স্মরণীয় ১০ জন যারা পেয়েছিলেন রাষ্ট্রের অবমাননা ও অবিচার (পর্ব ১)



দেবদুলাল মুন্না
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

অলঙ্করণ কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

পেছনে ফিরে দেখি। কী দেখি? অতীত। কিন্তু যে দলছুট হয়ে স্রোতে ভাসা মানুষের ভিড় থেকে চলে যায় অনেক আগে তাকেও তো পেছনে ফিরে তাকাতে হয়। পা সামনে এগুনো। কিন্তু একটি মুখ মুখ ফিরিয়ে দেখছে। সে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের সব বেদনা। একটু আলো জ্বেলেছিল। আমরা হয়তো বুঝিনি। হয়তো ড্যাশ ড্যাশ ড্যাশ। কিন্তু তার ওই দলছুট হয়ে এগিয়ে যাওয়ায় কম যন্ত্রণাবিদ্ধও হয়নি। মনে রেখেছি সেইসব মুখদের! তাদের অনেককেই তদানীন্তন সমাজ, শাসক, তথা রাষ্ট্রের চরম অবমাননা এবং অবিচারের মুখোমুখি হতে হয়েছে। এত এত মুখ। বলি মাত্র ১০ জনের কথা এ কিস্তিতে।

 

সক্রেটিস

সক্রেটিস এত গরীব ছিলেন যে প্রতিরাতে বাসায় ফেরার পর তাকে স্ত্রীর কাছে শুনতে হতো, ‘তুমি একটা কদাকার। মরো না কেন? বিষ খেতে পারো না!’ দেখতে খুব বিশ্রি ছিলেন। বিয়ে করেছিলেন কেন সেটিও জানতেন না। হয় না, হয়ে গিয়েছিল। সক্রেটিস সত্য ও যুক্তির কাছে সৎ ও একনিষ্ঠ থেকে অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি; বরং সেই বিষ মানে হেমলক খেয়ে অমর হয়ে গেলেন সবার মাঝে। খ্রিস্টপূর্ব ৪৭০ সালের দিকে সক্রেটিসের জন্ম গ্রিসের এথেন্স নগরীতে এলোপাকি গোত্রে, ছিলেন প্রাচীন গ্রিক ফিলোসফার। তিনি নিজে গরীবের গরীব কিন্তু সারাজীবন সকলকে বিনা পয়সায় শিক্ষা দিতেন। এত বড় পণ্ডিত, কিন্তু তাঁর মধ্যে অহংকারের লেশমাত্র ছিল না। কেউ তাঁকে রাগ করে কথা বলতে শোনেনি; নিজের সামান্য কর্তব্যটুকুও অবহেলা করতে দেখেনি। প্রথম জীবন কেটেছে ভাস্করের কাজ করে। সক্রেটিস কোনো এক সময় সামরিক বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। প্লেটোর বর্ণনায় সক্রেটিস বলেন, তিনি তিন তিনটি অভিযানে এথেনীয় সেনাবাহিনীর সাথে যোগ দিয়েছেন। এই অভিযানগুলো ছিল যখাক্রমে পটিডিয়া, অ্যাম্ফিপোলিস এবং ডেলিয়ামে। তিনি কখনো কোনো পেশা অবলম্বন করেননি, কারণ তিনি ঠিক তা-ই করবেন যাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন আর তা হচ্ছে দর্শন সম্বন্ধে আলোচনা। প্লেটোর লেখায় দেখা যায় সক্রেটিস কখনোই শিক্ষার বিনিময়ে অর্থ নেননি। বরঞ্চ তিনি তার দরিদ্রতার দিকে নির্দেশ করেই প্রমাণ দিতেন যে, তিনি কোনো পেশাদার শিক্ষক নন।

সক্রেটিসের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ ছিল তিনটি। ১. দেশের প্রচলিত দেবতাদের প্রতি উপেক্ষা প্রদর্শন। ২. নতুন নতুন দেবতার প্রবর্তন করার চেষ্টা। এবং ৩. তিনি(সক্রেটিস) যুবকদের নৈতিক চরিত্র কলুষিত করে তাদের বিপথে চালিত করছেন।

আরো পড়ুন ➥ বিখ্যাত সৃষ্টিশীলদের অবসাদ ও স্যাটায়ার

এথেন্সের তিনজন খ্যতিমান পুরুষ তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছিলেন। অভিযোগকারী তিনজনের নাম ছিল মেলেটাস, লাইকন এবং এনিতাস। প্রথমজন ছিলেন মধ্যম শ্রেণীর কবি, দ্বিতীয়জন ছিলেন বক্তা এবং তৃতীয়জন গণতান্ত্রিক নেতা।

সে সময় বিচারসভায় কোনো আইনজীবী থাকত না। অভিযোগকারী এবং অভিযুক্ত নিজেই নিজের পক্ষ সমর্থন করতেন। বিচারসভায় প্রথমে ওই তিনজন তাঁদের অভিযোগ বর্ননা করতেন—তারপর সক্রেটিস উঠে দাঁড়িয়ে বলেন নিজের কথা। সে এক বিচিত্র বিচার কাহিনী। ৫০০ জন জুরির সামনে বিচার। ৬০ ভোটের ব্যবধানে সক্রেটিস অপরাধী হিসাবে বিবেচিত হন। প্রথমেই তাঁর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হয়নি। বিচারের শেষ মুহূর্তে শাস্তি এড়াতে না পারলেও মৃত্যুদণ্ডকে এড়াতে পারতেন সক্রেটিস। তখন এথেন্সের বিচার ব্যবস্থায় অপরাধ চিহ্নিত হবার পর অপরাধীকে জিজ্ঞেস করা হতো, সে কী শাস্তি চায়। পাঁচশো জুরির উপস্থিতিতে সক্রেটিসকেও জিজ্ঞেস করা হলো, “আপনি কী শাস্তি চান।” কিন্তু যেহেতু তিনি নিজেকে অপরাধী মনে করতেন না তাই তার জবাব ছিল, “আমি দোষ করিনি কোনো। আমাকে পুরস্কৃত করা উচিত। প্রাইটেনিয়াম হলে (পাবলিক হল) আমার জন্যে বিশেষ ভোজের আয়োজন করা যেতে পারে।” প্রথাগতভাবে যা করা হতো গ্রিসের বীরদের জন্য। তাতে জুরিরা ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠেন, তাঁরা মনে করলেন, সক্রেটিস এই বিচারকে প্রহসন মনে করছে এবং তাঁদের উপস্থিতির সম্মান দিচ্ছে না। ফলে উচ্চারিত হলো, মৃত্যুদণ্ড। প্রথমে তাঁর বিরুদ্ধে জুরি ছিলেন ২৮০ জন এবং স্বপক্ষে ছিলেন ২২০ জন। তাঁর ওই উত্তর শুনে বিরুদ্ধে হয়ে গেল ৩৩০ জন। মৃত্যুদণ্ড বা শাস্তি নিয়ে সক্রেটিসের উদাসীনতার এখানেই শেষ নয়। শিষ্য আর বন্ধুরা চেয়েছিলেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সক্রেটিসকে মৃত্যুদণ্ডের আগে জেলে আটকে না রেখে জামিনে মুক্তি দেওয়া হোক। তখন এ প্রথাও ছিল। সক্রেটিস জামিন হিসেবে দিতে চেয়েছিলেন এক দীনা (রৌপ্যমুদ্রা)। তাঁর বন্ধুরা তৎক্ষণাৎ ব্যক্তিগত দায়িত্বে তিরিশ দীনা দিতে চাইলেন। কিন্তু সে প্রার্থনাও না-মঞ্জুর হয়েছিল। বিচারের প্রায় একমাস পর মৃত্যু হয় সক্রেটিসের, এসময় তিনি কারাগারে বন্দী ছিলেন। সক্রেটিসের মৃত্যুর সালটি ছিল খ্রিস্টপূর্ব ৩৯৯। মৃত্যুর আগে প্রার্থনা শেষ করে হেমলক তুলে নিলেন ৭০ বছরের সক্রেটিস। পান করে নিলেন সবটুকু হেমলক রস, এক নিঃশ্বাসে। কেউ বিষ পান করলে মুখভঙ্গি বিকৃত হয়। কিন্তু সক্রেটিসকে দেখে তা বুঝার উপায় নেই। তার মুখ বিন্দুমাত্র বিকৃত হয়নি। জলপানের মতো পান করেছিলেন তিক্ত বিষ। উপস্থিত সকলেই তার মৃত্যুতে উচ্চস্বরে কেঁদেছিলেন, এমনকি জেল কর্মকর্তার দু’চোখ ছিল অশ্রুসিক্ত। কিন্তু সক্রেটিসের চোখে না ছিল কোনো কান্না। না কোনো বিকার। শুধু একবার তার স্ত্রীর দিকে দৃষ্টি গিয়েছিল। কে জানে!

সেনেকা

স্টোয়িক দর্শনের অন্যতম এই পথিকৃৎ ও অসংখ্য ট্র্যাজেডি নাটকের রচয়িতার নাম সেনেকা। মৃত্যুও ছিল আরেক ট্র্যাজিক। পুরো নাম লুইস অ্যানিয়াস সেনেকা। তাঁর বাবার নামও কিন্তু লুইস অ্যানিয়াস সেনেকা। এজন্য সেনেকাকে অনেকে ‘সেনেকা দ্য ইয়াঙ্গার’ও বলে থাকেন। খ্রিস্টের জন্মের ৪ বছর পর অধুনা স্পেনের কর্ডোবায় জন্মেছিলেন সেনেকা। এর পরপরই পরিবারসমেত তারা চলে আসেন রোমে। শৈশব-কৈশোরে অ্যাটালাস ও সোশনের কাছে অলঙ্কারশাস্ত্রের সাথে স্টোয়িকও পাঠ নিয়েছিলেন সেনেকা। ছোটকাল থেকেই ক্ষীণকায় সেনেকার অসুখ-বিসুখ লেগেই থাকত। ২১ বছর বয়সে মিসরে যান। খালার ঐকান্তিক শুশ্রূষায় সুস্থ হয়ে সেনেকা ১৫ বছর পর পুনরায় ফিরে আসেন রোমে। রোমে ফেরার বছরই প্রত্যক্ষ ভোটে সেনেকা নির্বাচিত হন ম্যাজিস্ট্রেট। বাগ্মীতা ও দার্শনিক উৎকর্ষের রোমে অল্প সময়ে বেশ ভালোই প্রভাব কামিয়েছিলেন তিনি। পরের বছর (৩৭ খ্রিস্টাব্দ) যখন ক্যালিগুলা এলেন সম্রাটের গদিতে, বেঁধে যায় দুজনের ব্যক্তিত্বের সংঘাত, যা পরে রূপ নেয় শত্রুতায়। সম্রাট কর্তৃক মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েও ভাগ্যগুণে বেঁচে যান সেনেকা।

৪১ খ্রিস্টাব্দে ক্যালিগুলাকে হত্যা করে ক্ষমতায় এলেন ক্লডিয়াস। কিন্তু সম্রাটের সাথে বিরোধের চিত্রটা যেন পাল্টাল না। ক্লডিয়াসের স্ত্রী মেসালিনা এবার অভিযোগ দাগলেন ম্যাজিস্ট্রেট সেনেকার প্রতি। সেনেকা নাকি ব্যাভিচারে জড়িয়েছেন ক্যালিগুলার বোন জুলিয়া লিভিয়ার সাথে! ফলাফল, কর্সিকা দ্বীপে সেনেকাকে পাঠানো হলো শাস্তিস্বরূপ।

সেসময় তিনি মাকে চিঠি লিখতেন সান্ত্বনা জানিয়ে। এই চিঠিগুলোতে প্রতিফলিত হতো সেনেকার স্টোয়িক দর্শনের আত্মোপলব্ধি। স্টোয়িকবাদের স্রষ্টা হিসেবে পপুলার সেনেকা হলেও খ্রিস্টের জন্মের প্রায় ৩০০ বছর আগে এর জন্ম সিটিয়ামের দার্শনিক জেনোর হাত ধরে। সিটিয়ামের ‘স্টোয়া পয়কিলে’ নামক খোলা এক আর্ট গ্যালারিতে প্রথম এই দর্শনের প্রচার শুরু করেছিলেন জেনো। ‘স্টোয়া’ থেকেই তাই এলো ‘স্টোয়িসিজম’ নামকরণ।

জেনোর পর এই দর্শনকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রদান করতে ভূমিকা রাখেন মূলত তিন দার্শনিক—এপিক্টেটাস, সেনেকা ও অরেলিয়াস।

স্টোয়িকবাদ অনুযায়ী, আমাদের জীবন আসলে কোনো বাহ্যিক ঘটনা দ্বারা প্রভাবিত হয় না, বরং সে ঘটনাটিকে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে আমরা কিভাবে নিচ্ছি, তার ওপরই নির্ভর করে সমস্ত কিছু। ধরা যাক, আপনার ক্লাসের নোট খাতা হারিয়ে গেছে এবং আপনি ব্যথিত, কেননা পরীক্ষা আগামীকাল। কিন্তু এখানে আপনার কষ্ট পাওয়ার কারণ কিন্তু নোটখাতা নয়, বরং পরীক্ষায় কম নম্বর পাবার শঙ্কা। এখন স্টোয়িকবাদ কী বলে? স্টোয়িকবাদ আপনাকে বলবে ভাবনায় ইতিবাচকতা আনতে। ব্যাস, আপনি সুখী! দ্বিতীয়ত, কোনটি আপনার নিয়ন্ত্রণে আর কোনটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে, তা অনুধাবন করুন। এর দ্বারা ইচ্ছাশক্তিকেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন আপনি, কাজেকর্মে সফলও হবেন। যেমন ধরুন, আপনি একজনকে ভালোবাসেন, সে আপনাকে প্রত্যাখ্যান করছে কেননা আপনি মদ্যপান করেন ও বহুগামী। এখন আপনার তো তার মনের ওপর হাত নেই। কিন্তু নিজের মদ ছাড়ার ব্যাপারে তো নিয়ন্ত্রণ আছে। সুতরাং আপনি আপনার কাজটাই করেন দেখুন না! কাজ হলেও হতে পারে। যাক সেনেকার কথায় ফিরে যাই। আট বছর পর সেনেকাকে নাটকীয়ভাবে ফিরিয়ে আনেন সম্রাট ক্লডিয়াসের চতুর্থ স্ত্রী অ্যাগ্রিপিনা। সন্তান নিরোকে পরবর্তী সম্রাট বানাবার জন্য ক্লডিয়াসের কাছে সমস্ত তদবিরই করেছিলেন অ্যাগ্রিপিনা। সেই নিরোরই শিক্ষক নিযুক্ত করা হলো সেনেকাকে। ৫৪ খ্রিস্টাব্দে নিরো যখন ১৭ বছর বয়সে সম্রাট হলেন তখন আফ্রানিয়াস বুরাস ও সেনেকা সম্রাটের উপদেষ্টা নিযুক্ত হন। উপদেষ্টার উপদেশ নিরো কানে নিতেন যৎসামান্যই। সেনেকা, বুরাসের বাধা সত্ত্বেও মাকে হত্যা করতে তাই বাধেনি নিরোর। তবুও বুরাসের মৃত্যু অবধি তিনি নিরোর অনুগতই ছিলেন। অথচ একসময় নিরোর দালালিই করেছেন। পরে চাকরি ছেড়ে দেন। ৬২ খ্রিস্টাব্দে সম্রাটের চাকরি ছেড়ে সেনেকা পুরোদমে লেখালেখিতে সঁপে দিলেন নিজেকে। দার্শনিক গ্রন্থ ‘অন দ্য শর্টনেস অব লাইফ’-তাঁর সেরা মৌলিক (আপাত) কাজ। স্টোয়িকবাদ নিয়ে তাঁর অন্য ভাবনাগুলো এসেছে মাকে লেখা ও লুসিয়াসকে লেখা ৬৯টি চিঠিতে।

আরো পড়ুন ➥ মহান শিল্পীদের ক্ষত ও ভালোবাসাসমূহ

সম্রাটের উপদেষ্টা থাকাকালেই সেনেকা লিখেছিলেন রাজনৈতিক প্রহসন ‘দি আপোকোলোসিন্টোসিস’ এবং নাটক ‘ফিড্রা’। অবসরের পর ৬২-৬৫ খ্রিস্টাব্দ অবধি তিনি লিখেছেন অসংখ্য ট্র্যাজেডি নাটক ও গল্প। ‘দ্য ট্রোজান উইমেন’, ‘মেডিয়া’, ‘দ্য ফিনিশিয়ান উইমেন’, ‘দ্য ম্যাড হারকিউলিস’। তাঁর সর্বাধিক জনপ্রিয় ‘ইডিপাস’ ও ‘আগামেমনন’ ছিল যথাক্রমে গ্রিক উপন্যাস ‘সফোকলস’ ও ‘অ্যাসকাইলাস’ অবলম্বনে রচিত। তাঁর লেখায় ভার্জিল ও ওভিডের প্রভাব ছিল বলার মতো। এত ট্র্যাজেডি যার কলম থেকে বেরিয়েছে, তাঁর জীবনটাও ওই ট্র্যাজেডি দিয়েই শেষ হয়েছিল। ৬৫ খ্রিস্টাব্দে গায়াস কালপার্নিয়াস পিসো আর সেনেকার ভাতিজা লুকান মিলে ষড়যন্ত্র করেছিলেন নিরোকে হত্যা করবার। ভাতিজার সূত্রে কিভাবে যেন সেনেকার নামও জড়িয়ে পড়ে সেই ষড়যন্ত্রের অভিযোগে। ফলাফল, সেনেকার মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিলেন নিরো। তবে শিক্ষাগুরু হওয়ায় খানিকটা ‘দয়া’ করেন নিরো। জল্লাদ নয়, সেনেকার দণ্ড পালনের ভার দেওয়া হলো স্বয়ং সেনেকাকেই। সহজ মরণের জন্য দু’হাতের রগ কেটে ফেলেন সেনেকা। ভীষণ ক্ষীণকায় হওয়ায় রক্তপাতও তেমন হচ্ছিল না। এই দৃশ্য দেখে সেনেকার স্ত্রী পম্পিয়া পলিনাও হাত কেটে ফেলেন, তাকে অবশ্য উদ্ধার করেছিল সম্রাটের রক্ষীরা। যা-ই হোক, রগ কেটেও না মরতে পারায় সেনেকা পান করেন হেমলক বিষ। কাকতালীয়ভাবে তাতেও মৃত্যু হচ্ছিল না তাঁর, শুধুই যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন। শেষে সেনেকাই সৈন্যদের অনুরোধ করেন তাকে গরম পানির চৌবাচ্চায় ফেলতে। আজীবন শ্বাসকষ্টে ভোগা , ইনহেলার নেওয়া, সেনেকার শেষ নিঃশ্বাসটিও সেই চৌবাচ্চাতেই পড়েছিল। এই সেনেকাই বলেছিলেন, “দুঃখ করো না, বাঁচো।’ নিমলেন্দু গুণের একটা কবিতা আছে এ শিরোনামে। 

দান্তে

দান্তে ছিলেন ইতালিয়ান কবি, গদ্য লেখক এবং রাজনৈতিক চিন্তাবিদ। ফ্লোরেন্সের স্থানীয় ভেনেশিয়ান ভাষায় তাঁর তিন খণ্ডে লেখা জনপ্রিয় গ্রন্থ ‘দ্য ডিভাইন কমেডি’তে তৎকালীন গির্জার (চার্চের) ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সমসাময়িক রাজনীতির ব্যঙ্গাত্মক রূপ তুলে ধরা হয়েছিল। সেই জন্য দান্তেকে রোমে আটক করে রাখে পোপ। ফ্লোরেন্সে তার বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। দান্তের অনুপস্থিতিতেই তার অজান্তে তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তুলে বিচার করা হয় এবং রায়ও দিয়ে দেওয়া হয়। ১৩০২ সালের ২৭ জানুয়ারি, তাঁর বিরুদ্ধে পাঁচ হাজার ফ্লোরিন জরিমানা, দুই বছর ফ্লোরেন্স শহরে ঢোকার ওপরে নিষেধাজ্ঞা, দুই বছরের নির্বাসন দণ্ড এবং বাকি জীবনে আর কোনো দিন রাজনীতি করতে পারবেন না, এমনই শাস্তি দেওয়া হয়। কিন্তু দান্তে এই বিচার বা রায় কোনোটাই মেনে নেননি। পরে ১০ মার্চ ফের রায় দেওয়া হয় যে, দুই বছর নয়, আর কোনোদিনই দান্তে ফ্লোরেন্সে ফিরতে পারবেন না, অর্থাৎ আজীবন নিষিদ্ধ। যদি ফেরার চেষ্টা করেন তাহলে শহরের সীমানায় ঢুকতেই তাকে গ্রেফতার করা হবে এবং জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা হবে। এর পরের বছর এই রায়ের সঙ্গে আরো যুক্ত করা হয় তার ছেলেদের বয়স যখন চৌদ্দ বছর হবে তখন তাদেরও শহর থেকে চলে যেতে হবে। এর বারো বছর পর ১৩১৫ সালে তার সন্তানদের জন্য মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়। তবে, পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে তারা পালিয়ে বাবার কাছে পৌঁছতে সক্ষম হয়। বিশ বছর ছেলেদের নিয়ে এক দেশ থেকে অন্যদেশে ঘুরে বেড়ান গৃহহীন হয়ে। অবশেষে ১৩২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে রাভেন্নাতে তিনি মারা যান। মারা যাওয়ার আগে বলেছিলেন, “জগত মায়াময়। কিন্তু জগতকে আমি মায়ার চোখে না দেখে জ্ঞানের চোখে দেখে কাটিয়েছি বলে আমার কোনো আপোষ নেই। কষ্ট নেই।”

ব্রুনো

ইতালীয় দার্শনিক ও বিশ্বতত্ত্ব বিশারদ। ব্রুনো কোপার্নিকাসের সুরুজকেন্দ্রিক মতবাদকে সমর্থন করেছিলেন যা ছিল বাইবেলের ‘সুরুজ পৃথিবীর চার পাশে ঘোরে’ মতবাদের সম্পূর্ণ বিপরীত ফলে যা হবার তাই হলো। গির্জার পাদ্রীদের প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়েন তিনি। কিন্তু কোনোরকম নতিস্বীকার না করে হাসি মুখ মৃত্যুকেই বরণ করে নিয়েছিলেন ব্রুনো। যদিও এখন কোপার্নিকাস-ব্রুনোর সেই মতবাদই বৈজ্ঞানিক সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এবং খ্রিস্টান পাদ্রীরাও সেই বৈজ্ঞানিক সত্যকে মাথা পেতে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন। ভ্যাটিকানের পোপও ভুল স্বীকার করেছে। পোপও বলতে বাধ্য হয়েছে, ব্রুনোর প্রতি অন্যায় করা হয়েছে। ১৬০০ খ্রিস্টাব্দের ২০ জানুয়ারি পোপ অষ্টম ক্লেমেন্ট, ব্রুনোকে একজন ধর্মদ্রোহী বলে রায় দেয় এবং তাঁকে অন্যায়ভাবে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে। ১৬০০ খ্রিস্টাব্দের ১৭ ফেব্রুয়ারি তাঁকে রোমের কেন্দ্রীয় বাজার ক্যাম্পো দ্য ফিওরি-তে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁকে প্রকাশ্য দিবালোকে সবার সামনে খুঁটির সাথে বেঁধে পুড়িয়ে মারা হয়। ব্রুনো বলেছিলেন, “আমি সত্য উচ্চারণ করে যাবই। তোমরা আমায় আজ মেরে ফেলছো, কিন্তু আগামীকালই আফসোস করবে। কেননা আমি তোমাদের সত্য চিনাতে চেয়েছিলাম।”

পল গগাঁ

গগাঁ ১৮৮৮ সালে তাঁর অন্যতম বিখ্যাত চিত্রকর্ম সৃষ্টি করেছিলেন, ‘উপদেশের দৃষ্টি’ (ভিশন অফ দ্য সার্মন)। তিনি বলতেন যে তাঁর ধমনীতে বইছে ইনকাদের রক্ত এবং তিনি অত্যন্ত পছন্দ করতেন মদ্যপান। তিনি নিজেই নিজের সমাধিও তৈরি করেছিলেন। গগাঁ একসময় সিফিলিস রোগে আক্রান্ত হন। বেশ্যাগমন করতেন। তিনি এক বেশ্য, যার নাম ভিভিয়ানা, তাকে নিজের ছোটবোনও বানিয়েছিলেন। একবার তাকে আর্থিক সাহায্য করতে গিয়ে চুরিও করেছিলেন। গগাঁ ইউরোপীয় সমাজের পরিকাঠামো থেকে বাঁচতে চেয়েছিলেন এবং ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দে তাহিতিতে চলে যান। ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে পল গগাঁ ‘হিভা ওয়া’র দক্ষিণ উপকূলে অতুয়ানে চলে যান, যেটি ফ্রেঞ্চ পলিনেশিয়ার অন্তর্গত মার্কেসাস দ্বীপপুঞ্জের দ্বিতীয় বৃহত্তম দ্বীপ। অতুয়ানে অবস্থানকালে গগাঁ, মারি রোজ ভাইওহো নামে ১৪ বছর বয়স্ক এক নাবালিকা যুবতীর সাথে থাকতেন। এবং তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি একজন শিশু যৌন উৎপীড়নকারী ছিলেন (পেডোফিল)। অতুয়ানে বসবাসকালে গগাঁ আরো বেশি সমাজচ্যুত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি ফরাসি উপনিবেশবাদীদের বিরুদ্ধে স্থানীয় অধিবাসীদের পক্ষ নিয়েছিলেন। তিনি তাদেরকে কর প্রদান বন্ধ করতে এবং তাদের বাচ্চাদের ফরাসি স্কুলে পাঠানো বন্ধ করার জন্য প্ররোচিত করেছিলেন। তিনি সমকামিতার পক্ষে আন্দোলনেরও নেতৃত্ব দেন। কারণ তাঁর মতে সেই ফরাসি স্কুলেগুলো কেবলমাত্র মন্দ শিক্ষা দেয়। রাজ্যপালকে ব্যঙ্গ করার জন্য তাকে আদালতে প্রেরণ করা হয়েছিল এবং তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছিল। তার এই কাজের জন্য তাকে ৫০০ ফ্রাঙ্ক জরিমানা করা হয়েছিল এবং তিন মাসের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছিল। ৮ মে ১৯০৩, ৫৪ বছর বয়সে পল গগাঁ একেবারে একা, কপর্দকশূন্যভাবে তাঁর গৃহে মারা যান। অতুয়ানের তার সমাধিতে তাঁর সিরামিক ভাস্কর্য ওভিরি’র প্রতিলিপি স্থাপন করা হয়, যেটা তিনি প্যারিসে থাকাকালীন নিজেই নিজের সমাধির জন্য তৈরি করেছিলেন।

স্মরণীয় ১০ জন যারা পেয়েছিলেন রাষ্ট্রের অবমাননা ও অবিচার (পর্ব ২)

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'



তাহমিদ হাসান
ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

  • Font increase
  • Font Decrease

বইয়ের নাম: মানচিত্রের গল্প

লেখক: ড. মাহফুজ পারভেজ

প্রকাশক: শিশু কানন

প্রকাশকাল: ২০১৮

গল্প পড়তে সবারই ভালো লাগে। যারা ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলের কঠিন বিষয় ও বড় বড় বই পড়তে ভয় পান, তারাও গল্প আকারে সেসব সোৎসাহে পাঠ করেন। ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প' তেমনই এক গ্রন্থ, যা ভূগোল, মানচিত্র, অভিযান সংক্রান্ত সহস্র বর্ষের ইতিহাস, আবিষ্কার ও অর্জনকে গল্পের আবহে, স্বাদু ভাষায় উপস্থাপন করেছে। এ গ্রন্থ ছাড়াও তিনি মুঘল ইতিহাস, দারাশিকোহ, আনারকলি প্রভৃতি ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব ও বিষয়কে প্রাঞ্জল ভাষায় তুলে ধরেছেন একাধিক গ্রন্থের মাধ্যমে।

ড. মাহফুজ পারভেজ মূলত একজন কবি, কথাশিল্পী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তিনি ১৯৬৬ সালের ৮ মার্চ কিশোরগঞ্জ শহরের কেন্দ্রস্থল গৌরাঙ্গ বাজারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগে পড়াশুনা করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউজিসি ফেলোশিপে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগে প্রফেসর পদে নিয়োজিত আছেন।

তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ গুলো মধ্যে আমার সামনে নেই মহুয়ার বন, নীল উড়াল, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে, বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিদ্রোহী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তিচুক্তি, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রয়েছে।

https://www.rokomari.com/book/author/2253/mahfuz-parvez

লেখকের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ গুলোর মধ্যে ২০১৮ সালে প্রকাশিত 'মানচিত্রের গল্প' বইটি রয়েছে। লেখক বইটিকে ১৯ টি অধ্যায়ে ভাগ করছে। বইটির মধ্যে মানচিত্র আবিষ্কার কিভাবে শুরু হয়েছে এবং আবিষ্কারে পিছনে যাদের অবদান ছিল সেই সব বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।

মানচিত্র বা ম্যাপ শব্দটি আদিতে ল্যাটিন 'মাপ্পামুন্ডি' শব্দটি থেকে এসেছে। 'মাপ্পা' অর্থ টেবিল-ক্লথ আর 'মুনডাস' মানে পৃথিবী। অতি প্রাচীন সভ্যতায় চীনারা প্রথম মানচিত্র অঙ্কনে যাত্রা শুরু করে, কিন্তু সেই সব মানচিত্রের আজ অস্তিত্ব নেই। বইটির মধ্যে এইসব ক্ষুদ্র তথ্য থেকে শুরু টলেমির মানচিত্র, চাঁদের মানচিত্র সহ আরো অজানা তথ্য গুলো লেখক বইটির মধ্যে তুলে ধরেছে।

লেখক বইয়ের ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে টলেমির মানচিত্র, ভাস্কো ডা গামা আর কলম্বাসের লড়াই, রেনেলের ' বেঙ্গল অ্যাটলাস', 'আই হ্যাভ ডিসকভার দ্য হাইয়েস্ট মাউন্টেন অব দ্য ওয়ার্ল্ড ', মানচিত্র থেকে গ্লোব ইত্যাদি সব উল্লেখযোগ্য শিরোনামে বইটি সজ্জিত করছেন।

পরিশেষে ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে শেষ দুই অধ্যায়ে 'পরিশিষ্ট-১, পরিশিষ্ট-২' শিরোনামে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মানচিত্র এবং মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের কথা বইটিতে তুলে ধরেন।

কয়েকটি ঐতিহাসিক মানচিত্রের মধ্যে---

ব্যাবিলনে প্রাপ্ত ভূ মানচিত্র- যেটিতে ইউফ্রেটিস নদীর তীরে ব্যাবিলনকে আর্বতন করে দেখানো হয়েছে।

অ্যানাক্সিমান্ডারের মানচিত্র- পৃথিবীর প্রথম দিকের আদি মানচিত্রগুলোর মধ্যে এইটি অন্যতম, যা অঙ্কন করেছিল অ্যানাক্সিমান্ডার। এই মানচিত্রে ইজিয়ান সাগর এবং সেই সাগরকে ঘিরে মহাসাগরের এইসব দেখানো হয়েছে।

আল ইদ্রিসি'র মাপ্পা মুনদি- বিপুল মুসলিম মনীষীর মধ্যে বিখ্যাত ছিলেন আল ইদ্রিসি। আফ্রিকা, ভারত মহাসাগর ও দূরপ্রাচ্য বা ফারইস্ট অঞ্চলকে তিনি তাঁর মানচিত্রে ফুটিয়ে তুলে।

ফ্রা মায়োরো'র মানচিত্র- ভেনিসীয় সন্ন্যাসী ফ্রা মায়েরোর প্রণীত মানচিত্রটি একটি কাঠের ফ্রেমের ভেতরে পার্চমেন্টে আঁকা বৃত্তাকার প্লানিস্ফিয়ার।

হুয়ান দে লা কোসা'র মানচিত্র- তিনি ছিলেন স্পেনের বিজেতা৷ তিনি বহু ম্যাপ ও মানচিত্র তৈরি করেছিলেন তার মধ্যে প্রায় অধিকাংশ হারিয়ে গেছে বা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। ১৫০০ সালে প্রণীত তাঁর ম্যাপ বা মাপ্পা মুনদি এখনও রয়েছে, এই মানচিত্রে আমেরিকা মহাদেশকে চিহ্নিত করা সর্বপ্রথম ইউরোপীয় মানচিত্র।

মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব--

হাজি মহিউদ্দিন পিরি-- তাঁর পুরো নাম হাজি মহিউদ্দিন পিরি ইবনে হাজি মুহাম্মদ। তিনি ছিলেন উসমানী-তুর্কি সাম্রাজ্যের নামকরা অ্যাডমিরাল বা নৌ-সেনাপতি এবং বিশিষ্ট মানচিত্রকর।

আল ফারগনি- তাঁর পুরো নাম আবু আল আব্বাস আহমেদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে কাসির আল ফারগনি। অবশ্য ইউরোপের মানুষের কাছে তিনি বিজ্ঞানী আলফ্রাগানুস নামে পরিচিত ছিলেন। টলেমির একটি গ্রন্থ 'আলমাগেস্ট'- এর ভিত্তি করে সহজ সরল ভাষায় লেখা তাঁর বিখ্যাত বই 'এলিমেন্ট অব অ্যাস্ট্রোনমি অন দ্য সেলেস্টয়াল মোশান'।

বার্তোলোমে দে লাস কাসাস-- তিনি সরাসরি মানচিত্র চর্চায় অংশগ্রহণ করেন নি বটে, তবে তাঁর দ্বারা মানচিত্র চর্চা উপকৃত হয়েছে। তিনি ক্যারিবীয় অঞ্চলে ব্যাপক ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সবিস্তারে লিখে গিয়েছিলেন।

লেখক এই বইটিতে খুব সুন্দর উপস্থাপনার মাধ্যমে জটিল তথ্য গুলোকে সহজে তুলে ধরেছে৷ ২৭ শে মার্চ আমার জন্মদিনে আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ড. মাহফুজ পারভেজ স্যার এই বইটি উপহার দেন৷ এই বইটি পড়ে ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলে আগ্রহী পাঠক নিজের জ্ঞানকে প্রসারিত করতে পারবেন এবং নতুন কিছু জানতে পারবেন, একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

তাহমিদ হাসান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস স্নাতক সম্মান শ্রেণির শিক্ষার্থী

;

চা-নগরীতে এক কাপ চা



কবির য়াহমদ
চা-নগরীতে এক কাপ চা

চা-নগরীতে এক কাপ চা

  • Font increase
  • Font Decrease

[চা-শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির ন্যায্য দাবির প্রতি সংহতি]

এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে ডাইনোসর-টিকটিকি
এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে বেনামী বৃক্ষরাজি
সবকিছু থমকে যায়, সবকিছু থমকে থাকে জ্যোতির্ময় ছায়ায়।

ঈশ্বর; জন্মে শাপ আছে, কত খেলা-ছেলেখেলা
এ পাড়া, ও পাড়া বাঙময় সুঘ্রাণ, সঞ্জীবনী মায়া
দুই হাতে স্বর্গ-নরক, সুমিষ্ট কল্লোল; বিভাজন।

ভূগোলের পাঠে সমূহ ভুল, আকাশে নরক স্রোতহীন
উড়ুক্কু ভূ-স্বর্গ বাতাসে ভাসে এখানে-ওখানে
তবু স্বর্গ তার কালে নেমেছে ধরায়, ত্রিকোণ পাতায়
সবুজাভ মিহি মিহি ষোল আনা যৌনকলা!

ঈশ্বর তুমি পান করে যাও এক কাপ সুপেয় চা
মানবগোষ্ঠী বারে বারে জন্মাবে এই বৃহত্তর চা-নগরীতে।


তোমার চায়ের কাপে একটা মাছি পড়ুক
তার নিত্যকার অর্জনে হয়ে উঠুক বিষগন্ধি-মৌ
প্রসন্ন বিকেলে একপশলা বৃষ্টি আসুক
ভিজিয়ে দিয়ে যাক সত্যাসত্য ওড়না।

একদিন মেঘকে বলেছিলাম একান্তে
চুপসে দিতে আপাতদৃশ্য সমূহ প্রসাধন
অন্তর্বাসের অন্তর্হিত চেহারা ভাসুক
কোন এক মাছরাঙার ঠোঁটে।

আমাদের ধূম্রশালায় ইদানীং টান পড়েছে
তাই আশ্রয় নিয়েছে সব গার্লস কলেজে
ওখানে নিত্য বালিকার সহবাস-
দৃষ্টিবিভ্রমে কেউ কেউ যায় চোখের আড়ালে।

একটা মাছি ঘুরঘুর করতে থাকুক এক পেয়ালা চায়ে
একটা প্রসাধন দোকানী হন্যে হয়ে ছুটে আসুক মাছির পেছনে
আজ একটা মেঘখণ্ড আকাশে ব্যতিব্যস্ত হোক একপশলা বৃষ্টি হতে

আমাদের চা মহকুমায় আজ বৃষ্টি হোক ওড়নার ওজন বাড়িয়ে দিতে।


মুখোমুখি বসে গেলে এক কাপ চা হোক
অন্তত এক জোড়া ঠোঁটে চুমু খাক নিদেনপক্ষে একটা সিগারেট
আরেক জোড়া ঠোঁটে হাহাকার জাগুক অনন্ত শীতরাত্রির মত।

তোমার ঠোঁটগুলো ক্ষুদ্র অভিলাষী প্রগাঢ় আকাঙ্ক্ষার তরঙ্গ-বঞ্চিত নদী
মোহনা খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়, এক ফোঁটা জল, হায়
শেষ কবে ঢেলেছিল জল কেউ- অসহ্য ব্যথার কাল গৃহহীন জনে।

অবনত ইথার মিশে গেছে কাল সন্ন্যাস জীবনে
তবু মুখোমুখি কাল, তবু এক কাপ চা
একটা চুমু হোক চায়ের কাপে, একটা মাত্র হোক আজ অন্যখানে
যারা নেমেছিল পথে তাদের পথ থেমে আসুক পথে
সব পথ আজ মিশে যাবে চাপের কাপে, ঠোঁটের সাগরে।

ওহে ঈশ্বর, তোমার গোপন দরোজা খুলে দাও
প্রার্থনার ভাষা নমিত হোক আজ চায়ের কাপে, ক্রিয়াশীল রাতে।

;

কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু

কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশে বই বিক্রির জগতে বাতিঘর একটি বিপ্লব আনতে সক্ষম হয়েছে। বই বিক্রির পাশাপাশি বইপড়া, চা-কফির আড্ডাসহ নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা এনেছে প্রতিষ্ঠানটি। তারই আদলে এবার কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু হয়েছে।

গত ১১ আগস্ট প্রদীপ জ্বালিয়ে বুক ক্যাফেটি উদ্বোধন করেন প্রকাশক সুধাংশু শেখর দে, লেখক কমল চক্রবর্তী, অমর মিত্র, কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা সন্দীপ দত্ত, বাংলাদেশের প্রকাশক দীপঙ্কর দাস, মনিরুজ্জামান মিন্টু।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন কবি রুদ্র গোস্বামী, প্রকাশক রূপা মজুমদার, বাঁধাইকর্মী অসীম দাস, প্রেসকর্মী দীপঙ্কর, পাঠক তন্ময় মুখার্জি ও সৌম্যজিৎ, নূর ইসলাম, বাসব দাশগুপ্ত, লেখক সমীরণ দাস, সুকান্তি দাস, শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষসহ প্রায় ২শ পাঠক।

আয়োজকরা জানান, বুক স্টোর ও ক্যাফে এখন একটি জনপ্রিয় ধারা। সেই ধারায় শুধু নতুন একটি সংযোজন নয়, অভিযান বুক ক্যাফে অনন্য হয়ে উঠল বাংলা প্রকাশনা ও মুদ্রণের ২৪৪ বছরের ইতিহাসকে ফুটিয়ে তোলার মধ্য দিয়ে। প্রায় একশ বছরের পুরোনো ছাপার মেশিন রাখা হয়েছে এখানে। দেওয়ালে দেওয়ালে মুদ্রণ ও প্রকাশনায় অবদান রাখা ব্যক্তি ও সংস্থার ছবি স্থান পেয়েছে। চায়ের কাপে রয়েছে বাংলার প্রথম মুদ্রণের বর্ণমালা।


বাংলাদেশের অভিযান প্রকাশনীর কর্ণধার কবি মনিরুজ্জামান মিন্টু বলেন, ‘বাংলাদেশের বইয়ের বিশাল সমারোহ ও অভিযান বুক ক্যাফের এই পথচলা বাংলা বইয়ের বাজারকে সমৃদ্ধ করবে। শুধু বইয়ের দোকান নয়, বুক ক্যাফে! ফলে শিল্পের অপরাপর মাধ্যমগুলোও কোনো না কোনোভাবে এটাকে যুক্ত করবে।’

দেড় দশক ধরে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন কবি ও কথাসাহিত্যিক ড. রাহেল রাজিব। তিনি বলেন, ‘বই বিষয়ক যে কোনো আয়োজন একটি সমাজকে সামনে এগিয়ে নেয়। অভিযান বুক ক্যাফের অবস্থান কলকাতা কলেজ স্ট্রিট হলেও সেখানে বাংলাদেশের বইয়ের সমাহার এবং শিল্পবিষয়ক অপরাপর বিষয়গুলোর সম্পৃক্তি প্রতিষ্ঠানটিকে এগিয়ে নেবে।’

 

;

স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক



তৌফিক হাসান, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম
স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক

স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক

  • Font increase
  • Font Decrease

আমেরিকা ভ্রমণে বাঙালির অন্যতম গন্তব্যের একটি হচ্ছে স্ট্যাচু অব লিবার্টি। স্ট্যাচু অব লিবার্টির সামনে দাঁড়িয়ে একটা ছবি না উঠলে যেন আমেরিকাপূর্ণই হবে না! আমেরিকার সিম্বলিক আইকন হচ্ছে এই স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ভাস্কর্যটি আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক। তাই বাংলাদেশ থেকে রওনা হবার আগেই গন্তব্য হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছিল নিউইয়র্কের স্ট্যাচু অব লিবার্টি।

পরিকল্পনা ছিল আমার স্ত্রীর এবং তার ছোট বোনের পরিবারের সকলে মিলে একসাথে স্ট্যাচু অফ লিবার্টি দেখতে যাব। কিন্তু ভায়রা ভাইয়ের বিশেষ কাজ পরে যাওয়ায় সিদ্ধান্ত হলো তার এক বন্ধু নীলফামারীর জিএম ভাই আমাদের ড্রাইভ করে নিয়ে যাবে নিউইয়র্কে। যাত্রার দিন ঘড়ির কাটা মেপে জিএম ভাই হাজির, রেডি হয়েই ছিলাম তাই ঝটপট বেরিয়ে পরলাম। পেনসিলভেনিয়ার লেভিট্টাউনে তখন সকাল ৮টা বাজে, বাসা থেকে বের হবার সাথে সাথেই সূর্য মামার ঝাঁজ বুঝতে পারলাম। সূর্য এমন তেতেছে দিনটা যে খুব একটা সুখকর হচ্ছে না তা বেশ বুঝতে পারলাম। বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এবারের গ্রীষ্মে বেশি গরম অনুভূত হচ্ছে আমেরিকাতে। স্থানীয়দের মতে এরকম গরম বিগত কয়েক বছরে তারা দেখতে পায়নি। শুধু আমেরিকাতে নয়, এই বছর ইউরোপেও বেশ গরম অনুভূত হচ্ছে আর আমাদের দেশের কথা না হয় নাই বললাম।

লিবার্টি আইল্যান্ড

গাড়ির চাকা সচল আবার কিছুক্ষণ পরেই আমরা আই-৯৫ হাইওয়েতে গিয়ে পড়লাম, এই এক রাস্তা ধরেই প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টায় আমরা পৌঁছে যাবো নিউইয়র্কের ম্যানহাটানে। ৫৫ মাইল বেগে ছুটে চলছে আমাদের গাড়ি আর ঠান্ডা হাওয়ায় বসে আমরা গান শুনছি। হঠাৎ ড্যাশবোর্ডে চোখ পড়তেই খানিকটা আঁতকে ওঠার মতো অবস্থা হলো। কারণ সেখানে উইন্ড স্ক্রিনের তাপমাত্রা দেখাচ্ছে ১০০ ডিগ্রী ফারেনহাইট। কপালে ভোগ আছে তা পরিষ্কার হয়ে গেল। চলতে চলতে প্রায় ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই আমরা নিউইয়র্কের ম্যানহাটান এলাকার ব্যাটারি পার্কে পৌঁছে গেলাম, এখান থেকেই যেতে হবে লিবার্টি আইল্যান্ডে। এবার পার্কিং এর জায়গা খোঁজার পালা। নিউইয়র্কে গাড়ি পার্কিং করা বেশ ঝামেলার তার মধ্যে আমরা গিয়েছে ফোর্ডের ট্রানজিট নামের বেশ বড়সড় একটি ভ্যান। যত প্রাইভেট পার্কিংয়েই যাচ্ছি সবাই না করে দিচ্ছে যে এত বড় ভ্যানের জন্য কোন জায়গা খালি নেই। কোথায় গেলে পেতে পারি সেই হদিসও কেউ দিতে পারছে না দেখে মেজাজ কিঞ্চিৎ খারাপ হতে শুরু করলো। অবশেষে প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে আমরা এক পার্কিং খুঁজে পেলাম। গাড়ি পার্ক করেই ছুটলাম ফেরি টার্মিনালের দিকে। জনপ্রতি ২৩ ডলার করে অনলাইনে টিকিট করাই ছিল।  ওই টিকিটে ভাস্কর্যটির উপরে উঠা এবং এলিস আইল্যান্ড ভ্রমণ অন্তর্ভুক্ত।

 

লিবার্টি আইল্যান্ডে যাবার ফেরি

গ্রীষ্মকালে স্ট্যাচু অব লিবার্টিতে প্রচুর পর্যটক যায়। আপনি যদি অনলাইনে টিকিট না করে যান তাহলে ব্যাটারি পার্ক ফেরি টার্মিনালে যে টিকিট কাউন্টার আছে সেখানেও করতে পারবেন কিন্তু ঘণ্টাখানেক লাইনে দাঁড়াতে হতে পারে। আমাদের যেহেতু অনলাইন টিকিট কাটা ছিল তাই আমরা সরাসরি ফেরি টার্মিনাল চলে যাই। মোটামুটি এয়ারপোর্ট গ্রেড সিকিউরিটি সম্পন্ন করে জ্যাকেট, জুতা, ব্যাগ, বেল্ট এবং ওয়ালেট সবকিছু স্ক্যান করিয়ে ফেরিতে উঠার অনুমতি মেলে। ফেরিতে উঠিই তড়িঘড়ি করে ছাদে চলে যাই ভালো ভিউ পাবার জন্য। তবে রোদের তীব্রতায় সেখানে বেশ কষ্ট হচ্ছিল, বিশেষ করে বাচ্চাদের। ফেরি ছাড়ার পর খানিকটা আরাম বোধ হলো বাতাস শুরু হয় বলে। ফেরি ছাড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা পৌঁছে যাই লিবার্টি আইল্যান্ডে বা স্ট্যাচু অব লিবার্টির বাড়িতে। এই ভাস্কর্যটি আমেরিকার আইকনিক সিম্বল হলেও এটা কিন্তু আমেরিকানরা তৈরি করেনি। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয়ে আমেরিকানদের বিশেষভাবে সাহায্য করেছিল ফ্রান্স। আমেরিকার স্বাধীনতা অর্জনের ১০০ বছর পূর্তিতে দুই দেশের বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে, ১৮৮৬ সালে ফ্রান্সের জনগণের পক্ষ থেকে ভাস্কর্যটি আমেরিকাকে উপহার দেয়া হয়। ফ্রান্সে পুরোপুরি তৈরি করার পর বিশাল এই ভাস্কর্যটি খুলে ২০০টি বাক্সে ভরে জাহাজে করে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

লিবার্টি আইল্যান্ড জেটি

১৯২৪ সাল পর্যন্ত ভাস্কর্যটির নাম ছিল লিবার্টি এনলাইটেনিং দ্য ওয়াল্ড, পরবর্তীতে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ১৫১ ফুট ১ ইঞ্চি উচ্চতার ভাস্কর্যটির ডান হাতে রয়েছে প্রজ্জলিত মশাল এবং বাম হাতে রয়েছে আইনের বই। স্ট্যাচু অব লিবাটির মাথার মুকুটে রয়েছে সাতটি কাটা, যা সাত মহাদেশ এবং সাত সমুদ্র কে নিদের্শ করে। মাটি থেকে মূল বেদি সহ এর উচ্চতা ৩০৫ ফুট ১ ইঞ্চি। ভাস্কর্যটির নাকের র্দৈঘ্য ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি এবং এর এক কান থেকে আরেক কানের দূরত্ব ১০ ফুট। মূর্তিটির ওজন প্রায় আড়াই লক্ষ কেজি। ভাস্কর্যটির পায়ের কাছে পরে থাকা শেকল আমেরিকার মুক্তির প্রতীক। স্ট্যাচু অব লিবার্টির ভেতরে দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে একেবারে মাথায় ওঠা যায়। ভাস্কর্যটির মুকুটে রয়েছে ২৫ টি জানালা, যা অনেকটাই ওয়াচ টাওয়ার হিসেবে কাজ করে।

মজার ব্যাপার হলো যে স্ট্যাচু অফ লিবার্টির ছবি দেখলেই সবাই আমেরিকা ঠাওর করতে পারে সেটা কিন্তু আসলে আমেরিকার কথা ভেবে তৈরি করা হয়নি।ফরাসি ভাস্কর ফ্রেডেরিক অগাস্ট বার্থোল্ডি এটির রূপকার। রোমান দেবী লিবার্টাসের আদলেবার্থোল্ডি এই বিশ্বখ্যাত ভাস্কর্য টিডিজাইন করেছিলেন তবে মুখমন্ডলটি ডিজাইনে তার মায়ের মুখের প্রভাব আছে বলে জানা যায়। ভাস্কর্যটির ভিতরের কাঠামো ডিজাইন করতে তিনি বিখ্যাত গুস্তাভ আইফেলের সাহায্য নিয়েছিলেন। গুস্তাভ আইফেল কিন্তু ফ্রান্সের আইকন আইফেল টাওয়ারের রূপকার।

স্ট্যাচু অব লিবার্টি

প্রাথমিকভাবে বার্থোল্ডি ঠিক করেছিলেন তার এই স্বপ্নের শিল্পকর্মকে তিনি সুয়েজ খালের তীরে স্থাপন করবেন এবং সেই মোতাবেক সুয়েজ কর্তৃপক্ষ ও মিশর সকারের সাথে আলোচনার পর ঠিক হলো সুয়েজ খালের তীরেই স্থাপন করা হবে এই ভাস্কর্যটিকে, নামও ঠিক করা হলো 'ইজিপ্ট ব্রিঙিং লাইট টু এশিয়া'। পরবর্তীতে নানা জটিলতায় ভাস্কর্যটি মিশরে স্থাপন না করা গেলে বার্থোল্ডি আমেরিকায় আসেন তার শিল্পকর্মটির একটা হিল্লে করতে।

শুরুর দিকে আমেরিকাবাসীরাও খুব একটা আগ্রহ দেখাননি এই ভাস্কর্য নিয়ে। তবে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের পর শেষ পর্যন্ত ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান শহর ও একদার রাজধানী নিউইয়র্কের হাডসন নদীর মুখে লিবার্টি আইল্যান্ডে। আমরা সেই আইল্যান্ডে পৌঁছে ফেরি থেকে নেমেই সারিবদ্ধ ভাবে এগোতে থাকলাম ভাস্কর্য পানে। কাছে গিয়ে ভাল করে দেখতে লাগলাম বিশ্বখ্যাত সেই ভাস্কর্য। ভাস্কর্যটি তামায় তৈরি হলেও বর্তমানে এর গায়ের রঙ বর্তমানে সবুজ আকার ধারণ করেছে। সময়ের আবর্তে  আটলান্টিক মহাসাগরের নোনা জলের ওপর দিয়ে ভেসে আসা বাতাসের সাথে বিক্রিয়ার ফলে তামার বহিরাবরণের এই সবুজ সাজ। ভাস্কর্য চত্বর ভাল করে ঘুরে, মুর্তিটিকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে কিছু ছবি তুলে হাঁটা দিলাম এটির মাথার যাবার জন্য। আবারও সিকিউরিটি চেক করাতে হলো। বয়স্ক এবং অপারগ মানুষের জন্য লিফটের ব্যবস্থা আছে সেখানে তবে আমরা সিঁড়ি বেয়েই উঠতে লাগলাম। প্রায় ১০ তলা সমান উঁচু প্যাডেস্টালে পৌঁছার পর আমাদের থামতে হলো কারণ কোভিডের কারণে একদম মাথা পর্যন্ত উঠা বন্ধ আছে যদিও মাথার মুকুট পর্যন্ত উঠার জন্য টিকিট কাটা ছিল আমাদের।

প্যাডেস্টালের ওপর থেকেই মূল ভাস্কর্যের শুরু। সেখান থেকে ভাস্কর্যটির ভিতর দিয়ে উঠতে যাওয়াটা খানিকটা কঠিনই বলা চলে কারণ এর থেকে উপরের দিকে উঠতে হলে বেশচাপা প্যাঁচানো প্যাঁচানো খাড়াসিঁড়ি বাইতে হবে। উপর যাওয়া বারণ বিধায় নিচ থেকে তাকিয়ে উপরের দিকে দেখলাম। গ্লাস লাগানো থাকাতে মোটামুটি অনেকটা অংশ দেখা যায়। প্যাডেস্টালে কর্মরত সিকিউরিটি অফিসার খানিকাটা ব্রিফিং দিলেন এবং বললেন যে এই ভাস্কর্যের ভিতরের কাঠামোর সঙ্গে আইফেল টাওয়ারের খানিকটা মিল আছে। দেখিয়ে দিলেন কোন কর্নার থেকে দেখলে আইফেল টাওয়ারের মতো মনে হবে। প্যারিসের আইফেল টাওয়ার কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। তাই সিকিউরিটি অফিসারের দেখিয়ে দেয়া অংশ দিয়ে তাকিয়ে ভিতরের কাঠামোর সাথে আইফেল টাওয়ারের বেশ সাদৃশ্য পেলাম।

মূল ভাস্কর্যের ভিতরের কাঠামো

প্যাডেস্টালে বা ভাস্কর্যের পাদদেশে খানিকক্ষণ সময় কাটিয়ে ছবি-টবি তুলে নামার পথ ধরলাম।সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আমার স্ত্রীর তেষ্টা পেয়ে গেল। নিচে নামার পর পানি খাবে না লেমনেড খাবে জিজ্ঞেস করাতে সে বলল লেমনেড খাবে। অগত্যা লেমনেড তথা খাস বাংলায় লেবুর শরবত অর্ডার করলাম। প্লাস্টিক গ্লাসে অর্ধেক বরফের উপর আধখানা ফ্রেস লেবু, দুই চামচ চিনি আর পানি এই হলো লেমনেড। আমাদের মোট ১১ জনের জন্য বিল আসলো ১৮৬ ডলার। এমনিতেই ভীষণ গরম তার উপর লেবু পানির বিল দেখে গায়ের জ্বালা আরও বেড়ে গেল। নিজেকে আর ধরে রাখতে না পেরে স্ত্রীকে বলেই ফেললাম বাংলাদেশ তোমাকে কখনো লেবুর শরবত খেতে দেখিনি আর এখানে এসে তুমি ১৮৬ ডলার নামিয়ে দিলে। বউ মুখে কিছু না বলে আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকলো যেন আমার থেকে বড় কিপ্টে সে জীবনেও দেখেনি। শ্যালিকা আমার পাশে ছিল বলেই সেই যাত্রা রক্ষা পেলাম।

লিবার্টি আইল্যান্ড ঘোরা শেষ, মিউজিয়াম না দেখেই ফেরির পথ ধরলাম কারণ আমাদের পরের গন্তব্য এলিস আইল্যান্ড। ফেরিরে উঠার সময় কাঠের পাটাতনের বাহিরের দিকে স্টিল স্ট্রাকচারের গর্তে প্রচুর কয়েন দেখতে পেলাম। ইউরোপিয়ান-আমেরিকানরা এরকম হাজারো কয়েন প্রতিবছর নানা ধরনের মনোবাসনা নিয়ে পানিতে ছুঁড়ে মারে। এখনেও হয়তো তেমনি কিছু হয়েছে, কিছু অংশ গিয়ে সাগরে পরেছে বাকিটা পল্টুনের স্টিল স্ট্রাকচারের গ্যাপে আটকে গিয়েছে।

ফেরিতে উঠেই আবারো ছাদে চলে গেলাম, সমান্য পরেই চলে আসলাম এলিস আইল্যান্ডে। এলিস আইল্যান্ড একসময় একসময় ছিল অভিবাসীদের  ইমিগ্রেশন সেন্টার। এখানে ইমিগ্রেশন শেষ করে তারা আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়তো। ১৮৯২ সাল থেকে ১৯৫৪ সালে বন্ধ হয়ে যাবার আগ পর্যন্ত ৬০ বছরে প্রায় ১২ মিলিয়ন অভিবাসীর ইমিগ্রেশন হয়েছিল এই আইল্যান্ডে। অনুমান করা যায় যে বর্তমান মার্কিন নাগরিকদের প্রায় ৪০ শতাংশের পূর্বপুরুষদের মধ্যে কেউ না কেউ এই দ্বীপের মাধ্যমে আমেরিকাতে অভিবাসিত হয়েছিল।

এলিস আইল্যান্ড ইমিগ্রেশন রেজিস্ট্রেশন হল

ইমিগ্রেশন সেন্টারটিকে বর্তমানে স্মৃতিশালা হিসেবে বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা হয়েছে। ইমিগ্রেশন হল, লাগেজ রুম সহ পুরো ইমারতটি ভাল করে ঘুরে দেখলাম। প্রচুর পিক্টোরিয়াল ডিসপ্লে আছে যেগুলো পড়তে গেলে অনেক সময়ের দরকার। বিল্ডিঙে দুই ফ্লোরে দুটো থিয়েটারও আছে পুরো ইতিহাসের উপর মুভি দেখানোর জন্য। আমাদের সময় কম থাকাতে মুভি না দেখেই ফিরতে শুরু করলাম কারণ ততক্ষণে দিনের আলো কমতে শুরু করেছে।

;