একটি শরাবি গজলের তরজমা ও তাফসির



রূপান্তর সৈয়দ তারিক
অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

  • Font increase
  • Font Decrease

গজল গীতিকবিতার একটি ধারা। আদিতে আরবি কবিতার একটি রূপকল্প এটি। সপ্তম শতক থেকে আরবি ভাষায় এটি রচিত হতে থাকে। পরবর্তীতে অন্যান্য ভাষাতেও এই রূপকল্পটি গৃহীত হয়। ভারতবর্ষে হজরত আমির খসরু এটির প্রচলন ঘটান। প্রেমের সৌন্দর্য, বিরহ-বেদনা, আনন্দ এইসব সাধারণত এর বিষয়।

জনপ্রিয় একধারার গজলকে শরাবি গজল বলে। এসবের কেন্দ্রীয় বিষয় শরাব বা মদ। পঙ্কজ উদাস এই ধরনের গজলের রাজা। এইরকম গান বিস্তর করেছেন তিনি। একটি গজল ‘লা পিলা দে সাকিয়া’—তে তিনি গাইছেন:

মদ ঢালো, সাকি, বোতলের পর বোতল,
মদ খেয়ে হুঁশ ফিরলে আলাপ হবে,
আরো মদ ঢালো, সাকি।

আর একটি গজল ‘এক তরফ উসকা ঘর’-এর কথাগুলো এমন:

একদিকে ওই গোলাপি রমণী বসে,
আরেক পাশেই মদের বোতল-গ্লাস,
মেয়েটিকে যদি বাদ দিই, যাব কই?
মদঘর ছেড়ে বেরোলেই আমি লাশ।
বড় মুশকিলে পড়ে গেছি আমি আজ,
বলে দাও খোদা কী এখন তবে কাজ?

কিন্তু গানে বা কবিতায় মদ মানে কেবল পান করবার উগ্র পানীয়ই নয়। বিশেষ করে সুফি সাহিত্যে মদ প্রায়শই প্রেমের প্রতীক। তাও সাধারণ জাগতিক নর-নারীর প্রেম নয়, ঐশী প্রেম। অবশ্য জাগতিক প্রেমের রূপকেই সেটা সাধারণত বর্ণিত হয়। ভারতীয় ঐতিহ্যে যেমন রাধা-কৃষ্ণের কাহিনী জীবাত্মা ও পরমাত্মার রূপক, সুফিসাহিত্যেও লাইলি-মজনু, শিঁরি-ফরহাদ, হির-রানজা—এইরকম বিভিন্ন যুগলের প্রেমকাহিনীর রূপকে মানব ও স্রষ্টার প্রেমের বর্ণনা রয়েছে।

অহম বা খুদি হলো জীবাত্মা, এর সীমানা অতিক্রম করতে পারলে নিজের সত্তার ভিতরেই আনন্দময়-প্রেমময়-অনন্ত-অসীম সত্তার সন্ধান পাওয়া যায়। সেই সত্তার প্রেমে মগ্ন হয়ে থাকাই মদ খেয়ে মাতাল হওয়া। আর সেই সত্তাকে লাভ করবার পথপ্রদর্শক যিনি, সেই মুরশিদ-পীর-গুরুর সাথেও একটি প্রেমখেলার আয়োজন রয়েছে সুফি ভাবধারায়। খোদার প্রতিনিধি বা মানবিক রূপকল্প হিসাবেই গুরুর অবস্থান। নিরাকার আল্লাহর সাথে প্রেম করবার আগে তার সাকার প্রতিনিধির সাথে প্রেম করতে হয়। কোরানও বলছে, আল্লাহকে ভালোবাসতে হলে তার রাসুলকে ভালোবাসতে হবে। মদিনায় রওজানিবাসী নবিজির নুরের অর্থাৎ প্রজ্ঞা ও প্রেমের যারা উত্তরাধিকারী তারাই হলেন ওলি ও মুরশিদ। মুরশিদের সাথে প্রেমের রূপকও ওই মদ। অবশ্য সুফি কবিতায় মুরশিদকে প্রায়শই সাকি বা মদপরিবেশক বলে বর্ণনা করা হয়েছে।

সবকো মালুম হ্যায় ম্যায় শরাবি নেহিঁ—এই গজলটাতে প্রথমে সাদামাটাভাবে মদের কথাই বলা হয়েছে। ‘সবাই জানে আমি মদখোর না, কিন্তু কেউ যদি মদ এগিয়ে দেয় তো আমার কী দোষ?’—মনে হতে পারে যেন খোঁড়া যুক্তি দিয়ে নিজের মদ্যপানের বাসনাকে প্রকাশ করা হচ্ছে। কিন্তু এর পরেই বোঝা যাচ্ছে, এই মদ পানীয় বস্তু নয়, এ হচ্ছে দৃষ্টির মদ। প্রেমাস্পদের চোখে যখন চোখ পড়ে যায় তখন যে ঘটনা ঘটে তা অতুলনীয় এক ব্যাপার। দুজন তরুণ-তরুণী যখন পরস্পরের প্রেমে পড়ে, পরস্পরের সান্নিধ্যে আসে, তখন আসলে কী ঘটে? তখন মস্তিষ্কে একটি রাসায়নিক পদার্থের ক্ষরণ হয় যার নাম ফিনাইল ইথাইল অ্যামিন (PEA)। এই পদার্থ স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। এটি অ্যামফিটামিন জাতীয় একটি মাদকদ্রব্য। এর প্রভাবে দেখা দেয় উদ্দীপনা-উত্তেজনা, অকারণ আনন্দ-উল্লাস, পারস্পরিক তীব্র আকর্ষণ, বিচার-বিবেচনাহীন কাজকারবার। প্রেমিক-প্রেমিকা অনেক সময়েই যে বলে, ‘তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে আমার নেশা ধরে যাচ্ছে’—তার নিদান ওই দেহরসই।

সুতরাং গজলটিতে বলা হচ্ছে :

শুধু একবার চোখে যদি চোখ পড়ে
কসম তখন ভেঙে যায় যদি
আমি কী করতে পারি?

প্রেম তো এভাবেই ঘটে যায়। চোখে চোখ পড়ল দুজনের, মনের সাথে মনের যোগ ঘটল, শরীরের ভেতর বয়ে গেল স্নায়বিক প্রবাহ, রক্তধারায় মিশল পি-ই-এ আর কেঁপে উঠল তার বাস্তবতা, আগের যত ওয়াদা-শপথ-সিদ্ধান্ত টলে উঠল সব কিছু।

কিন্তু প্রেমের ভাগ্য কি সবার হয়? প্রেমানন্দে রইতে কি পারে সবাই? এও এক ভাগ্যের খেলা বা চান্স ফ্যাকটরের কারসাজি। আবার কাউকে পছন্দ হলেই যে তার সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়া যাবে, এমনও নয়। প্রেম গড়ে ওঠে প্রেমের যোগ্য হৃদয়-মন থাকলেই। কিন্তু যে জন তার অন্তরে প্রেমিক, সে প্রেমানন্দে থাকে আপন প্রেমের জোরেই :

মদ না খেয়েই উল্লাস যদি জাগে
আমি কী করতে পারি?

ধর্মে বলা আছে বেহেশতের কথা। সেখানে আছে সরাবন তহুরা নামের মদ। সেখানে আছে অনিন্দ্যকান্তি চিরযৌবনা হুর। এইসব বর্ণনাতেই লোভাতুর হয়ে মাতাল হয়ে থাকে অনেকে। তাদের জীবনের লক্ষ্য-আদর্শ-উদ্দেশ্য-মোক্ষই হলো জান্নাতে যাওয়া। এই জান্নাতের লোভেই কত যুবক যে জঙ্গি-খুনি হয়ে ওঠে হায়! তাদের বোঝানো হয়, জেহাদে মরলে সে শহিদ হবে, সরাসরি জান্নাত নিশ্চিত। এই জান্নাতের লোভেই সে আত্মঘাতী হয়ে খুন করে অসংখ্য মানুষ।

জঙ্গি হোক বা না হোক, ধর্মবিশ্বাসীরা বেহেশত-দোজখকে তাদের গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় বলেই মনে করে। ভালো কাজ করলে বেহেশতে যাবে ও অনন্ত সুখ ভোগ করবে, খারাপ কাজ করলে শাস্তি পাবে দোজখে। সুফিরা এইসব প্রলোভন ও ভীতিকে আমলে আনেন না। তাদের চর্চার বিষয় প্রেম। তাপসী রাবেয়া বলতেন, ‘আমি আগুন দিয়ে বেহেশত পুড়িয়ে দেব, পানিতে নিভিয়ে দেব দোজখ; যেন বেহেশতের লোভে আর দোজখের ভয়ে লোকে এবাদত না করে; যেন লোকে আল্লাহকে ভালোবেসে তার প্রেমেই চালায় সকল এবাদতি কার্যক্রম।’

কিন্তু কেউ যদি বেহেশতের লোভেই মাতাল হয়ে থাকে, তা নিয়ে কীইবা করার আছে?

মদ খেলে যেমন বেহুঁশ হয়ে যায়, তাল হারায়, তেমনি প্রেমে পড়লেও মানুষ হুঁশবোধ হারায়। হুঁশ যে হারায় তার চমৎকার একটা বর্ণনা আছে কোরান শরিফে। জুলেখার নামে ইউসুফকে নিয়ে যখন বদনাম ছড়িয়ে পড়ল চারিদিকে, তখন নিজের সখিদের একটা পরীক্ষায় ফেললেন তিনি। সবাইকে একহাতে একটা করে লেবু ও অন্য হাতে ছুরি দিয়ে বসিয়ে দিলেন তিনি, বলে দিলেন, যখন তিনি কাটতে বলবেন ঠিক তখনই যেন কাটে তারা লেবু। তিনি আয়োজন করে রেখেছিলেন ইউসুফের ঘরে প্রবেশের। যেই মুহূর্তে ইউসুফ এসে ঘরে ঢুকলেন তক্ষুণি জুলেখা বললেন, ‘কাটো।’ সখিরা সবাই একযোগে কাটল বটে, কিন্তু অপরূপ সৌন্দর্যবান ইউসুফকে দেখে তারা এমনই বেহুঁশ হলো যে লেবুর বদলে নিজের হাত কেটে ফেলল প্রত্যেকে। এরকমই উচাটন হয়ে পড়তেন রাধা কৃষ্ণের বাঁশি শুনে। কিন্তু আমার ভেতরে যে প্রেমানন্দ বয়ে যাচ্ছে তা তো কেউ ঠাহর করতে পারছে না। তাতে আমি কী করতে পারি?

জীবনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য, করণীয় ও পদ্ধতি এইসব নিয়ে কতই না ওয়াজ-নসিহত, কতই না ডিসকোর্স-বিশ্লেষণ, কতই না বাগাড়ম্বর! কিন্তু নিজের অহম-আমিত্ব-ইগো-খুদির পিছনে যে মুক্ত-অনন্ত-শাশ্বত পরমানন্দ রয়েছে, রবীন্দ্রনাথ যার কথা এভাবে বলেছেন :

আপনারে দিয়ে রচিলি রে কী এ
আপনারই আবরণ,
খুলে দেখ দ্বার অন্তরে তার
আনন্দনিকেতন।

তার খবর যদি কেউ না রাখে ও না
খোঁজে—আমি কী করতে পারি?


সবকো মালুম হ্যায় ম্যায় শরাবি নেহিঁ গজলটির রচয়িতা আনওয়ার ফররুখাবাদী। তিনি ফানা ছদ্মনামেও রচয়িতা হিসাবে পরিচিত। তিনি একজন সুফি কবি ছিলেন। গজল, কাওয়ালি, অন্যান্য ধরনের গান ও কবিতার রচয়িতা তিনি। ১৯২৮ সালে জন্ম তাঁর, প্রয়াত হন ২০১১ সালে। কারবালার বিষয় নিয়ে বিখ্যাত মর্সিয়া গান লেখেন তিনি, সামসাদ বেগম সেটি গেয়েছেন। তার লেখা গজল ‘ইয়ে জো হালকা হালকা সরুর হ্যায়’ নুসরাত ফতেহ আলি খান ও অন্যান্য শিল্পীরা গেয়েছেন। বর্তমান গজলটি পঙ্কজ উদাস গেয়েছেন :

সকলেই জানে, আমি মদখোর নই
তবু যদি কেউ বাড়ায় গ্লাস তো
আমি কী করতে পারি?

শুধু একবার চোখে যদি চোখ পড়ে
কসম তখন ভেঙে যায় যদি
আমি কী করতে পারি?

অল্প লোকেই এমন ভাগ্যবান,
দৃষ্টির মদ খেয়ে তারা নেশা করে;
অল্পজনেই অনুমতি দেয় খেতে
মায়া চোখ হতে যেই মদ ঝরে পড়ে।

আমার শপথ যদিও বড্ড কড়া
কিন্তু বলো তো, আমি কী করতে পারি?
মদ না খেয়েই উল্লাস যদি জাগে
আমি কী করতে পারি?

শুধু উল্লেখ আছে রঙ আর নুর
ওমনি জিকির : জান্নাত আর হুর,
আমি করি পান সৌন্দর্যের মদ
বিজ্ঞজনেরা তাতেই নেশায় চুর :
আমি কী করতে পারি?

শুঁড়িঘরে যত মত্তজনেরা ভাবে
তাদের মতন আমিও বুঝি মাতাল,
যেহেতু আমিও তাদের মতন করে
প্রায়শ হারাই তাল।

যদিও আমার শিরায় শিরায় বয়
প্রেমানন্দের ঢেউ
কিন্তু যদি তা বুঝতে না পারে কেউ,
আমি কী করতে পারি?

যদিও কেবল বাকোয়াজি করে যাও—
অহম পেরোলে আনন্দধারা আছে
সেটা না জানতে পাও,
এ জীবন এক মহা আনন্দ, যদি
মদ খেয়ে মজা পেতে না-ই শেখো,
আমি কী করতে পারি?


আরো পড়ুন সৈয়দ তারিকের অনুবাদে বুল্লে শাহ’র কবিতা

হাসান হাফিজের একগুচ্ছ কবিতা



হাসান হাফিজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ম্যানিলা ও নস্টালজিয়া

ও ম্যানিলা
তুমি আছো স্মৃতিপটে,
ওগো প্রিয় ম্যানিলাসুন্দরী
তৃষিতের ওষ্ঠ তুমি ভিজিয়েছো
স্যান মিগ্যুয়েল নামে বীয়ারে মাদকে
‘পিনোটুবুু’ অগ্নিগিরি
খুব কিন্তু দূরে নয়
দ্বীপ দেশ ফিলিপিন্স
ঔপনিবেশক স্মৃতি কী দুঃসহ
একটানা চারশো বছর
দীর্ঘ দীর্ঘকাল পরে
মুক্তিস্বাদ পেয়েছো যে তুমি
সেই কটু অম্লস্বাদ
স্মৃতি হয়ে বুকে বেঁধে
‘মুক্তি’ দ্যায় উপশম
সুতন্বী উচ্ছল হও মনোরমা
দ্বীপকন্যা সুছন্দা ম্যানিলা।

অসহ দংশন

না-বৃষ্টি না-রোদ
এমন ধূসর দিনে
কেন ছুঁতে চেয়েছে সে
তোমার পেলব হাত
শৈল্পিক আঙুল
চুম্বনের অধিকার
ওরা কিন্তু দ্যায় নি যুবাকে
সন্ধ্যার আঁধারবেলা
সেই স্মৃতি অনশ্বর
জ্বলজ্বলে নক্ষত্রস্পর্ধায়
অমলিন চিরক্ষণ জলরঙ ছবি হয়ে
জেগে থাকে ঠোকরায়
না-পাওয়ার অসীম তৃষ্ণায়...

একগুঁয়ে মাঝি

মন পোড়ে?
বৃষ্টি ওড়ে?
মনের তো ডানা নাই,
কীভাবে বৈদেশ যাবে
বন্ধুয়া-হদিস পাবে
প্রশ্ন এইটাই।

বৃষ্টি পড়ছে
আছড়ে পড়ছে
মৃত্তিকার আলিঙ্গনে
এবং সম্ভোগে
সার্থকতা জলের প্রেমের।
দেখেছ প্রেমের মড়া?
কোনোদিন ডুবেছে সে জলে?

মন পোড়ে?
আহা বাহা পুড়ুক জ্বলুক
পোড়াই নিয়তি
বাহক দুর্গতি
ছিল যে কপালে লেখা
কীভাবে খ-াবে?
মনের বৈরাগী মাঝি
ফিরে আসতে নয় রাজি
চড়েছে সে একগুঁয়ে
ভাঙাচোরা ডিঙি নৌকায়।

নিরালায় সন্ধ্যাকালে

যাও পাখি যাও
পরানবন্ধুরে গিয়া
স্মরণ করাও
দুঃখিনীরে একলা রাইখা
কী মজা সে পায়?
এবার নাগালে পেলে
রশি দিয়া বাইন্দা রাখব
সতত পঞ্চল বন্ধে
এইবার দেইখা নিব কীভাবে পলায়!
শরমের খেতা পুড়ি
ওরে পাইলে এই ঘুরি
উইড়া চলি পাতায় পাতায়
যাও পাখি বলো তারে
এবার সে আসতে পারে
দুই বন্ধু বসব গিয়া
পুরানা দীঘির পাড়ে
নিরালা সন্ধ্যায় কালে
প্রাচীন ঘাটলায়
ও বন্দু সারলী হাঁস
খুঁচিয়ে কী মজা পাস?
সবকিছু ছাইড়া ছুইড়া
নিজ গৃহে সোজা চইলা আয়!


গত্যন্তর নাই

বিশ্বাস ভেঙেছো তবু
তোমাকে বিশ্বাস করি
পুনরায় প্রতারিত হতে চাই
ক্ষতি আর কতটুকু হবে?
সর্বনাশ পোড়া ছাই
লানতের অন্ত নাই
তোমাদ্বারা সকলই সম্ভব
যদি অসম্ভব হয়
আমি তবে বেপথু নাচার
পথ খোলা নাই যে বাঁচার
আমার কী গতি হবে তবে?


আশাভঙ্গ

এতোটা পথ
পাড়ি দিলাম একা
ভেবেছিলাম
হয়তো পাবো দেখা।
জানতাম না অদর্শনই
এই কপালের লেখা।
ভেবেছিলাম সরল তুমি
এখন দেখি জটিল বক্ররেখা!


নৈকট্য তো ছিল না কপালে

ক.
খুঁজতে খুঁজতে একদিন
হয়তো পেয়ে যাবো
ভয় কিন্তু জাগরুক
পেলে পর নিশ্চিত হারাবো!

খ.
কাঁটা ও সংশয়
সমস্ত জীবনব্যাপী
ভিলেনের মতো জেগে রয়।

গ.
জারিজুরি সবই হলো ফাঁস।
জানতে না আমার হৃদয়মধ্যে
বাস করে অপরূপ আন্ধা সর্বনাশ?
আমি কিন্তু জানতাম
সে কারণে কাছে ঘেঁষতে
চাইতাম না মোটের উপর
নৈকট্য নিয়তি নয় জানা ছিল
কিন্তু করতে পারি নাই
তোমাকে ত্যাগের মতো ছিন্ন উপবাস।

 

;

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু



হাসিবুর রহমান
পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

  • Font increase
  • Font Decrease

 

কোন জাতির উত্থান-পতন, আবেগ, ভবিষ্যৎ নির্মাণে মিশে থাকে ইতিহাসের  সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম উপাদান । কেউ ইচ্ছে করলেই তাকে যেমন বদলে দিতে পারে না, ঠিক তেমনি আদর্শগত দিক থেকে কোন জাতিকে বিপথে চালিতে করতে পারে ভুল ইতিহাস। ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে অষ্টাদশ শতকের বাংলা নানা কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে, বাংলার আর্থিক সমৃদ্ধির সুনাম সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই সময়। শান্তি সমৃদ্ধির চূড়ান্ত এক পর্যায়ে ১৭৫৭ পলাশির অন্ধকার নেমে আসে এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটনো হয়।

দ্বিসার্ধশত বছরের পলাশি যুদ্ধের বহুমাত্রিক আলোচনা হয়েছে ঠিকই কিন্তু নবাব সিরাজউদ্দৌলার রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে জনসমাজে বিভ্রান্তিকর, কাল্পনিক গল্পও ছড়ানো হয়েছে । দেশী-বিদেশী ঐতিহাসিকরা তাঁকে লম্পট, দুশ্চরিত্র, কটুভাষী, হৃদয়হীন রূঢ়  চতুষ্পদ পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট স্বভাবজাত বলে মিথ্যা ও কলঙ্কের অপবাদে মুড়ে দিয়েছেন। সমকালীন যুগের ফারসি ভাষার মুসলমান,  ইংরেজ লেখক কেউই তাঁর প্রতি সুবিচার করে কলম ধরেননি।

তবে, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, নিখিল নাথ রায় আধুনিক কালে সুশীল চৌধুরীর মতো ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিকরা  সিরাজউদ্দৌলার মত দেশপ্রেমিক নবাবকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে যেভাবে মূল্যায়ন করে বিপথগামী ইতিহাস চর্চার ধারাকে থমকে দিয়েছেন- এটাও ইতিহাসবেত্তাদের সততা, স্বচ্ছতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বরূপ। 

বর্তমানে অধিকাংশ ঐতিহাসিক পলাশির যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে বিস্তর লেখালেখিতে আগ্রহী। কিন্তু তাঁরা দেখেন না, দেখতে চান না যে পলাশি হলো একটি  পরিণতি । ষড়যন্ত্র আর সামরিক আগ্রাসনের একটি সুদূরপ্রসারী ফলাফল। তাঁরা পলাশি পরবর্তী সময়ে ইংরেজ কর্তৃক ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার বৈধতা দিতে সিরাজের বিরুদ্ধে সীমাহীন মিথ্যা যুক্তির জাল বুনেছিল, আসলে এছাড়া ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার অন্য কোন বৈধ উপায় তাঁদের হাতে অবশিষ্ট ছিল না।

মাত্র চৌদ্দ মাসের শাসনকালে অবাধ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔদ্ধত্যকে  দমন করতে সিরাজের দৃঢ়তা, সাহসিকতা, কঠোরতা দেখিয়েছিলেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। বাংলার মাটিতে বিনা অনুমতিতে ইংরেজদের দুর্গ নির্মাণ, কিংবা কর্মচারীদের  অবাধ "ব্যক্তিগত বাণিজ্য" বন্ধ করা তাঁর কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একজন স্বাধীন নবাবের চোখে সার্বভৌমিকতার প্রশ্ন এখানে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু সিরাজের দুর্ভাগ্য তাঁর দরবারের পদস্থ বিশ্বাসী অমাত্য গোষ্ঠী, অনেকেই ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের আশায় কোম্পানির ষড়যন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। জগৎ শেঠদের মতো দেশীয় বণিকরাও এই ষড়যন্ত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

ঘরে বাইরে শত্রু পরিবেশিত সিরাজ দৃঢ়তার সঙ্গে এই অশুভ শক্তির মোকাবেলায় সফল হননি বটে , কিন্তু তাঁর স্বদেশভূমি রক্ষার লড়াইকে হীন চোখে দেখা অনৈতিহাসিক। পলাশি নামক বিয়োগান্ত ঘটনার পর  তাঁকে  চরম অপমান আর অমর্যতার সম্মুখীন হতে হয়। যে নিষ্ঠুরতা তাঁর সঙ্গে পলাশির পর দেখানো হয়েছিল ইতিহাসে তা বিরল। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সিরাজুল ইসলাম লিখেছেন, প্রকৃতপক্ষে সমকালীন শাসকশ্রেণীর মানদণ্ডে সিরাজউদ্দৌলার চারিত্রিক দৃঢ়তা, অত্যন্ত সাহসিকতা ও অসাধারণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ বিস্ময়কর বটে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সাম্প্রতিক কালেও ইংরেজদের ভারতবর্ষ দখলের বৈধতা দান করতে গিয়ে একশ্রেণীর ইতিহাসবিদ সিরাজকে নিয়ে নতুন নতুন কাহিনী, উপাখ্যান ম্যানুফ্যাকচার করে ইতিহাস হিসাবে প্রচার করে চলেছেন। তাঁরা বলেন-- সিরাজের মৃত্যু কোন শহীদের মৃত্যু নয় । কারণ তিনি মধ্যযুগীয় রাষ্ট্রব্যবস্থাকে রক্ষা করতে লড়াই করেছিলেন মাত্র, যেখানে জনসমাজের সঙ্গে তাঁর কোন সম্বন্ধ ছিল না। অথবা একথা বলা হয় যে বাংলার নবাব হিসেবে কেন্দ্রীয় মুঘল শাসকদের দ্বারা কোন লিখিত বৈধ অনুমোদন তাঁর ছিল না ইত্যাদি।

সিরাজের মৃত্যু কোন শহিদের মৃত্যু কিনা সে বিষয়ে বিতর্ক থাকা অকল্পনীয়। তাঁর দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা ইতিহাস-বিরুদ্ধ। এছাড়া শাসনের বৈধতার দিক থেকে বাংলার নবাবরা নিয়মিত দিল্লি সম্রাটদের রাজস্ব প্রদান করতেন, সিরাজ ও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। দেশের অভিন্ন মুদ্রা ব্যবস্থা বাংলাতেও চালু ছিল। কাজেই  অভিযোগকারীরা কি ধরনের 'দেশপ্রেম' ও 'জাতীয়তাবোধ' সিরাজের কাছে প্রত্যাশা করছেন তার কোন ইতিহাস সম্মত ব্যাখ্যা হয় না। দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব তিনি অস্বীকার করেননি এখানেই তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক অবদান।

সিরাজউদ্দৌলার নিরন্তর লড়াই এর সঙ্গে যুক্ত ছিল আপামর বাংলার মানুষের জীবন ভবিষ্যৎ। পলাশিতে যদি নবাবকে না হারতে হত তাহলে বাংলার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত নিশ্চয়। দীর্ঘ দু'শো বছরের ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণের জর্জরিত দেশবাসীর মনে হীনমন্যতাপদের জন্ম নিত না। স্বাধীনতার শত্রুদের সেদিন যথার্থভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। দেশপ্রেমিক নবাবের মৃত্যুকে কেবল ক্ষমতার হাত বদল বলেই ভেবেছিল একশ্রেণীর মানুষ। ক্ষমতাসীন নবাবের লাশকে সেদিন জনগণের ঘৃণা ও অপমানের বস্তু করে তুলেছিল। নবাবের অনুগ্রহে যাদের একসময় জীবন জীবিকা নির্ভর করত তারাই দেশপ্রেমিক সিরাজকে নির্মমভাবে হত্যা করল, মৃতদেহটি পশুর মত ডাস্টবিনে ছুঁড়ে দিয়েছিল। সমকালীন যুগের এই ঘৃণ্য প্রতিশোধ যেকোনো জাতির কাছেই বড় লজ্জার।

 

অথচ যে নবাব চরম বিপদের মুহূর্তে দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি, কারোর প্রতি  শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি, তাঁর সেই মহানুভবতা ও উদারতাকে কেউ মূল্যায়ন করতে চায় না। ম্যালেশন যথার্থই মন্তব্য করে করেছেন  যে, পলাশির আগে-পরে একমাত্র সিরাজের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কোন সম্পর্ক ছিল না।

একথা সত্যি যে, বাংলার নবাবদের মধ্যে সিরাজই বোধহয় দেশকে একটু বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলেন। তিনি মুর্শিদকুলি খান, সুজাউদ্দিন, সরফরাজ বা আলিবর্দী খানের মতো গা ভাসিয়ে চলতে পারতেন তাহলে তাঁকে অন্তত অকালে প্রাণ দিতে হতো না। হতভাগ্য রাজ্যহারা নবাব জীবনের অন্তিম সময়ের প্রাণ ভিক্ষার জন্য প্রত্যেকের পদতলে লুটিয়ে পড়েছিলেন কিন্তু সেদিন তাঁর করুণ আর্তি শুনতে পাইনি কেউ। ফলে বাংলার ইতিহাসে চিরকাল কালো অধ্যায় হিসেবে ১৭৫৭ সালের ৩রা জুলাই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তাঁকে জীবন ভিক্ষার পরিবর্তে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। নিষ্ঠুর, ঘৃণিত সেই হত্যাযজ্ঞ আজও মানুষের হৃদয়ে কম্পিত হয়। দেশ রক্ষার লড়াইয়ে পরাজিত হয়েও মানুষের মনে তিনি চিরদিন স্বাধীনতার স্পৃহায় অমর হয়েই থাকবেন, এটাই অকালপ্রয়াত নবাবের জন্য  শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি।

(প্রাবন্ধিক আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক।)

 সহায়ক তথ্যসূত্র :

১) যদুনাথ সরকার ,  বেঙ্গল নবাবস, এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা ,১৯৫২

 ২) ডঃ সুশীল চৌধুরী, পলাশির অজানা কাহিনী, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।

৩) ড: মোহম্মদ মোহর আলি,  হিস্টরি অব দ্য মুসলিমস অফ বেঙ্গল, ২খন্ড ,রিয়াধ ১৯৮৮।

৪) অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, সিরাজদ্দৌলা, কল্লোল, কলকাতা।

৫) ড : সিরাজুল ইসলাম , বাংলাদেশের ইতিহাস , খন্ড ১ম ( ১৭৫৭-১৯৭১) সম্পাদনা , এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ ২০১৭ ।

৬) আ:কা: মো: যাকারিয়া, সিরাজউদ্দৌলা , প্রথমা , ঢাকা ।

;

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ও শিশুসাহিত্যিক ফখরুল হাসান। ২৩ জুন বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে তার হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ৬ লেখককে সম্মাননা, ‘শেখ হাসিনার জয় বিশ্বের বিস্ময়’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, আবৃত্তি, ছড়া পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় সৈয়দ মাসুম, আর মজিব, এনাম আনন্দ, ফাহমিদা ইয়াসমিন, লুৎফর রহমান চৌধুরীকেও সম্মাননা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ আন্তর্জাতিক পর্ষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদের আয়োজনে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. শাহজাহান মৃধা বেনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ও জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি অসীম সাহা, মারুফুল ইসলাম, তারিক সুজাত ও অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন।

কবিতা আবৃত্তি করেন জালাল উদ্দিন নলুয়া, ড. তপন বাগচী, শফিকুর রাহী, রিফাত নিগার শাপলা, আনতানুর হক, হানিফ খান, ইউসুফ রেজা, রোকশানা সাথী, জমশেদ ওয়াজেদ, মাসুদ আলম বাবুল, মাদবর রফিক, লুৎফর চৌধুরী, হাসনাইন সাজ্জাদী, গিয়াসউদ্দিন চাষা, হেনা খান, কৌমুদী নার্গিস, বোরহান মাসুদ, সৈয়দ একতেদার আলী, আলী নিয়ামত, মিহির কান্তি ভৌমিক, লুৎফা জালাল, তানিয়া মাহমুদ, শ্রাবণ রেজা, ইমরান পরশ, সৈয়দ তপু, মেরীনা সাঈদ, শাফিন প্রমুখ

;

সংশপ্তক শেখ হাসিনা



আবদুল হামিদ মাহবুব
আবদুল হামিদ মাহবুব

আবদুল হামিদ মাহবুব

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সংশপ্তক শেখ হাসিনা

কাণ্ড অনেক করে

পদ্মা বুকে ‘পদ্মা সেতু’

ঠিক দিয়েছেন গড়ে।

 

কাণ্ড ওসব নয় সাধারণ,

ভুলতে কি আর পারি?

জয় বাংলা জোরসে হেঁকে

ঠিক তো দিলেন পাড়ি।

 

অপেক্ষাতে সবাই আছি

মনটা উচাটন

ওই দিনটা জানান দিয়ে

আসলো শুভক্ষণ!

 

বাংলাদেশের এমন জয়ে

বিশ্ব জানুক, কি সুখ?

সব বাঙালি বুকের পাতায়

সুখের গাথা লিখুক।

;