১৯৭১: বিদেশি পত্রিকায় মার্চ থেকে ডিসেম্বর (পর্ব ২)



অনুবাদ ও গ্রন্থনা : আন্দালিব রাশদী
গ্রাফিক বার্তা২৪.কম

গ্রাফিক বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

১৯৭১-এ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে তথা সত্যের পক্ষে যুদ্ধে নেমেছিলেন সংবাদকর্মী সিডনি শনবার্গ, মাইকেল লরেন্ট, অ্যান্থনি ম্যসকারেনহাস, লেয়ার লেভিন, ড্যান কোগিন, সাইমন ড্রিঙ, নিকোলাস টোমালিন, মার্ক টালি, ক্লেয়ার হোলিংওয়ার্থ, মার্টিন ওলাকট, জন পিলজার, ডেভিড লোশাক, পিটার হ্যাজেলহার্স্ট ও আরো অনেকে।

২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী যখন হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠল, তার সাক্ষী হয়ে রইলেন কজন বিদেশি সাংবাদিক। ৩৫ জন বিদেশি গণমাধ্যম প্রতিনিধিকে ৪৮ ঘণ্টারও বেশি সময়ের জন্য আটকে রাখা হয় ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে। ২৭ মার্চ বলপ্রয়োগ করে পূর্ব পাকিস্তান থেকে তাঁদের বহিষ্কার করা হয়। উড়োজাহাজে তোলার আগে সাংবাদিকদের তল্লাশি করা হয়। তাঁদের নোটবই, ছবির ফিল্ম ও ফাইল বাজেয়াপ্ত করা হয়। বহিষ্কৃত সাংবাদিকেরা যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্স, জাপান ও রাশিয়ার সংবাদপত্রসহ অন্যান্য গণমাধ্যমে কর্মরত ছিলেন। বহিষ্কারের কারণ জানতে চাওয়া হলে দায়িত্বপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা বলেন, ব্যাখ্যা করার কিছু নেই, এটা আমাদের দেশ।

মার্চ থেকে ডিসেম্বর প্রতিমাসের একটি করে নমুনা অনূদিত ও সংকলিত হলো, কোনো পুরোপুরি, কোনোটা আংশিক, ডিসেম্বরে কেবল দুটো।


পর্ব ১ ● মার্চ থেকে আগস্ট পড়তে ক্লিক করুন এখানে

দ্যাগব্লাদেত
সেপ্টেম্বর: পূর্ববাংলার মানুষকে সাহায্য করুন [পর্যালোচনা]


পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ওপর যে আঘাত করা হয়েছে, তার ব্যাপ্তি যে কত বিশাল, পৃথিবী এখনো তা বুঝে উঠতে পারেনি। বছরের শেষ নাগাদ এক কোটি মানুষ দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাবে। এতে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, যেখানে শরণার্থীরা আশ্রয় নিয়েছে, সেখানে ভয়ংকর পুষ্টিসংকটের সৃষ্টি হতে যাচ্ছে।

শরণার্থী শিবিরে যাঁরা কর্মরত, তাঁরা মনে করেন, স্বল্পতম সময়ের মধ্যে সাহায্য না পাওয়া গেলে এক লাখ শিশু ক্ষুধাজনিত মৃত্যুঝুঁকিতে পড়বে। পশ্চিমবঙ্গে ভারত সরকারের স্থাপিত শরণার্থী শিবিরে মাত্র ৩০ লাখ শরণার্থী ঠাঁই পেয়েছে। এই রাজ্যে শরণার্র্থী এসেছে ৫০ লাখ। তার মানে, ২০ লাখ শরণার্থী গ্রাম ও শহরাঞ্চলে রাস্তার ওপর অথবা যেখানে সামান্য ঠাঁই পাওয়া যায়, সেখানেই পড়ে আছে।

ক্ষুধা ছাড়াও এখন কলেরা চলছে। এই মহামারীর প্রকোপ কিছুটা কমিয়ে আনা সম্ভব হলেও অপুষ্টির শিকার ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম, এমন মানুষের মৃত্যু ঠেকানো যাচ্ছে না। প্রতিরোধ ক্ষমতা যাদের কম, তাদের প্রায় সবাই শিশু। ভয়ংকর হুমকির মুখে যে এক লাখ শিশু রয়েছে, তারা ছাড়াও তিন লাখ শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে।

এই সংখ্যার ভেতরেই লুকিয়ে আছে পূর্ব পাকিস্তান ট্র্যাজেডিস্বরূপ, যা বাইরের মানুষের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। এর আকার এতই বড় যে বায়াফ্রা ট্র্যাজেডির তুলনায় তা অনেক ছোট। অপর্যাপ্ত হলেও ত্রাণকর্ম যতটুকু হয়েছে, তা অবশ্যই বিবেচনাযোগ্য। ৫০০ মিলিয়ন নরওয়েজিয়ান ক্রোনার সাহায্য দেওয়া হয়েছে—এতেই ট্র্যাজেডির ব্যাপকতা বোঝা যায়। আর এ অঙ্কও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। এ মাসের শেষ দিকে জাতিসংঘের শরণার্র্থী কমিশনের কাজ চালিয়ে যেতে হলে আরো ৭০০ মিলিয়ন ক্রোনার প্রয়োজন পড়বে।

দুর্দশার মোজাইক ● এডওয়ার্ড কেনেডি
অক্টোবরে প্রকাশিত উইটনেস অব সিক্সটিজ-এ বাংলাদেশের যুদ্ধদিনের বন্ধু এডওয়ার্ড কেনেডির লেখা


ক্যাম্পে ভিড় করা রাশি রাশি শরণার্থীর কথা আমি শুনেছি। খোলা মাঠে কিংবা সরকারি ভবনের পেছনে, দিনের পর দিন সপ্তাহের পর সপ্তাহ মরিয়া হয়ে পা টেনে টেনে হেঁটে আসা মানুষ, কলকাতার রাস্তার অস্থায়ী আশ্রয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছে। তাদের চেহারা এবং তাদের কাহিনী লজ্জার দীর্ঘ চিত্র রচনা করে, যা পৃথিবীর সকল মানুষের নৈতিক সংবেদনশীলতাকে হতবাক করে রাখে। আমি দেখেছি, এক ক্যাম্প থেকে অন্য ক্যাম্পের অবস্থার মধ্যে ব্যাপক তারতম্য রয়েছে। কিন্তু অধিকাংশেরই বর্ণনা দেওয়া অসম্ভব। সরবরাহের অপর্যাপ্ততায় পয়ঃনিষ্কাশনের ভীতিকর অবস্থায় সেই শরণার্থীদের যারা কাশিতে ভুগছে, তারা শিশু—যাদের বয়স পাঁচ বছরের কম—এবং বয়োবৃদ্ধ। তারাই সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। এদের আনুমানিক সংখ্যা মোট শরণার্থীর প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ। এই শিশু ও বৃদ্ধের অনেকেই এর মধ্যে মৃত্যুবরণ করেছে। শরণার্থীদের মাঝখান দিয়ে হেঁটে গেলে, দেখে দেখে শনাক্ত করা সম্ভব, এক ঘণ্টার মধ্যে কারা মারা যাবে আর কাদের ভোগান্তি চিরতরে শেষ হওয়াটা কেবল কয়েক দিনের ব্যাপার মাত্র।

এই কঠিন ট্র্যাজেডি এখনো পৃথিবী বুঝে উঠতে পারেনি। আমি আপনাদের বলতে পারি, যতক্ষণ-না নিজ চোখে দেখছেন, এর বিশাল ব্যাপ্তি সম্পর্কে ধারণাও করতে পারবেন না। কেবল সেখানে গেলেই সেখানকার অনুভূতিটা আপনি আঁচ করতে পারবেন, মানুষের ভোগান্তি বুঝতে পারবেন, সহিংসতার যে শক্তি শরণার্থীর জন্ম দিচ্ছে এবং বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা বাড়িয়ে যাচ্ছে, তা অনুধাবন করতে পারবেন। ভারতে থাকাকালে পূর্ববাংলার সীমান্তজুড়ে ছড়ানো শরণার্থী এলাকাগুলো আমি ঘুরে দেখেছি; কলকাতা ও পশ্চিম বাংলার পশ্চিমে জলপাইগুড়ি পর্যন্ত, উত্তরে দার্জিলিং জেলা এবং পূর্বে ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলা ঘুরে এসেছি।

শিশুদের দিকে দেখুন, তাদের ছোট্ট হাড় থেকে আলগা হয়ে ভাঁজে ভাঁজে ঝুলে পড়া ত্বক, এমনকি তাদের মাথা তোলার শক্তিও নেই। শিশুদের পায়ের দিকে দেখুন, পা ও পায়ের পাতায় পানি নেমে ও অপুষ্টিতে ফুলে আছে। তাদের মায়ের হাতও নিস্তেজ। তাকিয়ে দেখুন, ভিটামিনের অভাবে শিশুরা অন্ধ হয়ে যাচ্ছে কিংবা তাদের এমন ঘা, যা কখনো সেরে যাওয়ার নয়। শিশুদের মা-বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে দেখুন, তাঁদের সন্তান আর কখনো সুস্থ হয়ে উঠবে না, সেই হতাশা তাঁদের চোখে। আর সবচেয়ে বেশি কঠিন দৃশ্যটি দেখুন, গত রাতে যে শিশুটি মারা গেছে, তার মৃতদেহও এখানেই।

শরণার্থী ও এডওয়ার্ড কেনেডি 

ক্যাম্পের পর ক্যাম্পে গল্প একই। এমনিতেই ঠাঁই হয় না, এমন হাসপাতালে অবিরাম বাড়তে থাকা বেসামরিক মৃত্যু পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। এসব ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত মানুষকে তাদেরই সহশরণার্থীরা সীমান্তের ওপার থেকে বয়ে এনেছে। তারপরও সীমান্তবর্তী বহুসংখ্যক ভারতীয় বাড়িঘর পাকিস্তানি সেনাদের গোলার শিকার হয়েছে। এছাড়া অকথিতসংখ্যক আহত মানুষ, যাদের গোনা হয়নি, যাদের দেখাশোনার কেউ নেই, পূর্ববাংলার গ্রামীণ এলাকায় পড়ে আছে। আরো ট্র্যাজিক অভিজ্ঞতা হচ্ছে নিষ্পাপ ও অশিক্ষিত গ্রামবাসীর। কলকাতার উত্তরে বয়রা-বনগাঁও সড়কের ডজনখানেক নতুন শরণার্থীর সাক্ষাৎকার নিয়ে টুকরো টুকরো কাহিনীগুলো একত্র করে দুর্দশার মোজাইক তৈরি করা সম্ভব।

যেদিন আমরা এই ২০ মাইল সড়ক ঘুরি, সেদিন কমপক্ষে সাত হাজার শরণার্থী বয়রার কাছে নদী পেরিয়ে সীমান্তের পাড়ঘেঁষে স্রোতধারার মতো নেমে এসেছে। এদের প্রায় সবাই কৃষক, চাষী-মজুর। অধিকাংশই হিন্দু। ঢাকা জেলার দক্ষিণে খুলনা ও বরিশাল থেকে এসেছে। এসেছে গত শরতের সাইক্লোনে বিধ্বস্ত প্রান্তবর্তী জেলা থেকে।

সাধারণত পায়ে হেঁটে বহু দিন বহু রাতের এই দীর্ঘ পথচলায় শিশু ও বৃদ্ধরা ক্লান্ত। মানসিক আঘাতের সাক্ষ্য দিচ্ছে অনেকের চেহারা, রাস্তার পাশে লক্ষ্যহীনভাবে বসে আছে অথবা অজানা নিয়তির উদ্দেশে লক্ষ্যহীনভাবে হাঁটছে। তারা নৃশংসতার গল্প বলেছে, মানুষ জবাই করার গল্প বলেছে, লুট ও অগ্নিকাণ্ডের কথা বলেছে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের দোসরদের হাতে হয়রানি ও লাঞ্ছিত হওয়ার গল্প বলছে। বহু শিশু রাস্তায় মারা যাচ্ছে। তাদের মা-বাবা তাদের বাঁচাতে অনুনয় জানাচ্ছে, ভিক্ষা চাচ্ছে। বর্ষাকালের বৃষ্টি গ্রামের দিকের সবকিছু ভিজিয়ে দিয়েছে। তাদের চেহারায় যোগ হয়েছে আরো বিষণ্ণতা ও হতাশা। সেদিন আমরা যারা বাইরে বের হয়েছিলাম, আমাদের জন্য বৃষ্টি মানে বড়জোর কাপড় বদলের চেয়ে বেশি কিছু নয় কিন্তু এই মানুষগুলোর জন্য বৃষ্টির মানে আরো একটি রাত বিশ্রাম, খাদ্য ও আশ্রয়বিহীন কাটিয়ে দেওয়া। যে শিশুটির কোমর থেকে নিচ পর্যন্ত পক্ষাঘাতগ্রস্ত, আর কখনো হাঁটতে পারবে না, কিংবা যে শিশুটি তার চোখের সামনে মা, বাবা, ভাই ও বোনদের হত্যা করতে দেখেছে, ছোট তাঁবুতে মাদুরে বসে ভয়ে কাঁপছে; আমরা পৌঁছানোর কয়েক মুহূর্ত আগে তার সেই ভাইটির মৃত্যু হয়েছে—এই শিশুদের চেহারা মন থেকে মুছে ফেলা খুব কঠিন কাজ। আমি যখন একজন শরণার্থী শিবিরের পরিচালককে জিজ্ঞেস করলাম, তাঁর সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজনটি কী? জবাব এলো, “একটি শব-চুল্লি।” পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ একটি ক্যাম্পের তিনি পরিচালক। নিম্ন ও মধ্য-আয়ের মানুষের আবাসনের জন্য এ জায়গা ঠিক করা হচ্ছিল, এটি এখন এক লাখ ৭০ হাজার শরণার্থীর বাড়ি।

পূর্ববাংলার ট্র্যাজেডি কেবল পাকিস্তানের জন্য ট্র্যাজেডি নয়, এটা কেবল ভারতের জন্য ট্র্যাজেডি নয়, এটা সমগ্র বিশ্বের জন্যই ট্র্যাজেডি।

লা ইউনিটা
নভেম্বর: পাকিস্তানি জনগণের ট্র্যাজেডির প্রতীক শেখ মুজিব [সম্পাদকীয়]


সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী সামরিক নেতৃত্বের হাতে কারাবন্দী শেখ মুজিবুর রহমানের নিয়তি যেন পাকিস্তানি জনগণের ট্র্যাজেডির প্রতীক। পূর্ব পাকিস্তানে জান্ত্যব নির্যাতনের সবচেয়ে বড় বলি তিনি। আতঙ্কিত মানুষের ভারতে পালিয়ে যাওয়া, অবিশ্বাস্য সংখ্যক মানুষের দেশত্যাগ—সবকিছুর পরও রাজনৈতিক সমাধানের প্রথম পদক্ষেপই হতে হবে আওয়ামী লীগের নেতার মুক্তি।

পশ্চিম পাকিস্তানের সামন্ত চরিত্র পূর্ব পাকিস্তানকে নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। এটুকু বলাই যথেষ্ট, পূর্ব পাকিস্তানের শ্রমিক ও কৃষকদের অবস্থা গোটা পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে করুণ এবং তারা সবচেয়ে পশ্চাৎপদ। ১৯৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়েছে। আর এর জবাবে ইয়াহিয়া খানের কাছে সবচেয়ে সুবিধাজনক মনে হলো আওয়ামী লীগকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আখ্যা দিয়ে অভিযুক্ত করা, নির্বাচনের ফলাফল বাতিল করে দেওয়া, দেশের পূর্বাংশের সামরিক আঘাত হানা এবং শেখ মুজিসবহ আওয়ামী লীগের নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের গ্রেপ্তার করা।

সত্য ঘটনা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ পাকিস্তান রাষ্ট্রের ঐক্য ও অখণ্ডতা রেখেই স্বায়ত্তশাসনের কর্মসূচির ভিত্তিতেই নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছে। শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিশ্রুতি ছয় দফা কর্মসূচি হিসেবে পরিচিত।

এ অবস্থায় রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যেসব বড় ধরনের প্রশ্নের সুরাহা স্বায়ত্তশাসন ও ফেডারেল কাঠামোতে এখনো হয়নি, সেসব এড়িয়ে পাকিস্তানে শান্তি ও গণতন্ত্র রক্ষা এবং শক্তিশালী করার কাজটি কেমন করে হবে, তা কে বলবে।

ভারত-সোভিয়েত ২০ বছর মেয়াদি বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার চুক্তির যৌথ স্মারকে যে রাজনৈতিক সমাধানের কথা বলা হয়েছে তা যথার্থ, প্রয়োজনীয় এবং জরুরি। আর যথাসময়ে তা করতে হলে যেসব রাষ্ট্র ও ব্যক্তি শান্তি ভালোবাসে এবং শান্তি চায়, তাদের অপরিহার্য করণীয় হচ্ছে, আওয়ামী লীগের নেতা ফ্যাসিবাদবিরোধী বীর শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির জন্য সোচ্চার হওয়া এবং মুক্তি আদায় করা।

বিবিসি
ডিসেম্বর: ১৬ ডিসেম্বর প্রচারিত সংবাদ


পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধ শেষ হয়ে আসছে। রেডিও পাকিস্তান জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি হয়েছে এবং ভারতীয় বাহিনী রাজধানী ঢাকায় প্রবেশ করেছে। পাকিস্তান বলেছে, স্থানীয় ভারতীয় ও পাকিস্তানি কমান্ডারদের মধ্যে চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি করা হয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস গান্ধী সংসদে বলেছেন, দু পক্ষের প্রতিনিধি ঢাকায় আত্মসমর্পণ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। পাকিস্তানের পক্ষে এই চুক্তি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ। তিনি বলেন, ভারত আশা করে, পূর্ব পাকিস্তানিদের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান, যিনি পাকিস্তানে আটক রয়েছেন, নিজ দেশের মানুষের মধ্যে তাঁর আসন গ্রহণ করবেন এবং বাংলাদেশকে শান্তির পথে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। মিসেস গান্ধী বলেন, ভারতীয় বাহিনী প্রয়োজনের অতিরিক্ত সময় সেখানে অবস্থান করবে না। তিনি আরো যোগ করেন, লাখ লাখ শরণার্থী ইতিমধ্যেই দেশের পথে পা বাড়িয়েছে।

১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ প্রকাশিত লি লেসাজের প্রতিবেদনটির একাংশ
ঢাকা ১৬ ডিসেম্বর। আজ ভারতীয় বাহিনী যখন ঢাকায় প্রবেশ করল তখন হাজার হাজার বাঙালির কণ্ঠে সানন্দ জয়ধ্বনি: ‘জয় বাংলা’। মেজর জেনারেল গান্ধর্ভ সিং নাগরার কমান্ডের অধীন ভারতীয় সৈন্য ও পূর্ব পাকিস্তানের গেরিলা বাহিনী (অর্থাৎ বাংলাদেশের গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা) যখন খুব ভোরে ঢাকার বাইরে একটি সেতু অকেজো করতে আক্রমণ চালাল, তখনই শুনতে পেল এখানকার পাকিস্তানি কমান্ড আত্মসমর্পণ করতে ভারতের দেওয়া শর্ত ও সময়সীমা মেনে নিয়েছে।

বেশ কয়েক ঘণ্টা ঢাকার রাস্তায় সশস্ত্র পাকিস্তানি সৈন্য সংখ্যা ভারতীয় সৈন্যের চেয়ে অনেক বেশি; কোথাও কোথাও বিক্ষিপ্ত গোলাগুলি হয়েছে। বেশ কজন ভারতীয় ও পাকিস্তানি সৈন্য নিহত হয়। তাদের মধ্যে একজন ভারতীয় অফিসার নিহত হন ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের সামনে।

মুক্তিবাহিনীর সদস্য ও পূর্ব পাকিস্তান লিবারেশন আর্মির লোকজন জনতার সাথে মিশে উৎসবমুখর জনতার অংশ হয়ে গেছে, আকাশে রাইফেলের গুলি ছুঁড়েছে।
পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল জে এফ আর জ্যাকব জেনারেল নাগরা ৯৫ মাউন্টেইন ব্রিগেডের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার এইচ এস ক্লেরকে রেড ক্রসের ঘোষিত নিরপেক্ষ অঞ্চল ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে পাঠালেন সেখানে আশ্রয় নেওয়া বিদেশি ও পূর্ব পাকিস্তানের সাবেক বেসামরিক সরকারের সদস্যদের রক্ষা করতে।

রাস্তা দিয়ে এগোবার সময় ব্রিগেডিয়ার ক্লের-এর গাড়ি বাঙালিরা বারবার ঘিরে ধরে। এক পর্যায়ে তারা গাড়ির ড্রাইভারকে টেনে বের করতে চেষ্টা করলে ক্লের নিজেই গাড়ি থেকে নেমে আসেন। বাঙালিরা তাকে ঘিরে ফেলে। একজন এক গোছা গাদাফুল তাঁর হাতে তুলে দেয়। বাঙালিরা চিৎকার করে তাকে ধন্যবাদ জানায়। নাগরা বললেন, “সারা পথ আনন্দ আর করতালির মধ্য দিয়ে আমাদের আসতে হয়েছে, ময়মনসিংহে উৎফুল্ল জনতা আমার পোষাক থেকে ব্যাজ ও প্যাচ খুলে নিয়ে যায়।”

জ্যাকব বললেন, “আমি আশা করি সবকিছু শান্তিপূর্ণ ও শান্ত। আমরা নিশ্চয়তা দিয়েছি সৈন্য ও পশ্চিম পাকিস্তানিদের আমরা রক্ষা করব; আমরা মনে করি তা অবশ্যই পালন করব।”

প্রায় ৮ জন বাঙালি জ্যাকবকে অভিনন্দন জানাতে এয়ারপোর্ট গেট থেকে রানওয়ের দিকে ছুটে আসে। একের পর এক তার কাছে এগিয়ে এসে বলতে থাকে, “আমি কি আপনার সাথে করমর্দন করতে পারি?” পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দিকে ইঙ্গিত করে একজন বলল, “গত ৯ মাস এরা আমাদের ইঁদুরের মতো হত্যা করেছে।”

আত্মসমর্পণ ও ভারতীয় সৈন্যের উপস্থিতি হঠাৎ করেই ঘটল। কয়েকটি বিবর্ণ সকাল কেটে যাবার পর মনে হলো আত্মসমর্পণের পরিকল্পনাটি প্রণীত হয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানে কারণ প্রবল যুদ্ধ এবং নতুন করে বিমান আক্রমণ বোমা বর্ষণ ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ ডেকে আনবে এবং ঢাকায় বহুসংখ্যক মানুষের মৃত্যু ঘটবে।

আত্মসমর্পণের পূর্বমুহূর্তে: নিয়াজি ও অরোরা
পূর্ব পাকিস্তানি সামরিক সদর দফতরে তড়িঘড়ি করে ডাকা এক সভায় মেজর জেনারেল ফরমান আলী খান, যিনি জেনারেল নিয়াজির পক্ষে যুদ্ধবিরতি সমঝোতার চেষ্টা করছেন, তিনি জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের কথা জানান। জাতিসংঘের বেতার ব্যবস্থায় বার্তাটি সকাল ৯টা ২০ মিনিটে দিল্লি পাঠানো হয়। আর দশ মিনিটের মধ্যে পুনরায় বোমাবর্ষণ শুরু হয়ে যাবার কথা। আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণের ঘটনা ঘটে বিকাল ৫টায় (ইস্টার্ন স্ট্যান্ডার্ড টাইম সকাল ৬টা) রেসকোর্স ময়দানে চারদিকে আনন্দিত গুলিবর্ষণ ও উল্লসিত চিৎকারের মধ্য দিয়ে।

বাসভর্তি ভারতীয় সৈন্যদের থামিয়ে বাঙালিরা ধন্যবাদ দিচ্ছে, আর ২৫ মার্চের পর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য পাকিস্তান সেনাবাহিনী যে নির্মম কর্মকাণ্ড চালিয়েছে—তখন থেকে লুকিয়ে রাখা বাংলাদেশের পতাকা বের করে আবার উড়িয়ে দিচ্ছে। [সমাপ্ত]

ওমিক্রণে থমকে গেছে বইমেলার আয়োজন



সজিব তুষার, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

এবারও থমকে গেছে লেখক পাঠকের প্রাণের আসর অমর একুশে বইমেলা প্রাঙ্গণ। তুমুল উৎসাহ আর ব্যাপক উদ্দীপনা নিয়ে কাজ শুরু হলেও কোভিড- ১৯ এর ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট আতঙ্ক থামিয়ে দিয়েছে কাজ। একটা বড় অংশের কাঠামো তৈরি হয়ে গেলেও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে আছে গর্ত আর স্তূপ স্তূপ বাঁশ।

বরাবরের মত এ বছরেও ১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়ার কথা অমর একুশে বইমেলা-২০২২। সে অনুযায়ী, কাজ শুরু করে দিয়েছিলো আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি। প্রায় শেষ হয়ে এসেছিলো প্রকাশনী গুলোর রেজিস্ট্রেশন ও লটারি পূর্ববর্তী কার্যক্রম। কাজ চলার মাঝেই বাঁধ সাধে বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯ নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

গত ১৬ জানুয়ারি সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ গণমাধ্যমকে জানান, 'করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে আপাতত দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত করা হয়েছে বইমেলা। মেলার পূর্ণ প্রস্তুতি রয়েছে বাংলা একাডেমির। সংক্রমণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকেই শুরু করা যেতো বইমেলা'। 

সরকারের এই ঘোষণার পর থমকে গেছে পুরো উদ্যমে শুরু হওয়া মেলার স্টল তৈরির কাজ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়ে দেখা যায়, স্টল তৈরির জন্য মাঠে কাঠামোর বেশ খানিকটা তৈরি হয়ে আছে। জায়গায় জায়গায় পুঁতে রাখা রয়েছে বাঁশ। কিন্তু কাজ করতে দেখা যায়নি কোনও শ্রমিককে।

এবারের বই মেলায় প্রথম বই প্রকাশ হবে এমন এক তরুণ লেখক বায়েজিদ হোসেন বলেন, 'ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা আমাদের রক্তে গেঁথে গেছে। বৈশ্বিক মহামারী করোনার তোপে পণ্ড হয় গতবারের মেলাও। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো রাস্তায় বসে যাবে। এমন চলতে থাকলে খুব দ্রুতই অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হবেন তারা। এখন পর্যন্ত যেটুকু টিকে আছে সেটা নষ্ট করে ফেললে; শিল্প সংস্কৃতির আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না'।

যথোপযুক্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে বইমেলা সঠিক সময়ে শুরু করার পক্ষে কথা বলেন তিনি।

বাঁশ দিয়ে বইমেলা স্টলের কাঠামো নির্মাণের পর থেমে আছে কাজ।ছবি: বার্তা২৪.কম

প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গ্রন্থিক'র প্রকাশক রাজ্জাক রুবেল বলেন, 'গতবারের মেলার অভিজ্ঞতার পর এবছর আর রিস্ক নেব বলে মনে হচ্ছে না। সম্ভব হলে জমা দেওয়া টাকাটা ফেরত আনার ব্যবস্থা করবো'।

স্টলের রেজিস্ট্রেশন ও অন্যান্য বাবদ খরচের কথা উল্লেখ করে বলেন, 'দুটা স্টলের জন্য জমা দিতে হয়েছে আগের থেকেও বেশি। ডেকোরেশন খরচ। স্টলের লোকের খরচ। তাদের এমন সিদ্ধান্তে আমি কোনভাবেই লস আটকাতে পারবো না'।

এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমিতে গেলে কেউ কিছু বলতে পারেন নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মচারী জানান, "মহাপরিচালক- প্রকাশক ও সংশ্লিষ্টদের সাথে মিটিং করে সিদ্ধান্ত জানানো পর্যন্ত কেউ কিছু বলতে পারবো না"।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে থেকে তোলা বইমেলার প্রস্তুতিকালীন কাজের একাংশের ছবি। ছবি- বার্তা২৪.কম

 

এর আগে বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ও বাংলা একাডেমির পরিচালক জালাল আহমেদ গণমাধ্যমকে জানান, স্বাস্থ্যবিধি মেনে পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকেই নেওয়া হচ্ছে বইমেলা শুরুর প্রস্তুতি। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত বছরও মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে দেড় মাস পিছিয়ে ১৮ মার্চ থেকে শুরু হয় অমর একুশে বইমেলা। আবার নির্ধারিত সময়ের দুদিন আগে ১২ এপ্রিলই টানে ইতি। সম্প্রতি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সরকার। তবে দু'সপ্তাহ পিছিয়ে দিলে আদতে বই মেলা হবে কি না এ নিয়ে সন্দিহান অনেকেই। বইমেলা মানেই হাজার মানুষের ভিড়। লেখক পাঠকের সমারোহ। তবে একের পর এক মেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকলে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গুলো মেলা করবে কি না তা নিয়েও শঙ্কায় আছেন সচেতন মহল।

স্বাস্থ্যবিধি মেনেই মেলা হোক চান বড় একটা অংশের নেটিজানরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে বেশ আলোচনাও তুলছেন তারা।


উল্লেখ্য, মুক্তধারা প্রকাশনীর মালিক চিত্তরঞ্জন সাহা বাংলা একাডেমির গেইটে ১৯৭২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে চট বিছিয়ে শুরু করেন বই বিক্রি। ১৯৭৭ সালে তার সঙ্গে যোগ দেন আরও অনেকে। ১৯৭৮ সালে এ বইমেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয় বাংলা একাডেমিকে। তখন মহাপরিচালক ছিলেন আশরাফ সিদ্দিকী। পরের বছরই বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি যুক্ত হয় মেলার সঙ্গে।

মনজুরে মওলা বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্বে থাকার সময় ১৯৮৩ সালে 'অমর একুশে গ্রন্থমেলা' নামে এ মেলা আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও তা আর করা যায়নি। পরের বছর বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণে আসর বসে 'অমর একুশে বইমেলা'র। ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি জুড়ে কাগজের বইয়ের মুহুর্মুহু গন্ধ মাখা বইমেলাই যেন দর্শনার্থীদের মনে করিয়ে দেয় ভাষা সংগ্রামের কথা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকার জ্যাম ঠেলেও ফেব্রুয়ারিতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাণের গন্তব্য হয়ে দাঁড়ায় ভাষা ও বইপ্রেমী মানুষের কাছে। সবাই চায় বইমেলা ফিরে পাক তার আগের জৌলুশ। বইয়ের সাথে ভবিষ্যত প্রজন্মের এই মিল বন্ধনের পুণ্যভূমি বেঁচে থাকুক সব অশুভ ছায়া থেকে।

;

অন্বেষণ মানে তো খোঁজ, এই খোঁজ হল আত্ম-অন্বেষণ...



সুবর্ণা মোর্শেদা, চিত্রশিল্পী
সুবর্ণা মোর্শেদা

সুবর্ণা মোর্শেদা

  • Font increase
  • Font Decrease

নিজেকে খোঁজার যে তাগিদ, আমার মধ্যে সেটা সবসময়ই কাজ করে। এই তাগিদ থেকেই আমার কাজের শুরু বলা যেতে পারে। সবসময় মনে হয়, নিজেকে খোঁজার চেয়ে কঠিন কিছু নাই। গত দুই বছরে সেই খোঁজার তাগিদ আরো তীব্র হয়ে উঠেছে। এই সময়ে অন্যদের সঙ্গে যখন কথা বলেছি, তার মাঝেও নিজেকেই খোঁজার চেষ্টা চলতো। লকডাউনের বেশ আগে থেকেই নিজেকে অনেক বেশি আইসোলেশনে নিয়ে যাই আমি—একটা নিরঙ্কুশ একাকীত্বের মধ্যে চলে আত্ম-অনুসন্ধানের কাজ। সো, লকডাউন আমার জন্য খুব নতুন কিছু ছিলো না। শুধু বাবা-মায়ের সঙ্গে নতুন করে থাকাটা ছিলো একেবারে নতুন।


২০১৯-এর একটা সময় আমি খুব অন্ধকারে ডুবে যাই। স্বভাবগত দিক থেকে রঙিন মানুষ হয়েও একটা গভীর ব্যক্তিগত কারণে আমার জীবন হয়ে পড়ে সম্পূর্ণ সাদা-কালো। আর এ সময়টাতেই নিভৃতে অনেকগুলো কাজ করে ফেলি। কখনো লিথোগ্রাফ, কখনো পেন্সিল স্কেচ আর কাগজে সেলাই করে করা এ-কাজগুলোই আমাকে সেই গভীর অন্ধকারেও বেঁচে থাকার প্রেরণা যুগিয়েছে। কাগজে সেলাই করে শিল্পকর্ম নির্মাণের একটা আলাদা আনন্দ আছে। সেটা হলো স্পর্শের আনন্দ।


এই স্পর্শকে কেমন করে দেখাবো! সেলাইয়ের উঁচু-নিচু অংশগুলোকে আমি বলি স্পর্শের প্রতীক। এর মধ্য দিয়ে স্পর্শের অনুভূতিকে অন্যের মনে সঞ্চার করা যায়। বড় হওয়ার পর, জীবনে এই প্রথম আমি মায়ের সাথে বাবার সাথে এতো দীর্ঘ সময় আমি কাটানোর অবকাশ পেয়েছি। আমার মায়ের গাছ লাগানোর শখ অনেক আগে থেকেই। সেই শখ লকডাউনে আরো তীব্র হলো।

তাঁর লাগানো গাছগুলো যতো বড় হচ্ছিলো, আর তাঁর বয়স যেন ততোই কমছিলো। গাছে ফল ধরা, ফুল ধরা দেখে তাঁর কী যে এক আনন্দ! সব মিলে যেন এক অপার্থিব অনুভূতি! তো, আমি তাঁকে একজন সফল চাষী হিসেবে ঘোষণা করলাম। দীর্ঘদিন ধরে আমি গন্ধ, স্পর্শ নিয়ে কাজ করি। এবার মায়ের গন্ধের সঙ্গে যোগ হলো মায়ের বাগানের গন্ধ-স্পর্শ।


গাছগুলোর পাতা যখন ঝরে পড়ে, সে-পাতার রং, শেইপকে আমার কাজের সঙ্গে সংযুক্ত করা আর স্পর্শগুলোকে ধরার জন্যই আমার কাগজে সেলাই করার কাজ। আমার ঘুমের সমস্যা আছে। রাতে ঘুম হয় না বা হতো না সেই অন্ধকার সময়গুলোতে। ঘুম না হওয়ার কারণে যে সকালে খারাপ লাগতো তা-ও না। সকালের গন্ধ আমার খুব প্রিয়।


এরমধ্যেই হলো মায়ের করোনা। দীর্ঘ ১ মাস ধরে মায়ের সিরিয়াস কন্ডিশন । আমি বুঝতে পারতাম, গাছগুলোও মাকে খুব মিস করছে। এদিকে মা তো হসপিটালে অক্সিজেন নিতে ব্যস্ত! ২৪ ঘন্টাই মায়ের সঙ্গে থাকি। তাঁর অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমে যাওয়া-- কখনও ভালো, কখনও মন্দ। অবশেষে মায়ের জয়ী হয়ে ঘরে ফেরা। তাঁর সঙ্গে আবার তাঁর গাছেদের সেই নিবিড় সম্পর্ক--গভীর বন্ধুত্ব!

পুরো সময়টাই যেন কবিতার মত, প্রেমের কবিতা! আমার সাদা-কালো ক্যানভাসে ছড়িয়ে দেওয়া রঙের মত! অন্ধকারে অপরূপ আলোর মত। আমার ছবিগুলো যেন জীবনের মত! আমার জীবন যেন আমার ছবির মতো!

সকলকে আমন্ত্রণ!


চিত্রকর্ম প্রদর্শনী: ‘অন্বেষণ’
শিল্পী: সুবর্ণা মোর্শেদা (তৃতীয় একক প্রদর্শনী)
স্থান: ইএমকে সেন্টার
প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন: অধ্যাপক জামাল আহমেদ, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, তাওহিদা শিরোপা।
মাধ্যম: লিথোগ্রাফ, সায়ানোটাইপ, পেন্সিল স্কেচ, জলরংসহ বিভিন্ন মাধ্যম
সংখ্যা: মোট ৪২টি শিল্পকর্ম
চলবে: ১৫-৩০ জানুয়ারি
শো কিউরেটর: রেজাউর রহমান

;

কল্পনা ও ইতিহাসের ট্রাজিক নায়িকা আনারকলি



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

আনারকলির নাম উচ্চারিত হলে উত্তর-পশ্চিম ভারতের আবহে এক করুণ-মায়াবী প্রেমকাহিনী সবার মনে নাড়া দেয়। ইতিহাস ও কল্পকথায় আবর্তিত এই রহস্যময়ী নতর্কীর পাশাপাশি শাহজাদা সেলিম তথা সম্রাট জাহাঙ্গীর, সম্রাট আকবর, সম্রাজ্ঞী যোধা বাঈ চোখের সামনে উপস্থিত হন। ভেসে আসে পরামক্রশালী মুঘল আমলের অভিজাত রাজদরবার ও হেরেম। ব্রিটিশ ঔপনিবেশ-পূর্ব উপমহাদেশের ঐতিহ্য, সমৃদ্ধি, সাংস্কৃতিক দ্যুতি, বহুত্ববাদী পরিচিতির রাজকীয় অতীত এসে শিহরিত করে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলোর নাগরিকদের। 

১৫২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ১৮৫৭ সালে অস্তমিত ৩৩১ বছরের বিশ্ববিশ্রুত মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে বহু সম্রাট, শাহজাদা, শাহজাদীর নাম বীরত্বে ও বেদনায় লিপিবদ্ধ রয়েছে। কিন্তু আনারকলির নাম বিশ্বস্ত ঐতিহাসিক বিবরণের কোথাও লেখা নেই, যদিও মুঘল হেরেমের এই রহস্যময়ী নারীর নাম আজ পর্যন্ত শিল্প-সাহিত্য-চলচ্চিত্র ও লোকশ্রুতিতে প্রবাহিত হচ্ছে। সম্রাজ্ঞী, শাহজাদী কিংবা কোনও পদাধিকারী না হয়েও মুঘল সংস্কৃতির পরতে পরতে মিশে থাকা কে এই নারী, আনারকলি, যিনি শত শত বছর ধরে মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হচ্ছেন, এমন জিজ্ঞাসা অনেকেরই। ইতিহাসে না থাকলেও শিল্প, সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে চিত্রিত হচ্ছেন তিনি অকল্পনীয় জনপ্রিয়তায়। ইতিহাস ও মিথের মিশেলে তাকে নিয়ে আখ্যান ও কল্পকথার কমতি নেই। তার নামে প্রতিষ্ঠিতি হয়েছে মাজার, সমাধি স্মৃতিসৌধ, প্রাচীন বাজার, মহিলাদের পোষাকের নান্দনিক ডিজাইন। ইতিহাসের রহস্যঘেরা এই নারীকে নিয়ে নির্মিত হয়েছে ইতিহাস সৃষ্টিকারী চলচ্চিত্র ‘মুঘল-ই-আজম’। রচিত হয়েছে অসংখ্য গ্রন্থ ও গবেষণা।

যদিও বাংলা ভাষায় আনারকলিকে নিয়ে আদৌ কোনও গ্রন্থ রচিত হয়নি, তথাপি উর্দু সাহিত্যে তাকে নিয়ে রয়েছে একাধিক নাটক ও উপন্যাস। ইংরেজিতে রয়েছে বহু গ্রন্থ। বিশেষত উর্দু ভাষার বলয় বলতে উত্তর ও পশ্চিম ভারতের যে বিশাল এলাকা পূর্বের বিহার থেকে পশ্চিমে পাঞ্জাব পর্যন্ত প্রসারিত, সেখানে আনারকলি একটি অতি পরিচিত ও চর্চিত নাম। সাহিত্যে ও লোকশ্রুতিতে তিনি এখনও জীবন্ত। অবিভক্ত পাঞ্জাবের রাজধানী লাহোরে রয়েছে আনারকলি মাকবারা। মাকবারা হলো কবরগাহ, সমাধিসৌধ। মুঘল স্মৃতিধন্য শহর দিল্লি, লাহোরে আছে আনারকলি বাজার। সাহিত্য ও লোককথার মতোই আনারকলিকে নিয়ে নির্মিত নানা লিখিত ও অলিখিত উপাখ্যান। 

অথচ মুঘল রাজদরবার স্বীকৃত ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থগুলোর কোথাও উল্লেখিত হন নি আনারকলি। প্রায়-প্রত্যেক মুঘল রাজপুরুষ লিখিত আকারে অনেক স্মৃতি ও ঐতিহাসিক বিবরণ লিপিবদ্ধ রাখলেও তার নাম আসে নি কোনও মুঘলের আত্মস্মৃতি বা ইতিহাস গ্রন্থে। তাহলে কেবলমাত্র একটি কাল্পনিক চরিত্র হিসেবে তার নাম অর্ধ-সহস্র বছর ধরে লোকমুখে প্রচারিত হলো কেন এবং কেমন করে? সত্যিই আনারকলি বলে কেউ না থাকতেন কেমন করে সম্ভব হলো পাঁচ শতাধিক বছর ধরে নামটি টিকে থাকা? এসব খুবই বিস্ময়কর বিষয় এবং আশ্চর্যজনক ঐতিহাসিক প্রশ্ন।

ভারতবর্ষে মুঘল ইতিহাসের এক রহস্যময় নারী চরিত্র রূপে আনারকলিকে নিয়ে আগে বহু চর্চা হলেও সবচেয়ে সফল ও ব্যাপকভাবে তিনি চিত্রিত হয়েছেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের কেন্দ্রস্থল বলিউডের ইতিহাস সৃষ্টিকারী সেরা জনপ্রিয় ও ব্যবসা সফল ছবি ‘মুঘল-ই-আজম’-এ। ছবির কাহিনী মুঘল-ই-আজম তথা শাহানশাহ জালালউদ্দিন মোহাম্মদ আকবরের দরবারে আবর্তিত। আকবরপুত্র শাহজাদা সেলিম, যিনি পরবর্তীতে হবেন সম্রাট জাহাঙ্গীর, মুঘল দরবারের এক নবাগত নর্তকী আনারকলির প্রেমে বিভোর। দীর্ঘ ছবিটি সেলিম-আনারকলির প্রণয়ের রোমান্টিকতায় ভরপুর। কিন্তু সম্রাট আকবর সেই ভালোবাসা মেনে নিতে নারাজ। প্রচণ্ড ক্রোধে আকবর আনারকলিকে শাহজাদার জীবন থেকে সরিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হন নি, সম্রাটপুত্রকে ভালোবাসার অপরাধে তুচ্ছ নর্তকী আনারকলিকে জীবন্ত কবরস্থ করেন। 

প্রশ্ন হলো, সত্যিই যদি আনারকলি নামে কোনও চরিত্র না-ই থাকবে, তাহলে এতো কাহিনীর উৎপত্তি হলো কেমন করে? সাহিত্যে ও চলচ্চিত্রে আনারকলিকে কেন্দ্র করে যা বলা হয়েছে বা দেখানো হয়েছে, তার সত্যতা কতটুকু? সত্যিই কি আনারকলিকে জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছিল? নাকি আনারকলি বলে ইতিহাসে কোনও চরিত্রই ছিল না? নাকি সব কিছুই লোকমুখে ছড়িয়ে পড়া কোনও মিথ, উপকথা বা গল্প? এসব প্রশ্নের উত্তর শত শত বছরেও মেলে নি।

আনারকলি যদি ‘কাল্পনিক’ হবেন, তাহলে, মুঘল আমলে ভারতে আগত ইংরেজ পরিব্রাজকের বর্ণনায়, লখনৌর লেখকের উপন্যাসে, লাহোরের নাট্যকারের নাটকে, বলিউডের একাধিক সিনেমায় আনারকলি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হবেন কেন? কেন শত শত বছর কোটি কোটি মানুষ আনারকলির নাম ও করুণ ঘটনায় অশ্রুসিক্ত হচ্ছেন? কেন আনারকলির নামে ভারতের প্রাচীন শহরগুলোতে থাকবে ঐতিহাসিক বাজার? লাহোরে পাওয়া যাবে তার কবরগাহ, যেখানে শেষ বয়সে শাহজাদা সেলিম তথা সম্রাট জাহাঙ্গীর হাজির হয়ে নির্মাণ করবেন সমাধিসৌধ আর রচনা করবেন করুণ প্রেমের কবিতা?

এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের জন্যে ‘কিছুটা ঐতিহাসিক, কিছুটা কাল্পনিক চরিত্র আনারকলি’ ও তাকে ঘিরে প্রবহমান প্রাসঙ্গিক ঘটনাবলীর ঐতিহাসিক পর্যালোচনা ভিত্তিক এই রচনা। আমার রচিত ‘দারাশিকোহ: মুঘল ইতিহাসের ট্র্যাজিক হিরো’ (প্রকাশক: স্টুডেন্ট ওয়েজ) গ্রন্থটি পাঠকপ্রিয়তা লাভ করায় মুঘল মূল-ইতিহাসের বাইরের এই রহস্যময়ী চরিত্র ও আখ্যানকে বাংলাভাষী পাঠকের সামনে উপস্থাপনে উৎসাহী হয়েছি। উর্দু ও ইংরেজিতে আনারকলির ঘটনাবলী ও প্রাসঙ্গিক ইতিহাস নিয়ে বহু লেখালেখি হয়েছে। যেগুলো থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছি। আনারকলির প্রসঙ্গে তাকে নিয়ে নির্মিত অবিস্মরণীয় চলচ্চিত্র ‘মুঘল-ই-আজম’ সম্পর্কেও আলোকপাত করেছি। চেষ্টা করেছি ইতিহাস ও মিথের মধ্যে লুকিয়ে থাকা মুঘল হেরেমের রহস্যময়ী নতর্কী ও বিয়োগান্ত প্রেমের নায়িকা আনারকলিকে অনুসন্ধানের।

;

সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় করোনায় আক্রান্ত



আন্তর্জাতিক ডেস্ক, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। মঙ্গলবার (১১ জানুয়ারি) তাঁর কোভিড–১৯ পরীক্ষায় পজিটিভ আসে। বতর্মানে তিনি নিজ বাড়িতেই আইসোলেশনে আছেন।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, বইমেলার উদ্বোধনের জন্য গত ২ জানুয়ারি মালদহ গিয়েছিলেন শীর্ষেন্দু। সেই বইমেলা স্থগিত হয়ে যায়। মালদহ থেকে বাড়ি ফিরে আসার পর তাঁর সর্দি, কাশি এবং শারীরিক দুর্বলতা দেখা দেয়। সন্দেহ হলে সোমবার তিনি নমুনা পরীক্ষা করান। মঙ্গলবার কোভিড–১৯ পরীক্ষায় পজিটিভ আসে। এ খবর তিনি নিজেই জানিয়েছেন।

লেখক বলেন, ‘জ্বর আসেনি কখনও। উপসর্গ হিসেবে ক্লান্তি, দুর্বলতার সঙ্গে স্বাদহীনতা রয়েছে।

;