নিজের একটি কামরা

সানজিদা আমীর ইনিসী
অলঙ্করণ কাব্য কারিম

অলঙ্করণ কাব্য কারিম

  • Font increase
  • Font Decrease

গাড়ির ভাড়া মিটায়ে বাড়ির দিকে তাকাতেই সিকিউরিটি গার্ড হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলেন, “সাংবাদিকের বাসায় যাবেন?”
“হ্যাঁ”
“উনি বইলা রাখছেন, আপনি আসবেন। যান। সোজা গিয়া বামপাশে লিফট।”

ফার্স্ট ফ্লোরে যাব, লিফট দরকার ছিল না, তবু সিঁড়ি দিয়ে উঠব ভাবতে কষ্ট হচ্ছিল। উঠে বাসা খুঁজে কলিং বেল দিলাম। একজন ভদ্রলোক, যিনি সাংবাদিক এবং আমার পরিচিত, তিনিই দরজা খুলে বললেন, “আসুন, দরজা খোলাই ছিল।”
আমি ঠোঁট প্রসারিত করলাম।

আমার মাথার ভেতরে তখন ভীষণ যন্ত্রণা শুরু হইছে। আমি ঘোরঘোর অনুভব করছিলাম। ভেতর থেকে দৃঢ়কণ্ঠে বলছিলাম, আজ রাতটাই শেষ রাত। সকাল-সকাল সদরঘাট যাব। বাবুবাজার ব্রিজ থিকা সোজা নদীতে, আগে পাঁচটা ঘুমের ওষুধ খাইয়া নিব, যাতে পানিতে হাত-পা ছোটাছুটি না করতে পারি।
“কী খাবেন?”
আমি চমকে উঠলাম। হাসতে চেষ্টা করলাম। বললাম, “খেয়ে এসছি। ডাল, ডিম আর ভাত।”
“ভাত খেয়ে এসছেন.. তাইলে ঠিক আছে। অন্য কী খাবেন? ব্রেড-জেলি আছে ফ্রিজে।”
“খাব না। সিগারেট আছে?”
“আমি সিগারেট খাই না। তবে বাসায় থাকার কথা। আর কী খান? হুইস্কি খাইতে পারেন চাইলে।”
“নাহ, আমার সকালে উঠতে হবে। কাজ আছে। সিগারেট খাব।”
“বারান্দায় যাইতে হবে। এখানে না।”
“হ্যাঁ-হ্যাঁ। বারান্দায় গিয়েই।”

ডাইনিং টেবিলের ওপর পুরো এক প্যাকেট বেনসন সুইচ রাখা। কায়সার আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, এটাই আমার ব্র্যান্ড কিনা।
“আমি বেনসন লাইট খাই। তবে না-ফাটায়ে সুইচ চলতে পারে, এখন। হাহাহা।”

বেশ বড় বারান্দা। দুইটা বেতের সোফা রাখা আছে। আমার ঘরবাড়ি নাই বিধায় নানানজনের বাসায় আমার থাকা লাগছে। তাদের সিংহভাগ সাংবাদিক। বাকিরা হয় ফিল্মমেকার নয়তো থিয়েটারের লোকজন।
“গাঁজা খান?”
“হুম।”
“এখন ওইটা কিন্তু ম্যানেজ করতে পারব না।”
“দরকার নাই। সিগারেট আছে। আমি একটু বাদে ঘুমাব।”
“টেনশনে আছেন কিছু নিয়ে?”
সিগারেটের দিকে তাকায়ে হাসতে হাসতে বললাম, “হ্যাঁ, সমস্যা তো লেগেই থাকে। ঢাকায় আমার থাকার জায়গার সংকট।”
“গ্র্যাজুয়েশন তো শেষ আপনার।”
আমি মাথা নাড়লাম।
“সবচেয়ে ভালো আইডিয়া হইল, প্রেমিকের সাথে বাসা ভাড়া নিয়ে নেওয়া”
আমি চোখ তুলে তাকালাম না। চোখে পানি চলে আসাতে অস্বস্তি হচ্ছে।
“আপনি তো ছোটখাটো চাকরি করছেনই, আপনি অর্ধেক দিলেন। আপনার প্রেমিক অর্ধেক দিবে। ব্যস, ঝামেলা শেষ।”
“এত সহজ না কায়সার ভাই। এই পৃথিবীতে নাই কোনো শুদ্ধ প্রেম, নাই কোনো বিশুদ্ধ থাকার জায়গা।”
“হাহাহা।”
“সকালে ওঠেন আপনি? আমি সকাল-সকাল যাব।”
“যাবেন! দরজা খোলাই থাকে। সমস্যা হবে না। সিকিউরিটি গার্ড আছে।”
আমি সিগারেট শেষ কইরা বিদায় না নিয়াই বারান্দা ছেড়ে উঠে পড়লাম।

আমি আর আগামীকাল সমস্তদিন থাকছি না ভাবতে ভালো লাগতেছে আমার। আমি ফ্রেশ হইয়া আইসা আধশোয়া হইয়া রইলাম। প্রেমিক, আমার প্রেমিক, শফিকের সাথে আধঘণ্টা অর্থহীন আলাপের পর আমি ঘুমাইতে গেলাম। পাশ ফিইরা শোয়াতে চোখের পানি টপাটপ বালিশে পড়তে শুরু করল।

সাতটা তিপ্পান্ন মিনিটে আমার ঘুম ভাঙল। অ্যালার্ম বাজার সাত মিনিট আগে। ফেসবুক খুলে শফিকের টেক্সট দেখলাম। ভালো লাগল। উঠে বসলাম। মুখ ধুইলাম। চুল আঁচড়াইলাম।

বের হইয়া ডাইনিং টেবিলের ওপর থাকা সিগারেটের প্যাকেট থিকা সিগারেট বের কইরা ধরায়ে বাইর হইলাম। ফুরফুরা লাগতেছিল খুব। আমি লিফটে আর নামলাম না, সিঁড়ি বাইয়া নামলাম।

কিছুদূর গিয়া ওভারব্রিজ পার হইলে ফার্মেসি। আমি পাঁচটা ঘুমের ওষুধ দুইটা দোকান থিকা কিনলাম। তারপর বাসে উঠলাম।

সদরঘাটের বাস।

একদম পেছনের সিটে বসলাম। পাশে কেউ নাই। সামনেও কেউ নাই। ওষুধগুলি খাইয়া আমি গুনগুন করতে থাকি।
“..So you think you can love me and leave me to die
Oh baby- can't do this to me baby..”

কেন আত্মহত্যা করতে যাইতেছি, তার কারণগুলি সব শফিককেন্দ্রিক না। এইটা ঠিক, খুব সত্য যে, আমি শফিককে ভালোবাসি। আমার ভালোবাসাবাসির নিষ্ঠা শফিকের মাথা নিচু কইরা দেয়, জানি, তবু, আমার কিছু যায়-আসে না। শফিকের সাথে থাকলেও আমি ভালো থাকতে পারব না। আর অন্যকাউরে ভালোবাসতেও পারি না। একদম পারি না। এইটা আমারে কষ্ট দেয়।

শফিকের মতো মানুষ কি আমি পছন্দ করতাম বা করি? উত্তরটা হইল, না, করি না। একেবারে পছন্দ করি না এমন মানুষ। কিন্তু শফিককে আমি কখনো জাজ করতে পারি না। ইচ্ছা করে না। যে প্রেম সত্যের মতো সুন্দর, তারে কেনই বা আমি বিচার করতে যাব। তারে বিচার করার কিছু নাই, তার কাছ থিকা চাওয়ারও কিছু নাই। আমি ফ্যালফ্যাল কইরা তাকায়ে থাইকা কেবল অসাড় হইয়া ভালোবাসতে পারি। ওইটুকুই।

সদরঘাট চলে আসছি।

আরো জিজ্ঞাসা করে-টরে ব্রিজে।

প্রায় খালি চারদিক। বিশ্রী রোদ আছে। যেমন বিশ্রী আমার বাঁইচা থাকা। যেমন অস্বস্তিকর আমার দিনরাত্রি। মূলত এইজন্যেই আমি রেলিংয়ে পা রাখব। পা রেখে-রেখে উঠে দাঁড়াব। তারপর..
ঝাঁপ দিব।

আমি রেলিংয়ের হাতল ধরে পা রেখে-রেখে উঠে গেছি। নিচে তাকায়ে পানি দেখছি, উপরে আকাশ।
কিন্তু আর কিছু না। আর কিছু দ্যাখার আগেই হ্যাঁচকা টান মাইরা আমাকে নামায়ে ফেলল। আমি ব্রিজের সাইডওয়াকে গিয়া পড়লাম। আরো মানুষজন আসলো। কী যেন সব বলতে শুরু করল। আমি শুনতে পাচ্ছিলাম না। আমার কানের ভেতর মৌমাছি ঢুকে গেছে যেন, ভীষণ শব্দে আমি চিৎকার করে কেঁদে উঠি।

উদ্দ্যেশ্যহীনভাবে আমি কিছুক্ষণ হাঁইটা যাত্রাবাড়ির বাসে উইঠা বসি। আমার পায়ের গোড়ালি আর হাঁটুতে ব্যথা—আমি ধরে রাখি। আমার শীত করে, বৈশাখের রোদে আমার কাঁপুনি দিয়ে শীত করে।

এরপর কিভাবে ঢাকা মেডিকেল চলে গেছি জানি না। সেখান থিকা আবার ধানমন্ডি। ধানমন্ডি থিকা বাইক নিয়া গুলশান। গুলশান ১-এ।

পাঁচ-ছয় বছর ধরে গুলশানে আমি যে বাসায় থাকছিলাম, তার মোড়ে আড্ডা দিই। যখন আমি ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হইলাম, পাঁচ বছর আগে, তখন থিকা। মহাখালীতে শফিকের বাসা তখন। আমি মাঝেমধ্যে গুলশান থাকতাম। সামনে চা-র দোকান। বেশ বইসা থাকা যাইত। আড্ডা দেওয়া যাইত। মানুষ কম থাকলে চুমু খাওয়াও কঠিন ছিল না।

আমি সেই চা-র দোকানে গিয়া বসি। ব্যাগ ঘাঁইটা দশটা ফেক্সো পাই। খাইলে কিছু হবে না এই জেদে তখন দশটা ফেক্সো-১২০ খাইয়া ফেললাম।

দোকানে বইসা তখন একের পর এক সিগারেট ফুঁকতেছি। একঘণ্টা, দুইঘণ্টা, তিনঘণ্টা পার হইল। দোকানের মালিকের ছোট মেয়েরা আইসা জিজ্ঞেস করা শুরু করল, “আপনার লগে যে লোকটা থাকে, উনি কই?”
“উনি বাসায়।”
“আপনে কানতাছেন ক্যান?”
“সর্দি হইছে, চোখ থিকা পানি পড়ে।”
“আপনার চুলে মাটি লাগতাছে।”
আমি অপ্রয়োজনীয় জোর দিয়ে বললাম,
“লাগুক।”

তিনঘন্টা পর শফিক আসলো। সহজ সুরে জিগাইল, “কী হইছে?”
আমি উইঠা সামনে গিয়া হাঁটতে শুরু করলাম।

আমার কথা জড়ায়ে যাইতেছিল, একটা কথা তিনবার চেষ্টা করে বলতে হচ্ছিল। সামনে একটা খালি রিকশায় গিয়া বসলাম। হাত-পা কাঁপতেছে রাগে।
“জামাকাপড়ে এত ধুলাবালি কিভাবে লাগছে?”
আমি ঝাড়া দিলাম টিশার্টের হাতার অংশ। দিয়া মুখ অন্যদিকে ফিরায়ে বইসা রইলাম।

ফের ‘কী হইছে’ জিজ্ঞেস করায় আমি বলতে শুরু করলাম। আমাকে মাঝপথে থামায়ে দিয়া শফিক উৎসুক হইয়া জানতে চাইল, “আজকেই সুইসাইড করতে গেছিলা?”
বললাম, “মরতে পারি নাই।”
বইলা আমি শফিকের দিকে তাকায়ে রইলাম। শফিকরে জড়ায়ে ধরে বলা যাইত যদি ‘আমি মরতে পারি নাই’ তাইলে আমি শান্তি পাইতাম।
“এইসব নাটক ক্যান করতেছো?”
“আবার বলো।”
“নাটক শুরু করলা কেন?”
আমি চিৎকার কইরা বলি,
“নাটক .. নাটক মনে হইতেছে?”—বইলা ব্যাগ নিয়া হাঁটতে শুরু করি। ব্যাগ রাস্তার ওপর থিকা ছ্যাঁচড়ায়ে নিয়ে যাচ্ছিলাম। এলোমেলো পা ফেলতেছিলাম। আমার আর একেবারে শক্তি নাই।

শফিক আগায়ে আইসা আমার হাত থিকা ব্যাগটা নিয়া বলল, বাসায় চলো।
আমি লক্ষ্মী মেয়ের মতো রাজি হইলাম। মাথা কাত কইরা সম্মতি জানাইলাম।

বাসায় যাওয়ার পরে শফিক ঘুমাইতে বলল। আমি রাতে আবার সদরঘাট যাব বইলা ঠায় বইসা রইলাম। পইড়া যাইতেছিলাম মাঝেমধ্যে। এরমধ্যে মাথায় কেমন যেন ঝাঁকুনি লাগতে থাকল। আমি ব্যাগ নিয়া সোজা বের হইয়া গেলাম। রিকশা করলাম।

রিকশা বেশিদূর যাওয়ার আগে আবার সেই রিকশা ঘুরাইলাম। শফিকের সাথে ফোনে কথা হচ্ছিল। বাসার সামনে বইসা কান্নাকাটি করাতে শফিক কী বইলা যেন আমাকে ভর্ৎসনা করল। ওর আম্মা জানতে পারলে কী করবেন তাও বলল বোধহয়। আমি তখন দরজার সামনে দাঁড়ায়ে আছি। কথা বলার পরে খানিক দয়া কইরা গেট খুইলা আবার বাসায় নিয়া গেল।
আমি ঘুমায়ে গেলাম।

ভীষণ অশান্তির ঘুম থিকা জাগার পর আমার আর কী করার থাকে.. আমার বেকারদিন, আমার থাকার জায়গার অভাব তুচ্ছ লাগে। শফিক দেখলাম চাবি খুঁজতেছে, বাসার চাবি, বের হবে বা আমাকে বের করে দিয়ে আসবে; শফিকের মুখেচোখে চাবি খুঁইজা না-পাওয়ার উৎকণ্ঠা।

আমার ওই উৎকণ্ঠা দেখতে ভালো লাগে। রাত এগারোটা বেজে থাকে শফিকের ঘড়িতে, আমার সদরঘাট যাওয়ার তড়িঘড়ি মিলায়ে যাইতে থাকে হাওয়ায়।


সানজিদা আমীর ইনিসীর অন্যান্য লেখা

বাবার বিয়ে
তারা ভাবার্থহীন চোখ দিয়া আমারে দেখতে থাকে
আরম্ভের আলো

আপনার মতামত লিখুন :