কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ২)



জিনি লকারবি ।। অনুবাদ : আলম খোরশেদ
অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

  • Font increase
  • Font Decrease

জয়বাংলার দেশে

[পূর্ব প্রকাশের পর] মাইকে করে শহরের বড় মাঠ, পার্ক ও স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠেয় রাজনৈতিক দলের সভাসমাবেশসমূহের ঘোষণা দেওয়া হচ্ছিল দিনরাত। কখন কোথায় এইসব সভাগুলো হবে আপনাকে তার হিসাব রাখতে হতো, কেননা তখন শহরের সেইসব অঞ্চল দিয়ে চলাফেরা করাটা ছিল প্রায় অসম্ভব। সেরকমই একটি মিছিলে আটকা পড়ে এক সন্ধ্যায় আমার অফিসের একটা মিটিং হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল—এক ঘণ্টায় আমি রাস্তার মাত্র একটি মোড় অতিক্রম করতে পেরেছিলাম সেদিন। শহরের রাস্তাগুলো ছেয়ে থাকত যত প্রচার-প্রচারণার বিজ্ঞাপন ও শ্লোগানে আর শান্তি, সমৃদ্ধি, স্বৈরশাসন থেকে মুক্তির প্রতিশ্রুতি সম্বলিত পোস্টারসমূহে।

অবশেষে সেই বিখ্যাত দিনটি, ৭ই ডিসেম্বর ১৯৭০, উপস্থিত হলো। লোকজন সব রাস্তায় নেমে এলো, তাদেরও সবারই গন্তব্য স্কুল, অনুষ্ঠানকেন্দ্র, আদালত ভবনে স্থাপিত ভোটকেন্দ্রসমূহ—যেখানে স্বেচ্ছাসেবীরা বসে আছে তাদের ব্যালট সংগ্রহের জন্য। প্রথমবারের মতো নারী-পুরুষ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে সবাই ভোট দেওয়ার সুযোগ পেল। ভোটের পরে একজন দিনমজুর তার মার্কিন মনিবের দপ্তরে গিয়ে হাজির হয়। চোখে পানি নিয়ে সে তার বুড়ো আঙুলখানি বাড়িয়ে দেয়। “আমার আঙুলের দাগটা দেখুন”, সে চিৎকার করে বলে, “এটা দিয়েই আমি আমার ভোট দিয়েছি।”

নির্বাচন বৈধ ও সুষ্ঠু ছিল, কিন্তু তার ফলাফল পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক জান্তার কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না।

সামরিক শাসক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ধরেই নিয়েছিলেন যে, জাতীয় সংসদের মোট ৩১৩টি আসনের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দকৃত ১৬৯টি আসনের ৬০ শতাংশ বড়জোর জিততে পারে আওয়ামী লীগ। বাকি আসনের ভোটাররা, তিনি ভেবেছিলেন, পশ্চিম পাকিস্তানি প্রার্থীদের সমর্থন দেবে, যাতে করে মুজিব সারাদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হয়। কিন্তু বিস্ময়কর এক বিজয়ের ঘটনায় আওয়ামী লীগ ১৬৯টির মধ্যে ১৬৭টি আসনেই জয়ী হয়—যা ছিল সংসদের সামগ্রিক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য যথেষ্ট। পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতাধরেরা মুজিবকে চাপ দিচ্ছিলেন তাঁর ছয় দফার দাবিগুলোর ব্যাপারে আপোষরফা করার জন্য। জুলফিকার আলি ভুট্টো, পশ্চিম পাকিস্তানের পিপলস্ পার্টির প্রধান, যারা মোট ৮০টি আসনে জয়ী হয়েছিল, দাবি করেছিলেন যেন বাণিজ্য ও বিদেশি সাহায্যের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের হাতে থাকে। মুজিব এতে সম্মত না হলে ভুট্টো ১৯৭১ সালের তেসরা মার্চে অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ অধিবেশন বয়কটের ঘোষণা দেন।

ফেব্রুয়ারি মাসে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সভা অনুষ্ঠিত হয়। তবে তা শেষ হয় অচলাবস্থায়। বাঙালিরা আঁচ করতে পারে যে, নির্বাচনের আগে যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল সেগুলো বাস্তবায়ন করা হবে না। সংখ্যাগুরু বাঙালি ও অবাঙালি বিহারিদের মধ্যেকার দীর্ঘদিনের শত্রুতা তখন রক্তাক্ত ধর্মঘট ও দাঙ্গারূপে বিস্ফোরিত হয়। লন্ডন অবজার্ভারের ১৮ই এপ্রিল ১৯৭১ সংখ্যায় বিহারিদের সম্পর্কে বলা হয়:

১৯৪৭ সালে দেশভাগের রক্তারক্তির সময় হিন্দুদের অত্যাচার থেকে রক্ষা পাবার জন্য, ভারতীয় রাজ্য বিহারের এই উর্দুভাষী মুসলমানেরা শরণার্থী হিসাবে পূর্ব পাকিস্তানে আসে। বিহারিরা, যাদের অধিকাংশই ছিল বণিকশ্রেণির, দ্রুত ভারতে পালিয়ে যাওয়া হিন্দুদের দোকানপাট দখল করে বসে। বাঙালিদের এই আতিথেয়তার বদলা দেয় তারা ১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের উর্দুভাষী সৈন্যদের দালালি ও দেখভালের কাজ করে, যাদের সঙ্গে তারা অধিকতর নৈকট্য অনুভব করত। চট্টগ্রাম শহরে রাত্রি নামলে বেসামরিক গাড়িতে করে সেনাবহিনীর গুদামের অস্ত্রশস্ত্র বিতরণ করা হতো অবাঙালিদের ঘরে ঘরে। হঠাৎ করে সেই বাড়িগুলোতে অতিথিদের আগমন বেড়ে গেল—সাদা পোশাকপরা কমান্ডোসেনাদের। এইসব ঘটনার খবর জানাজানি হয়ে গেলে গুজবের ডালপালাও বাড়ে এবং বাঙালিরা তখন বাঙালি ছাড়া আর সবাইকেই অবিশ্বাস করতে শুরু করে। মার্কিন মিশনারিরাও এই রাজনৈতিক ডামাডোল থেকে মুক্ত ছিল না। আমার তা জানার যথেষ্ট কারণ ছিল।

এটা শুরু হয়েছিল খুব সাদামাটাভাবেই। আমাদের গির্জায় প্রার্থনা করতে আসা এক পরিবারের জনৈক তরুণ সদস্যের যক্ষা হয়েছিল। পরিবারটি যথেষ্ট আর্থিক দুর্দশার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তার ওপর বাড়ির বড়কর্তাও ভুগছিলেন কর্কটরোগে। আমি পুরো পরিবারটিকেই সরকারি যক্ষা হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলাম আর তাদের পরিচালিত স্বাস্থ্যনিবাসের নির্বাহীর সঙ্গেও দেখা করেছিলাম এই আশায়, যদি তরুণটিকে সেখানে বিনা পয়সায় ভর্তি করে দেওয়া যায়। তো, ছেলেটিকে আমি নিজেই গাড়ি চালিয়ে সেখানে রেখে এসেছিলাম এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে যে, প্রতি সপ্তাহেই আমি তার পরিবারের কাউকে না কাউকে নিয়ে আসব তার কাছে।

আর তারপর আসে ১৮ই ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ সাল।

আমি ছেলেটির মা, ঠাকুরমা, দশ বছরের বোন ও ঊনিশ বছরের ভাইকে নিয়ে তাকে দেখতে যাই। আমাদের খুব সুন্দর সময় কাটে সেখানে। আমি খাবারদাবার ও সেবার মান নিয়ে তার অভিযোগ শুনি এবং এই সিদ্ধান্তে আসি যে, সেখানে সে ভালোই রয়েছে। বাড়ি ফেরার পথে, ছোট মেয়েটি কোনোদিন সমুদ্র দেখেনি বলে, আমরা মূল রাস্তা ছেড়ে কয়েকমিনিটের মতো ভেতরের দিকে এগিয়ে যাই। সেই রাস্তায় প্রচুর নির্মাণসামগ্রী পড়ে ছিল : আলকাতরার ড্রাম, ইটপাথরের স্তূপ ও একটি গাড়ি। আচমকা একটি বাচ্চা মেয়ে রাস্তা পেরুতে শুরু করে। আমি ব্রেকে চাপ দিয়ে হর্ন বাজাতে থাকি।

মেয়েটি রাস্তা না পেরিয়ে ঘুরে দাঁড়ায় এবং আমাকে দেখিয়ে বলে ওঠে : “দেখো, একটা মেয়ে গাড়ি চালাচ্ছে।”

তারপর সে সরাসরি আমার গাড়ির দিকে এগিয়ে আসে।

আমি কোনোদিনই নিশ্চিত করে বলতে পারব না, এরপর কী হয়েছিল। ব্রেক কাজ করেনি, নাকি মেয়েটাই গাড়ির নিচে গড়িয়ে গিয়েছিল নাকি—আমি জানি না। কিন্তু অই মুহূর্তে আমি তার ওপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে দিই!

আমার প্রথম প্রতিক্রিয়া হয়েছিল, বলাই বাহুল্য, গাড়ি থামিয়ে গিয়ে দেখা তাকে কোনো সাহায্য করা যায় কিনা। নির্মাণসামগ্রীর জঞ্জালের মধ্যেই এঁকেঁবেঁকে গাড়িটি পার্ক করার একটা জুতসই জায়গা খোঁজার মধ্যেই আমি শুনতে পাই, ঊনিশ বছরের নির্মল চিৎকার করে বলছে, “দিদি চালিয়ে যান, তাড়াতাড়ি গাড়ি চালান।”

ততক্ষণে প্রচুর মানুষ আমাদেরকে ঘিরে ধরেছে। বিশাল বিশাল ইট ও পাথর ছুঁড়ে মারা হচ্ছিল আমাদের দিকে, আমি স্টিয়ারিং হুইলে মাথা নামিয়ে সেই শিলাবৃষ্টি থেকে বাঁচার চেষ্টা করি। আমি মরে গেছি ভেবে নির্মল গাড়ির স্টিয়ারিং হাতে নিয়ে পাগলের মতো ঘোরাতে থাকে। আমি সোজা হয়ে বসে, অ্যাক্সিলেটরে জোরে চাপ দিই, কিন্তু স্বাভাবিক অবস্থাতেই যে-গাড়ির গায়ে তেমন একটা জোর ছিল না, তাকে নিয়ে এই লোহালক্কড়ে-ঢাকা পথে আমি বেশিদূর এগুতে পারি না।

ভিড় করে আসা লোকের দঙ্গল রাস্তায় সদা-উপস্থিত বেবিট্যাক্সি ও সাইকেলগুলো দিয়ে আমাদের রাস্তায় ব্যারিকেড দিতে শুরু করে।

তারপর শুরু হয় সত্যিকারের সংকট। তারা আমার গাড়ির চাবি নিয়ে নেয়, গাড়িটাকে চিৎ করে ফেলতে চেষ্টা করে, সামনের উইন্ডশিল্ডের জায়গায় সৃষ্ট বিশাল ফুটো দিয়ে তারা নির্মলকে টেনেহিঁচড়ে বার করে নিয়ে বেদম পেটাতে শুরু করে।

ঘটনার পরম্পরা আমার কাছে এখনো একটু অস্পষ্ট, তবে হঠাৎ করে একজন পাকিস্তানি প্রকৌশলীর আগমনের কথা মনে আছে। তিনি ঘটনাটা আন্দাজ করেন, একজন সুদর্শন ব্যক্তিকে গাড়ির কাছে পাঠিয়ে তিনি নিজে যান পুলিশের কাছে। আমাদেরকে পাহারা দেবার জন্য যাকে পাঠানো হয়েছিল তিনি আসলে একজন দোকানদার ছিলেন, যিনি আবার স্থানীয় ইউনিয়ন কাউন্সিলের একজন নির্বাচিত সদস্যও। তিনি জনতাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার কাজটা ভালোভাবেই করেন, একই সঙ্গে আমাদের বলতে থাকেন যে, তিনি না এসে পড়লে আমাদের সবাইকে মারা পড়তে হতো, তবে এখন যেহেতু তিনি আছেন, তখন আমাদের আর ভয়ের কিছু নেই! এই হট্টগোলের মধ্যে নির্মল এক ফাঁকে সটকে পড়ে এবং রিকশা করে ছয় মাইল দূরে, চট্টগ্রাম শহরে আমাদের মিশনের সদরদপ্তর তথা বাইবেল ইনফরমেশন সেন্টারে গিয়ে হাজির হয়।

নির্মল যখন সাহায্যের জন্য ছুটছিল, তখন আমি, ছোট মেয়েটি, তার মা ও ঠাকুরমা শত্রুপক্ষে পরিপূর্ণ সমুদ্রের মধ্যে একটি দ্বীপের মতো বসে ছিলাম।

‘বিদেশি!’, ‘আমেরিকান!’, ‘খ্রিস্টান!’ এই অভিধাগুলো গালির মতো করে বারেবারে ছুঁড়ে মারা হচ্ছিল আমাদের দিকে। আমি আমার স্থান বদল করার সাহস পাই না, কেননা আমি ভাঙা কাচ আর ইটের টুকরো দ্বারা চতুর্দিকে পরিবেষ্টিত হয়ে ছিলাম।

মানুষগুলো যখন গাড়ির ওপর হামলে পড়ছিল তখন ছোট মেয়েটি আতঙ্কে ছটফট করছিল। তার মা আমার কথা বলে জনতার সঙ্গে বোঝাপড়া করার চেষ্টা করছিলেন। “সে একজন নার্স। তাকে সাহায্য করতে দিচ্ছেন না কেন? আপনারা ছোটো বাচ্চাটিকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে দিচ্ছেন না কেন? আমাদের একটা ভালো হাসপাতাল আছে। মেয়েটি সেখানে ভালো হয়ে যাবে।”
বৃদ্ধাটি পেছনের সিটের এক কোনায় সোজা হয়ে বসে ‘হায় যিশু’, ‘হায় যিশু’ করেই যাচ্ছিলেন।

দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল বিকাল সাড়ে পাঁচটার দিকে। আর সন্ধ্যা সাতটায় দিকে আমাদের মিশনের রেভারেন্ড রেইড মিনিখ আসেন অকুস্থলে। (নির্মলের মুখ থেকে ঘটনার রুদ্ধশ্বাস বর্ণনা শুনে তিনি এত দ্রুত ঘটনাস্থলের দিকে রওনা দেন যে, পূর্ব পাকিস্তানে ততদিনে তিনদফা দায়িত্ব পালন-করা প্রবীণ মিশনারি রেভারেন্ড জিন গুরগানুসকেও বলে আসতে পারেননি, তিনি কোথায় যাচ্ছেন। জিন শুধু অ্যাক্সিডেন্ট শব্দটি শুনতে পান, আর কিছু নয়।) ঠান্ডা, অন্ধকারে সেই দোমড়ানো গাড়ির ভেতরে বসে থাকা আমাদের কাছে রেইডকে তখন হোন্ডায় চেপে আসা, ‘চকচকে বর্মগায়ে একজন সেনাপতির’ মতো মনে হয়েছিল।

তিনি কর্তৃত্ব গ্রহণ করেন এবং দ্রুতই আমরা একটা পুলিশের গাড়িতে করে বাড়ির দিকে (তিনি ভেবেছিলেন আর কি) যেতে থাকি। পুলিশ চালকের অন্য ভাবনা ছিল মনে। সে আমাদেরকে থানায় নিয়ে যায়, যেখানে আমাকে গণ্য করা হয় একজন ‘অপরাধী’ হিসাবে। আমি উঠে দাঁড়ালে তারা আমাকে বসতে বলে। একসময় তারা নির্মলের পরিবারকে যেতে দেয়, এবং তারা আমার খবর জানাতে সোজা গিয়ে হাজির হয় গুরগানুসের বাড়িতে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই জিন এসে উপস্থিত হন। এখন তাদের বন্দী হলো দুজন! আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলের একজন বিশুদ্ধ ভদ্রলোক, জিন বুঝেছিলেন ততক্ষণে আমার একটু ‘হালকা হবার’ প্রয়োজন পড়ার কথা। তিনি খুব বিনয়ের সঙ্গে পুলিশ অফিসারের কাছে তাদের বাথরুমের অবস্থান বিষয়ে জানতে চান।

“এখানে সেরকম কিছু নেই,” তার ত্বরিৎ জবাব আসে।
“কী বলছেন আপনি, অবশ্যই কিছু না কিছু একটা ব্যবস্থা থাকবে এখানে,” জিন বলেন।
“আপনারা সেটা ব্যবহার করতে পারবেন না। আপনারা ঘর ছেড়ে কোথাও যেতে পারবেন না।” অফিসার চিৎকার করে বলেন।
“আপনি এরকম একটি অনুরোধে কিছুতেই না করতে পারেন না,” জিন জোর দিয়ে বলেন।

অফিসার তখন হার মানেন। বাইরে তখন অন্ধকার হলেও জিন আর আলো চেয়ে তাঁর ভাগ্যের ওপর বাড়তি কোনো চাপ সৃষ্টি করার ঝুঁকি নেন না, তিনি একটা বাচ্চা ছেলেকে রাস্তার ওপারের দোকান থেকে মোমবাতি কিনে আনতে পাঠান। আমরা তখন বাইরের ঘরের দিকে এগুতে থাকি : মোমবাতি হাতে একটি ছোটো ছেলে, একজন পুলিশ প্রহরী, জিন ও আমি।

রাত সাড়ে নয়টার দিকে মিনিখ সব আইনি ঝামেলার ফয়সালা করে ফেরত আসেন। ‘জনতা’, যার মধ্যে ছিল ছোট মেয়েটির গ্রামের লোকজন, (তবে মেয়েটির বাবা মায়ের সম্পর্কে খুব কমই জানা গিয়েছিল), চায়নি পুলিশ কোনো মামলা করুক। জনতা একটা জরিমানা নির্ধারণ করে—ছয়শত টাকা। এটাকে নাকি কম করেই ধরা হয়েছে কেননা : এক. ঘটনার শিকার মেয়ে, দুই. তার কোনো শিক্ষাদীক্ষা ছিল না, তিন. সে গরিব ঘরের মেয়ে ছিল। আমার কাছে সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় ছিল এটাই যে, তাদের মধ্যে একজনও একটি প্রাণের বিয়োগে কোনোপ্রকার দুঃখপ্রকাশ করেনি। ভাবখানা ছিল এরকম যে, “কী হয়েছে যে সে মারা গেছে! সবাইকেই তো মারা যেতে হয়।” তারা ঘটনাটির পুরোপুরি একটি জাতীয়তাবাদী ও রাজনৈতিক চেহারা দিতে চাইছিল : আমি বিদেশি। আমি একজন বাঙালির ক্ষতি করেছি।

বেশ কয়েক সপ্তাহ পরেই কেবল আমি বুঝতে পারি আমার অবাঙালি হওয়ার বিষয়টা সেদিন কতখানি বিপক্ষে গিয়েছিল আমার।

পরে নির্মল সেই যক্ষা হাসপাতালে তার ভাইকে দেখতে গিয়েছিল আবার। ঝোঁকের মাথায় সে দুর্ঘটনাস্থলের কাছেই একটি চায়ের দোকানে ঢোকে এবং কৌশলে আলোচনাকে সেদিনের ঘটনার দিকে নিয়ে যায়।

“আপনাদের মনে আছে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি নাগাদ এখানে একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল?” সে জিজ্ঞাসা করে।
“হ্যাঁ, হ্যাঁ”, সবাই তার বর্ণনা দেওয়ার জন্য অস্থির হয়ে ওঠে।
“একজন সাদা মেমসাহেব গাড়িটা চালাচ্ছিলেন,” সবাই একযোগে বলে ওঠে।
“কী ঘটেছিল আসলে?” নির্মল তাদের উস্কে দেয়, আর তারাও তাদের মতো করে খুঁটিনাটির বিবরণ দিতে থাকে। শেষ পর্যন্ত সে জিজ্ঞাসা করে, “মেয়েটি কি মরেই গিয়েছিল?”
“মারা গিয়েছিল? না, সে মারা যায়নি তো! আপনি তাকে দেখতে চান?”

নির্মল ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিল। আমাদেরকে এই গল্প করতে করতে সে তার রাগ চেপে রাখতে পারছিল না এই কারণে যে, তারা আমাদেরকে বোকা বানিয়ে ‘জনতা’র কথা বলে আসলে স্থানীয় নেতাদের পকেট ভারি করেছিল।

আমার সেটা নিয়ে কোনো মাথা ব্যথা ছিল না। বাচ্চা মেয়েটা বেঁচে গিয়েছিল সেটাই বড় কথা! তবে, সেদিনের ঘটনাটিকে ঘিরে আমার মনে সারাজীবন এক অদ্ভুত, বর্ণনাতীত অনূভূতি জেগে থাকবে, সন্দেহ নেই। [চলবে]


কর্মব্যপদেশে, একাত্তরের বাংলাদেশে: জনৈক মার্কিন সেবিকার স্মৃতিকথা (কিস্তি ১)

ইতিহাসবেত্তা রূপ কুমার বর্মনের বীক্ষণে দলিত, তপশিলি, নিম্নশ্রেণির ইতিহাস



সাৰ্থক লাহা
ইতিহাসবেত্তা রূপ কুমার বর্মন

ইতিহাসবেত্তা রূপ কুমার বর্মন

  • Font increase
  • Font Decrease

ইতিহাস চর্চা দীর্ঘকাল ধরে মূলত রাজনীতি, রাজনৈতিক চিন্তা, রাজবংশ, রাজা-রাজত্বের মধ্যে সীমায়িত ছিল। আবার একইসাথে ইতিহাসের সংজ্ঞায়নে কেউ কেউ বলেছেন মহান মহান মানুষের জীবন অবতারনা বা আলোচনার নামই হল ইতিহাস। থমাস কার্লাইলের ভাষায়, 'ইতিহাস হল অসংখ্য মহান মানুষের আত্মজীবনির সারবস্তু’।

মূলত একটা সময় ইতিহাস মানে নেপোলিয়ান, আলেকজান্ডার, অশোক, সমুদ্রগুপ্ত, আকবর প্রমুখ মানুষদের জীবনীগাঁথা ও তাঁদের সময়কালকেই বোঝা হতো। কিন্তু ইতিহাসের যে অন্য অনুষঙ্গ আছে বা ইতিহাস যে সমস্ত শ্রেণির মানুষের ইতিবৃত্ত সেটা বুঝতে বেশ কয়েক শতাব্দী অপেক্ষা করতে হয়।

মূলত গত শতাব্দীর ৮০’র দশক থেকে নিম্নবর্গের কথা ঐতিহাসিক কলমে উন্মোচিত হয়। তা সত্ত্বেও প্রশ্ন উঠেছে ‘নিম্নবর্গের মানুষ কি সত্যিই কথা বলতে পারে?’- এই প্রশ্নের উত্তরে সজ্জিত উপাত্ত নিয়ে ইতিহাসে যে দলিত শ্রেনি, তপশিলি জাতির উচ্চারনও সমানভাবে প্রতীয়মান, সেই জায়গাটি বাংলা ভাষায় ইতিহাসচর্চার আলোকে যিনি সম্মুখে আনেন তিনি হলেন অন্যতম ইতিহাসবেত্তা রূপ কুমার বর্মন। যার কলমে বিভিন্ন গ্রন্থে দলিত শ্রেনি, তপশিলি শ্রেণির তথা নিম্নশ্রেনির ইতিহাস, আত্মকথন, স্বকীয় রচনাগুলি পরিস্ফুটিত হয়েছে। লেখকের ‘সমকালীন পশ্চিমবঙ্গ জাতপাত জাতি-রাজনীতি ও তপশিলি সমাজ’ গ্রন্থটিও এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নয়।

ইতিহাসচর্চা বস্তুনিষ্ঠতা, বিজ্ঞানবাদিতা, নিরপেক্ষতা সহ নানা নতুন অনুষঙ্গ নিয়ে ক্রমশই অগ্রবর্তী হচ্ছে। ইতিহাসবেত্তাদের কলমে ক্রমশই পরিবেশ, খাদ্যাভ্যাস, মহামারি, বিজ্ঞান, ক্রীড়াসহ নানাবিধ চর্চা বিশ শতকে নানা আবর্ত আলোচিত হতে দেখা যায়।

মুখ্যত বাংলা ভাষায় জাতপাত, জাতি-রাজনীতি ও তপশিলি সমাজ বিষয়ক আলোচনার আবর্ত দীর্ঘকাল যাবৎ ইতিহাসচর্চাকারীদের কলমে অপাংক্তেয় অবস্থাতেই থেকে গিয়েছিল। ঔপনিবেশিক কালপর্বে এবং সাম্প্রতিকে কিছুক্ষেত্রে জাতিচেতনা, দলিত আন্দোলন নিয়ে লেখালেখি হলেও মূলত তা ক্ষুদ্র গণ্ডির মধ্যেই সীমায়িত। কাজেই কলকাতার গাঙচিল প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত রূপ কুমার বর্মনের ‘সমকালীন পশ্চিমবঙ্গ জাতপাত জাতি-রাজনীতি ও তপশিলি সমাজ’ এই গ্রন্থটি জাতপাতের ও আঞ্চলিক ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে একটি নতুন দিকনির্দেশক গ্রন্থ তা বলাই যায়।

লেখক মূলত সমকালীন পশ্চিমবঙ্গকে এক্ষেত্রে অনুধাবন করেছেন। অসংখ্য সাক্ষাৎকার ও ক্ষেত্রসমীক্ষা সহ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংযোজন এবং অসংখ্য প্রবন্ধ অন্তর্ভুক্তিকরনের প্রয়াসের ফসল এই গবেষণা গ্রন্থটি। শিরোনামেই ধরা পড়েছে গ্রন্থের মূল নির্যাস। যার মধ্যে সমকালীন পশ্চিমবঙ্গের জাতপাত, জাতি-হিংসা, তপশিলিদের সামাজিক স্তরীকরণে কী অবস্থা, অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা, নারীদের বৈষম্যকরনের পাশাপাশি ডান-বাম রাজনীতির আবহে এই তপশিলি জাতির চিত্রপটের স্বরূপ অনুধাবন, জাতিকেন্দ্রিক রচনা, কিছু ব্যক্তিত্বের বর্ননের সাথেও সরকারী নীতি, বিভাগ স্থাপন, প্রতিস্থান নির্মান ও নামকরন প্রভৃতি নানাবিধ বিষয়ের সংযুক্তকরুন বইটিকে এক অনন্য মাত্রা দান করেছে।

রুপ কুমার বর্মনের গ্রন্থটিতে ভূমিকা, অধ্যায়ীকরন, উপসংহার, সুদীর্ঘ গ্রন্থ তালিকা সহ বিভিন্ন সাক্ষাৎকারের সন্নিবিষ্টকরন পরিলক্ষিত করতে পারি। গ্রন্থ তালিকায় প্রাথমিক তথ্যাদি সহ বিভিন্ন আঞ্চলিক রচনা, অফিসিয়াল ও লেখ্যাগারের তথ্যাদি ও বৈদেশিক গ্রন্থের প্রয়োগ গ্রন্থটির প্রামাণ্যতাকে নির্দেশ করে। অতিরিক্ত তথ্যাদির এই ব্যবহার গ্রন্থটিকে আরো প্রাঞ্জল করেছে।

গ্রন্থটির ভূমিকাংশে জাতপাত এবং জাতি, বর্ণবাদের উৎপত্তির ব্যাখ্যা থেকে শুরু করে প্রাচীন ও আদি মধ্যযুগের বর্ণবাদের বিকাশ এবং ক্রমশই যে জাতপাতের ভারতীয় সমাজে নিম্নবর্ণীয়দের প্রান্তিকায়িত করার আভাস তার ব্যাখ্যা দেখতে পায়। লেখক ইসলামিক এবং ঔপনিবেশিক সময়কালেও গ্রন্থগুলি অবলোকন করে ভারতীয় সমাজের নিম্নবর্ণীয়দের কি অবস্থান, তারা কিভাবে জাতি বৈষম্যের শিকার সেই ব্যাখ্যা করেছেন এবং পরবর্তীকালে বিভিন্ন আইন এবং প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা মধ্য দিয়ে নিম্নবর্ণীয়দের অবস্থা যে ক্রমিক প্রভু-দাস সম্পর্কের (patron-client Relationship) বন্ধনে নিমজ্জিত হয়েছে। এবং প্রান্তিকিকরন হয়ে যাওয়ার যে ব্যাখ্যা সেটা আমরা দেখতে পাই এবং স্বাধীনতার সময়কালে ভারতের নিম্ন বর্ণের জাতি জাতি হিংসা অবসানের যে প্রচেষ্টা এবং সেই প্রচেষ্টায় তপশিলি জাতি এবং জনজাতীয় অন্যান্য পিছিয়ে পড়া জাতির স্বরূপ কতটা বিকাশমূলক হয়েছে তার ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এবং খুব সুস্পষ্টভাবে ভারতীয় প্রেক্ষিতে পরিবর্তনের অনুধাবন করার চেষ্টা করেছেন এবং সমকালীন পশ্চিমবঙ্গেও জাতপাতের যে ধারাবাহিকতা সেটির আলোচনা করেছেন।

বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে তপশিলি জাতি ক্রমিক কিভাবে মৌখিক তথা বাহ্যিক এবং মানসিক জাতপাতের শিকার হচ্ছে সেই নব ব্যাখ্যাও এক্ষেত্রে সুস্পষ্ট।

গ্রন্থটির বিভিন্ন অধ্যায়ে বিভিন্ন আঙ্গিকে এই জাতপাত, জাতি-রাজনীতি, জাতি-হিংসা, জাতি-বৈষম্য এই বিষয়গুলি পরিস্ফুটিত হয়েছে। প্রথম অধ্যায়ে পশ্চিমবঙ্গে জাতপাত, জাতি হিংসা এবং সামাজিক সংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক স্তরীকরণের ক্ষেত্রে জাতপাতের যে গুরুত্বপূর্ণ সেই ব্যাখ্যা যেমন আলোচিত হয়েছে তেমনি অন্য মেরুতে পশ্চিমবঙ্গের শহরাঞ্চলে চলতে থাকা বাচিক, মানসিক, ব্যবহারগত জাতপাতের যে অন্ধকার দিক সেটি লেখক তুলে ধরেছেন।
দ্বিতীয় অধ্যায়ে স্বাধীনতার পর্বে পশ্চিমবঙ্গের পরিবর্তনকালীন রাজনীতি জাতপাত বা জাতি রাজনীতি কে কতটা ত্বরান্বিত করেছে এবং তপশিলি জাতির বিকাশ তথা উন্নয়ন নাকি তপশিলিরা রাজনীতির শিকার হয়েছে সেই ব্যাখ্যায় আমরা মূলত সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত পর্যবেক্ষিত হতে দেখি।

গ্রন্থটির তৃতীয় অধ্যায় মূলত বাংলার নিম্নবর্ণীয়দের নিজস্ব স্বকীয় লেখনীর মাধ্যমে তাদের অবস্থা নির্ণয়ের বা নির্মাণের আলোকে উঠে এসেছে। খুব সুন্দর ভাবেই লেখক বিভিন্ন জীবনী সাহিত্য, সৃজনধর্মী সাহিত্য অবলোকন এবং ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে সাম্প্রতিক পশ্চিমবঙ্গে নিম্নবর্ণের উত্থানের প্রশ্নটিই উত্থাপন করেছেন। গ্রন্থটির চতুর্থ অধ্যায়ে বাংলার তপশিলি সমাজের থেকে রাজনীতিতে প্রতিনিধিত্বকরণ এবং বেশ কিছু নিম্নবর্ণীয় মানুষের বিস্মৃত স্মৃতির নতুন করে চর্চা এবং চর্যার জগতে আনার আলোকে রচিত হয়েছে।

জাতপাত, জাতি-বৈষম্য, জাতি রাজনীতি এই শব্দবন্ধগুলি ভারতীয় সমাজের আদি থেকে বর্তমান পর্যন্ত সমানভাবেই বহমান হয়ে রয়েছে। সমাজে অন্যকে দেখার মানসিকতা, প্রভু-দাসত্বের সম্পর্ক উচ্চবর্ণ-নিম্নবর্ণের রূপক বর্তমান বিশ্বায়ন এবং প্রযুক্তির যুগেও সমভাবেই জাজ্বল্যমান সেটি পরিস্ফুটিত হয়েছে। গ্রন্থটি অনুধাবন করলে আমরা এই বিষয়টির সুস্পষ্ট বর্ণনা ফুটে উঠতে দেখতে পারি। কাজেই শুধুমাত্র ইতিহাস চর্চার আলোকে বা ইতিহাস পাঠকদের কাছেই নয়, সমাজের প্রতিটি মানুষের কাছে এই বইটির এক অন্যকথনের গল্প বলে যে গল্প জাতপাত, জাতি হিংসা, বৈষম্য প্রভৃতি বিষয়ের সংযোজনে জাতপাতের ইতিহাসে এই গ্রন্থটির গুরুত্বকে বর্নিত করে।

অনেক প্রশ্নের জবাব রূপ কুমার বর্মনের সমকালীন পশ্চিমবঙ্গ জাতপাত জাতি-রাজনীতি ও তপশিলি সমাজ’ গ্রন্থটি সজ্জা, জাতি ইতিহাসের নানা আঙ্গিকে বর্ননা, নির্ভরযোগ্য গ্রন্থতালিকা এবং সার্বিক-সুস্পষ্ট বর্ননা গ্রন্থটিকে অনন্য মাত্রা দান করে। হাল আমলে দাঁড়িয়ে জাতপাতের বর্ননা, আঞ্চলিক প্রেক্ষিত, জাতি-হিংসার নানা দিকের উন্মোচন এবং বিভিন্ন তথ্যাদির প্রয়োগে সার্বিকভাবে সমকালীন বাংলার জাতপাতের ইতিহাস নির্মানের ক্ষেত্রে এক দিকনির্দেশক পাঠ হয়ে উঠেছে রূপ কুমার বর্মনের ‘সমকালীন পশ্চিমবঙ্গ জাতপাত জাতি-রাজনীতি ও তপশিলি সমাজ’ গ্রন্থটি।

গ্ৰন্থ আলোচনা
সমকালীন পশ্চিমবঙ্গ: জাতপাত, জাতি-রাজনীতি ও তপশিলি সমাজ
রূপ কুমার বর্মণ
গাঙচিল প্রকাশনী, কলকাতা, ২০২২, দাম- ৪০০ টাকা
.....

সাৰ্থক লাহা, গবেষক, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।

;

নজরুল পুত্রবধূ কল্যাণী কাজীর শেষ ইচ্ছা



সোমঋতা মল্লিক
নজরুল পুত্রবধূ কল্যাণী কাজীর শেষ ইচ্ছা

নজরুল পুত্রবধূ কল্যাণী কাজীর শেষ ইচ্ছা

  • Font increase
  • Font Decrease

“তোমার মহাবিশ্বে কিছু হারায় না তো কভু।

আমরা অবোধ, অন্ধ মায়ায় তাই তো কাঁদি প্রভু।।"

১৪ মে, সকাল। কলকাতার রবীন্দ্র সদনে সমবেত কণ্ঠে ধ্বনিত হল এই নজরুল সঙ্গীত। বহুল প্রচলিত গানটি এই বিশেষ দিনে আমার কাছে ধরা দেয় অন্যরূপে। সমুখে শায়িত রয়েছেন সদ্য প্রয়াত কাজী নজরুল ইসলামের কনিষ্ঠ পুত্রবধূ শ্রীমতী কল্যাণী কাজী। নিথর দেহে পুষ্পের অঞ্জলি। তাঁকে ঘিরে তাঁর আপনজনদের এই মর্মস্পর্শী উচ্চারণ মনকে ব্যাকুল করে।

তাঁর সঙ্গে আমার দীর্ঘ ১২-১৩ বছরের আত্মিক সম্পর্ক। ছায়ানট (কলকাতা)-এর হাত ধরেই যদিও এই সম্পর্ক শুরু হয়, কিন্তু পরবর্তীতে তিনি হয়ে উঠেছিলেন আমাদের পরিবারের একজন। তাঁর কাছ থেকে যে ভালোবাসা পেয়েছি তা অবর্ণনীয়। আমার জীবনে এই প্রথম নজরুল জন্মজয়ন্তী যেদিন কল্যাণী কাজী আর সশরীরে আমাদের মধ্যে নেই। একথা ভাবলেই চোখ ভরে ওঠে জলে। বছরের এই বিশেষ দিনগুলিতে তাঁর সাথে দেখা হলে মনে হত, কি অসীম ভালোবাসায় তিনি আমাদের প্রাণের কবিকে অন্তরে ধারণ করেন। আর পাঁচজন শিশুর মতো তিনিও নজরুলকে ভালোবেসেছেন শৈশবেই।


'অন্তরঙ্গ অনিরুদ্ধ' বইয়ের ভূমিকায় তিনি লিখেছেন, "ছেলেবেলা থেকেই আমার প্রিয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। 'প্রভাতী', ‘লিচুচোর’ থেকে শুরু করে ‘বিদ্রোহী', 'আমার কৈফিয়ৎ’ ‘কান্ডারী হুঁশিয়ার’, ‘ইন্দ্রপতন’ প্রভৃতি কবিতা বিভিন্ন বয়সে মনে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। ছবিতে তাঁর ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া চুল আর বড় বড় ভাবালু চোখ দুটোর দিকে মুগ্ধ বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকতাম। খুব কাছ থেকে তাঁকে দেখার ইচ্ছা হত। মনে পড়ছে, একবার গৃহশিক্ষককে অনুরোধ করেছিলাম তাঁকে দেখতে নিয়ে যাবার জন্য। কিন্তু কেন জানি না শেষ পর্যন্ত যাওয়া হয়ে ওঠেনি। নিয়তি সেদিন অলক্ষ্যে নিশ্চয় হেসেছিলেন। নয়ত যে মানুষটাকে শুধু মাত্র চোখের দেখা দেখবার জন্য সেদিন ব্যাকুল হয়েছিলাম - পরবর্তী জীবনে তাঁরই পরিবারের একজন হয়ে তাঁর কাছে থেকে তাঁকে সেবা করার সুযোগ পেলাম কি করে? একেই বোধহয় বলে ‘বিধিলিপি’!

এই বিরল ব্যক্তিত্বের খুব কাছের মানুষ হয়েও, দুর্ভাগ্যবশত আমি সুস্থ অবস্থায় তাঁকে পাইনি। আমি এ বাড়ীর ছোট বউ হয়ে আসার বেশ কয়েক বছর আগেই বিস্মৃতি তাঁর চেতনার ওপর কালো পর্দা টেনে দিয়েছিল। তবুও আমাদের সবার প্রিয় ‘মামনি’ প্রমীলার স্নেহচ্ছায়ায় থেকে, তাঁর যতটুকু সেবা করার সুযোগ পেয়েছি তাতেই আমি ধন্য।"


এভাবেই কাজী অনিরুদ্ধর সঙ্গে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হওয়ার সুবাদে নজরুল পরিবারের একজন হয়ে উঠেছিলেন তিনি। বহু অন্তরঙ্গ আড্ডায় তিনি পরিবারিক স্মৃতিচারণা করতেন।

প্রথমবার তাঁর শ্বশুরবাবা কে সামনে থেকে দেখার অনুভূতির বর্ণনা যখনই দিতেন, মনে হত আমরাও সেই সময়ে উপস্থিত হয়েছি। তাঁর কথা বলার ভঙ্গি ছিল অসাধারণ। অতি সামান্য ঘটনাও তাঁর বাচনভঙ্গিতে হয়ে উঠত অসাধারণ।

তাঁকে ঘিরেই জমে উঠত আড্ডা। কখনও কথা, আবার কখনও গেয়ে উঠতেন একের পর এক নজরুল সঙ্গীত। নিয়মিত দূরদর্শনে নজর রাখতেন কোন্ শিল্পী কিভাবে নজরুলের গান গাইছেন। বিভিন্ন চ্যানেলের প্রভাতী অনুষ্ঠান দেখতে খুবই ভালোবাসতেন। পরিচিত শিল্পী হলে অনুষ্ঠানের পরেই চলভাষের মাধ্যমে অভিনন্দন জানাতেন। এভাবেই তিনি ভালোবাসায় আবদ্ধ করে রাখতেন সকলকে।

নজরুল চর্চার সঙ্গে যুক্ত যে কোন ব্যক্তি/সংগঠনকে তিনি আপন করে নিতেন। তাঁর পূর্ণদাস রোডের বাড়িতে ছিল নজরুল প্রেমীদের নিত্য যাতায়াত। নজরুল বিষয়ক আলোচনায় তাঁর ক্লান্তি ছিলনা। যে কোন সময়, যে কোন পরিস্থিতে তিনি পাশে থেকেছেন। ২০১৭ সালে কলকাতার বুকে প্রথম নজরুল মেলার আয়োজন করে ছায়ানট (কলকাতা), উদ্বোধক কল্যাণী কাজী। শিশুদের জন্য নজরুলের লেখা ২৫টি ছড়া ও কবিতা নিয়ে ২০২১ সালে ছায়ানটের উদ্যোগে কল্যাণী কাজীর কণ্ঠে ‘শিশু কিশোরদের নজরুল’ শিরোনামে একটি অ্যালবাম প্রকাশিত হয়। পরম যত্নে তাঁর হাতে গড়া দল 'বিষের বাঁশী' ছায়ানট (কলকাতা) - এর বহু অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছে।


নজরুল সঙ্গীতের শিক্ষা তিনি কিভাবে পেয়েছিলেন সেই বিষয়ে কল্যাণী কাজী স্মৃতিচারণা করেছেন, "সর্বজন শ্রদ্ধেয় শিল্পী শ্রী ধীরেন্দ্র চন্দ্র মিত্রের কাছে গান শেখার সুযোগ পাই। কিন্তু আজ আমার মনে হচ্ছে আমি সে সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে পারিনি। বাংলা গানের সাথে সাথে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতেও যাতে ব্যুৎপত্তি লাভ করতে পারি,  তিনি তার জন্যে আপ্রাণ চেষ্টা করতেন। কিন্তু আমার তখন চটুল গানের দিকেই ঝোঁক বেশি, তাই রাগ সঙ্গীতের জটিল পথে চলতে মন চাইত না। যতদিন যাচ্ছে ততই বুঝতে পারছি গলাকে স্ববশে রেখে গান গাইতে হলে, বিশেষ করে নজরুল গীতিকে প্রাণবন্ত করতে রাগ সঙ্গীত চর্চা খুবই দরকার।

আজ সঙ্গীতের শিক্ষকতা করতে গিয়ে নজরুল গীতির সঙ্গে সঙ্গে ছাত্র-ছাত্রীদের সব রকমের বাংলা গানের চাহিদা যে মেটাতে পারি, তারজন্য আমি আমার গুরু শ্রদ্ধেয় শ্রী ধীরেন্দ্র চন্দ্র মিত্রের কাছে বিশেষ ভাবে কৃতজ্ঞ। সেদিন যদি তিনি জোর করে খেয়াল, ঠুংরী, দাদরা, গীত, গজল এর সাথে সাথে কীর্তন, পুরাতনী, রাগপ্রধান প্রভৃতি গান না শেখাতেন, তবে গানের অনেক ধারাই আমার অজানা থেকে যেত। কাজী নজরুলের গানের সঙ্গে প্রকৃত পক্ষে তিনিই আমায় প্রথম পরিচয় করান। প্রথম যে নজরুল গীতিটা শিখিয়েছিলেন সেটা হল হাম্বির রাগে নিবদ্ধ 'আজো কাঁদে কাননে কোয়েলিয়া'। এরপর তিনি শেখালেন 'ভোরের ঝিলের জলে', 'প্রথম প্রদীপ জ্বালো', 'শাওন আসিল ফিরে', 'ফুলের জলসায় নীরব কেন কবি' প্রভৃতি নজরুলের রাগভিত্তিক গানগুলো।


আমার স্বামী অনিরুদ্ধ যখন নজরুল গীতির স্বরলিপির বই 'রাগবিচিত্রা'-র প্রস্তুতি নেন, তখন আমিই হাম্বির রাগের গানটির স্বরলিপির কাজে সাহায্য করেছিলাম। তিনি গানটা জানতেন না। অপ্রচলিত গানটা পরে খুবই জনপ্রিয় হয়েছে।" 

তিনি অসুস্থ ছিলেন বেশ কয়েকমাস, কিন্তু তাঁর জীবনীশক্তি ছিল প্রবল। জীবনের বহু দুঃসময়কে তিনি জয় করেছিলেন অবলীলায়। ১২ মে ভোরে নজরুল অনুরাগীদের চোখের জলে ভাসিয়ে অনন্তলোকে পাড়ি দিলেন তিনি।

তাঁর কন্যা অনিন্দিতা কাজী বলেছেন মায়ের শেষ ইচ্ছের কথা। শোকবার্তায় অনিন্দিতা লিখেছেন - "মায়ের শেষ ইচ্ছা ছিল তাঁর নিজের বাড়িতে (৭৪ এইচ, পূর্ণদাস রোড, ট্রায়াঙ্গুলার পার্ক) দাদু ও ঠাকুমার স্মৃতির উদ্দেশ্যে একটা আর্কাইভ হবে।"

আমরা সকলেই চাই তাঁর শেষ ইচ্ছে পূরণ হোক।

সোমঋতা মল্লিক, নজরুল সঙ্গীতশিল্পী ও গবেষক। সভাপতি, ছায়ানট (কলকাতা)।

;

বাজারে এলো আতিফ ওয়াফিকের বই ‘এটিকেট এনসাইক্লোপিডিয়া’ 



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

এইচ এম আতিফ ওয়াফিক, যোগাযোগের ক্ষেত্রে একজন বিশেষজ্ঞ, তার সর্বশেষ বই "এটিকেট এনসাইক্লোপিডিয়া" বাজারে এসেছে। এই বইটি আজকের পাঠকদের দ্রুত-গতির বিশ্বে সঠিক আচরণের শিল্প সম্পর্কে একটি সমসাময়িক দৃষ্টিভঙ্গি সরবরাহ করবে বলে লেখক মনে করেন।

একটি সমাজে যেখানে আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্ক ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, "এটিকেট এনসাইক্লোপিডিয়া" সেই ব্যক্তিদের জন্য একটি অমূল্য সম্পদ হিসাবে কাজ করবে বলে লেখক মনে করেন। বিশেষ করে আজকের স্কুল এবং কলেজ পড়ুয়া ছাত্র ছাত্রী দের এই বই টি অনেক কাজে আসবে। এই বইটি পাঠকদের আধুনিক আচরণের সূক্ষ্মতা আয়ত্ত করতে সাহায্য করার জন্য ব্যবহারিক পরামর্শ এবং কার্যকরী টিপস প্রদান করে৷

"এটিকেট এনসাইক্লোপিডিয়া" যত্ন সহকারে গবেষণা করা হয়েছে, পাঠকদের সমসাময়িক শিষ্টাচারের নিয়ম সম্পর্কে সর্বশেষ অন্তর্দৃষ্টি এবং নির্দেশিকা প্রদান করে। এর সহজ ভাষা এবং উপস্থাপন উদাহরণ সহ, সমস্ত পটভূমির পাঠকদের জন্য উপযুক্ত, তারা তাদের সামাজিক দক্ষতা পোলিশ করতে চাইছে বা তাদের পেশাদার চিত্র উন্নত করতে চাইছে।

এইচ এম আতিফ ওয়াফিক একজন অন্বেষিত যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ, তার আকর্ষক কথা বলার ব্যস্ততা এবং অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ পরামর্শের জন্য পরিচিত। বর্তমানে তিনি সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন ইউনিভার্সিটি অব স্কলার্স এ ।

রিডিং ক্যাফে, বনানীতে বইটি উন্মোচনের সময়, জনাব ববি হাজ্জাজ (একজন অক্সফোর্ড স্কলার), জনাব সোলায়মান শুকন (একজন বাংলাদেশী যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ), জনাব শাহরিয়ার নাফীস (সাবেক জাতীয় ক্রিকেটার), জনাব হাসান মাহমুদ (প্রতিষ্ঠাতা, স্কুল অফ ইঞ্জিনিয়ার্স), জনাব বেনজির আবরার (প্রতিষ্ঠাতা, এক্সিলেন্স বাংলাদেশ), মিসেস আফরুজা তানজি (রাষ্ট্রদূত, ওয়ান ইয়াং ওয়ার্ল্ড), মিসেস শারমিন কবির (প্রতিষ্ঠাতা, রিতু), মিসেস ইশরাত নাহের ইরিনা (প্রতিষ্ঠাতা, প্রেসক্রিপশন বাংলাদেশ), জনাব ফাহিন আরাফিন (ক্রিয়েটিভ হেড, স্বপ্ন), জনাব সালেহীন মাহবুব (বিশ্ববিদ্যালয় অনুষদ), মিসেস ফারহানা শারমিন (ডিজিটাল স্ট্র্যাটেজিস্ট, রিমার্ক এইচবি), এবং আরও অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী প্রিয় শিক্ষার্থীউপস্থিত ছিলেন।

;

কলকাতা আলীপুর জেল মিউজিয়ামে 'নজরুল কক্ষ'



কনক জ্যোতি, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
কলকাতা আলীপুর জেল মিউজিয়ামে 'নজরুল কক্ষ'

কলকাতা আলীপুর জেল মিউজিয়ামে 'নজরুল কক্ষ'

  • Font increase
  • Font Decrease

আধুনিক বাংলা সাহিত্যে তিনি একক ও অনন্য। তিনি কাজী নজরুল ইসলাম। যার অগ্নিঝরা লেখনি ত্রস্ত করেছে ঔপনিবেশিক শাসকদের। যার বই বার বার বাজেয়াপ্ত হয়েছে। যাকে কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে কাটাতে হয়েছে দিনের পর দিন।

নজরুল শতবর্ষ আগে বন্দি ছিলেন কলকাতার আলীপুর সেন্ট্রাল জেলখানায়। নজরুল বিষয়ক সংগঠন ছায়ানট কলকাতা শিল্প, সঙ্গীত, সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা-গবেষণার পাশাপাশি নজরুল স্মৃতিধন্য হেরিটেজ স্থান ও স্থাপনাসমূহ রক্ষায় জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সক্রিয় রয়েছে। ছায়ানট কলকাতার সভাপতি, বিশিষ্ট শিল্পী, সোমঋতা মল্লিক কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতের নজরুলতীর্থগুলো নিজে গিয়ে সেগুলো রক্ষার প্রশাসনিক ও নাগরিক তৎপরতা চালিয়ে ছিলেন। যার ফলে এবছর নজরুল জয়ন্তীতে কলকাতা আলীপুর জেল মিউজিয়ামে স্থাপিত হয়েছে 'নজরুল কক্ষ'।


ছায়ানট কলকাতা সভাপতি সোমঋতা মল্লিক বার্তা২৪.কম'কে জানান, গত ১৪ ডিসেম্বর,২০২২ তারিখে ছায়ানট (কলকাতা) তথ্য সহ WBHIDCO - এর কাছে এই মর্মে আবেদন করে যে, নজরুল স্মৃতি বিজড়িত আলিপুর জেল মিউজিয়ামে কাজী নজরুল ইসলাম যে জায়গায় বন্দি হিসেবে ছিলেন, সেই জায়গাটি চিহ্নিত করা এবং নজরুল মূর্তি স্থাপন করার জন্য।

তিনি বলেন, গত ১৭ জানুয়ারি,২০২৩ তারিখে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে নজরুলের আগমনের শতবর্ষকে স্মরণ করে ছায়ানট (কলকাতা) এবং আলিপুর মিউজিয়াম যৌথভাবে একটি অনুষ্ঠানও পালন করে।

শনিবার (২৬ মে) আমরা সত্যিই আনন্দিত, আমাদের এই প্রস্তাব তাঁরা বিবেচনা করেছেন এবং আলিপুর মিউজিয়ামে 'নজরুল কক্ষ' তৈরি হয়েছে, জানান সোমঋতা মল্লিক।

;