সাহিত্যে জ্বলে নেভে ফ্যাসিস্ট ও বিপ্লবীর চরিত্র



দেবদুলাল মুন্না
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

অলঙ্করণ কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

সাল ১৯০৬। শহর ভিয়েনা। ওই শহরে এক বড় ব্যবসায়ীর ষোড়শী মেয়ে ছিল। একদিন রাস্তার ধারে বসে থাকা এক আর্টিস্টকে দিয়ে শখ করে মেয়েটি তার পোট্রেট আঁকাল। অসম্ভব রূপবতী এই তরুণীর ছবি আঁকতে গিয়ে মনের অজান্তে শিল্পী তার প্রেমে পড়ে গেল। শিল্পীর বয়সও বেশি না । মাত্র আঠার। ছেলেটির স্বপ্ন চিত্রশিল্পী হওয়া। Academy of Fine Arts Vienna-তে চেষ্টা করেছিল ভর্তি হবার জন্য। কিন্তু পারেনি। তখন লুবনিগ নামে আরেকটি শহরে একটি মিউজিয়াম ছিল। সেখানে সেই শিল্পীকে গরীব বলে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। ছেলেটির অবসর কাটে রাস্তার ধারে ছবি এঁকে। আবার মাঝে মাঝে পথচারীদের পোর্টেট এঁকে দুচার পয়সা রোজগার করে। শিল্পীদের মন অনেক রোম্যান্টিক হয়। এটাই স্বাভাবিক। তো পরদিন মেয়েটিকে সে প্রপোজ করে।

মেয়েটি হা বা না, কিছুই বলে না। ছেলেটি মাঝে মাঝে মেয়েটির বাড়ির সামনে গিয়ে বসে থাকত। একপলক দেখার জন্য। বিশাল বাড়িটি উচু প্রাচীরে ঘেরা। বিশাল লোহার গেট। মাঝে মাঝে ছেলেটি তার একমাত্র সঙ্গী কুকুরকে গেটের ফাঁক দিয়ে প্রবেশ করিয়ে দিত বাড়ির ভিতরে। কুকুরটির মুখে থাকত প্রেমপত্র। কুকুরটি ছিল ছেলেটির অনেক প্রিয়।

ভিয়েনা আসার সময় তার মা এই কুকুরটিকে তার সাথে দিয়েছিল। বলা যায়, কুকুরটি ছিল মায়ের দেওয়া শেষ উপহার। একদিন ছেলেটি জানতে পারে তার মাও মারা গিয়েছেন। ছেলেটির আর কেউ রইল না। এদিকে মেয়েটির পরিবার ছেলেটির বিষয়টি আমলে নিল। ছেলেটি চালচুলোহীন, রাস্তার ছেলে। তার ওপরে non-Jewish এই সম্পর্ক কিছুতেই সম্ভব নয়। আর ছেলেটির ভবিষ্যত বলে কিছু নেই। পার্কে বসে মাঝে মাঝে বাদাম খেত আর ভাবত সে বা তার মতো লোকই তো বেশি, তবে তারা চালচুলোহীন কেন, নিপীড়িত কেন? তো, ওই বড়লোক তরুণীর পরিবারের সদস্যরা শিল্পীকে বারবার বারণ করে দিল। কিন্তু প্রেম কি আর বারণ শোনে? ছেলেটি সুযোগ পেলেই মেয়েটিকে দূর থেকে দেখত। উত্তর না এলেও প্রেমপত্র দিত। তো একদিন প্রেমপত্রসমেত কুকুরটিকে আবার পাঠাল মেয়েটির বাড়িতে। কিন্তু এইদিন আর কুকুরটি ফিরে এলো না। ছেলেটি সারারাত অপেক্ষা করে, সকালে চলে গেল। পরদিন আবার মেয়েটির বাড়ির সামনে গেল। বাড়ির সামনে রাস্তার পাশে ছেলেটি তার সেই প্রিয় কুকুরটির মৃতদেহ খুঁজে পেল। মা নেই, একমাত্র সঙ্গী কুকুরও নেই। নির্মমভাবে তাকে মেরে ফেলা হয়েছে। সেইদিন কাঁদতে কাঁদতে ছেলেটি চলে এলো। আর কোনোদিন ওই বাড়ির সামনে যায়নি সে।

মেয়েটি ছিল ইহুদী পরিবারের, তাই হয়তো পরবর্তীতে ছেলেটি অনেক ইহুদিদের হত্যা ও অত্যাচার করে। ছেলেটির নাম ছিল এডলফ হিটলার। তার লেখা বই ‘মেইনক্যাম্প’ যারা পড়েছেন তারা নিশ্চয়ই এক জায়গায় পড়েছেন যে, তার মাঝে মাঝে মনে হতো এই জগতে কিছুই কিছু না। কিছুই নেই। এই পরাক্রমশালী, ফ্যাসিস্ট হিটলারের এই শৈশব, এই বেড়ে ওঠাকে আমি ইগনোর করতে পারি না। মাইকেল মধুসূদন রাবণকে বীর হিসেবে দেখিয়েছিলেন। হিটলারকে কেউ দেখায়নি। কিন্তু জাতীয়তাবাদ তো যখন ধর্মে রূপান্তরিত হয় তখন উগ্রই হয়। নাকি? তবু জাতীয়তাবাদী সত্তার ইতিহাসবিদরাও তাকে খল নায়কই বানিয়ে রাখলেন। যেমন রেখেছে আমেরিকা, লেনিনকে। লেনিনের মূর্তি ভাঙার পর আহমদ ছফা একটি কবিতা লিখেছিলেন আক্ষেপ করে—“লেনিন এবার ঘুমাবে শান্তিতে।”

কিন্তু লেনিনের অনুসারীরা কি দেশে দেশে ঘুমাচ্ছে শান্তিতে? বা হিটলারের অনুসারীরা? দুই ধারা, দুটি বড় প্রোফাইল। লেনিনের ভাইকে জার শাসকরা মেরে ফেলেছিল। ওই ভাই-হত্যার প্রতিশোধ কাজ করেছিল লেনিনের বিপ্লবী হয়ে ওঠার পেছনে। কার্ল মার্কসের স্বপ্ন বাস্তবায়নে জাতীয়তাবাদী না আন্তর্জাতিকতাবাদী হয়ে উঠেছিলেন। যৌথ মানব খামারের স্বপ্ন প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। এ মাসে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে তার নেতৃত্বে বলশেভিকরা অক্টোবর বিপ্লব করেছিল। এরপর ওই বিপ্লব ছড়িয়ে পড়েছিল পূর্ব ইউরোপে। বিভিন্ন দেশে। দুই বিপরীত রাজনৈতিক দর্শনের অনুসারী দুইজন। দেশে দেশে এখনো এই দুই দর্শনের অনুসারীরা লড়ছেন। এও আমরা জানি। তবে জাতীয়তাবাদী প্যাকেজ নাকি প্রাক্সিস প্যাকেজ আপনার দরকার সেটি আপনিই জানেন। আমার দরকার পরেরটা। আপনার? হিটলারের মৃত্যুর খবরটি কিভাবে জেনেছিলেন তার দ্বারা নির্যাতিত কার্ল লেহমান? ১৯৪৫ সালের ১ মে। লন্ডন থেকে ৬৫ কিলোমিটার দূরের বিবিসির রিডিংয়ে নিজের ডেস্কে বসে কাজ করছিলেন কার্ল লেহম্যান।

আরো পড়ুন ➥ শীতে পাওয়া সাহিত্য

সোভিয়েত সেনাবাহিনী বার্লিনের উপকণ্ঠে পৌঁছে গেছে আর জার্মানির সঙ্গে যুদ্ধও শেষ পর্যায়ে এসে ঠেকেছে।

২৪ বছর বয়সী লেহম্যান রেডিও শুনছিলেন। এ সময় একটি ঘোষণা এলো, শ্রোতাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ শোনার জন্য প্রস্তুতি নিতে বলা হচ্ছে। তারা একটি আনুষ্ঠানিক সংগীত বাজিয়ে ঘোষণা দিল, হিটলার মারা গেছেন। সেদিনের সেই ঘোষণাটি মনে করছেন লেহম্যান, তিনি জানান, বলশেভিকদের সঙ্গে লড়াইয়ের সময় তিনি মারা গেছেন। খুবই ভারী কণ্ঠে ওই ঘোষণাটি দেওয়া হয়েছিল। ইহুদিদের ওপর নাৎসি বাহিনীর নির্যাতন বেড়ে যাওয়ায় নয় বছর আগে লেহম্যান ও তার ছোট ভাই গেয়গকে জার্মানি থেকে ব্রিটেনে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন তাদের বাবা-মা। তাদের বাবা ছিলেন একজন জার্মান ইহুদি। লেহম্যান বলেন, ‘আমি একেবারে স্বস্তি অনুভব করছিলাম, কারণ হিটলার আমার জীবনটা ধ্বংস করে দিয়েছে।” কিন্তু পরে জানেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির নিশ্চিত পরাজয় বুঝতে পেরে ১৯৪৫ সালে বার্লিনের একটি বাঙ্কারে গুলি করে আত্মহত্যা করেছিলেন অ্যাডলফ হিটলার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর এমনই জেনে আসছে বিশ্ববাসী। কিন্তু এই সুইসাইডের ঘটনা কতখানি ঠিক? প্রশ্ন তুলেছেন সিমোনি রিনি গুয়েরিরো। তার বইয়ের নাম, ‘হিটলার ইন ব্রাজিল-হিজ লাইফ অ্যান্ড হিজ ডে’। বইতে সিমোনি দাবি করেন, হিটলার ছদ্মবেশে পালিয়ে যান প্রথমে আর্জেন্টিনা, পরে প্যারাগুয়ে, আরো পরে বলিভিয়ায়। তারপর? ১৯৮৪ সালে বলিভিয়ার জঙ্গলে মারা যান গুলি খেয়ে। বলিভিয়ার জঙ্গলে হিটলারের মতো একনায়কতান্ত্রিক মারা যাওয়ার খবরে আসরা নড়েচড়ে বসি। কেননা, বলিভিয়ার জঙ্গলে বিপ্লবী চে গুয়েভারা মারা যান। চে-কে নিয়ে পরে বলি। এর আগে হিটলারের ভক্ত এক অধ্যাপকের কথা মনে পড়ছে। অ্যানাটমি বইয়ে সাধারণত মানবদেহের চামড়া, পেশি, শিরা-উপশিরা, স্নায়ু, দেহের ভেতরের বিভিন্ন অঙ্গ ও হাড় চিত্রের সাহায্যে বিস্তারিতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়। অপারেশনের সময় অনেক সার্জনের কাছেই জরুরি হয়ে ওঠে এ ধরনের একটি অ্যানাটমি বই। ‘পার্নকপ্ফ টোপোগ্রাফিক অ্যানাটমি অব ম্যান’ এনাটমির একটি সেরা বই। লেখকের নাম পার্নকপ্ফ। এই বইয়ের পেছনে রয়েছে রক্তাক্ত করুণ ইতিহাস।

নাৎসিদের হাতে নিহত ব্যক্তিদের দেহ ব্যবচ্ছেদ করে গবেষণালব্ধ ফল সন্নিবেশিত হয়েছে এ বইয়ের পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা। হাতে আঁকা জটিল সব চিত্রসংবলিত এই বইয়ে রয়েছে মানবদেহের বিস্তারিত খুঁটিনাটি। কিন্তু পার্নকপফের বইটি এখন আর বাজারে নেই। তাই কয়েক খণ্ডে প্রকাশিত এই বইয়ের পুরনো একটি সেটও যে কোনো সার্জনের কাছে মহামূল্যবান। হাজার হাজার পাউন্ড খরচ করেও এটি সংগ্রহে রাখতে দ্বিধা করেন না আগ্রহীরা। চড়া মূল্যের এই বই কেউ কেউ সাজিয়ে রাখেন ক্লিনিকে কিংবা বাড়ির লাইব্রেরিতে।

সমালোচকেরা মনে করেন, বইটির যেহেতু কালো ও মর্মান্তিক এক ইতিহাস রয়েছে, তাই এটি ব্যবহারের প্রসঙ্গে নৈতিকতার প্রশ্ন জড়িত। নাৎসিবাদী খ্যাতিমান ডাক্তার এডুয়ার্ড পার্নকপফের ২০ বছর মেয়াদি একটি প্রকল্প ছিল এই অ্যানাটমি বই। সহকর্মীদের ভাষ্যানুযায়ী, পার্নকপ্ফ ছিলেন নাৎসিবাদের উগ্র সমর্থক। হিটলারের ভক্ত। কর্মস্থলে তিনি রোজ নাৎসি ইউনিফর্ম পরে যেতেন। তাকে যখন ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল স্কুলের ডিন পদে নিয়োগ দেওয়া হয়, তখন তিনি সব ইহুদি সহকর্মীকে বরখাস্ত করেন। বরখাস্ত হওয়া কর্মীদের মধ্যে ছিলেন তিন জন নোবেল বিজয়ীও। ১৯৩৯ সালে নতুন একটি আইন প্রণয়ন করে বলা হয়, বন্দীদের হত্যা করার পরপরই গবেষণা ও শিক্ষার কাজের জন্য তাদের দেহগুলোকে নিকটস্থ অ্যানাটমি বিভাগে জমা দিতে হবে। সেই সময়ে ড. পার্নকপ্ফ দিনে ১৮ ঘণ্টা করে কাজ করতেন। মৃতদেহগুলো একের পর এক ব্যবচ্ছেদ করতেন। সেই সময়ে তার সঙ্গে থাকতেন একদল আঁকিয়ে, যারা সেগুলো আঁকতেন। মৃতদেহ দিয়ে অ্যানাটমি বিভাগগুলো কখনো কখনো উপচে উঠত। বিভাগগুলোতে আর মৃতদেহের স্থান সংকুলান না হলে তখন কখনো কখনো বন্দীশিবিরগুলোতে হত্যাকাণ্ড সাময়িকভাবে স্থগিত করা হতো।

আরো পড়ুন ➥ স্মরণীয় ১০ জন যারা পেয়েছিলেন রাষ্ট্রের অবমাননা ও অবিচার

পার্নকাপফের বইয়ে যে ৮০০ চিত্র রয়েছে, তার অন্তত অর্ধেকই এসেছে রাজনৈতিক বন্দীদের থেকে। এসব বন্দীর তালিকায় সমকামী নারী-পুরুষ, জিপসি, রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বী ব্যক্তি ও ইহুদিরা ছিল। এটলাস থেকে বইয়ের প্রথম খণ্ডটি প্রকাশিত হয় ১৯৩৭ সালে। বইটিতে ইলাস্ট্রেটর হিসেবে এরিখ লেপিয়ের ও কার্ল এন্ডট্রেসের স্বাক্ষর ও স্বস্তিকা চিহ্ন রয়েছে।

লেনিন বা চে গুয়েভারার জীবনটা ছিল অন্যরকম। লেনিনকে নিয়ে লিখে বিখ্যাত হয়েছেন মিখাইল জেরানভ। বইয়ের নাম, ‘লেনিন, ড্রিমার অব রেভ্যুলেশন’। এ বইয়ের কিছু অংশ: “ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানিভ (লেলিন) ১৮৭০ সালের ২২ এপ্রিল জার শাসিত তৎকালীন রাশিয়ায় সিমর্স্ক শহরে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা ল্যা নিকোলয়েভিচ উলিনায়ভ ছিলেন একজন বিদ্যালয় পরিদর্শক আর মা মারিয়া আলেক্সন্ড্রাভনা ছিলেন শিক্ষিকা। ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। পুলিশের হাত থেকে বাঁচার জন্য সাইবেরিয়ার ‘লেনা’ নদীর নামানুসারে তিনি নিজের ছদ্মনাম রাখেন লেলিন। মজার ব্যাপার হলো লেলিন ছাত্র বয়স থেকেই মার্কসবাদী হলেও তার বাবা ছিলেন একজন কট্টর গণতন্ত্রবাদী। বড়ভাই আলেকজান্ডার ও বোন অ্যানা ইলিচনিনা ছিলেন বিপ্লবী ও সহযোদ্ধা। ১৮৮৬ সালে বাবা মারা যাওয়ার পর সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে মায়ের ওপর। এদিকে বাবা মারা যাওয়ার কিছুদিন পর একই বছরে লেলিনের পরিবারে আসে ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন। বড়ভাই আলেকজান্ডার ছিলেন ‘নারোদনায়া ভোলিয়ার’ নামের একটি বিপ্লবী সংগঠনের সভ্য। এই সংগঠন সিদ্ধান্ত নেয় তৃতীয় জারকে হত্যা করা হবে। গুপ্তচররা বিষয়টা জেনে ফেলে। চার সঙ্গীসহ আলেজজান্ডারকে ফাঁসি দেওয়া হয়। তখন লেলিনের বয়স ছিল ১৭ বছর। বড়ভাইয়ের ফাঁসির বিষয়টি তাকে ভয়াবহভাবে নাড়া দেয়। বড় ভাইয়ের প্রভাব পরবর্তী জীবনেও ছিল উল্লেখযোগ্য মাত্রায়। ১৮৯৫ সালে লেলিন কারারুদ্ধ হন এবং ১৮৯৭ সালে তাকে পূর্ব সাইবেরিয়ার নির্জন স্থানে নির্বাসিত করা হয়। এর কিছুদিন পর ক্রুপস্কায়াকেও সেখানে নির্বাসনে পাঠায়। পরবর্তীকালে (১৮৯৮) তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। নির্বাসনে লেলিন ৩০টি বই রচনা করেন। লেনিন গল্পকার ছিলেন। একটি মাত্র বই লিখেছিলেন। বইয়ের নাম, ‘সেকেন্ড আলেকজান্ডার’।”

সেকেন্ড আলেকজান্ডার গল্পে আমার দেখি, গল্পের শুরু হয়েছে এভাবে, “পাহাড়ের খাদের কয়েকটি খাদ স্কিপিং করার মতোন লাফিয়ে সরু থেকে বড় খাদে দাঁড়াল সেকেন্ড আলেকজান্ডার। বাইনোকুলারে চোখ রেখে দেখে নিল চারপাশ। ওভারস্যাকে থিসিসটা, বিপ্লবের। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। সেকেন্ড আলেকজান্ডার ফের বাইনোকুলারে চোখ রাখল। তাঁবুতে ফিরবে সে। ওখানে ঘুমানোর আগে অব্দি ভদকা খাবে ফায়ারপ্লেসের সামনে বসে। তখন নির্ঘাত আন্না বলবে, ‘এত মদ গিলছো কেন?’ সেকেন্ড আলেকজান্ডার বলবে না নিশ্চিত তার ভাইকে যেদিন শাসকরা ফাঁসিতে ঝুলিয়েছিল সেইরাতের কথা। সারারাত ছটফট। বারবার ভাইয়ের মুখ। ফাঁসির রজ্জু। একটা শহরে, একটা রাষ্ট্রে ঘটে যাচ্ছে যখন এসব তখন সবাই ঘুমাচ্ছিল।”

আরো পড়ুন ➥ বিখ্যাত সৃষ্টিশীলদের অবসাদ ও স্যাটায়ার

এই ‘দ্বিতীয় আলেকজান্ডার’ যে লেনিন এটি নিশ্চয়ই না বোঝার কথা না। মৃত লেনিনকে এখনো আমেরিকা ভয় পায়। সত্যি বলছি। আমাদের জাহিদ হায়দারের গল্প ‘লেনিনের বেঁচে থাকা’-তে এই অংশটুকু পড়ুন তবে, “ব্রজনাথপুর গ্রামের লেনিন ছিল ভালো ছাত্র। পাবনা এডোয়ার্ড কলেজ থেকে মানবিক শাখায় আইএ পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছিল সমাজবিজ্ঞানে। এমএ পরীক্ষায় পেয়েছিল প্রথম শ্রেণি, তবে পজিশন ছিল দ্বিতীয়। করিমুল্লাহ ভাবত, রাশিয়ার লেনিনের মতো তার ছেলে করবে রাজনীতি, সমাজতন্ত্র আনবে দেশে, হবে শেখ মুজিবের মতো বড় নেতা। বাপ করিমুল্লাহর মাথায় এই স্বপ্ন আসার একটা কারণ হতে পারে, সম্পদের অধিকার নিয়ে কমিউনিস্ট নেত্রীর বক্তৃতা এবং সলিলদার কাছে শোনা চারু মজুমদারের নকশাল আন্দোলনের মূলকথা। কিন্তু ছেলে লেনিন বাপের স্বপ্নের ধার দিয়েও যায়নি। লেনিনের পছন্দ শিক্ষকতার চাকরি। যোগ দিল একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে। দু বছর চাকরি করার পর পেয়ে যায় বিদেশে পড়ার সুযোগ। লেনিনের বিদেশ যাওয়া উপলক্ষে ব্রজনাথপুর গ্রামের বাড়িতে মিলাদ হলো। মিলাদ পড়ালেন গ্রামের মসজিদের ইমাম সাহেব। মিলাদ শেষে তিনি লেনিনকে আলাদা ডেকে নিয়ে, প্রায় ফিসফিস স্বরে বললেন, ‘বাবা নাছারার দেশে যাচ্ছো সাবধানে থাইকো, মেয়েগুলি খুব শয়তান, সবসময় আল্লাহর নাম লিবে, নামাজ কাজা ক্যরে না।’ লেনিন মনোযোগ দিয়ে কথা শুনে মিলাদ পড়ানোর জন্য টাকা দিল ইমাম সাহেবকে। তিনি টাকা গুনে দেখলেন, তিনশ। ‘যাচ্ছো আমেরিকায় আর একশ দিলি ভালো হয়।’ ইমাম সাহেবের চাওয়াকে পূরণ করে লেনিন।

আগে অনেক চিঠি পাবনা থেকে গেছে আমেরিকার হাওয়াইতে, এসেছে অনেক উত্তর। প্রেরক ছিলেন মুহম্মদ করিমুল্লাহ; প্রাপক, মুহম্মদ নিজামউদ্দিন। আমেরিকার উদ্দেশে যাওয়ার আগের দিন সন্ধ্যায় লেনিন বাবাকে তার আমেরিকার ঠিকানা লিখে দেয়। নামের সঙ্গে লেখেনি লেনিন। করিমুল্লাহ, কেন নামের সঙ্গে লেনিন নেই, ছেলের কাছে জানতে চাইলে লেনিন বলল, আমেরিকানরা লেনিন নামের মানুষকে পছন্দ করে না।”

লেনিনকে ভয় পেলেও চে গুয়েভারাকে ভয় পায় না আমেরিকা। কারণ? চে-র ছবি সম্বলিত টি-শার্ট, ব্রেসলেট, ক্যাপ ব্যাগ এসব যেন এখন তার চিন্তার বিরোধীদেরও এক ফ্যাশনের অংশ। আমি এক উগ্র মৌলবাদী দলের ছেলের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, ‘যার ছবি আপনার কালো টি শার্টে আঁকা (চে-র ছবি ছিল, বহুল পরিচিত সিগারেট টানা অবস্থার চে) তিনি কে ? বিশ্বাস হবে না জানি, তবু বলি ওই ছেলে বলেছিল, ‘হবে কোনো গায়ক বা মডেলের।’ চে-র আলাপ বারান্তরে হবে।

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'



তাহমিদ হাসান
ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

  • Font increase
  • Font Decrease

বইয়ের নাম: মানচিত্রের গল্প

লেখক: ড. মাহফুজ পারভেজ

প্রকাশক: শিশু কানন

প্রকাশকাল: ২০১৮

গল্প পড়তে সবারই ভালো লাগে। যারা ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলের কঠিন বিষয় ও বড় বড় বই পড়তে ভয় পান, তারাও গল্প আকারে সেসব সোৎসাহে পাঠ করেন। ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প' তেমনই এক গ্রন্থ, যা ভূগোল, মানচিত্র, অভিযান সংক্রান্ত সহস্র বর্ষের ইতিহাস, আবিষ্কার ও অর্জনকে গল্পের আবহে, স্বাদু ভাষায় উপস্থাপন করেছে। এ গ্রন্থ ছাড়াও তিনি মুঘল ইতিহাস, দারাশিকোহ, আনারকলি প্রভৃতি ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব ও বিষয়কে প্রাঞ্জল ভাষায় তুলে ধরেছেন একাধিক গ্রন্থের মাধ্যমে।

ড. মাহফুজ পারভেজ মূলত একজন কবি, কথাশিল্পী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তিনি ১৯৬৬ সালের ৮ মার্চ কিশোরগঞ্জ শহরের কেন্দ্রস্থল গৌরাঙ্গ বাজারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগে পড়াশুনা করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউজিসি ফেলোশিপে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগে প্রফেসর পদে নিয়োজিত আছেন।

তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ গুলো মধ্যে আমার সামনে নেই মহুয়ার বন, নীল উড়াল, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে, বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিদ্রোহী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তিচুক্তি, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রয়েছে।

https://www.rokomari.com/book/author/2253/mahfuz-parvez

লেখকের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ গুলোর মধ্যে ২০১৮ সালে প্রকাশিত 'মানচিত্রের গল্প' বইটি রয়েছে। লেখক বইটিকে ১৯ টি অধ্যায়ে ভাগ করছে। বইটির মধ্যে মানচিত্র আবিষ্কার কিভাবে শুরু হয়েছে এবং আবিষ্কারে পিছনে যাদের অবদান ছিল সেই সব বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।

মানচিত্র বা ম্যাপ শব্দটি আদিতে ল্যাটিন 'মাপ্পামুন্ডি' শব্দটি থেকে এসেছে। 'মাপ্পা' অর্থ টেবিল-ক্লথ আর 'মুনডাস' মানে পৃথিবী। অতি প্রাচীন সভ্যতায় চীনারা প্রথম মানচিত্র অঙ্কনে যাত্রা শুরু করে, কিন্তু সেই সব মানচিত্রের আজ অস্তিত্ব নেই। বইটির মধ্যে এইসব ক্ষুদ্র তথ্য থেকে শুরু টলেমির মানচিত্র, চাঁদের মানচিত্র সহ আরো অজানা তথ্য গুলো লেখক বইটির মধ্যে তুলে ধরেছে।

লেখক বইয়ের ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে টলেমির মানচিত্র, ভাস্কো ডা গামা আর কলম্বাসের লড়াই, রেনেলের ' বেঙ্গল অ্যাটলাস', 'আই হ্যাভ ডিসকভার দ্য হাইয়েস্ট মাউন্টেন অব দ্য ওয়ার্ল্ড ', মানচিত্র থেকে গ্লোব ইত্যাদি সব উল্লেখযোগ্য শিরোনামে বইটি সজ্জিত করছেন।

পরিশেষে ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে শেষ দুই অধ্যায়ে 'পরিশিষ্ট-১, পরিশিষ্ট-২' শিরোনামে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মানচিত্র এবং মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের কথা বইটিতে তুলে ধরেন।

কয়েকটি ঐতিহাসিক মানচিত্রের মধ্যে---

ব্যাবিলনে প্রাপ্ত ভূ মানচিত্র- যেটিতে ইউফ্রেটিস নদীর তীরে ব্যাবিলনকে আর্বতন করে দেখানো হয়েছে।

অ্যানাক্সিমান্ডারের মানচিত্র- পৃথিবীর প্রথম দিকের আদি মানচিত্রগুলোর মধ্যে এইটি অন্যতম, যা অঙ্কন করেছিল অ্যানাক্সিমান্ডার। এই মানচিত্রে ইজিয়ান সাগর এবং সেই সাগরকে ঘিরে মহাসাগরের এইসব দেখানো হয়েছে।

আল ইদ্রিসি'র মাপ্পা মুনদি- বিপুল মুসলিম মনীষীর মধ্যে বিখ্যাত ছিলেন আল ইদ্রিসি। আফ্রিকা, ভারত মহাসাগর ও দূরপ্রাচ্য বা ফারইস্ট অঞ্চলকে তিনি তাঁর মানচিত্রে ফুটিয়ে তুলে।

ফ্রা মায়োরো'র মানচিত্র- ভেনিসীয় সন্ন্যাসী ফ্রা মায়েরোর প্রণীত মানচিত্রটি একটি কাঠের ফ্রেমের ভেতরে পার্চমেন্টে আঁকা বৃত্তাকার প্লানিস্ফিয়ার।

হুয়ান দে লা কোসা'র মানচিত্র- তিনি ছিলেন স্পেনের বিজেতা৷ তিনি বহু ম্যাপ ও মানচিত্র তৈরি করেছিলেন তার মধ্যে প্রায় অধিকাংশ হারিয়ে গেছে বা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। ১৫০০ সালে প্রণীত তাঁর ম্যাপ বা মাপ্পা মুনদি এখনও রয়েছে, এই মানচিত্রে আমেরিকা মহাদেশকে চিহ্নিত করা সর্বপ্রথম ইউরোপীয় মানচিত্র।

মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব--

হাজি মহিউদ্দিন পিরি-- তাঁর পুরো নাম হাজি মহিউদ্দিন পিরি ইবনে হাজি মুহাম্মদ। তিনি ছিলেন উসমানী-তুর্কি সাম্রাজ্যের নামকরা অ্যাডমিরাল বা নৌ-সেনাপতি এবং বিশিষ্ট মানচিত্রকর।

আল ফারগনি- তাঁর পুরো নাম আবু আল আব্বাস আহমেদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে কাসির আল ফারগনি। অবশ্য ইউরোপের মানুষের কাছে তিনি বিজ্ঞানী আলফ্রাগানুস নামে পরিচিত ছিলেন। টলেমির একটি গ্রন্থ 'আলমাগেস্ট'- এর ভিত্তি করে সহজ সরল ভাষায় লেখা তাঁর বিখ্যাত বই 'এলিমেন্ট অব অ্যাস্ট্রোনমি অন দ্য সেলেস্টয়াল মোশান'।

বার্তোলোমে দে লাস কাসাস-- তিনি সরাসরি মানচিত্র চর্চায় অংশগ্রহণ করেন নি বটে, তবে তাঁর দ্বারা মানচিত্র চর্চা উপকৃত হয়েছে। তিনি ক্যারিবীয় অঞ্চলে ব্যাপক ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সবিস্তারে লিখে গিয়েছিলেন।

লেখক এই বইটিতে খুব সুন্দর উপস্থাপনার মাধ্যমে জটিল তথ্য গুলোকে সহজে তুলে ধরেছে৷ ২৭ শে মার্চ আমার জন্মদিনে আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ড. মাহফুজ পারভেজ স্যার এই বইটি উপহার দেন৷ এই বইটি পড়ে ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলে আগ্রহী পাঠক নিজের জ্ঞানকে প্রসারিত করতে পারবেন এবং নতুন কিছু জানতে পারবেন, একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

তাহমিদ হাসান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস স্নাতক সম্মান শ্রেণির শিক্ষার্থী

;

চা-নগরীতে এক কাপ চা



কবির য়াহমদ
চা-নগরীতে এক কাপ চা

চা-নগরীতে এক কাপ চা

  • Font increase
  • Font Decrease

[চা-শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির ন্যায্য দাবির প্রতি সংহতি]

এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে ডাইনোসর-টিকটিকি
এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে বেনামী বৃক্ষরাজি
সবকিছু থমকে যায়, সবকিছু থমকে থাকে জ্যোতির্ময় ছায়ায়।

ঈশ্বর; জন্মে শাপ আছে, কত খেলা-ছেলেখেলা
এ পাড়া, ও পাড়া বাঙময় সুঘ্রাণ, সঞ্জীবনী মায়া
দুই হাতে স্বর্গ-নরক, সুমিষ্ট কল্লোল; বিভাজন।

ভূগোলের পাঠে সমূহ ভুল, আকাশে নরক স্রোতহীন
উড়ুক্কু ভূ-স্বর্গ বাতাসে ভাসে এখানে-ওখানে
তবু স্বর্গ তার কালে নেমেছে ধরায়, ত্রিকোণ পাতায়
সবুজাভ মিহি মিহি ষোল আনা যৌনকলা!

ঈশ্বর তুমি পান করে যাও এক কাপ সুপেয় চা
মানবগোষ্ঠী বারে বারে জন্মাবে এই বৃহত্তর চা-নগরীতে।


তোমার চায়ের কাপে একটা মাছি পড়ুক
তার নিত্যকার অর্জনে হয়ে উঠুক বিষগন্ধি-মৌ
প্রসন্ন বিকেলে একপশলা বৃষ্টি আসুক
ভিজিয়ে দিয়ে যাক সত্যাসত্য ওড়না।

একদিন মেঘকে বলেছিলাম একান্তে
চুপসে দিতে আপাতদৃশ্য সমূহ প্রসাধন
অন্তর্বাসের অন্তর্হিত চেহারা ভাসুক
কোন এক মাছরাঙার ঠোঁটে।

আমাদের ধূম্রশালায় ইদানীং টান পড়েছে
তাই আশ্রয় নিয়েছে সব গার্লস কলেজে
ওখানে নিত্য বালিকার সহবাস-
দৃষ্টিবিভ্রমে কেউ কেউ যায় চোখের আড়ালে।

একটা মাছি ঘুরঘুর করতে থাকুক এক পেয়ালা চায়ে
একটা প্রসাধন দোকানী হন্যে হয়ে ছুটে আসুক মাছির পেছনে
আজ একটা মেঘখণ্ড আকাশে ব্যতিব্যস্ত হোক একপশলা বৃষ্টি হতে

আমাদের চা মহকুমায় আজ বৃষ্টি হোক ওড়নার ওজন বাড়িয়ে দিতে।


মুখোমুখি বসে গেলে এক কাপ চা হোক
অন্তত এক জোড়া ঠোঁটে চুমু খাক নিদেনপক্ষে একটা সিগারেট
আরেক জোড়া ঠোঁটে হাহাকার জাগুক অনন্ত শীতরাত্রির মত।

তোমার ঠোঁটগুলো ক্ষুদ্র অভিলাষী প্রগাঢ় আকাঙ্ক্ষার তরঙ্গ-বঞ্চিত নদী
মোহনা খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়, এক ফোঁটা জল, হায়
শেষ কবে ঢেলেছিল জল কেউ- অসহ্য ব্যথার কাল গৃহহীন জনে।

অবনত ইথার মিশে গেছে কাল সন্ন্যাস জীবনে
তবু মুখোমুখি কাল, তবু এক কাপ চা
একটা চুমু হোক চায়ের কাপে, একটা মাত্র হোক আজ অন্যখানে
যারা নেমেছিল পথে তাদের পথ থেমে আসুক পথে
সব পথ আজ মিশে যাবে চাপের কাপে, ঠোঁটের সাগরে।

ওহে ঈশ্বর, তোমার গোপন দরোজা খুলে দাও
প্রার্থনার ভাষা নমিত হোক আজ চায়ের কাপে, ক্রিয়াশীল রাতে।

;

কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু

কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশে বই বিক্রির জগতে বাতিঘর একটি বিপ্লব আনতে সক্ষম হয়েছে। বই বিক্রির পাশাপাশি বইপড়া, চা-কফির আড্ডাসহ নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা এনেছে প্রতিষ্ঠানটি। তারই আদলে এবার কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু হয়েছে।

গত ১১ আগস্ট প্রদীপ জ্বালিয়ে বুক ক্যাফেটি উদ্বোধন করেন প্রকাশক সুধাংশু শেখর দে, লেখক কমল চক্রবর্তী, অমর মিত্র, কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা সন্দীপ দত্ত, বাংলাদেশের প্রকাশক দীপঙ্কর দাস, মনিরুজ্জামান মিন্টু।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন কবি রুদ্র গোস্বামী, প্রকাশক রূপা মজুমদার, বাঁধাইকর্মী অসীম দাস, প্রেসকর্মী দীপঙ্কর, পাঠক তন্ময় মুখার্জি ও সৌম্যজিৎ, নূর ইসলাম, বাসব দাশগুপ্ত, লেখক সমীরণ দাস, সুকান্তি দাস, শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষসহ প্রায় ২শ পাঠক।

আয়োজকরা জানান, বুক স্টোর ও ক্যাফে এখন একটি জনপ্রিয় ধারা। সেই ধারায় শুধু নতুন একটি সংযোজন নয়, অভিযান বুক ক্যাফে অনন্য হয়ে উঠল বাংলা প্রকাশনা ও মুদ্রণের ২৪৪ বছরের ইতিহাসকে ফুটিয়ে তোলার মধ্য দিয়ে। প্রায় একশ বছরের পুরোনো ছাপার মেশিন রাখা হয়েছে এখানে। দেওয়ালে দেওয়ালে মুদ্রণ ও প্রকাশনায় অবদান রাখা ব্যক্তি ও সংস্থার ছবি স্থান পেয়েছে। চায়ের কাপে রয়েছে বাংলার প্রথম মুদ্রণের বর্ণমালা।


বাংলাদেশের অভিযান প্রকাশনীর কর্ণধার কবি মনিরুজ্জামান মিন্টু বলেন, ‘বাংলাদেশের বইয়ের বিশাল সমারোহ ও অভিযান বুক ক্যাফের এই পথচলা বাংলা বইয়ের বাজারকে সমৃদ্ধ করবে। শুধু বইয়ের দোকান নয়, বুক ক্যাফে! ফলে শিল্পের অপরাপর মাধ্যমগুলোও কোনো না কোনোভাবে এটাকে যুক্ত করবে।’

দেড় দশক ধরে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন কবি ও কথাসাহিত্যিক ড. রাহেল রাজিব। তিনি বলেন, ‘বই বিষয়ক যে কোনো আয়োজন একটি সমাজকে সামনে এগিয়ে নেয়। অভিযান বুক ক্যাফের অবস্থান কলকাতা কলেজ স্ট্রিট হলেও সেখানে বাংলাদেশের বইয়ের সমাহার এবং শিল্পবিষয়ক অপরাপর বিষয়গুলোর সম্পৃক্তি প্রতিষ্ঠানটিকে এগিয়ে নেবে।’

 

;

স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক



তৌফিক হাসান, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম
স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক

স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক

  • Font increase
  • Font Decrease

আমেরিকা ভ্রমণে বাঙালির অন্যতম গন্তব্যের একটি হচ্ছে স্ট্যাচু অব লিবার্টি। স্ট্যাচু অব লিবার্টির সামনে দাঁড়িয়ে একটা ছবি না উঠলে যেন আমেরিকাপূর্ণই হবে না! আমেরিকার সিম্বলিক আইকন হচ্ছে এই স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ভাস্কর্যটি আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক। তাই বাংলাদেশ থেকে রওনা হবার আগেই গন্তব্য হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছিল নিউইয়র্কের স্ট্যাচু অব লিবার্টি।

পরিকল্পনা ছিল আমার স্ত্রীর এবং তার ছোট বোনের পরিবারের সকলে মিলে একসাথে স্ট্যাচু অফ লিবার্টি দেখতে যাব। কিন্তু ভায়রা ভাইয়ের বিশেষ কাজ পরে যাওয়ায় সিদ্ধান্ত হলো তার এক বন্ধু নীলফামারীর জিএম ভাই আমাদের ড্রাইভ করে নিয়ে যাবে নিউইয়র্কে। যাত্রার দিন ঘড়ির কাটা মেপে জিএম ভাই হাজির, রেডি হয়েই ছিলাম তাই ঝটপট বেরিয়ে পরলাম। পেনসিলভেনিয়ার লেভিট্টাউনে তখন সকাল ৮টা বাজে, বাসা থেকে বের হবার সাথে সাথেই সূর্য মামার ঝাঁজ বুঝতে পারলাম। সূর্য এমন তেতেছে দিনটা যে খুব একটা সুখকর হচ্ছে না তা বেশ বুঝতে পারলাম। বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এবারের গ্রীষ্মে বেশি গরম অনুভূত হচ্ছে আমেরিকাতে। স্থানীয়দের মতে এরকম গরম বিগত কয়েক বছরে তারা দেখতে পায়নি। শুধু আমেরিকাতে নয়, এই বছর ইউরোপেও বেশ গরম অনুভূত হচ্ছে আর আমাদের দেশের কথা না হয় নাই বললাম।

লিবার্টি আইল্যান্ড

গাড়ির চাকা সচল আবার কিছুক্ষণ পরেই আমরা আই-৯৫ হাইওয়েতে গিয়ে পড়লাম, এই এক রাস্তা ধরেই প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টায় আমরা পৌঁছে যাবো নিউইয়র্কের ম্যানহাটানে। ৫৫ মাইল বেগে ছুটে চলছে আমাদের গাড়ি আর ঠান্ডা হাওয়ায় বসে আমরা গান শুনছি। হঠাৎ ড্যাশবোর্ডে চোখ পড়তেই খানিকটা আঁতকে ওঠার মতো অবস্থা হলো। কারণ সেখানে উইন্ড স্ক্রিনের তাপমাত্রা দেখাচ্ছে ১০০ ডিগ্রী ফারেনহাইট। কপালে ভোগ আছে তা পরিষ্কার হয়ে গেল। চলতে চলতে প্রায় ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই আমরা নিউইয়র্কের ম্যানহাটান এলাকার ব্যাটারি পার্কে পৌঁছে গেলাম, এখান থেকেই যেতে হবে লিবার্টি আইল্যান্ডে। এবার পার্কিং এর জায়গা খোঁজার পালা। নিউইয়র্কে গাড়ি পার্কিং করা বেশ ঝামেলার তার মধ্যে আমরা গিয়েছে ফোর্ডের ট্রানজিট নামের বেশ বড়সড় একটি ভ্যান। যত প্রাইভেট পার্কিংয়েই যাচ্ছি সবাই না করে দিচ্ছে যে এত বড় ভ্যানের জন্য কোন জায়গা খালি নেই। কোথায় গেলে পেতে পারি সেই হদিসও কেউ দিতে পারছে না দেখে মেজাজ কিঞ্চিৎ খারাপ হতে শুরু করলো। অবশেষে প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে আমরা এক পার্কিং খুঁজে পেলাম। গাড়ি পার্ক করেই ছুটলাম ফেরি টার্মিনালের দিকে। জনপ্রতি ২৩ ডলার করে অনলাইনে টিকিট করাই ছিল।  ওই টিকিটে ভাস্কর্যটির উপরে উঠা এবং এলিস আইল্যান্ড ভ্রমণ অন্তর্ভুক্ত।

 

লিবার্টি আইল্যান্ডে যাবার ফেরি

গ্রীষ্মকালে স্ট্যাচু অব লিবার্টিতে প্রচুর পর্যটক যায়। আপনি যদি অনলাইনে টিকিট না করে যান তাহলে ব্যাটারি পার্ক ফেরি টার্মিনালে যে টিকিট কাউন্টার আছে সেখানেও করতে পারবেন কিন্তু ঘণ্টাখানেক লাইনে দাঁড়াতে হতে পারে। আমাদের যেহেতু অনলাইন টিকিট কাটা ছিল তাই আমরা সরাসরি ফেরি টার্মিনাল চলে যাই। মোটামুটি এয়ারপোর্ট গ্রেড সিকিউরিটি সম্পন্ন করে জ্যাকেট, জুতা, ব্যাগ, বেল্ট এবং ওয়ালেট সবকিছু স্ক্যান করিয়ে ফেরিতে উঠার অনুমতি মেলে। ফেরিতে উঠিই তড়িঘড়ি করে ছাদে চলে যাই ভালো ভিউ পাবার জন্য। তবে রোদের তীব্রতায় সেখানে বেশ কষ্ট হচ্ছিল, বিশেষ করে বাচ্চাদের। ফেরি ছাড়ার পর খানিকটা আরাম বোধ হলো বাতাস শুরু হয় বলে। ফেরি ছাড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা পৌঁছে যাই লিবার্টি আইল্যান্ডে বা স্ট্যাচু অব লিবার্টির বাড়িতে। এই ভাস্কর্যটি আমেরিকার আইকনিক সিম্বল হলেও এটা কিন্তু আমেরিকানরা তৈরি করেনি। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয়ে আমেরিকানদের বিশেষভাবে সাহায্য করেছিল ফ্রান্স। আমেরিকার স্বাধীনতা অর্জনের ১০০ বছর পূর্তিতে দুই দেশের বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে, ১৮৮৬ সালে ফ্রান্সের জনগণের পক্ষ থেকে ভাস্কর্যটি আমেরিকাকে উপহার দেয়া হয়। ফ্রান্সে পুরোপুরি তৈরি করার পর বিশাল এই ভাস্কর্যটি খুলে ২০০টি বাক্সে ভরে জাহাজে করে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

লিবার্টি আইল্যান্ড জেটি

১৯২৪ সাল পর্যন্ত ভাস্কর্যটির নাম ছিল লিবার্টি এনলাইটেনিং দ্য ওয়াল্ড, পরবর্তীতে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ১৫১ ফুট ১ ইঞ্চি উচ্চতার ভাস্কর্যটির ডান হাতে রয়েছে প্রজ্জলিত মশাল এবং বাম হাতে রয়েছে আইনের বই। স্ট্যাচু অব লিবাটির মাথার মুকুটে রয়েছে সাতটি কাটা, যা সাত মহাদেশ এবং সাত সমুদ্র কে নিদের্শ করে। মাটি থেকে মূল বেদি সহ এর উচ্চতা ৩০৫ ফুট ১ ইঞ্চি। ভাস্কর্যটির নাকের র্দৈঘ্য ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি এবং এর এক কান থেকে আরেক কানের দূরত্ব ১০ ফুট। মূর্তিটির ওজন প্রায় আড়াই লক্ষ কেজি। ভাস্কর্যটির পায়ের কাছে পরে থাকা শেকল আমেরিকার মুক্তির প্রতীক। স্ট্যাচু অব লিবার্টির ভেতরে দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে একেবারে মাথায় ওঠা যায়। ভাস্কর্যটির মুকুটে রয়েছে ২৫ টি জানালা, যা অনেকটাই ওয়াচ টাওয়ার হিসেবে কাজ করে।

মজার ব্যাপার হলো যে স্ট্যাচু অফ লিবার্টির ছবি দেখলেই সবাই আমেরিকা ঠাওর করতে পারে সেটা কিন্তু আসলে আমেরিকার কথা ভেবে তৈরি করা হয়নি।ফরাসি ভাস্কর ফ্রেডেরিক অগাস্ট বার্থোল্ডি এটির রূপকার। রোমান দেবী লিবার্টাসের আদলেবার্থোল্ডি এই বিশ্বখ্যাত ভাস্কর্য টিডিজাইন করেছিলেন তবে মুখমন্ডলটি ডিজাইনে তার মায়ের মুখের প্রভাব আছে বলে জানা যায়। ভাস্কর্যটির ভিতরের কাঠামো ডিজাইন করতে তিনি বিখ্যাত গুস্তাভ আইফেলের সাহায্য নিয়েছিলেন। গুস্তাভ আইফেল কিন্তু ফ্রান্সের আইকন আইফেল টাওয়ারের রূপকার।

স্ট্যাচু অব লিবার্টি

প্রাথমিকভাবে বার্থোল্ডি ঠিক করেছিলেন তার এই স্বপ্নের শিল্পকর্মকে তিনি সুয়েজ খালের তীরে স্থাপন করবেন এবং সেই মোতাবেক সুয়েজ কর্তৃপক্ষ ও মিশর সকারের সাথে আলোচনার পর ঠিক হলো সুয়েজ খালের তীরেই স্থাপন করা হবে এই ভাস্কর্যটিকে, নামও ঠিক করা হলো 'ইজিপ্ট ব্রিঙিং লাইট টু এশিয়া'। পরবর্তীতে নানা জটিলতায় ভাস্কর্যটি মিশরে স্থাপন না করা গেলে বার্থোল্ডি আমেরিকায় আসেন তার শিল্পকর্মটির একটা হিল্লে করতে।

শুরুর দিকে আমেরিকাবাসীরাও খুব একটা আগ্রহ দেখাননি এই ভাস্কর্য নিয়ে। তবে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের পর শেষ পর্যন্ত ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান শহর ও একদার রাজধানী নিউইয়র্কের হাডসন নদীর মুখে লিবার্টি আইল্যান্ডে। আমরা সেই আইল্যান্ডে পৌঁছে ফেরি থেকে নেমেই সারিবদ্ধ ভাবে এগোতে থাকলাম ভাস্কর্য পানে। কাছে গিয়ে ভাল করে দেখতে লাগলাম বিশ্বখ্যাত সেই ভাস্কর্য। ভাস্কর্যটি তামায় তৈরি হলেও বর্তমানে এর গায়ের রঙ বর্তমানে সবুজ আকার ধারণ করেছে। সময়ের আবর্তে  আটলান্টিক মহাসাগরের নোনা জলের ওপর দিয়ে ভেসে আসা বাতাসের সাথে বিক্রিয়ার ফলে তামার বহিরাবরণের এই সবুজ সাজ। ভাস্কর্য চত্বর ভাল করে ঘুরে, মুর্তিটিকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে কিছু ছবি তুলে হাঁটা দিলাম এটির মাথার যাবার জন্য। আবারও সিকিউরিটি চেক করাতে হলো। বয়স্ক এবং অপারগ মানুষের জন্য লিফটের ব্যবস্থা আছে সেখানে তবে আমরা সিঁড়ি বেয়েই উঠতে লাগলাম। প্রায় ১০ তলা সমান উঁচু প্যাডেস্টালে পৌঁছার পর আমাদের থামতে হলো কারণ কোভিডের কারণে একদম মাথা পর্যন্ত উঠা বন্ধ আছে যদিও মাথার মুকুট পর্যন্ত উঠার জন্য টিকিট কাটা ছিল আমাদের।

প্যাডেস্টালের ওপর থেকেই মূল ভাস্কর্যের শুরু। সেখান থেকে ভাস্কর্যটির ভিতর দিয়ে উঠতে যাওয়াটা খানিকটা কঠিনই বলা চলে কারণ এর থেকে উপরের দিকে উঠতে হলে বেশচাপা প্যাঁচানো প্যাঁচানো খাড়াসিঁড়ি বাইতে হবে। উপর যাওয়া বারণ বিধায় নিচ থেকে তাকিয়ে উপরের দিকে দেখলাম। গ্লাস লাগানো থাকাতে মোটামুটি অনেকটা অংশ দেখা যায়। প্যাডেস্টালে কর্মরত সিকিউরিটি অফিসার খানিকাটা ব্রিফিং দিলেন এবং বললেন যে এই ভাস্কর্যের ভিতরের কাঠামোর সঙ্গে আইফেল টাওয়ারের খানিকটা মিল আছে। দেখিয়ে দিলেন কোন কর্নার থেকে দেখলে আইফেল টাওয়ারের মতো মনে হবে। প্যারিসের আইফেল টাওয়ার কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। তাই সিকিউরিটি অফিসারের দেখিয়ে দেয়া অংশ দিয়ে তাকিয়ে ভিতরের কাঠামোর সাথে আইফেল টাওয়ারের বেশ সাদৃশ্য পেলাম।

মূল ভাস্কর্যের ভিতরের কাঠামো

প্যাডেস্টালে বা ভাস্কর্যের পাদদেশে খানিকক্ষণ সময় কাটিয়ে ছবি-টবি তুলে নামার পথ ধরলাম।সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আমার স্ত্রীর তেষ্টা পেয়ে গেল। নিচে নামার পর পানি খাবে না লেমনেড খাবে জিজ্ঞেস করাতে সে বলল লেমনেড খাবে। অগত্যা লেমনেড তথা খাস বাংলায় লেবুর শরবত অর্ডার করলাম। প্লাস্টিক গ্লাসে অর্ধেক বরফের উপর আধখানা ফ্রেস লেবু, দুই চামচ চিনি আর পানি এই হলো লেমনেড। আমাদের মোট ১১ জনের জন্য বিল আসলো ১৮৬ ডলার। এমনিতেই ভীষণ গরম তার উপর লেবু পানির বিল দেখে গায়ের জ্বালা আরও বেড়ে গেল। নিজেকে আর ধরে রাখতে না পেরে স্ত্রীকে বলেই ফেললাম বাংলাদেশ তোমাকে কখনো লেবুর শরবত খেতে দেখিনি আর এখানে এসে তুমি ১৮৬ ডলার নামিয়ে দিলে। বউ মুখে কিছু না বলে আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকলো যেন আমার থেকে বড় কিপ্টে সে জীবনেও দেখেনি। শ্যালিকা আমার পাশে ছিল বলেই সেই যাত্রা রক্ষা পেলাম।

লিবার্টি আইল্যান্ড ঘোরা শেষ, মিউজিয়াম না দেখেই ফেরির পথ ধরলাম কারণ আমাদের পরের গন্তব্য এলিস আইল্যান্ড। ফেরিরে উঠার সময় কাঠের পাটাতনের বাহিরের দিকে স্টিল স্ট্রাকচারের গর্তে প্রচুর কয়েন দেখতে পেলাম। ইউরোপিয়ান-আমেরিকানরা এরকম হাজারো কয়েন প্রতিবছর নানা ধরনের মনোবাসনা নিয়ে পানিতে ছুঁড়ে মারে। এখনেও হয়তো তেমনি কিছু হয়েছে, কিছু অংশ গিয়ে সাগরে পরেছে বাকিটা পল্টুনের স্টিল স্ট্রাকচারের গ্যাপে আটকে গিয়েছে।

ফেরিতে উঠেই আবারো ছাদে চলে গেলাম, সমান্য পরেই চলে আসলাম এলিস আইল্যান্ডে। এলিস আইল্যান্ড একসময় একসময় ছিল অভিবাসীদের  ইমিগ্রেশন সেন্টার। এখানে ইমিগ্রেশন শেষ করে তারা আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়তো। ১৮৯২ সাল থেকে ১৯৫৪ সালে বন্ধ হয়ে যাবার আগ পর্যন্ত ৬০ বছরে প্রায় ১২ মিলিয়ন অভিবাসীর ইমিগ্রেশন হয়েছিল এই আইল্যান্ডে। অনুমান করা যায় যে বর্তমান মার্কিন নাগরিকদের প্রায় ৪০ শতাংশের পূর্বপুরুষদের মধ্যে কেউ না কেউ এই দ্বীপের মাধ্যমে আমেরিকাতে অভিবাসিত হয়েছিল।

এলিস আইল্যান্ড ইমিগ্রেশন রেজিস্ট্রেশন হল

ইমিগ্রেশন সেন্টারটিকে বর্তমানে স্মৃতিশালা হিসেবে বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা হয়েছে। ইমিগ্রেশন হল, লাগেজ রুম সহ পুরো ইমারতটি ভাল করে ঘুরে দেখলাম। প্রচুর পিক্টোরিয়াল ডিসপ্লে আছে যেগুলো পড়তে গেলে অনেক সময়ের দরকার। বিল্ডিঙে দুই ফ্লোরে দুটো থিয়েটারও আছে পুরো ইতিহাসের উপর মুভি দেখানোর জন্য। আমাদের সময় কম থাকাতে মুভি না দেখেই ফিরতে শুরু করলাম কারণ ততক্ষণে দিনের আলো কমতে শুরু করেছে।

;