এসব শরীরভর্তি আত্মা



তানিয়া চক্রবর্তী
অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

অলঙ্করণ: কাজী যুবাইর মাহমুদ

  • Font increase
  • Font Decrease

“Sex without love is a meaningless experience, but as far as meaningless experiences go it’s pretty damn good.”

“The way you make love is the way God will be with you.”

এক তীব্র স্বর্গীয় অনুভূতির প্রাসঙ্গিকতা থেকেই হয়তো দ্বিতীয় এই বক্তব্যটি রুমি রেখেছিলেন। প্রথম বক্তব্যটি করেছিলেন আমেরিকার বিশিষ্ট পরিচালক উডি এ্যালেন। বিভিন্ন মানুষ তার মনোভাব, শরীরী সক্রিয়তা, হৃদয়, ব্যক্তিচরিত্রের ভিত্তিতে যৌনতা নিয়ে অজস্র কথা বলেছিলেন। ফলত যৌনতা জীবনের সঙ্গে কতখানি সৎভাবে যুক্ত, আদৌ যুক্ত কিনা এসকল প্রশ্নের সঠিক উত্তর পাওয়া যায়নি কারণ মানুষের ইন্দ্রিয়সচেতন জীবনে ভালোবাসার ভঙ্গিমার মধ্যে দিয়েই যৌনতা বহুসময়ে ঢুকে পড়েছে; কখনো যৌনতা লালসা ও হিংসা হয়ে গেছে; কখনো যৌনতা জন্মের বাহানা হিসেবে থেকে গেছে—তাই যৌনতা গোল গোল পথেই ঘুরে চলেছে ক্রমাগত।

তবু দূর থেকে যৌনতাকে দেখলে তার স্বরূপের কিছুটা বোঝা যায়—যে সেটা বুঝবে তাকে আবার শরীরী যৌনতাও জানতে হবে অথচ একই দেহ ও শরীরে এ পার্থক্য মন নির্ধারণ করতে অপারগ থাকে। ফলত বলে রাখা ভালো যৌনতার সম্যক রূপ আসলে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রার মধ্যে ঘোরাফেরা করে। ফলে যা লিখছি তা সিদ্ধান্তমূলক হতেও পারে নাও হতে পারে।

এ মানবশরীর আসলে সে মাংস যা আমরা খাই না—এ ভোগ তবে মহাভোগ। স্পর্শে, কামনায়, ছোঁয়ায় তাকে আস্বাদন করি। তার জন্য কিছু সংকেত, চিহ্ন, অঙ্গ আছে যা এই মাংসল চেতনাকে সমৃদ্ধ করে তোলে। আমরা উপভোগ করি, প্রকৃতি মূলত বাস্তু সামলায়। কারো উদ্দেশ্য সাধনে আমরা অধ্যাসে সুখী হওয়া জীব। শরীর আসলে আকাশের তুল্যমূল্য ক্যানভাস এত অনন্ত যে তাকে যৌন অঙ্গে, যৌনাচারে, যৌনশব্দে ভ্রমে বাঁধা হয়েছে—ফলে আসলে তা ভ্রমেরও মহিমা। আমরা ভাবি অঙ্গজ জনন, যৌন জনন—মানবেতর বেশিরভাগ প্রাণীতে উৎপাদন ও ইন্দ্রিয়ের ক্রিয়াই মূল বস্তু। মানুষে আসলে তার মাত্রা চূড়ান্ত বদলে যায়—কারণ বোধের উত্তরণ ও তার অসীম প্রকরণ।

জীবনে যৌনতা কী? যৌনতা কী শুধুই শরীরী মিলন? আসলে তা যত না মিলনের রূপক ততোধিক ভাঙনের রূপক। যেমন আমরা যৌন শব্দের ব্যবহার বলি (স্তন, লিঙ্গ, যোনি) এগুলো তো মায়া, মমতা, জন্ম, রেচন, বর্জ্যের সংকেতেও পরিপূর্ণ রূপে প্রকাশিত। যদি দেহ এই পৃথিবীর ম্যাপ হয় তবে অঙ্গ তার ভূখণ্ড; সে উৎপাদনশীল না নিষ্কাশনকামী তা আলোচ্য নয়। এই যে যৌন শব্দ তাকে আমরা সর্বজনীন যৌনতার রূপকে যে ভাবি তা আমাদের ত্রুটি। তাই যৌন শব্দের ব্যবহার যৌনতার পরিচয় দেয় না সর্বদা। শরীর তো আসলে অশরীরী কারণ জন্ম থেকে সে ক্ষয় তথা বিয়োগের দিকে যায় তার দেহজ সংযুক্তিও আসলে তার বিযুক্তি! এই দেহ পূর্ণ অস্তিত্ব থেকে অনস্তিত্বে যায় ফলে এই নশ্বর দেহের যৌনতা আসলে খাবারের সঙ্গে জিহ্বার সম্পর্কের মতোই তাৎক্ষণিক গুরুত্বের—আসল উদ্দেশ্য উদরপূর্তির অথচ তার নিরূপণ স্বাদের আস্বাদনেই হয়। দেহ আসলে দেহকে বিয়োগ করে । দেহ শূন্য; আর এই শূন্যের ঘূর্ণিতে যৌনতা হলো মাতাল অবস্থা—এই সাংকেতিক উত্তেজনা আসলে মরীচীকার মতো কারণ কখনো এটি পূর্ণ সমাপ্তির জন্য তৃপ্ত হয় না; পুনরায় জাগ্রত হয়।

উর্দু ভাষার প্রসিদ্ধ লেখক কৃষণ চন্দরের গল্প ‘জঞ্জাল বুড়ো’ (অনুবাদ - অরুণকুমার মখোপাধ্যায়) গল্পে জঞ্জাল বুড়োর ক্ষয়িষ্ণু জীবনের শেষ মুহূর্ত কেবল মমতা ও স্নেহকে আশ্রয় করে পৃথিবীর এক রোমান্টিক, বিদগ্ধ মুহূর্ত তৈরি করে। জীবনের প্রারম্ভে দুলারী, তার শরীর, তার প্রেম, তার স্বামীসেবা, দুলারীর ফার্মের মালিকের সঙ্গে পালিয়ে যাওয়া তাতে যে শিরশিরানি তৈরি করা যৌনতার আবেদন ছিল তা জঞ্জাল বুড়োর যন্ত্রণায়, বাৎসল্যে ধুয়ে মুছে ক্ষীণ হয়ে গেল—ভেতরে বায়বীয় আত্মিক অনুভূতি শরীরের বাইরের ভেতরের সকল কিছুকে তছনছ করে দিল।

আবার পাওলো কোয়েলহোর লেখা উপন্যাস ‘এগারো মিনিটে’ (অনুবাদ - সায়ন্তনী নাগ) শরীর অত্যধিকভাবে, পরীক্ষামূলকভাবে, যথেচ্ছাচারে, চূড়ান্ত স্বাধীনতায় বারবার মুক্ত হয়েছে। এখানে শরীর তার প্রতিটি বিন্দুকে, সময়কে উদযাপন করেছে অথচ সেখানেও শেষে শরীর আর থাকেনি। উপন্যাসের প্রথমদিকে নায়িকা মারিয়া তার ডায়েরীতে লিখছে “আমি আবিষ্কার করেছি কী কারণে একজন পুরুষ একজন মহিলাকে টাকা দেয়। সে সুখী হতে চায়। শুধুমাত্র অর্গ্যাজম পাওয়ার জন্য সে এক হাজার ফ্রাংক দেয় না। সে সুখী হতে চায়। আমিও চাই। সবাই চায়। অথচ কেউ সুখী নয়। আমার কী হারাবার আছে, যদি কিছুক্ষণের জন্য আমি ঠিক করি আমি হব একজন ‘…’। ভাববার বা লিখবার পক্ষেও এই শব্দটা এত কী কঠিন! কিন্তু এসো, নির্লিপ্ত হয়ে বলেই ফেলি! আমার কী হারাবার আছে যদি আমি কিছুক্ষণের জন্য এক বেশ্যা হব বলে ঠিক করি? সম্মান। সম্ভ্রম। আত্মমর্যাদা। যদিও আমি যখন ভাবি, দেখি আমার ওসব কিছুই ছিল না। আমার জন্মানোর কথা ছিল না। আমায় ভালোবাসার মতো কেউ ছিল না। এবার জীবন আমার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিক।” এখানে শরীর তার শরীরী মুহূর্তকে চ্যলেঞ্জ করেছে। আবার এই উপন্যাসের অন্যত্র দেখা যায় অর্থের বিনিময়ে শরীরী খেলায় এমন লোক মারিয়ার জীবনে জোটে তাদের সঙ্গে নগ্ন অবস্থায় সে দেহ নয় দৃষ্টি আদান-প্রদান করে। একটা জায়গায় নায়িকা মারিয়া তার ডায়েরিতে লিখছে “কাল রাতে যখন র্যালফ হার্ট আমার দিকে তাকাল, সে যেন চোরের মতো একটা দরজা খুলল। কিন্তু যখন সে গেল, আমার কিছুই নিল না।—সব মানুষ তার নিজের কামনা অনুভব করে।—এ এক আবেগ যা আমার আত্মা বেছে নিয়েছে। আর এ এমন তীব্র যে আমার চারপাশের সবাইকে, সবকিছুকে সংক্রামিত করে।” এবার উপন্যাসের শেষে পর্যাপ্ত শরীরী মিলনের পর মারিয়া লিখছে “এ কোনো এগারো মিনিট নয়, এ অসীম। যেন আমরা দুজনেই আমাদের শরীর ছেড়ে বন্ধুত্ব এবং বোঝাপড়া নিয়ে আনন্দে হেঁটে চলেছি নন্দনকাননে। আমি নারী এবং পুরুষ, সেও পুরুষ এবং নারী। আমি জানি না এটা কতক্ষণ চলছিল, কিন্তু সবকিছু মনে হচ্ছিল নিঃশব্দ ধ্যানমগ্ন, যেন জগৎ ও জীবনের অস্তিত্ব নেই, তারা বদলে গেছে পবিত্র, নামহীন ও সময়হীন কোনোকিছুতে।”

আরো পড়ুন আলো মাখা পাহাড়

এই বক্তব্যের পরে উপন্যাসে র‌্যালফ তথা মারিয়ার পার্টনারের উক্তি পাই সেখানে, র‌্যালফকে মারিয়া প্রশ্ন করছে “একজন বেশ্যার প্রেমে পড়লে কী করে?” র‌্যালফ উত্তর দেয় “আমার মনে হয় এর কারণ, তোমার শরীর কোনোদিন আমার একার হবে না জেনে আমি মন দিয়েছি তোমার ঐ আত্মাকে জয় করাতে।” মারিয়া প্রশ্ন করে “তোমার ঈর্ষা হয় না?” র‌্যালফ উত্তর দেয় “তুমি বসন্তকে বলতে পারো না, এখানে এসো আর যতদিন সম্ভব থাকো।” এই উপন্যাস আসলে যৌনতাকে চেপে ধরে যৌনতাকে অতিক্রম করে ফেলেছে। ফলত যৌনতা আসলে যতখানি সুন্দর ও প্রশান্তি ততখানি সে একটা লোভ ও হাহাকার ফলে কামার্ত মানুষ নিজেও তাকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারে।

৫ অগাস্ট দরজা খুলে দেখা গেল মেয়েটি নগ্ন হয়ে বিছানায় উপুড় হয়ে পড়ে আছে। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট বলেছিল ড্রাগের ওভারডোজ নিয়ে আত্মহত্যা। তিনি মেরিলিন মনরো। এই মৃত্যু নিয়ে বহু বিতর্ক আছে। ছাপোষা সংসার থেকে শরীরের ডাক, শরীরের মাহাত্ম্য, নগ্নতার আবেদন, যৌনতার ভরপুর মন্থন নিয়ে যে মেয়ে নিজেকে স্বেচ্ছায় বাঁচিয়ে রেখেছিল সে শুধু মনের তাগিদে পাগল হতে থাকল! তার পুরুষের সংখ্যা বাড়তেই থাকল কাহিনীতে, জীবনে—তার চরিত্র, জীবন নিয়ে মানুষের আনন্দ, কুৎসা বাড়তেই থাকল কারণ সে যৌন সে শরীরী—অথচ শরীর তখন মন খুঁজছিল অথচ মানুষ বুঝেছিল শরীর অনর্গল বুঝি নতুন শরীর চায়। এই মননের খোঁজ, এটা সত্য হতে বাধ্য কারণ জীবনের মাত্রা তো এভাবেই আসে—বহু মূল্যবান বস্তুও বহুব্যবহারে লঘু হয়ে পড়ে—ফলে যদি দেহ কেবল দেহ হয় তবে তা কেবলমাত্র বস্তুই।

হাসান হাফিজের একগুচ্ছ কবিতা



হাসান হাফিজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ম্যানিলা ও নস্টালজিয়া

ও ম্যানিলা
তুমি আছো স্মৃতিপটে,
ওগো প্রিয় ম্যানিলাসুন্দরী
তৃষিতের ওষ্ঠ তুমি ভিজিয়েছো
স্যান মিগ্যুয়েল নামে বীয়ারে মাদকে
‘পিনোটুবুু’ অগ্নিগিরি
খুব কিন্তু দূরে নয়
দ্বীপ দেশ ফিলিপিন্স
ঔপনিবেশক স্মৃতি কী দুঃসহ
একটানা চারশো বছর
দীর্ঘ দীর্ঘকাল পরে
মুক্তিস্বাদ পেয়েছো যে তুমি
সেই কটু অম্লস্বাদ
স্মৃতি হয়ে বুকে বেঁধে
‘মুক্তি’ দ্যায় উপশম
সুতন্বী উচ্ছল হও মনোরমা
দ্বীপকন্যা সুছন্দা ম্যানিলা।

অসহ দংশন

না-বৃষ্টি না-রোদ
এমন ধূসর দিনে
কেন ছুঁতে চেয়েছে সে
তোমার পেলব হাত
শৈল্পিক আঙুল
চুম্বনের অধিকার
ওরা কিন্তু দ্যায় নি যুবাকে
সন্ধ্যার আঁধারবেলা
সেই স্মৃতি অনশ্বর
জ্বলজ্বলে নক্ষত্রস্পর্ধায়
অমলিন চিরক্ষণ জলরঙ ছবি হয়ে
জেগে থাকে ঠোকরায়
না-পাওয়ার অসীম তৃষ্ণায়...

একগুঁয়ে মাঝি

মন পোড়ে?
বৃষ্টি ওড়ে?
মনের তো ডানা নাই,
কীভাবে বৈদেশ যাবে
বন্ধুয়া-হদিস পাবে
প্রশ্ন এইটাই।

বৃষ্টি পড়ছে
আছড়ে পড়ছে
মৃত্তিকার আলিঙ্গনে
এবং সম্ভোগে
সার্থকতা জলের প্রেমের।
দেখেছ প্রেমের মড়া?
কোনোদিন ডুবেছে সে জলে?

মন পোড়ে?
আহা বাহা পুড়ুক জ্বলুক
পোড়াই নিয়তি
বাহক দুর্গতি
ছিল যে কপালে লেখা
কীভাবে খ-াবে?
মনের বৈরাগী মাঝি
ফিরে আসতে নয় রাজি
চড়েছে সে একগুঁয়ে
ভাঙাচোরা ডিঙি নৌকায়।

নিরালায় সন্ধ্যাকালে

যাও পাখি যাও
পরানবন্ধুরে গিয়া
স্মরণ করাও
দুঃখিনীরে একলা রাইখা
কী মজা সে পায়?
এবার নাগালে পেলে
রশি দিয়া বাইন্দা রাখব
সতত পঞ্চল বন্ধে
এইবার দেইখা নিব কীভাবে পলায়!
শরমের খেতা পুড়ি
ওরে পাইলে এই ঘুরি
উইড়া চলি পাতায় পাতায়
যাও পাখি বলো তারে
এবার সে আসতে পারে
দুই বন্ধু বসব গিয়া
পুরানা দীঘির পাড়ে
নিরালা সন্ধ্যায় কালে
প্রাচীন ঘাটলায়
ও বন্দু সারলী হাঁস
খুঁচিয়ে কী মজা পাস?
সবকিছু ছাইড়া ছুইড়া
নিজ গৃহে সোজা চইলা আয়!


গত্যন্তর নাই

বিশ্বাস ভেঙেছো তবু
তোমাকে বিশ্বাস করি
পুনরায় প্রতারিত হতে চাই
ক্ষতি আর কতটুকু হবে?
সর্বনাশ পোড়া ছাই
লানতের অন্ত নাই
তোমাদ্বারা সকলই সম্ভব
যদি অসম্ভব হয়
আমি তবে বেপথু নাচার
পথ খোলা নাই যে বাঁচার
আমার কী গতি হবে তবে?


আশাভঙ্গ

এতোটা পথ
পাড়ি দিলাম একা
ভেবেছিলাম
হয়তো পাবো দেখা।
জানতাম না অদর্শনই
এই কপালের লেখা।
ভেবেছিলাম সরল তুমি
এখন দেখি জটিল বক্ররেখা!


নৈকট্য তো ছিল না কপালে

ক.
খুঁজতে খুঁজতে একদিন
হয়তো পেয়ে যাবো
ভয় কিন্তু জাগরুক
পেলে পর নিশ্চিত হারাবো!

খ.
কাঁটা ও সংশয়
সমস্ত জীবনব্যাপী
ভিলেনের মতো জেগে রয়।

গ.
জারিজুরি সবই হলো ফাঁস।
জানতে না আমার হৃদয়মধ্যে
বাস করে অপরূপ আন্ধা সর্বনাশ?
আমি কিন্তু জানতাম
সে কারণে কাছে ঘেঁষতে
চাইতাম না মোটের উপর
নৈকট্য নিয়তি নয় জানা ছিল
কিন্তু করতে পারি নাই
তোমাকে ত্যাগের মতো ছিন্ন উপবাস।

 

;

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু



হাসিবুর রহমান
পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

পলাশি ট্রাজেডি ও সিরাজের মৃত্যু

  • Font increase
  • Font Decrease

 

কোন জাতির উত্থান-পতন, আবেগ, ভবিষ্যৎ নির্মাণে মিশে থাকে ইতিহাসের  সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম উপাদান । কেউ ইচ্ছে করলেই তাকে যেমন বদলে দিতে পারে না, ঠিক তেমনি আদর্শগত দিক থেকে কোন জাতিকে বিপথে চালিতে করতে পারে ভুল ইতিহাস। ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে অষ্টাদশ শতকের বাংলা নানা কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে, বাংলার আর্থিক সমৃদ্ধির সুনাম সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই সময়। শান্তি সমৃদ্ধির চূড়ান্ত এক পর্যায়ে ১৭৫৭ পলাশির অন্ধকার নেমে আসে এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটনো হয়।

দ্বিসার্ধশত বছরের পলাশি যুদ্ধের বহুমাত্রিক আলোচনা হয়েছে ঠিকই কিন্তু নবাব সিরাজউদ্দৌলার রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা ও ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে জনসমাজে বিভ্রান্তিকর, কাল্পনিক গল্পও ছড়ানো হয়েছে । দেশী-বিদেশী ঐতিহাসিকরা তাঁকে লম্পট, দুশ্চরিত্র, কটুভাষী, হৃদয়হীন রূঢ়  চতুষ্পদ পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট স্বভাবজাত বলে মিথ্যা ও কলঙ্কের অপবাদে মুড়ে দিয়েছেন। সমকালীন যুগের ফারসি ভাষার মুসলমান,  ইংরেজ লেখক কেউই তাঁর প্রতি সুবিচার করে কলম ধরেননি।

তবে, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, নিখিল নাথ রায় আধুনিক কালে সুশীল চৌধুরীর মতো ব্যতিক্রমী ঐতিহাসিকরা  সিরাজউদ্দৌলার মত দেশপ্রেমিক নবাবকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে যেভাবে মূল্যায়ন করে বিপথগামী ইতিহাস চর্চার ধারাকে থমকে দিয়েছেন- এটাও ইতিহাসবেত্তাদের সততা, স্বচ্ছতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্বরূপ। 

বর্তমানে অধিকাংশ ঐতিহাসিক পলাশির যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে বিস্তর লেখালেখিতে আগ্রহী। কিন্তু তাঁরা দেখেন না, দেখতে চান না যে পলাশি হলো একটি  পরিণতি । ষড়যন্ত্র আর সামরিক আগ্রাসনের একটি সুদূরপ্রসারী ফলাফল। তাঁরা পলাশি পরবর্তী সময়ে ইংরেজ কর্তৃক ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার বৈধতা দিতে সিরাজের বিরুদ্ধে সীমাহীন মিথ্যা যুক্তির জাল বুনেছিল, আসলে এছাড়া ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার অন্য কোন বৈধ উপায় তাঁদের হাতে অবশিষ্ট ছিল না।

মাত্র চৌদ্দ মাসের শাসনকালে অবাধ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔদ্ধত্যকে  দমন করতে সিরাজের দৃঢ়তা, সাহসিকতা, কঠোরতা দেখিয়েছিলেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। বাংলার মাটিতে বিনা অনুমতিতে ইংরেজদের দুর্গ নির্মাণ, কিংবা কর্মচারীদের  অবাধ "ব্যক্তিগত বাণিজ্য" বন্ধ করা তাঁর কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একজন স্বাধীন নবাবের চোখে সার্বভৌমিকতার প্রশ্ন এখানে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু সিরাজের দুর্ভাগ্য তাঁর দরবারের পদস্থ বিশ্বাসী অমাত্য গোষ্ঠী, অনেকেই ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের আশায় কোম্পানির ষড়যন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। জগৎ শেঠদের মতো দেশীয় বণিকরাও এই ষড়যন্ত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

ঘরে বাইরে শত্রু পরিবেশিত সিরাজ দৃঢ়তার সঙ্গে এই অশুভ শক্তির মোকাবেলায় সফল হননি বটে , কিন্তু তাঁর স্বদেশভূমি রক্ষার লড়াইকে হীন চোখে দেখা অনৈতিহাসিক। পলাশি নামক বিয়োগান্ত ঘটনার পর  তাঁকে  চরম অপমান আর অমর্যতার সম্মুখীন হতে হয়। যে নিষ্ঠুরতা তাঁর সঙ্গে পলাশির পর দেখানো হয়েছিল ইতিহাসে তা বিরল। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সিরাজুল ইসলাম লিখেছেন, প্রকৃতপক্ষে সমকালীন শাসকশ্রেণীর মানদণ্ডে সিরাজউদ্দৌলার চারিত্রিক দৃঢ়তা, অত্যন্ত সাহসিকতা ও অসাধারণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ বিস্ময়কর বটে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সাম্প্রতিক কালেও ইংরেজদের ভারতবর্ষ দখলের বৈধতা দান করতে গিয়ে একশ্রেণীর ইতিহাসবিদ সিরাজকে নিয়ে নতুন নতুন কাহিনী, উপাখ্যান ম্যানুফ্যাকচার করে ইতিহাস হিসাবে প্রচার করে চলেছেন। তাঁরা বলেন-- সিরাজের মৃত্যু কোন শহীদের মৃত্যু নয় । কারণ তিনি মধ্যযুগীয় রাষ্ট্রব্যবস্থাকে রক্ষা করতে লড়াই করেছিলেন মাত্র, যেখানে জনসমাজের সঙ্গে তাঁর কোন সম্বন্ধ ছিল না। অথবা একথা বলা হয় যে বাংলার নবাব হিসেবে কেন্দ্রীয় মুঘল শাসকদের দ্বারা কোন লিখিত বৈধ অনুমোদন তাঁর ছিল না ইত্যাদি।

সিরাজের মৃত্যু কোন শহিদের মৃত্যু কিনা সে বিষয়ে বিতর্ক থাকা অকল্পনীয়। তাঁর দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা ইতিহাস-বিরুদ্ধ। এছাড়া শাসনের বৈধতার দিক থেকে বাংলার নবাবরা নিয়মিত দিল্লি সম্রাটদের রাজস্ব প্রদান করতেন, সিরাজ ও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। দেশের অভিন্ন মুদ্রা ব্যবস্থা বাংলাতেও চালু ছিল। কাজেই  অভিযোগকারীরা কি ধরনের 'দেশপ্রেম' ও 'জাতীয়তাবোধ' সিরাজের কাছে প্রত্যাশা করছেন তার কোন ইতিহাস সম্মত ব্যাখ্যা হয় না। দেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব তিনি অস্বীকার করেননি এখানেই তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক অবদান।

সিরাজউদ্দৌলার নিরন্তর লড়াই এর সঙ্গে যুক্ত ছিল আপামর বাংলার মানুষের জীবন ভবিষ্যৎ। পলাশিতে যদি নবাবকে না হারতে হত তাহলে বাংলার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত নিশ্চয়। দীর্ঘ দু'শো বছরের ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণের জর্জরিত দেশবাসীর মনে হীনমন্যতাপদের জন্ম নিত না। স্বাধীনতার শত্রুদের সেদিন যথার্থভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। দেশপ্রেমিক নবাবের মৃত্যুকে কেবল ক্ষমতার হাত বদল বলেই ভেবেছিল একশ্রেণীর মানুষ। ক্ষমতাসীন নবাবের লাশকে সেদিন জনগণের ঘৃণা ও অপমানের বস্তু করে তুলেছিল। নবাবের অনুগ্রহে যাদের একসময় জীবন জীবিকা নির্ভর করত তারাই দেশপ্রেমিক সিরাজকে নির্মমভাবে হত্যা করল, মৃতদেহটি পশুর মত ডাস্টবিনে ছুঁড়ে দিয়েছিল। সমকালীন যুগের এই ঘৃণ্য প্রতিশোধ যেকোনো জাতির কাছেই বড় লজ্জার।

 

অথচ যে নবাব চরম বিপদের মুহূর্তে দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি, কারোর প্রতি  শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি, তাঁর সেই মহানুভবতা ও উদারতাকে কেউ মূল্যায়ন করতে চায় না। ম্যালেশন যথার্থই মন্তব্য করে করেছেন  যে, পলাশির আগে-পরে একমাত্র সিরাজের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কোন সম্পর্ক ছিল না।

একথা সত্যি যে, বাংলার নবাবদের মধ্যে সিরাজই বোধহয় দেশকে একটু বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলেন। তিনি মুর্শিদকুলি খান, সুজাউদ্দিন, সরফরাজ বা আলিবর্দী খানের মতো গা ভাসিয়ে চলতে পারতেন তাহলে তাঁকে অন্তত অকালে প্রাণ দিতে হতো না। হতভাগ্য রাজ্যহারা নবাব জীবনের অন্তিম সময়ের প্রাণ ভিক্ষার জন্য প্রত্যেকের পদতলে লুটিয়ে পড়েছিলেন কিন্তু সেদিন তাঁর করুণ আর্তি শুনতে পাইনি কেউ। ফলে বাংলার ইতিহাসে চিরকাল কালো অধ্যায় হিসেবে ১৭৫৭ সালের ৩রা জুলাই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তাঁকে জীবন ভিক্ষার পরিবর্তে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। নিষ্ঠুর, ঘৃণিত সেই হত্যাযজ্ঞ আজও মানুষের হৃদয়ে কম্পিত হয়। দেশ রক্ষার লড়াইয়ে পরাজিত হয়েও মানুষের মনে তিনি চিরদিন স্বাধীনতার স্পৃহায় অমর হয়েই থাকবেন, এটাই অকালপ্রয়াত নবাবের জন্য  শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি।

(প্রাবন্ধিক আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক।)

 সহায়ক তথ্যসূত্র :

১) যদুনাথ সরকার ,  বেঙ্গল নবাবস, এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা ,১৯৫২

 ২) ডঃ সুশীল চৌধুরী, পলাশির অজানা কাহিনী, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।

৩) ড: মোহম্মদ মোহর আলি,  হিস্টরি অব দ্য মুসলিমস অফ বেঙ্গল, ২খন্ড ,রিয়াধ ১৯৮৮।

৪) অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, সিরাজদ্দৌলা, কল্লোল, কলকাতা।

৫) ড : সিরাজুল ইসলাম , বাংলাদেশের ইতিহাস , খন্ড ১ম ( ১৭৫৭-১৯৭১) সম্পাদনা , এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ ২০১৭ ।

৬) আ:কা: মো: যাকারিয়া, সিরাজউদ্দৌলা , প্রথমা , ঢাকা ।

;

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ফখরুল হাসান

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সম্মাননা পেলেন কবি ও শিশুসাহিত্যিক ফখরুল হাসান। ২৩ জুন বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে তার হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ৬ লেখককে সম্মাননা, ‘শেখ হাসিনার জয় বিশ্বের বিস্ময়’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, আবৃত্তি, ছড়া পাঠ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় সৈয়দ মাসুম, আর মজিব, এনাম আনন্দ, ফাহমিদা ইয়াসমিন, লুৎফর রহমান চৌধুরীকেও সম্মাননা দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ আন্তর্জাতিক পর্ষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদের আয়োজনে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. শাহজাহান মৃধা বেনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী ও জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি অসীম সাহা, মারুফুল ইসলাম, তারিক সুজাত ও অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন।

কবিতা আবৃত্তি করেন জালাল উদ্দিন নলুয়া, ড. তপন বাগচী, শফিকুর রাহী, রিফাত নিগার শাপলা, আনতানুর হক, হানিফ খান, ইউসুফ রেজা, রোকশানা সাথী, জমশেদ ওয়াজেদ, মাসুদ আলম বাবুল, মাদবর রফিক, লুৎফর চৌধুরী, হাসনাইন সাজ্জাদী, গিয়াসউদ্দিন চাষা, হেনা খান, কৌমুদী নার্গিস, বোরহান মাসুদ, সৈয়দ একতেদার আলী, আলী নিয়ামত, মিহির কান্তি ভৌমিক, লুৎফা জালাল, তানিয়া মাহমুদ, শ্রাবণ রেজা, ইমরান পরশ, সৈয়দ তপু, মেরীনা সাঈদ, শাফিন প্রমুখ

;

সংশপ্তক শেখ হাসিনা



আবদুল হামিদ মাহবুব
আবদুল হামিদ মাহবুব

আবদুল হামিদ মাহবুব

  • Font increase
  • Font Decrease

 

সংশপ্তক শেখ হাসিনা

কাণ্ড অনেক করে

পদ্মা বুকে ‘পদ্মা সেতু’

ঠিক দিয়েছেন গড়ে।

 

কাণ্ড ওসব নয় সাধারণ,

ভুলতে কি আর পারি?

জয় বাংলা জোরসে হেঁকে

ঠিক তো দিলেন পাড়ি।

 

অপেক্ষাতে সবাই আছি

মনটা উচাটন

ওই দিনটা জানান দিয়ে

আসলো শুভক্ষণ!

 

বাংলাদেশের এমন জয়ে

বিশ্ব জানুক, কি সুখ?

সব বাঙালি বুকের পাতায়

সুখের গাথা লিখুক।

;