৩৪ বছর পর হেলাল হাফিজের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ

মাহমুদ হাফিজ, কন্ট্রিউবিটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম
‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’ কবিতার বই হাতে কবি হেলাল হাফিজ, সঙ্গে মাহমুদ হাফিজ

‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’ কবিতার বই হাতে কবি হেলাল হাফিজ, সঙ্গে মাহমুদ হাফিজ

  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলা কবিতার প্রেম ও বিরহের রাজপুত্তুর বিরলপ্রজ কবি হেলাল হাফিজ ৩৪ বছর পর নিজের গড়া রেকর্ড ভাঙলেন। একটি মাত্র কাব্যগ্রন্থ নিয়ে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা কবি ৩৪ বছর পর ৩৪টি কবিতা দিয়ে প্রকাশ করছেন দ্বিতীয় মৌলিক কাব্যগ্রন্থ ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’।

বইটির প্রকাশক দিব্য প্রকাশ। এর প্রচ্ছদ এবং পাতায় পাতায় অলঙ্করণ করেছেন শিল্পী ধ্রুব এষ। আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত না হলেও বইয়ের ছাপা-বাঁধাই শেষ হয়েছে। কয়েক কপি বই কবির কাছে পৌঁছানো হয়েছে। তারই একটি কপি বার্তা২৪.কমের হাতে এসেছে।

শুক্রবার (২৯ নভেম্বর) কবির দ্বিতীয় আবাস জাতীয় প্রেসক্লাবের মিডিয়া লাউঞ্জে বার্তা২৪.কমকে প্রদত্ত একান্ত সাক্ষাৎকারে প্রেম-বিরহ-দ্রোহের রাজকুমার হেলাল হাফিজ বললেন, সম্প্রতি আমার জন্মদিনে অনুরাগীদের কথা দিয়েছিলাম, বেঁচে থাকলে আরও একটি বই উপহার দিয়ে যাব। এই বই সেই প্রতিশ্র্রুত বই।

তিনি বলেন, এই বই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও প্রযুক্তির ফসল। প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে মাঝে মাঝেই মনের কোণে উঁকি দিয়েছে কবিতার নানা লাইন। সেগুলো অণু কবিতা হিসেবে লিখে ফেলেছি।

কবি বলেন, এ যুগে বড় কবিতা পড়ার সময় মানুষের কম। অণু কবিতাগুলো ফেসবুকে প্রকাশিত কাব্যানুরাগীদের দৃষ্টি কাড়ে।

তিনি বলেন, বইটিতে মোট ৩৫টি কবিতা স্থান পেয়েছে। ‘পিতার পত্র’ নামের কবিতাটি মূলত আমার বাবার লেখা একটি চিঠির লাইন। কবিতাটিকে ইনভারটেড কমার মধ্যে এখানে তুলে দিয়েছি। আমার নিজস্ব কবিতা ৩৪টি। অন্তত দুইশ’ কবিতা থেকে বাছাই করে শেষাবধি ৩৪টি কবিতা দিয়ে এই বইয়ের পান্ডুলিপি তৈরি করি। বাকি কবিতাগুলো আলোর মুখ দেখার সম্ভাবনা নেই।

পিতার কবিতা বইয়ে স্থান প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করলে কবি বলেন, আমার ভরজীবনের যে দুঃখ, কষ্ট। তা পিতার থেকেই পাওয়া। তিনি বলেছিলেন- আমি যে দুঃখ কষ্ট দিয়ে গেলাম, তা লালন করো। এক চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘রেটিনার লোনাজলে তোমার সাঁতার/ পিতৃদত্ত সে মহান উত্তরাধিকার’। এটিকে এই অণু কবিতার বইয়ের মধ্যে ‘পিতার পত্র’ নাম দিয়ে স্থান দিয়েছি।

১৯৮৬ সালে বেরিয়েছিল কবি হেলাল হাফিজের প্রথম ও সাড়া জাগানো কবিতার বই ‘যে জলে আগুন জ্বলে’। সেই বইয়ের ৫৬টি কবিতা দিয়ে কবি বাংলা কবিতার জগতে জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছান। একটি মাত্র বইয়ের মাধ্যমে কাব্য সাম্রাজ্যে রাজত্ব করে আসা কবির কপালে বিরলপ্রজ তকমা জোটে।

২৫ বছর পর ২০১২ সালে বের হয় কবির ‘কবিতা একাত্তর’। এই বইয়ের ইংরেজি অনুবাদের নাম হয় ‘দ্য টিয়ার্স দ্যাট ব্লেজ’। কবিতা একাত্তরে প্রথম গ্রন্থের ৫৬টি কবিতার সঙ্গে নতুন ১৫টি নতুন কবিতা যুক্ত হয়। এ বছরের গোড়ায় এর সঙ্গে ১৭টি নতুন কবিতা যুক্ত হয়ে বের হয় দ্বিভাষিক বই ‘এক জীবনের জন্মজখম’। এর ইংরেজি অনুবাদ অংশের নাম দেয়া হয় ‘বার্থ উন্ড অব ওয়ান লাইফ’। প্রথম বইয়ের পরের বইগুলো কিছু কবিতা যোগ ও অনুবাদের মাধ্যেম প্রকাশিত হয়েছে। তাই বর্তমান গ্রন্থকে কবি স্বয়ং তার দ্বিতীয় মৌলিক কাব্যগ্রন্থ হিসেবে অভিহিত করছেন।

‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো ক্ষুদ্র হলেও বড় ব্যঞ্জণাময়। যেমন—‘কোনোদিন, আচমকা একদিন/ ভালোবাসা এসে যদি হুট করে বলে বসে,-/ ‘চলো, যেদিক দু’চোখ যায় চলে যাই’, / যাবে? (অভিসার), ভালোবেসেই নাম দিয়েছি ‘তনা’,/ মন না দিলে/ ছোবল দিও তুলে বিষের ফণা’ (প্রতিদান)। ‘যদি যেতে চাও, যাও,/ আমি পথ হবো চরণেরর তলে/ না ছুঁয়ে তোমাকে ছোঁব/ ফেরাবো না, পোড়াবোই হিমেল অনলে’ (পথ)। ‘আজন্ম মানুস আমাকে পোড়াতে পোড়াতে কবি করে তুলেছে’/ মানুষের কাছে এও তো আমার এক ধরনের ঋণ। / এমনই কপাল আমার/ অপরিশোধ্য এই ঋণ ক্রমাগত বেড়েই চলেছে’ (কবিসূত্র)। ' হয় তো তোমাকে হারিয়ে দিয়েছি/ নয় তো গিয়েছি হেরে,/ থাক না ধ্রুপদী অস্পষ্টতা/ কে কাকে গেলাম ছেড়ে'  (জটিল জ্যামিতি)। ‘তুমি আমার নিঃসঙ্গতার সতীন হয়েছো’ (সতীন)। ‘সূতো ছিঁড়ে তুমি গোটালে নাটাই/ আমি তো কাঙাল ঘুড়ি,/ বৈরী বাতাসে কী আশ্চর্য/ একা একা আজও উড়ি!’(ঘুড়ি)। ‘তোমার বুকের ওড়না আমার প্রেমের জায়নামাজ’ (ওড়না)। ‘বিনা জলে, বিনা সমীরণে/ দেখো, দেখো কতো ঢেউ/ কটিদেশে, মনে!’(ঢেউ)।

আপনার মতামত লিখুন :