চটকদার উমরার প্যাকেজ থেকে সাবধান!

মুফতি এনায়েতুল্লাহ, বিভাগীয় প্রধান, ইসলাম
বিভিন্ন এজেন্সির উমরার প্যাকেজ, ছবি: সংগৃহীত

বিভিন্ন এজেন্সির উমরার প্যাকেজ, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

মো. আবেদিন ফারুক। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। তার খুব ইচ্ছা উমরা পালন করার। সে লক্ষে তিনি খোঁজ-খবর নেওয়া শুরু করলেন। কিন্তু বিভিন্ন উমরা এজেন্সির ঘোষণাকৃত নানা প্যাকেজ দেখে তিনি হয়রান। সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না, কী করবেন।

দুই-তিন দিন খোঁজ নিয়ে তিনি যে ধারণা পেলেন, তার সারমর্ম হলো- টাকা বেশি সেবা বেশি, এটা মূখ্য নয়। মূখ্য উমরা এজেন্সি অর্থাৎ সেবা দানকারী প্রতিষ্ঠানের মনোভাব। তারা ইচ্ছা করলেই তবে আরামে-স্বচ্ছন্দে উমরা পালন করা সম্ভব; অন্যথায় নয়।

উমরার সফর কয়দিনের হবে, শেয়ারিং বেড, এয়ারলাইনস নির্বাচন ও রোড নির্ধারণ, সৌদি আরবের অভ্যন্তরের বিভিন্ন পরিবহন সেবা, মিটার হিসেবে কাছে কিংবা দূরের হোটেলে থাকা, হোটেল মানের বিষয়ে মতামত দেওয়া, সকালের নাস্তা ও দু’বেলা খাবারের ব্যবস্থা, মক্কা-মদিনার বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থানগুলো দেখানোর ব্যবস্থা, এজেন্সির গাইডের সেবা, ভিসার জন্য সার্ভিস চার্জ ও ভ্যাট দেওয়ার মতো বিষয়গুলোতে সিদ্ধান্ত নেওয়া নিয়ে আবেদিন ফারুক বেশ চিন্তিত। কারণ, একেক এজেন্সি বিষয়গুলোকে নানাভাবে উপস্থাপন করে বিভিন্ন প্যাকেজ অফার করছে। ভিআইপি, এক্সক্লুসিভ, ডিলাক্স, প্রিমিয়াম ও স্ট্যান্ডার্ডসহ অনেক নাম। আখেরে কোন প্যাকেজটা বেছে নেবেন আবেদিন ফারুক সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না।

এভাবে আবেদিন ফারুকের মতো হজ-উমরা পালনকারীর ৯০ ভাগ বাধ্য হয়ে স্মরণাপন্ন হন, আগে হজ-উমরা পালনকারী কারো। তিনি দেখিয়ে দেন কোনো হজগাইড অথবা স্থানীয় মুয়াল্লিম বা এজেন্সির প্রতিনিধিকে। তিনি বুঝিয়ে, এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করে হজ-উমরার ব্যবস্থা করেন। এভাবে নিজের অজান্তেই আবেদিনরা কোনো না কোনো হজগাইডের সেবা নেন। অর্থাৎ হজ-উমরার ক্ষেত্রে গাইড পদ্ধতি বেশ সনাতন, আপাতত এর কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। কারণ, সরাসরি এজেন্সির কাছে উমরা বা হজ পালনকারী আসে খুব কম। ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে এজেন্সি কর্তৃপক্ষও দেশের বিভিন্ন জায়গায় এজেন্সির প্রতিনিধি ও পার্টনারসহ নানা পরিচয়ে হজগাইডদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলেন।

গলদটা এখানেই। অনেক সময় দেখা যায়, হজ-উমরা পালনকারীর চাহিদা, স্থানীয় গাইডের সুযোগ-সুবিধা ও এজেন্সির মুনাফার সমন্বয় ঘটে না। দেখা দেয় বিপত্তি। তাই জেনে-শুনে-বুঝে বিশ্বস্ত এজেন্সি নির্বাচন করা জরুরি।


এক্ষেত্রে আমাদের পরামর্শ হলো, হজ-উমরা গমনের আগে স্থানীয় মুয়াল্লিম বা গাইডকে সঙ্গে নিয়ে এজেন্সির মালিকের সঙ্গে সরাসরি আলাপ করে নেওয়া। গাইড আপনাকে কী কী সুবিধা দেবে সেটা এজেন্সির মালিকের উপস্থিতিতে নিশ্চিত হওয়া। তাহলে আর কোনো সমস্যা হবে না। আপনার যাত্রা হবে নির্বিঘ্ন ও আরামদায়ক।


প্রতিবছর বিশ্বের লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ উমরা পালন করেন। বাংলাদেশ থেকে গত বছর এক লাখ বিশ হাজার ধর্মপ্রাণ মানুষ উমরা পালন করেছেন। চলতি বছর মহররম মাসের ৫ তারিখ থেকে উমরা পালনকারীরা সৌদি আরব গমন করছেন। নানা জটিলতা ও প্রক্রিয়া শেষে চলতি সপ্তাহ থেকে বাংলাদেশ থেকে উমরা যাত্রী যাওয়া শুরু করেছেন।

সৌদি আরবে বাংলাদেশি উমরা যাত্রীদের বিভিন্ন সেবা প্রদানের জন্য সৌদি আরবের বিভিন্ন হজ-উমরা পরিচালনা কোম্পানির সঙ্গে দ্বি-পাক্ষিক চুক্তি করতে হয়। এ চুক্তির আওতায় উমরা যাত্রীদের জেদ্দা বিমান বন্দর থেকে মক্কার নির্দিষ্ট হোটেলে প্রেরণ, মক্কা থেকে মদিনা, পরে মদিনা থেকে এয়ারপোর্ট (মদিনা কিংবা জেদ্দা) যাতায়াতে গাড়ীর ব্যবস্থাসহ প্রয়োজনীয় সব কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। যাত্রী সংখ্যাভেদে যাতায়াতের এই সেবায় ঘটে তারতম্য। এখানে বাংলাদেশি এজেন্সির কোনো হাত নেই।

উমরা যাত্রীর ভিসা প্রসেসিং থেকে শুরু করে, অন্যান্য সেবার বিষয়গুলো স্থানীয় এজেন্সি দিয়ে থাকেন। যেমন ফ্লাইটের রুট ও ধরণভেদে টিকিট, হোটেল নির্বাচন ও খাবার ব্যবস্থা। মোটাদাগে এই হলো- উমরার খরচ।

এ বছর উমরা যাত্রীদের নতুন নিয়মের কারণে ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা বেশি গুনতে হবে। একই সঙ্গে যেনতেনভাবে থাকার হোটেল ও যাতায়াতের গাড়ির বুকিং দেখিয়ে আর ভিসা করা যাচ্ছে না। হোটেল বুকিং, যাতায়াতের টাকা আন্তর্জাতিক ব্যাংক হিসাবের (আইবিএএন) মাধ্যমে ভিসার আবেদনের সময় পরিশোধ করতে হচ্ছে।

সৌদি সরকার উমরার ভিসা ফি নতুন করে ৩০০ সৌদি রিয়াল সমপরিমাণ প্রায় ছয় হাজার ৬০০ টাকা আরোপ, সৌদি উমরা কোম্পানির সার্ভিস চার্জ ১০৫ রিয়াল ও ভিসা সার্ভিস বাবদ ৯৪ রিয়াল সুনির্দিষ্ট করে দেওয়ার কারণে এই খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে।

উমরার অফারসমূহ
বিভিন্ন এজেন্সির উমরার প্যাকেজ, ছবি: সংগৃহীত

 

সৌদি সরকার উমরার জন্য যে ফি ও অন্যান্য চার্জ নির্ধারণ করেছে তাতে হোটেল এবং যাতায়াতের খরচ বাদ দিয়ে আগের তুলনায় অতিরিক্ত ৩৫০ রিয়ালের কমবেশি প্রদান করতে হচ্ছে। এর আগে উমরা ভিসার জন্য এজেন্সিগুলোকে মাত্র ২০০ থেকে ২৫০ রিয়াল পরিশোধ করতে হতো। এই অর্থ সৌদি কোম্পানিগুলোর সার্ভিস চার্জসহ অন্যান্য কিছু চার্জের নামে নেওয়া হতো। সৌদি উমরা কোম্পানিগুলো প্রতিযোগিতামূলকভাবে তাদের ভিসা প্রতি সার্ভিস চার্জ ৪০ রিয়াল থেকে শুরু করে ১০০ রিয়াল পর্যন্ত গ্রহণ করতো। গাড়ি ভাড়া বাবদ গ্রহণ করত আরও ৫০ থেকে ৭০ রিয়াল। এক্ষেত্রে ভিসা প্রদান করা ছাড়া সৌদি হজ ও উমরা মন্ত্রণালয়ের অন্য কোনো দায় দায়িত্ব ছিলো না এবং কোনো রকমের ফিও নিতো না। আগের নিয়মে একটি হোটেল দেখিয়ে দিলেই হতো। কেউ চাইলেই কোনো উমরা এজেন্সি থেকে তাদের সার্ভিস চার্জসহ ৭ হাজার থেকে ৯ হাজার টাকা খরচ করে উমরা ভিসা নিয়ে নিজের উদ্যোগে উমরা পালনে চলে যেতে পারত। এ বছর থেকে সেটি আর সম্ভব হচ্ছে না।


প্রথম দিকে কিছু মিডিয়ায় উমরার খরচ কমবে মর্মে ভুল তথ্য পরিবেশিত হওয়ার কারণে কিছু বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। এ কারণে উমরার যাত্রীরা এজেন্সির ঘোষিত প্যাকেজে আস্থা রাখতে পারছেন না। বাস্তবতা হলো- এর আগে তো উমরার ওপর সৌদি সরকারের কোনো ফি ছিলো না। এখন নতুন করে ৩০০ রিয়াল ধার্য করা হয়েছে।


খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উমরা এজেন্সিগুলোর জন্য এ বছর সৌদি সরকার ১০৫ রিয়াল সার্ভিস চার্জ নির্ধারণ করে দিয়েছে। সৌদি সরকার অনুমোদিত সংস্থা মুয়াচ্ছাছার মাধ্যমে উমরাযাত্রীদের পরিবহন, হোটেল বুকিং এবং ভিসা ফি গ্রহণ করে অনলাইনে উমরা মোফা ইস্যু হবে। এক্ষেত্রে উমরা এজেন্সিগুলো এয়ারপোর্টে উমরা যাত্রীদের রিভিস করে গাড়িতে ওঠিয়ে দেওয়া এবং ফেরার সময় সময়মতো গাড়ির জন্য মুয়াচ্ছাছার সঙ্গে যোগাযোগ করে ব্যবস্থা করে দেওয়া ছাড়া বড় ধরনের কোনো কাজ নেই। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, সৌদি আরবের গাড়ির ব্যবস্থাপনা কোম্পানী (নাকাবা)-এর প্রতিনিধিদের সেভাবে বিমান বন্দরে পাওয়া যায় না। ফলে উমরা যাত্রীদের নিজ খরচে মক্কা যেতে হয়। চলতি সপ্তাহে একাধিক উমরাযাত্রী বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম-এর কাছে এ অভিযোগ করেছেন। এমতাবস্থায় করণীয় কী সেটাও অস্পষ্ট।

সৌদি সরকার হজ ও উমরা ভিসার জন্য নতুন করে ৩০০ রিয়াল ধার্য করলেও তিন বছরের মধ্যে দ্বিতীয়বার উমরার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ২০০০ রিয়াল প্রদানের যে বাধ্যবাধতা ছিল তা রাষ্ট্রীয় আদেশের মাধ্যমে তুলে নিয়েছেন। ফলে এখন কোনো ব্যক্তি নির্ধারিত ফি প্রদান করে যেকোনো সময়ই একাধিকবার উমরা পালন করতে পারবেন।

আপনার মতামত লিখুন :