আত্মঘাতের আলো কিম্বা অন্ধকার



তানিয়া চক্রবর্তী
অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

  • Font increase
  • Font Decrease

মৃত্যুর কাছাকাছি থাকা মানুষের কাছে জীবন কিম্বা মৃত্যু কখনো কি দুটো সমার্থক হতে পারে? হয়তো পারে হয়তো পারা আর না পারার মুহূর্তকে জানতেই পারে না। জীবন কী, কতখানি একজন শিল্পী, দার্শনিক, কবি, অভিনেতা কিম্বা আরো যারা শিক্ষা ও বোধের যুগপৎ লালনে লালিত নিশ্চয় কিছুটা হলেও তার রূপের সান্নিধ্য পান। তবে আত্মহত্যা কেন হয়? কেন হয় প্রতিবছর পৃথিবীতে ১০ লক্ষেরও বেশি আত্মহত্যা? পরিসংখ্যান এও বলে মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের আত্মহত্যার সংখ্যা প্রায় চারগুণ বেশি। তাহলে এই আত্মহত্যা সত্যি কি খুব দোষের? সে নিয়ে বিভিন্ন মত আছে ধর্মীয়, দার্শনিক এবং বৈজ্ঞানিক। কিন্তু সে কথায় যাচ্ছি না। আসছি আত্মহত্যার কিছু বিশেষ মুহূর্তদের কথায়।

৩২ বছরে বিদায় বলে সমুদ্র ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তিনি এবং শেষ অবধি তাঁর দেহটিও পাওয়া যায়নি। তিনি সেই বিখ্যাত কবি হার্ট ক্রেন, যার দ্য ব্রিজ (১৯৩০), ওয়াইট বিল্ডিংসের মতো সৃষ্টি চেতনাকে ঝালাপালা করে দিতে সক্ষম। ২০১১ সালে বিশিষ্ট পরিচালক ও নির্দেশক জেমস ফ্র্যাঙ্কো তাঁকে নিয়ে একটি অপূর্ব ছবি করেন, ছবির নাম ‘দ্য ব্রোকেন টাওয়ার’ (তাঁরই কবিতার নামে)। কবিতায় মেটাফোরের ব্যবহার তাকে জটিল হলেও অতি উচ্চমানের রোমান্টিক কবি বলে গণ্য করেছে।

১৮৯৯ সালের ২১ জুলাই ওহিও’র গ্যরেটসভিলে তাঁর জন্ম। তাঁর ছোটবেলার অনেকটা সময় ঘুরেফিরে তাঁর দিদার বাড়িতে বড় হওয়া। সেই বাড়ির লাইব্রেরি ছিল তাঁর প্রাণ। সতের বছর বয়সে ঘর ছেড়েছিলেন নিজের শর্তে বাঁচবেন বলে। রবার্ট ব্রাউনিং, এমারসন—এদের পড়েই তার বড় হয়ে ওঠা; এছাড়াও প্লেটো, বালজাক, শেলি, ইয়েটস, এলিয়ট, জেমস জয়েস, বোদলেয়ায়র তাঁর অন্যতম প্রিয় ছিলেন।

১৯১৭-তে তাঁর বাবা-মার বিচ্ছেদ হলে তিনি মায়ের ছত্রছায়াকেই শান্তির জন্য বেছে নেন। বাবার সঙ্গে কর্মসূত্রে যেটুকু কথা হতো সেখানেও দ্বিমত ছিল। এক অদ্ভুত সিদ্ধান্তহীন জীবন তাঁকে ছেয়ে ধরেছিল। কখনো বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কাজ সেখানে তিতিবিরক্ত হয়ে অপ্রাসঙ্গিকভাবেই দাঙ্গায় জড়িয়ে পড়া, কখনো পুনরায় নিজেকে ফিরে পাওয়ার চেষ্টায় গ্রামে ফিরে শান্ত জীবন কাটানোর চেষ্টা করেন। তাঁর জীবনে এক সময়ে সম্ভবত ১৯২৪-এর কাছাকাছি সময়ে ইমিল অফারের আবির্ভাব হয় তারপর তাঁর লেখা ভয়েজেস কবিতাটি প্রকাশ্যে আসে ফলে এটিকে সেই সম্পর্কের অনুষঙ্গ হিসেবেই ভাবা হয়। এই সম্পর্কের অবনতিও খুব শীঘ্র হয়। তার কিছুকাল পরে মায়ের সঙ্গেও দ্বন্দ্বের জায়গা বাড়তে শুরু করে ক্রেনের।

বিশেষ ফেলোশিপের স্বীকৃতির কারণে ১৯৩২ সালে তিনি ছিলেন সেই মুহূর্তে মেক্সিকোয়, সঙ্গে তাঁর তৎকালীন প্রেমিকা পেগি কোলে। এই সমসাময়িক মুহূর্তে তার সবচেয়ে জনপ্রিয়, বিতর্কিত কবিতা ‘দ্য ব্রোকেন টাওয়ার’-এর প্রকাশ। এই সম্পর্ক, এই মুহূর্ত তাঁর জীবনের একটা অদ্ভুত সন্ধিক্ষণ। পেগি কোলে নিজে ছিলেন চিত্রশিল্পী। তাঁর দ্বিতীয় স্বামী আমেরিকান লেখক ও সম্পাদক ম্যালকম কোলে ছিলেন হার্ট ক্রেনের বন্ধু। ১৯৩১ সালে তাঁর এবং পেগির বিবাহবিচ্ছেদের সময় থেকেই হার্ট ক্রেনের জীবনে পেগি আসেন। এর আগে অবধি হার্ট ক্রেনের সম্পর্কে এটাই প্রচলিত ছিল যে তিনি সমকামী হতে পারেন কারণ এর আগে এক নাবিকের সঙ্গে প্রেম এবং নিজের জীবন, এছাড়াও জাহাজের মধ্যে এক পুরুষ সদস্যের সঙ্গে তাঁর যৌন আচরণের জন্য তাঁকে আঘাত পেতে হয়।


আরো পড়ুন ➥ বনভোজনের আহ্লাদ


ফলত পেগির সঙ্গে তার এই সম্পর্ক তাঁকে অন্য দৃষ্টিভঙ্গির সামনে দাঁড় করায়। এই প্রেমের সময় ক্রেন তার এক বন্ধুকে চিঠিতে লিখছেন, “আমার জীবনে যা সব অপূর্ব অত্যাশ্চর্য জিনিস হচ্ছে তার জন্য পেগি দায়ী।” কিছু সময় পরে এই সম্পর্ক তাঁর অজান্তেই ক্ষয়ের দিকে যাচ্ছিল তখন ক্রেন লিখছেন, “আমি পেগিকে খুব বাজেভাবেই ভুল বুঝছি এবং ভুল প্রত্যাশা করছি ওর থেকে।”

যেদিন তিনি মেক্সিকোর সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়েছিলেন সেটি ছিল মেক্সিকো থেকে নিউইয়র্ক যাওয়ার জাহাজ, সঙ্গে সম্ভবত পেগিও ছিলেন, মদ্যপান করেছিলেন কিন্তু হঠাৎ করে “গুডবাই এভরিবডি” বলে তিনি যে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়বেন কেউ তা কল্পনাও করতে পারেনি। দিনটি ছিল ২৭ এপ্রিল, এর কিছুদিন আগেই ‘দ্য ব্রোকেন টাওয়ার’ লিখেছেন; এই কবিতাটি পড়লে প্রেমের জীবনের দ্বন্দ্বের এক চূড়ান্ত প্রহেলিকা এসে তাড়না দিতে থাকে—যারা পাঠ করবেন বুঝবেন। জীবনের কোনো মুহূর্ত কিভাবে প্রতিভাত হলে জীবনের সবচেয়ে স্থিতিশীল সময়ে প্রেমিকার সংস্পর্শে থাকা এক চূড়ান্ত রোমান্টিক কবি বিদায় বলে সমুদ্রে হারিয়ে যেতে পারেন!

এই সম্পর্কের মধ্যে সবচেয়ে ভালো মুহূর্তে তারই ভাষ্যতে তিনি থেকেছিলেন অথচ কিভাবে যেন ক্ষয়েই যাচ্ছিলেন। এর পর প্রায় ত্রিশ বছর কেটে যায় পেগি অন্য সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন কিন্তু তিনি নিজে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন ‘দ্য লাস্ট ডে অফ ক্রেন’ নামে। পেগির মৃত্যু হয় অবশ্য ক্যানসারে। আর দেহহীন ভরপুর প্রেমের এক কবি তাঁর বাবার সমাধির কাছে স্মৃতিচিহ্ন হয়ে অমর হয়ে গেলেন—হ্যারল্ড হার্ট ক্রেন!

The matrix of the heart, lift down the eye
That shrines the quiet lake and swells a tower
The commodious, Tall decorum of the sky
Unseals her earth, and lifts love in its shower.

(“THE BROKEN TOWER”-এর শেষ স্তবক)