স্বপ্ন ছুঁয়েছে’ পদ্মার এপার-ওপার

নতুন বছর পড়ুন গত বছরের বিভিন্ন পুরস্কার পাওয়া বই



আহমেদ দীন রুমি, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট
নতুন বছরের পাঠ-তালিকায় রাখুন পুরস্কারপ্রাপ্ত বই

নতুন বছরের পাঠ-তালিকায় রাখুন পুরস্কারপ্রাপ্ত বই

  • Font increase
  • Font Decrease

হাল আমলের সবচেয়ে জনপ্রিয় সাহিত্যিক আর. আর. মার্টিন বলেছিলেন, “একজন পাঠক তার মৃত্যুর আগে হাজারটা জীবন যাপন করে।” কথাটা যে মিথ্যা না তা কেবল সত্যিকার পাঠকই জানেন। আর তাই বই সামনে নেবার আগেই সতর্ক হতে হয় পাঠককে, কোন জীবনটা সে যাপন করতে যাচ্ছে। নতুন বছর। গৃহিণীর সংসার থেকে সংসদ সদস্যের দিনপঞ্জি—সবকিছুতে চলছে পরিকল্পনার তোড়জোর। নতুন বছরে লাভ-ক্ষতির সমীকরণ মেলাতে শুরু করেছে সবাই। বইপ্রেমীদের অনেকেই লিস্ট করছে আসছে বছর কোন কোন বই পড়া যায়। ইতোমধ্যে ছোট-বড় একটা লিস্ট করেও ফেলেছে কেউ কেউ। সেই লিস্টে যদি ২০১৯ সালের নোবেল বা পুলিৎজার পুরস্কার পাওয়া বইটি যোগ হয়; তাহলে বোধ হয় মন্দ হয় না।

গোটা ২০১৯ সাল জুড়ে অনেক বই বিভিন্ন শাখায় খ্যাতি অর্জন করেছে। জিতে নিয়েছে এক বা একাধিক পুরস্কার। বর্তমানে আলোচিত কিছু পুরস্কার পাওয়া ফিকশন বইকে পরিচয় করিয়ে দেবার জন্য আজকের প্রচেষ্টা।

কোস্টা বুক এওয়ার্ডস
কোস্টা বুক এওয়ার্ডসকে যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং সমাদৃত এওয়ার্ড বলে গণ্য করা হয়। পুরস্কার পায় শুধু যুক্তরাজ্য আর আয়ারল্যান্ডের লেখকেরা। পাঁচটা ভিন্ন ভিন্ন ক্যাটাগরির মধ্যে আছে—প্রথম উপন্যাস, উপন্যাস, জীবনী, কবিতা এবং শিশুতোষ। নির্বাচিত পাঁচের মধ্যে থেকে আবার একটিকে নির্বাচন করা হয় বছরের সেরা বই হিসাবে। এবছর পুরস্কার পেয়েছে The Cut out Girl: A Story of War and Family, Lost and Found।

উঠে এসেছে যুদ্ধ, সমাজ আর ইতিহাসের উপাদান 

রচয়িতা বার্ট ভান এস-এর কলমে উঠে আসা ইহুদি তরুণীর দুর্দান্ত গল্প বইটি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হল্যান্ডে অবস্থান করা সেই তরুণী নাৎসি বাহিনীর হাত থেকে বাঁচতে আত্মগোপন করে। তারপর এগিয়ে চলে নাটকীয়তা। ২০১৯ সালের ২৯ জানুয়ারি গ্রন্থটিকে কোস্টা বুক অব দ্য ইয়ার ঘোষণা করা হয়।

এন্ড্রু কার্নেগি মেডেল
পুরস্কারের নাম এন্ড্রু কার্নেগি মেডেলস্ ফর এক্সিলেন্স ইন ফিকশন এন্ড ননফিকশন। শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত আগের বছরের বই এই পুরস্কারের জন্য মনোনীত হতে পারে। এওয়ার্ড প্রদান করে আমেরিকান লাইব্রেরি এসোসিয়েশন আর তদারকি করে পেশাদার পর্যবেক্ষকের টিম। ২০১৯ সালে পুরস্কার গলায় তুলেছে রেবেকা মাক্কাই-এর The Great Believers।

প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার আখ্যান এ বইটি 

১৯৮৫ সালে শিকাগো আর্ট গ্যালারির পরিচালক ইয়েল টিসম্যানকে নিয়ে এগিয়ে গেছে গল্প। অবিশ্বাস্য সব আর্টের সংগ্রহ ছিল তার কাছে। ঠিক যে সময়টাতে ক্যারিয়ারে প্রোজ্জ্বল হতে শুরু করেছে; তখনই চারপাশে বেড়ে যায় এইডসের প্রকোপ। কাছে শুধু টিকে থাকে বন্ধু নিকোর ছোট্ট বোন। বইটি পুরস্কৃত হয় ২৭ জানুয়ারি।

অডি এওয়ার্ডস
অডিও পাবলিশার্স এসোসিয়েশন (APA) উদ্যোগে দেওয়া হয় অডি এওয়ার্ড। আধুনিক সময়ে অডিওবুক অন্যতম জনপ্রিয় একটি মাধ্যম হিসাবে দেখা দিয়েছে। সেদিকে লক্ষ্য রেখেই প্রায় ২৯টি ক্যাটাগরিতে পুরস্কার প্রদান করা হয় অডি এওয়ার্ডস। ২০১৯ সালে Children of Blood and Bone বইটি মনোনীত হয়। টমি আদিয়েমির রচনাটি পাঠ করেছেন বাহনি টারপিন।

জাদু আর সামাজিক অবস্থা উঠে এসেছে যুগপৎভাবে 

কেন্দ্রিয় চরিত্র জেলিয়ে আদেবোলা এবং উড়িষ্যার মাটিতে এক জাদুময় পটভূমিতে বিস্তৃত হয়েছে আখ্যান। অনেকটা কাল্পনিক হলেও সামাজিক ও রাজনৈতিক আলোচনার ছায়া পাওয়া যায়। মার্চ মাসের ৪ তারিখ বইটি নির্বাচিত হয় অডি এওয়ার্ডের জন্য। 

ন্যাশনাল বুক ক্রিটিকস্ সার্কেল এওয়ার্ডস
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরো একটি সম্মানজনক পুরস্কারের নাম ন্যাশনাল বুক ক্রিটিকস্ সার্কেল এওয়ার্ড। সাহিত্যের ভিন্ন ছয়টি শাখায় এই পুরস্কার প্রদান করা হয়ে থাকে—আত্মজীবনী, জীবনী, সমালোচনা, ফিকশন, নন-ফিকশন এবং কবিতা। অবশ্য সাম্প্রতিক সময়ে লেখকের প্রথম বইকেও এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ২০১৯ সালে ফিকশন ক্যাটাগরিতে পুরস্কার জিতে নেয় Milkman।

মিল্কম্যান-বইয়ের প্রচ্ছদ 

অ্যানা বার্নসের লেখা এই উপন্যাসের পটভূমি নির্মিত হয়েছে কৌতূলোদ্দীপক এবং ভয়ানক এক বেনামা শহরে। কেন্দ্রীয় চরিত্রে নারী; যার রহস্যজনক পদক্ষেপগুলো পাঠককে বুঁদ করে রাখবে শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত। বইটি নির্বাচিত হয় ১৪ মার্চ।

এডগার এওয়ার্ড
আমেরিকার রহস্য উপন্যাস লেখকদের জন্য প্রদত্ত সম্মানিত পুরস্কার এডগার এওয়ার্ড। দেওয়া হয় সেরা রহস্য উপন্যাস, নন-ফিকশন এবং টেলিভিশনের জন্য। ২০১৯ সালে সেই পুরস্কার জিতে নেয় ওয়াল্টার মোজলের Down the River Unto the Sea। জো কিং অলিভার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দা। কিন্তু জটিলতার মধ্য দিয়ে সরকারি গোয়েন্দা বিভাগ থেকে প্রাইভেট ডিটেকটিভে পরিণত হন।

রহস্য উপন্যাস হিসাবে জিতে নেয় পুরস্কার 

টিন-এজ মেয়ের সাহায্যে চালু করেন এক এজেন্সি। এরমধ্যে এক ভদ্রমহিলা কেস পাঠায়; যাতে জো নিজেই জড়িত ছিল একসময়। এক রহস্যময় জটিল পরিস্থিতিতে এগিয়ে চলে কেস। বইটি পুরস্কার পায় ২০১৯ সালের ২৫ এপ্রিল। 

পুলিৎজার প্রাইজ
সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন, অনলাইন সাংবাদিকতা, সাহিত্য, সংগীতের জন্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেওয়া হয় পুলিৎজার পুরস্কার। বিশ্বব্যাপী নোবেল আর বুকার পুরস্কারের পরেই সমাদৃত পুলিৎজার। রিচার্ড পাওয়ার্স-এর The Overstory নির্বাচিত হয় ২০২৯ সালের প্রতিযোগিতায়।

বইটি পুলিৎজার পুরস্কার পায় সেরা ফিকশন ক্যাটাগরিতে

আমাদের পৃথিবীর সাথেই আরেকটা পৃথিবী আছে—বৃহৎ, মন্থর, সম্পদশালী এবং প্রায়ই আমাদের কাছে অদৃশ্য। মূলত গল্পটা রচিত হয়েছে সৃজনশীল মানুষগুলো এবং তাদের পৃথক পৃথিবী নিয়ে। ২৫ এপ্রিল পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। 

বেস্ট ট্রান্সলেটেড বুক এওয়ার্ডস
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অনেক লেখাই শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ডে এগিয়ে যায়। আফ্রিকা, এশিয়া কিংবা ইউরোপের সেই সব সেরা লেখাকে ইংরেজিতে নেবার প্রয়াসেই আয়োজিত হয়েছে বেস্ট ট্রান্সলেটেড বুক এওয়ার্ডস। বিভিন্ন ভাষার উপন্যাস এবং কবিতা যুক্তরাষ্ট্র থেকে অনূদিত হলেই তা মনোনয়ন পেতে পারে। এই দফায় নির্বাচিত হয় প্যাট্রিক চামোইসিওর Slave Old Man। বস্তুত এটি অনূদিত হয়েছে ফরাসি ঔপন্যাসিক লিন্ডা কাভারডালের লেখা ‘ক্রিওলে’ থেকে।

মূল বইটি লেখা হয়েছে ফরাসি ভাষায় 

আখ্যানের পটভূমি নির্মিত হয়েছে এক বৃদ্ধ দাসের ভয়ানক পলায়ন প্রচেষ্টাকে কেন্দ্র করে। মালিক আর তার বিভৎস সব হাউন্ডগুলোকে ফাঁকি দিয়ে দাসের নেওয়া প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল রোমাঞ্চকর। বইতে দাস ব্যবসার নির্মম দিকগুলোর সাথে সাথে সেই জীবনকে চিত্রিত করা হয়েছে দারুণ প্রাঞ্জলতা নিয়ে। শ্রেষ্ঠ হিসাবে বইটির নাম ঘোষিত হয় ৩১ মে।

স্টোকার এওয়ার্ড
ভূতে মানুষের অবিশ্বাস থাকাতেও ভূতের গল্প ভালোবাসে। সে কারণেই গড়ে উঠেছে হরর জনরা। ডার্ক ফ্যান্টাসি এবং হরর উপন্যাসের জন্য দেওয়া হয় স্টোকার এওয়ার্ড। পুরস্কার প্রদান করে হরর রাইটার্স এসোসিয়েশন। গেল বছর তা হাতিয়ে নিয়েছে পল ট্রেমলের ‘দ্য কেবিন এট দ্য এন্ড অব দ্য ওয়ার্ল্ড’। এক বিকেলে উঠানে ঘাসফড়িং ধরার সময় ওয়েন এক আগন্তুকের মুখোমুখি হয়।

বইটি হরর জনরায় এক নতুন মাইলফলক

আস্তে আস্তে আরো তিনজন অপরিচিত আসে এবং ওয়েনকে উঠিয়ে নিতে যায়। তাদের দাবি, পৃথিবীকে রক্ষা করার জন্য ওয়েনকে প্রয়োজন। এক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি ফেলে দিয়ে শুরু হয়েছে গল্প; যা ধরে রেখেছে শেষ পৃষ্ঠা অব্দি। ১১ মে বইটিকে সেরা হিসাবে নির্বাচিত করে স্টোকার বোর্ড। 


আরো পড়ুন ➥ ২০১৯ সালে প্রকাশিত সেরা নন-ফিকশন বইগুলো

সংশপ্তক শেখ হাসিনা



আবদুল হামিদ মাহবুব
আবদুল হামিদ মাহবুব

আবদুল হামিদ মাহবুব

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সংশপ্তক শেখ হাসিনা

কাণ্ড অনেক করে

পদ্মা বুকে ‘পদ্মা সেতু’

ঠিক দিয়েছেন গড়ে।

 

কাণ্ড ওসব নয় সাধারণ,

ভুলতে কি আর পারি?

জয় বাংলা জোরসে হেঁকে

ঠিক তো দিলেন পাড়ি।

 

অপেক্ষাতে সবাই আছি

মনটা উচাটন

ওই দিনটা জানান দিয়ে

আসলো শুভক্ষণ!

 

বাংলাদেশের এমন জয়ে

বিশ্ব জানুক, কি সুখ?

সব বাঙালি বুকের পাতায়

সুখের গাথা লিখুক।

;

স্বপ্নের পদ্মা সেতু



রিঝুম ইতি
স্বপ্নের পদ্মা সেতু

স্বপ্নের পদ্মা সেতু

  • Font increase
  • Font Decrease

আমি জন্মেছি বাংলায়-

গর্বিত আমি,
শেখ হাসিনার মহিমায়।
পেয়েছি আমি,
স্বপ্নের পদ্মা সেতু।
একদিন যেটা,
স্বপ্নই ছিলো শুধু।
আজ, পদ্মাসেতুর প্রয়োজন -
বুঝবে সেই,
ভুক্তভুগী যেজন।
মাঝরাতে-
বেড়েছিলো মায়ের অসুখ।
ফেরিঘাটে-
গুণেছি শুধু প্রহর।
অবশেষে -
পারিনি মাকে বাঁচাতে,
পেরেছো কি দায় এড়াতে?
অভাবের সংসার-
একটা চাকরি,খুব দরকার।
একদিন-
ডাক পড়লো আমার,
ইন্টারভিউ দেবার।
পড়লাম এসে-
ফেরিঘাটের জ্যামে,
স্বপ্ন নষ্ট-
কিছু সময়ের দামে।
বাংলাদেশে-
হয়নি কোন চাকরি,
ভেবেছি তাই-
বিদেশ দেবো পাড়ি।
ভিটেমাটি সব বেঁচে,
সব টাকা যোগাড় করে।
রওনা দিলাম ভোরে,
চারপাশের-
কুয়াশা ঘিরে ধরে।
ফেরি চলাচল বন্ধ,
হারালো,জীবনের ছন্দ।
সারা বছর-
হাড়ভাংগা পরিশ্রমে,
জন্মাই ফসল-বাংলার মাটির বুকে।
পাইনা ভালো দাম,
এই কি তবে-
আমার ঘামের দাম।
শহরে আমি-
সবজি বেঁঁচবো দামে,
কিন্তু-
ঘাটে সবজি যাবে পঁচে।
শুধু-
পাইনি সুবিধা আমি,
পেয়েছে আরো-
তিন কোটি বাঙালি।
হাজারো-
ব্যর্থতার গল্প,
এভাবেই-
রচনা হতো।
হয়েছে স্বপ্ন পূরণ,
পদ্ম সেতুর দরুণ।

লেখক-রিঝুম ইতি, অনার্স- ১ম বর্ষ, প্রাণীবিদ্যা, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ

;

সত্য-মিথ্যার মাঝখানে!



ড. মাহফুজ পারভেজ
প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

  • Font increase
  • Font Decrease

১.

ভিক্ষুকের ছদ্মবেশে ইউলিসিস প্রবেশ করেছিলেন নিজেরই প্রাসাদে, ইথাকায়। ইথাকা সাধারণত ইতিহাসে চিহ্নিত হয় হোমারের ইথাকা নামে। ওডিসিয়াস-এর বাড়ি। যে দ্বীপটিতে বিলম্বিত প্রত্যাবর্তন ঘিরে ক্লাসিকাল গ্রিক গল্প 'ওডিসি' আবর্তিত।

প্রত্নতাত্ত্বিককাল থেকেই ইথাকাকে পৌরাণিক বীরের বাড়ি হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। ওডিসি'তে হোমার ইথাকাকে এভাবে বর্ণনা করেন:

"পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ইথাকাতে বাস করুন, সেখানে এক পাহাড়, নেরিটন। বনের সাথে বসতি। অনেকগুলো দ্বীপের একটি। কাঠবাদাম জ্যাসিয়েন্টসকে ঘিরে রেখেছে। ইথাকা নিজেই মূল ভূখন্ডের কাছাকাছি ঘেঁষার দিকে খুব আগ্রহী। অন্যরা ভোর ও সূর্যের দিকে পৃথক হয়ে পড়েছে। কিন্তু অতিপ্রাকৃত দ্বীপ ইথাকা যুবকদের জন্য একজন ভাল নার্সের মতো প্রণোদন জাগ্রতকারী। "

২.

ইথাকায় ইউলিসিসের ফিরে আসার মধ্যে পেরিয়ে গিয়েছিল কুড়ি বছর। এতই প্রাচীন তাঁর অনুপস্থিতি যে, স্ত্রী পেনেলোপির একাধিক প্রণয়প্রার্থী তাঁরই প্রাসাদে এসে জড়ো হয়েছে, বসবাস করছে এই আশায় যে, হয়তো এবার পেনেলোপি-কে পাওয়া যাবে।

পেনেলোপি প্রথমে অপেক্ষায় ছিলেন, স্বামী ফিরবেন। তাই তাঁর প্রণয়াকাঙ্ক্ষীদের দূরে রাখতেন এক চতুর ছলনায়। সকলকে বলতেন, তিনি ইউলিসিসের পিতা লেয়ার্তেসের জন্য একটি শবাচ্ছাদনবস্ত্র বুনছেন, বোনা শেষ হলেই সাড়া দেবেন মনোমতো এক ভালবাসার আবেদনে। কিন্তু সে-বোনা অনন্তকাল ধরে যেন চলতে থাকল, চলতেই থাকল। আসলে, সকালের বুনন রাতে বিনষ্ট করে ফেলতেন তিনি।

ইউলিসিস ফিরবেন, সময় ক্রয় করে চলেছেন পেনেলোপি তাই। এটাই ছিল সত্য। আর সব মিথ্যা।

অবশেষে একটা সময় এমন এল, যখন সমস্ত আশা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ল। দু’দশক পেরিয়ে গেল যে। ইউলিসিস সম্ভবত আর ফিরবেন না, তাঁদের পুত্র টেলেম্যাকাস-ও বড় হয়ে গিয়েছে। এবার তা হলে পেনেলোপি অন্য পুরুষের কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে পারেন।

এমনই এক ক্ষণে ফিরে এলেন ইউলিসিস। তবে, ভিক্ষুকের ছদ্মবেশে। তারপর যখন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে স্বয়ম্বরসভা, তখন দেখা গেল, এই ভিক্ষুকই হলেন সেরা পাণিপ্রার্থী পেনেলোপির। স্বপরিচয়ে প্রত্যাবর্তন এবার তাঁর। একে একে হত্যা করলেন স্ত্রী-র সকল পাণিপ্রার্থীকে। তিনিই তো অধিকর্তা, প্রমাণ করতে হবে তাঁকে। প্রমাণ করলেনও তিনি।

৩.

লুইজ় গ্লিক-এর 'মেডোল্যান্ডস' কবিতাগ্রন্থে ইউলিসিস-পেনেলোপির যে-মিথ, তার ভেতর এক গাঢ় অন্তরঙ্গতা আছে। 'গাঢ়' শব্দটা বললে নিমেষে মাথায় আসে বাংলা ভাষার সেই কবিকে, শহরের পথহাঁটা যাঁকে স্মরণ করিয়ে দিত, ‘বেবিলনে একা একা এমনই হেঁটেছি আমি রাতের ভিতর’।

বস্তুত, অনুভব বা বোধ গাঢ় না-হলে স্মৃতি অবাধ বিচরণ করতে পারে না। জীবনের স্মৃতি প্রস্তরীভূত হতে পারে না কালাতিক্রমী কল্পস্মৃতির সঙ্গে। যেমনভাবে, শরীরের শত প্রলোভন থাকা সত্ত্বেও মন মিশতে পারে না মনের সঙ্গে।

কারো কারো কবিতাভাষায় প্রচ্ছন্ন রয়েছে সেই গাঢ় অনুভব, যে-কারণে কবিতা আর জীবন পাশাপাশি বসবাস করতে পারে। পুরাণকাহিনিকণা আর বাস্তবের খণ্ডাংশ একাকার হতে পারে। পৌরাণিক আখ্যান পেরিয়ে সামনে এসে দাঁড়াতে পারেন একজন ইউলিসিস। একজন পেনেলোপি নব-নির্মাণে উত্থিত হতে পারেন। কালান্তরের দাগ মুছে আমাদের কালের নারী-পুরুষে পরিণত হতে পারেন তাঁরা।

৪.

বাস্তবের জীবনে ছুঁয়ে যাওয়া পৌরাণিক ভাষ্যের অপর নাম 'মিথ'। আদিতে যা গ্রিক শব্দ 'mythos' থেকে উদ্ভূত।  শব্দটি হোমারের বিভিন্ন কাজে প্রচুর দেখা গেছে। এমন কি হোমার যুগের কবিরাও এই শব্দটির ব্যাপক ব্যবহার করেছেন তাদের সাহিত্য কর্মে।

মূলগত অর্থে 'mythos' শব্দটি সত্য অথবা মিথ্যার মাঝে পার্থক্য বোঝাতে প্রয়োগ করা হয়। David Wiles এর মতে, প্রাচীন গ্রিসে শব্দটি বিপুল তাৎপর্য বহন করতো। এটি ব্যবহার করা হত মিথ্যাচারমূলক ধর্মীয় বা সামাজিক ব্যাপারগুলোকে উপস্থাপন করার সময়।

আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, মিথ নিজেই এখন সত্য ও মিথ্যার মাঝখান থেকে জীবনের বাস্তবে রূপান্তরিত হয়েছে। 'এটা ছিল' বা 'এটা হতে পারতো' ধরনের বহু মিথ প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে সত্যের চেয়ে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ অবয়বে। কিংবা মিথ প্রতিষ্ঠিত করতে দাঙ্গা, হাঙ্গামা, হত্যাকাণ্ড ও রক্তপাতের বন্যা বইছে। একদা মিথ্যাচারমূলক ধর্মীয় বা সামাজিক ব্যাপারগুলোকে উপস্থাপন করতো যে মিথ, তা-ই এখন ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার মজবুত হাতিয়ারে পরিণত হয়ে হত্যা করছে মানুষ ও মানবতাকে।

৫.

সত্য আর মিথ্যার স্পষ্ট বিভাজনের পাশে মিথ দাঁড়িয়ে আছে অমীমাংসিত উপস্থিতিতে। কারো কাছে তা সত্য, কারো কাছে মিথ্যা, কারো কাছে অনির্ধারিত চরিত্রে। ব্যক্তি বা সামাজিক চর্চার বাইরে সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমেও সত্যের পাশাপাশি মিথ্যা ও মিথের বাড়বাড়ন্ত।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে মার্কিন দেশে সাংবাদিকতা বললেই 'ফেইক নিউজ' শব্দটি সামনে চলে আসতো৷ বিরুদ্ধে গেলে মিথ্যা বা ফেইক বলাটা এখন ক্ষমতাসীনদের ট্রেন্ড বা ট্রেডমার্ক৷

এদিকে, তথ্যের সুনামির মধ্যে কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তা আলাদা করা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে৷ এর পেছনে কার দায় সবচেয়ে বেশি, তা এক গভীর গবেষণার বিষয়।

প্রতিদিন সামাজিক মাধ্যমে ও সংবাদ প্রবাহে কতো কতো সংবাদ আসে৷ আজকাল সবচেয়ে জরুরি আর গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো ফেসবুকে পাওয়া যায় শেয়ার-কমেন্টের কারণে৷ কিন্তু  ধীরে ধীরে এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটছে। এখন সত্য, মিথ্যা বা মিথ ফেসবুক স্ট্যাটাস বা কমেন্টে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে না। সংবাদমাধ্যমও সঠিক তথ্য দেওয়ার চেয়ে কিভাবে প্রকাশ করলে ক্লিক আর শেয়ার বাড়বে, সেদিকে বেশি মনোযোগী৷

ফলে সত্য, মিথ্যা, মিথের ত্রিশঙ্কু পরিস্থিতি চারপাশে। আর মাঝখানে অসহায় মানুষের বিপন্ন অবস্থান।

পাদটীকা: ইউলিসিস আইরিশ লেখক জেমস জয়েস (জন্ম-২ ফেব্রুয়ারি ১৮৮২, মৃত্যু-১৩ জানুয়ারি ১৯৪১, বয়স ৫৮)-এর কালজয়ী সৃষ্টি। ১৯২২ সালে এই গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। অধিকাংশ সাহিত্য সমালোচক ইউলিসিস-কে ইংরেজি ভাষায় লিখিত বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ উপন্যাস বলে গণ্য করে থাকেন। ইউলিসিস-এর কাহিনী একটিমাত্র দিনকে ঘিরে। ১৯০৪ সালের ১৬ জুন। এই সাধারণ একটি দিনে এক সাধারণ নাগরিক লেওপোল্ড ব্লুম (Leopold Bloom) ডাবলিন শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত ঘুরে বেড়ান নানা কাজে। প্রাচীন গ্রিক কবি হোমার-এর রচিত মহাকাব্য ওডিসি-র সাথে উপন্যাসটির অনেক সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। ওডিসি কাব্যের বীর ইউলিসিস-এর নামেই উপন্যাসের নামকরণ। জয়েস-এর ভক্তরা ১৬ জুন দিনটিকে ব্লুম-দিবস (Bloomsday) হিসেবে পালন করে থাকেন। জয়েসের ইউলিসিস বিশাল এক গ্রন্থ। কোন কোন সংস্করনের দৈর্ঘ্য হাজার পৃষ্ঠার উপরে চলে গিয়েছে। বিগত আশি বছর ধরে সাহিত্য বিশারদরা বইটির চুলচেরা বিশ্লেষণ করে যাচ্ছেন। বইটি সাহিত্যাঙ্গণে অনেক বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে। বিংশ শতকের শুরুতে আধুনিকতাবাদ (modernism) নামে যে সাহিত্যধারার সৃষ্টি হয়, ইউলিসিস তার অতি উৎকৃষ্ট একটি উদাহরণ। বিরতিহীন চৈতন্যবর্ণনার (stream of consciousness) অনবদ্য প্রয়োগের জন্যে উপন্যাসটি যথার্থই বিখ্যাত। এ ছাড়াও জয়েস-এর অভিনব গদ্যশৈলী, গদ্য নিয়ে বিচিত্র সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা, কুশলী চরিত্রায়ন ও চমৎকার রসবোধ বইটিকে স্বতন্ত্রতা এনে দিয়েছে। তবে বইটি বেশ দুরূহপাঠ্য যে কারণে কেউ কেউ এর সমালোচনা করেছেন। ১৯৯৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত প্রকাশক মডার্ন লাইব্রেরি শতাব্দীর সেরা ১০০টি ইংরেজি উপন্যাসের তালিকা প্রনয়ন করে। ইউলিসিস তালিকার শীর্ষে স্থান পায়। ২০২২ সাল জেমস জয়েসের ইউলিসিস প্রকাশের শতবর্ষ।

ড. মাহফুজ পারভেজ,  প্রফেসর,  রাজনীতি বিজ্ঞান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম

;

সরদার ফজলুল করিমের 'আমি মানুষ'



মোহাম্মদ আলম চৌধুরী
সরদার ফজলুল করিমের 'আমি মানুষ'

সরদার ফজলুল করিমের 'আমি মানুষ'

  • Font increase
  • Font Decrease

[গ্রন্থালোচনা: সরদার ফজলুল করিম (২০০৯), ‘আমি মানুষ’, ঢাকা: কথাপ্রকাশ।]

সরদার ফজুলুল করিম (১৯২৫-২০১৪) আমার প্রিয় মানুষদের একজন। হৃদয়ের গভীরতম স্থানেই তাঁর আসন। কেন তাঁকে এতবেশি ভালোবাসি তাঁর সংক্ষিপ্ত কোন জবাব নেই। আসলে ভালোবাসার কারণ প্রকাশ দুঃসাধ্য।

বৈচিত্রময় জীবনের অধিকারী সরদার ফজুলল করিম একজন মানবতাবাদী দার্শনিক। তাঁর দর্শনের প্রধান উৎস ‘মানুষ’। জ্ঞান-কারবারী এ-মানুষটি আজীবন মানুষকে কেন্দ্রবিন্দু করেই জ্ঞানের কণা কুড়িয়েছেন আর বিলিয়েছেন। যতদিন এ ধরাভূমে ছিলেন ততদিন তিনি এ কাজ করেছেন। জীবনে যা কিছু ভেবেছেন, যা কিছু করেছেন তার সবই মানুষের জন্য। আজ তিনি নেই কিন্তু তাঁর রচনাবলি তাঁর পক্ষে এমনই সাক্ষ্য দেয়।

মানুষের রহস্যাবৃত জগতে তিনি মানুষকেই তালাশ করেছেন বিচিত্র উপায়ে। তাঁর স্পষ্টবাদিতা তো এমনই বলে। তাই মানুষের ভালো-মন্দ সব কিছুই তাঁকে ভাবিয়েছে। ইট-পাথুরের গাঁথুনির চেয়ে হৃদয়কেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।

মানুষই পাপ-পূণ্যের উৎসস্থল। মানুষই অপরাধী, মানুষই বিচারক, মানুষই পূণ্যবান আবার মানুষই পাপী। মানুষই দাতা আবার মানুষই ডাকাত। মানুষের জন্যই স্বর্গ আবার মানুষের জন্যই নরক। এভাবে বহু কথার অবতারণা করা যায়।  তবে সার-নির্যাসে এটুকু বলা যায় যে, ধরণীর সমস্ত কিছুই মানুষের জন্য মানুষ করেছে। মানুষই সৃষ্টি করে মানুষই ধ্বংস করে।  সত্যিই ‘মানুষই সব কিছুর মাপকাঠি’।

মানুষেই আস্থা রাখে মানুষ। মানুষেই আস্থা হারায় মানুষ। তাই তো গীত হয়, ‘...আস্থা হারানো এই মন নিয়ে আমি আজ/ তোমাদের কাছে এসে দু হাত পেতেছি’। ‘মানুষ, মানুষের জন্যে জীবন জীবনের জন্যে...’। মানুষই আবার মানুষের হাতে মারণাস্ত্র তুলে দেয় মানুষকে মারার জন্য। মানুষই আবার বানরের হাতে লাঠি তুলে দেয় মানুষকে আঘাতের জন্য।

সরদার ফজুলুল করিম তাঁর ৮৯ বছরের জীবনে পড়িয়েছেন ও  লিখেছেন। ভাষান্তর করেছেন। শক্ত কঠিন অন্যের রচনাকে মোলায়েম করে মাতৃভাষায় ভাষান্তর করেছেন। দূর গ্রিক দার্শনিকদের রচনাকে নিজভূমে সহজলভ্য ও প্রিয় করে তুলেছেন। কালজয়ী ত্রিপুরুষ- সক্রেটিস (খ্রি. পূ. ৪৭০-৩৯৯), প্লেটো (খ্রি. পূ. ৪২৮-৩৪৮) ও অ্যারিস্টটলকে (খ্রি. পূ. ৩৮৪-৩২২) এদেশের জ্ঞানপীঠে নাগরিকত্ব দিয়েছেন।  সরদার ফজলুল করিম  তাঁর কাজ সম্পন্ন করে গেছেন। আমরা কী করেছি তাঁর জন্যে?

ফিরে আসি মূল কথায়। তাঁর অসংখ্য রচনা থেকে ক্ষুদ্র পরিসরের ‘আমি মানুষ’ বইটি নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনার তাগিদ অনুভব থেকেই এ লেখা।

মানুষ কী? মানবকুলে জন্ম নিলেই কী মানুষ হওয়া যায়? তাহলে মানুষ হতে হলে কী লাগে? মনুষ্যাকৃতি থাকলেই কী মানুষ হয়? তাহলে মানুষের আকৃতি কী রকম? ইত্যাদি বিষয় নিয়ে প্রশ্নমালা দীর্ঘতর করা যায়।

দুনিয়ায় চিরকালীন নামজারি-করা অনেকেই এসব প্রশ্ন নিয়ে ভেবেছেন। মতামতও দিয়েছেন। আবার ভবিয়েছেন, ভাবাচ্ছেনও। এ কালের কুশীলব হিসেবে তিনিও তালাশ করেছেন এসব প্রশ্নের উত্তর।

‘ আমি মানুষ’ বইটি উৎসর্গ করেছেন ‘মানুষ’কে। ২০টি নাতিদীর্ঘ রচনা নিয়ে পুরো বইটি ৮০ পৃষ্ঠার। বইটির প্রথম রচনাও ‘আমি মানুষ’। ২০০৯ সালে ২১শে ফেব্রুয়ারিতে এটি প্রকাশিত হয়।

আলোচ্য বইটির রচনাগুলো ২০০১-২০০৪ এবং ২০০৮ সালে লিখিত। এর মধ্যে ২০০৩ সালে লিখিত হয়েছে ৭টি, ২০০৪ সালে ১০টি এবং ২০০১, ২০০২ ও ২০০৮ সালে ১টি করে রচনা লিখিত হয়েছে।

ক্ষুদ্রাকৃতির এ বইতে তিনি বেশ কিছু ভারী ও ওজনদার কথার অবতারণা করেছেন। আমাকে কথাগুলো বেশ ভাবাচ্ছে। তাই লেখনীর খরাকালেও কাগজ-কলম নিয়ে বসেছি।

বাংলাদেশ ও ভারতে মানুষকে কষ্ট দেওয়ার বুদ্ধিজীবী প্রদত্ত নাম ‘সাম্প্রদায়িকতা’। কারা এসব কুকর্মে জড়িত থাকে রাষ্ট্র সব জানে। কিন্তু রাষ্ট্র চুপ থাকে আর তখন একদল আরেক দলকে দোষারোপ করে। তখন শুরু করে ‘দোষারোপের রাজনীতি’। পৃথিবী এখন বড় ব্যস্ত। কে কাঁদে কার জন্যে? কিন্তু পোঁড়া ঘা দেখে মানুষ অতীতকে মনে করে নিজেই কেঁদে উঠে। এসব ঘটনা যখন মুষড়ে উঠে তখন সরদার ফজুলুল করিম বুকে ব্যথা অনুভব করে বলে আমাদের জানিয়েছেন।

‘...মানুষ মানুষকে পণ্য করে/ মানুষ মানুষকে জীবিকা করে...’ মানুষকে কেন্দ্র করেই পৃথিবীর সব শিল্প-কারখানা, বিধাতার স্বর্গ-নরক, রাষ্ট্রের কয়েদখানা, সুগন্ধি কারখানা, শরাব কারখানা। ধর্মশালায় প্রত্যেকে মানব-মানবীর স্বতন্ত্র পরিচয়- কেউ মুসলিম, কেউ ইহুদি, কেউ খ্রিস্টান, কেউ হিন্দু, কেউ শিখ, কেউ জৈন। আবার কেউ যদি এসব নিয়ে মাথা না ঘামালে সবাই মিলে তাকে ডাকে ‘নাস্তিক’।

বইটির নাম কেন যে তিনি ‘আমি মানুষ’ রেখেছেন তার একটি ফিরিস্তি দিয়েছেন। একদিন বাজার করতে গিয়ে  দোকানী একটি মেয়ের প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েই তিনি জবাব দিয়েছিলেন, ‘আমি মানুষ’। পরক্ষণেই  দোকানীর কন্ঠে শুনতে পান ‘...উনি মানুষ’(পৃ.১২)।

বইটিতে তাঁর প্রিয়জনদের লেখালেখি এবং তাঁদের চিন্তাধারা এবং তাঁর প্রতি তাঁদের আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশও রয়েছে। ৮৯ বছর বেঁচেও তাঁর মধ্যে আফসোসের শেষ ছিল না। তারাশঙ্করের নিতাইচরণের কন্ঠে বলেছেন, ‘জীবন ছোটো ক্যানে?’(পৃ.১৪)।

মায়া মানুষের সহজাত। প্রাচীন গ্রিক দর্শন ও দার্শনিকদের প্রতি তাঁর প্রবল আগ্রহ ছিল। আড়াই হাজার বয়সী বুড়ো সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টটলের সাথেই ছিল তাঁর আলাপচারিতা, জ্ঞান-কারবার ও দহরম-মহরম। অন্তিম মুহূর্তেও উতলে উঠেছে অ্যারিস্টটলের প্রতি তাঁর ভালোবাসা। এ্যারিস্টটলের ‘পলিটিক্স’-এর গায়ের ধুলো আমার গায়ের জামা দিয়েই মুছলাম। পরিষ্কার করলাম।...আমি এর এক অন্ধভক্ত। আমি জানি এর যে কোন পাতাটিই স্বর্ণ কেন, হীরক খণ্ড' (পৃ. ১৭)।

আমৃত্যু জ্ঞানসাধক সরদার ফজুলুল করিম নিজেকে ‘বই-এর বলদ’ (পৃ. ২২) বলে পরিচয় দিতেন। বইয়ের সাথেই তাঁর হৃদ্যতা, বইয়ের সাথেই তাঁর সারা জীবনের কথোপকথন। বই কী? এ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘বই অবশ্যই লিখিত এবং মুদ্রিত, মানুষের এক মহৎ আবিষ্কার। ...যে বই পাঠ করা হয় না, সে বই, বই নয়। একটা হালকা বস্তু বটে। কেবল তাই নয়, যে বই পঠিত হয়, কিন্তু তার বিষয়বস্তু আলোচিত হয় না, তার বক্তব্য অনুসৃত হয় না, সে বইও বই নয়। বস্তু মাত্র’ (পৃ. ২২)।

বিজ্ঞান একই সাথে আশীর্বাদ ও অভিশাপ। বিজ্ঞানের অভিশাপ পর্যালোচনা করে তাঁর নিজের ভেতর হাহাকার উঠেছে। তিনি বলেছেন, ‘রোবট বানান, ক্ষতি নেই। কিন্তু আগে মানুষ বানান’ (পৃ. ২২)। মানুষ বিশ্বকে সৃষ্টি করেনি, কিন্তু বিশ্বকে ধ্বংসের ক্ষমতা রাখে। তাই বিজ্ঞান নিয়ে তাঁর দুঃশ্চিন্তা।

বাংলাদেশের রাজনীতির দুরারোগ্য একটি ব্যাধির সরকারি নাম হচ্ছে ‘হরতাল’। যে তালে হরহামেশা জানমালের ক্ষতি হয় আদতে তা-ই হরতাল। জীবনে বেতালের সৃষ্টি করে বলে বাংলাদেশের হরতাল নিয়ে তিনি স্মৃতিচারণ করেছেন। তাঁর দুঃখ হচ্ছে হরতালের দিনে তিনি বাসায় বন্দী থাকেন। ফলে মানুষের সাক্ষাৎ না পেলে তাঁর আর নিজেকে দেখা হয় না।

বাংলায় গ্রিকদর্শন মানেই সরদার ফজলুল করিমের অনুবাদের আশ্রয় গ্রহণ। এতো প্রাণবন্ত অনুবাদ- জ্ঞান তালাশকারীদের মনে বিস্ময়ের উদ্রেক সৃষ্টি করে। তাঁর বিপুল অনুবাদের মধ্যে ‘প্লেটোর সংলাপ’-ই যে প্রথম অনুবাদ করেছিলেন জেলখানায় বসে তা এ-বই পাঠে অবগত হলাম। তাঁর অনুবাদে মুগ্ধ হয়ে প্রফেসর মুজাফফর (ন্যাপ) বিস্মিত হয়েছিলেন। এ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘মুজাফফর নিজে ‘প্লেটোর সংলাপ’ আজিজ সুপার মার্কেট থেকে কিনে বেশ মনোযোগ দিয়ে পাঠ করেছে। ওঁর কেবল প্রশ্ন ছিল : সত্যই কি এই রকম একটা মানুষ ছিল? (পৃ. ৩১)।

প্রকৃতির প্রতি ছিল তাঁর নিখাদ প্রেম । আজকের প্রকৃতি বিনাশী কার্যক্রম তাঁকে ব্যথিত করে। সে কথা বেশ গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেছেন। সমুদ্রপ্রেমিক মানুষটি বলেন, ‘কক্সবাজারের সমুদ্রের পূর্ব কিংবা পশ্চিমের দিগন্তে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের ছবি আমার মনকে উদ্দীপিত করে’ (পৃ. ৩৫)।

মানুষের দানবিক আচরণের কিছু নমুনা তিনি দিয়েছেন। সেটি আমেরিকার দ্বারা ইরাকে হামলা হোক কিংবা অন্যদের দ্বারা আমেরিকায় হামলা হোক। এসব তাঁর মনোকষ্ট বৃদ্ধি করেছে। টুইন টাওয়ার ধ্বংস সম্পর্কে লিখেছেন, ‘এই হচ্ছে, আজকের, এই মুহূর্তের পৃথিবী। এটা কি মানুষের পৃথিবী?’ (পৃ. ৪২)।

জ্ঞানিক আলোচনায় ঋদ্ধ ক্ষৃদ্রাকৃতির বইটি সাহিত্য, দর্শন, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ-মনোবিদ্যাসহ জ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রকে স্পর্শ করেছে। এখানে তাঁর একান্ত কিছু কথাও রয়েছে। কিন্তু পাঠের পর পরক্ষণেই মনে হয়- এ তো আমাদেরই মনের কথা।

পুরো বইটিই ‘মানুষ’কে নিয়ে লিখিত হয়েছে। তবে, মানুষের তৈরি রাষ্ট্র প্রকৃতির বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ করে তারও বর্ণনা রয়েছে। সভ্যতা বিনাশকারী মানুষের ওপর ক্ষোভের উদ্গীরণ করেছেন। প্রাকৃতিক জলাধার ভরাট করে ইট-পাথরের গাঁথুনি- তাঁকে ব্যথিত করেছে। এমনকি, এদেশে অহরহ নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণ, আত্মহত্যা, নিপীড়ন আর অবিচারের ঘটনায় তাঁর মনের ক্ষোভের কথাও জানা যায়। ব্যক্তি, ব্যক্তিত্ব, মর্মযন্ত্রনা, স্বপ্ন আর দুঃস্বপ্রে বয়ানও এ-বইতে রয়েছে।

মানুষ হিসেবে বাঁচার মানুষের সংগ্রামের ইতিহাসও এ-গ্রন্থে পাওয়া যায়। বইটি যে কোন পাঠকের ভালো লাগবে। এ আশাবাদ নির্দ্ধিধায় করা যায়।

লেখক: প্রফেসর, রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

;