পবিত্র কাবা: মানুষের নিরাপদ সম্মেলন স্থল

মোহাম্মদ আতিকুর রহমান, অতিথি লেখক, ইসলাম

পৃথিবীর কেন্দ্রবিন্দুতে পবিত্র কাবা ঘরের অবস্থান। হজরত আদম আলাইহিস সালাম থেকে শুরু করে যুগে যুগে অসংখ্য নবী-রাসূল কাবা ঘর আবাদ করেছেন। বেহেশত থেকে দুনিয়ায় আগমনের পর এই কাবা সংলগ্ন এলাকা আরাফার মাঠে হজরত আদম আলাইহিস সালাম ও হজরত হাওয়া আলাইহিস সালামের পুনরায় সাক্ষাৎ হয়।

কাবার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- একত্রিকরণ। হজরত আদম ও হজরত হাওয়া (আ.) যেমনিভাবে কাবাকে কেন্দ্র করে সাক্ষাৎ লাভের পর আল্লাহর করুণায় সিক্ত হয়ে পরস্পরে নতুন করে পথচলা শুরু করেন, ঠিক তেমনিভাবে পৃথিবীর নানাপ্রান্ত থেকে ছুঁটে আসা মানুষ কাবাকে ঘিরে একত্রিত হয়ে আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের পাথেয় পান। পৃথিবীর মুসলমানরা দৈনিক পাঁচবার মহান রবের কুদরতি পায়ে আল্লাহু আকবর ধ্বনিতে লুটিয়ে পড়েন এই কাবাকে কেন্দ্র করে। কাবার এই আকর্ষণই বান্দাকে মাবুদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে।

কাবা পৃথিবীর প্রথম ঘর। প্রথম উপাসানালয়। কাবাকে কেন্দ্র করে পৃথিবীর আবাদ শুরু হয়। মূলের দিকে ফিরে যাওয়া মানুষের সৃষ্টিগতস্বভাব। সৃষ্টিকর্তার হুকুম পালনের মাধ্যমে সন্তুষ্টি অর্জন ও সৃষ্টির মূলের দিকে ফিরে যাওয়া- এই দু’টি বিষয়ের মাধ্যমে কাবা পৃথিবীব্যাপী মানবজাতিকে আকর্ষণ করে। যে আকর্ষণে মানবজাতি ছুঁটে চলে কাবা পানে। এক সময় কাফের-মুশরিকরাও কাবা তওয়াফ করত। পরবর্তীতে কাবার পবিত্রতা ও সম্মান রক্ষার জন্য তাদের তওয়াফ নিষিদ্ধ করা হয়।

আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর পূর্বে হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর জন্ম হয়। যখন পৃথিবীর মানুষ আল্লাহর একত্ববাদকে ভুলে চন্দ্র, সূর্য, বিভিন্ন কিছুর মূর্তি, বিগ্রহ ও আগুনকে সৃষ্টিকর্তা ভেবে তাদের পূজো-অর্চণা করত। পৃথিবীর সয়লাব ছিলো শিরিক ও ভ্রান্ত আকিদায়। অবিচার, অন্যায় ও পাপাচার ছিল মানুষের নিত্ত-নৈমিত্তিক বিষয়।

দুনিয়ার এমন দূর্যোগময় মুহূর্তে হজরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম মানুষকে শিরকি আকিদা থেকে বের করে আল্লাহর একত্ববাদে দীক্ষিত করার কাজে নিরলস পরিশ্রম শুরু করেন। কিন্তু মানুষ তাদের পূর্ব-পুরুষদের ধর্মত্যাগ করে আল্লাহর একত্ববাদে দীক্ষিত হতে অস্বীকৃতি জানায়। তবুও হজরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম নানা প্রতিকূলতা সহ্য করে আল্লাহর একত্ববাদের দাওয়াত অব্যাহত রাখেন। দাওয়াতি কাজের জন্য তার গোত্রের লোকজন রাগান্বিত হয়। তার বিরোধীতা শুরু করে। ফলশ্রুতিতে তিনি আল্লাহতায়ালার হুকুমে মক্কায় স্ত্রী-সন্তানকে রেখে আসেন। এটা ছিল আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে পরীক্ষা বিশেষ।

এভাবে হজরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম আল্লাহর পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধরণের পরীক্ষার সম্মুখীন হন। ওই সব পরীক্ষার অন্যতম হলো- মুশরিক কর্তৃক আগুনে নিক্ষেপ, স্ত্রী-সন্তানদের নির্জনবাস, কলিজার টুকরা আপন তনয়কে কোরবানি করার নির্দেশ ইত্যাদি। এমন কঠিন থেকে কঠিনতর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ায় আল্লাহতায়ালা তাকে মানবজাতির পিতা হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি পুত্র হজরত ইসমাঈল আলাইহিস সালামকে সঙ্গে নিয়ে কাবাঘরের পুনঃনির্মাণ করেন।

কাবা প্রসঙ্গে কোরআনে কারিমের অনেক জায়গায় আলোচনা করা হয়েছে। কোরআনে কারিমের এক আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যখন আমি কাবা ঘরকে মানুষের জন্য সম্মেলনস্থল ও শান্তির আলয় করলাম, আর তোমরা ইবরাহীমের দাঁড়ানোর জায়গাকে নামাজের জায়গা বানাও এবং আমি ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে আদেশ করলাম, তোমারা আমার গৃহকে তওয়াফকারী, অবস্থানকারী ও রুকু-সেজদাকারীদের জন্যে পবিত্র রাখো। যখন ইবরাহীম বললেন, হে পরওয়ারদেগার! এ স্থানকে তুমি শান্তিধাম করো এবং এর অধিবাসীদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও কিয়ামতে বিশ্বাস করে, তাদেরকে ফলের দ্বারা রিজিক দান করো। আল্লাহতায়ালা বললেন, যারা অবিশ্বাস করে, আমি তাদেরও কিছুদিন ফায়দা ভোগ করার সুযোগ দেবো। অতঃপর তাদেরকে বলপ্রয়োগে দোজখের আজাবে ঠেলে দেবো; সেটা নিকৃষ্ট বাসস্থান।’ -সূরা বাকারা: ১২৫-১২৬

বর্ণিত আয়াতের ভাষ্যমতে, আল্লাহতায়ালা কাবাকে মানুষের জন্য নিরাপদ সম্মেলনস্থল বানিয়েছেন। বিভিন্ন তাফসির গ্রন্থে উল্লেখ আছে, যদি কেউ কাউকে হত্যা করার পর সেখানে আশ্রয় গ্রহণ করত তাহলে সেখান থেকে বের না হওয়া পর্যন্ত কাবার সম্মানার্থে তার ওপর আক্রমণ করা নিষেধ ছিল।

উল্লেখিত আয়াতে হজরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম মক্কা নগরীকে শান্তিময় এবং এর অধিবাসীদেরকে বিভিন্ন ফলফলাদি দ্বারা রিজিক প্রদানের জন্য আল্লাহর নিকট দোয়া করেছিলেন। আল্লাহতায়ালা তার সেই দোয়া কবুল করেন এবং মক্কা ও মক্কার পাশ্ববর্তী অঞ্চলসমূহে বিভিন্ন ফলফলাদির সমাহার ঘটান। যা কিয়ামত পর্যন্ত স্থায়ী থাকবে।

আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী মানুষ পৃথিবীর দূরবর্তী অঞ্চল থেকে একস্থানে মিলিত হয়ে সংঘবদ্ধভাবে এক আল্লাহর ইবাদত করে এখান থেকে ইসলামের বার্তা নিয়ে নিজ নিজ দেশে ফিরে যান। মূলতঃ এই উদ্দেশ্যেই কাবাঘর নির্মাণ করা হয়। বিশ্ব মুসলিমের এ সম্মেলনের নামই হলো- হজ। এখান থেকেই প্রতিষ্ঠিত হয় বিশ্ব মুসলিম ভ্রাতৃত্বের ঐক্যতা।

এই কাবাকে কেন্দ্র করেই পৃথিবীর সকল সামর্থ্যবান মুসলমান মহান রবের ডাকে সাড়া দিতে ছুঁটে চলেন মক্কার পানে। লাব্বাইক… আল্লাহুম্মা লাব্বাইক ধ্বনিতে মুখরিত করে তোলেন দুনিয়ার আকাশ-বাতাস।

ইসলাম এর আরও খবর