Barta24

রোববার, ২৫ আগস্ট ২০১৯, ১০ ভাদ্র ১৪২৬

English

মসজিদে হারামে সহজে যাতায়াতের গেট

মসজিদে হারামে সহজে যাতায়াতের গেট
বাদশা আবদুল আজিজ গেট, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
মুফতি এনায়েতুল্লাহ
বিভাগীয় প্রধান
ইসলাম
বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম


  • Font increase
  • Font Decrease

পবিত্র কোরআনে কাবা ঘরকে বিশ্বের সবচেয়ে পবিত্র ও মূল্যবান স্থান হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। কাবা ঘরকে মাঝে রেখে মসজিদের হারাম নির্মাণ করা হয়েছে। কাবাঘর নির্মাণের পর থেকে নানা সময়ে মসজিদের হারামের সম্প্রসারণ করা হয়েছে। সর্বশেষ সৌদি বাদশা আবদুল্লাহ বিন আজিজ কর্তৃক সম্প্রসারণের পর ২০১১ সালের হিসাব অনুযায়ী মসজিদে হারামের আয়তন দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ বর্গ মিটার। স্বাভাবিক ধারণ ক্ষমতা অনুযায়ী এতে একসঙ্গে ৯ লাখ মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। তবে হজ বা রমজানের সময় অতিরিক্ত আরও ৪০ লাখ লোকের স্থান সংকুলান হয় মসজিদে হারামে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/13/1563016348541.jpg
বাদশা ফাহাদ গেট, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

মসজিদের হারামে প্রবেশের জন্য ছোটবড় প্রায় দুই শ’ দরজা রয়েছে। হজমৌসুমে হাজিদের চলাচল স্বাভাবিক রাখতে সবগুলো দরজা খুলে দেওয়া হয়। কিন্তু ছোট-বড় দরজাগুলো দেখতে প্রায় এক রকম হওয়ায় অনেক সময় হাজি সাহেবরা নানারকম বিড়ম্বনায় পড়েন কাউকে খুঁজতে কিংবা নির্দিষ্ট রাস্তা দিয়ে বের হতে অথবা প্রবেশ করতে। তাই দরজাসমূহের নাম ও নম্বর দেখে মসজিদে প্রবেশ ও বের হয়ে আসা সহজ। সবগুলো দরজায় আরবি ও ইংরেজিতে নাম লেখা এবং নম্বর দেওয়া আছে।

অভিজ্ঞতার আলোকে দেখা গেছে, মসজিদে হারামে নামাজ আদায়, তাওয়াফ এবং সাই শেষ করে হাজিরা দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েন কোন গেট দিয়ে বের হবেন। যেহেতু মসজিদের হারামের চারপাশেই হাজি সাহেবরা থাকেন, তাই তাদের সহজে মসজিদে হারামে বের হতে ও প্রবেশ করার সুবিধার্থে এসব গেট ব্যবহার করার জন্য পরামর্শ দেওয়া হলো।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/13/1563016400448.jpg
উমরা গেট, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

যেসব হাজি সাহেব মিসফালা, কেদুয়া, কংকারিয়া, জাহারাত কুদাই, শারে মানসুর, দাখেলা, খালেদিয়া, শওকিয়া, কাকিয়া, নাক্কাসা, দৌড়কুদাই এলাকায় হোটেলে থাকবেন তারা কিং আবদুল আজিজ গেট বা ১ নম্বর গেট দিয়ে যাতায়াত করবেন।

যারা গাজজা, জারওয়াল, জান্নাতুল মুয়াল্লা, জুম্মাইজা, রিয়াদা খালেদ, মসজিদে জিন ও মক্তব বলদিয়া এলাকায় থাকবেন, তারা ওমরা ও সাই শেষ করে মারওয়া গেট দিয়ে বের হয়ে আসবেন।

তাইসির, বিন লাদেন, হুতাইপিয়া ও জাবালে কুবা এলাকার যারা থাকবেন, তারা মসজিদে হারামে যাতায়াতের জন্য কাবা এক্সেটনশনের টানেল দিয়ে বের হয়ে আসবেন অথবা বাদশাহ আবদুল্লাহ গেট দিয়ে যাতায়াত করবেন।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/13/1563016440921.jpg
বাদশা আবদুল্লাহ এক্সটেনশন গেট, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

আজিয়াত সৌদ, আজিয়াত মাসাফি, রিয়ালবখশ ও মাখবাতাল জিন এলাকায় থাকা হাজি সাহেবরা এক নম্বর গেট অথবা হজরত বেলাল গেট দিয়ে যাতায়াত করবেন।

মসজিদে হারামের দরজাসমূহের মধ্যে বাদশা আবদুল আজিজ গেট, বাদশাহ ফাহাদ গেট, আল ফাতাহ গেট ও ওমরাহ গেটকে প্রধান গেট হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

অন্য উল্লেখযোগ্য গেটগুলো হলো- আজইয়াদ গেট, হজরত বেলাল রা. গেট, হুনাইন গেট, হজরত ইসমাইল আ. গেট, সাফা গেট, বনি হাশেম গেট, হজরত আলী রা. গেট, হজরত আব্বাস রা. গেট, নবী করিম সা. গেট, আস সালাম গেট, শায়রা গেট, আল হুজুন গেট, উমলাত গেট, আল মুদ্দাআ গেট, আল মারওয়া গেট, আল মুহসাব গেট, আল আরাফাহ গেট, মিনা গেট, হজরত ওমর রা. গেট, আন নাদওয়া গেট, আস সামিয়া গেট, আল কুদস গেট, আল মদিনা গেট ও আল হুদায়বিয়া গেট।

আপনার মতামত লিখুন :

এবারের হজ ব্যবস্থাপনা যথেষ্ট ভালো ও সুন্দর হয়েছে: হজ কাউন্সিলর

এবারের হজ ব্যবস্থাপনা যথেষ্ট ভালো ও সুন্দর হয়েছে: হজ কাউন্সিলর
কাউন্সিলর মুহাম্মাদ মাকসুদুর রহমান, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

মক্কা (সৌদি আরব) থেকে: ২০১৯ সালের হজ ব্যবস্থাপনা বিগত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় যথেষ্ট ভালো ও সুন্দর হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন হজ অফিস মক্কার কাউন্সিলর মুহাম্মাদ মাকসুদুর রহমান।

হজ ব্যবস্থাপনা নিয়ে আমাদের যে লক্ষ্যমাত্রা ছিল এবং যে মান আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম তা পূরণ হয়েছে। হ্যাঁ, টুকটাক ঘাটতি আছে, তবে সেটা খুব বেশি নয়। ১ লাখ ২৭ হাজার হাজির ব্যবস্থাপনা খুব সহজ বিষয় না। কোনো কোনো বেসরকারি এজেন্সি কিছু ঝামেলা করেছে, সেটাও উল্লেখ করার মতো কিছু নয়। অতীতের তুলনায় তারা এবার ভালো সেবা দিয়েছে। কমিটমেন্ট রক্ষা করেছে। বিগত দিনের মতো কোনো এজেন্সি হাজিদের রাস্তায় রাখেননি, হাজিদের মক্কায় রেখে এজেন্সি কর্তৃপক্ষ পালিয়ে যায়নি, ফ্লাইট বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটেনি, এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগের সংখ্যা, অভিযোগের মাত্রা ও অভিযোগের গভীরতা বেশ কম বলেও মন্তব্য করেছেন হজ কাউন্সিলর।

শুক্রবার (২৩ আগস্ট) রাতে বাংলাদেশ হজ মিশনে বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম এর সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় তিনি এসব কথা বলেন। এক প্রশ্নের জবাবে সাতক্ষীরার সন্তান মুহাম্মাদ মাকসুদুর রহমান বলেন, অনেকক্ষেত্রে দায়েরকৃত অভিযোগ প্রত্যাহারের ঘটনাও ঘটে। কিন্তু আমরা কোনো অভিযোগ তামাদি করি না। সবগুলো ধর্ম মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করি। সেখানে তদন্ত (উভয়ের বক্তব্য শুনে) সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

হজ কাউন্সিলর বলেন, আমাদের কাছে এ পর্যন্ত পঞ্চাশটির মতো অভিযোগ এসেছে। অভিযোগগুলো অধিকাংশই বাড়ি ও হোটেল সংক্রান্ত। হয়তো বাড়িটা কাবা শরিফ থেকে একটু দূরে কিংবা নিম্নমানের। অথবা যে মানের বাড়ি বা হোটেলে রাখার কথা ছিল সেভাবে রাখা হয়নি, লিফট কাজ করে না, ঠিকমতো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয় না, রুচিমত খাবার দেওয়া হয় না, অনেকে আবার নিম্নমানের খাবারের অভিযোগও করেছেন। টাকা বেশি নিয়ে গড়ে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, মিনা ও আরাফাতের যাওয়ার সময় দেরিতে গাড়ি দিয়েছে, মদিনায় ৪০ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের সুযোগ পায়নি- এ জাতীয় অভিযোগ। তেমন গুরুতর কোনো অভিযোগ না। তার পরও আমরা এসব আমলে নিয়ে ব্যবস্থা নিচ্ছি। আমরা কোনো হাজির কাছ থেকে অভিযোগ শুনতে চাই না।

স্থানীয়ভাবে ও বাংলাদেশ থেকে প্রেরিত হজকর্মীদের কাজ কী? এর উত্তরে তিনি বলেন, হজকর্মীরা জেদ্দা বিমানবন্দর, মসজিদে হারামের বিভিন্ন গেট, বাংলাদেশিদের জন্য স্থাপিত স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, সরকারি হজযাত্রীদের বাড়ি থেকে শুরু করে মিনা, মুজদালিফা, আরাফাতের ময়দান ও কংকর নিক্ষেপের স্থানে সেবা দিয়ে থাকে। কেউ আবার দোভাষী হিসেবে কাজ করে। স্থানীয়ভাবে হজকর্মী নিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, স্থানীয় হজকর্মী নিয়োগ নীতিমালা মেনে বিধি মোতাবেক দেওয়া হয়েছে। গত বছর মন্ত্রণালয় থেকে ৩৫ জন মহিলা হজকর্মী নিয়োগের অনুমতি ছিল, এবার ৫০ জনের অনুমতি পাওয়া দেওয়া হয়েছে। এবার প্রথমবারের মতো, সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, স্থানীয়ভাবে প্রবাসীদের মধ্য থেকে অর্ধেক হজ গাইড নিয়োগের। এর কারণ হলো, বাংলাদেশ থেকে অতীতে এমন কিছু হজ গাইড এসেছে, যে আগে কখনও হজ করেনি, সে দ্বীন সম্পর্কে জানে না, সে আলেম না, মাশায়েরে মুকাদ্দাসার রাস্তাঘাট তেমনভাবে চেনে না- তারপরও নির্বাচকদের প্রভাবিত করে কোনো না কোনোভাবে তারা এসেছে। তাদের দ্বারা হাজিদের কোনো উপকার হয় না। বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে একাধিকবার জানানো হয়েছে। ফলে এবার অর্ধেক হজ গাইড প্রবাসীদের মধ্য থেকে নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে সর্বশেষ আমরা ৬২ জনকে চূড়ান্ত করি, কিন্তু কাজ করেছেন ৫৮ জন। তাদের অনেকেই সৌদি প্রবাসী আলেম, সৌদিতে অধ্যয়নরত বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। ফলে এবার হজযাত্রীরা বেশ উপকৃত হয়েছেন। অনেকেই আমাকে তাদের সন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/24/1566646050888.jpg

হজপালনের আগে হজযাত্রীদের প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করে হজ কাউন্সিলর বলেন, সহিহ-শুদ্ধভাবে হজপালনের জন্য প্রশিক্ষণ নেওয়া দরকার। প্রশিক্ষণ দ্বারা ভিন্ন একটি দেশে আসা, নতুন পরিবেশে নিজেকে খাপ খাওয়ানো, এখানকার কৃষ্টি-কালচার, আবহাওয়া ও হজের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য এটা দরকার। অভিজ্ঞতার আলোকে দেখা গেছে, তুলনামূলকভাবে প্রশিক্ষণ নেওয়া হাজি যেমন শৃঙ্খলা বজায় রাখেন অন্যদের ক্ষেত্রে তা দেখা যায় না। হজপালনের ক্ষেত্রে আর্থিক, শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা জরুরি বিষয়। কিন্তু আমাদের দেশ থেকে এমন অনেক হাজি আসেন, যে তার নিজ জেলার বাইরে এমনকি ঢাকায় কখনও আসেননি। তিনি একদিনে ঢাকা দেখেন, বিমানে উঠেন এবং অন্যদেশে আসেন। যে দেশের ভাষা ভিন্ন, নেই কোনো পরিচিত মুখ। রুচিমত খাবার পান না। রুম শেয়ার করতে হয়। সব কাজ নিজেকে করতে হয়। ফলে তার মানসিক অবস্থা খুব নাজুক হয়ে যায়। এ সময়টায় অনেকে অসুস্থ হয়ে যান। এ বিষয়গুলো প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কাটিয়ে উঠা সম্ভব।

হজপালন করতে এসে বাংলাদেশের এমপি, মন্ত্রী থেকে শুরু করে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের লোকজন হজ মিশনে উঠেন। তাতে হজযাত্রীদের সেবা বিঘ্নিত হয় কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হজ মিশনে ভিআইপিদের চাপ নিতে হয় না। তারা যথেষ্ট হেল্পফুল। তারা সিচ্যুয়েশন বুঝেন। কাজেই সেবাপ্রার্থীদের সেবায় কোনো হেরফের হয় না। তবে হ্যাঁ, মাঝে-মধ্যে ভিআইপির সফরসঙ্গীদের অযাচিত চাপ নিতে হয়। তাদের সামলানো দুষ্কর হয়ে উঠে। ২০১৮ সালে এমন উৎপাত বেশি ছিল, এবার তেমন কিছু ঘটেনি।

 

 

ভবিষ্যতে হাজিদের আরও বেশি সেবা দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে হজ কাউন্সিলর বলেন, প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে শতকরা ৭৩ ভাগ ও পাকিস্তান থেকে শতকরা ৮০ ভাগ হজযাত্রী সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজে আসেন। ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রে এ হার আরও বেশি। তাদের জন্য মক্কা থেকে একটু দূরে আজিজিয়ায় একসঙ্গে থাকার ব্যবস্থা করা হয়, মসজিদে হারামে যাতায়াতের জন্য তাদের আলাদা পরিবহন ব্যবস্থা আছে। সে হিসেবে বাংলাদেশের হজযাত্রীরা বেসরকারি ব্যবস্থাপনার দিকে বেশি ঝুঁকছে। ৫৯৬টি এজেন্সির মাধ্যমে তাদেরকে প্রায় আড়াই হাজার বাড়ি বা হোটেলে থাকতে হচ্ছে। ফলে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটছে। তবে সৌদি সরকার, ধর্ম মন্ত্রণালয় কিংবা হজসেবা সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ হচ্ছে, অন্য দেশের হাজিদের মতো তোমরাও আজিজিয়ার দিকে চলে যাও। সেখানে প্রচুর বিশাল বিশাল হোটেল রয়েছে। সেখানে হাজিরা ভালো থাকবে। আমি তো বলি, সেখানে গেলে হাজিরা ইবাদতও করবেন আরামে, ঘুমাবেনও আরামে। এর অর্থ হলো- এই মিসফালা থেকে প্রায় এক-দেড় কিলোমিটার হেটে যেতে হয়। প্রায়ই মসজিদে হারামের রাস্তা বন্ধ থাকে। ফলে মসজিদে হারামের বর্ধিতাংশে যেতে হয়। আবার কষ্ট করে আসতে হয়। পক্ষান্তরে যারা আজিজিয়ায় থাকেন তাদের জন্য পরিবহন ব্যবস্থা আছে, ওখান থেকে আসতে সময় লাগে ১০ মিনিট। নামাজ শেষে আবার হোটেলে ফিরতে সময় লাগে ১০ মিনিট। সবকিছু হিসাব করে সরকার আজিজিয়ার চিন্তা করছে। ভবিষ্যতে হয়তো সেদিকেই যেতে হবে।

আরও পড়ুন: নবীর স্মৃতি আর সৌন্দর্যের শহর তায়েফ

চলতি হজ মৌসুমে কিছু লাগেজ এখনও পাননি হাজিরা। এটা তো কষ্টকর বিষয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে হজ কাউন্সিলর বলেন, প্রতিবছরই কিছু লাগেজ হারায়। প্রায় আড়াই লাখ লাগেজের মধ্যে আজ পর্যন্ত ৫১টা ব্যাগ মিসিং। সাতশ'র মতো ব্যাগ মিসিংয়ের অভিযোগ ছিল। আমরা সর্বাত্মকভাবে চেষ্টা করছি লাগেজগুলো খোজে হাজিদের কাছে পৌঁছানোর। এক্ষেত্রে মক্কা রুট ইনিশিয়েটিভের ইউনাইটেড এজেন্সির অফিস, আমাদের হাজিদের সরকারি-বেসরকারি বাড়িতে খোজ নেওয়া হচ্ছে।

সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার স্বার্থে বাংলাদেশ থেকে পাঠানো বিভিন্ন দলের সদস্যদের সেবা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে হজ কাউন্সিলর বলেন, অন্যবারের তুলনায় তারা ভালো সেবা দিচ্ছেন। এবার তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়ে পাঠানোর ফলে এটা হয়েছে। তার পরও কিছু অভিযোগ এসেছে, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে, আমরা তাদের কাছে লিখিত, মৌখিক ক্ষেত্রবিশেষ শোকজ করে কারণ জানতে চেয়েছি। আমরা চেয়েছি, একটি সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা। যেখানে কারও দায়িত্ব অবহেলার কোনো সুযোগ নেই। ওভারঅল তাদের সেবায় আমি সন্তুষ্ট।

ভবিষ্যতে আর সুন্দর হজ ব্যবস্থাপনার জন্য হজযাত্রীদের প্রশিক্ষণ, লাগেজের ওপর নাম-ঠিকানা সুন্দরভাবে লেখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

নবীর স্মৃতি আর সৌন্দর্যের শহর তায়েফ

নবীর স্মৃতি আর সৌন্দর্যের শহর তায়েফ
তায়েফের পাহাড়ি পথ

তায়েফ (সৌদি আরব) থেকে ফিরে: পবিত্র মক্কা থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর স্মৃতিবিজড়িত শহর তায়েফ। এ শহর ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি।

চমৎকার সাজানো গোছানো শহর। মক্কা থেকে তায়েফের রাস্তাগুলো পাহাড়ের বুক চিরে তৈরি করা। এক পাশে উঁচু পাহাড় অন্য পাশে শরীর হিম করা গভীর খাদ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ এ শহর দেখতে হাজিরা কিছুটা সময় বরাদ্দ রাখেন।


পাহাড় কেটে বানানো রাস্তাটি একমুখী। অনেক উপরে ওঠার প্রতিক্রিয়ায় গাড়ির ভেতরে নিঃশ্বাস নিতে কিছুটা কষ্ট হওয়ার পাশাপাশি, কান বন্ধ হয়ে যায় আপনা-আপনি। তায়েফের রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় দেখা যায়, ঝকঝকে নীল আকাশ। মরুর দেশে এমন নীল আকাশের কথা চিন্তা করা যায়? পাহাড় দেখে মানুষ কেন আপ্লুত হয়, সেটা তায়েফের পাহাড় না দেখলে জানতাম না। খুব বেশি দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নেই। তারপরও আমার মনে হয়, পাহাড়ের সৌন্দর্য আর আকাশের সত্যিকারের নীল দেখতে হলে তায়েফের আকাশ দেখতে হবে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/24/1566606945381.jpg
মসজিদে আদ্দাস; তায়েফবাসীর নির্মম নির্যাতনে রক্তাক্ত নবী এখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন, পরে সেখানে একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়।


হজরত রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর স্মৃতিবিজড়িত শহর তায়েফের সৌন্দর্য পর্যটকরা পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখেছেন। মক্কায় এসে সেই তায়েফ না দেখা অনেকটা বোকামি। তবে তায়েফের পূর্ণ সৌন্দর্য দেখতে হলে পুরো একটি দিন থাকতে হবে সেখানে, কারণ তায়েফের আকাশ আর সৌর্ন্দয ক্ষণে ক্ষণে বদলায়। রাতের তায়েফ নাকি অনেক বেশি মোহনীয়। সেটা অবশ্য দেখা হয়নি।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/24/1566607134974.jpg
তায়েফের ফল


ইতিহাসের পাতায় তায়েফ নানা কারণে আলোচিত। এই তায়েফের বনি সাকিফ গোত্রে নবী করিম (সা.) দুধমাতা হজরত হালিমা সাদিয়ার ঘরে লালিত-পালিত হয়েছিলেন। এখন সেই বাড়ি-ঘরের কোনো চিহ্ন নেই। তারপরও একটি পাহাড়ের পাদদেশকে অনেকে হালিমার বাড়ি বলে সেখানে যেয়ে নামাজ পড়েন। পাশের পাহাড়টিতে নবী করিম (সা.) বকরি চড়িয়েছেন বলে মনে করে সেখান থেকে মাটি আনা, সেখানে যেয়ে গড়াগড়ি খাওয়া শুরু করেন লোকজন। সাম্প্রতিত বছরগুলোতে খুব বেশি ভিড় বেড়ে যাওয়ায় গত দুই বছর ধরে সেখানে যাওয়া বন্ধ।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/24/1566607227765.jpg
মসজিদে ইবনে আব্বাস


নবুওয়তপ্রাপ্তির পর হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) মক্কা থেকে তায়েফ এসেছিলেন ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে। কিন্তু তায়েফবাসী ইসলাম গ্রহণের পরিবর্তে নবীকে অত্যাচার ও নিগ্রহ করেছে। ইসলাম প্রচার করতে এসে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) তায়েফে প্রায় ১০ দিন অবস্থান করেছিলেন। তারপর ফিরে গেছেন তায়েফবাসীর নানা নির্যাতন সহ্য করে। রক্তাক্ত অবস্থায় নবী করিম (সা.) যেখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন, সেখানে একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। মসজিদের নাম মসজিদে আদ্দাস।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/24/1566607962824.jpg
কথিত সেই বুড়ির বাড়ি



মক্কা থেকে তায়েফ নগরের দূরত্ব প্রায় ১২০ কিলোমিটার। এর উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৬ হাজার ৩৩২ ফুট। পুরো শহরটিই গড়ে উঠেছে পাহাড়ের ওপর। মক্কা থেকে প্রায় সোয়া এক ঘণ্টা সময় লাগে তায়েফ আসতে। পথে উট-দুম্বা ও ছাগলের পাল দেখা যায়। বাদশা ফয়সাল ও বাদশা খালেদের আমলে শীতকালীন রাজধানী হিসেবে গণ্য করা হতো তায়েফকে। বাদশা খালেদের শাসনামলে এখানে একবার ওআইসি’র শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। রবিশস্য ও নানান ফল-ফলাদির জন্য তায়েফ বিখ্যাত। তায়েফে উৎপন্ন আঙুর, কমলা, আনার ইত্যাদি অতি দামী ফলফলাদি মিষ্টি ও পুষ্টিতে ভরপুর। বিশেষ করে তায়েফের আঙুর খুব বিখ্যাত। তায়েফের উৎপাদিত সবজি সৌদি আরবের চাহিদার প্রায় ৩০ ভাগ পূরণ করে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/24/1566607493793.jpg
মসজিদে রাসূল


প্রাচীনকাল থেকে মক্কা ও তায়েফবাসীর মাঝে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল। বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আব্বাস (রা.) তায়েফের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করতেন। পরে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) তায়েফের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য চালিয়ে যান। তায়েফের প্রধান মসজিদকে ইবনে আব্বাস মসজিদ বলা হয়। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর কবর মসজিদ সংলগ্ন কবরস্থানে। এ কবরস্থানে আরও অনেক সাহাবির কবর রয়েছে। মসজিদ সংলগ্ন একটি লাইব্রেরি আছে। সেটা অবশ্য জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত নয়। তবে সেখানে প্রাচীন অনেক কিতাবের সংগ্রহ আছে। রয়েছে হজরত আব্বাস (রা.)-এর হাতের লেখা কোরআনের কপিসহ বিভিন্ন সময়ে পাথর ও কাগজে লিখিত কোরআনের প্রাচীন কপি।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/24/1566607586946.jpg
মসজিদে  আলি


এখনও তায়েফবাসীর সুনাম রয়েছে ব্যবসার ক্ষেত্রে। তায়েফকে ঘিরে সৌন্দর্য্যের যে পসরা আল্লাহ দিয়েছেন, হাজি সাহেবরা সেসব দেখতে যান না। তারা যান সেখানকার কিছু ঐতিহাসিক জায়গা দেখতে। যদিও সৌদি সরকার সেসব জায়গায় যেতে নিষেধ করেন এবং স্থানগুলোর ঐতিহাসিক কোনো ভিত্তি নেই বলে দাবি করেন। তারপরও মানুষ ভিড় করেন। চলে পুলিশ আর পর্যটকদের লুকোচুরি। যেমন পর্যটকরা বুড়ির বাড়ি (যে বুড়ি নবীর মসজিদে যাওয়ার পথে কাঁটা দিতেন; এ ঘটনা মক্কার, তবে সেটা তায়েফ কীভাবে এলো বোধগম্য নয়)।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/24/1566634344584.jpg

বিবি হালিমার ঘর ছিলো এখানে, অনেকে সেখানে যেয়ে নামাজ পড়েন, পাথর বা মাটি নিয়ে আসেন। বর্তমানে এখানে যাওয়া বন্ধ করা হয়েছে।

 

বুড়ির সেই বড়ই গাছ, রাসূলের মসজিদ (তায়েফ এসে এখানে রাসূল সা. নামাজ আদায় করেছেন), মসজিদে আলি (হজরত আলি রা. তার শাসনামলে এ মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন, তায়েফে এলে এখান থেকে খেলাফত পরিচালনা করতেন।) ইত্যাদি দেখতে যান। সেখানে যেয়ে নামাজ পড়েন, দোয়া করেন। সৌদি সরকার ও ইসলামি স্কলাররা এসব করতে নিষেধ করেন। তারপরও মানুষ যায়। হুজুগ বা আবেগ বলে কথা। আমার মনে হয়, এসব না দেখে, শুধু পাহাড় আর আকাশের সৌন্দর্য দেখতে তায়েফ যাওয়া দরকার।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/24/1566607749532.jpg
খাবারের সন্ধানে রাস্তায় নেমে আসা বানর


তায়েফ শহরে রয়েছে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে তৈরি করা চমৎকার সব রিসোর্ট, পার্ক আর অবকাশ যাপনকেন্দ্র। দিনের বেলা আর হজের মৌসুম বলে মানুষজনের দেখা মিলল না। পর্যটকদের আনন্দ দিতে রয়েছে পাহাড়ে ক্যাবল কারের ব্যবস্থা। তায়েফের প্রবেশপথে ওকাজ নামক স্থানে রয়েছে ফলমূলের বিশাল বিশাল দোকান, বাচ্চাদের খেলার মাঠ। এখানে ভাড়ায় মরুভূমির জাহাজ উটে সওয়ার করা যায়। কিন্তু এর সবই হয় বিকেলে! অগত্যা অনেকটা খালি মাঠে আমাদের তায়েফ দেখতে হলো।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/24/1566608101486.jpg
মিকাত জিল মাহরাম


তবে একেবারে হাতাশা নয়, আমাদের আনন্দ দিলো পাহাড় থেকে নেমে রাস্তার পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো বানরের দল। ফেরার পথে বানরকে কলা খাইয়ে মিকাত জিল মাহরাম থেকে উমরার নিয়ত করে ইহরাম পরিধান করে ফিরলাম মক্কায়। সেই সঙ্গে মনে আফসোস, যদি একটি পুরো দিন!

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র