স্মরণীয় ১০ জন যারা পেয়েছিলেন রাষ্ট্রের অবমাননা ও অবিচার (পর্ব ১)

দেবদুলাল মুন্না
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

অলঙ্করণ কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

পেছনে ফিরে দেখি। কী দেখি? অতীত। কিন্তু যে দলছুট হয়ে স্রোতে ভাসা মানুষের ভিড় থেকে চলে যায় অনেক আগে তাকেও তো পেছনে ফিরে তাকাতে হয়। পা সামনে এগুনো। কিন্তু একটি মুখ মুখ ফিরিয়ে দেখছে। সে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের সব বেদনা। একটু আলো জ্বেলেছিল। আমরা হয়তো বুঝিনি। হয়তো ড্যাশ ড্যাশ ড্যাশ। কিন্তু তার ওই দলছুট হয়ে এগিয়ে যাওয়ায় কম যন্ত্রণাবিদ্ধও হয়নি। মনে রেখেছি সেইসব মুখদের! তাদের অনেককেই তদানীন্তন সমাজ, শাসক, তথা রাষ্ট্রের চরম অবমাননা এবং অবিচারের মুখোমুখি হতে হয়েছে। এত এত মুখ। বলি মাত্র ১০ জনের কথা এ কিস্তিতে।

 

সক্রেটিস

সক্রেটিস এত গরীব ছিলেন যে প্রতিরাতে বাসায় ফেরার পর তাকে স্ত্রীর কাছে শুনতে হতো, ‘তুমি একটা কদাকার। মরো না কেন? বিষ খেতে পারো না!’ দেখতে খুব বিশ্রি ছিলেন। বিয়ে করেছিলেন কেন সেটিও জানতেন না। হয় না, হয়ে গিয়েছিল। সক্রেটিস সত্য ও যুক্তির কাছে সৎ ও একনিষ্ঠ থেকে অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি; বরং সেই বিষ মানে হেমলক খেয়ে অমর হয়ে গেলেন সবার মাঝে। খ্রিস্টপূর্ব ৪৭০ সালের দিকে সক্রেটিসের জন্ম গ্রিসের এথেন্স নগরীতে এলোপাকি গোত্রে, ছিলেন প্রাচীন গ্রিক ফিলোসফার। তিনি নিজে গরীবের গরীব কিন্তু সারাজীবন সকলকে বিনা পয়সায় শিক্ষা দিতেন। এত বড় পণ্ডিত, কিন্তু তাঁর মধ্যে অহংকারের লেশমাত্র ছিল না। কেউ তাঁকে রাগ করে কথা বলতে শোনেনি; নিজের সামান্য কর্তব্যটুকুও অবহেলা করতে দেখেনি। প্রথম জীবন কেটেছে ভাস্করের কাজ করে। সক্রেটিস কোনো এক সময় সামরিক বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। প্লেটোর বর্ণনায় সক্রেটিস বলেন, তিনি তিন তিনটি অভিযানে এথেনীয় সেনাবাহিনীর সাথে যোগ দিয়েছেন। এই অভিযানগুলো ছিল যখাক্রমে পটিডিয়া, অ্যাম্ফিপোলিস এবং ডেলিয়ামে। তিনি কখনো কোনো পেশা অবলম্বন করেননি, কারণ তিনি ঠিক তা-ই করবেন যাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন আর তা হচ্ছে দর্শন সম্বন্ধে আলোচনা। প্লেটোর লেখায় দেখা যায় সক্রেটিস কখনোই শিক্ষার বিনিময়ে অর্থ নেননি। বরঞ্চ তিনি তার দরিদ্রতার দিকে নির্দেশ করেই প্রমাণ দিতেন যে, তিনি কোনো পেশাদার শিক্ষক নন।

সক্রেটিসের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ ছিল তিনটি। ১. দেশের প্রচলিত দেবতাদের প্রতি উপেক্ষা প্রদর্শন। ২. নতুন নতুন দেবতার প্রবর্তন করার চেষ্টা। এবং ৩. তিনি(সক্রেটিস) যুবকদের নৈতিক চরিত্র কলুষিত করে তাদের বিপথে চালিত করছেন।

আরো পড়ুন ➥ বিখ্যাত সৃষ্টিশীলদের অবসাদ ও স্যাটায়ার

এথেন্সের তিনজন খ্যতিমান পুরুষ তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছিলেন। অভিযোগকারী তিনজনের নাম ছিল মেলেটাস, লাইকন এবং এনিতাস। প্রথমজন ছিলেন মধ্যম শ্রেণীর কবি, দ্বিতীয়জন ছিলেন বক্তা এবং তৃতীয়জন গণতান্ত্রিক নেতা।

সে সময় বিচারসভায় কোনো আইনজীবী থাকত না। অভিযোগকারী এবং অভিযুক্ত নিজেই নিজের পক্ষ সমর্থন করতেন। বিচারসভায় প্রথমে ওই তিনজন তাঁদের অভিযোগ বর্ননা করতেন—তারপর সক্রেটিস উঠে দাঁড়িয়ে বলেন নিজের কথা। সে এক বিচিত্র বিচার কাহিনী। ৫০০ জন জুরির সামনে বিচার। ৬০ ভোটের ব্যবধানে সক্রেটিস অপরাধী হিসাবে বিবেচিত হন। প্রথমেই তাঁর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হয়নি। বিচারের শেষ মুহূর্তে শাস্তি এড়াতে না পারলেও মৃত্যুদণ্ডকে এড়াতে পারতেন সক্রেটিস। তখন এথেন্সের বিচার ব্যবস্থায় অপরাধ চিহ্নিত হবার পর অপরাধীকে জিজ্ঞেস করা হতো, সে কী শাস্তি চায়। পাঁচশো জুরির উপস্থিতিতে সক্রেটিসকেও জিজ্ঞেস করা হলো, “আপনি কী শাস্তি চান।” কিন্তু যেহেতু তিনি নিজেকে অপরাধী মনে করতেন না তাই তার জবাব ছিল, “আমি দোষ করিনি কোনো। আমাকে পুরস্কৃত করা উচিত। প্রাইটেনিয়াম হলে (পাবলিক হল) আমার জন্যে বিশেষ ভোজের আয়োজন করা যেতে পারে।” প্রথাগতভাবে যা করা হতো গ্রিসের বীরদের জন্য। তাতে জুরিরা ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠেন, তাঁরা মনে করলেন, সক্রেটিস এই বিচারকে প্রহসন মনে করছে এবং তাঁদের উপস্থিতির সম্মান দিচ্ছে না। ফলে উচ্চারিত হলো, মৃত্যুদণ্ড। প্রথমে তাঁর বিরুদ্ধে জুরি ছিলেন ২৮০ জন এবং স্বপক্ষে ছিলেন ২২০ জন। তাঁর ওই উত্তর শুনে বিরুদ্ধে হয়ে গেল ৩৩০ জন। মৃত্যুদণ্ড বা শাস্তি নিয়ে সক্রেটিসের উদাসীনতার এখানেই শেষ নয়। শিষ্য আর বন্ধুরা চেয়েছিলেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সক্রেটিসকে মৃত্যুদণ্ডের আগে জেলে আটকে না রেখে জামিনে মুক্তি দেওয়া হোক। তখন এ প্রথাও ছিল। সক্রেটিস জামিন হিসেবে দিতে চেয়েছিলেন এক দীনা (রৌপ্যমুদ্রা)। তাঁর বন্ধুরা তৎক্ষণাৎ ব্যক্তিগত দায়িত্বে তিরিশ দীনা দিতে চাইলেন। কিন্তু সে প্রার্থনাও না-মঞ্জুর হয়েছিল। বিচারের প্রায় একমাস পর মৃত্যু হয় সক্রেটিসের, এসময় তিনি কারাগারে বন্দী ছিলেন। সক্রেটিসের মৃত্যুর সালটি ছিল খ্রিস্টপূর্ব ৩৯৯। মৃত্যুর আগে প্রার্থনা শেষ করে হেমলক তুলে নিলেন ৭০ বছরের সক্রেটিস। পান করে নিলেন সবটুকু হেমলক রস, এক নিঃশ্বাসে। কেউ বিষ পান করলে মুখভঙ্গি বিকৃত হয়। কিন্তু সক্রেটিসকে দেখে তা বুঝার উপায় নেই। তার মুখ বিন্দুমাত্র বিকৃত হয়নি। জলপানের মতো পান করেছিলেন তিক্ত বিষ। উপস্থিত সকলেই তার মৃত্যুতে উচ্চস্বরে কেঁদেছিলেন, এমনকি জেল কর্মকর্তার দু’চোখ ছিল অশ্রুসিক্ত। কিন্তু সক্রেটিসের চোখে না ছিল কোনো কান্না। না কোনো বিকার। শুধু একবার তার স্ত্রীর দিকে দৃষ্টি গিয়েছিল। কে জানে!

সেনেকা

স্টোয়িক দর্শনের অন্যতম এই পথিকৃৎ ও অসংখ্য ট্র্যাজেডি নাটকের রচয়িতার নাম সেনেকা। মৃত্যুও ছিল আরেক ট্র্যাজিক। পুরো নাম লুইস অ্যানিয়াস সেনেকা। তাঁর বাবার নামও কিন্তু লুইস অ্যানিয়াস সেনেকা। এজন্য সেনেকাকে অনেকে ‘সেনেকা দ্য ইয়াঙ্গার’ও বলে থাকেন। খ্রিস্টের জন্মের ৪ বছর পর অধুনা স্পেনের কর্ডোবায় জন্মেছিলেন সেনেকা। এর পরপরই পরিবারসমেত তারা চলে আসেন রোমে। শৈশব-কৈশোরে অ্যাটালাস ও সোশনের কাছে অলঙ্কারশাস্ত্রের সাথে স্টোয়িকও পাঠ নিয়েছিলেন সেনেকা। ছোটকাল থেকেই ক্ষীণকায় সেনেকার অসুখ-বিসুখ লেগেই থাকত। ২১ বছর বয়সে মিসরে যান। খালার ঐকান্তিক শুশ্রূষায় সুস্থ হয়ে সেনেকা ১৫ বছর পর পুনরায় ফিরে আসেন রোমে। রোমে ফেরার বছরই প্রত্যক্ষ ভোটে সেনেকা নির্বাচিত হন ম্যাজিস্ট্রেট। বাগ্মীতা ও দার্শনিক উৎকর্ষের রোমে অল্প সময়ে বেশ ভালোই প্রভাব কামিয়েছিলেন তিনি। পরের বছর (৩৭ খ্রিস্টাব্দ) যখন ক্যালিগুলা এলেন সম্রাটের গদিতে, বেঁধে যায় দুজনের ব্যক্তিত্বের সংঘাত, যা পরে রূপ নেয় শত্রুতায়। সম্রাট কর্তৃক মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েও ভাগ্যগুণে বেঁচে যান সেনেকা।

৪১ খ্রিস্টাব্দে ক্যালিগুলাকে হত্যা করে ক্ষমতায় এলেন ক্লডিয়াস। কিন্তু সম্রাটের সাথে বিরোধের চিত্রটা যেন পাল্টাল না। ক্লডিয়াসের স্ত্রী মেসালিনা এবার অভিযোগ দাগলেন ম্যাজিস্ট্রেট সেনেকার প্রতি। সেনেকা নাকি ব্যাভিচারে জড়িয়েছেন ক্যালিগুলার বোন জুলিয়া লিভিয়ার সাথে! ফলাফল, কর্সিকা দ্বীপে সেনেকাকে পাঠানো হলো শাস্তিস্বরূপ।

সেসময় তিনি মাকে চিঠি লিখতেন সান্ত্বনা জানিয়ে। এই চিঠিগুলোতে প্রতিফলিত হতো সেনেকার স্টোয়িক দর্শনের আত্মোপলব্ধি। স্টোয়িকবাদের স্রষ্টা হিসেবে পপুলার সেনেকা হলেও খ্রিস্টের জন্মের প্রায় ৩০০ বছর আগে এর জন্ম সিটিয়ামের দার্শনিক জেনোর হাত ধরে। সিটিয়ামের ‘স্টোয়া পয়কিলে’ নামক খোলা এক আর্ট গ্যালারিতে প্রথম এই দর্শনের প্রচার শুরু করেছিলেন জেনো। ‘স্টোয়া’ থেকেই তাই এলো ‘স্টোয়িসিজম’ নামকরণ।

জেনোর পর এই দর্শনকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রদান করতে ভূমিকা রাখেন মূলত তিন দার্শনিক—এপিক্টেটাস, সেনেকা ও অরেলিয়াস।

স্টোয়িকবাদ অনুযায়ী, আমাদের জীবন আসলে কোনো বাহ্যিক ঘটনা দ্বারা প্রভাবিত হয় না, বরং সে ঘটনাটিকে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে আমরা কিভাবে নিচ্ছি, তার ওপরই নির্ভর করে সমস্ত কিছু। ধরা যাক, আপনার ক্লাসের নোট খাতা হারিয়ে গেছে এবং আপনি ব্যথিত, কেননা পরীক্ষা আগামীকাল। কিন্তু এখানে আপনার কষ্ট পাওয়ার কারণ কিন্তু নোটখাতা নয়, বরং পরীক্ষায় কম নম্বর পাবার শঙ্কা। এখন স্টোয়িকবাদ কী বলে? স্টোয়িকবাদ আপনাকে বলবে ভাবনায় ইতিবাচকতা আনতে। ব্যাস, আপনি সুখী! দ্বিতীয়ত, কোনটি আপনার নিয়ন্ত্রণে আর কোনটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে, তা অনুধাবন করুন। এর দ্বারা ইচ্ছাশক্তিকেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন আপনি, কাজেকর্মে সফলও হবেন। যেমন ধরুন, আপনি একজনকে ভালোবাসেন, সে আপনাকে প্রত্যাখ্যান করছে কেননা আপনি মদ্যপান করেন ও বহুগামী। এখন আপনার তো তার মনের ওপর হাত নেই। কিন্তু নিজের মদ ছাড়ার ব্যাপারে তো নিয়ন্ত্রণ আছে। সুতরাং আপনি আপনার কাজটাই করেন দেখুন না! কাজ হলেও হতে পারে। যাক সেনেকার কথায় ফিরে যাই। আট বছর পর সেনেকাকে নাটকীয়ভাবে ফিরিয়ে আনেন সম্রাট ক্লডিয়াসের চতুর্থ স্ত্রী অ্যাগ্রিপিনা। সন্তান নিরোকে পরবর্তী সম্রাট বানাবার জন্য ক্লডিয়াসের কাছে সমস্ত তদবিরই করেছিলেন অ্যাগ্রিপিনা। সেই নিরোরই শিক্ষক নিযুক্ত করা হলো সেনেকাকে। ৫৪ খ্রিস্টাব্দে নিরো যখন ১৭ বছর বয়সে সম্রাট হলেন তখন আফ্রানিয়াস বুরাস ও সেনেকা সম্রাটের উপদেষ্টা নিযুক্ত হন। উপদেষ্টার উপদেশ নিরো কানে নিতেন যৎসামান্যই। সেনেকা, বুরাসের বাধা সত্ত্বেও মাকে হত্যা করতে তাই বাধেনি নিরোর। তবুও বুরাসের মৃত্যু অবধি তিনি নিরোর অনুগতই ছিলেন। অথচ একসময় নিরোর দালালিই করেছেন। পরে চাকরি ছেড়ে দেন। ৬২ খ্রিস্টাব্দে সম্রাটের চাকরি ছেড়ে সেনেকা পুরোদমে লেখালেখিতে সঁপে দিলেন নিজেকে। দার্শনিক গ্রন্থ ‘অন দ্য শর্টনেস অব লাইফ’-তাঁর সেরা মৌলিক (আপাত) কাজ। স্টোয়িকবাদ নিয়ে তাঁর অন্য ভাবনাগুলো এসেছে মাকে লেখা ও লুসিয়াসকে লেখা ৬৯টি চিঠিতে।

আরো পড়ুন ➥ মহান শিল্পীদের ক্ষত ও ভালোবাসাসমূহ

সম্রাটের উপদেষ্টা থাকাকালেই সেনেকা লিখেছিলেন রাজনৈতিক প্রহসন ‘দি আপোকোলোসিন্টোসিস’ এবং নাটক ‘ফিড্রা’। অবসরের পর ৬২-৬৫ খ্রিস্টাব্দ অবধি তিনি লিখেছেন অসংখ্য ট্র্যাজেডি নাটক ও গল্প। ‘দ্য ট্রোজান উইমেন’, ‘মেডিয়া’, ‘দ্য ফিনিশিয়ান উইমেন’, ‘দ্য ম্যাড হারকিউলিস’। তাঁর সর্বাধিক জনপ্রিয় ‘ইডিপাস’ ও ‘আগামেমনন’ ছিল যথাক্রমে গ্রিক উপন্যাস ‘সফোকলস’ ও ‘অ্যাসকাইলাস’ অবলম্বনে রচিত। তাঁর লেখায় ভার্জিল ও ওভিডের প্রভাব ছিল বলার মতো। এত ট্র্যাজেডি যার কলম থেকে বেরিয়েছে, তাঁর জীবনটাও ওই ট্র্যাজেডি দিয়েই শেষ হয়েছিল। ৬৫ খ্রিস্টাব্দে গায়াস কালপার্নিয়াস পিসো আর সেনেকার ভাতিজা লুকান মিলে ষড়যন্ত্র করেছিলেন নিরোকে হত্যা করবার। ভাতিজার সূত্রে কিভাবে যেন সেনেকার নামও জড়িয়ে পড়ে সেই ষড়যন্ত্রের অভিযোগে। ফলাফল, সেনেকার মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিলেন নিরো। তবে শিক্ষাগুরু হওয়ায় খানিকটা ‘দয়া’ করেন নিরো। জল্লাদ নয়, সেনেকার দণ্ড পালনের ভার দেওয়া হলো স্বয়ং সেনেকাকেই। সহজ মরণের জন্য দু’হাতের রগ কেটে ফেলেন সেনেকা। ভীষণ ক্ষীণকায় হওয়ায় রক্তপাতও তেমন হচ্ছিল না। এই দৃশ্য দেখে সেনেকার স্ত্রী পম্পিয়া পলিনাও হাত কেটে ফেলেন, তাকে অবশ্য উদ্ধার করেছিল সম্রাটের রক্ষীরা। যা-ই হোক, রগ কেটেও না মরতে পারায় সেনেকা পান করেন হেমলক বিষ। কাকতালীয়ভাবে তাতেও মৃত্যু হচ্ছিল না তাঁর, শুধুই যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন। শেষে সেনেকাই সৈন্যদের অনুরোধ করেন তাকে গরম পানির চৌবাচ্চায় ফেলতে। আজীবন শ্বাসকষ্টে ভোগা , ইনহেলার নেওয়া, সেনেকার শেষ নিঃশ্বাসটিও সেই চৌবাচ্চাতেই পড়েছিল। এই সেনেকাই বলেছিলেন, “দুঃখ করো না, বাঁচো।’ নিমলেন্দু গুণের একটা কবিতা আছে এ শিরোনামে। 

দান্তে

দান্তে ছিলেন ইতালিয়ান কবি, গদ্য লেখক এবং রাজনৈতিক চিন্তাবিদ। ফ্লোরেন্সের স্থানীয় ভেনেশিয়ান ভাষায় তাঁর তিন খণ্ডে লেখা জনপ্রিয় গ্রন্থ ‘দ্য ডিভাইন কমেডি’তে তৎকালীন গির্জার (চার্চের) ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সমসাময়িক রাজনীতির ব্যঙ্গাত্মক রূপ তুলে ধরা হয়েছিল। সেই জন্য দান্তেকে রোমে আটক করে রাখে পোপ। ফ্লোরেন্সে তার বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। দান্তের অনুপস্থিতিতেই তার অজান্তে তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তুলে বিচার করা হয় এবং রায়ও দিয়ে দেওয়া হয়। ১৩০২ সালের ২৭ জানুয়ারি, তাঁর বিরুদ্ধে পাঁচ হাজার ফ্লোরিন জরিমানা, দুই বছর ফ্লোরেন্স শহরে ঢোকার ওপরে নিষেধাজ্ঞা, দুই বছরের নির্বাসন দণ্ড এবং বাকি জীবনে আর কোনো দিন রাজনীতি করতে পারবেন না, এমনই শাস্তি দেওয়া হয়। কিন্তু দান্তে এই বিচার বা রায় কোনোটাই মেনে নেননি। পরে ১০ মার্চ ফের রায় দেওয়া হয় যে, দুই বছর নয়, আর কোনোদিনই দান্তে ফ্লোরেন্সে ফিরতে পারবেন না, অর্থাৎ আজীবন নিষিদ্ধ। যদি ফেরার চেষ্টা করেন তাহলে শহরের সীমানায় ঢুকতেই তাকে গ্রেফতার করা হবে এবং জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা হবে। এর পরের বছর এই রায়ের সঙ্গে আরো যুক্ত করা হয় তার ছেলেদের বয়স যখন চৌদ্দ বছর হবে তখন তাদেরও শহর থেকে চলে যেতে হবে। এর বারো বছর পর ১৩১৫ সালে তার সন্তানদের জন্য মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়। তবে, পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে তারা পালিয়ে বাবার কাছে পৌঁছতে সক্ষম হয়। বিশ বছর ছেলেদের নিয়ে এক দেশ থেকে অন্যদেশে ঘুরে বেড়ান গৃহহীন হয়ে। অবশেষে ১৩২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে রাভেন্নাতে তিনি মারা যান। মারা যাওয়ার আগে বলেছিলেন, “জগত মায়াময়। কিন্তু জগতকে আমি মায়ার চোখে না দেখে জ্ঞানের চোখে দেখে কাটিয়েছি বলে আমার কোনো আপোষ নেই। কষ্ট নেই।”

ব্রুনো

ইতালীয় দার্শনিক ও বিশ্বতত্ত্ব বিশারদ। ব্রুনো কোপার্নিকাসের সুরুজকেন্দ্রিক মতবাদকে সমর্থন করেছিলেন যা ছিল বাইবেলের ‘সুরুজ পৃথিবীর চার পাশে ঘোরে’ মতবাদের সম্পূর্ণ বিপরীত ফলে যা হবার তাই হলো। গির্জার পাদ্রীদের প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়েন তিনি। কিন্তু কোনোরকম নতিস্বীকার না করে হাসি মুখ মৃত্যুকেই বরণ করে নিয়েছিলেন ব্রুনো। যদিও এখন কোপার্নিকাস-ব্রুনোর সেই মতবাদই বৈজ্ঞানিক সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এবং খ্রিস্টান পাদ্রীরাও সেই বৈজ্ঞানিক সত্যকে মাথা পেতে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন। ভ্যাটিকানের পোপও ভুল স্বীকার করেছে। পোপও বলতে বাধ্য হয়েছে, ব্রুনোর প্রতি অন্যায় করা হয়েছে। ১৬০০ খ্রিস্টাব্দের ২০ জানুয়ারি পোপ অষ্টম ক্লেমেন্ট, ব্রুনোকে একজন ধর্মদ্রোহী বলে রায় দেয় এবং তাঁকে অন্যায়ভাবে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে। ১৬০০ খ্রিস্টাব্দের ১৭ ফেব্রুয়ারি তাঁকে রোমের কেন্দ্রীয় বাজার ক্যাম্পো দ্য ফিওরি-তে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁকে প্রকাশ্য দিবালোকে সবার সামনে খুঁটির সাথে বেঁধে পুড়িয়ে মারা হয়। ব্রুনো বলেছিলেন, “আমি সত্য উচ্চারণ করে যাবই। তোমরা আমায় আজ মেরে ফেলছো, কিন্তু আগামীকালই আফসোস করবে। কেননা আমি তোমাদের সত্য চিনাতে চেয়েছিলাম।”

পল গগাঁ

গগাঁ ১৮৮৮ সালে তাঁর অন্যতম বিখ্যাত চিত্রকর্ম সৃষ্টি করেছিলেন, ‘উপদেশের দৃষ্টি’ (ভিশন অফ দ্য সার্মন)। তিনি বলতেন যে তাঁর ধমনীতে বইছে ইনকাদের রক্ত এবং তিনি অত্যন্ত পছন্দ করতেন মদ্যপান। তিনি নিজেই নিজের সমাধিও তৈরি করেছিলেন। গগাঁ একসময় সিফিলিস রোগে আক্রান্ত হন। বেশ্যাগমন করতেন। তিনি এক বেশ্য, যার নাম ভিভিয়ানা, তাকে নিজের ছোটবোনও বানিয়েছিলেন। একবার তাকে আর্থিক সাহায্য করতে গিয়ে চুরিও করেছিলেন। গগাঁ ইউরোপীয় সমাজের পরিকাঠামো থেকে বাঁচতে চেয়েছিলেন এবং ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দে তাহিতিতে চলে যান। ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে পল গগাঁ ‘হিভা ওয়া’র দক্ষিণ উপকূলে অতুয়ানে চলে যান, যেটি ফ্রেঞ্চ পলিনেশিয়ার অন্তর্গত মার্কেসাস দ্বীপপুঞ্জের দ্বিতীয় বৃহত্তম দ্বীপ। অতুয়ানে অবস্থানকালে গগাঁ, মারি রোজ ভাইওহো নামে ১৪ বছর বয়স্ক এক নাবালিকা যুবতীর সাথে থাকতেন। এবং তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি একজন শিশু যৌন উৎপীড়নকারী ছিলেন (পেডোফিল)। অতুয়ানে বসবাসকালে গগাঁ আরো বেশি সমাজচ্যুত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি ফরাসি উপনিবেশবাদীদের বিরুদ্ধে স্থানীয় অধিবাসীদের পক্ষ নিয়েছিলেন। তিনি তাদেরকে কর প্রদান বন্ধ করতে এবং তাদের বাচ্চাদের ফরাসি স্কুলে পাঠানো বন্ধ করার জন্য প্ররোচিত করেছিলেন। তিনি সমকামিতার পক্ষে আন্দোলনেরও নেতৃত্ব দেন। কারণ তাঁর মতে সেই ফরাসি স্কুলেগুলো কেবলমাত্র মন্দ শিক্ষা দেয়। রাজ্যপালকে ব্যঙ্গ করার জন্য তাকে আদালতে প্রেরণ করা হয়েছিল এবং তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছিল। তার এই কাজের জন্য তাকে ৫০০ ফ্রাঙ্ক জরিমানা করা হয়েছিল এবং তিন মাসের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছিল। ৮ মে ১৯০৩, ৫৪ বছর বয়সে পল গগাঁ একেবারে একা, কপর্দকশূন্যভাবে তাঁর গৃহে মারা যান। অতুয়ানের তার সমাধিতে তাঁর সিরামিক ভাস্কর্য ওভিরি’র প্রতিলিপি স্থাপন করা হয়, যেটা তিনি প্যারিসে থাকাকালীন নিজেই নিজের সমাধির জন্য তৈরি করেছিলেন।

স্মরণীয় ১০ জন যারা পেয়েছিলেন রাষ্ট্রের অবমাননা ও অবিচার (পর্ব ২)

আপনার মতামত লিখুন :