জয়দেবপুরের গণ বিক্ষোভ

সার্জেন্ট (অব.) সৈয়দ জহিরুল হক
গ্রাফিক : বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

গ্রাফিক : বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

পাকিস্তান আমলে, ১৯৬৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টে সাধারণ সৈনিক পদে ভর্তি হই। ছয় মাস ট্রেনিং শেষে দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টে ব্যাটালিয়ানে জয়দেবপুরে বদলি। সেখানে আমাকে আলফা কোম্পানির ১নং প্লাটুনে পাঠানো হয়। তখন আমার ব্যাটেলিয়ান কমান্ডার ছিলেন লে. কর্নেল (বাঙালি) মাসুদুল হাসান খান। এবং আমার কোম্পানি কমান্ডার ছিলেন (পাকিস্তানি) মেজর কাজিম কামাল খান। কোম্পানি অফিসার ছিলেন (ক্যাপ্টেন) জেনারেল এ এস এম নাসিম। তিনি ব্যাটেলিয়ান অ্যাডজুটেন্ট পদেও নিয়োজিত ছিলেন। আরেকজন অফিসার ছিলেন জেনারেল (সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট) (বাঙালি) গোলাম হেলাল মুরশেদ খান। তখন ব্যাটেলিয়ান উপঅধিনায়ক ছিলেন (মেজর) জেনারেল জিয়াউর রহমান। পরবর্তীতে তিনি চট্রগ্রাম বদলি হয়ে গেলে (মেজর) জেনারেল কে. এম. শফিউল্লাহ উপঅধিনায়ক পদের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। যুদ্ধকালীন তিনি ৩ নম্বর সেক্টর কমান্ডার ছিলেন। আমি এ সেক্টরের অধীনেই যুদ্ধ করি।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিকা গড়ে উঠে ১৯৭০ এর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। সেই নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাক ভোটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নির্বাচিত হন। কিন্তু পাক সামরিক সরকার তার নিকট দায়িত্ব হস্তান্তর করতে অস্বীকৃতির মনোভাব প্রকাশ করে। তারা চেয়েছিল ভুট্টোকে ক্ষমতায় বসাতে। এ নিয়ে তখন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে ক্ষোভ জেগে উঠে। ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পর গোটাদেশের আপামর জনগণ বিদ্রাহী হয়ে ওঠে। সেই সময় পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের সাথে বাঙালি সৈনিকদের ছিল সুসম্পর্ক। কেননা আমরা সবাই বাঙালি।

পাক সামরিক কর্তৃপক্ষ বেঙ্গল রেজিমেন্টের ওপর বিশেষ দৃষ্টি রাখা শুরু করে। ১৯ মার্চ ১৯৭১ দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টকে নিরস্ত্র করার লক্ষ্যে পাক সামরিক জান্তা সুপরিকল্পিত নীল নকশা তৈরি করে। ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব আরবাবের সাথে প্রায় ৬০/৭০ জন পাকিস্তানি সেনা ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে জয়দেবপুরে আসে। সেকেন্ড বেঙ্গল কী অবস্থায় আছে তা পরিদর্শনের জন্য। কিন্তু তাদের বাস্তব লক্ষ্য ছিল সেকেন্ড বেঙ্গলকে নিরস্ত্র করা। জয়দেবপুরের জনগণ এ সংবাদ জানতে পেরে গণমিছিলের ডাক দেয়। অল্প সমেয়র ভিতর জয়দেবপুর রেল ক্রসিং থেকে শুরু করে চৌরাস্তা পর্যন্ত হাজার হাজার লোক সমবেত হলো। ঐ দিন আবার আমাদের কোম্পানির রেশন আনার জন্য আমরা ৪/৫ জন সৈনিক একটি গাড়িতে করে টাঙ্গাইল থেকে জয়দেবপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হই। আমি নিজেও সেই গাড়িতে ছিলাম। চৌরাস্তার মোড়ে পৌঁছলে জনগণ আমাদের বিস্তারিত ঘটনা জানাল। বলল, আপনারা জয়দেবপুর পৌঁছতে পরবেন না। আপনারা টাঙ্গাইল ফিরে যান। আপনাদের রেশন এবং ফ্রেশের ব্যবস্থা আওয়ামী লীগের নেতারা করে দেবে। পরিস্থিতি উপলব্ধি করার জন্য একজন বাদে আমরা বাকি সেনারা শার্ট লুঙ্গি পরে জনগণের সাথে মিশে যাই। সেদিন চৌরাস্তা থেকে জয়দেবপুর বাজার পর্যন্ত ছিল জনতার ঢল। যাতে দ্বিতীয় বেঙ্গল থেকে পাকিস্তানিরা অস্ত্র নিয়ে যেতে না পারে। তারা জয়দেবপুর স্টেশন থেকে দুটি রেলে বগি এনে রাজবাড়ি রেল ক্রসিংয়ের ওপর রেখে দিল। যাতে কোনো পাক সেনা দল জয়দেবপুর থেকে ঢাকায় যেতে না পারে বা ঢাকা থেকে জয়দেপুর প্রবেশ করতে না পারে। অপর দিকে দ্বিতীয় বেঙ্গলের সৈনিকরা পূর্ব থেকেই প্রস্তুত ছিল। তারাও কিছুটা উগ্র ভাবে ছিল। ব্রিগেড কমান্ডার এসে যখন দেখল পরিস্থিতি ভয়াবহ খারাপের দিকে তখন তারা অস্ত্র নেওয়ার পরিকল্পনা বাদ দিয়ে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে ফিরে যাবার প্রস্তুতি নিল।

গণ বিক্ষোভ দেখে ব্রিগেড কমান্ডার প্রথম গাড়িতে দ্বিতীয় বেঙ্গলের বাঙালি সেনাদের এবং পেছনে দ্বিতীয় গাড়িতে পাক সৈনিকদের নিয়ে জয়দেবপুর থেকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে ফেরত যাবার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। রেল ক্রসিংয়ে এসে বাঁধার সম্মুখীন হয়। বিদ্রোহী জনগণ পাকিস্তানি সৈন্যদের আক্রমণ করার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিল। কিন্তু যখন দেখল দ্বিতীয় বেঙ্গলের বাঙালি সৈনিকগণ প্রথম গাড়িতে আছে তখন তারা এক কঠিন পরীক্ষায় পড়ে যায়। এদিকে ব্রিগেড কমান্ডার দ্বিতীয় বেঙ্গল অধিনায়ককে আদেশ করল ফায়ার করার জন্য। কিন্তু আমাদের লোকেরা তখন সাইডে কচুরি পানাতে এবং গাছের আগায় ফায়ার করে। এ দেখে ব্রিগেড কমান্ডার গর্জে উঠে বললেন, “তোমার লোকেরা কী গুলি করছে? এখন পর্যন্ত ১০/১২টা লাশ ফেলতে পারল না! হাজার হাজার জনতার সামনে গুলি করলে লাশ পড়ে না এ কেমন কথা? ওদেরকে বলো, সরাসরি মানুষের উপর গুলি করতে।” কিন্তু আমাদের বাঙালি অফিসার ব্রিগেড কমান্ডারকে বুঝিয়ে দিল নিরস্ত্র মানুষের ওপর আমরা গুলি করতে পারি না। অপর দিকে জনতার ভিড়ের মধ্য থেকে দেশি অস্ত্র ও দুটি চাইনিজ রাইফেল দ্বারা পাকিস্তানিদের লক্ষ্য করে গুলি করে। এ দেখে ব্রিগেডিয়ার আরো রাগান্বিত হয়ে যায়। তখন পাকিস্তানিরা জনগণের ওপর গোলা বর্ষণ করে। এভাবে জনতার ভিড় কমতে থাকে। পরে রেল ক্রসিং থেকে রেলগাড়ির বগিও সরিয়ে ফেলা হয়। ব্রিগেড কমান্ডারও বুঝতে পারে বাঙালি জনতার পাশাপাশি বাঙালি সৈনিকরাও পাকিস্তানিদের ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছে। পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যেতে পারে। তখন দ্বিতীয় বেঙ্গল কমান্ডার লে. কর্ণেল মাসুদুল হাসান খানকে আদেশ দিয়ে বললেন, যে কোনো উপয়ে হোক আমাদের ঢাকা ক্যান্টেনমেন্টে পৌঁছার ব্যাবস্থা করে দাও। যাবার সময় ব্রিগেড কমান্ডার লে. কর্নেল মাসুদুল হাসানকে ঢাকায় চলে আসতে হুকুম দিয়ে যান। ২১ মার্চ লে. কর্নেল মাসুদুল হাসান ঢাকায় চলে যান। তার স্থলে পাঞ্জাব রেজিমেন্ট থেকে (বাঙালি) লে. কর্নেল রাকিবকে সেকেন্ড বেঙ্গলের অধিনায়কের দায়িত্বে পাঠায়।

এর পর থেকে আওয়ামী লীগের নেতাগণ সেকেন্ড বেঙ্গলকে সর্বদিক দিয়ে সাহায্য সহযোগিতা করত। যেভাবে এদেশের সাধারণ মানুষের মনে আন্দোলনে সাড়া দিয়ে ছিল ঠিক সেভাবেই আমরা যারা বাঙালি সৈনিক ছিলাম তাদের মনেও আন্দোলন সাড়া দিয়ে ছিল। পার্থক্য ছিল আন্দলনের প্রারম্ভিক পর্বে ও প্রস্ততি পর্বে আমরা প্রকাশ্যে আন্দেলনের মাঠে নামি নাই। আমরা সময় ও সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম। ১৯৭১ সালে মার্চের প্রথম থেকেই আমরা সিগন্যাল প্লাটুনের গোপন কোড নম্বরের মাধ্যমে আমাদের বেঙ্গল রেজিমেন্টগুলোর মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করতাম ও সংবাদ আদান প্রদান করতাম।

১৯৭১ সালে আই এস ডিউটির জন্য আমাদের আলফা কোম্পানিকে টাঙ্গাইলের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তখন আমার কোম্পানি কমান্ডার ছিলেন মেজর কাজিম কামাল খান এবং (ক্যাপ্টেন) জেনারেল এ এস এম নাসিম সাহেব তখন আমার কোম্পানির অফিসার এবং ব্যাটালিয়ান অ্যাডজুন্টেন্ট পদে নিযুক্ত ছিলেন। টাঙ্গাইলে আসার পর যখন গোটা দেশে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আন্দোলন শুরু করে তখন সম্ভবত ২০ মার্চ আমরা (ক্যাপ্টেন) জেনারেল নাসিম সাহেবের সাথে পরামর্শ করলাম। “দেশের এ পরিস্থিতি আমাদের করণীয় কী?” নাসিম সাহেব আমাদের বললেন, “তোমরা একটু ধৈর্য ধরো। আমরা যারা বাঙালি অফিসাররা আছি সকলের সম্মতিতে একত্রে একসাথে পাক সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করতে হবে।” ২৫ মার্চ রাতে আমাদের সেই সুযোগ এসে যায়। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ভিতর যতগুলো বেঙ্গল রেজিমেন্ট ছিল সবগুলোই একত্রে বিদ্রোহ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। (ক্যাপ্টেন) জেনারেল নাসিম সাহেব আমাদেরকে অস্ত্রাগার থেকে নিজ নিজ গোলাবারুদ সংগ্রহ করতে বললেন। আমি অস্ত্রাগার থেকে চায়না ৭.৬২ এম এম এল এম জি এবং ১২ বাক্স এল এম জির গুলি নিয়ে নিই। মহান মুক্তিযুদ্ধে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এল এমজির মাধ্যমেই আমি যুদ্ধ করেছি। আমাদের সঙ্গে যে সকল পাঞ্জাবি, পাঠান ও বিহারী সৈনিক ছিল তাদের কাছ থেকে আগেই অস্ত্র ও গোলাবারুদ জমা নিয়ে নেওয়া হয়। ঐ রাত্রেই আনুমানিক ১২টার দিকে মেজর কাজিম কামাল খানসহ যতগুলো পাঞ্জাবি, পাঠান ও বিহারী অফিসার ও সৈনিক ছিল—তাদের সবাইকে হত্যা করা হলো।

ক্যাপ্টেন নাসিম সাহেব আমাদেরকে গাড়িতে উঠতে বললেন। অতিদ্রুত আমাদের কোম্পানির যাবতীয় সামানা ও রেশনসহ গাড়ি লোড করা হলো। সম্ভবত রাত ২টার দিকে আমরা ময়মনসিংহের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। কেননা, তখন আমরা শুনেছিলাম, ময়মনসিংহ বিডিয়ার ক্যাম্পে বাঙালি ও পাকিস্তানিদের মধ্যে গোলাগুলি চলছে। বাঙালি বিডিয়ারদের সাহয্যার্থে আমরা ময়মনসিংহের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। সকালে আমরা মুক্তাগাছা জমিদার বাড়িতে কিছুক্ষণের জন্য নাস্তার করার উদ্দেশ্যে বিশ্রাম নিই। ঐ সময় (ক্যাপ্টেন) জেনারেল নাসিম সাহেব আমাকে বললেন, “তোমার বাড়ি নাকি এখান থেকে খুব কাছে, তুমি বাড়িতে গিয়ে তোমার আত্মীয় স্বজনদের সাথে সাক্ষাত করে ময়মনসিংহে এসে আমাদের সাথে যোগ দেবে।” জবাবে আমি বললাম, “স্যার, আমার পক্ষে বাড়ি যাওয়া সম্ভব নয়। কেননা, বিশেষ করে আমার নানি আমাকে যুদ্ধের ময়দানে না-ও আসতে দিতে পারে। তাই আমি যেতে চাচ্ছি না।”

নাস্তা পর্ব শেষ হওয়ার পরপরই আমরা খবর পাই বিডিআরদের সাথে পাক বাহিনীর গোলাগুলি বন্ধ হয়েছে এবং সমস্ত বাঙালি বিডিআররা আমাদের সাথে যোগ দিতে চাচ্ছে। আমরা এ সংবাদ শোনার পর পুনরায় ময়মনসিংহের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। ময়মনসিংহে পৌঁছে আমাদের কোম্পানিকে ময়মনসিংহ সার্কিট হাইজ ও ডাক বাংলাসহ বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয় নিতে বলা হয়।

আমার কোম্পানির এস জেসিও ছিল সুবেদার নূরল আজিম চৌধুরি এবং প্লাটুন অধিনায়ক ছিলেন সুবেদার মনির আহমেদ এবং প্লাটুনসহ অধিনায়কের দায়িত্বে ছিলেন নায়েব সুবেদার জনাব আলী। আমরা ময়মনসিংহে দুদিন থাকার পর পাকিস্তানি জঙ্গি বিমান আমাদের ক্যাম্পের উপর দিয়ে চক্কর দিতে থকে। আমরা বুঝতে পারলাম আমাদের অবস্থান সম্পর্কে তাদেরকে সংবাদ দেওয়া হয়েছে। আমরা ঐ দিন ট্রেন যোগে ভৈরবের দিকে রওনা হই। ঐ সময় রাস্তার দুপাশ থেকে হাজার হাজার জনতা আমাদেরকে প্রাণঢালা অভিনন্দন জানায়। এবং বিভিন্ন রকম ফলমূল খাদ্য, সিগারেট, ম্যাচ ইত্যাদি আমাদের ট্রেনে দিয়ে যায়। সকলেই আমাদের জয়যুক্ত হওয়ার জন্য প্রাণ খুলে দোয়া করছিল।

সেখানে পৌঁছে নাসিম সাহেব আমাদেরকে একটি স্কুল বিল্ডিংয়ে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দেন। ঐ দিন পাকিস্তান থেকে হঠাৎ করে ক্যাপ্টেন সেলিম সাহেব আমাদের মাঝে উপস্থিত হন। তিনি ইতিপূর্বে আমাদের ব্যাটালিয়ানের অ্যাডজুটেন্ট পদে দায়িত্বে ছিলেন। পরে তাকে পাকিস্তানে বদলি করা হয়। জেনারেল নাসিম সাহেব ও আমরা ক্যাপ্টেন সেলিম সাহেবকে কাছে পেয়ে অত্যন্ত আনন্দিত হলাম। তার কিছুক্ষণ পর দেখা গেল পাকিস্তানি একটি জঙ্গি বিমান ভৈরব শহরের উপর দিয়ে চক্কর চালায়। জঙ্গি বিমানটি চলে যাওয়ার পরপরই আমরা ভৈরব থেকে আশুগঞ্জ চলে যাই। [চলবে…]


ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের স্মৃতি ২ আশুগঞ্জের বিমান হামলা

আপনার মতামত লিখুন :