ময়মনসিংহ বড় মসজিদ



মো. আলী এরশাদ হোসেন আজাদ, অতিথি লেখক, ইসলাম
ময়মনসিংহ বড় মসজিদ

ময়মনসিংহ বড় মসজিদ

  • Font increase
  • Font Decrease

ইতিহাস-ঐতিহ্যের শহর বলে খ্যাত ময়মনসিংহ। এই শহরে ইতিহাসের অন্যতম নিদর্শন হয়ে আছে বড় মসজিদ। ময়মনসিংহের ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে লেখা বিভিন্ন গ্রন্থে বড় মসজিদের কথা গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। ময়মনসিংহে নগর সভ্যতার বিকাশে স্থানীয় হিন্দু-মুসলমান সমাজের সহাবস্থান ছিল, বড় মসজিদের অবস্থান তার ঐতিহাসিক দলিল। মসজিদের পাশে থানা ও একটি মন্দির আছে। রয়েছে একটি কবরস্থানও। বড় মসজিদ ময়মনসিংহ বিভাগের কেন্দ্রীয় দ্বীনি প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিগণিত।

হজরত শাহজালাল রহমাতু্ল্লাহি আলাইহির আগমনের ২৫০ বছর আগে শাহ মুহাম্মদ সুলতান কমরউদ্দিন রুমি (রহ.) বৃহত্তর ময়মনসিংহে ইসলাম প্রচার করেন। বাংলার স্বাধীন সুলতান সৈয়দ আলাউদ্দিন হোসেন শাহের পুত্র সৈয়দ নাসিরুদ্দিন নসরত শাহের নামে প্রতিষ্ঠিত ‘নাসিরাবাদ’কে কেন্দ্র করে আদি ময়মনসিংহের গোড়াপত্তন। পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের তীরে ১ মে ১৭৮৭ প্রতিষ্ঠিত ময়মনসিংহ জেলা, এখন বিভাগীয় মহানগরী। ‘আইন-ই-আকবরি’ অনুযায়ী, ‘মোমেনশাহী পরগনার শাসনকর্তা মোমেনশাহের নামানুসারে পরগনার নাম হয় মোমেনশাহী।’ পরবর্তী সময়ে আলাপসিং পরগনার ‘সিংহ’ যুক্ত হয়ে উচ্চারণ পরিবর্তনে হয় ময়মনসিংহ’ (ইসলামি বিশ্বকোষ)।

বৃহত্তর ময়মনসিংহের কেন্দ্রীয় মসজিদ চকবাজারের ‘বড় মসজিদ’। ঈদ, জুমায় অসংখ্য মানুষ বাস-ট্রেনে চড়ে, হেঁটে বহুদূর থেকে আসেন ‘বড় মসজিদে’র বরকত নেওয়ার জন্য।

বর্তমান কোতোয়ালি থানাসংলগ্ন চকবাজার নামক স্থানে আনুমানিক পৌনে দুই শ’ বছর আগে (১৮৫০/১৮৫২ খ্রি.) গণ্যমান্য মুসলমানরা নামাজ আদায়ের জন্য টিনের ছাপরা মসজিদ নির্মাণ করেন। এই মসজিদটিই ময়মনসিংহের গর্ব ও ঐতিহ্যের স্মারক ‘বড় মসজিদ’। ১৯৩৫ সালের বেঙ্গল ওয়াকফ অ্যাক্টের অধীনে মসজিদটি পাবলিক এস্টেটে পরিণত হয়।

ময়মনসিংহ বড় মসজিদের সামনের অংশ



প্রায় ০১.৯ একর জমির ওপর নির্মিত ‘বড় মসজিদ’ একটি তিনতলা সুরম্য স্থাপত্য। মসজিদটির দৈর্ঘ্য ১০৫ ফুট ও প্রস্থ ৮৫ ফুট। অন্তত পাঁচ হাজার মুসল্লি এখানে একত্রে নামাজ আদায় করতে পারে। ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সুসমন্বয়ে অপূর্ব অলংকরণে সুশোভিত মসজিদের ১২৫ ফুট উঁচু দুটি মিনার ও একটি কেন্দ্রীয় সুবৃহৎ গম্বুজে ব্যবহৃত হয়েছে চীনামাটির তৈজসপত্রের টুকরা দিয়ে তৈরি নান্দনিক নকশাকৃত আস্তরণ। মসজিদের পশ্চিম দিকে রয়েছে দুটি অনুচ্চ ফাঁপা গম্বুজ। ছাদের রেলিং দেওয়া হয়েছে মিনার-গম্বুজের আদলে ঢেউ খেলানো শোভায়। মসজিদের প্রধান তিনটি প্রবেশমুখেও আছে অনুচ্চ গম্বুজ শোভিত ফটক। মসজিদ আঙিনা অলংকৃত হয়েছে আরও কয়েকটি বৃহদাকৃতির অনুচ্চ গম্বুজ ও লতাপাতার বিন্যস্ততায় থোকায় থোকায় আঙুর শোভিত ফটক ও অনুচ্চ নকশা দেয়ালে।

মসজিদের প্রবেশমুখেই, জলকেলিরত রংবেরঙের মাছের শোভামণ্ডিত স্বচ্ছ-পবিত্র পানির দু’টি হাউস ও আলাদা অজুখানা। মসজিদের অভ্যন্তরে মূল্যবান মোজাইক পাথরের মেঝে, দেয়ালজুড়ে শেতশুভ্র মনোরম টাইলস, সুদৃশ্য ঝাড়বাতি, অত্যাধুনিক শব্দ নিয়ন্ত্রণ ও তাপানুকূল ব্যবস্থা। পবিত্র রমজানে অসংখ্য মুসল্লি জামাতবদ্ধভাবে এই মসজিদে ইতিকাফ করেন।

প্রতিষ্ঠাকাল থেকে ১৯৪০ খ্রি. পর্যন্ত মিসর থেকে আগত প্রখ্যাত কারি ও আলেম মাওলানা আবদুল আওয়াল (রহ.) ইমামের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪১ থেকে ১৯৯৭ খ্রি. পর্যন্ত টানা ৫৬ বছর হাকিমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানবি (রহ)-এর খলিফা, মুজাদ্দিদে মিল্লাত, জামানার কুতুব হজরত মাওলানা ফয়জুর রহমান (রহ.) ইমাম ও খতিবের দায়িত্ব পালন করেন। এ মহান আধ্যাত্মিক সাধকের পবিত্র ফায়েজ, খেদমত ও মেহনতে ‘বড় মসজিদে’র দ্যুতি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে।

১৯৯৭ খ্রি. থেকে হাদিয়ে জামান, পীরে কামেল, আল্লামা শায়খ আবদুল হক অত্যন্ত সুনাম ও দক্ষতার সঙ্গে ইমাম ও খতিবের দায়িত্ব পালন করছেন।

বড় মসজিদে রয়েছে মসজিদকেন্দ্রিক একটি মাদরাসা। ব্রহ্মপুত্র নদ তীরবর্তী ময়মনসিংহ সিটি করর্পোরেশনের প্রাণকেন্দ্রে বড় মসজিদ যুগ যুগ ধরে ময়মনসিংহের অন্যতম ধর্মীয় স্মারক হয়ে আছে।

   

হজ পালন করলেন ১৮ লাখ ৩৩ হাজার ১৪৬ জন



ইসলাম ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
আরাফাতের ময়দানে যাচ্ছেন হাজিরা, ছবি : সংগৃহীত

আরাফাতের ময়দানে যাচ্ছেন হাজিরা, ছবি : সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

চলতি হজ মৌসুমে বিশ্বের ১৮ লাখ ৩৩ হাজার ১৬৪ জন হজযাত্রী পবিত্র হজ পালন করেছেন বলে জানিয়েছেন সৌদি আরবের হজ ও উমরাবিষয়ক মন্ত্রী ড. তওফিক আল-রাবিয়া। দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা এসপিএ এ তথ্য জানিয়েছে।

শনিবার (১৫ জন) এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি মক্কা থেকে মিনা ও আরাফাত পর্যন্ত হজের পর্যায়গুলো কোনো বিপত্তি ছাড়া সফল হওয়া কথাও ঘোষণা করেন।

এদিকে, সৌদি আরবে জেনারেল অথরিটি ফর স্ট্যাটিস্টিকসের তথ্য অনুসারে, এবার বিশ্বের ২০০টির বেশি দেশ থেকে হজযাত্রী এসেছেন বলে জানানো হয়েছে।

তন্মধ্যে, এশিয়ার দেশ থেকে আসা হজযাত্রীর সংখ্যা ৬৩.৩ শতাংশ, আরব দেশ থেকে ২৩.৩ শতাংশ, আফ্রিকা অঞ্চল থেকে ১১.৩ শতাংশ এবং আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়া থেকে ৩.২ শতাংশ বলেও জানানো হয়।

সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ হজযাত্রীর সংখ্যা দুই লাখ ২১ হাজার ৮৫৪ জন এবং দেশের বাইরে থেকে আসা হজযাত্রীর সংখ্যা ১৬ লাখ ১১ হাজার ৩১০ জন। হজযাত্রীদের মধ্যে পুরুষ ৯ লাখ ৫৮ হাজার ১৩৭ জন এবং নারী হজযাত্রী ৮ লাখ ৭৫ হাজার ২৫ জন।

১৫ লাখ ৪৬ হাজার ৩৪৫ জন হজযাত্রী বিমানযোগে, ৬০ হাজার ২৫১ জন স্থলপথে এবং ৪ হাজার ৭১৪ জন সমুদ্রপথে সৌদি আরবে পৌঁছেছেন।

উল্লেখ্য, হজের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে শুক্রবার (১৪ জুন) থেকে। এদিন মিনায় অবস্থান শেষে শনিবার আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করে রাতে মুজদালিফার খোলা প্রান্তরে রাতযাপন করবেন। রোববার (১৬ জুন) হজের তৃতীয় দিন হাজিরা বড় জামারাতে কংকর নিক্ষেপ, পশু কোরবানি, মাথার চুল মুণ্ডন করবেন।

;

কোরবানির গোশত বণ্টনের সমাজপ্রথা মানা কি জরুরি



ইসলাম ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
কোরবানির গোশত, ছবি: সংগৃহীত

কোরবানির গোশত, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

কোনো কোনো এলাকায় কোরবানির গোশত বণ্টনের একটি সমাজপ্রথা চালু আছে। তা হলো- এলাকায় যারা কোরবানি করেন, তাদের কোরবানির গোশতের তিন ভাগের একভাগ সমাজে জমা ‎করতে হয়। পরে ওই গোশত নির্দিষ্ট সমাজভুক্ত সবার মাঝে (যারা কোরবানি করেছেন বা করেননি) বণ্টন করা হয়।

সাধারণ দৃষ্টিতে এটি একটি ভালো উদ্যোগ মনে হতে পারে, কিন্তু কোনো সামাজিক প্রথা বা রীতি পালন করার জন্য তা ‎শরিয়তের দৃষ্টিতে শুদ্ধ ও আমলযোগ্য কি না- তাও নিশ্চিত হতে হয়। ভালো নিয়ত থাকলেও শরিয়ত সমর্থন করে না ‎অথবা ইসলামের নীতির সঙ্গে মানানসই নয়- এমন কোনো কাজ করা বা এমন কোনো রীতি অনুসরণের সুযোগ ‎নেই।

বর্ণিত সামাজিক প্রথাটিতে উদ্দেশ্য ভালো হলেও যে পদ্ধতিতে তা করা হয় তাতে শরিয়তের দৃষ্টিতে মৌলিক কিছু আপত্তি ‎রয়েছে। তার অন্যতম হলো, সামাজিক এ প্রথার কারণে সবাই তার কোরবানির এক তৃতীয়াংশ গোশত সমাজের ‎লোকদের হাতে দিতে বাধ্য থাকে এবং এর বিলি-বণ্টন ও গ্রহিতা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে শুধু সমাজপতিদের হাত থাকে। ‎গোশত বণ্টনের ক্ষেত্রে এমন বাধ্যবাধকতা শরিয়তসম্মত নয়। কেননা শরিয়তে কোরবানি ও গোশত বণ্টন একান্তই কোরবানিদাতার নিজস্ব কাজ।

ঈদের দিন সম্মিলিতভাবে জামাতে নামাজ আদায় করতে বলা হলেও কোরবানির জন্য কত মূল্যের পশু কিনবে, সে পশু ‎কোথায় জবাই করবে, গোশত কীভাবে বণ্টন করবে- এ বিষয়গুলো কোরবানিদাতার ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

‎শরিয়তে কোরবানির কিছু গোশত সদকা করতে উৎসাহিত করা হয়েছে এবং আত্মীয়-স্বজন ও গরীব-দুঃখীদের কোরবানির ‎গোশত দিতে তাকিদ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তা কোরবানিদাতার ওপর অপরিহার্য করা হয়নি। বরং কোরবানিদাতা কী ‎পরিমাণ গোশত নিজে রাখবে, কী পরিমাণ সদকা করবে এবং কাকে কাকে বিলি করবে আর কী পরিমাণ আগামীর ‎জন্য সংরক্ষণ করবে- এগুলো কোরবানিদাতার একান্ত নিজস্ব ব্যাপার এবং ব্যক্তিগতভাবে করার কাজ। এটিকে ‎সামাজিক নিয়মে নিয়ে আসা ঠিক নয়।

শরিয়তের মাসয়ালা জানা না থাকার কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গোশত বণ্টনের বর্ণিত যে পদ্ধতি প্রচলিত- তা পরিহারযোগ্য। এখানে চলমান প্রথাটির কিছু ক্ষতির দিক উল্লেখ করা হলো-

এক. অনেক কোরবানিদাতার পরিবারের সদস্য-সংখ্যা বেশি হওয়ায় অথবা অন্যকোনো যৌক্তিক কারণে নিজ পরিবারের ‎জন্য বেশি গোশত রাখার প্রয়োজন হয়, ফলে সে পরিবারের জন্য বেশি গোশত রাখতে চায়। আবার অনেকে তার ‎কোনো দরিদ্র আত্মীয়কে কোরবানির গোশত দিতে চায়। কিন্তু সামাজিক এই বাধ্যবাধকতার কারণে অনিচ্ছা সত্ত্বেও ‎সামাজিক রীতি অনুযায়ী কোরবানির এক তৃতীয়াংশ গোশত সমাজে দিতে বাধ্য হয়। অথচ হাদিসে ইরশাদ ‎হয়েছে, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘কোনো মুসলমানের সম্পদ তার সন্তুষ্টি ব্যতীত হালাল নয়।’ -মুসনাদে আহমাদ : ২০৬৯৫

দুই. প্রচলিত প্রথায় গোশতদাতা তার দানের অংশটি কাকে দেবে সে স্বাধীনতা হারায়। হয়তো সে তার নিকটাত্মীয় অথবা ‎পরিচিত কাউকে একটু বেশি পরিমাণে দিত, কিন্তু এক্ষেত্রে তার জন্য এমনটি করার সুযোগ থাকে না।

তিন. অনেক মানুষ এমন আছেন, যারা প্রত্যেকের হাদিয়া বা সদকা গ্রহণ করতে চান না। আর শরিয়তও কাউকে সবার ‎হাদিয়া বা সদকা গ্রহণ করতে বাধ্য করেনি। কিন্তু সামাজিক এই রীতির কারণে গোশত গ্রহণকারী প্রত্যেকেই অন্য ‎সবার হাদিয়া বা সদকা গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। বলাবাহুল্য এ ধরনের ঐচ্ছিক বিষয়ে বাধ্যবাধকতা আরোপ করা ‎মোটেই উচিত নয়।

চার. এ ধরনের বাধ্যবাধকতা আরোপের আরেকটি ক্ষতির দিক হলো, সমাজের কিছু মানুষ এমন থাকে, যাদের আয় ‎রোজগার হারাম পন্থায় হয়। সেক্ষেত্রে জেনে বুঝে তাদের কোরবানির গোশত সমাজের সবার ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া ‎হয়। অথচ হারাম উপার্জনের মাধ্যমে কোরবানিকৃত পশুর গোশত খাওয়া জায়েজ নয়।

মোটকথা, শরিয়তের শিক্ষা মোতাবেক প্রত্যেককে তার কোরবানির অংশ দান করার বিষয়ে স্বাধীন রাখতে হবে। প্রচলিত পদ্ধতিতে বা অন্য কোনোভাবে বাধ্যবাধকতা আরোপ করা যাবে না। কোরবানিদাতা নিজ দায়িত্ব ও বিবেচনা মতো যাকে ‎যে পরিমাণ হাদিয়া করতে চায় করবে এবং গরিব-মিসকিনকে যে পরিমাণ সদকা করতে চায় করবে। নবী কারিম ‎সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময় থেকে শত শত বছর যাবৎ এ পদ্ধতিই চলমান আছে। এই পদ্ধতিই অবলম্বন ‎করা জরুরি। শরিয়ত যা চালু করতে বলেনি এমন কোনো প্রথা চালু করা থেকে বিরত থাকতে হবে। -সহিহ মুসলিম : ১৯৭২

;

জেনে নিন কোরবানি বিষয়ক প্রয়োজনীয় মাসয়ালা



ইসলাম ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
কোরবানির মাসয়ালা, ছবি: সংগৃহীত

কোরবানির মাসয়ালা, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

কোরবানি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এটি আদায় করা ওয়াজিব। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি এই ইবাদত পালন করে না- তার ব্যাপারে হাদিস শরিফে এসেছে, ‘যার কোরবানির সামর্থ্য রয়েছে কিন্তু কোরবানি করে না সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।’ -মুস্তাদরাকে হাকেম : ৩৫১৯

যাদের ওপর কোরবানি ওয়াজিব
প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থমস্তিষ্কসম্পন্ন প্রত্যেক মুসলিম নর-নারী, যে ১০ জিলহজ ফজর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবে তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব। টাকা-পয়সা, সোনা-রূপা, অলঙ্কার, বসবাস ও খোরাকির প্রয়োজন আসে না এমন জমি, প্রয়োজন অতিরিক্ত বাড়ি, ব্যবসায়িক পণ্য ও অপ্রয়োজনীয় সব আসবাবপত্র কোরবানির নেসাবের ক্ষেত্রে হিসাবযোগ্য।

আর নেসাব হলো- স্বর্ণের ক্ষেত্রে সাড়ে সাত (৭.৫) ভরি, রূপার ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন (৫২.৫) ভরি, টাকা-পয়সা ও অন্যান্য বস্তুর ক্ষেত্রে নিসাব হলো- এর মূল্য সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হওয়া। আর সোনা বা রূপা কিংবা টাকা-পয়সা এগুলোর কোনো একটি যদি পৃথকভাবে নেসাব পরিমাণ না থাকে কিন্তু প্রয়োজন অতিরিক্ত একাধিক বস্তু মিলে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হয়ে যায় তাহলেও তার ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব। - ফাতাওয়া তাতারখানিয়া : ১৭/৪০৫

কোরবানি করতে না পারলে
কেউ যদি কোরবানির দিনগুলোতে ওয়াজিব কোরবানি দিতে না পারে তাহলে কোরবানির পশু ক্রয় না করে থাকলে তার ওপর কোরবানির উপযুক্ত একটি ছাগলের মূল্য সদকা করা ওয়াজিব। আর যদি পশু ক্রয় করেছিল, কিন্তু কোনো কারণে কোরবানি দেওয়া হয়নি তাহলে ওই পশু জীবিত সদকা করে দেবে। - ফাতাওয়া কাজিখান : ৩/৩৪৫

যেসব পশু দ্বারা কোরবানি করা যাবে
উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা দ্বারা কোরবানি করা জায়েজ। এসব গৃহপালিত পশু ছাড়া অন্যান্য পশু যেমন হরিণ, বন্যগরু ইত্যাদি দ্বারা কোরবানি করা জায়েজ নয়। -বাদায়েউস সানায়ে : ৪/২০৫

কোরবানির পশুর বয়সসীমা
উট কমপক্ষে ৫ বছরের হতে হবে। গরু ও মহিষ কমপক্ষে ২ বছরের হতে হবে। আর ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা কমপক্ষে ১ বছরের হতে হবে। তবে ভেড়া ও দুম্বা যদি ১ বছরের কিছু কমও হয়, কিন্তু এমন হৃষ্টপুষ্ট হয় যে, দেখতে ১ বছরের মতো মনে হয় তাহলে তা দ্বারাও কোরবানি করা জায়েজ। অবশ্য এক্ষেত্রে কমপক্ষে ৬ মাস বয়সের হতে হবে।

উল্লেখ্য, ছাগলের বয়স ১ বছরের কম হলে কোনো অবস্থাতেই তা দ্বারা কোরবানি জায়েজ হবে না। -বাদায়েউস সানায়ে : ৪/২০৫-২০৬

উট, গরু, মহিষ সাত ভাগে এবং সাতের কমে যেকোনো সংখ্যা যেমন দুই, তিন, চার, পাঁচ ও ছয় ভাগে কোরবানি করা জায়েজ। অর্থাৎ কোরবানির পশুতে এক সপ্তমাংশ বা এর অধিক যেকোনো অংশে অংশীদার হওয়া জায়েজ। এক্ষেত্রে ভগ্নাংশ- যেমন, দেড় ভাগ, আড়াই ভাগ, সাড়ে তিন ভাগ হলেও কোনো সমস্যা নেই। -সহিহ মুসলিম : ১৩১৮

কোরবানির পশুতে আকিকার অংশ
কোরবানির গরু, মহিষ ও উটে আকিকার নিয়তে শরিক হতে পারবে। এতে কোরবানি ও আকিকা দুটোই সহিহ হবে। -রদ্দুল মুহতার : ৬/৩৬২

শরিকানা কোরবানির নিয়ম

শরিকদের কারও পুরো বা অধিকাংশ উপার্জন যদি হারাম হয় তাহলে কারও কোরবানি সহিহ হবে না।

যদি কেউ গরু, মহিষ বা উট একা কোরবানি দেওয়ার নিয়তে কিনে আর সে ধনী হয় তাহলে ইচ্ছা করলে অন্যকে শরিক করতে পারবে। তবে এক্ষেত্রে একা কোরবানি করাই শ্রেয়। শরিক করলে সে টাকা সদকা করে দেওয়া উত্তম। -ফাতাওয়া কাজিখান : ৩/৩৫০-৩৫১

রুগ্ন ও দুর্বল পশুর কোরবানি
এমন শুকনো দুর্বল পশু, যা জবাইয়ের স্থান পর্যন্ত হেঁটে যেতে পারে না তা দ্বারা কোরবানি করা জায়েজ নয়। -জামে তিরমিজি : ১/২৭৫

দাঁত নেই এমন পশুর কোরবানি
গরু-ছাগলের অধিকাংশ দাঁত না থাকলেও যে কয়টি দাঁত আছে তা দ্বারা যদি ঘাস চিবিয়ে খেতে পারে তবে সেটি দ্বারা কোরবানি সহিহ। কিন্তু দাঁত পড়ে যাওয়ার কারণে যদি ঘাস চিবিয়ে খেতে না পারে তবে ওই পশু কোরবানি করা যাবে না। -ফাতাওয়া আলমগীরী : ৫/২৯৮

যে পশুর শিং ভেঙে বা ফেটে গেছে
যে পশুর শিং একেবারে গোড়া থেকে ভেঙে গেছে, যে কারণে মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ওই পশুর কোরবানি জায়েজ নয়। কিন্তু শিং ভাঙার কারণে মস্তিষ্কে যদি আঘাত না পৌঁছে তাহলে সেই পশু দ্বারা কোরবানি জায়েজ। তাই যে পশুর অর্ধেক শিং বা কিছু শিং ফেটে বা ভেঙে গেছে বা শিং একেবারে উঠেনি, সে পশু দ্বারা কোরবানি করা জায়েজ। -জামে তিরমিজি : ১/২৭৬

কান বা লেজ কাটা পশুর কোরবানি
যে পশুর লেজ বা কোনো কান অর্ধেক বা তারও বেশি কাটা সে পশুর কোরবানি জায়েজ নয়। আর যদি অর্ধেকের কম হয় তাহলে তার কোরবানি জায়েজ। তবে জন্মগতভাবেই যদি কান ছোট হয় তাহলে অসুবিধা নেই। -জামে তিরমিজি : ১/২৭৫

মৃতের পক্ষ থেকে কোরবানি
মৃতের পক্ষ থেকে কোরবানি করা জায়েজ। মৃত ব্যক্তি যদি অসিয়ত না করে থাকে তবে সেটি নফল কোরবানি হিসেবে গণ্য হবে। কোরবানির স্বাভাবিক গোশতের মতো তা নিজেরাও খেতে পারবে এবং আত্মীয়-স্বজনকেও দিতে পারবে। আর যদি মৃত ব্যক্তি কোরবানির অসিয়ত করে গিয়ে থাকে তবে এর গোশত নিজেরা খেতে পারবে না। গরীব-মিসকিনদের মাঝে সদকা করে দিতে হবে। -মুসনাদে আহমাদ : ১/১০৭

অন্যের ওয়াজিব কোরবানি আদায় করতে চাইলে
অন্যের ওয়াজিব কোরবানি দিতে চাইলে ওই ব্যক্তির অনুমতি নিতে হবে। অনুমতি নিলে এর দ্বারা ওই ব্যক্তির কোরবানি আদায় হয়ে যাবে। নতুবা ওই ব্যক্তির কোরবানি আদায় হবে না। অবশ্য স্বামী বা পিতা যদি স্ত্রী বা সন্তানের বিনা অনুমতিতে তার পক্ষ থেকে কোরবানি করে তাহলে তাদের কোরবানি আদায় হয়ে যাবে। তবে অনুমতি নিয়ে আদায় করা ভালো।

গোশত, চর্বি বিক্রি করা
কোরবানির গোশত, চর্বি ইত্যাদি বিক্রি করা জায়েজ নয়। বিক্রি করলে পূর্ণ মূল্য সদকা করে দিতে হবে। -ইলাউস সুনান : ১৭/২৫৯

বিদেশে থাকা ব্যক্তির কোরবানি অন্যত্র করা
বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তির জন্য নিজ দেশে বা অন্য কোথাও কোরবানি করা জায়েজ।

কোরবানিদাতা এক স্থানে আর কোরবানির পশু ভিন্ন স্থানে থাকলে কোরবানিদাতার ঈদের নামাজ পড়া বা না পড়া ধর্তব্য নয়; বরং পশু যে এলাকায় আছে ওই এলাকায় ঈদের জামাত হয়ে গেলে পশু জবাই করা যাবে।

কোরবানির পশুর হাড় বিক্রি
কোরবানির মৌসুমে অনেকে কোরবানির হাড় ক্রয় করে থাকে। টোকাইরা বাড়ি বাড়ি থেকে হাড় সংগ্রহ করে তাদের কাছে বিক্রি করে। এদের ক্রয়-বিক্রয় জায়েজ। এতে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু কোনো কোরবানিদাতার জন্য নিজ কোরবানির কোনো কিছু এমনকি হাড়ও বিক্রি করা জায়েজ নয়। করলে মূল্য সদকা করে দিতে হবে। আর জেনেশুনে মহাজনদের জন্য এদের কাছ থেকে ক্রয় করাও বৈধ হবে না। -ফাতাওয়া হিন্দিয়া : ৫/৩০১

কাজের লোককে কোরবানির গোশত খাওয়ানো
কোরবানির পশুর কোনো কিছু পারিশ্রমিক হিসাবে দেওয়া জায়েজ নয়। গোশতও পারিশ্রমিক হিসেবে কাজের লোককে দেওয়া যাবে না। অবশ্য এ সময় ঘরের অন্যান্য সদস্যদের মতো কাজের লোকদের গোশত খাওয়ানো যাবে। -আল বাহরুর রায়েক : ৮/৩২৬

জবাইকারীকে পারিশ্রমিক দেওয়া
কোরবানির পশু জবাই করে পারিশ্রমিক দেওয়া-নেওয়া জায়েজ। তবে কোরবানির পশুর কোনো কিছু পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া যাবে না। -কিফায়াতুল মুফতি : ৮/২৬৫

;

৪০ বছর ধরে বিনামূল্যে হজযাত্রী পরিবহন করেন তিনি



ইসলাম ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
সাদ জারুল্লাহ আল রশিদ আল তামিমি, ছবি: সংগৃহীত

সাদ জারুল্লাহ আল রশিদ আল তামিমি, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

সৌদি আরবের হাইলের বাসিন্দা আল তামিমি ৪০ বছর ধরে বিভিন্ন উপায়ে এই অঞ্চল এবং আশেপাশের এলাকার লোকদের হজের সময় বিনামূল্যে পরিবহন সেবা দিয়ে আসছেন। সেবার অংশ হিসেবে তিনি ওই অঞ্চলের লোকদের মক্কায় পৌঁছে দেন।

আরব নিউজের সঙ্গে হাজিদের সেবার স্মৃতিচারণের সময় সাদ জারুল্লাহ আল রশিদ আল তামিমি বলেন, তিনি হাইলের ১০০ কিলোমিটার দক্ষিণে আল-গাজালা গভর্নরেটের আল-মাহাশ গ্রামের বাসিন্দা।

১৯৭৮ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বাবার অসিয়ত অনুযায়ী নিজ এলাকার বাসিন্দাসহ আশেপাশের লোকদের মক্কা এবং মাশায়েরে মোকাদ্দাসায় (মিনা, আরাফাত ও মুজদালিফায়) নিয়ে আসছেন। এখন তার ছেলে জিএমসির মাধ্যমে হজযাত্রীদের সেবা করেন।

তামিমি জানান, তার বাবা দুই বার হজ পালন করেছেন। তিনি তার মা ও ভাইয়ের সঙ্গে উটে চড়ে প্রথম হজপালন করেন। তখন মক্কায় পৌঁছতে তার একমাস সময় লাগে। দ্বিতীয় হজ গাড়িতে করে আদায় করি, তাতে সময় লাগে মাত্র ৯ দিন।

তিনি আরও বলেন, হজের সময় সেবা দেওয়ার জন্য ৪০ বছর ধরে গাড়ির প্রয়োজনীয় জ্বালানী এবং রক্ষণাবেক্ষণ খরচ আগেই জমিয়ে রাখেন। এ ছাড়া হজযাত্রীদের যাতে কোনো সমস্যা না হয়, সে জন্য কফি, চা ও অন্যান্য খাবার সঙ্গে নিয়ে যেতেন। নিজের খরচের ব্যাপারে কারও কাছ থেকে কোনো ধরনের সাহায্য নেননি।

তিনি একটি বড় বাস দিয়ে সেবা দেওয়া শুরু করেন। বাসটিতে ৮৫ জন একসঙ্গে বসতে পারত। পরে তা দোতলা করা হয়। ওপরের অংশটি পুরুষদের এবং নীচের অংশটি ছিল নারীদের জন্য।

তামিমি তার এলাকায় শিক্ষার্থীদের বাসে করে স্কুলে আনা-নেওয়ার কাজ করেন।

হজযাত্রীদের সেবায় ব্যবহৃত পরিবহন, ছবি: সংগৃহীত

আল-তামিমি জানান, আমার কাছে একটি নোটবুক ছিল। যেখানে আগ্রহী হজযাত্রীরা রমজান মাসে তাদের নাম লিপিবদ্ধ করে যেত। সে সময় হজযাত্রা কঠিন ছিল বিধায়, এই নিয়মটি আমাকে মানতে হয়েছে- বলে উল্লেখ করেন।

এক প্রশ্নের উত্তরে আল-তামিমি বলেন, পাকিস্তান, ভারত, আফগানিস্তান, মিসর, জর্ডান, তিউনিসিয়া ও মরক্কোসহ অনেক দেশের মানুষ তার সঙ্গে হজযাত্রা করেছেন।

হজযাত্রায় নানা ঘটনা রয়েছে, একটি ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এক ভারতীয় প্রথমে হজে যাওয়ার জন্য নাম লেখায়, পরে সে হজে যাবে না জানানোর পর অন্য একজনকে সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু যাত্রা শুরুর আগের দিন তিনি হজে যাবেন বলে মনস্থির করেন এবং পরে পুরো রাস্তা দাঁড়িয়ে যান। তার আবেগ এবং কষ্ট আমাকে দারুণভাবে শিহরিত করে।

সে সময় আল-গাজালা থেকে আল-নুকরা পর্যন্ত রাস্তা ছিল অত্যন্ত খারাপ। বিশেষ করে বৃষ্টির সময় চলাচল করা কষ্ট হত। তখন মানুষ জীবনের কষ্ট সহ্য করত।

আল-তামিমির ছেলে রশিদ আল বকর তার সঙ্গে প্রায় ১৫ বছর ধরে হাজিদের সেবা করে আসছেন। তিনি বলেন, আমার সন্তানদের বলা আছে, হজযাত্রীদের পরিষেবা চালিয়ে যেতে।

হজযাত্রার স্মতিচারণে তিনি বলেন, হজের দিনগুলোতে বিভিন্ন পরিবার একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হযত, পরে তাদের মাঝে অনেকে ছেলে-মেয়েদের বিয়ে দিয়ে আত্মীয়তাও করে নেয়।

বর্তমান সময়ের হজ ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে, হজযাত্রা অত্যন্ত সহজ ও নিরাপদ হয়েছে।

;