সাহিত্যে যৌনতা



দেবদুলাল মুন্না
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

অলঙ্করণ কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

‘যৌনতা থেকেই মানবসভ্যতার ইতিহাস। যৌনতা এমন ভয়ঙ্কর জিনিস যে মানুষ যদি যৌনতায় লিপ্ত থেকে প্রজনন না করে তবে একদিন মানবসভ্যতারই বিলুপ্তি হবে। মানবসভ্যতার বিলুপ্তি মানেই ঈশ্বরের মৃত্যু। ফলে যৌনতা এত জরুরি যে একে বাদ দিয়ে কিছুই হয় না। দর্শন, রাজনীতি, শিল্পকলা সবই।’—কথাটি আর্নেস্ট ফিশারের।

‘থট অব সেক্সুয়ালি’ বইতে এর হদিস আমরা পাই। ঔপন্যাসিক শোভা দে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “আমার উপন্যাসে যৌনতার বিষয়টি অবারিতভাবেই উপস্থিত। আমার লেখায় যৌন বিষয়গুলো কেন খোলামেলাভাবে উপস্থাপিত হয়, তার ব্যাখ্যা আমি দেব না। কারণ, একজন পুরুষ লেখক যখন কাহিনীতে যৌনতাকে উপস্থাপন করেন, তখন তাঁকে জবাবদিহি করতে হয় না। গল্প-উপন্যাস লেখার সময় কতটা যৌন বিষয় ব্যবহার করা যাবে বা কতটা যাবে না—এমন কোনো সংবিধি কি আছে? ‘এই পর্যন্ত ঠিক আছে’, ‘এর বেশি হলে বরদাশত করা হবে না’, ‘এটা অশ্লীল’, ‘ওটা কামনা-উদ্দীপক’, ‘এটার প্রয়োজন ছিল না’, ‘ওটা বাণিজ্যিক’—এসব বাজে কথা। পরিষ্কার বলি, যৌনতা নিয়ে আমার কোনো সমস্যা নেই।”

তিনি বলেন, “ঋগ্বেদে দেখা যায় যমী তার যমজ ভাই যমের কাছে সঙ্গম প্রার্থনা করছে। দম্ভ নিজ বোন মায়াকে, লোভ নিজ বোন নিবৃত্তিকে, ক্রোধ নিজ বোন হিংসাকে ও কলি নিজ বোন নিরুক্তিকে বিয়ে করছে। মৎস্যপুরাণ অনুযায়ী, শতরূপা হচ্ছে ব্রহ্মার মেয়ে। কিন্তু ব্রহ্মা মেয়ের রূপে মুগ্ধ হয়ে তার সঙ্গে যৌনমিলনে লিপ্ত হয়। এই মেয়ের গর্ভে জন্ম হয় সায়ম্ভুব মনুর। এই মনু থেকেই মনুষ্য জাতির উদ্ভব।” প্রাচীন সাহিত্যে নগ্ন বর্ণনা এবং যৌনতা ছিল। সংস্কৃত, লাতিন, গ্রিক, ফারসি, জার্মান এমনকি আরবি সাহিত্যেও যৌনতা এবং নগ্নতা ছিল। আরব্যরজনীর গল্পগুলোতে সবাধ এবং অবাধ সব রকমের যৌনতাই আছে। সংস্কৃত সাহিত্যের জনপ্রিয় কবি জয়দেব দাসের ‘গীতগোবিন্দম’ অবলম্বনে লেখা বড়ু চণ্ডীদাসের ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে’ও যৌনতা আছে, নগ্নভাবেই আছে। এতটাই নগ্নভাবে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্যের ছাত্রদের কয়েকটি অধ্যায় পড়ানো হয় না। যেখানে বৃন্দাবনে রাধার সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণ মিলিত হয়, জোর করে তার কাঁচুলি ছিঁড়ে ফেলে। এরচেয়ে গাঢ় বর্ণনা আছে রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যানের মুসলমান লেখক দোনা গাজীর লেখা ‘ছয়ফুল মুলুক বদিউজ্জামাল’ কাহিনীকাব্যে। সেখানে সুড়ঙ্গের ভেতরে গোপন মিলনের ভাষা ও বর্ণনা এ যুগের পর্নোগ্রাফি ও চটি সাহিত্যকেও ছাড়িয়ে যায়।

আরো পড়ুন ➥ চে, বিপ্লব ও বাজার

১৯২৮ সালে নীরদ সি চৌধুরী শনিবারের চিঠি নামের পত্রিকায় একটি লেখা লিখেছিলেন। এন সি চৌধুরী কয়েকটি দিকের ইঙ্গিত দেন ওই রচনায়। সেগুলো এমন: “অশ্লীলতা নতুন কোনো জিনিস না। জীবনে এটি আছে বলেই আর্টেও এটি থাকবে। অশ্লীলতা আর দুর্নীতি এক জিনিস না। দুর্নীতি হলো ইথিক্সের মামলা। অশ্লীলতা হলো এসথেটিকসের জিনিস। আর্ট হচ্ছে একধরনের ট্রান্সফর্মেশন, রস সৃষ্টি, সত্যি কথা বলার কোনো মিডিয়াম না। মানে, সত্যি কথা বলাটা আর্টের উদ্দেশ্য না।

কিন্তু এমন একটা সময় ছিল যখন সাহিত্যে যৌনতা থাকার ফলে নিষিদ্ধ হয়েছে বইয়ের পর বই। ১৫৫৭ খ্রিস্টাব্দে পোপ চতুর্থ পল রোমান ক্যাথলিক চার্চের প্রথম নিষিদ্ধ বইয়ের তালিকা তৈরি করেন। তালিকার ৫৫০টি বইয়ের অধিকাংশই নিষিদ্ধ ছিল ধর্মীয় কারণে অর্থাৎ যেসব বইতে ধর্ম বিষয়ক ক্যাথলিক মতবাদকে অস্বীকার করা হয়েছে। তবে তালিকায় কিছু এমন বইও ছিল, যেগুলো শুধুমাত্র মাত্রাতিরিক্ত যৌনতাকে উপজীব্য করে রচিত হয়েছিল। আবার এমন কিছু কিছু বইও ছিল সেই তালিকায়, বিশেষত জিওভান্নি বোকাচ্চিও রচিত বইগুলো, যেগুলোর বিরুদ্ধে একাধারে ধর্ম অবমাননা ও স্পষ্ট যৌনতা—উভয় অভিযোগই ছিল। ১৯৬৫ সালে পোপ ষষ্ঠ পল কর্তৃক বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত, ভ্যাটিকান নিয়মিতই লিব্রোরাম প্রোহিবিটোরাম বা নিষিদ্ধ বইয়ের তালিকা প্রকাশ করে এসেছে।

১৭৪৮ সালে জন ক্লিল্যান্ড যৌনতানির্ভর একটি বই বিতরণ শুরু করেন, যেটির শিরোনাম ছিল মেমোয়েরস অব উইমেন প্লেজার (Memoirs of a Woman of Pleasure)। পরবর্তীতে বইটি দ্য লাইফ অ্যান্ড অ্যাডভেঞ্চার অব মিস ফ্যানি হিল (The Life and Adventures of Miss Fanny Hill) শিরোনামে প্রকাশিত হয়। পরের বছরই ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ বইটি বাজেয়াপ্ত করে এবং ষাটের দশক পর্যন্ত বইটি যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন দুই দেশেই নিষিদ্ধ ছিল।

১৮৫৭ সালে রবলে ডাংলিসনের Medical Lexicon: A Dictionary of Medical Science বইটির মাধ্যমে সর্বপ্রথম ইংরেজিতে পর্নোগ্রাফি টার্মটি ব্যবহৃত হয়। সেখানে টার্মটিকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছিল এভাবে: “A description of prostitutes or of prostitution as a matter of public hygiene.” অর্থাৎ পর্নোগ্রাফি হলো যৌনকর্মী বা যৌনপল্লীর একটি রূপ যা সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যের সাথে জড়িত। তবে ইতোমধ্যেই যেহেতু গ্রিক ও ফরাসি ভাষায় টার্মটি যৌনতানির্ভর শিল্প ও সাহিত্যকে ইঙ্গিত করতে ব্যবহৃত হতো, তাই ইংরেজিতেও সেই অর্থটিই কয়েক দশকের মধ্যে দারুণ জনপ্রিয়তা পায়।

আরো পড়ুন ➥ সাহিত্যে জ্বলে নেভে ফ্যাসিস্ট ও বিপ্লবীর চরিত্র

১৮৬৫ সালে অলিম্পিয়া নামে একটি ছবি প্রকাশিত হয়। এটি ছিল মূলত প্যারিস স্যালনের একজন পতিতার পোর্ট্রেট। শিল্পী এডোয়ার্ড ম্যানেটস এ ছবিটি এঁকেছিলেন। ছবিটি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বয়ে গিয়েছিল। খ্রিস্টধর্মের মৌল তত্ত্বকথায় আছে ‘আদিপাপবর্জিত জন্ম’, বা ভারতীয় পুরাণ ও উপকথাতে আছে ‘অযোনিসম্ভব আবির্ভাব’ (Virgin Birth)? যেমন—‘সীতার জন্ম লাঙলের ফলায়, উর্বশীর জন্ম জহুমুনির জঙঘা থেকে, দ্ৰৌপদীর জন্ম হোমাগ্নি থেকে, বৌদ্ধশাস্ত্রে মাতা আম্রপালী পূর্ণযৌবনা স্বয়ম্বরূপে আম্রকাননে আবির্ভূত হয়েছিলেন। কিন্তু এগুলো উপকথা মাত্র। হিন্দু বা বৌদ্ধধর্মের মর্মমূলের তত্ত্বকথা নয়। অপর পক্ষে খ্রিস্টান ধর্ম নরনারীর জৈব সম্পর্কের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করে। খ্রিস্টধর্মে যাজকদের বারবার আদম-ঈভের আদিপাপ থেকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। ধর্মযাজক সেন্ট অগাস্টিন তার শিষ্যদের সাবধান করে বলেছেন : “What does it matter whether it be in Person of mother or sister: We have to be beware of Eve in every woman”

এসব যে সেসময় সমাজ পশ্চাতপদ ছিল বলে হয়েছে সেটি যেমন সত্য আবার এও সত্য যে যৌনতাকে আমরা খুব ক্যাজুয়ালি নিতে শিখিনি এখনো। যৌনতাকে ঘিরে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ট্যাবু। বহুগামিতা ভালো নয়, সমকামিতা ভালো নয় এমন চিন্তাই করেন বেশিরভাগ মানুষ। আমাদের সমাজ অদ্ভুত। একটা উদাহরণ দিই। ধরেন, বাবা/মা সন্তানকে প্রেম করতে বাধা দেন, কিন্তু বিয়ে দেন কেন? ভাবুন তো? মানে সেক্সই করা ও বংশ বিস্তারের জন্য। এরচেয়ে প্রেম সুন্দর না? তবে প্রেমে কেন বাধা? ওই বিয়ে দেয় যৌনতার বৈধতা! আসলে কী হচ্ছে। বিয়ে বহির্ভুত যৌনতা কি হয় না, হচ্ছে না? তবে? এখনো যে যৌনতা ট্যাবু এর প্রমাণ দেখি সাম্প্রতিক কালের কয়েকজন লেখককে যখন দেখি যৌনবিষয়ে লেখার কারণে বিতর্কিত। সমালোচিত। কিন্তু তারা আবার বেস্ট সেলার। সম্প্রতি স্পেনে বসবাসরত ফরাসি লেখক মাইকেল হোয়েলসব্যাকের উপন্যাস ‘দ্য ম্যাপ অ্যান্ড দ্য টেরিটরি’ প্রকাশিত হয়। হোয়েলসব্যাককে যারা অপছন্দ করেন, তাদের কাছে কেবল স্থুলরুচির মাথা মোটা একটা লোকের অধিক কিছু নন তিনি। তাদের মতে, এই লোকটি আবর্জনা ছাড়া কিছুই লিখতে পারেন না। তারা অভিযোগ করেন, তার সাহিত্য অশ্লীল, চটি সাহিত্যমাত্র। সত্য যে তার লেখা প্রায় সবসময়েই খুবই কামোদ্দীপনা আর যৌনতার স্রোত উপচে পড়ে। কিন্তু ‘দ্য ম্যাপ অ্যান্ড দ্য টেরিটরি’ উপন্যাসটি যারা পড়েছেন তারা কি যৌনতার ভেতর দিয়ে প্রথা ভাঙা, লোনলিনেসের ভায়োলিন শোনেননি?

আরো পড়ুন ➥ শীতে পাওয়া সাহিত্য

কিংসলে এমিসের বিষয়টা আবার হোয়েলসব্যাকের মতো নয়। এমিসের সাহিত্যিক দক্ষতার কথা উঠলে খুব বেশি লোককে পাওয়া যাবে না তার পাঁড়ভক্ত হিসেবে। তিনি সারাবিশ্বেই আলোচিত। বিংশ শতকের শেষ দিকের সেরা রম্য ঔপন্যাসিক হিসেবে স্বীকৃত এক লেখক। বুকার ছাড়াও অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। পেয়েছেন নাইটহুড উপাধি। তিনি তার একটি স্মৃতিকথায় লিখেছিলেন, “আমাদের কালে সেরা মাতাল না হলেও সেরা মদখোর হিসেবে আমার বদনাম রয়েছে বলে কখনো কখনো শুনতে পাই।” তিনি নারীকাতর লোক ছিলেন। তার আত্মজীবনীতে তিনি যেমন স্বীকার করেছেন বিষয়টি, তেমনি তার জীবনীকাররা তেমন অনেক ঘটনার সন্ধান পেয়েছেন। তিনি জীবনের অনেক সময় নারীদের পেছনে ঘুরঘুর করে কাটিয়েছেন। তার প্রথম বিয়েটাও এসব কারণেই ভেঙে যায়।

যুগোস্লাভ উপকূলে ঘুমিয়ে থাকা একটা বিখ্যাত ফটোগ্রাফের কথা বলি। ওই ছবিতে দেখা যায়, তার পিঠে লেখা ‘ওয়ান ফ্যাট ইংলিশম্যান—আই ফাক এভরিথিং’। কথা ক’টি লিখেছিলেন তার স্ত্রী হিলি। হানিফ কোরেইশিরও পিছু ছাড়েনি বিতর্ক। তিনি তো প্রথম জীবনে ছিলেন একজন চটি লেখক। একজন বিরাট ‘রসময় গুপ্ত’। তবে সেসব করেছেন তিনি কেবল ছদ্মনামেই। এসবই সেই ’৭০ দশকের কথা। কিন্তু ৯০-এ এসে নিজের যত অনন্য উপন্যাস আর একের পর এক ফিল্মের স্ক্রিন প্লে দিয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছেন। কোরাইশি তার আগের সময়টা নিয়ে বলেন, “তা যদি আপনাকে চমকে দিয়ে থাকে, তাহলে তা চমকে দিয়েছে আর কি।” তিনি এলএ টাইম পত্রিকাকে জানালেন, “আমি চোখে যা দেখেছি তাই তো বলার চেষ্টা করেছি। এ বিশ্বে তো লেসবিয়ান, কৃষ্ণাঙ্গ, সমকামী মানুষ এবং স্বাভাবিক যৌনরুচিসম্পন্ন মানুষ রয়েছেন। মানুষ এলে এসব চরিত্র আসবে না কেন?”

সাহিত্যে যৌনতার কথা উঠলে সবাই যে বইটির কথা সবার আগে বলবেন সেটি হলো ‘ট্রপিক অফ ক্যানসার।’ ১৯৩৮ সালে আমেরিকায় নিষিদ্ধ হয় এ বই। বইয়ের লেখক হেনরি মিলার। তার বই নিষিদ্ধ হওয়ার পেছনে বক্তব্য ছিল, বইটিতে রয়েছে খোলামেলা যৌনকর্মকাণ্ডের বর্ণনা, অশ্লীল শব্দাবলি, তাছাড়া যৌনতা বিষয়ে সমাজের যে মানদণ্ড আছে তাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে বইটি। তো হলোটা কী? লেখকের কাজই তো স্থিতাবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করা। হেনরি মিলার সেটি করেছেন। আপনাদের নিশ্চয়ই মনে পড়ছে ১৯৫৮ সালে আমেরিকায় প্রকাশিত হয়েছিল নবোকভের ‘লোলিটা’র কথা। ডি এইচ লরেন্সের ‘লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার’ও ক্লিল্যান্ডের ‘ফ্যানি হিল’, আর তারপর অ্যালেন গিন্সবার্গের ‘হাউল’ কবিতাটি। সবগুলোই বেস্ট সেলার লিস্টের। ডিএইচ লরেন্স মনে করতেন, মানবীয় সম্বন্ধের আসল ভিত্তি দেহ এবং সভ্যতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দেহের অস্তিত্ব ভুলে মানুষ জগতকে দুস্থ ও দুর্নীতিময় করে তুলেছে। তার ‘লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার’ উপন্যাসে দেহধর্মের আদিম কামনার জয় ঘোষিত হয়েছে। পক্ষাঘাতগ্রস্ত পুরুষত্বহীন শিল্পপতি স্যার ক্লিফোর্ডকে ছেড়ে লেডি চ্যাটার্লি মুক্ত অরণ্যে মাটিতে বৃষ্টির ভেতর আদিম নারীর মতো স্বামীর শিকার-রক্ষক নিম্নরুচির অথচ স্বাস্থ্যের আদিম রক্তে তাজা মের্লস-এর কাছে দেহ সমর্পণে ও যৌনসঙ্গমে আত্মার মুক্তি খুঁজে পেয়েছে। জেমস জয়েসের ‘ইউলিসিসি’-এ আমরা একইভাবে স্বামীর নির্লিপ্ততায় দেখি স্ত্রীকে ছুটে যেতে প্রেমিকের কাছে। এমিল জোলার ‘তেরেসা’ উপন্যাসের কথাই ধরুন। জোলা তো তথাকথিত অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত ছিলেন। তার উপন্যাসে যৌনতার মাত্রাটা কেমন? বন্ধুপত্নী তেরেসাকে পাওয়ার জন্য তার স্বামী ক্যামিলাসকে নদীতে ডুবিয়ে মারেন লঁরা। এমন কি ঘটছে না সমাজে? ঘটা তো খুবই স্বাভাবিক। কারণ আয়ান ঘোষের সংখ্যা বাড়লে রাধার সংখ্যাও বাড়বে।

আরো পড়ুন ➥ স্মরণীয় ১০ জন যারা পেয়েছিলেন রাষ্ট্রের অবমাননা ও অবিচার

তো হেনরি মিলার (১৮৯১-১৯৮০) নিয়ে কিছু বলি। চল্লিশ বছর বয়সে নিউ ইয়র্ক থেকে ফ্রান্সে এসেছিলেন লেখক হবার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। ১৯০৭ সালে তিনি প্রথম প্রেমে পড়েন হাইস্কুলের সহপাঠিনী কোরা সেওয়ার্ডের। তার আগে তিনি সহপাঠিনী মিরিয়ামের সৌন্দর্য ও কমনীয়তায় এতই বিপর্যস্ত হয়েছিলেন যে মেয়েটিকে দূর থেকে দেখতেন আর মনে-মনে ভালোবাসতেন; মিরিয়ামের কথা মিলার লিখে গেছেন ‘সেক্সাস’ উপন্যাসে। হেনরি মিলার পাঁচবার বিয়ে করেছেন আর ডিভোর্স দিয়েছেন। প্রথম বিয়ে বিয়ট্রিস সিলভাস উইকেন্সের সঙ্গে। ১৯১৭সালে। ডিভোর্স ১৯২৪। দ্বিতীয় বিয়ে জুন স্মিথ ম্যান্সফিল্ডের সঙ্গে। বিয়ে ১৯২৪ ডিভোর্স ১৯৩৪। তৃতীয়, জ্যামিনা মার্থা লেপ্সকার সঙ্গে। বিয়ে ১৯৪৪, ডিভোর্স ১৯৫২। চতুর্থ বিয়ে ইভ ম্যাকক্লুরের সঙ্গে ১৯৫৩ সালে। ডিভোর্স ১৯৬২। পঞ্চম বিয়ে হোকি টোকুডার সঙ্গে ১৯৬৭। ডিভোর্স ১৯৭৮।

মিলারের শেষ প্রেমিকা ছিলেন ব্রেন্ডা ভেনাস, যাঁকে তিনি বিয়ে করেননি, লিভ টুগেদার করতেন আর অজস্র প্রেমপত্র লিখতেন, যেগুলো একসাথে করে ব্রেন্ডা ভেনাস একটি বই প্রকাশ করেন। তবে যৌনতায় নারীকে খারাপভাবে মানে পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব থেকে উপস্থাপন করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেকেই করেছেন। তসলিমা নাসরিনকে যেহেতেু গুরুত্বপূর্ণ মনে করি না (হেহেহেহেহেহে) তাই কেইট মিলারের কথাই বলি। সেক্সুয়াল পলিটিক্স কেইট মিলেট রচিত ১৯৬৯ সালের একটি বই, বইটি তার পিএইচডি গবেষণার ওপর ভিত্তি করে লিখিত।

মিলেট যুক্তি দেখান, যৌনতাকে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বারংবারই ঋণাত্মকভাবে দেখানো হয়েছে, এবং তিনি আরো আলোচনা করেন পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় যৌনতাটাকে নারীরা ভালোমতন উপভোগ করতে পারে না, তিনি ডি এইচ লরেন্স, হেনরি মিলার এবং নরম্যান মেইলারের লেখা নিয়েও কথা বলেন। মিলেট বলেন এ সকল লেখকরা যৌনতাকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির মতোই দেখেন এবং নারীদেরকে সেভাবেই তাদের যৌনতাকে ভোগ করতে হবে বলেন। অপরদিকে তিনি জঁ জ্যনে-র (সমকামী পুরুষ লেখক) লেখার পক্ষে কথা বলেন। মিলেট এছাড়া সিগমুন্ড ফ্রয়েড, জর্জ মেরেডিথ, জন রাসকিন এবং জন স্টুয়ার্ট মিলের কথাও তুলে আনেন। এমনভাবে যখন ‘পুরুষ লেখক’রা নারীচরিত্রকে আঁকেন তখন যেন পাল্টাভাবে নারীচরিত্র লেখে প্রতিশোধ নিতে চান ভারতীয় লেখক শোভা দে। লেখেন ইংরেজিতে। উপন্যাসে যৌনতাকে নিরাবরণভাবে উপস্থাপন করে নানা সমালোচনার জন্ম দিয়েছেন তিনি। নারীচরিত্রই তার উপন্যাসের ‘প্রটেগনিস্ট’ বা নায়ক। সিস্টার্স থেকে শেঠজিসহ সব উপন্যাসেই আছে নায়িকার ক্রমপরিবর্তন বা ‘মেটামোরফসিস’। পেছনে কোনো নারীবাদী মহৎ চেতনা নেই, বরং রয়েছে নারীর যৌনজীবনকে খোলাখুলি উপস্থাপন করে রসালো আখ্যান তৈরির ইচ্ছা। কারণ কী? শোভা দে বলেন, “পুরুষ লেখকরা যেভাবে নারীচরিত্রকে অসহায়, নেতিয়ে পড়া দেখায় আমি ঠিক বিপরীত চরিত্রটি নারীদের দেখাই। কারণ নারীরাই প্রকৃতভাবে যৌনভাবেও শক্তিশালী।”

আরো পড়ুন ➥ বিখ্যাত সৃষ্টিশীলদের অবসাদ ও স্যাটায়ার

আমেরিকান নারীবাদী লেখক গিল্ডা জেফারস তার ‘ট্রু ম্যান’ বইতে বলছেন, “পুরুষ বা নারীতেই সেক্স হতে হবে কেন? সমকামিতাও সেক্সের সুন্দর দিক।” এ্যালেস গিনসবার্গসহ অনেক লেখকই ছিলেন সমকামী। সমকামিতা ছিল। এখন তো বাড়ছে। আধুনিক সাহিত্যে, মুভিতেও জায়গা করে নিয়েছে সমকামী মানুষের গল্প। প্রাচীন নাগরিক সমাজ, ব্যক্তির স্বাধীনতা, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ধারণা জন্ম নিয়েছিল গ্রিসে। সেই গ্রিস, যে কখনো নাগরিকের যৌন স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেনি। সমলিঙ্গ যৌন সংসর্গের বৈধতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ছিল না সেখানে। হেরোডেটাস, প্লেটোর মতো দার্শনিক চিন্তাবিদদের লেখায় প্রায়ই পাওয়া যায় সমকামী সম্পর্কের কথা। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে গ্রিসের লেসবন দ্বীপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন স্যাফো। এই মহিলা কবির লেখার প্রতিটি পরতে পরতে ছিল নারী শরীরের বন্দনা। স্যাফোর জন্মস্থান লেসবন থেকেই অভিধানে জায়গা পেয়েছে লেসবিয়ান শব্দটি—এটি আমরা যেন মনে রাখি।

প্রাচীন পারস্যে সমকামী সম্পর্কের প্রচলন ছিল। ভারতীয় কামসূত্রও বলেছে সমকামিতা যৌন সম্পর্কের অন্যরূপ। অতীত ও বর্তমান কোনো কালেই সমকামিতাকে অস্বীকার করার উপায় না থাকলেও রক্ষণশীল সমাজের বাধা তো আছেই। তাই সাহিত্যের দিকে তাকালে তার পরিসরের ক্ষেত্রকে বরং খুবই সীমাবদ্ধ বলে মনে হয়েছে। ইংরেজি সাহিত্যে ক্রিস্টোফার মার্লোর ‘এডওয়ার্ড দি সেকেন্ড’ (১৫৯৩-১৫৯৪) এবং মহেশ দত্তানির ‘Bravely fought the queen’ (1991) নাটক বর্তমান সমাজে বহু আলোচিত।
জগদীশ গুপ্তের গল্পে সমকামিতার আভাস পাওয়া যায় মাত্র। রাণুর স্বামীর বদলিজনিত কারণে অন্যত্র যেতে হবে। যাবার আগে রাণু কানুর স্ত্রী ইন্দিরার সঙ্গে একরাত্রি কাটাতে চায়। তার মুখ থেকে নির্গত হয়, “তুই আর আমি এক হয়ে যাই।” অর্থাৎ এক নারী অপর নারীর সাথে এক হয়ে যাওয়ার বাসনা শুধুই সমকামিতার দিককে প্রকাশ করে না, সমকামিতা হয়ে যায়, একটা মাধ্যম।

কমলকুমার মজুমদারের ‘মল্লিকা বাহার’-এ সমকামিতার স্পষ্ট ইঙ্গিত মেলে। মল্লিকার পুরুষ সঙ্গের অভাবে তার যৌনতার অভিমুখ বদলে যায়। গল্পের মোড় ফেরে শোভনাদির সঙ্গে মল্লিকার দেখা হওয়ার ঘটনায়।

একটি বাক্যে লেখক বলেন, “শোভনার চোখে অন্য এক আলো এসে পড়েছে, তার চোখে মুখে দেখা যাবে পুরষালি দীপ্তি, যে কোনো রমণী যে সে ঘাটের পথে, বাটের পথে চিকের আড়াল হতে দেখুক, ভালো এ দৃষ্টি লাগবেই। শোভনার স্পর্শের মধ্যে কেমন এক দিব্য উষ্ণতা, এ উষ্ণতা বহুকাল বয়সী বহুজন প্রিয়। মল্লিকার এ উষ্ণতা ভালো লেগেছিল ভারী ভালো লেগেছিল।”

আরো পড়ুন ➥ মহান শিল্পীদের ক্ষত ও ভালোবাসাসমূহ

জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর ‘বুটিক ছুটকি’ গল্পেও খুব সংক্ষিপ্তভাবে শেষ দিকে এসেছে দুই বোনের স্পর্শজনিত অনুভবের কথা। দারিদ্র্যের এক ভয়াবহ চিত্র এই গল্পের প্রেক্ষাপট হিসেবে বর্তমান। মাতৃহীন দুই সমবয়সী বোনের জীবনে নেই কোনো আনন্দের কলরব। ক্রাচ নিয়ে জীবনোপায় অবলম্বন করা দরিদ্র পিতা প্রতাপের বাড়িতে ইলেকট্রিকের আলো কেটে দিয়েছে। কোনোক্রমে দুবেলা খাওয়া তাদের একমাত্র জীবনে যেন একটা ঘটনা। আর কোনো ঘটনা নেই। কিন্তু প্রাকৃতিক নিয়মে দুই বোন চৌদ্দ পনেরোয় যখন পৌঁছায়, তখন স্বাভাবতই পুরুষের দৃষ্টির আওতার বাইরে থাকে না তারা, “বটুকির কোমরের দিকটা সুন্দর। ছুটকির বুকের দিকটা।” গল্পের মধ্যে সীমাহীন দারিদ্র্যের ছবির মধ্যে থেকে ফুটে ওঠে আরো একটা দিক। উদ্ভিন্ন যৌবনা দুই নারী রাত একটা অবধি নিশ্চিদ্র অন্ধকারের মধ্যে জেগে থাকে বাবার আসার প্রতীক্ষায়, কখন ফিরবে বাবা, ততক্ষণ দুই বোন পরস্পরের সহমর্মী হয়ে বেঁচে থাকে। জামা কাপড়ের অভাবে রাতের অন্ধকারে তারা নগ্ন হয়ে শোয়—একজন দেখে “দিদির ঘাড়ের সুন্দর বাঁক। শাঁখের মতন সরু হয়ে নিচের দিকে গড়িয়ে আসা গলা।” আর দিদি দেখে “সবুজ আলোটা বল্লমের মতো খোঁচা মেরে ছুটকির সুন্দর উঁচু বুকের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ছিল, পাতলা জামার ছিদ্র দিয়ে, উদ্ধত স্তনের চূড়ায়। একটা চূড়া বেরিয়ে এসেছিল।” দুই নারীর পরস্পরকে দেখাই নিয়ে আসে দুজনকে কাছাকাছি। বিশেষত ছুটকি যখন বলে “রক্ষা করো বাবা, দরকার নেই রাজার ছেলের, বিনা পণে যদি বুড়ো মদন এসে তুলে নিয়ে যায় বাঁচি” তখন বোঝাই যায়, কামনা বাসনার প্রতি লোভাতুর হয়ে আছে অসহায় নারী। না হলে রাত্রের অন্ধকারে নগ্ন দুই বোন দুটি শরীরকে আশ্রয় করে উষ্ণতা চাইবে কেন? রাতের অন্ধকার দুজনের কামনা প্রকাশের সহায়ক হয়ে ওঠে; গল্পটির পড়ে মনে হয়, সমকামনা উদ্ভূত হয়ে ওঠার একটা পরিবেশ। আপনার কি অশ্লীলতা দেখতে পেলেন? আমি পাইনি। বরং তাদের অসহায়ত্ব আমার মন খারাপ করে দিয়েছিল ১৩ বছর আগে যখন এ বইটি পড়ি।

ইউরোপের দিকে যদি তাকাই তবে দেখি ডেভিড হকনি, ম্যারিও ডাবস্কি। এরা সমকামী। এরা শিল্পী। ডাবস্কি আসার পর গে লিবারেশন মুভমেন্ট আরো জোরদার হয়। এরপর ভেনিস ও সুলেভিন ১৯৭৮ সালে ‘টয়েলেট পিস’ নামে যে স্থাপত্যকীর্তি সৃষ্টি করেন তার মধ্যে দিয়ে সমকামী জীবনের স্বীকৃতি আন্দোলনকে আরো তীব্রতর করে। আমার এখনও মনে পড়ে সৈয়দ শামসুল হক একটি লেখায় লিখেছিলেন, “ক্লাস এইটে পড়ার সময় মাইকেল মধুসূদনের ‘বীরাঙ্গনা কাব্যে’র বীরাঙ্গনার শারীরিক বর্ণনা শুনে আমার শিশ্ন ফুলে উঠেছিল।” বঙ্কিমচন্দ্রের ‘কৃষ্ণকান্তের উইলে’র হীরা মালিনীর সঙ্গে গোবিন্দলালের সম্পর্কও পাঠকের শরীর গরম করে তোলে। কিশোর রবীন্দ্রনাথের কাঁচাহাতে লেখা কবিতায় ‘তব কুচযুগ নিঙারি নিঙারি’ পড়লেও সমস্ত ইন্দ্রিয় একযোগে হইহই রইরই করে ওঠে। ‘বৌঠাকুরানীর হাটে’র নারী অঙ্গের প্রকাশের বর্ণনা, ‘চোখের বালি’র মহেন্দ্র ও বিনোদিনীর সম্পর্ক উত্তেজনা জাগায়। ‘ঘরে-বাইরে’র সন্দীপের সাথে বিমলার সম্পর্ক কিংবা ‘চার অধ্যায়ে’র এলার মধ্যে দিয়ে রবীন্দ্রনাথ যৌনতা প্রকাশ করেছেন। ‘ল্যাবরেটরি’ গল্পে সোহিনীর মেয়ের মধ্যে উদগ্র কামনাও প্রকাশ। অদ্ভুত দৃশ্যকল্প জেগে উঠেছিল মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দিবারাত্রির কাব্য’ যখন পড়ি। সেই উপন্যাসে মালতির মেয়ে আনন্দ যে কিনা বলেছিল, “কি যে বৃষ্টি মনে হচ্ছে সমুদ্র ভাসিয়ে দিবে।” আহা এমন বৃষ্টির ঝাপটা আর উত্তাল সমুদ্রকে কে না ভালোবাসে!

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'



তাহমিদ হাসান
ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প'

  • Font increase
  • Font Decrease

বইয়ের নাম: মানচিত্রের গল্প

লেখক: ড. মাহফুজ পারভেজ

প্রকাশক: শিশু কানন

প্রকাশকাল: ২০১৮

গল্প পড়তে সবারই ভালো লাগে। যারা ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলের কঠিন বিষয় ও বড় বড় বই পড়তে ভয় পান, তারাও গল্প আকারে সেসব সোৎসাহে পাঠ করেন। ড. মাহফুজ পারভেজের 'মানচিত্রের গল্প' তেমনই এক গ্রন্থ, যা ভূগোল, মানচিত্র, অভিযান সংক্রান্ত সহস্র বর্ষের ইতিহাস, আবিষ্কার ও অর্জনকে গল্পের আবহে, স্বাদু ভাষায় উপস্থাপন করেছে। এ গ্রন্থ ছাড়াও তিনি মুঘল ইতিহাস, দারাশিকোহ, আনারকলি প্রভৃতি ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব ও বিষয়কে প্রাঞ্জল ভাষায় তুলে ধরেছেন একাধিক গ্রন্থের মাধ্যমে।

ড. মাহফুজ পারভেজ মূলত একজন কবি, কথাশিল্পী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তিনি ১৯৬৬ সালের ৮ মার্চ কিশোরগঞ্জ শহরের কেন্দ্রস্থল গৌরাঙ্গ বাজারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগে পড়াশুনা করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউজিসি ফেলোশিপে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগে প্রফেসর পদে নিয়োজিত আছেন।

তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ গুলো মধ্যে আমার সামনে নেই মহুয়ার বন, নীল উড়াল, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে, বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিদ্রোহী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তিচুক্তি, রক্তাক্ত নৈসর্গিক নেপালে ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রয়েছে।

https://www.rokomari.com/book/author/2253/mahfuz-parvez

লেখকের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ গুলোর মধ্যে ২০১৮ সালে প্রকাশিত 'মানচিত্রের গল্প' বইটি রয়েছে। লেখক বইটিকে ১৯ টি অধ্যায়ে ভাগ করছে। বইটির মধ্যে মানচিত্র আবিষ্কার কিভাবে শুরু হয়েছে এবং আবিষ্কারে পিছনে যাদের অবদান ছিল সেই সব বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।

মানচিত্র বা ম্যাপ শব্দটি আদিতে ল্যাটিন 'মাপ্পামুন্ডি' শব্দটি থেকে এসেছে। 'মাপ্পা' অর্থ টেবিল-ক্লথ আর 'মুনডাস' মানে পৃথিবী। অতি প্রাচীন সভ্যতায় চীনারা প্রথম মানচিত্র অঙ্কনে যাত্রা শুরু করে, কিন্তু সেই সব মানচিত্রের আজ অস্তিত্ব নেই। বইটির মধ্যে এইসব ক্ষুদ্র তথ্য থেকে শুরু টলেমির মানচিত্র, চাঁদের মানচিত্র সহ আরো অজানা তথ্য গুলো লেখক বইটির মধ্যে তুলে ধরেছে।

লেখক বইয়ের ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে টলেমির মানচিত্র, ভাস্কো ডা গামা আর কলম্বাসের লড়াই, রেনেলের ' বেঙ্গল অ্যাটলাস', 'আই হ্যাভ ডিসকভার দ্য হাইয়েস্ট মাউন্টেন অব দ্য ওয়ার্ল্ড ', মানচিত্র থেকে গ্লোব ইত্যাদি সব উল্লেখযোগ্য শিরোনামে বইটি সজ্জিত করছেন।

পরিশেষে ১৯ টি অধ্যায়ের মধ্যে শেষ দুই অধ্যায়ে 'পরিশিষ্ট-১, পরিশিষ্ট-২' শিরোনামে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মানচিত্র এবং মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের কথা বইটিতে তুলে ধরেন।

কয়েকটি ঐতিহাসিক মানচিত্রের মধ্যে---

ব্যাবিলনে প্রাপ্ত ভূ মানচিত্র- যেটিতে ইউফ্রেটিস নদীর তীরে ব্যাবিলনকে আর্বতন করে দেখানো হয়েছে।

অ্যানাক্সিমান্ডারের মানচিত্র- পৃথিবীর প্রথম দিকের আদি মানচিত্রগুলোর মধ্যে এইটি অন্যতম, যা অঙ্কন করেছিল অ্যানাক্সিমান্ডার। এই মানচিত্রে ইজিয়ান সাগর এবং সেই সাগরকে ঘিরে মহাসাগরের এইসব দেখানো হয়েছে।

আল ইদ্রিসি'র মাপ্পা মুনদি- বিপুল মুসলিম মনীষীর মধ্যে বিখ্যাত ছিলেন আল ইদ্রিসি। আফ্রিকা, ভারত মহাসাগর ও দূরপ্রাচ্য বা ফারইস্ট অঞ্চলকে তিনি তাঁর মানচিত্রে ফুটিয়ে তুলে।

ফ্রা মায়োরো'র মানচিত্র- ভেনিসীয় সন্ন্যাসী ফ্রা মায়েরোর প্রণীত মানচিত্রটি একটি কাঠের ফ্রেমের ভেতরে পার্চমেন্টে আঁকা বৃত্তাকার প্লানিস্ফিয়ার।

হুয়ান দে লা কোসা'র মানচিত্র- তিনি ছিলেন স্পেনের বিজেতা৷ তিনি বহু ম্যাপ ও মানচিত্র তৈরি করেছিলেন তার মধ্যে প্রায় অধিকাংশ হারিয়ে গেছে বা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। ১৫০০ সালে প্রণীত তাঁর ম্যাপ বা মাপ্পা মুনদি এখনও রয়েছে, এই মানচিত্রে আমেরিকা মহাদেশকে চিহ্নিত করা সর্বপ্রথম ইউরোপীয় মানচিত্র।

মানচিত্র প্রণয়নে কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব--

হাজি মহিউদ্দিন পিরি-- তাঁর পুরো নাম হাজি মহিউদ্দিন পিরি ইবনে হাজি মুহাম্মদ। তিনি ছিলেন উসমানী-তুর্কি সাম্রাজ্যের নামকরা অ্যাডমিরাল বা নৌ-সেনাপতি এবং বিশিষ্ট মানচিত্রকর।

আল ফারগনি- তাঁর পুরো নাম আবু আল আব্বাস আহমেদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে কাসির আল ফারগনি। অবশ্য ইউরোপের মানুষের কাছে তিনি বিজ্ঞানী আলফ্রাগানুস নামে পরিচিত ছিলেন। টলেমির একটি গ্রন্থ 'আলমাগেস্ট'- এর ভিত্তি করে সহজ সরল ভাষায় লেখা তাঁর বিখ্যাত বই 'এলিমেন্ট অব অ্যাস্ট্রোনমি অন দ্য সেলেস্টয়াল মোশান'।

বার্তোলোমে দে লাস কাসাস-- তিনি সরাসরি মানচিত্র চর্চায় অংশগ্রহণ করেন নি বটে, তবে তাঁর দ্বারা মানচিত্র চর্চা উপকৃত হয়েছে। তিনি ক্যারিবীয় অঞ্চলে ব্যাপক ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সবিস্তারে লিখে গিয়েছিলেন।

লেখক এই বইটিতে খুব সুন্দর উপস্থাপনার মাধ্যমে জটিল তথ্য গুলোকে সহজে তুলে ধরেছে৷ ২৭ শে মার্চ আমার জন্মদিনে আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ড. মাহফুজ পারভেজ স্যার এই বইটি উপহার দেন৷ এই বইটি পড়ে ইতিহাস, রাজনীতি, ভূগোলে আগ্রহী পাঠক নিজের জ্ঞানকে প্রসারিত করতে পারবেন এবং নতুন কিছু জানতে পারবেন, একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

তাহমিদ হাসান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস স্নাতক সম্মান শ্রেণির শিক্ষার্থী

;

চা-নগরীতে এক কাপ চা



কবির য়াহমদ
চা-নগরীতে এক কাপ চা

চা-নগরীতে এক কাপ চা

  • Font increase
  • Font Decrease

[চা-শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির ন্যায্য দাবির প্রতি সংহতি]

এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে ডাইনোসর-টিকটিকি
এখানে-ওখানে জন্ম নিয়েছে বেনামী বৃক্ষরাজি
সবকিছু থমকে যায়, সবকিছু থমকে থাকে জ্যোতির্ময় ছায়ায়।

ঈশ্বর; জন্মে শাপ আছে, কত খেলা-ছেলেখেলা
এ পাড়া, ও পাড়া বাঙময় সুঘ্রাণ, সঞ্জীবনী মায়া
দুই হাতে স্বর্গ-নরক, সুমিষ্ট কল্লোল; বিভাজন।

ভূগোলের পাঠে সমূহ ভুল, আকাশে নরক স্রোতহীন
উড়ুক্কু ভূ-স্বর্গ বাতাসে ভাসে এখানে-ওখানে
তবু স্বর্গ তার কালে নেমেছে ধরায়, ত্রিকোণ পাতায়
সবুজাভ মিহি মিহি ষোল আনা যৌনকলা!

ঈশ্বর তুমি পান করে যাও এক কাপ সুপেয় চা
মানবগোষ্ঠী বারে বারে জন্মাবে এই বৃহত্তর চা-নগরীতে।


তোমার চায়ের কাপে একটা মাছি পড়ুক
তার নিত্যকার অর্জনে হয়ে উঠুক বিষগন্ধি-মৌ
প্রসন্ন বিকেলে একপশলা বৃষ্টি আসুক
ভিজিয়ে দিয়ে যাক সত্যাসত্য ওড়না।

একদিন মেঘকে বলেছিলাম একান্তে
চুপসে দিতে আপাতদৃশ্য সমূহ প্রসাধন
অন্তর্বাসের অন্তর্হিত চেহারা ভাসুক
কোন এক মাছরাঙার ঠোঁটে।

আমাদের ধূম্রশালায় ইদানীং টান পড়েছে
তাই আশ্রয় নিয়েছে সব গার্লস কলেজে
ওখানে নিত্য বালিকার সহবাস-
দৃষ্টিবিভ্রমে কেউ কেউ যায় চোখের আড়ালে।

একটা মাছি ঘুরঘুর করতে থাকুক এক পেয়ালা চায়ে
একটা প্রসাধন দোকানী হন্যে হয়ে ছুটে আসুক মাছির পেছনে
আজ একটা মেঘখণ্ড আকাশে ব্যতিব্যস্ত হোক একপশলা বৃষ্টি হতে

আমাদের চা মহকুমায় আজ বৃষ্টি হোক ওড়নার ওজন বাড়িয়ে দিতে।


মুখোমুখি বসে গেলে এক কাপ চা হোক
অন্তত এক জোড়া ঠোঁটে চুমু খাক নিদেনপক্ষে একটা সিগারেট
আরেক জোড়া ঠোঁটে হাহাকার জাগুক অনন্ত শীতরাত্রির মত।

তোমার ঠোঁটগুলো ক্ষুদ্র অভিলাষী প্রগাঢ় আকাঙ্ক্ষার তরঙ্গ-বঞ্চিত নদী
মোহনা খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়, এক ফোঁটা জল, হায়
শেষ কবে ঢেলেছিল জল কেউ- অসহ্য ব্যথার কাল গৃহহীন জনে।

অবনত ইথার মিশে গেছে কাল সন্ন্যাস জীবনে
তবু মুখোমুখি কাল, তবু এক কাপ চা
একটা চুমু হোক চায়ের কাপে, একটা মাত্র হোক আজ অন্যখানে
যারা নেমেছিল পথে তাদের পথ থেমে আসুক পথে
সব পথ আজ মিশে যাবে চাপের কাপে, ঠোঁটের সাগরে।

ওহে ঈশ্বর, তোমার গোপন দরোজা খুলে দাও
প্রার্থনার ভাষা নমিত হোক আজ চায়ের কাপে, ক্রিয়াশীল রাতে।

;

কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু

কলকাতায় অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশে বই বিক্রির জগতে বাতিঘর একটি বিপ্লব আনতে সক্ষম হয়েছে। বই বিক্রির পাশাপাশি বইপড়া, চা-কফির আড্ডাসহ নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা এনেছে প্রতিষ্ঠানটি। তারই আদলে এবার কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে অভিযান বুক ক্যাফের যাত্রা শুরু হয়েছে।

গত ১১ আগস্ট প্রদীপ জ্বালিয়ে বুক ক্যাফেটি উদ্বোধন করেন প্রকাশক সুধাংশু শেখর দে, লেখক কমল চক্রবর্তী, অমর মিত্র, কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা সন্দীপ দত্ত, বাংলাদেশের প্রকাশক দীপঙ্কর দাস, মনিরুজ্জামান মিন্টু।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন কবি রুদ্র গোস্বামী, প্রকাশক রূপা মজুমদার, বাঁধাইকর্মী অসীম দাস, প্রেসকর্মী দীপঙ্কর, পাঠক তন্ময় মুখার্জি ও সৌম্যজিৎ, নূর ইসলাম, বাসব দাশগুপ্ত, লেখক সমীরণ দাস, সুকান্তি দাস, শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষসহ প্রায় ২শ পাঠক।

আয়োজকরা জানান, বুক স্টোর ও ক্যাফে এখন একটি জনপ্রিয় ধারা। সেই ধারায় শুধু নতুন একটি সংযোজন নয়, অভিযান বুক ক্যাফে অনন্য হয়ে উঠল বাংলা প্রকাশনা ও মুদ্রণের ২৪৪ বছরের ইতিহাসকে ফুটিয়ে তোলার মধ্য দিয়ে। প্রায় একশ বছরের পুরোনো ছাপার মেশিন রাখা হয়েছে এখানে। দেওয়ালে দেওয়ালে মুদ্রণ ও প্রকাশনায় অবদান রাখা ব্যক্তি ও সংস্থার ছবি স্থান পেয়েছে। চায়ের কাপে রয়েছে বাংলার প্রথম মুদ্রণের বর্ণমালা।


বাংলাদেশের অভিযান প্রকাশনীর কর্ণধার কবি মনিরুজ্জামান মিন্টু বলেন, ‘বাংলাদেশের বইয়ের বিশাল সমারোহ ও অভিযান বুক ক্যাফের এই পথচলা বাংলা বইয়ের বাজারকে সমৃদ্ধ করবে। শুধু বইয়ের দোকান নয়, বুক ক্যাফে! ফলে শিল্পের অপরাপর মাধ্যমগুলোও কোনো না কোনোভাবে এটাকে যুক্ত করবে।’

দেড় দশক ধরে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন কবি ও কথাসাহিত্যিক ড. রাহেল রাজিব। তিনি বলেন, ‘বই বিষয়ক যে কোনো আয়োজন একটি সমাজকে সামনে এগিয়ে নেয়। অভিযান বুক ক্যাফের অবস্থান কলকাতা কলেজ স্ট্রিট হলেও সেখানে বাংলাদেশের বইয়ের সমাহার এবং শিল্পবিষয়ক অপরাপর বিষয়গুলোর সম্পৃক্তি প্রতিষ্ঠানটিকে এগিয়ে নেবে।’

 

;

স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক



তৌফিক হাসান, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম
স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক

স্ট্যাচু অব লিবার্টি: আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক

  • Font increase
  • Font Decrease

আমেরিকা ভ্রমণে বাঙালির অন্যতম গন্তব্যের একটি হচ্ছে স্ট্যাচু অব লিবার্টি। স্ট্যাচু অব লিবার্টির সামনে দাঁড়িয়ে একটা ছবি না উঠলে যেন আমেরিকাপূর্ণই হবে না! আমেরিকার সিম্বলিক আইকন হচ্ছে এই স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ভাস্কর্যটি আমেরিকার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক। তাই বাংলাদেশ থেকে রওনা হবার আগেই গন্তব্য হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছিল নিউইয়র্কের স্ট্যাচু অব লিবার্টি।

পরিকল্পনা ছিল আমার স্ত্রীর এবং তার ছোট বোনের পরিবারের সকলে মিলে একসাথে স্ট্যাচু অফ লিবার্টি দেখতে যাব। কিন্তু ভায়রা ভাইয়ের বিশেষ কাজ পরে যাওয়ায় সিদ্ধান্ত হলো তার এক বন্ধু নীলফামারীর জিএম ভাই আমাদের ড্রাইভ করে নিয়ে যাবে নিউইয়র্কে। যাত্রার দিন ঘড়ির কাটা মেপে জিএম ভাই হাজির, রেডি হয়েই ছিলাম তাই ঝটপট বেরিয়ে পরলাম। পেনসিলভেনিয়ার লেভিট্টাউনে তখন সকাল ৮টা বাজে, বাসা থেকে বের হবার সাথে সাথেই সূর্য মামার ঝাঁজ বুঝতে পারলাম। সূর্য এমন তেতেছে দিনটা যে খুব একটা সুখকর হচ্ছে না তা বেশ বুঝতে পারলাম। বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এবারের গ্রীষ্মে বেশি গরম অনুভূত হচ্ছে আমেরিকাতে। স্থানীয়দের মতে এরকম গরম বিগত কয়েক বছরে তারা দেখতে পায়নি। শুধু আমেরিকাতে নয়, এই বছর ইউরোপেও বেশ গরম অনুভূত হচ্ছে আর আমাদের দেশের কথা না হয় নাই বললাম।

লিবার্টি আইল্যান্ড

গাড়ির চাকা সচল আবার কিছুক্ষণ পরেই আমরা আই-৯৫ হাইওয়েতে গিয়ে পড়লাম, এই এক রাস্তা ধরেই প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টায় আমরা পৌঁছে যাবো নিউইয়র্কের ম্যানহাটানে। ৫৫ মাইল বেগে ছুটে চলছে আমাদের গাড়ি আর ঠান্ডা হাওয়ায় বসে আমরা গান শুনছি। হঠাৎ ড্যাশবোর্ডে চোখ পড়তেই খানিকটা আঁতকে ওঠার মতো অবস্থা হলো। কারণ সেখানে উইন্ড স্ক্রিনের তাপমাত্রা দেখাচ্ছে ১০০ ডিগ্রী ফারেনহাইট। কপালে ভোগ আছে তা পরিষ্কার হয়ে গেল। চলতে চলতে প্রায় ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই আমরা নিউইয়র্কের ম্যানহাটান এলাকার ব্যাটারি পার্কে পৌঁছে গেলাম, এখান থেকেই যেতে হবে লিবার্টি আইল্যান্ডে। এবার পার্কিং এর জায়গা খোঁজার পালা। নিউইয়র্কে গাড়ি পার্কিং করা বেশ ঝামেলার তার মধ্যে আমরা গিয়েছে ফোর্ডের ট্রানজিট নামের বেশ বড়সড় একটি ভ্যান। যত প্রাইভেট পার্কিংয়েই যাচ্ছি সবাই না করে দিচ্ছে যে এত বড় ভ্যানের জন্য কোন জায়গা খালি নেই। কোথায় গেলে পেতে পারি সেই হদিসও কেউ দিতে পারছে না দেখে মেজাজ কিঞ্চিৎ খারাপ হতে শুরু করলো। অবশেষে প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে আমরা এক পার্কিং খুঁজে পেলাম। গাড়ি পার্ক করেই ছুটলাম ফেরি টার্মিনালের দিকে। জনপ্রতি ২৩ ডলার করে অনলাইনে টিকিট করাই ছিল।  ওই টিকিটে ভাস্কর্যটির উপরে উঠা এবং এলিস আইল্যান্ড ভ্রমণ অন্তর্ভুক্ত।

 

লিবার্টি আইল্যান্ডে যাবার ফেরি

গ্রীষ্মকালে স্ট্যাচু অব লিবার্টিতে প্রচুর পর্যটক যায়। আপনি যদি অনলাইনে টিকিট না করে যান তাহলে ব্যাটারি পার্ক ফেরি টার্মিনালে যে টিকিট কাউন্টার আছে সেখানেও করতে পারবেন কিন্তু ঘণ্টাখানেক লাইনে দাঁড়াতে হতে পারে। আমাদের যেহেতু অনলাইন টিকিট কাটা ছিল তাই আমরা সরাসরি ফেরি টার্মিনাল চলে যাই। মোটামুটি এয়ারপোর্ট গ্রেড সিকিউরিটি সম্পন্ন করে জ্যাকেট, জুতা, ব্যাগ, বেল্ট এবং ওয়ালেট সবকিছু স্ক্যান করিয়ে ফেরিতে উঠার অনুমতি মেলে। ফেরিতে উঠিই তড়িঘড়ি করে ছাদে চলে যাই ভালো ভিউ পাবার জন্য। তবে রোদের তীব্রতায় সেখানে বেশ কষ্ট হচ্ছিল, বিশেষ করে বাচ্চাদের। ফেরি ছাড়ার পর খানিকটা আরাম বোধ হলো বাতাস শুরু হয় বলে। ফেরি ছাড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা পৌঁছে যাই লিবার্টি আইল্যান্ডে বা স্ট্যাচু অব লিবার্টির বাড়িতে। এই ভাস্কর্যটি আমেরিকার আইকনিক সিম্বল হলেও এটা কিন্তু আমেরিকানরা তৈরি করেনি। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয়ে আমেরিকানদের বিশেষভাবে সাহায্য করেছিল ফ্রান্স। আমেরিকার স্বাধীনতা অর্জনের ১০০ বছর পূর্তিতে দুই দেশের বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে, ১৮৮৬ সালে ফ্রান্সের জনগণের পক্ষ থেকে ভাস্কর্যটি আমেরিকাকে উপহার দেয়া হয়। ফ্রান্সে পুরোপুরি তৈরি করার পর বিশাল এই ভাস্কর্যটি খুলে ২০০টি বাক্সে ভরে জাহাজে করে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

লিবার্টি আইল্যান্ড জেটি

১৯২৪ সাল পর্যন্ত ভাস্কর্যটির নাম ছিল লিবার্টি এনলাইটেনিং দ্য ওয়াল্ড, পরবর্তীতে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ১৫১ ফুট ১ ইঞ্চি উচ্চতার ভাস্কর্যটির ডান হাতে রয়েছে প্রজ্জলিত মশাল এবং বাম হাতে রয়েছে আইনের বই। স্ট্যাচু অব লিবাটির মাথার মুকুটে রয়েছে সাতটি কাটা, যা সাত মহাদেশ এবং সাত সমুদ্র কে নিদের্শ করে। মাটি থেকে মূল বেদি সহ এর উচ্চতা ৩০৫ ফুট ১ ইঞ্চি। ভাস্কর্যটির নাকের র্দৈঘ্য ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি এবং এর এক কান থেকে আরেক কানের দূরত্ব ১০ ফুট। মূর্তিটির ওজন প্রায় আড়াই লক্ষ কেজি। ভাস্কর্যটির পায়ের কাছে পরে থাকা শেকল আমেরিকার মুক্তির প্রতীক। স্ট্যাচু অব লিবার্টির ভেতরে দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে একেবারে মাথায় ওঠা যায়। ভাস্কর্যটির মুকুটে রয়েছে ২৫ টি জানালা, যা অনেকটাই ওয়াচ টাওয়ার হিসেবে কাজ করে।

মজার ব্যাপার হলো যে স্ট্যাচু অফ লিবার্টির ছবি দেখলেই সবাই আমেরিকা ঠাওর করতে পারে সেটা কিন্তু আসলে আমেরিকার কথা ভেবে তৈরি করা হয়নি।ফরাসি ভাস্কর ফ্রেডেরিক অগাস্ট বার্থোল্ডি এটির রূপকার। রোমান দেবী লিবার্টাসের আদলেবার্থোল্ডি এই বিশ্বখ্যাত ভাস্কর্য টিডিজাইন করেছিলেন তবে মুখমন্ডলটি ডিজাইনে তার মায়ের মুখের প্রভাব আছে বলে জানা যায়। ভাস্কর্যটির ভিতরের কাঠামো ডিজাইন করতে তিনি বিখ্যাত গুস্তাভ আইফেলের সাহায্য নিয়েছিলেন। গুস্তাভ আইফেল কিন্তু ফ্রান্সের আইকন আইফেল টাওয়ারের রূপকার।

স্ট্যাচু অব লিবার্টি

প্রাথমিকভাবে বার্থোল্ডি ঠিক করেছিলেন তার এই স্বপ্নের শিল্পকর্মকে তিনি সুয়েজ খালের তীরে স্থাপন করবেন এবং সেই মোতাবেক সুয়েজ কর্তৃপক্ষ ও মিশর সকারের সাথে আলোচনার পর ঠিক হলো সুয়েজ খালের তীরেই স্থাপন করা হবে এই ভাস্কর্যটিকে, নামও ঠিক করা হলো 'ইজিপ্ট ব্রিঙিং লাইট টু এশিয়া'। পরবর্তীতে নানা জটিলতায় ভাস্কর্যটি মিশরে স্থাপন না করা গেলে বার্থোল্ডি আমেরিকায় আসেন তার শিল্পকর্মটির একটা হিল্লে করতে।

শুরুর দিকে আমেরিকাবাসীরাও খুব একটা আগ্রহ দেখাননি এই ভাস্কর্য নিয়ে। তবে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের পর শেষ পর্যন্ত ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান শহর ও একদার রাজধানী নিউইয়র্কের হাডসন নদীর মুখে লিবার্টি আইল্যান্ডে। আমরা সেই আইল্যান্ডে পৌঁছে ফেরি থেকে নেমেই সারিবদ্ধ ভাবে এগোতে থাকলাম ভাস্কর্য পানে। কাছে গিয়ে ভাল করে দেখতে লাগলাম বিশ্বখ্যাত সেই ভাস্কর্য। ভাস্কর্যটি তামায় তৈরি হলেও বর্তমানে এর গায়ের রঙ বর্তমানে সবুজ আকার ধারণ করেছে। সময়ের আবর্তে  আটলান্টিক মহাসাগরের নোনা জলের ওপর দিয়ে ভেসে আসা বাতাসের সাথে বিক্রিয়ার ফলে তামার বহিরাবরণের এই সবুজ সাজ। ভাস্কর্য চত্বর ভাল করে ঘুরে, মুর্তিটিকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে কিছু ছবি তুলে হাঁটা দিলাম এটির মাথার যাবার জন্য। আবারও সিকিউরিটি চেক করাতে হলো। বয়স্ক এবং অপারগ মানুষের জন্য লিফটের ব্যবস্থা আছে সেখানে তবে আমরা সিঁড়ি বেয়েই উঠতে লাগলাম। প্রায় ১০ তলা সমান উঁচু প্যাডেস্টালে পৌঁছার পর আমাদের থামতে হলো কারণ কোভিডের কারণে একদম মাথা পর্যন্ত উঠা বন্ধ আছে যদিও মাথার মুকুট পর্যন্ত উঠার জন্য টিকিট কাটা ছিল আমাদের।

প্যাডেস্টালের ওপর থেকেই মূল ভাস্কর্যের শুরু। সেখান থেকে ভাস্কর্যটির ভিতর দিয়ে উঠতে যাওয়াটা খানিকটা কঠিনই বলা চলে কারণ এর থেকে উপরের দিকে উঠতে হলে বেশচাপা প্যাঁচানো প্যাঁচানো খাড়াসিঁড়ি বাইতে হবে। উপর যাওয়া বারণ বিধায় নিচ থেকে তাকিয়ে উপরের দিকে দেখলাম। গ্লাস লাগানো থাকাতে মোটামুটি অনেকটা অংশ দেখা যায়। প্যাডেস্টালে কর্মরত সিকিউরিটি অফিসার খানিকাটা ব্রিফিং দিলেন এবং বললেন যে এই ভাস্কর্যের ভিতরের কাঠামোর সঙ্গে আইফেল টাওয়ারের খানিকটা মিল আছে। দেখিয়ে দিলেন কোন কর্নার থেকে দেখলে আইফেল টাওয়ারের মতো মনে হবে। প্যারিসের আইফেল টাওয়ার কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। তাই সিকিউরিটি অফিসারের দেখিয়ে দেয়া অংশ দিয়ে তাকিয়ে ভিতরের কাঠামোর সাথে আইফেল টাওয়ারের বেশ সাদৃশ্য পেলাম।

মূল ভাস্কর্যের ভিতরের কাঠামো

প্যাডেস্টালে বা ভাস্কর্যের পাদদেশে খানিকক্ষণ সময় কাটিয়ে ছবি-টবি তুলে নামার পথ ধরলাম।সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আমার স্ত্রীর তেষ্টা পেয়ে গেল। নিচে নামার পর পানি খাবে না লেমনেড খাবে জিজ্ঞেস করাতে সে বলল লেমনেড খাবে। অগত্যা লেমনেড তথা খাস বাংলায় লেবুর শরবত অর্ডার করলাম। প্লাস্টিক গ্লাসে অর্ধেক বরফের উপর আধখানা ফ্রেস লেবু, দুই চামচ চিনি আর পানি এই হলো লেমনেড। আমাদের মোট ১১ জনের জন্য বিল আসলো ১৮৬ ডলার। এমনিতেই ভীষণ গরম তার উপর লেবু পানির বিল দেখে গায়ের জ্বালা আরও বেড়ে গেল। নিজেকে আর ধরে রাখতে না পেরে স্ত্রীকে বলেই ফেললাম বাংলাদেশ তোমাকে কখনো লেবুর শরবত খেতে দেখিনি আর এখানে এসে তুমি ১৮৬ ডলার নামিয়ে দিলে। বউ মুখে কিছু না বলে আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকলো যেন আমার থেকে বড় কিপ্টে সে জীবনেও দেখেনি। শ্যালিকা আমার পাশে ছিল বলেই সেই যাত্রা রক্ষা পেলাম।

লিবার্টি আইল্যান্ড ঘোরা শেষ, মিউজিয়াম না দেখেই ফেরির পথ ধরলাম কারণ আমাদের পরের গন্তব্য এলিস আইল্যান্ড। ফেরিরে উঠার সময় কাঠের পাটাতনের বাহিরের দিকে স্টিল স্ট্রাকচারের গর্তে প্রচুর কয়েন দেখতে পেলাম। ইউরোপিয়ান-আমেরিকানরা এরকম হাজারো কয়েন প্রতিবছর নানা ধরনের মনোবাসনা নিয়ে পানিতে ছুঁড়ে মারে। এখনেও হয়তো তেমনি কিছু হয়েছে, কিছু অংশ গিয়ে সাগরে পরেছে বাকিটা পল্টুনের স্টিল স্ট্রাকচারের গ্যাপে আটকে গিয়েছে।

ফেরিতে উঠেই আবারো ছাদে চলে গেলাম, সমান্য পরেই চলে আসলাম এলিস আইল্যান্ডে। এলিস আইল্যান্ড একসময় একসময় ছিল অভিবাসীদের  ইমিগ্রেশন সেন্টার। এখানে ইমিগ্রেশন শেষ করে তারা আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়তো। ১৮৯২ সাল থেকে ১৯৫৪ সালে বন্ধ হয়ে যাবার আগ পর্যন্ত ৬০ বছরে প্রায় ১২ মিলিয়ন অভিবাসীর ইমিগ্রেশন হয়েছিল এই আইল্যান্ডে। অনুমান করা যায় যে বর্তমান মার্কিন নাগরিকদের প্রায় ৪০ শতাংশের পূর্বপুরুষদের মধ্যে কেউ না কেউ এই দ্বীপের মাধ্যমে আমেরিকাতে অভিবাসিত হয়েছিল।

এলিস আইল্যান্ড ইমিগ্রেশন রেজিস্ট্রেশন হল

ইমিগ্রেশন সেন্টারটিকে বর্তমানে স্মৃতিশালা হিসেবে বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা হয়েছে। ইমিগ্রেশন হল, লাগেজ রুম সহ পুরো ইমারতটি ভাল করে ঘুরে দেখলাম। প্রচুর পিক্টোরিয়াল ডিসপ্লে আছে যেগুলো পড়তে গেলে অনেক সময়ের দরকার। বিল্ডিঙে দুই ফ্লোরে দুটো থিয়েটারও আছে পুরো ইতিহাসের উপর মুভি দেখানোর জন্য। আমাদের সময় কম থাকাতে মুভি না দেখেই ফিরতে শুরু করলাম কারণ ততক্ষণে দিনের আলো কমতে শুরু করেছে।

;