অ্যাবি আহমেদ শান্তিতে নোবেল পেলেন পশ্চিমাপ্রীতির কারণে!

জাভেদ পীরজাদা, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট
অ্যাবি আহমেদ

অ্যাবি আহমেদ

  • Font increase
  • Font Decrease

অ্যাবি আহমেদ শান্তিতে নোবেল পেলেন এবার। থানবার্গ পাননি। বয়স হয়তো অল্প। নিউজিল্যান্ডের জাসিন্ড্রা পাননি। অথচ তিনিই বেশি পাওয়ার যোগ্য ছিলেন। না দেওয়ার কারণ মুসলিমদের পক্ষে দাঁড়ানো এবং নিজেকে নাস্তিক ঘোষণা দেওয়া। আমাজানের আদিবাসী নেতা রাওনি মেতুকটায়ারকে না দেওয়ার কারণ আমাজানে দাবানল অটুট থাকুক আমেরিকার স্বার্থে। আরো দুটি জার্নালিজম বেইসড সংগঠন ছিল পুরস্কার পাওয়ার তালিকায়। তারাও পায়নি। বরং অ্যাবিকে দিলে লাভ নগদে দুই দেশ ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়া জাতির বৈরিতার অবসান ঘটানোর কথা বেশি প্রচার করা যাবে। সেই সঙ্গে পশ্চিমাদের বন্ধু অ্যাবি আহমেদকেও পুরস্কার দিয়ে হাতে রাখা যাবে এ কারণে খনিজ সম্পদের পরিমাণ ওই এলাকায় এত বেশি যে ওগুলোও হাতিয়ে নেওয়া যাবে। নোবেল নিয়ে রাজনীতি পুরনো। অরুন্ধতী রায় এবছরের জুলাইতে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মজা করে বলেন, “নোবেল শান্তি পুরস্কার ভারতের মোদিজীও পেয়ে বসলে আমি অবাক হব না। বা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দিলেও। এ নিয়ে আমার আগ্রহ নেই।”

◤ জাসিন্ড্রা ও থানবার্গ ◢


নোবেলে শান্তি পুরস্কার নিয়ে রাজনীতি

২০১৫ সালে তিউনিশিয়ার চারটি নাগরিক সংগঠনকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। নোবেল কমিটির মতে, এই চার সংগঠন গণতন্ত্রের জন্য আলোচনায় মধ্যস্থতার মাধ্যমে তিউনেশিয়ায় বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছে। তিউনিসিয়ার নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিত্বকারী এই চার সংগঠন হলো, তিউনিসিয়ান জেনারেল লেবার ইউনিয়ন (ইউজিআইটি), দ্য তিউনিসিয়ান কনফেডারেশন অব ইন্ডাস্ট্রি, ট্রেড অ্যান্ড হ্যান্ডিক্রাফটস (ইউটিআইসিএ), তিউনিসিয়ান হিউম্যান রাইটস লিগ (এলটিডিএইচ) এবং তিউনিসিয়ান অর্ডার অব ল’ইয়ারস। কারণ, ২০১০ সালের ১৮ ডিসেম্বর পুলিশের দুর্নীতি ও দুর্ব্যবহারের প্রতিবাদে মোহাম্মদ বোয়াজিজি নামের এক তরুণের আত্মাহুতির মাধ্যমে তিউনিসিয়ায় আন্দোলন শুরু হয়। সেই আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানের রূপ পায় এবং ২০১১ সালের ১৪ জানুয়ারি দেশটির প্রেসিডেন্ট জিনে আল আবিদিন বেন আলির ২২ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। নোবেলে আমাদের দেশের গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহম্মদ ইউনূসও শান্তি পুরস্কার পান। তার পুরস্কার গ্রহণের পর আমেরিকান অর্থনীতিবিদ পল সুইজি বলেছিলেন, “ইউনূস কি শান্তি প্রতিষ্ঠা করলেন? ক্ষুদ্র লোন দিয়ে?” ২০০৯ সালে মার্কিন রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামাকে নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রদান নিয়ে নোবেল কমিটির প্রাক্তন সচিব গের লুন্ডেস্টাড সম্প্রতি একটি বই লিখে দাবি করেছেন, নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য ওবামার নাম মনোনয়ন যথাযথ ছিল না। তাঁকে নোবেল পুরস্কার প্রদানের প্রস্তাবে পাঁচ সদস্যের একজন ক্ষোভে-দুঃখে পদত্যাগও করেছিলেন!

রাজনীতির অস্ত্র হিসেবে শান্তি পুরস্কারের ব্যবহারের এমন অভিযোগ অতীতেও বহুবার উঠেছে। পুরস্কার দিয়ে রাজনীতি করবার পাশাপাশি পুরস্কার না দিয়ে রাজনীতি করবার অভিযোগও কম নয়। খেয়াল করলে দেখা যাবে, ওবামা যে শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন, মহাত্মা গান্ধী তা পাননি। অখচ মহাত্মা গান্ধীর ‘অহিংস রাজনীতি’ তো বিশ্বসেরা। এসব হিসেব মিলিয়েই এবছর অ্যাবি আহমেদ পেলেন বলে মনে করছেন অনেক ইনটেলেকচুয়ালরা।

গত বছর আবি আহমেদের প্রচেষ্টাতেই ইরিত্রিয়ার সঙ্গে ইথিওপিয়ার পুরনো বৈরিতার অবসান ঘটেছে। দুটি দেশ ও জাতিকে এক সুতোয় গাঁথার জন্য আবি এবার নোবেল পেতেই পারেন। ১৯৯৮ সালে শুরু হওয়া সীমান্ত যুদ্ধে দু দেশের প্রায় ৭০ হাজার মানুষ নিহত হন। ২০০০ সালে শান্তিচুক্তি হলেও উত্তেজনা বহাল ছিল।

◤ ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যাবি আহমেদ ও ইরিত্রিয়ার প্রেসিডেন্ট ইসায়িয়াস আফকের্কি ◢


গত বছরের ৯ জুলাই ইরিত্রিয়ার রাজধানী আসমারাতে ‘শান্তি ও বন্ধুত্বের যৌথ ঘোষণা’য় সই করেন ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যাবি আহমেদ ও ইরিত্রিয়ার প্রেসিডেন্ট ইসায়িয়াস আফকের্কি। গত বছরের এপ্রিলে অ্যাবি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই একের পর এক বিভিন্ন ধরনের সংস্কারনীতি গ্রহণ করতে থাকেন। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্যে থাকা দেশটিতে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন তিনি। শুরুতেই তিনি জরুরি অবস্থার অবসান ঘটান, বন্দিদের মুক্ত করে দেন, বিদেশিদের জন্য বিনিয়োগের সুযোগও অংশত উন্মুক্ত করে দেওয়ার ঘোষণা দেন। দুই দশক বৈরি সম্পর্ক পুষে রাখা ইরিত্রিয়ার সাথেও সংলাপ শুরু করেন তিনি। এর ফলেই হয় শান্তিচুক্তি। হয় যুদ্ধের অবসান, যে যুদ্ধ চলছিল প্রায় বিশ বছর ধরে।

কে এই অ্যাবি আহমেদ

গত বছরের ২ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর আফ্রিকা মহাদেশের সর্বকনিষ্ঠ এ সরকারপ্রধান খুব দ্রুততার সঙ্গে এমন কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন, যেগুলো দেশে-বিদেশে ইথিওপীয়দের মনে আশা সঞ্চার করেছে। ক্ষমতায় এসেই তিনি হাজার হাজার রাজনৈতিক বন্দিকে মুক্তি দিয়েছেন, সেন্সরশিপের নামে বন্ধ থাকা শত শত ওয়েবসাইট চালু করেছেন, ইরিত্রিয়ার সঙ্গে ২০ বছর ধরে চলা যুদ্ধের ইতি টেনেছেন, রাষ্ট্রের জরুরি অবস্থা তুলে নিয়েছেন।

রাজধানী আদ্দিস আবাবার চিত্রটাই যেন পাল্টে গেছে। আগের সরকারের চাপে পিষ্ট থাকা মানুষগুলো এখন যেন একটু বুক উঁচিয়ে হাঁটতে পারছে, মন খুলে হাসার একটা উপলক্ষ এখন তাদের সামনে আছে, কয়েক দশক ধরে যেটি তাদের জীবনে ছিল না।

◤ ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবা ◢


ইথিওপিয়ায় ৯০টিরও বেশি সংখ্যালঘু সম্প্রদায় আছে। সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলো একটি অন্যটির সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত। দশকের পর দশক দেশটির রাজনীতি যে ঘূর্ণাবর্তে ছিল, তাতে এ বিভেদ আরো বেড়েছে। সবচেয়ে বড় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নাম ‘ওরোমো’। দেশের মোট জনসংখ্যার তিন ভাগের এক ভাগ মানুষই এ সম্প্রদায়ের। প্রধানমন্ত্রী অ্যাবিও এ সম্প্রদায়ের। ইথিওপিয়ার অবস্থা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে, ওরোমো থেকে কেউ প্রধানমন্ত্রী না হলে গৃহযুদ্ধ নিশ্চিত। তিনি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর এখন শান্তির বার্তা ইথিওপিয়ার সর্বত্র।

আবি বিস্ময়করভাবে সব নৃ-গোষ্ঠীর মধ্যে সমান জনপ্রিয়। তার নিজের নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ও এর পেছনে অনেকাংশে দায়ী। তার বাবা ছিলেন ওরোমো মুসলমান এবং মা ছিলেন খ্রিস্টান। অ্যাবি আহমেদ মার্কিন মুল্লুকে পড়াশোনা করেছেন। চার্চেও যান। মদও খান। মাও খিস্ট্রান। এক মেয়েও খিস্ট্রান। তিনি ওরোমো, আমরাহা, টাইগারি ও ইংরেজি ভাষায় সমান পারদর্শী। মিনেসোটার ওই জনসভার ভাষণে তিনি ইথিওপিয়ার রাষ্ট্রীয় তিনটি ভাষাই ব্যবহার করেছিলেন। এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশ সোমালিয়ার মানুষদের সম্মানে তিনি সোমালি ভাষায়ও কথা বলেছিলেন। তিনি সেই মানুষ যখন যেখানে যেভাবে রাজনীতি করতে হয় সেটি পারেন। যেটি পারেন না ইরিত্রিয়ার প্রেসিডেন্ট ইসায়িয়াস আফকের্কি। তিনি খাঁটি মুসলমান। পশ্চিমা আগ্রাসনবিরোধী। আচ্ছা অ্যাবি আহমেদের সাথে তো তারই শান্তি চুক্তি হয়েছিল। কিন্তু ইসায়িয়াস আফকের্কিকেও যৌথভাবে দেওয়া হলো না কেন? “রাজনীতি এখানেই”—বলে শুক্রবার আলজাজিরার সুইডিশ প্রতিবেদক জেনিস স্মিমগা তার প্রতিক্রিয়া জানালেন।

আপনার মতামত লিখুন :