের কেউ নয়। তোমার বাবা তার বিবেচনায় ভরসা করেন কিন্তু তাই বলে নিজের কর্তৃত্ব তার হাতে তুলে দেবেন না। কিন্তু আমি দেখছি যে তুমি নিতান্তই মেনিমুখো আর সস্তা। তোমার শিরায় রক্ত  নয়, যেন দুধ বইছে!  তুমি আমার বা আমাদের বাচ্চাদের কথা ভাবো না। তোমার বাবা মারা যাবার আগ পর্যন্ত আমরা কি প্রাপ্যটুকু বুঝে পাব না!

ইয়ামোস ভারী গলায় বলে:

“তুমি আমাকে তাচ্ছিল্য করছ, তাই না সাতিপি?”

“তুমি আমাকে রাগাচ্ছ।”

“শোনো, আমি তোমাকে বলেছি যে বাবা বাড়ি এলে আমি তাকে এসব ব্যাপারে জানাব। প্রতিজ্ঞা করছি।”

সাতিপি দম চেপে ধরে বলে ওঠে :

“হ্যা- কিন্তু তুমি কীভাবে বলবে? মরদের মতো, নাকি ইঁদুরের মতো?”

২.

কাইট তার ছোট বাচ্চা আঙ্কের সঙ্গে খেলছিল। বাচ্চাটি সবে হাঁটতে শুরু করেছে এবং কাইট তাকে হাসিমুখে তানানানা করতে করতে উৎসাহ দিচ্ছিল। কাইট বাচ্চাটির সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসে সামনের হাতটি বাড়িয়ে রেখেছিল, যতক্ষণ পর্যন্ত না অনিশ্চিতভাবে পা বাড়িয়ে এগিয়ে আসতে আসতে বাচ্চাটি তার মায়ের বাহুতে ধরা দিচ্ছিল।

কাইট পুরো ব্যাপারটি সোবেককে দেখাতে চাইছিল, কিন্তু অচিরেই সে বুঝে উঠল যে সে এদিকে মনোযোগী নয় বরং কপাল কুঁচকে বসে ছিল।

“আহ সোবেক, তুমি দেখছ না। সোনামণি, তুমি তোমার বাবাকে বলে দাও যে সে দুষ্টুমি করছে তোমার কা-কারখানা না দেখে।”

সোবেক  বিরক্তভরা কণ্ঠে খেঁকিয়ে ওঠে:

“আমি অন্য কিছু ব্যাপারে ভাবছি, সেসব নিয়ে দুশ্চিন্তা হচ্ছে।”

কাইট তার গোড়ালির হিল পেছনে ফেরায়,  তার ঘাড়ের ওপর ফেলে রাখা মসৃণ চুলগুলো সোজা করে। বাচ্চাটির আঙুলগুলো তাকে ধরে রেখেছিল।

“কেন? কোথাও কি ঝামেলা হয়েছে?”

কাইটের কথাতেও মনোযোগ ছিল না। প্রশ্নটা যেন দায়সারাভাবে করা হয়েছে।

সোবেক রেগে গিয়ে বলে:

“সমস্যা এটাই যে আমাকে বিশ্বাস করা হয় না। আমার বাবা একজন বৃদ্ধ, তার চিন্তা ভাবনা একেবারেই সেকেলে ধরনের, এবং জমিদারির প্রতিটি ব্যাপারে তার খবরদারি করা চাই - তিনি আমার ভরসায় কিছুই ছেড়ে দিতে চান না।”

কাইট তার মাথা নামিয়ে অস্পষ্টভাবে প্রতিবাদ করে-

“আসলেই, এটা খুব খারাপ ব্যাপার।”

ইয়ামোস যদি আরেকটু সাহসী হত আর আমাকে সমর্থন করত তবে বাবাকে বাগে আনা তেমন কঠিন হত না। কিন্তু সে আসলে ভীতুর ডিম। বাবা চিঠিতে তাকে যেসব নির্দেশ দেন, সে সবই ঘাড় গুঁজে পালন করে।”

কাইট বাচ্চার গলায় থাকা জপমালা ঝাঁকাতে  ঝাঁকাতে বলে :

“আসলেই, ঠিক বলেছ।”

কাঠের ব্যাপারে আমি অবশ্যই আমার বিবেচনা বাবাকে জানাব তিনি বাড়ি এলে। এটা ঢের ভালো হয়েছে তেলের বদলে শনবাবদ দাম গ্রহণ করায়।”

“আমি নিশ্চিত, তুমি ঠিক কাজই করেছ।”

“কিন্তু  বাবা তার গৎবাধা পথের বাইরের যে কোনো ব্যাপারেই বাধা দেন। তিনি হম্বিতম্বি করবেন, আমি তোমাকে তেলের দামে এ ব্যবসা করতে বলেছিলাম। আমি জমিদারিতে না থাকলে সবকিছুই ভুলভাবে করা হয়। তুমি একটি বোকা বালক, যে কিছুই করতে জানো না। আমার বয়স কত, সে ব্যাপারে তিনি কী মনে করেন? তিনি বোঝেন না যে আমি আমার কালের পূর্ণাঙ্গ একজন মানুষ এবং তিনি বিগত হচ্ছেন! তার নির্দেশ এবং তার দৃষ্টিতে অপ্রাসঙ্গিক এমন যে কোনো লেনদেনের মানে হলো আমরা ব্যবসায় উন্নতি করতে পারি না অথচ আমরা তা করছি। ধনী হতে হলে কিছু ঝুঁকি তো নিতেই হবে! আমার দূরদৃষ্টি ও সাহস আছে, বাবার কোনোটিই নেই।”

বাচ্চার ওপর চোখ রেখে কাইট ধীরগলায় বলে :

“তুমি খুব বেপরোয়া ও চালাক, সোবেক।”

“কিন্তু তিনি যদি বাড়ি সংক্রান্ত কিছু সত্য ব্যাপারে এখন জানতেন এবং তাতে দোষ খুঁজে বের করে আমাকে নাকাল করতেন, তবে বেশ হত! আমাকে যদি নিজের মতো করে চলার সুযোগ দেয়া না হয়, আমি এসবে থাকব না। বরং চলে যাব।”

কাইট বাচ্চাটির দিকে হাত বাড়ায়, তার দিকে মাথা ঘুরিয়ে পাকড়াও করার ভঙ্গিতে বলে-

“চলে যাবে? কোথায় যাবে তুমি?”

“যে কোনো জায়গায়!  এটা মেনে নেয়া আমার পক্ষে অসম্ভব ব্যাপার যে একজন উচ্ছৃঙ্খল, আত্মকেন্দ্রিক মানুষ আমাকে কোনোভাবেই নিজের মতো কাজ করার সুযোগ দিচ্ছেন না। তাহলে আমি কী করব?”

“না, কাইট কৌশলী ভঙ্গিতে বলে “আমি বলছি সোবেক, না।”

সোবেক স্ত্রীর দিকে তাকায়, কাইটের কণ্ঠস্বর খেয়াল করে তার উপস্থিতি বুঝতে পারে।  সে তার স্ত্রীর প্রতি এতটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল যে কোনো ব্যাপারে আলাপের ক্ষেত্রে কাইট যে মানুষ হিসেবে নিজস্ব অস্তিত্ব বহন করে, তারও যে নিজস্ব চিন্তা করার সামর্র্থ্য আছে, তা সে ভুলেই বসেছিল।

“তুমি কী বলতে চাও, কাইট?”

“আমি এটাই চাই যে তুমি বোকামি করবে না। পুরো জমিদারির মালিকানা তোমার বাবার নামে - জমি, সেচব্যবস্থা, গবাদি পশু, কাঠ, শনের খেত - সব। তোমার বাবার মৃত্যুর পর এসবই তোমাদের হবে তোমার আর ইয়ামোসের আর আমাদের বাচ্চাদের। তুমি তোমার বাবার সঙ্গে ঝগড়া করলে এবং চলে গেলে তখন তিনি তোমার ভাই ইয়ামোসে ও আইপির মাঝে তা ভাগ করে দিতে পারেন। তাছাড়া তিনি আইপিকে অত্যধিক ভালোবাসেন। আইপি তা জানে বলেই কাজে লাগানোর ধান্দা করে। তুমি আইপির হাতের খেলনা হবে না। এটা তাকে খুব ভালো সুবিধা দেবে, যদি তুমি ইমহোটেপের সঙ্গে ঝগড়া করে চলে যাও। আমাদের অবশ্যই বাচ্চাদের দিকটা নিয়ে ভাবতে হবে।”

সোবেক তার দিকে তাকায়, তারপর বিস্ময়ের হাসি হাসে।

“একজন নারীকে আগেভাগে কখনোই বোঝা যায় না। আমি আগে টের পাইনি, কাইট, যে তুমি এত বুদ্ধিমতি।”

কাইট আন্তরিকভাবে বলে:

“তোমার বাবার সঙ্গে ঝগড়া কর না। তার কথার জবাব মুখে মুখে দিও না। আর কটাদিন সবুর কর।”

“তুমি বোধহয় ঠিকই বলছ, কিন্তু এই অবস্থা কয়েক বছর যাবত চলতে পারে। বাবা চাইলে আমাদেরকে তার জমিদারীতে অংশীদার করে নিতে পারে।”

কাইট মাথা নেড়ে বলে

“তিনি তা করবেন না। কারণ তিনি একথা বলতে ভালোবাসেন যে আমরা তার ঘাড়ে চেপে খাই, তার ওপর ভর করে বেঁচে আছি, তিনি না থাকলে আমাদের বাঁচবার জো নেই।”

 সোবেক কৌতূহলভরে তাকে দেখে।

“তুমি আমার বাবাকে তেমন পছন্দ কর না, কাইট।”

সে প্রসঙ্গে কথা বলার বদলে কাইট বাচ্চার প্রতি মনোযোগ দেয়।

“এসো, সোনামণি, - দেখ, এই যে তোমার পুতুল।”

সোবেক তার বাঁকানো কালো চুলের দিতে তাকায়। তারপর খানিকটা বিভ্রান্ত মুখে সে ফিরে যায়।

৩.

এশা তার নাতি আইপিকে ডেকে পাঠিয়েছে। সেই সুদর্শন কিশোর যৌবনে পদার্পণ করছে, চেহারাতে অসন্তোষের ভাব প্রবল। পাশে দাঁড়ানো তরুণকে বৃদ্ধা বেশ তীক্ষ্ম কণ্ঠে শাসাচ্ছিলেন। তার চোখজোড়া ম্লান আর ইদানীং তেমন ভালোভাবে দেখতে না পেলেও এখন সেগুলো যেন জ্বলছিল.

“আমার কানে এসব কী আসছে?” তোমার হাজারটা বায়না, এটা করবে না, ওটা করবে না! তুমি গবাদি পশুর দেখাশোনা করতে চাও, ভালো কথা। কিন্তু তুমি ইয়ামোসের সঙ্গে যেতে চাও না, খেতের কাজের তদারকিও করবে না, এ কেমন কথা? তোমার মতো একটা বাচ্চা ছেলে যখন এসব বায়না করে, তার ফল  কী হয়, জানো?”

আইপি অদ্ভুতভাবে বলে :

“আমি কচি খোকা নই। আমি বড় হচ্ছি, তবে কেন আমাকে ছেলেমানুষ ভাবা হবে? আমাকে কাজের হুকুম দেয়া হবে আর নিজের মতো করে কাজ জন্য কোনো  ভাতাও আলাদাভাবে পাব না! ইয়ামোস আমাকে সবসময় কাজের হুকুম দেয়! সে কি ভাবে?”

“সে তোমার বড় ভাই আর তোমার বাবা জমিদারিতে না থাকলে এর দায়িত্ব ইয়ামোসের ওপর অর্পিত।”

“ইয়ামোস নির্বোধ - ধীরগতির নির্বোধ। আমি তারচেয়ে ঢের চালাক। সোবেকও বোকা কারণ সে খুব ফুটানি মারে যে ভারী বুদ্ধিমান!  বাবা চিঠি লিখে জানিয়েছেন যে আমি আমার পছন্দসই কাজ করতে পারব।”

“ব্যাপারটা মোটেই তেমন নয়” বিরক্তিসহ এশা বলে।

“আর আমি যদি আরো বেশি খাবার ও পানি না পাই আরি তিনি যদি শোনেন যে আমি অসন্তুষ্ট  এবং  কেউ আমার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেনি, তিনি ক্ষিপ্ত হবেন।”

কথা বলার সময় সে চতুর, বাঁকানো হাসি হাসে।

“তুমি অকালে পেকেছ”, এশা সজোরে বলে। “ ইমহোটেপকে ব্যাপারটা জানাতে হয়।”

“না.  দাদী, তুমি তাকে এসব বলবে না।”

তার হাসি বদলে যায়। কিছুটা দুঃখভারাক্রান্তভাবে সে অনর্থকই বলে :

“এ বাড়িতে শুধু তোমার আর আমার মাথায় খানিকটা ঘিলু আছে।”

 “তোমার বিদ্বেষ!”

“আমার বাবা তোমার ওপর ভরসা করেন - তিনি জানেন, তুমি বিচক্ষণ।”

“তা হতে পারে - আসলে ব্যাপারটা ঠিক তেমন -  কিন্তু আমি তোমার কাছ থেকে এসব শুনতে চাই না।”

আইপি হাসে।

“তুমি আমার পক্ষে থাকলে ভালো হত, দাদী।”

“এই পক্ষাপক্ষির মানে কী?”

“বড় দুই ভাই খুবই বিরক্তিকর। তুমি তা জানো না? অবশ্যই জানো। হেনেট তোমাকে সবকিছু বলে।  সাতিপি যেভাবে আর যতভাবে সম্ভব দিনরাত ঘ্যানঘ্যান করে ইয়ামোসের হাড় মাংস জ্বালিয়ে খায়। আর এদিকে সোবেক গাধামি করেছে কাঠ কেনার ব্যাপারে  আর বাবা বাড়ি এসে তা জানলে ভয়ানক ক্ষেপে যাবে। তুমি দেখো দাদী, দুয়েক বছরের মধ্যেই আমি বাবার জমিদারির অংশীদার হয়ে যাব আর তারপর আমি যেভাবে চাইব, বাবা সবকিছু সেভাবেই করবে।”

“তুমি, পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্য হয়ে এভাবে ভাবছ?”

“ বয়স নিয়ে ভাবার দরকার কী! বাবার হাতে পুরো জমিদারির ক্ষমতা আছে আর আমি জানি, তাকে কীভাবে বাগে আসতে হবে!”

“এসব ধান্দাবাজি ছাড়ো!”

আইপি নরম গলায় বলে:

“দাদী, তুমি তো বোকা নও! তুমি বেশ ভালোই জানো, বাবা ওপরে যতই হম্বিতম্বি করুক, ভেতরে ভেতরে খুবই দুর্বল মানুষ!”

আইপি হঠাৎ কথা বলা বন্ধ করে। সে খেয়াল করে, দাদী মাথা তুলে তার কাঁধের ওপর দিয়ে পেছনে চেয়ে আছে। সে নিজের মাথা ঘুরিয়ে দেখতে পায়, হেনেট তার ঠিক পেছনেই চুপিসারে এসে দাঁড়িয়েছে।

“তার মানে ইমহোটেপ একজন দুর্বল মানুষ”- হেনেট তার মৃদু ঘ্যাঙানো সুরে বলে, “তিনি মোটেই খুশি হবেন না, আমার মনে হয়, তুমি এই কথা বলেছ জেনে।”

আইপি অকারণে দ্রুত হেসে পরিস্থিতি সামলাতে চেষ্টা করে।

”কিন্তু তুমি তাকে বলবে না, হেনেট। ... এখন বলো তো আমাকে ... প্রতিজ্ঞা করছ, প্রিয় হেনেট ...”

হেনেট এশার দিকে পিছলে যায়। সে তার গলা মৃদু চড়ায়।

“অবশ্যই, আমি কখনো চাই না কোনো ঝামেলা পাকাক ... তুমি তা জানো, আমি তোমাদের সবার কথাই ঘাড়গুঁজে মেনে চলি। আমি কখনোই কোনোকিছু বারবার করি না, যদি না মনে হয় যে এটা আমার কাজ”

“আমি দাদীকে খোঁচাচ্ছিলাম, ব্যাপারটা ¯্রফে এটুকুই!” আইপি বলে। আমি বাবাকে বলব। তিনি নিশ্চয়ই বুঝবেন যে আমি মোটেই  গুরুত্বসহযোগে ব্যাপারটা সম্পর্কে বলিনি।

সে তীক্ষè দৃষ্টিতে হেনেটের দিকে চেয়ে ঘাড় ফিরিয়ে চলে যায়।

 হেনেট তার দিকে চেয়ে এশাকে বলে-

“দারুণ একটা ছেলে - মরদ হয়ে উঠছে। আর কেমন টাস টাস করে কথাগুলো বলে গেল!”

এশা সতর্কভাবে বলে:

“সে বিপজ্জনকভাবে কথা বলে। তার মাথায় যেসব ছাইপাস ঘুরছে, সেসব আমার মোটেই পছন্দ নয়। আমার ছেলে আস্কারা দিয়ে তাকে মাথায় তুলেছে।”

“কে-ই বা তেমনটি করবে না! এমন নজরকাড়া, সুঠাম ছেলে।”

“ সুদর্শন হতে হলে মনটাও তেমন হতে হয়!” তীক্ষ্ম কণ্ঠে এশা বলে।

খানিকটা সময় চুপ করে ধীর গলায় এশা বলে:

“হেনেট - আমার দুশ্চিন্তা হচ্ছে।”

“ কেন, এশা? কেন তুমি এত ভাবছ? যা হোক, কর্তা দ্রুতই বাড়ি ফিরবেন এবং সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে যাবে।”

“তাই নাকি? আমার বিশ্বাস হয় না!”

খানিকটা সময় চুপ থেকে সে আবার বলে:

“আমার নাতি ইয়ামোস বাড়িতে আছে?”

“আমি খানিক আগে তাকে বারান্দার দিকে আসতে দেখেছি।”

“ যাও, তাকে গিয়ে বল, আমি তার সঙ্গে কথা বলব।”

হেনেট চলে যায়।  সে বারান্দায় এসে ইয়ামোসকে দেখে তাকে এশার খবর জানায়।

ইয়ামোস তখনই দাদীর ঘরে আসে।

এশা হঠাৎ বলে:

“ইয়ামোস, খুব দ্রুতই ইমহোটেপ এখানে আসবে।”

ইয়ামোসের শান্ত মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

“তাহলে তো বেশ ভালো হয়।”

“সবকিছুই তার পক্ষে আছে? বিষয়গুলোর বন্দোবস্ত করা হয়েছে?”

আমার বাবা যেভাবে বলেছেন,  আমার সাধ্যমতো সেভাবেই সবকিছু করা হয়েছে।

“আইপির ব্যাপার কী?”

ইয়ামোস দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

“বাবা একেবারেই অসচেতন, যা আইপি খুব ভালোই জানে। এটা তার জন্য শুভ কিছু বয়ে আনবে না।”

“তুমি অবশ্যই এ ব্যাপারে ইমহোটেপকে স্পষ্ট করবে।”

ইয়ামোস সন্দিহান হয়ে ওঠে।

এশা দৃঢ়ভাবে বলে ওঠে:

“আমি তোমার পাশেই আছি।”

“ কখনো কখনো”, ইয়ামোস দীর্ঘশ্বাস জড়ানো গলায় বলে, “চারপাশে বাধা ছাড়া আর কিছুই যেন দেখা যায় না। কিন্তু বাবা আসলে সব ঠিক হয়ে যাবে। তিনি নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন করণীয় সম্পর্কে। তিনি যা যা করতে নির্দেশ দিয়ে গেছেন, তার অনুপস্থিতিতে সেসব করা কঠিন - কারণ আমার হাতে কোনো কর্তৃত্বই নেই, যদিও তার প্রতিনিধি হিসেবেই শুধু আমি আছি।”

এশা ধীরে বলে:

“তুমি ভালো ছেলে - বিনয়ী ও সজ্জন। তুমি দায়িত্ববান স্বামীও; তুমি সেই প্রবাদটি আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছ - একজন পুরুষের অবশ্যই তার স্ত্রীকে ভালোবেসে সংসার রচনা করা উচিত, যেন সে সেই নারীর সান্নিধ্য উপভোগ করতে পারে এবং ভরণপোষণ ও প্রয়োজনীয় সামগ্রীর বন্দোবস্ত করতে পারে এবং যতদিন তারা বেঁচে থাকে, যেন একে অন্যের মন জয় করে  চলতে পারে। কিন্তু এ কথার আরেকটা অর্থও আছে - তাকে সংসার সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে নাক গলানোর সুযোগ না দেয়া। আমি যদি তোমার জায়গায় থাকতাম, আমার নাতি, তবে আমি অবশ্যই এ ব্যাপারে ভাবতাম।

ইয়ামোসে তার দিতে তাকায় গভীর দৃষ্টিতে, তারপর সেখান থেকে চলে যায়।

আরও পড়ুন: মৃত্যুনীল নদের আখ্যান, পর্ব- ১

হাসান হাফিজের একগুচ্ছ কবিতা



হাসান হাফিজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ম্যানিলা ও নস্টালজিয়া

ও ম্যানিলা
তুমি আছো স্মৃতিপটে,
ওগো প্রিয় ম্যানিলাসুন্দরী
তৃষিতের ওষ্ঠ তুমি ভিজিয়েছো
স্যান মিগ্যুয়েল নামে বীয়ারে মাদকে
‘পিনোটুবুু’ অগ্নিগিরি
খুব কিন্তু দূরে নয়
দ্বীপ দেশ ফিলিপিন্স
ঔপনিবেশক স্মৃতি কী দুঃসহ
একটানা চারশো বছর
দীর্ঘ দীর্ঘকাল পরে
মুক্তিস্বাদ পেয়েছো যে তুমি
সেই কটু অম্লস্বাদ
স্মৃতি হয়ে বুকে বেঁধে
‘মুক্তি’ দ্যায় উপশম
সুতন্বী উচ্ছল হও মনোরমা
দ্বীপকন্যা সুছন্দা ম্যানিলা।

অসহ দংশন

না-বৃষ্টি না-রোদ
এমন ধূসর দিনে
কেন ছুঁতে চেয়েছে সে
তোমার পেলব হাত
শৈল্পিক আঙুল
চুম্বনের অধিকার
ওরা কিন্তু দ্যায় নি যুবাকে
সন্ধ্যার আঁধারবেলা
সেই স্মৃতি অনশ্বর
জ্বলজ্বলে নক্ষত্রস্পর্ধায়
অমলিন চিরক্ষণ জলরঙ ছবি হয়ে
জেগে থাকে ঠোকরায়
না-পাওয়ার অসীম তৃষ্ণায়...

একগুঁয়ে মাঝি

মন পোড়ে?
বৃষ্টি ওড়ে?
মনের তো ডানা নাই,
কীভাবে বৈদেশ যাবে
বন্ধুয়া-হদিস পাবে
প্রশ্ন এইটাই।

বৃষ্টি পড়ছে
আছড়ে পড়ছে
মৃত্তিকার আলিঙ্গনে
এবং সম্ভোগে
সার্থকতা জলের প্রেমের।
দেখেছ প্রেমের মড়া?
কোনোদিন ডুবেছে সে জলে?

মন পোড়ে?
আহা বাহা পুড়ুক জ্বলুক
পোড়াই নিয়তি
বাহক দুর্গতি
ছিল যে কপালে লেখা
কীভাবে খ-াবে?
মনের বৈরাগী মাঝি
ফিরে আসতে নয় রাজি
চড়েছে সে একগুঁয়ে
ভাঙাচোরা ডিঙি নৌকায়।

নিরালায় সন্ধ্যাকালে

যাও পাখি যাও
পরানবন্ধুরে গিয়া
স্মরণ করাও
দুঃখিনীরে একলা রাইখা
কী মজা সে পায়?
এবার নাগালে পেলে
রশি দিয়া বাইন্দা রাখব
সতত পঞ্চল বন্ধে
এইবার দেইখা নিব কীভাবে পলায়!
শরমের খেতা পুড়ি
ওরে পাইলে এই ঘুরি
উইড়া চলি পাতায় পাতায়
যাও পাখি বলো তারে
এবার সে আসতে পারে
দুই বন্ধু বসব গিয়া
পুরানা দীঘির পাড়ে
নিরালা সন্ধ্যায় কালে
প্রাচীন ঘাটলায়
ও বন্দু সারলী হাঁস
খুঁচিয়ে কী মজা পাস?
সবকিছু ছাইড়া ছুইড়া
নিজ গৃহে সোজা চইলা আয়!


গত্যন্তর নাই

বিশ্বাস ভেঙেছো তবু
তোমাকে বিশ্বাস করি
পুনরায় প্রতারিত হতে চাই
ক্ষতি আর কতটুকু হবে?
সর্বনাশ পোড়া ছাই
লানতের অন্ত নাই
তোমাদ্বারা সকলই সম্ভব
যদি অসম্ভব হয়
আমি তবে বেপথু নাচার
পথ খোলা নাই যে বাঁচার
আমার কী গতি হবে তবে?


আশাভঙ্গ

এতোটা পথ
পাড়ি দিলাম একা
ভেবেছিলাম
হয়তো পাবো দেখা।
জানতাম না অদর্শনই
এই কপালের লেখা।
ভেবেছিলাম সরল তুমি
এখন দেখি জটিল বক্ররেখা!


নৈকট্য তো ছিল না কপালে

ক.
খুঁজতে খুঁজতে একদিন
হয়তো পেয়ে যাবো
ভয় কিন্তু জাগরুক
পেলে পর নিশ্চিত হারাবো!

খ.
কাঁটা ও সংশয়
সমস্ত জীবনব্যাপী
ভিলেনের মতো জেগে রয়।

গ.
জারিজুরি সবই হলো ফাঁস।
জানতে না আমার হৃদয়মধ্যে
বাস করে অপরূপ আন্ধা সর্বনাশ?
আমি কিন্তু জানতাম
সে কারণে কাছে ঘেঁষতে
চাইতাম না মোটের উপর
নৈকট্য নিয়তি নয় জানা ছিল
কিন্তু করতে পারি নাই
তোমাকে ত্যাগের মতো ছিন্ন উপবাস।

 

;

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু



হাসিবুর রহমান
পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

  • Font increase
  • Font Decrease

 

কোন জাতির উত্থান-পতন, আবেগ, ভবিষ্যৎ নির্মাণে মিশে থাকে ইতিহাসের  সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম উপাদান । কেউ ইচ্ছে করলেই তাকে যেমন বদলে দিতে পারে না, ঠিক তেমনি আদর্শগত দিক থেকে কোন জাতিকে বিপথে চালিতে করতে পারে ভুল ইতিহাস। ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে অষ্টাদশ শতকের বাংলা নানা কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে, বাংলার আর্থিক সমৃদ্ধির সুনাম সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই সময়। শান্তি সমৃদ্ধির চূড়ান্ত এক পর্যায়ে ১৭৫৭ পলাশির অন্ধকার নেমে আসে এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটনো হয়।

দ্বিসার্ধশত বছরের পলাশি যুদ্ধের বহুমাত্রিক আলোচনা হয়েছে ঠিকই কিন্তু নবাব সিরাজউদ্দৌলার রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে জনসমাজে বিভ্রান্তিকর, কাল্পনিক গল্পও ছড়ানো হয়েছে । দেশী-বিদেশী ঐতিহাসিকরা তাঁকে লম্পট, দুশ্চরিত্র, কটুভাষী, হৃদয়হীন রূঢ়  চতুষ্পদ পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট স্বভাবজাত বলে মিথ্যা ও কলঙ্কের অপবাদে মুড়ে দিয়েছেন। সমকালীন যুগের ফারসি ভাষার মুসলমান,  ইংরেজ লেখক কেউই তাঁর প্রতি সুবিচার করে কলম ধরেননি।

তবে, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, নিখিল নাথ রায় আধুনিক কালে সুশীল চৌধুরীর মতো ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিকরা  সিরাজউদ্দৌলার মত দেশপ্রেমিক নবাবকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে যেভাবে মূল্যায়ন করে বিপথগামী ইতিহাস চর্চার ধারাকে থমকে দিয়েছেন- এটাও ইতিহাসবেত্তাদের সততা, স্বচ্ছতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বরূপ। 

বর্তমানে অধিকাংশ ঐতিহাসিক পলাশির যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে বিস্তর লেখালেখিতে আগ্রহী। কিন্তু তাঁরা দেখেন না, দেখতে চান না যে পলাশি হলো একটি  পরিণতি । ষড়যন্ত্র আর সামরিক আগ্রাসনের একটি সুদূরপ্রসারী ফলাফল। তাঁরা পলাশি পরবর্তী সময়ে ইংরেজ কর্তৃক ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার বৈধতা দিতে সিরাজের বিরুদ্ধে সীমাহীন মিথ্যা যুক্তির জাল বুনেছিল, আসলে এছাড়া ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার অন্য কোন বৈধ উপায় তাঁদের হাতে অবশিষ্ট ছিল না।

মাত্র চৌদ্দ মাসের শাসনকালে অবাধ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔদ্ধত্যকে  দমন করতে সিরাজের দৃঢ়তা, সাহসিকতা, কঠোরতা দেখিয়েছিলেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। বাংলার মাটিতে বিনা অনুমতিতে ইংরেজদের দুর্গ নির্মাণ, কিংবা কর্মচারীদের  অবাধ "ব্যক্তিগত বাণিজ্য" বন্ধ করা তাঁর কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একজন স্বাধীন নবাবের চোখে সার্বভৌমিকতার প্রশ্ন এখানে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু সিরাজের দুর্ভাগ্য তাঁর দরবারের পদস্থ বিশ্বাসী অমাত্য গোষ্ঠী, অনেকেই ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের আশায় কোম্পানির ষড়যন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। জগৎ শেঠদের মতো দেশীয় বণিকরাও এই ষড়যন্ত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

ঘরে বাইরে শত্রু পরিবেশিত সিরাজ দৃঢ়তার সঙ্গে এই অশুভ শক্তির মোকাবেলায় সফল হননি বটে , কিন্তু তাঁর স্বদেশভূমি রক্ষার লড়াইকে হীন চোখে দেখা অনৈতিহাসিক। পলাশি নামক বিয়োগান্ত ঘটনার পর  তাঁকে  চরম অপমান আর অমর্যতার সম্মুখীন হতে হয়। যে নিষ্ঠুরতা তাঁর সঙ্গে পলাশির পর দেখানো হয়েছিল ইতিহাসে তা বিরল। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সিরাজুল ইসলাম লিখেছেন, প্রকৃতপক্ষে সমকালীন শাসকশ্রেণীর মানদণ্ডে সিরাজউদ্দৌলার চারিত্রিক দৃঢ়তা, অত্যন্ত সাহসিকতা ও অসাধারণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ বিস্ময়কর বটে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সাম্প্রতিক কালেও ইংরেজদের ভারতবর্ষ দখলের বৈধতা দান করতে গিয়ে একশ্রেণীর ইতিহাসবিদ সিরাজকে নিয়ে নতুন নতুন কাহিনী, উপাখ্যান ম্যানুফ্যাকচার করে ইতিহাস হিসাবে প্রচার করে চলেছেন। তাঁরা বলেন-- সিরাজের মৃত্যু কোন শহীদের মৃত্যু নয় । কারণ তিনি মধ্যযুগীয় রাষ্ট্রব্যবস্থাকে রক্ষা করতে লড়াই করেছিলেন মাত্র, যেখানে জনসমাজের সঙ্গে তাঁর কোন সম্বন্ধ ছিল না। অথবা একথা বলা হয় যে বাংলার নবাব হিসেবে কেন্দ্রীয় মুঘল শাসকদের দ্বারা কোন লিখিত বৈধ অনুমোদন তাঁর ছিল না ইত্যাদি।

সিরাজের মৃত্যু কোন শহিদের মৃত্যু কিনা সে বিষয়ে বিতর্ক থাকা অকল্পনীয়। তাঁর দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা ইতিহাস-বিরুদ্ধ। এছাড়া শাসনের বৈধতার দিক থেকে বাংলার নবাবরা নিয়মিত দিল্লি সম্রাটদের রাজস্ব প্রদান করতেন, সিরাজ ও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। দেশের অভিন্ন মুদ্রা ব্যবস্থা বাংলাতেও চালু ছিল। কাজেই  অভিযোগকারীরা কি ধরনের 'দেশপ্রেম' ও 'জাতীয়তাবোধ' সিরাজের কাছে প্রত্যাশা করছেন তার কোন ইতিহাস সম্মত ব্যাখ্যা হয় না। দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব তিনি অস্বীকার করেননি এখানেই তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক অবদান।

সিরাজউদ্দৌলার নিরন্তর লড়াই এর সঙ্গে যুক্ত ছিল আপামর বাংলার মানুষের জীবন ভবিষ্যৎ। পলাশিতে যদি নবাবকে না হারতে হত তাহলে বাংলার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত নিশ্চয়। দীর্ঘ দু'শো বছরের ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণের জর্জরিত দেশবাসীর মনে হীনমন্যতাপদের জন্ম নিত না। স্বাধীনতার শত্রুদের সেদিন যথার্থভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। দেশপ্রেমিক নবাবের মৃত্যুকে কেবল ক্ষমতার হাত বদল বলেই ভেবেছিল একশ্রেণীর মানুষ। ক্ষমতাসীন নবাবের লাশকে সেদিন জনগণের ঘৃণা ও অপমানের বস্তু করে তুলেছিল। নবাবের অনুগ্রহে যাদের একসময় জীবন জীবিকা নির্ভর করত তারাই দেশপ্রেমিক সিরাজকে নির্মমভাবে হত্যা করল, মৃতদেহটি পশুর মত ডাস্টবিনে ছুঁড়ে দিয়েছিল। সমকালীন যুগের এই ঘৃণ্য প্রতিশোধ যেকোনো জাতির কাছেই বড় লজ্জার।

 

অথচ যে নবাব চরম বিপদের মুহূর্তে দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি, কারোর প্রতি  শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি, তাঁর সেই মহানুভবতা ও উদারতাকে কেউ মূল্যায়ন করতে চায় না। ম্যালেশন যথার্থই মন্তব্য করে করেছেন  যে, পলাশির আগে-পরে একমাত্র সিরাজের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কোন সম্পর্ক ছিল না।

একথা সত্যি যে, বাংলার নবাবদের মধ্যে সিরাজই বোধহয় দেশকে একটু বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলেন। তিনি মুর্শিদকুলি খান, সুজাউদ্দিন, সরফরাজ বা আলিবর্দী খানের মতো গা ভাসিয়ে চলতে পারতেন তাহলে তাঁকে অন্তত অকালে প্রাণ দিতে হতো না। হতভাগ্য রাজ্যহারা নবাব জীবনের অন্তিম সময়ের প্রাণ ভিক্ষার জন্য প্রত্যেকের পদতলে লুটিয়ে পড়েছিলেন কিন্তু সেদিন তাঁর করুণ আর্তি শুনতে পাইনি কেউ। ফলে বাংলার ইতিহাসে চিরকাল কালো অধ্যায় হিসেবে ১৭৫৭ সালের ৩রা জুলাই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তাঁকে জীবন ভিক্ষার পরিবর্তে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। নিষ্ঠুর, ঘৃণিত সেই হত্যাযজ্ঞ আজও মানুষের হৃদয়ে কম্পিত হয়। দেশ রক্ষার লড়াইয়ে পরাজিত হয়েও মানুষের মনে তিনি চিরদিন স্বাধীনতার স্পৃহায় অমর হয়েই থাকবেন, এটাই অকালপ্রয়াত নবাবের জন্য  শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি।

(প্রাবন্ধিক আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক।)

 সহায়ক তথ্যসূত্র :

১) যদুনাথ সরকার ,  বেঙ্গল নবাবস, এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা ,১৯৫২

 ২) ডঃ সুশীল চৌধুরী, পলাশির অজানা কাহিনী, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।

৩) ড: মোহম্মদ মোহর আলি,  হিস্টরি অব দ্য মুসলিমস অফ বেঙ্গল, ২খন্ড ,রিয়াধ ১৯৮৮।

৪) অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, সিরাজদ্দৌলা, কল্লোল, কলকাতা।

৫) ড : সিরাজুল ইসলাম , বাংলাদেশের ইতিহাস , খন্ড ১ম ( ১৭৫৭-১৯৭১) সম্পাদনা , এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ ২০১৭ ।

৬) আ:কা: মো: যাকারিয়া, সিরাজউদ্দৌলা , প্রথমা , ঢাকা ।

;

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ও শিশুসাহিত্যিক ফখরুল হাসান। ২৩ জুন বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে তার হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ৬ লেখককে সম্মাননা, ‘শেখ হাসিনার জয় বিশ্বের বিস্ময়’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, আবৃত্তি, ছড়া পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় সৈয়দ মাসুম, আর মজিব, এনাম আনন্দ, ফাহমিদা ইয়াসমিন, লুৎফর রহমান চৌধুরীকেও সম্মাননা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ আন্তর্জাতিক পর্ষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদের আয়োজনে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. শাহজাহান মৃধা বেনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ও জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি অসীম সাহা, মারুফুল ইসলাম, তারিক সুজাত ও অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন।

কবিতা আবৃত্তি করেন জালাল উদ্দিন নলুয়া, ড. তপন বাগচী, শফিকুর রাহী, রিফাত নিগার শাপলা, আনতানুর হক, হানিফ খান, ইউসুফ রেজা, রোকশানা সাথী, জমশেদ ওয়াজেদ, মাসুদ আলম বাবুল, মাদবর রফিক, লুৎফর চৌধুরী, হাসনাইন সাজ্জাদী, গিয়াসউদ্দিন চাষা, হেনা খান, কৌমুদী নার্গিস, বোরহান মাসুদ, সৈয়দ একতেদার আলী, আলী নিয়ামত, মিহির কান্তি ভৌমিক, লুৎফা জালাল, তানিয়া মাহমুদ, শ্রাবণ রেজা, ইমরান পরশ, সৈয়দ তপু, মেরীনা সাঈদ, শাফিন প্রমুখ

;

সংশপ্তক শেখ হাসিনা



আবদুল হামিদ মাহবুব
আবদুল হামিদ মাহবুব

আবদুল হামিদ মাহবুব

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সংশপ্তক শেখ হাসিনা

কাণ্ড অনেক করে

পদ্মা বুকে ‘পদ্মা সেতু’

ঠিক দিয়েছেন গড়ে।

 

কাণ্ড ওসব নয় সাধারণ,

ভুলতে কি আর পারি?

জয় বাংলা জোরসে হেঁকে

ঠিক তো দিলেন পাড়ি।

 

অপেক্ষাতে সবাই আছি

মনটা উচাটন

ওই দিনটা জানান দিয়ে

আসলো শুভক্ষণ!

 

বাংলাদেশের এমন জয়ে

বিশ্ব জানুক, কি সুখ?

সব বাঙালি বুকের পাতায়

সুখের গাথা লিখুক।

;