হজরত হাওয়া আ.-এর কবর

মুহাম্মদ ছফিউল্লাহ হাশেমী, অতিথি লেখক, ইসলাম, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
জেদ্দায় অবস্থিত হজরত হাওয়া আ.-এর কবর, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

জেদ্দায় অবস্থিত হজরত হাওয়া আ.-এর কবর, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

জেদ্দা (সৌদি আরব) থেকে: লোহিত সাগরের পাড়ে গড়ে উঠা সুবিশাল এক নগরী জেদ্দা। সৌদি আরবের দ্বিতীয় বড় নগরী, শিল্প নগরী এবং প্রধান সমুদ্র বন্দর। দেশের অর্থনৈতিক রাজধানীও এই জেদ্দা।

জেদ্দা শহরের আল বালাদ এলাকায় বেশকিছু প্রাচীন কবরস্থান আছে। এর মধ্যে একটি কবরস্থানের নাম- মাকবারায়ে হাওয়া বা হাওয়ার কবর। কবরস্থানটির নামফলকে আরবিতে লেখা আছে, মাকবারায়ে হাওয়া। অনেকেই মনে করেন, এই কবরস্থানে মানবজাতির আদি মাতা হজরত হাওয়া (আ.)-এর কবর রয়েছে। কবরস্থানের রক্ষণাবেক্ষণে নিয়োজিত ব্যক্তিদের সাথে কথা বললে তারা জানান, ‘এটি লাখ লাখ বছরের পুরোনো কবরস্থান এ কথা সত্য। কিন্তু এখানে হজরত হাওয়া (আ.)-এর কবর আছে কিনা আমরা এ ব্যাপারে কিছুই জানি না।’

সমকালীন সৌদি লেখক মুহাম্মদ সাদিক দিয়াম বলেন, ‘ওখানে হাওয়া (আ.)-এর কবর রয়েছে এ বিষয়ে কোনো যৌক্তিক প্রমাণ নেই। আমি মনে করি এটি একটি কল্পকাহিনী ছাড়া আর কিছুই নয়।’ এই কবরস্থানে হজরত হাওয়া (আ.)-এর কবর রয়েছে এমন কথাও অনেক ইতিহাসবিদ ও ভ্রমণকারীরা বলেছেন। কেউ কেউ তাদের বইতে কবরের আকার-আকৃতির বর্ণনা, এমনকি নকশাও দিয়েছিলেন। যেমন প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ মুহাম্মাদ আল-মাক্কি তার 'দ্য ট্রু হিসটোরি অব মক্কা অ্যান্ড দ্য নোবেল হাউজ অব গড' বইতে লিখেছেন, ‘হজের মৌসুমে হাওয়া’র সমাধিতে প্রচুর দর্শণার্থী ভিড় করতো। হজের নিয়ম-কানুনগুলো পালন শেষে তারা সেখানে যেতো। প্রতারকরা তাদের কাছে ওই সমাধির মাটিও বিক্রি করতো।’

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/27/1564206496483.jpg
কবরস্থানের ভেতরের দৃশ্য, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

 

তবে এখানে এই কবরস্থানকে আলাদা করে কোনো বিশেষত্ব দেওয়া হয় না। আর সব কবরস্থানের মতোই চারদিকে উঁচু দেয়াল ঘেরা এবং সর্বসাধারণের কবরস্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে এটি।

জেদ্দা সেই প্রাচীনকাল থেকেই পবিত্র নগরী মক্কার প্রবেশদ্বার হিসেবে খ্যাত। প্রাচীন জেদ্দা শহর সুরক্ষায় চারপাশে বৃত্তাকার দেয়াল নির্মাণ করা হয়েছিল। সে দেয়ালের চারদিকে ছিল চারটি দরজা। পূর্বদিকের দরজাটির নাম ‘বাবে মক্কা’ তথা 'মক্কার দরজা'। আজও ‘বাবে মক্কা’ নামটি বহাল আছে। এই দরজা থেকে শুরু হওয়া রাস্তার নাম ‘তরিকে মক্কা’ বা 'মক্কা সড়ক'।

অনেক হাজি জেদ্দা অবস্থানকালে হজরত হাওয়া (আ.)-এর কবর পরিদর্শনে যান। অনেকে আবার সেখানে গিয়ে দোয়া করেন। ধর্মীয় কিছু বিধি-নিষেধের কারণে ১৯২৮ সালে হাওয়ার সমাধিটি নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালে কংক্রিটের চাদরে ঢেকে ফেলা হয় সমাধিটি। তবে কবরস্থানটি যথারীতি চালু আছে এবং অনেক মৃতদেহই এখানে কবরস্থ করা হয়।

বিভিন্ন গ্রন্থের তথ্যমতে, হাওয়ার সমাধির দৈর্ঘ্য ১২০ মিটার, প্রস্থ ৩ মিটার এবং উচ্চতা ৬ মিটার।

কবরস্থানটি জেদ্দার নগরকেন্দ্র বালাদের কাছে এবং জেদ্দার প্রধানতম সড়ক মদিনা রোডের পাশে। ফলে সেখানে যাওয়া বেশ সহজ। গাড়িতে বিভিন্ন স্থানে যাওয়া-আসার পথে প্রায়ই কবরস্থানের পাশ দিয়ে যাওয়া লাগে।

কবরস্থানে গিয়ে দেখা যায় শুধুই সারি সারি কবর। প্রতিটি কররের মাঝখানে কয়েক টুকরো পাথর দিয়ে চিহ্নিত করা রয়েছে। কবরস্থানে নিরাপত্তার খুবই কড়াকড়ি ছিল।

মূল ফটকের সঙ্গে বেশ বড় একটি ছাউনি, দু'পাশে কাঠের বেঞ্চ পাতা। এখানে বসে মুসলিম দর্শনার্থীরা কবরবাসীদের জন্য দোয়া করে থাকেন। আরবদের অনেকে পানি ঢেলে দিচ্ছেন নিজ পরিজনের কবরে। অনেকে আবার গম বা ডাল ছড়িয়ে দিচ্ছেন কবরস্থানের কবুতরদের জন্য। ঝাঁকে ঝাঁকে কবুতর সারা কবরস্থানজুড়ে। সারি সারি কবরের মাঝখানে রয়েছে পায়ে চলার পথ। কবরগুলোতে রয়েছে ক্রমিক নম্বর। বিনা পয়সায় পাওয়া যাচ্ছে ঠাণ্ডা পানির বোতল।

এখানে ছবি তোলা একেবারে নিষিদ্ধ। চারপাশে কড়া নজর রাখছে নিরাপত্তা রক্ষী ও কবরস্থান কর্মীরা। ক্যামেরা নিয়ে ঢোকার তো প্রশ্নই আসে না। এতোকিছুর পরেও মুঠোফোনে কেউ হয়তো দু-একখানা ছবি তুলে ফেলেন গোপনে।