Alexa

ইসলামে শ্রম ও শ্রমিকের মর্যাদা

ইসলামে শ্রম ও শ্রমিকের মর্যাদা

পৃথিবীতে বিচরণশীল সব প্রাণীর রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহতায়ালার, ছবি: সংগৃহীত

আল্লাহতায়ালা আসমান-জমিনের প্রাণী ও জড় সবকিছু সৃষ্টি করেছেন এবং আল্লাহতায়ালা তাদের রিজিকের দায়িত্ব নিজে গ্রহণ করেছেন। এ প্রসঙ্গে কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘পৃথিবীতে বিচরণশীল সব প্রাণীর রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহতায়ালার।’ -সূরা হুদ: ৬

আল্লাহতায়ালা সব প্রাণীর রিজিকের দায়িত্ব নেওয়ার অর্থ এটা নয় যে, মান্না ও সালওয়ার মতো প্রস্তুত করা খাদ্য সরবরাহ করবেন। বরং প্রাণীকে তার রিজিকের জন্য চেষ্টা করতে হবে। আল্লাহতায়ালা তার প্রচেষ্টায় ও শ্রমে বরকত দান করবেন এবং তারই মাধ্যমেই জীবিকার সুব্যবস্থা করবেন।

জীবিকা উপার্জনের নির্দেশ
ইসলাম জীবিকা উপার্জনের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দান করেছে। নবী-রাসূলরা জীবিকা উপার্জনের জন্য শ্রম ব্যয় করেছেন। শেষ নবী হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) ও তার সাহাবাগণ, জীবিকা উপার্জনের জন্য বিভিন্ন পেশা গ্রহণ করেছেন। বিনাশ্রমে অর্জন উপার্জন করাকে তারা ঘৃণা করতেন।

এ বিষয়ে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, নামাজ আদায়ের পর তোমরা জমিনে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ (জীবিকা) অন্বেষণ কর। -সূরা জুমুআ: ১০

নবী করিম (সা.) বলেছেন, জীবিকা অন্বেষণ করা (অপরাপর) ফরজ আদায়ের পর আরেকটি ফরজ। -মিশকাত ও বায়হাকি: ২৪২

জীবিকা উপার্জন নবী-রাসূলদের সুন্নত
নবী-রাসূলদের কোনো না কোনো পেশা ছিল। তারা অলস ছিলেন না। নিজ হাতে অর্জিত সম্পদ ভোগ করতেন। নবী-রাসূলরা ছাগল চরাতেন। নবী করিম (সা.) বলেন, পৃথিবীতে আল্লাহতায়ালা এমন কোনো নবী পাঠাননি যিনি বকরি চরাননি। সাহাবিরা (বিস্মিত হয়ে) আরজ করেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনিও কি (বকরি চরাতেন)? তিনি প্রত্যুত্তরে বলেন, হ্যাঁ আমিও কয়েক কিরাতের বিনিময়ে মক্কাবাসীদের বকরি চরাতাম।’ –সহিহ বোখারি: ১/৩০১

নবী করিম (সা.) আরও বলেন, কোনো ব্যক্তি নিজ হাতের উপার্জন থেকে আহার করা অপেক্ষা উত্তম খাদ্য কখনও আহার করেনি (অর্থাৎ নিজ হাতে অর্জিত আহার অপেক্ষা উত্তম কোনো খাদ্য নেই) আল্লাহর নবী হজরত দাউদ (আ.) নিজ হাতের অর্জিত সম্পদ খেতেন। -সহিহ বোখারি: ১/২৭৮

হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, হজরত মুসা (আ.) বিয়ের মোহর ও পানাহারের বিনিময়ে আট কিংবা দশ বছর নিজেকে মজুরিতে খাটিয়েছেন। -ইবনে মাজা

অন্য হাদিসে রয়েছে, হজরত দাউদ (আ.) ছিলেন বর্ম প্রস্তুতকারী, হজরত আদম (আ.) ছিলেন কৃষিবিদ, হজরত নূহ (আ.) ছিলেন কাঠমিস্ত্রী, হজরত ইদরিস (আ.) ছিলেন দর্জি এবং হজরত মুসা (আ.) ছিলেন রাখাল। -ফাতহুল বারি: ৪/৩০৪

নিজ হাতে অর্জিত জীবিকা সর্বোত্তম জীবিকা
হজরত রাফে ইবন খাদিজ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী করিম (সা) কে জিজ্ঞেস করলো, উত্তম উপার্জন কোনটি? হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রত্যুত্তরে বলেন, ব্যক্তির স্বীয় হাতের কাজ এবং হালাল ব্যবসার মাধ্যমে উপার্জন।

হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেন, তোমাদের স্বীয় (হাতে) উপার্জিত নিজ উপার্জিত সম্পদ থেকে ভক্ষণ করা খাদ্য হলো- উত্তম খাদ্য। অবশ্য তোমাদের সন্তান-সন্তুতিও নিজ উপার্জনের অর্ন্তভুক্ত অর্থাৎ সন্তানের উপার্জিত সম্পদও পিতা-মাতার জন্য তাদের নিজে উপর্জনের ন্যায়।

ইসলামে শ্রমের গুরুত্ব
নবী করিম (সা.) সাহাবায়ে কেরামকে কাজ করার নির্দেশ দিতেন। তিনি ইরশাদ করেছেন, তোমাদের নিজ হাতে রশি নিয়ে লাকড়ির বোঝা বেঁধে নিজ পিঠে করে তা বিক্রি করা, এর দ্বারা আল্লাহ কর্তৃক স্বীয় মর্যাদা রক্ষা করা (প্রয়োজনপূরণ করা) মানুষের কাছে সওয়াল করে অনুগ্রহ কিংবা লাঞ্চনা পাওয়ার চেয়ে উত্তম।

নবীর শিক্ষা করো না ভিক্ষা, মেহনত করো সবে। তিনি আরও বলেছেন, যদি কোনো মুসলমান গাছ লাগায় কিংবা জমি চাষ করে, অত:পর কোনো পাখি বা মানুষ কিংবা কোনো চতুষ্পদ জন্তু তা থেকে ভক্ষণ করে, তাহলে তা তার জন্য সদকা হিসেবে বিবেচ্য হবে। -সহিহ বোখারি: ১/৩১২

সৎ ব্যবসা ইবাদত
বিভিন্ন উপায়ে অর্থ উপার্জন করা যায়। তন্মধ্যে ব্যবসা হলো- উত্তম পন্থা। নবী করিম (সা.) বলেছেন, সত্যাশ্রয়ী, আমানতদার ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন নবী, সিদ্দিক ও শহীদদের সঙ্গে অবস্থান করবে। -ইবনে মাজাহ: ১/১৬৫

অন্য হাদিসে আরও ইরশাদ হয়েছে, ব্যবসায়ীদের পাপী হিসেবে হাশরে উঠানো হবে। মুত্তাাক, পুণ্যবান ও সৎ ব্যবসায়ী ছাড়া। -তিরমিজি: ১/২৩০

নবী করিম (সা.) আরও বলেছেন, আল্লাহতায়ালা ওই ব্যক্তিকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন যে ক্রয়-বিক্রয়ে উদারতা ও নম্রতা প্রদর্শন করে। -ইবনে মাজাহ

দ্রুত শ্রমিকের পারিশ্রমিক প্রদান
শ্রমিকের কাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার পারিশ্রমিক প্রদান করা কর্তব্য। এ ব্যাপারে শৈথিল্যতা প্রদর্শন করা বা গড়িমসি করা মহা অপরাধ। নবী করিম (সা.) বলেছেন, শ্রমিকের পারিশ্রমিক তার শরীরের ঘাম শুকাবার পূর্বেই প্রদান করো। -মিশকাত: ২৫৮

হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, বিচর দিবসে আমি তিন শ্রেণির মানুষের প্রতিপক্ষ হবো। ১. যে ব্যক্তি আমার নামের প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরে তা ভঙ্গ করেছে, ২. যে ব্যক্তি স্বাধীন ব্যক্তিকে বিক্রি করে তার মূল্য ভক্ষণ করেছে এবং ৩. যে ব্যক্তি কাউকে শ্রমিক নিযুক্ত করে নিজের কাজ আদায় করেছে, কিন্তু তার পারিশ্রমিক প্রদান করেনি। -সহিহ বোখারি: ১/৩০২

শ্রমিক উত্তম ব্যক্তি
কর্মহীন ব্যক্তি উত্তম ব্যক্তি নয়, বরং কর্মীই উত্তম। হজরত ঈসা (আ.) এক ব্যক্তিকে অসময়ে উপাসনালয়ে দেখে প্রশ্ন করলেন, তুমি এখানে কী করো, সে বললো আল্লাহর ইবাদত করি। হজরত ঈসা (আ.) বললেন, তোমার জীবিকার ব্যবস্থা কে করে? লোকটি বলল, আমার একজন ভাই আছে সে জীবিকার ব্যবস্থা করে। হজরত ঈসা (আ.) তখন বললেন, সে তোমার চেয়ে উত্তম। -হেদায়াতুল মুরশিদীন

কর্মহীন ব্যক্তিকে অবশ্যই অন্যের মুখাপেক্ষী হতে হবে, যা খুবই খারাপ। বেকারত্ব ও ভিক্ষাবৃত্তি মানুষের সামাজিক, মানসিক ও নৈতিক মর্যাদার অধ:পতন ঘটায়। নবী করিম (সা.) বলেছেন, কে আছ! আমার সঙ্গে ওয়াদাবদ্ধ হবে যে, সে কোনো দিন কারও কাছে কোনো কিছু চাইবে না; আমি তার জান্নাতের দায়িত্ব নিবো। হজরত সাওবান (রা.) বলেন, আমি (এ ব্যাপারে অঙ্গীরাবদ্ধ হলাম)। অত:পর তিনি জীবনে আর কখনও কারও কাছে কিছু চাননি। -সুনানে আবু দাউদ

আপনার মতামত লিখুন :